কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?

 

কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ্‌র অসংখ্য প্রশংসা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যাকে আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত নবী ও রাসূলদের সর্বশেষে প্রেরণ করে এ ধারা বন্ধ করে দিয়েছেন। এবং যার দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার ওয়াদা করেছেন, যার পরে কোন নবী আসেনি  এবং আসবেওনা যদিও মিথ্যুকরা এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে কম করেনি।

আল্লাহ ইসলামকেই একমাত্রমনোনিত দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করেছেন সুতরাং কারো থেকে অন্য কোন দ্বীনের অনুসারী হওয়া মেনে নেবেননা। আল্লাহ বলেন:

 অর্থ্যাৎ: আর যে ইসলাম ছাড়া অপর কোন দ্বীন চায়, তার থেকে তা কখনো গ্রহন করা হবেনা, বরং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে গণ্য হবে। (সূরা আল ইমরান ৮৫)

ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে:

প্রথম স্তর: ইসলাম (বাহ্যিক দিক) এর ৫টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে।

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লার প্রেরিত পুরুষ রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়া।

২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. যাকাত প্রদান করা।

৪. রমজানের রোজা রাখা।

৫. সক্ষম ব্যক্তির জন্য আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের হজ্জ করা।

দ্বিতীয় স্তর: ঈমান (অভ্যন্তরীন দিক) এর ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে:

১. আল্লাহর উপর ঈমান আনা।

২. ফেরেশতাদের উপর ঈমান।

৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের উপর ঈমান, কুরআনে কারীমে সকল কিতাবের কথাই  এসেছে।

৪. আল্লাহর রাসূল সমূহের উপর ঈমান আনা যার ধারা শেষ হয়েছে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ দ্বারা যিনি আরবী; হাশেমী গোত্র থেকে ছিলেন, জন্ম ও নবী হিসেবে মনোনিত হয়েছিলেন মক্কাতে হিজরত ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন মদীনা মুনাওয়ারায়।

৫. আখেরাতের উপর ঈমান আনা।

৬. তাকদীর বা ভাগ্যের উপর ঈমান আনা, এমনভাবে যে, ভাল-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।

তৃতীয় স্তর: ইহ্‌সান, যার অর্থ হলো: প্রত্যেক মুমিন মুসলিম এমনভাবে আল্লাহর উপাসনা করবে যেমন সে তাকে দেখছে, আর যদি তা সম্ভব না হয়ে উঠে, তবে এমনভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন।

তবে ইসলামের (বাহ্যিক অংশের) ভিত্তি ও চুড়া হলো, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সঠিক কোন উপাস্য নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই প্রেরিত রাসূল।

 এ শাহাদাত বা সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে:

আল্লাহ ছাড়া কোন  উপাসনার যোগ্য সঠিক উপাস্য বা মাবুদ নেই। এ সব জানা, বুঝা, বিশ্বাস করা এবং মনে প্রাণে আঁকড়ে ধরা; আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ তার বান্দা, সুতরাং তার ইবাদত বা উপাসনা না করা, তিনি তাঁর রাসূল হেতু তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা; তিনি যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছেন সেগুলিকে সত্য বলে জানা তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন সে গুলিকে অনুসরণ করা, যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করা; আর আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে তার কথার উপর নির্ভর করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত পন্থা ছাড়া অন্য কোন পন্থায় আল্লাহর ইবাদত না করা, আর সে অনুসারে আমল করা, এবং অপরের কাছে সেটা পৌঁছানো, জানানো, বিবৃত করণ এবং অপরকে নির্দেশ দেয়া, আর যতটুকু সম্ভব এ ব্যাপারে বাধ্য থাকা বা আনুগত্য করা।

তবে এই সাক্ষ্য ঐ পর্যন্ত যথার্থভাবে সম্পন্ন হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষ্যদাতা এর অর্থ অন্তনিহিত তথ্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত না হবে, সাথে সাথে তার সে জ্ঞান হতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত; যার সামনে সন্দেহ ও অজ্ঞতার কোন স্থান থাকবে না, তিরোহিত দূরিভূত করবে মিথ্যার ও অসত্যের বেড়াজাল।

অনুরূপভাবে এ সাক্ষ্য সম্পন্ন হওয়ার অন্য আরেকটি শর্ত হলো: সাক্ষ্যদাতাকে সম্পূর্ণ কায়োমনোবাক্যে খাঁটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অবিকৃতভাবে তা মেনে নিতে হবে, যাতে করে তার বিপরীত শিরক্‌ বা বিদ‘আত সেখানে স্থান না পায়।

শিরক হলো, ইবাদতের কোন অংশকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের দিকে নিবদ্ধ করা, আর বিদ‘আত হলো ইবাদত বা উপাসনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত এর বিপরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া।

সুতরাং যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে তাকে শিরক বিদ‘আত স্পর্শ করতে পারবে না।

এমনিভাবে এ সাক্ষ্য হতে হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ওপূর্ণ বশ্যতার ভিত্তিতে যার সামনে এর অন্তর্নিহিত ও অবশ্যাম্ভাবী বস্তুসমূহে অস্বীকার বিদ্রোহ, ও ঘৃনার নাম তা ব্যত্ত থাকবেনা। আর তা হলো, শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত এবং কেবলমাত্র তাঁর রাসূলেরই অনুসরণ। আর এ সাক্ষ্য হতে হবে সম্পূর্ণভাবে এ সাক্ষ্য দান ও সাক্ষ্যদানকারীদের মনে প্রাণে ভালবেসে; যাতে করে এ সাক্ষ্য যারা দেয় না অন্তরের অন্তস্থলে তাদের প্রতি অপছন্দভাব ফুটে উঠবে; যা মূলত শির্ক ও বিদ‘আতকেই অপছন্দ করা এবং শির্ককারী মুশরিক ও বিদ‘আতকারীদেরকে এমন অপছন্দ করতে হবে যেমন তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা সে অপছন্দ করে।

এ বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার নীতির উপর ভিত্তি করে আমার প্রিয় ভাই রফি উনলা বাছিরি “কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?” এ প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। যদিও মুসলিমগণ তাদেরকে আগেই অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তাদের কাছ থেকে এটা স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এক মিথ্যুক নবুওয়াতের দাবীদারের অনুসারী। কিন্তু তারা ইসলাম নামের ছত্রছায়ায় সারা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক স্থানে শক্তিশালী আস্তানা গেড়ে তার মাধ্যমে ইসলামের বিকৃত চিত্র মানুষের কাছে পেশ করছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সাবধান করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে মিথ্যাবাদীদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর বাণীতে যেভাবে ধিকৃত করা হয়েছে তা প্রচার ও প্রসার করা আজকের দিনে খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“তার চেয়ে কে বেশী অত্যাচারী যে আল্লাহর উপর মিথ্যার সম্পর্কে দেখায় অথবা বলে আমার কাছে ওহী (বাণী) এসেছে অথচ তার কাছে কিছুই আসেনি”। [1]

অনুরুপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে পর্যন্ত ত্রিশ জনের মত মিথ্যুক প্রতারক, যাদের সবাই মনে করবে তারা আল্লাহর রাসূল, তারা প্রকাশ না পাবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না।”[2] তিনি আরও বলেন: “আমি সমস্ত নবীদের ধারা সমাপ্তকারী, আর আমার মসজিদ হলো শ্রেষ্টত্বের দিক থেকে সর্বশেষ মসজিদ”। [3]

সূতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে নবুওয়াতের দাবী করবে সে মিথ্যুক। আর এই কাদিয়ানীরা যদিও তার নিজেদের মুসলিম মনে করে থাকে; বস্তুত তারা ইসলামের উপর জঘণ্য আঘাত হেনেছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে, নবুওয়াতের মূলে করেছে কুঠারাঘাত, যে প্রধান মূলনীতির উপর ইসলামের প্রতিষ্ঠা সেটা নষ্ট করেছে; আর তা হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল তারা এ প্রধান বিশ্বাসকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। আল্লাহ তাদের সাথে প্রাপ্য ব্যাবহারই করুন এবং তাদের ফেৎনা ও অনুরূপ প্রত্যেক প্রতারকের ফেৎনা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন।

দো‘আ করি যেন আল্লাহ এর লিখককে উত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।

وصلى الله على خاتم الأنبياء ورسله وعلى آله وأصحابه أجمعين.

 

সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল আবুদ[4]

১০/০৯/১৪১৩ হি:

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

الحمد لله وحده، وصلوات الله وسلامه على من لا نبي بعده، وبعد!

কাদিয়ানীদের বাহ্যিক চাকচিক্যময় কথা-বার্তায় অনেকেই প্রতারিত হয় এবং প্রশ্ন রাখে কাদিয়ানীদেরকে খারাপ বল কেন? তারা তো নিজেদেরকে মুসলিমই বলে থাকে।

এ উদ্ভূত প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের নিম্নের কয়েকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

ক. তাদের ইতিহাস

খ. তাদের আকিদা বিশ্বাস

গ. তাদের দৈনন্দিন সম্পাদিত কার্যাদি, অর্থাৎ আরকানে ইসলাম সম্পর্কে তাদের মতামত।

ক. তাদের ইতিহাস

প্রথমেই যেটা লক্ষ্যণীয় তা হলো: ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সাহায্যে মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এ দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যারা ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশের আনুগত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান বলে সনদ লাভ করে এবং ১৯০০ সাথে ভারতস্থ ব্রিটিশ শাসনের অধীন ধর্মীয় দল হিসাবে নিবন্ধিত হয়।

১৯০৮ সালে যখন গোলাম আহমদ কাদিয়ানী মারা যায়, তখন থেকেই তাদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাপারে মত-পার্থক্য দেখা দিতে থাকে। ১৯১৪ সালে তা প্রকটরূপ লাভ করে, যার পরিনতিতে তারা দু’টি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ক. কাদিয়ানী: যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তনয় মীর্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন.

খ. লাহোরী: যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নবুওয়াতের দাবীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক মৌলবী মুহাম্মাদ আলীর নেতৃত্বাধীন।

তাদের এ দু’টি উপদল ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের মাটিতে কাজ করছে,  তবে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান কর্তৃক তাদেরকে অমুসলিম সংখ্যালঘু বলে ঘোষিত হয়। ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে তাদের কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। ফলে তাদের বর্তমান নেতা: মীর্যা তাহের আহমাদ (গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর পৌত্র) পাকিস্তান থেকে পালিয়ে নিয়ে লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছে।

 এ দিকে তাদের লাহোরী গ্রুপ পাঞ্জাবের দারুস্‌সালাম পল্লীতে তাদের আস্তানা গাড়ে, তবে তাদের প্রচার ও প্রসার অপরটির তুলনায় বেশী নয়।

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক হলো যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটিগুলো, (যেমন শিকাগো ইসলামিক ইউনিভার্সিটি যা তাদের প্রতিষ্ঠিত), বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ছাত্র গ্রহণ করে এবং তাদেরকে ব্রেন ওয়াশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার সুযোগ সুবিধা দ্বারা আকৃষ্ট করার ও ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

 

খ. তাদের আক্বীদা ও বিশ্বাস

১. আল্লাহর উপর ঈমান সম্পর্কে:

মুসলিম মাত্রই এটা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা‘আলার উপর বিশ্বাস তিন দিক থেকে হতে হয়:

এক: সমস্ত সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি করা, পালন করা, আইন দান, মৃত্যু ও জীবন দান এগুলো একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই বিশেষত্ব।

দুই: অনুরূপভাবে যিনি সৃষ্টি করেন, লালন করেন, জন্ম মৃত্যু প্রদান করেন জীবন বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন শুধু সে আল্লাহই যাবতীয় ইবাদত বা উপাসনার একমাত্র হক্কদার, অন্য কেউ এতে অংশীদার নয়। সুতরাং দো‘আ,  মান্নত, কুরবানী, বিপদমুক্তি, সাহায্য ইত্যাদি তথা সর্বপ্রকার ইবাদতে একমাত্র তাঁকেই উদ্দেশ্য করতে হবে।

তিন: আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল কতৃক আল্লাহর জন্য নির্দিষ্টকৃত নাম ও গুণাগুণকে কোন প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃত না করে তাঁর উপযোগী যেভাবে হবে সেভাবে তার জন্য তা সাব্যস্ত করা।

কিন্তু যদি কাদিয়ানীদের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে তারা এ তিনটি বিশ্বাসেই মুসলিমদের আক্কীদা-বিশ্বাসের বিরোধিতা করছে। যেমন:

মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ‘শিরক ফির রাবুবিয়াত’ বা আল্লাহ তা‘আলার সাথে নিজেকেও সবকিছুর স্রষ্টা ও মালিক বলে দাবী করেছে। এ ব্যাপারে তার মতামত হলো: সে এ মর্মে ওহী বা বাণী পেয়েছে যে, তাকে বলা হচ্ছে:

“আমার যেমন আকাশ ও ভুমণ্ডলের মালিকানা রয়েছে তেমনি তা তোমারও।”[5]

এ কথা ঠিক রাখতেই সে তার উর্দু ‘তাওদীহুল মারাম[6] বইয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক  অক্টোপাস[7] এর সাথে তুলনা করেছে।

অনুরূপভাবে ইবাদত যে, শুধুমাত্র আল্লাহকেই করতে হবে তাতেও সে দ্বিমত পোষণ করেছে, বরং আল্লাহর সাথে তারও ইবাদত করার জন্য সে লোকদের আহবান করেছে’ যেমন:  তার দাবী অনুযায়ী তার কাছে এই মর্মে বাণী এসেছে (!) যে:

“তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হলো, তুমি আমার সাথে একীভূত, একই সূত্রে গ্রথিত…… আল্লাহ তোমার পবিত্রতা জপ করছে ….. আর যে কেউ আল্লাহর প্রকাশ্য রূপের[8] সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তার কাছে কোন মঙ্গল নেই।”[9]

আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণবাহী কুরআন-হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত আল্লাহর নাম ও গুনাবলীসমূহ সম্পর্কে তার মতামত আরো জঘন্য। সে আল্লাহকে এমন কতেক নাম ও গুণে বিভূষিত করেছে যা কক্ষনো আল্লাহর (স্রষ্টার) শান এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। বরং তা কেবল বান্দার (সৃষ্টিজগতের) গুণই হতে পারে; যেমন সে বলছে “আল্লাহ …. তরবারী নির্মাতা।”[10]

আরও বলছে: “আমার রব চৌকিদারের মত আমার সামনে সামনে হাঁটে।”[11]

উপরন্তু সে সর্বেশ্বরবাদ (وحدة الوجود-Pantheism) বা জগতের সবকিছু এক, তথা সৃষ্টি জগত এবং স্রষ্টা একই বস্তুর দুইদিক, এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রবক্তা। তাই সে তার আরবী গ্রন্থ (الاستفتاء) তে তার দাবী মোতাবেক আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় আল্লাহ তা‘আলা নাকি তাকে বলছে (!) “তুমি আমার থেকে, আর আমি তোমার থেকে।”[12]

 অন্য এক স্থানে আল্লাহকে তার মহৎ গুণাগুণের বিপরীত গুণে ভূষিত করেছে। যেমন: তার দাবী অনুসারে আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় তার কাছে নাকি এ মর্মে বাণী এসেছে যে,  “তোমার সাথে আমার সম্পর্ক পিতা পুত্রের সম্পর্ক, তুমি আমার পুত্রতুল্য।”[13]

এতেই শেষ নয় বরং অন্য স্থানে বলছে তার কাছে নাকি ওহী এসেছে এই বলে যে,  “হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পারি নি।”[14]

 এ হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ  সম্পর্কে কাদিয়ানীদের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত বিশ্বাস।

প্রত্যেক মুসলিমকেই তাদের এ বিশ্বাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী হতে হবে। যাতে তারা কাদিয়ানীদের প্রকাশ্য কথা-বার্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধোকা না খায়; কারণ তারা প্রকাশ্যে শিরক থেকে মুক্ত থাকার অঙ্গিকার করে থাকে, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা নবুওয়াতের দাবীদারের সব গ্রন্থই শির্কে পরিপূর্ণ।

২. ফেরেশতার উপর ঈমান সম্পর্কে:

ফেরেশতা জগত সম্পর্কে ভণ্ড নবুওয়াতের দাবীদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর আক্বীদা ও বিশ্বাস হলো ফেরেশতা ও আল্লাহ একই বস্তু। তাই সে তার আরবী গ্রন্থ (حمامة البشرى) তে ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলছে: “এদেরকে আল্লাহ তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রূপে তৈরী করেছেন”[15]

এর থেকে বুঝলাম যে, সে ফেরেশতাদের অস্তিত্বই মানে না, বরং ফেরেশতা বলতে, আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গই বুঝে।

মোটকথা: মুসলিমদের অবশ্যই তাদের এই বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে হবে; আর জ্ঞানীদের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।

৩. ঐশী গ্রন্থ সমুহের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

ভণ্ড কাদিয়ানী তার আরবী গ্রন্থ (الاستفتاء) তে বলছে, “আল্লাহ …. আমার সাথে কথা বলেছেন যেমন তার রাসূলদের সাথে বলেছেন। …. আর আমি এই কালেমাসমূহের সত্যতার বিশ্বাস রাখি যেমন আল্লাহর অন্যান্য কিতাবের উপর রাখি” পৃষ্টা নং : ২২, ৮৬।

ফলে সে তার স্বহস্তে লিখিত বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন প্রবন্ধের সমষ্টি (تذكرة الوحي المقدس) বা ‘ঐশী বাণী স্মারক’ নামে যার নামকরণ করেছিল; সেটাকে আল্লাহর কাছ থেকে যথাযথ অবতীর্ণ অন্যান্য কিতাবাদীর সাথে তুলনা করেছে।

এটা প্রমাণ করতে গিয়ে তার অনুসারীরা সূরা আল-বাকারার আয়াত:

﴿وَٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ وَبِٱلۡأٓخِرَةِ هُمۡ يُوقِنُونَ ٤﴾ [البقرة: 4]

এর মধ্যকার (ٱلۡأٓخِرَةِ) শব্দের বিকৃত অর্থ (Distortion) করে বুঝতে চায় যে, (আখেরাত)[16] দ্বারা কাদিয়ানীর নবুওয়াতের কথা বুঝানো হয়েছে; অবশ্য তারা কুরআন হাদীসের অর্থ বিকৃত করার কায়দা কানুন তাদের পুর্বসূরী কাদিয়ানীর কাছ থেকেই নিয়েছে। ফলে যদি তার স্বহস্তে লিখা বিভিন্ন ভাষায় রচিত রচনাবলীকে ঐশী বাণী বলতে হয়, তবে কুরআনকেও বলতে হয় যে, মানুষের রচনা বা মানবের লিখা।[17] আল্লাহর কালাম নয়। (নাউযুবিল্লাহ)

৪. রাসূলদের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

মুসলিমদের বিশ্বাস হলো যে, নবীগণ পবিত্র নসল ও নসব থেকে নির্বাচিত হতে হয়ে থাকেন, সুতরাং তাদের নসব এ কোন প্রকার ব্যাভিচারের নাম গন্ধও নেই কিন্তু গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতে নবীদের আসল নসব পবিত্র হতে হবে এমন কোন কথা নেই, বরং সে তার উর্দু বই (কিসতিয়ে নুহ) তে মরিয়াম (আ) সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলছে, (সে তার গর্ভসহ বিবাহ বসতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তার স্বজাতীয় মুরব্বীরা তাকে বিবাহের জন্য পীড়াপীড়ি করছিল)[18]

তারপর তার নবুওয়াতের দাবীর দ্বিতীয় পর্যাযে সে যখন নিজকে ঈসা (আ) এর অনুরূপ বা স্বদৃশ্য (Analogous) বলে বর্ণনা করত, তখন বলত “ঈশার সদৃশ ব্যক্তি ঈশা থেকেও উত্তম”[19]

অতপর তার জীবনের তৃতীয় স্তরে যখন সে পূর্ণ নবুওয়াত দাবী করলো তখন সে স্পষ্টাক্ষরে নিজের নবুওয়াতের কথা বলতে নিরস্ত থেকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শানে না‘ত কসীদা লিখতে আরম্ভ করল, এ সমস্ত কসিদায় সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসায় সীমালঙ্গন করতে লাগল। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুই নাম ছিল, (মুহাম্মাদ, আহমাদ) সেহেতু সে এসব কসীদায় দ্বিতীয় নামটির ব্যবহার বেশী করে করতে লাগল; তবে এসব কিছুতে ধাঁধাঁ ও প্রহেলিকা এমন ব্যাপকহারে ব্যাবহার করতো যে, সে কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসা করছে নাকি আহমদ (নিজ নাম এর শেষাংশ) এর প্রশংসা করছে তা অনেকেই বুঝতে পারত না।

অতপর সে  সরাসরি আহমাদ দ্বারা নিজকে বুঝাবার এক চমৎকার পন্থা আবিস্কার করলো, এবং বললো “আমার এ জুব্বায় (পোষাকে) আল্লাহর নুর ছাড়া আর কিছুই নেই, আসহাবে সুফফা তোমার উপর দরুদ পাঠ করছে, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহীয়ানরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু আহমাদ সে আত্ম প্রকাশ করেছে, সম্মোহনীরূপ নিয়ে”[20]

অনুরূপভাবে ধাঁধাঁর ব্যবহার সম্পন্ন হওয়ার পর এক সময় সরাসরি নবুওয়াতের দাবী করে বললো: “আমি যা কিছুই বলেছি, সেটা আমার রব এর পক্ষ থেকে যে আমার নিত্য সঙ্গী”[21]

 তার অনুসারীরা তার নবুওয়াতের দাবীকে চাঙ্গা করতে সূরা আল-জুমু‘আ এর আয়াত (২-৩)

﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّ‍ۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢ وَءَاخَرِينَ مِنۡهُمۡ لَمَّا يَلۡحَقُواْ بِهِمۡۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٣﴾ْ [الجمعة: 2-3]

এর অনুবাদ করতে যেয়ে সম্পূর্ণ বিকৃত ভাবে (وَءَاخَرِينَ مِنۡهُمۡ لَمَّا يَلۡحَقُواْ بِهِمۡۚ) এর অনুবাদে এ কথা ঢোকালো যে, এর অর্থ হলো (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার গোলাম আহমাদ এর রূপ নিয়ে আবার দুনিয়ায় আসবে।[22] এর চেয়ে বড় কুফরী আর কি হতে পারে?

যেখানে সে নিজকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্ণজম্মের রূপ বলে দাবী করছে? [23]

মুসলিমরা এ ব্যাপারে যতটুকু সাবধান হয়েছে?

এ পুনর্জন্মবাদের এ বিশ্বাস হিন্দুদের থেকে ধার করা বুলি মাত্র।

৫. আখেরাতের উপর ঈমান সম্পর্কে:

প্রত্যেক মুসলিমই এটা বিশ্বাস করে যে, পরকাল আছে; যেখানে পাপ পূণ্যের বিচার হবে এবং প্রত্যেকের কাজ অনুযায়ী সে প্রতিফল ভোগ করবে, কিন্তু গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষন করে, সে ১৮৯৩ সর্বপ্রথম ১৩১১ হি মোতাবেক কেয়ামতের যে সমস্ত আলামত রয়েছে:

১. সেগুলোকে অস্বীকার করে। যেমন তার আরবী বই (حمامة البشرى) তে সূরা আ‘রাফ এর ১৮৭ নং আয়াত[24]

﴿يَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلسَّاعَةِ أَيَّانَ مُرۡسَىٰهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ رَبِّيۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقۡتِهَآ إِلَّا هُوَۚ ثَقُلَتۡ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَا تَأۡتِيكُمۡ إِلَّا بَغۡتَةٗۗ يَسۡ‍َٔلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنۡهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ ٱللَّهِ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ١٨٧﴾ [سورة الأعراف: 187]

এর ব্যাখ্যা বিকৃত করতে গিয়ে শব্দটিকে (بَغۡتَةٗۗ) হিসাবে লিখে:[25] আয়াতের ভুল ব্যাখ্যায় গিয়ে বলে যে, (بغطة) শব্দটি দ্বারা প্রকাশ্যভাবে বুঝায় যে, কিয়ামতের যে সমস্ত আকাট্য প্রমাণ বা প্রকাশিত হবে বলে বলা হয়, তা কখনো অনুষ্ঠিত হবে না।[26]

এতো গেল তার প্রথম প্রদক্ষেপ, দ্বিতীয় স্তরে এসে ১৩১৮ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ সালে সে সরাসরি পরকাল অস্বীকার করার জন্য প্রথমে শব্দের নম্বর হিসাব করে গানিতীয় কায়দায় বললো “আজকের দিনে কাল তার সর্বশেষ গুর্ণায়নে পৌঁছেছে, সূরা ফাতেহায় বর্ণিত ইহকাল এর নির্ধারিত সময় সাত হাজার চন্দ্র বছর এবং সূর্য্য বছর শেষ হতে চলেছে”[27]

 এ কথার ব্যাখ্যায় তার ছেলে মাহমুদ বলে: “পরকাল মৃত্যুর পরেই শুরু হয়ে থাকে, মৃত্যু সময় থেকে পৃথক করে হাজার বছর পরে নির্দিষ্ট সময়ে পরকাল বলতে কিছু নেই”[28]

মোট কথা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী যখন দাবী করল যে, সেই হলো প্রতিশ্রুত মসীহ,[29] তখন থেকেই সে তার এ দাবীর সমর্থনে বলতে আরম্ভ করল যে, তার আবির্ভাবের পরবর্তী সময়টাই হলো কিয়ামত, আর এ ব্যাপারে তার যুক্তি হলো যে, প্রতিটি শব্দের গোপন একটা নম্বর রয়েছে। সেই শুধুমাত্র তা জানে আর সে অনুসারে হিসাব নিকাশ করে সে সিদ্ধান্ত নিয়াছে যে, ইহকালীন বয়স যত হবার কথা তা শেষ হয়ে গেছে তার আবির্ভাবের সাথে সাথেই; সুতরাং তার আবির্ভাবের পরবর্তী জীবনটাকে পরকালীন জীবন হিসাবে মানতে হবে। এভাবেই সে তার সমস্ত প্রচেষ্টা ইয়াহূদী নাসারাদের কিয়ামত সম্পর্কিত বিশ্বাস এর সাথে সম্পৃক্ত করতে চাইলো, কিন্তু যখন তার মারা যাওয়ার পরও দুনিয়ার অস্তিত্ব রয়ে গেল, তখন তার অনুসারীরা সেই বিশ্বাসটাকে নতুন করে সাজাবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু হায়! তার সমস্ত পুস্তকাদী এব্যাপারে এত স্পষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণবহ যে সেটা কোন ব্যাখ্যাই গ্রহণ করছে না।

৬. তাকদীর বা ভাগ্যের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী  অন্যান্য পাচঁটি রুকন এর মত এখানেও ভ্রষ্ট  হয়েছে।

এ ব্যাপারে সে তার আরবী বই (الاستفتاء) তে বলছে যে, আল্লাহ নাকি তাকে প্রেমের ভান বা ছিনালি করে বলছে “হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পেরেছিলাম না”[30] [না‘উযুবিল্লাহ]

 এতে করে সে বুঝাতে চাইলো যে, আল্লাহ তার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, এ জন্যই অনেক দেরীতে তাকে নবুওয়াতের খবর দিয়েছে। [না‘উযুবিল্লাহ]

এ সব দাবীর পিছনে যে রহস্যটা কাজ করেছে সেটা হলো, সে যে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করত; সেটাকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা; কারণ সে কখনো নিজেকে বলতো প্রতিশ্রুত মসীহ, আবার কখনো বলতো: মাহদী, আবার ক্ষনিক পরেই বলতো, সে হলো মুজাদ্দিদ বা ধর্ম সংস্কারক, আবার কখনো বলতো, সে হলো নবী: আবার কখনো দাবী করতো যে, সে সমস্ত ধর্মের সংশোধনকারী।

সে যখন দেখলো যে, তার বিভিন্ন অবস্থান লোকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করবে, তখন দাবী করলো যে,  আল্লাহ তাকে প্রথমে চিনতে ভুল করেছিল। [না‘উযুবিল্লাহ]

অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী বইতেই সে বলছে যে, আল্লাহ তাকে বলছে “কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে তখন তোমার শুধুমাত্র হও বলতে হবে, তাতেই তা হয়ে যাবে”[31]

 সে এটাকে তার গ্রহনীয় প্রার্থনা হিসাবে বর্ণনা করে তার আরবী বই তে বলছে “কখনো কখনো আল্লাহ তার অমোঘ ইচ্ছাকে ত্যাগ করে তার বান্দার প্রার্থনা শুনেন”[32]

যাতে বুঝা গেল যে, তার মতে আল্লাহর অমোঘ ইচ্ছা পরিবর্তনশীল, সুতরাং সে তাকদীরের উপর ঈমান রাখার প্রয়োজন মনে করে না।

আমরা যদি তার এ বিশ্বাসের মূল খুজতে যাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সে এ কথাগুলো মথি লিখিত সু সমাচার থেকে গ্রহণ করেছে, কারণ সেখানে ঈসা (আ) এর দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয়েছে, তিনি নাকি তার সাথী পিটারকে বলেছেন “তুমি ধরাপৃষ্ঠে যা কিছু করবে তাই উর্ধ্বাকাশে গৃহিত হবে, আর ভূপৃষ্ঠে যাই সংগঠিত হবে,  উর্ধ্বাকাশেও তাই ঘটবে)[33]

সুতরাং যদি তার শিক্ষা ইসলামী ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী না হয়ে অন্যান্য বিভিন্ন মতবাদ থেকে নেয়া হয়ে থাকে বা মন গড়া কিছু কার্যকলাপকে ধর্মের রূপে রূপায়িত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তা হলে কিভাবে বলা যাবে যে, তার অনুসারীদেরকে মুসলিমরা অনাহুত নিন্দা করে? আর কিভাবেই বা তাদেরকে আমরা মুসলিম বলবো? সুতরাং তারা যেখানেই থাকুক অবশ্যই নিন্দনীয় ও ধিকৃত।

গ. তাদের রীতি নীতি

১. কালেমায়ে শাহাদাত (لا إله إلا الله محمد رسول الله) সম্পর্কে তাদের মতামত:

আগেই বলেছি ইবাদতের ক্ষেত্রে কাদিয়ানী নিজকে আল্লাহর সাথে ইবাদতের জন্য আহবান করেছে এবং নিজকে আল্লাহর প্রকাশ্য রূপ বলে দাবী করেছে।[34]

 অনুরূপভাবে অন্যস্থানে বলছে যে, “আল্লাহ নবীদের সাজে সজ্জিত হয়ে জগতে আগমন করেছেন” অর্থাৎ নবীরা পূজনীয় হবার ক্ষমতা রাখেন, অন্যস্থানে নিজকে মূসা (আ) এর সাথে তুলনা করে বলছে তার কাছে যে ওহী এসেছে তাতে আছে “তুমি উম্মতে মুহাম্মাদীয়ার জন্য মূসার মত”[35]

অর্থাৎ মূসা যেমন নতুন শরীয়ত নিয়ে এসেছিল তুমি তেমনি নতুন শরীয়ত নিয়ে প্রেরিত অনুরূপভাবে তুমি অন্যান্য নবীদের মত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

উপরোক্ত কথা দ্বারা ভণ্ড নবুওয়াতের দাবীদার নিজকে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য বলে সাব্যস্ত করছে। অপরদিকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবর্তে তাকেই সমীহ ও সম্মানের অধিকারী মনে করার জন্য তার অনুসারীদের চেষ্টার কারণও উদঘাটিত হয়েছে।

এ জন্যই সে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুটো রূপ সাব্যস্ত করেছে, প্রথমরূপে আরবীয় মুহাম্মাদ আর দ্বিতীয় রূপে; অনারব আহমদ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, আর এটা প্রমান করার জন্য সে বাস্তবকে অস্বীকার করতেই এমন অসার তর্কে যেতেও দ্বিধা করে নি।

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, কাদিয়ানীরা (لا إله إلا الله) (আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই) এটাকেই অস্বীকার করছে; (محمد رسول الله) বা মুহাম্মাদ আল্লাহর বাসূল বা প্রেরিত পুরুষ, এটার সাক্ষ্য তাদের কাছে পাওয়া তো অনেক দূরের কথা। ফলে তারা ইবাদতের জন্য যেমন গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ব্যক্তিত্বকে; তেমনি নবুওয়াতের জন্যও তারই সত্বাকে কল্পনা করবে এটাই স্বাভাবিক।

২. নামাজ কায়েম করা সম্পর্কে তাদের মতামত:

ইসলামের এ বিশেষ নিদর্শনের ব্যাপারে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যে সব প্রকাশ্য বিরোধিতায় লিপ্ত তা হলো:

 # তার মতে যারা মসজিদে থাকবে তাদের জন্য মুয়াজ্জিনের আজানের জওয়াব দেয়া মুস্তাহাব নয়।[36]

# আরবী জানা সত্বেও যে কোন ভাষায় নামাজ পড়লেই শুদ্ধ হবে।[37]

# মাহিলাদের উপর জুমা ওয়াজিব, জুমা ওয়াজিব হওয়ার জন্য দুইজন লোকই যথেষ্ঠ; এমনকি কোন লোক তার স্ত্রী ব্যতীত কাউকে না পেলে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জুমা পড়া তার উপর ওয়াজিব।[38]

অনুরূপভাবে সে সুফীবাদে বিখ্যাত নিরবিচ্ছিন্ন অনবরত চল্লিশ দিনের নির্জন বাস বা বদ্ধ ঘরে একাকীত্বে থাকাকে মনে প্রাণে সমর্থন দেয়, এবং এটাকে বিরাট পূণ্যের কাজ বলে মনে করে”[39]

যদিও সে পরকালে বিশ্বাস করে না তবুও মানুষকে ধোকা দেবার নিমিত্তে সে তার বই (الوصية) তে তার অনুসারী যারা বেহেস্তি কবরস্থান (যা ‘কাদিয়ান’ নামক স্থানে অবস্থিত) সেখানে দাফন হবে তাদেরকে বেহেস্তের ওয়াদা প্রদান করেছে।[40]

সুতরাং গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যদি তার অনুসারীদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পথের বাইরে নতুন নতুন নিয়ম কানুন জারী করে, তা হলে তাদেরকে নিন্দা করা কি প্রত্যেক মুমিনের জন্য ওয়াজিব নয়?  তাদের প্রকাশ্যরূপে মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয় সে ব্যাপারে লোকদেরকে সাবধান করা কি জরুরী নয়?

 প্রশ্ন হতে পারে : তারা তো, আমাদের মতই নামাজে হাত বেধে দাঁড়ায়, নিবিষ্ট মন নিয়ে নামাজ পড়ে। এমনকি সিজদায় যাবার সময় আগে হাত রেখে তারপর দুই হাটু স্থপন করে থাকেন।[41] আপনি বি বলতে চান তারা এটা তাদের মোনাফেকী?

 উত্তরে বলবো : হ্যাঁ নি:সন্দেহে এটা তাদের মোনাফেকী।

আল্লাহ তা‘আলা বলছেন:

﴿۞لَّيۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ﴾ [البقرة: 177]

(মুখ পূর্ব পশ্চিম ফিরানোর মাঝে কোন সওয়াব নেই, সওয়াব হলো ঐ ব্যক্তির জন্য যে, ঈমান এনেছে আল্লাহ পরকাল, ফেরেস্তা, আল্লাহর কিতাবাদী এবং তার রাসূলদের প্রতি।)[42]

৩. যাকাত আদায় করা সম্পর্কে তাদের মতামত:

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যাকাতকে নিজের মনগড়া ভাবে ফরয করেছে। কারণ সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে সমস্ত হাদীসে যাকাতের বিধান বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে অস্বীকার করেছে কারণ তার মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসসমূহ কুরআনের বিরোধিত করছে। অনুরূপভাবে সে মনে করে যে, হাদীস লেখা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর অনেক যুগ পরে। সুতরাং তা গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। উপরন্ত সে মুসলিমদেরকে এই বলে আক্রমন করে বসলো যে, “যারা হাদীসের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় তারা কুরআনের মর্যাদাহানি করে।”[43]

 এ জন্যই সে তার প্রথম ফতোয়াতেই এই বলে আহবান করেছে যে, “তার মতের বিপরিত যত সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস আছে তা বাদ দিতে হবে।”[44]

আর এজন্যই সে তার অনুসারীদের প্রত্যেক জীবিত লোকের উপর নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা তাদের আয় থেকে মাসিক ১/১৬ অংশ বা ১/১০ থেকে শুরু করে ১/৩ অংশ পর্যন্ত সবাইকেই আন্দেলনের বাক্স এ আন্দোলনের স্বার্থে জমা দিতে হবে।[45]

অনুরূপভাবে সে তার অনুসারী প্রত্যেক মৃত্যু পথ যাত্রীর উপর ধার্য করেছে যে, যদি সে বেহেস্তি কবরস্থানের সৌভাগ্যে গৌরবাম্বিত হতে চায় তবে যেন তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ১/১০ অংশ আন্দোলনের স্বার্থে দান করে যায়।[46]

তার এই নির্দেশ কাদিয়ানীদের উভয় গ্রুপ (কাদিয়ানী ও লাহোরী) এর মাঝে এখনো প্রচলিত রয়েছে।

এ সমস্ত কিছুর ফলে তারা: একদিকে নির্দিষ্ট পরিমান দান মনগড়াভাবে নিজেদের উপর ধার্য করলো, শরীয়ত এর হুকুমকে অস্বীকার করলো; অপর দিকে খৃষ্টানদের মত বেহেস্তের কেনা বেচার চেক হস্তান্তরের ন্যায় বেহেস্তি কবরস্থান বিক্রি করার অভিনব পদ্ধতি চালু করল।

 একবার ইসলামে যাকাত বিধানের দিকে তাকানো যাক, দেখা যাবে সেখানে অত্যন্ত ইনসাফের সাথে তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যেমন: যে সমস্ত ভূমিতে নিজ কষ্টে কৃষকরা ফসল ফলায় সেখানে ১/২০ অংশ, আর যেখানে কৃষকের কষ্ট ব্যতীত প্রাকৃতিক নিয়মে ফসল উৎপন্ন হয় সেখানে ১/১০ অংশ, বরং অন্যান্য সম্পদের উপর মাত্র ১/৪০ অংশ যাকাত ধার্য করা হয়েছে; যাতে ইনসাফ ও ন্যায়ের চরম উৎকর্ষতা ফুটে উঠেছে। এর সাথে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতামতের কি কোন তুলনা চলে?

৪. রমজানের রোজা সম্পর্কে তাদের মতামত:

গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতে রমজানের রোজা ভাঙ্গা প্রত্যেক মুসাফির ও রোগীর উপর ওয়াজিব, চাই কি তার সফর দীর্ঘ হউক বা সংক্ষিপ্ত হোক, রোগ বেশী হোক আর কমই হউক সর্বাবস্থায়ই রোজা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে যারা ই‘তিকাফে থাকবে তাদের জন্য যে কোন দুনিয়ার কথা বলতে নিষেধ নেই, যেমনি ভাবে তারা ইচ্ছা করলে রোগীর দেখা শুনার জন্য বাহির হতে পারে।[47]

ফরজ রোজার ব্যাপারে উদাসীনতা স্বত্বেও সে সুফীদের থেকে ধার করে অনবরত ৮ মাস পর্যন্ত (১৮৭৫-১৮৭৬) নফল রোজা রাখার পদ্ধতি আবিস্কার করে।[48]

তার আরেক অনুসারী তার এ অন্তরীন থাকার ঘটনাকে ফলাও করে প্রচার করতে গিয়ে কিভাবে চল্লিশ দিন পর্যন্ত সুফীদের নির্জনবাসে অবস্থান করে ধন্য হয়েছে তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে।[49]

 বরং সে এ শরিয়ত গর্হিত কাজকে অশেষ পূণ্যের কাজ মনে করে বসেছে, এবং বলছে যে, সে এই নির্জন বাসের দ্বারা অদৃশ্যের পর্দাকে ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।

আর এখান থেকে বের হবার পরই সে ১৮৭৬ সালে তার বানোয়াট বিভিন্ন ভাষার ভুলে পরিপূর্ণ বাক্যাবলীকে ওহী বলে দাবী করতে লাগল।[50]

সুতরাং তার অবস্থা থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, সে শয়তানের মন্ত্রনাকে ওহী বলে চালাতে চেষ্টা করেছে। তা হলে প্রত্যেক মুসলিমকে তার শয়তানী থাবা থেকে সাবধান করা কি জরূরী নয়?

৫. হজ্জ সম্পর্কে তাদের মতামত:

কাদিয়ানীদের চতুর্থ খলিফা মীর্যা তাহের আহমদ তার এক জুম‘আর আরবী খোতবায় এই বলে দাবী করেছে যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী আন্তরিক আকাংঙ্খা ছিল মক্কা মদীনায় কবরগুলিতে গিয়ে সেগুলির মাটি দ্বারা ধন্য হবে।[51] (তবে হজ্জ করবে এ জন্য নয়)

হজ্জের জন্য তার আকাংখা প্রকাশ না পাওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তার মুখপাত্র (মৌলবী সায়ফী কাদিয়ানী তার ইংরেজী বই (ملفوظات المسيح الموعود) এ বলছে (যার পড়শী ক্ষুধার্ত থাকবে, ফকির থাকবে, তার জন্য হজ্জ করা হারাম, বরং গরিবের প্রতি সমবেদনা এবং পড়শীর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বকে ইসলাম ফরয হজ্জের উপর স্থান দেয়।)[52]

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে সে হজ্জ না করার জন্য শস্তা একটা যুক্তি দাড় করাতে চেষ্টা করেছে।

তবুও ১৩১১ হি: (মোতাবেক ১৮৯৩) সালে তার সাথীরা তাকে নিজে স্বয়ং হজ্জ পালন করতে বললে সে শস্তা দামের জবাব দিল (حتى يأذن الله)[53] অর্থাৎ তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম হয় নি।

কিন্তু এতেও সে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ১৩১৫ হি: মোতাবেক ১৮৯৭ সালের দিকে তার আরবী বই (الاستفتاء) তে প্রহেলিকা এবং ধাঁধাঁর মত কিছু কথা বলে হজ্জের স্থান পরিবর্তন করতে উদ্বুদ্ধ করলো; তাই সে বলছে:

 (আল্লাহ চায় তোমাদের গুনাহ ঝরে যাক তোমাদের জিঞ্জির খসে যাক এবং শুস্ক ভূমি থেকে শষ্য শ্যামল ভূমিতে তোমরা স্থানান্তরিত হও। কিন্তু তোমরা নিজদের দেহ কে পাপ পঙ্কিলে রাখতে সচেষ্ট, তোমাদের প্রিয় ভূমি থেকে দুরে থাকতে তোমরা সন্তুষ্ট, আমি তোমদেরকে প্রাচীন ঘরের দিকে ডাকছি, তোমরা সেখান থেকে মূর্তির দিকে ধাবিত হচ্ছো, কতক্ষন তোমরা এ বিড়ম্বনায় থাকবে? )[54]

 এ সমস্ত ধাধা আর প্রহেলিকা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘কাদীয়ান’ নগরী, যেখানে মানুষ নামের জানোয়ারগুলো বাস করে। যেখানকার মুসলিমরা চতুস্পদ জন্তুর চেয়েও অধম, যেমন সে নিজেই তার অন্য বইতে তা লিখছে। (তিনি অর্থাৎ আল্লাহ হিন্দুস্তানের দিকে তাকিয়ে এ (কাদীয়ান)কেই একমাত্র খিলাফতের কেন্দ্রস্থল হিসাবে পেলেন।[55]

 এ সব কারণে তার অনুসারীদের যারা তখনো হজ্জে আগ্রহী ছিল তাদেরকে এই শর্ত আরোপ করতো যে, “হজ্জের জন্য বাধা-বিপত্তি দূরীভূত হওয়া দরকার”[56] তা হচ্ছে না বিধায় হজ্জ করা যাবে না। তার চেয়েও স্পষ্ট ভাবে নিজের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে সে বলছে “নিশ্চয়ই আমিই হচ্ছি হাজরে আসওয়াদ বা কৃষ্ণ পাথর। যমিনের উপর আমাকে গ্রহণ যোগ্য করা হয়েছে আমার স্পর্শতায় সবার জন্য বরকত নিহিত।”[57]

কিন্তু এ সমস্ত ইশারা ইঙ্গিতে তার অনুসারীরা নিরস্ত না হয়ে মক্কায় হজ্জ করার জন্য আগ্রহ দেখায়; অথচ তাদের নবী তার উর্দু বই (دافع البلاء)[58] তে বলছে, “আমি তাকে অবতীর্ণ করেছি কাদিয়ানের নিকটে”।

অনুরূপভাবে আরও স্পষ্টভাবে অন্য স্থানে বলছে “আর আল্লাহ তার কাদিয়ানের ঘরকে নি:শঙ্ক ভয়হীন হারামে পরিণত করেছেন …. অথচ এর আশে পাশে মানুষের উপর ছিনতাই হচ্ছে।[59]

বন্ধুরা !

কাদিয়ানীর এ সব প্রহেলিকা বাদ দিয়ে একবার কুরআনের বাণীর দিকে তাকান দেখবেন সেখানে কোন প্রহেলিকা বা ধাঁধাঁর ব্যাবস্থা করা হয়নি, যা বলা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে মানুষের শান্তি ও মুক্তির জন্য বিবৃত করা হয়েছে। সূরা আল-বাকারাহ এর ১৯৬ নং আয়াতের দিকে তাকান, দেখবেন যেখানে বলা হয়েছে “তোমরা আল্লাহর জন্যই হজ্জ এবং উমরা পূর্ণ করে আদায় করো।”[60]

তাহলে কাদিয়ানীদের বিরোধিতার কারণ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে আমরা আরও দেখতে পাই গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী স্পষ্টাক্ষরেই বলছে “আমি এ সবগুলিতে স্বাতন্ত্র বোধ করছি। সুতরাং তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাজের স্থান বানাও।”[61]

এর উপর টীকা লিখতে গিয়ে সে লিখছে “আমাকে ইবরাহীম নামে নামকরণ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে আমাকে আদম থেকে খাতেমুর রাসূল মুহাম্মাদ পর্যন্ত সমস্ত নবীর নামে নামকরণ করা হয়েছে।”[62]

এসব কিছু বলার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই; আর তা’ হলো, এ কথা বলা যে, হাজরে আসওয়াদ এবং তাকে ইবরাহীম নামকরণ করার কারণে মাকামে ইবরাহীমে যে দুই রাকাত নামাজ পড়তে হতো তা পড়তে হবে সে যেখানে অবস্থান করছে সেখানে অর্থাৎ কাদিয়ানে।

তবে তারকথা (খাতেমুর রাসূল) দ্বারা সে বুঝাতে চাচ্ছে নবীদের মোহর বা আংটি; মুসলিমরা যা বিশ্বাস করে যে, (খাতেমুর রাসূল) অর্থ শেষ নবী এটা তার উদ্দেশ্য নয়।

কারণ সে নবুওয়াতের অভিনব নতুন ব্যাখ্যা সংযোজন করেছে, তার মতে নবুওয়াত দ্বারা “আল্লাহ কর্তৃক অধিক আলাপ সম্ভাষন”[63] করাকেই বুঝায়।

সুতরাং তার (খাতেমুর রাসূল) দ্বারা অর্থ নেয়, উৎকৃষ্ট নবী; যদিও আরবী ভাষায় এর অর্থ হলো শেষ নবী। কিন্তু তারা এ অর্থ করতে নারাজ; কারণ এতে করে তাদের প্রতিষ্ঠাতার নবুওয়াতের দাবী করাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলতে হয়।

সবশেষে আমার অনুরোধ আমরা যেন তাদের তৎপরতায় প্রতারিত না হই। আর এ জন্যই মুসলিম যুবকদেরকে তাদের প্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে এবং প্রচার প্রপাগান্ডা থেকে দুরে রাখার জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি।

সাথে সাথে অনুরোধ করব আমরা যেন আমাদের প্রতিটি সমাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের ব্যাপক প্রসার ঘটাই; কারণ যেখানেই সুন্নাতের ব্যাপক প্রসার হয়েছে সেখান থেকে এসব বাতিল মতবাদ তিরোহিত হয়েছে। পক্ষান্তরে যেখানেই মুসলিমরা সুন্নাতে রাসূল থেকে দুরে সরে এসেছে সেখানেই বাতিল দানা বেঁধে উঠেছে। কারণ কাদিয়ানী নিজেই তার নবুওয়াতের দাবীর উৎস হিসাবে ঐ অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কথা বলেছে, এ ব্যাপারে সে তার বইতে বলছে “তুমি মুসলিম যুবকদের দেখবে যে তারা ইসলামী আচার অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছে, সুন্নাত ত্যাগ করেছে, দাড়ী কামিয়েছে, মাটি পর্যন্ত কাপড় পরিধান করছে, মোচ লম্বা রাখছে, খৃষ্টানদের যাবতীয় রসম রেওয়াজ তাদের মন মগজ দখল করে আছে।”[64]

পরিশেষে সবাইকে এ, ফেৎনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য আবারো অনুরোধ জানিয়ে শেষ করছি।

ওমা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ

সমাপ্ত

ইসলাম হাউস

Advertisements

এতিম মিসকিন ও দুস্থ মানুষের অধিকার

এতিম মিসকিন ও দুস্থ মানুষের অধিকার

সত্য-সুন্দরের প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সব ক্ষেত্রে ইসলাম দিয়েছে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য শ্রেষ্ঠতম রীতিনীতি। মানুষে মানুষে বিবাদ নয়! ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে সাম্য-সম্প্রীতির সুদৃঢ় প্রাসাদ। ইসলামের বিধানে মুসলিমরা পরস্পর ভাই ভাই। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিনগণ একে অন্যের ভাই।’ (সূরা হুজরাত-১০)।

রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই ভাই (বুখারি)।

সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিজন। আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তার সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করে।

ইসলাম সব মানুষের সাথে সদাচারের শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে সমাজের এতিম, দুস্থ, অসহায় ও মজলুম মানুষকে সহায়তা দানের প্রতি ইসলাম অধিক গুরুত্ব আরোপ করে।

আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সমাজের বিত্তশালী সব মানুষকে এতিম, দুস্থ ও মজলুম মানুষের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য উদ্বুদ্ধ করে বিভিন্ন ভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।

এতিমের হক আদায় না করা ও মিসকিনদের খাবার না দেয়ার প্রতি ভর্ৎসনা করে আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তুমি কি এমন লোককে দেখেছ, যে দ্বীনকে অস্বীকার করে? সে তো ওই ব্যক্তি যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। আর সে মিসকিনদের খাবার দানে মানুষকে উৎসাহিত করে না। (সূরা মাউন ১-৩)।

আল কুরআনের অপর আয়াতে এতিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য উৎসাহিত করে ইরশাদ হচ্ছে, কখনো এরূপ নয়! বরং তোমরা এতিমদের সম্মান করো না। আর মিসকিনদের খাদ্যদানে উৎসাহিত করো না। (সূরা ফাজর ১৭-১৮)।

এখানে এতিমদের সম্মান না করার অর্থ হলো তাদের হক অধিকার তথা তাদের প্রয়োজনীয় খোঁজখবর ও দেখাশোনা না করা।

যারা দুনিয়ার জীবনে এতিম, মিসকিন ও বন্দীদের সাহায্য করে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের চিরসুখের জান্নাতে এর প্রতিদান দেয়ার ওয়াদা দিয়েছেন।

এতিম-মিসকিনদের সহায়তা করা মুমিনের পরিচয়, জান্নাতি মানুষের স্বভাব। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, তারা দুনিয়ার জীবনে খাদ্যদ্রব্যের প্রতি নিজেদের প্রয়োজনীয় আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও কয়েদিদের খাবার প্রদান করে। (সূরা দাহর-৮)।

ইসলাম অসহায় ও দুস্থ মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে, প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম শিক্ষা দেয় পরস্পরকে ভালোবাসতে। অন্তত কেউ যেন অন্যকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেয়, কারো ক্ষতিসাধন না করে, কারো প্রতি যেন জুলুম-অত্যাচার না করে, আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে! তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের শান্তির জন্য, কল্যাণের জন্য। (সূরা আল ইমরান-১১০)।

এতিম, অসহায় ও মজলুম মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করার ফজিলত সম্পর্কে আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব দুঃখ, কষ্ট দূর করবে আল্লাহ তার কিয়ামতের দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি এতিম, অসহায় ও সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন ও সঙ্কট নিরসন করবে আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় সঙ্কট নিরসন করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ মানুষের সাথে থাকেন যতক্ষণ মানুষ এতিম মিসকিন, অসহায় ও মজলুম মানুষের সাহায্যরত থাকে।

(বুখারি-মুসলিম)।

আর যারা এতিম মিসকিনদের সাহায্য করে না তাদের সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেন, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি ঈমানদার নয় যে তৃপ্তি সহকারে খায় অথচ তার গরিব মিসকিন প্রতিবেশী থাকে অভুক্ত অবস্থায় (মিশকাত)।

পৃথিবীতে ইসলামের আগমনই হলো মানব সমাজের কল্যাণের জন্য। মানবতার মুক্তির জন্য। সুন্দর, সুশৃঙ্খল, সাম্য-সম্প্রীতিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র ইসলামই দিয়েছে এর সুন্দরতম সুবিবেচিত বিধান।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় মানুষ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করলেই সবার মুক্তি ও সফলতা আসবে। ব্যক্তি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যদি ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করা যায় তাহলে সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা থাকবে না। ইসলামী বিধান অনুযায়ী যদি সম্পদশালীরা তাদের অর্জিত সম্পদের জাকাত দেন তাহলে দারিদ্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবে কোটি কোটি দারিদ্র্য নিপীড়িত মানুষ।

ধনীরা যদি তাদের জাকাত দেন এবং মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি যে মানবিক কর্তব্য থাকা প্রয়োজন তা যদি আমরা পালন করি তাহলে সমাজে দরিদ্র মানুষ থাকবে কিন্তু বিনা চিকিৎসায় কিংবা না খেয়ে মানুষ মরবে এমনটা সমাজে ঘটবে না।

আজ লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে রাস্তায় ঘুমায়। তাদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাদের পরিবারে হাজার হাজার সন্তান বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষাদীক্ষাসহ সামাজিক সব অধিকার থেকে। আজ বিশ্বে যদি ইসলামী বিচারব্যবস্থা চালু হয় তাহলে কেউ গ্রাস করতে পারবে না এতিমের সম্পদ। নির্মম নির্যাতন করতে পারত না অসহায় মজলুম মানুষের ওপর। কিন্তু আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে চলছে অন্যায়-অবিচার, মানুষের চোখে-মুখে হতাশা, হাহাকার কিন্তু এর কি কোনো সমাধান নেই? মুক্তি নেই! এটাই কি তাদের অবধারিত নিয়তি, অবশ্যই সে সমাধান পেতে হলে ফিরে আসতে হবে ইসলামের ছায়াতলে।

বস্তুত ইসলাম মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এবং জুলুম-অত্যাচার বন্ধের কার্যকর বিধান দিয়েছে, এর অনুকরণ আমাদের সবার ঈমানী কর্তব্য।

একমাত্র ইসলামী অনুশাসনই পারে সমাজের সব অন্যায়-অবিচার দূর করে গরিব, দুঃখী, এতিম, দুস্থ, মিসকিনদের মুখে হাসি ফোটাতে। বিশ্বকে উপহার দিতে পারে সাম্য-সম্প্রীতির এক মহামিলনের সৌহার্দøপূর্ণ সুখময় শান্তিময় সমাজ।

রমযান কর্মের মাস

রমযান কর্মের মাস

ইবাদত ও কর্ম ইসলামের দু’টি শাখা, যা কখনো পৃথক হয় না, বরং একে অপরের সাথে ওতপ্রোত জড়িত। মূলত যে ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম তার রবের সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করে, সে ইবাদত এক প্রকার কর্ম বা আমল। এ ইবাদত হচ্ছে মানুষ সৃষ্টির মূল ও চূড়ান্ত লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ ٥٧ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ ٥٨﴾ [الذاريات: 56-58]

“আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই ‎সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত ‎করবে।‎ আমি তাদের কাছে কোন রিয্ক চাই ‎না; আর আমি চাই না যে, তারা ‎আমাকে খাবার দিবে।‎ নিশ্চয় আল্লাহই রিয্কদাতা, তিনি ‎শক্তিধর, পরাক্রমশালী”। সূরা যারিয়াত: (৫৬-৫৮)‎

আবার কর্ম এক প্রকার ইবাদত, যা কারো নিকট অস্পষ্ট নয়। কারণ এ কর্মের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর জমিনে তার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, যা মানুষ সৃষ্টির বড় লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ ٱلۡأَرۡضِ وَٱسۡتَعۡمَرَكُمۡ فِيهَا فَٱسۡتَغۡفِرُوهُ ثُمَّ تُوبُوٓاْ إِلَيۡهِۚ إِنَّ رَبِّي قَرِيبٞ مُّجِيبٞ ٦١﴾ [سورة هود:61]

“তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে ‎এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের ‎ব্যবস্থা করেছেন ‎। সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ‎‎ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। ‎নিশ্চয় আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী”।‎ [সূরা হুদ: (৬১)]

কর্ম ও ইবাদত যেহেতু ইসলামের দু’টি শাখা, একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িত, তাই আল্লাহ তা‘আলা ইবাদত হিসেবে যেমন সালাতের নির্দেশ দিয়েছেন, অনুরূপ তিনি কর্মেরও নির্দেশ দিয়েছেন ইবাদত হিসেবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرٗا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ١٠﴾ [الجمعة :10]

“অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন ‎‎তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর ‎অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে ‎‎বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল ‎হতে পার”। [সূরা জুমু‘আ: (১০)]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কর্মের সাথে সওমের সংযোগ স্থাপন করেছেন, যে সওম নিরেট ইবাদত:

, فعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْمَقْبُرِىُّ , قَالَ : حَدَّثَنِى أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ : قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَمْ أَرَكَ تَصُومُ شَهْرًا مِنَ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ قَالَ ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِى وَأَنَا صَائِمٌ. أخرجه أحمد 5/201(22096) , و\”النَّسائي\” 4/201.

আবু সায়িদ মাকবুরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উসামা ইব্ন যায়েদ আমাকে বলেছেন: “আমি বলেছি হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন শাবানে এতো সওম পালন করেন, অথচ অন্যান্য মাসে আপনাকে এতো সওম পালন করতে দেখি না। তিনি বলেন রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মাস, অধিকাংশ মানুষ এর থেকে গাফেল ও ভ্রুক্ষেপহীন থাকে, এ মাসে আল্লাহর নিকট কর্ম ও আমল পেশ করা হয়, আমি চাই আমার কর্মগুলো সওম অবস্থায় তার নিকট পেশ করা হোক”। আহমদ: (৫/২০১), হাদিস নং: (২২০৯৬), নাসায়ি: (৪/২০১)

এ জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ সওমকে কখনো অলসতা বা কর্ম পরিত্যাগ করার অজুহাত বা কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ দেন নি, বরং সওম ও রমযানকে তিনি কষ্ট ও পরিশ্রমের মৌসুম বানিয়েছেন। জাবের ইব্‌ন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

خَرَجَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَى مَكَّةَ ، عَامَ الْفَتْحِ ، فِي رَمَضَانَ ، فَصَامَ حَتَّى بَلَغَ كُرَاعَ الْغَمِيمِ ، فَصَامَ النَّاسُ ، فَبَلَغَهُ أَنَّ النَّاسَ قَدْ شَقَّ عَلَيْهِمُ الصِّيَامُ ، فَدَعَا بِقَدَحٍ مِنَ الْمَاءِ بَعْدَ الْعَصْرِ فَشَرِبَ ، وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ ، فَأَفْطَرَ بَعْضُ النَّاسِ ، وَصَامَ بَعْضٌ ، فَبَلَغَهُ أَنَّ نَاسًا صَامُوا ، فَقَالَ : أُولَئِكَ الْعُصَاةُ. أخرجه \”مسلم\” 3/141(2579) و\”النَّسائي\” 4/177 ، وفي \”الكبرى\” 2583.

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে মক্কার অভিযানে বের হন, তিনি সওম অবস্থায় ‘কুরাল গামিম’ নামক স্থান পর্যন্ত পৌঁছান, সাহাবিরাও সওম রেখে ছিল, তার নিকট সংবাদ পৌঁছলে যে, সাহাবিদের পক্ষে সওম খুব কষ্টকর হয়ে গেছে, তিনি আসরের পর পানির একটি পাত্র তলব করে পানি পান করেন, লোকেরা তাকে দেখতে ছিল। অতঃপর কেউ সওম ভঙ্গ করল, কেউ ভঙ্গ করল না। তার নিকট খবর পৌঁছল যে, কতক লোক সওম ভঙ্গ করেনি, তিনি বললেন: তারা হচ্ছে গুনাহগার”। মুসলিম: (৩/১৪১), হাদিস নং: (২৫৭৯), নাসায়ি: (৪/১৭৭), নাসায়ি ফিল কুবরা: (২৫৮৩)

মুসলিমরাই মূলত রমযানকে ছুটি, অবসর ও অলসতার মাসে পরিণত করেছে, এ মাসের রাতে তারা জাগ্রত থাকে, দিনে ঘুমায়। যদি তারা প্রকৃত পক্ষে সওম পালন করত, আর সওমের মূল ও মহান উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে চেষ্টা করত, তাহলে এ মাসের মধ্যে মুসলিম জাতির ভাগ্যে এমন বহু সফলতা ধরা দিত, যা তাদের অবশিষ্ট বছরের জন্য যথেষ্ট হত।

মুসলিমদের দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এ মাস হচ্ছে কর্ম, পরিশ্রম ও উৎপাদন করার মাস। এ মাস বিজয়ের মাস, এ মাসে অর্জিত হয়েছে মহান ও ঐতিহাসিক একাধিক বিজয়। মুসলিমদের অন্তরে যখন বয়ে যাবে ঈমানের বাতাস, হিল্লোলিত হবে তাদের হৃদয়ে তাকওয়ার স্পন্দন, “আল্লাহু আকবার ধ্বনি”তে তারা প্রকম্পিত করে তুলবে আকাশ-বাতাস, তখনই তাদের নিকট সাহায্য অবতরণ করবে আল্লাহর তরফ থেকে, যদিও তাদের সংখ্যা হয় কম, সামর্থ্য হয় অপ্রতুল। নিম্নে রমযান মাসে সংগঠিত কয়েকটি যুদ্ধ ও তার ফলাফল উল্লেখ করা হল:

বদর যুদ্ধ: (২য়-হি.)

দ্বিতীয় হিজরির রমযান মাসে সংগঠিত হয় বদর যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুসলিমরা বিরাট সফলতা অর্জন করে, যা ছিল ইসলামী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। সন্দেহ নেই এ যুদ্ধ ছিল ইসলামের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। এ যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ সত্য ও মিথ্যা পৃথক করেন। এর ফলে আল্লাহর দ্বীন হয়েছে সম্মানিত আর বাতিল হয়েছে ভূলুণ্ঠিত। এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ, এটা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের প্রথম যুদ্ধ। এ যুদ্ধে যদি আল্লাহ তার দ্বীন, নবী ও বাহিনীকে বিজয়ী না করতেন, তাহলে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যেত, সে কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হত না, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ তার রবকে সম্বোধন করে বলেন:

” اللهم إن تهلك هذه العصابة، فلن تعبد في الأرض ” .

“হে আল্লাহ, তুমি যদি এ বাহিনীকে ধ্বংস কর, তাহলে জমিনে কখনো তোমার ইবাদত করা হবে না”। তাফসির ইব্ন কাসির, সূরা আনফাল: আয়াত: (১৭)

মক্কা বিজয়: (৮ম-হি.)

অষ্টম হিজরির রমযান মাসে কুরআনে ঘোষিত ‘ফাতহে মুবিন’ তথা মক্কার স্পষ্ট বিজয় লাভ করে মুসলিম জাতি। এ বছর তারা মক্কার পবিত্র ভূমিকে মূর্তি, মুশরিক ও নাপাক থেকে মুক্ত করেন, ফলে আল্লাহর পবিত্র জায়গায় আল্লাহর দ্বীন বুলন্দ হয়। মদিনাতে দীর্ঘ আট বছর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও দ্বীন প্রচারে নিরত থেকে এ বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় ফিরে আসেন।

বুওয়াইব যুদ্ধ: (১৩-হি.)

১৩-হি. রমযান মাসে আমীরুল মুমিনিন ওমর ইব্নুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুর জমানায় পারস্যের ফুরাত নদীর উপকূলে “البويب” বুওয়াইব যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলিফা আবু বকরের নির্দেশ। মুসলিমদের সেনাপতি ছিল মুসান্না ইব্‌ন হারেসা, মুসলিমগণ পারস্যের উপর জয়ী হয়ে সেখানে ইসলামের ঝাণ্ডা উড্ডিন করেন।

স্পেন বিজয়: (৯২-হি.)

৯২হি. রমযান মাসে তারেক ইব্ন যিয়াদের হাতে স্পেন বিজিত হয়। ‘রডারিক’ এর নেতৃত্বাধীন স্পেন বাহিনী তার নিকট আত্মসমর্পণ করে।

আম্মুরিয়া বিজয়: (২২৩-হি.)

২২৩-হি. রমযান মাসে আম্মুরিয়া বিজিত হয়। আম্মুরিয়া ছিল সে যুগের রোমীদের মজবুত ও শক্তিশালী ঘাঁটি। আব্বাসি খলিফা মুতাসেম বিল্লার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এ যুদ্ধের কারণ ছিল রোমীরা বার বার মুসলিমদের উপর আক্রমণ করে তাদের অনেককে বন্দি করে নিয়ে যায়। সেখানে এক নারী মুতাসিমবিল্লার নিকট وامعتصماه” ” বলে সাহায্যের আবেদন জানায়। এ আওয়াজ মুতাসিম বিল্লা পর্যন্ত পৌঁছালে সে এক বিরাট বাহিনী তৈরি করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। আল্লাহর মেহের বাণীতে এ যুদ্ধে রোমীরা পরাজিত হয় এবং মুসলিমরা আম্মুরিয়া লাভ করে।

আইন-জালুত যুদ্ধ: (৬৫৮-হি.)

আমাদের প্রিয় ভূমি ফিলিস্তিনে ৬৫৮-হি. রমযান মাসে আইন-জালুত যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সেনাপতি মুযাফফর কুতয এর নেতৃত্বে মুসলিম ও তাতারীদের মাঝে সংগঠিত হয় এ যুদ্ধ। কারণ তাতারীরা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় প্রচুর ফেতনা, ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে তাদের অন্তরে ভয় ও ভীতির সঞ্চার করেছিল, তাই সেনাপতি মুযাফফার কুতয অভিযান পরিচালনা করে মোগল সৈন্যদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

এন্টাকিয়া বিজয়: (৬৬৬-হি.)

৬৬৬-হি. রমযান মাসে এন্টাকিয়া রাজ্য বিজিত হয়, যা ছিল শাম দেশের ক্রুসেডদের রাজধানী। এ মহান বিজয়ে মুসলিমদের সেনাপতি ছিল সুলতান জাহের বিবারস, তার হাতে ক্রসেডদের পরাজয় হয়।

শাকহাব যুদ্ধ: (৭০২-হি.)

৭০২-হি. রমযান মাসে শাকহাব যুদ্ধ সংগঠিত হয়। শায়খুল ইসলাম ইব্‌ন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় মুসলিমরা এ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। সিরিয়ার বিখ্যাত শহর দামেস্কের নিকট মুসলিম ও তাতারীদের মাঝে এ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এ যুদ্ধের কারণ ছিল তাতারীরা দ্বিতীয়বার মুসলিম শহরসমূহে হামলা চালায়। তখন শাইখুল ইসলাম ইব্ন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ কসম দিয়ে আল্লাহর নিকট যুদ্ধ জয়ের সাহায্য প্রার্থনা করে ছিলেন। অতঃপর তিনি মুসলিমদের সওম ভঙ্গের নির্দেশ দেন, যেন শত্রুদের বিপক্ষে তারা দুর্বল না হয়ে পড়ে। অধিক ইবাদতকারী, মর্দে-মুজাহিদ ইব্ন তাইমিয়ার কসম আল্লাহ রক্ষা করেছেন। সত্যের বাহিনী মুসলিম বীরগণ এ যুদ্ধে তাতারীদের পরাজিত করে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।

দশই রমযান: (১৩৯৩-হি.)

১৩৯৩-হি. মোতাবেক ৬-অক্টোবর ১৯৭৩-ই. মিসর ও আরবের মুসলিমরা সিনাই ভূ-খণ্ডে ইহুদিদের মোকাবিলা করে, যাদের অভ্যাস ছিল নবী ও নেককার লোকদের হত্যা করা। এ যুদ্ধে মিসরিরা ইহুদিদের পরাজিত করে তাদের থেকে সিনাই উপত্যকা উদ্ধার করে, ইতিপূর্বে কয়েক বছর যাবত যা ক্রসেডদের দখলে ছিল।

আমাদের পূর্বপুরুষ, প্রথম যুগের মুসলিমগণ জানতেন, রমযান হচ্ছে কর্ম, জিহাদ ও আমলের মাস, ঘুম-কর্মহীনতা কিংবা অলসতার মাস নয় রমযান। তারা জানতেন আল্লাহর জমিনে তার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইবাদত, তাহাজ্জুদ ও জিহাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারক রহ. যখন তার বিখ্যাত কবিতা ফুজায়েল ইব্ন আয়াজের নিকট প্রেরণ করেন, ফুজায়েল রহ. আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারকের কবিতা পাঠ করে ক্রন্দন করতে থাকেন, অতঃপর বলেন: আবু আব্দুর রহমান সত্য কথাই বলেছেন, তিনি আমাকে সঠিক উপদেশ দিয়েছেন। ফুজায়েল হারাম শরিফ খেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হতেন না, কারণ সেখানে এক সালাত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাতের সমান। আর আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারক থাকতেন জিহাদের ময়দানে। দেখুন: সিয়ারে আলামিন নুবালা: (৮/৪১২)

নিচে আব্দুল্লাহ ইব্ন মুবারকের কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হল:

يا عابد الحرمين لو أبصرتنا … لعلمت أنك بالعبادة تلعبُ
من كان يخضِبُ جيدَهُ بدموعه * * * فنحورنا بدمائنا تتخضَّبُ
أوْ كان يُتعِبُ خيلَهُ في باطلٍ * * * فخيولنا يومَ الصبيحةِ تتعبُ
ريحُ العبير لكم ونحنُ عبيرُنا* * * رهَجُ السنابكِ والغُبارُ الأطيبُ
ولقد أتانا من مقالِ نبينا * * * قولٌ صحيحٌ صادقٌ لا يكذبُ
لا يستوي وغُبار خيل الله في* * * أنف امرئٍ ودُخانُ نارٍ تلهَبُ
هذا كتابُ الله ينطق بيننا * * * ليس الشهيدُ بميتٍ لا يُكذَبُ

অতএব রমযান মাস আমরা অলসতা, কর্মহীনতা বা বেকারত্বসহ অতিবাহিত করব না। এতে আমরা আমাদের প্রতিটি কাজ-কর্ম ও আমল দৃঢ় ও সুন্দরভাসে সম্পন্ন করব, কারণ কোন কাজ সুন্দর করা তাকওয়ার দলিল, আর তাকওয়ার অনুশীলন হচ্ছে সওমের প্রধান উদ্দেশ্য ও অন্যতম লক্ষ্য।

উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

ভ্রান্ত ধারণা ১ : ঘাড়ে ব্যথা মানেই উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ।
সঠিক তথ্য : ঘাড়ের ব্যথা থাকলেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এমন ধারণা ঠিক নয়। ঘাড়ে ব্যথা হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। খুব কম ক্ষেত্রেই উচ্চ রক্তচাপে ঘাড়ে ব্যথা হয়ে থাকে।
ভ্রান্ত ধারণা ২ : একবার উচ্চ রক্তচাপ মানেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়া।
সঠিক তথ্য : একবার উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া মানেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এটা ঠিক নয়। সুস্থ ও স্বাভাবিক রক্ত চাপের কারও কারও হঠাত্ কখনও উচ্চ রক্তচাপ পাওয়া যেতে পারে। সুস্থ অবস্থায় পরপর তিন দিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ধরে নেয়া হয়।
ভ্রান্ত ধারণা ৩ : কাঁচা লবণ খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয় তবে লবণ ভেজে খেলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
সঠিক তথ্য : এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। কাঁচা লবণ এবং ভাজা লবণের মধ্যে গুণগত কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই উচ্চ রক্তচাপে সমান ক্ষতিকর।
ভ্রান্ত ধারণা ৪ : উচ্চ রক্তচাপ শুধু সমাজের উচ্চবিত্তদেরই হয়ে থাকে।
সঠিক তথ্য : এই ধারণাটি মোটেও ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত সবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সমান।
ভ্রান্ত ধারণা ৫ : উচ্চ রক্তচাপ বেশি বয়সের অসুখ অর্থাত্ বয়স্করাই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন।
সঠিক তথ্য : যে কোনো বয়সের নরনারীই জীবনের যে কোনো সময়ে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে বিভিন্ন কারণে ৪০ ঊর্ধ্ব বয়সের নর-নারীর উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ভ্রান্ত ধারণা ৬ : যাদের গায়ের রং ফর্সা (সাদা চামড়া) শুধু তারাই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন।
সঠিক তথ্য : একথা মোটেই ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে গায়ের রঙ, বয়স, লিঙ্গভেদ, ধর্ম, গোত্র, জাতীয়তা ইত্যাদির কোনোই সম্পর্ক নেই।
ভ্রান্ত ধারণা ৭ : খুব বেশি স্বাস্থ্যবান কিংবা অতিশয় মোটা মানুষেরাই উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন।
সঠিক তথ্য : শুধু মোটা বা স্বাস্থ্যবান মানুষেরাই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন এমনটি ভাবার কোনোই কারণ নেই। যে কোনো স্বাস্থের মানুষই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে স্বাস্থ্যবান বা মোটা মানুষের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ভ্রান্ত ধারষা ৮ : বেশি বেশি খাবার খেলেই বিশেষ করে চর্বিজাতীয় খাবার বেশি বেশি খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয়।
সঠিক তথ্য : এ ধারণাটি সব সময় ঠিক নয়। বেশি বেশি খাবার খাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তবে চর্বিজাতীয় খাবার বেশি বেশি খাওয়া হলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভ্রান্ত ধারণা ৯ : যদি কেউ ৫৫ কিংবা ৬০ বছর বয়সেও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত না হন তবে তার বাকি জীবনে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার কোনোই আশঙ্কা নেই।
সঠিক তথ্য : এ ধারণাটিও ঠিক নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যে কোনো বয়সের নর-নারী জীবনের যে কোনো সময়ে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। কাজেই ৫০ কিংবা ৬০ বছর পেরোলেই ভাববেন না আপনি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিমুক্ত। বরং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকুন।
ভ্রান্ত ধারণা ১০ : উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যাক্তির রক্তে চর্বির (কোলেস্টেরল) মাত্রা সব সময় বেশি থাকে।
সঠিক তথ্য : এটা একেবারেই ভিত্তিহীন ধারণা। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত কারও কারও রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। তবে এটা সবসময় সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
ভ্রান্ত ধারণা ১১ : কেবল ডায়াস্টোলিক (নিচের) রক্তচাপ বাড়লেই ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হয়, সিস্টোলিক (উপরের) রক্তচাপ বেশি হলেও কোনো ক্ষতি নেই।
সঠিক তথ্য : এটা একেবারেই ঠিক নয়। চিকিত্সা বিজ্ঞানে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক দুটো রক্তচাপেরই সমান গুরুত্ব রয়েছে। তবে সাম্প্র্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের বেলায় উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কদের উচ্চ ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রান্ত ধারণা ১২ : দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কোনো সম্পর্ক নেই। সুষম খাদ্য তালিকা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। চিকিত্সকরা অযথাই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
সঠিক তথ্য : মনে রাখবেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সুষম খাদ্য তালিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুষম খাদ্যাভ্যাস শুধু উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করে না, বরং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। মোটকথা, একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য তালিকা ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।
ভ্রান্ত ধারণা ১৩ : ওষুধের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে আর চিকিত্সকের কাছে পরামর্শের জন্য যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
সঠিক তথ্য : ওষুধের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উচ্চ রক্তচাপের জটিলতাগুলো শুরুতেই শনাক্ত করতে এবং এর যথাযথ ব্যাবস্থা নিতে অবশ্যই নিয়মিত তিন মাস পরপর চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হয়।

রমযান বিষয়ে জাল ও দুর্বল হাদিসসমূহ

রমযান বিষয়ে জাল ও দুর্বল হাদিসসমূহ

এক.

রমযান কাছে এলে আমরা অনেকে নিম্নের দোয়াটি পড়ি, তবে এমন লোক খুব কম আছি যারা এর শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা সম্পর্কে অবগত:

“اللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان”

“হে আল্লাহ, আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের জন্য বরকত রাখুন এবং আমাদেরকে রমযান পর্যন্ত পৌঁছার তাওফিক দিন”।

হাদিসের সনদ:

ইমাম আহমদ তার “মুসনাদ” গ্রন্থে বলেন: আমাদেরকে বলেছে আব্দুল্লাহ, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে উবাইদুল্লাহ ইব্‌ন ওমর, যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ থেকে, তিনি যিয়াদ আন-নুমাইরি থেকে, তিনি সাহাবি আনাস ইব্‌ন মালেক থেকে, তিনি বলেন: রজব আগমন করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:… …

ইব্নুস সুন্নি ফিল “আমালিল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ”: (৬৫৯), তিনি এ হাদিস ইব্‌ন মুনি সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে উবাইদুল্লাহ ইব্‌ন ওমর আল-কাওয়ারিরি।

বায়হাকি ফি “শুআবিল ঈমান”: (৩/৩৭৫), তিনি বর্ণনা করেন আবু আব্দুল্লাহ আল-হাফেয সূত্রে, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে আবু বকর মুহাম্দ ইব্‌ন মুয়াম্মাল, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে মুহাম্মদ ইব্‌ন শারানি, আল-কাওয়ারিনি থেকে।

আবু নু‘আইম ফিল “হিলইয়াহ”: (৬/২৬৯), তিনি এ হাদিস বর্ণনা করেন হাবিব ইব্‌ন হাসান ও আলি ইব্‌ন হারুন সূত্রে, তারা উভয়ে বলেছেন আমাদেরকে বলেছে ইউসূফ আল-কাদি, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু বকর, তিনি বলেন আমাদেরকে বলেছে যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ।

এ হাদিস বাযযার তার “মুসনাদ” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন আহমদ ইব্‌ন মালেক আল-কুশাইরি থেকে, সে যায়েদা থেকে।

এ হাদিসের সনদে দু’টি দোষ বা সমস্যা রয়েছে, হাদিস বিশারদগণের নিকট যার পরিভাষিক নাম হচ্ছে ইল্লত, অর্থাৎ হাদিসে দু’টি ইল্লত রয়েছে:

প্রথম ইল্লতঃ এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হচ্ছেন যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ, তার সম্পর্কে হাদিস বিশারদগণের মূল্যায়ন দেখুন:

আবু হাতেম বলেছেন: যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ যিয়াদ ইব্‌ন নুমাইরি থেকে মারফূ সনদে মুনকার হাদিস বর্ণনা করে, জানি না এ সমস্যা তার থেকে না তার উস্তাদ যিয়াদ থেকে। সে যিয়াদ ব্যতীত অন্য কারো থেকে হাদিস বর্ণনা করেছে কিনা তাও জানি না, যার সূত্র ধরে তার হাদিস যাচাই করব।

বুখারি বলেছেন: তার হাদিস মুনকার।

আবু দাউদ বলেছেন: তার হাদিস সম্পর্কে কিছু জানি না।

নাসায়ি বলেছেন: তাকে চিনি না।

যাহাবি “দেওয়ানে দুয়াফাতে” বলেছেন: সে কোন দলিল নয়।

ইব্‌ন হাজার বলেছেন: তার হাদিস মুনকার।

“মুনকার” হাদিস:

হাদিস বিশারদদের একটি পরিভাষা হচ্ছে “মুনকার”, এর অর্থ সম্পর্কে ইমাম আহমদ বলেন:

 ((الحديث عن الضعفاء قد يُحْتاج إليه في وقتٍ، والمنكر أبدًا منكر))

“দুর্বল বর্ণনকারীদের হাদিস কখনো প্রয়োজন হয়, কিন্তু মুনকার সর্বদা মুনকার”। দেখুন: “ইলালুল মারওয়াযী”: হাদিস নং: (২৮৭), “মাসায়েল ইব্‌ন হানি”: (১৯২৫-১৯২৬), ইব্‌ন রজব “শারহুল ইলাল”: (১/৩৮৫) গ্রন্থে ইব্‌ন হানি থেকে তা বর্ণনা করেছেন।

ইমাম আহমদের কথার অর্থ হচ্ছে: মুনকার সর্বদা পরিত্যক্ত, এর বিপরীতে দুর্বল হাদিসের প্রয়োজন হলেও মুনকার কখনো গ্রহণ করা যাবে না।

দ্বিতীয় ইল্লতঃ এ হাদিসের অপর বর্ণনাকারী যিয়াদ ইব্‌ন আব্দুল্লাহ নুমাইরি আল-বিসরি, (যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদের উস্তাদ): তার সম্পর্কে হাদিস বিশারদদের বক্তব্য শুনুন:

ইয়াহ ইয়া ইব্‌ন মায়িন বলেছেন: তার হাদিস দুর্বল।

আবু হাতেম বলেছেন: তার হাদিস লেখা যাবে, কিন্তু দলিল হিসেবে পেশ করা যাবে না।

আবু উবাইদ আজুররি বলেছেন: আমি আবু দাউদকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি তাকে দুর্বল বলেছেন।

ইব্‌ন হিব্বান ‘মাজরুহ’ বা দোষী ব্যক্তিদের আলোচনায় বলেন: তার হাদিস মুনকার। আনাস থেকে সে এমন কিছু বর্ণনা করে, যা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সাথে মিলে না, তার হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা বৈধ নয়।

দারা কুতনি বলেছেন: সে দলিল নয়।

ইব্‌ন হাজার বলেছেন: সে দুর্বল।

হাদিস সম্পর্কে আলেমদের মতামত:

বায়হাকি তার “শুআবুল ঈমান”: (৩/৩৭৫) গ্রন্থে বলেন: এ হাদিস শুধু যিয়াদ ইব্‌ন নুমাইরি এবং তার থেকে শুধু যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ বর্ণনা করেছেন।

বুখারি বলেছেন: যিয়াদ ইব্‌ন নুমাইরি থেকে যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ বর্ণিত হাদিস মুনকার।

ইমাম নববী তার “আযকার”: (পৃ.২৫৪) গ্রন্থে বলেন: “হিলইয়াতুল আউলিয়া” গ্রন্থে এ হাদিস আমরা দুর্বল সনদে বর্ণনা করেছি।

ইমাম যাহাবি “মিযানুল ইতিদাল”: (৩/৯৬) গ্রন্থে যায়েদার জীবনী আলোচনায় এ হাদিস উল্লেখ করে বলেন: এ হাদিসও দুর্বল।

হায়সামি তার “মাজমাউয যাওয়ায়িদ”: (২/১৬৫) গ্রন্থে বলেন: “বাযযার এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, এর সনদে যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ আছে, ইমাম বুখারি তাকে মুনকারুল হাদিস বলেছেন, আলেমদের একটি জামাত তাকে অপরিচিত বলেছেন”।

তিনি আরো বলেন: “বাযযার ও তাবরানি আওসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, এর সনদে যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ আছে, যার ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে, কেউ তাকে নির্ভরযোগ্যও বলেছেন”। “মাজমাউয যাওয়ায়িদ”: (৩/১৪০)

ইব্‌ন আলান ফি “ফুতুহাতির রাব্বানিয়াহ”: (৪/৩৩৫) গ্রন্থে ইব্‌ন হাজার থেকে নকল করে বলেন: ইব্‌ন হাজার বলেছেন এ হাদিস গরিব, ইমাম বাযযার ও আবু নুআইম তা বর্ণনা করেছেন।

আহমদ আল-বান্না “বুলুগুল আমানি”: (৯/২৩১) গ্রন্থে বলেন:  অধ্যায়ের এ হাদিসে যিয়াদ নুমাইরি রয়েছে, সে দুর্বল।

ইমাম সুয়ূতি এ হাদিস তার “জামে সগির” গ্রন্থে বায়হাকি ফি “শুআবিল ইমান” ও ইব্‌ন আসাকের সূত্রে উল্লেখ করে তার দুর্বলতার দিকে ঈঙ্গিত করেছেন, এর অন্যান্য সনদও রয়েছে, যার একটি অপরটি দ্বারা শক্তিশালী হয়”। কিন্তু তিনি সেসব সনদ উল্লেখ করেন নি!? বস্তুত এ হাদিসের সনদ একটি।

আহমদ শাকের “মুসনাদের তাখরিজ”: (৪/১০০-১০১) গ্রন্থে হাদিস নং: (২৩৪৬) এ বলেন: এর সনদ দুর্বল।

শায়খ শুআইব আরনাউত মুসনাদে আহমদের “তাখরিজ”: (৪/১৮০), গ্রন্থে হাদিস নং: (২৩৪৬) এ বলেন: এর সনদ দুর্বল।

আলবানি “মিশকাতের তাখরিজ”: (১/৪৩২), গ্রন্থে হাদিস নং: (১৩৬৯) এ বলেন: “জামেউস সাগির” গ্রন্থে আল্লামা সুয়ূতি বলেন বায়হাকি তার “শুআবুল ইমান” গ্রন্থে এ হাদিস উল্লেখ করেছেন। মুনাভি তার পশ্চাতে বলেন: লেখকের অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় বায়হাকি হাদিস বর্ণনা করে তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা এমন নয়, বরং বায়হাকি তার পিছু নিয়েছেন, যেমন তিনি বলেছেন: … অতঃপর বায়হাকির উল্লেখিত কথা নকল করেন। (অর্থাৎ বায়হাকি বলেন: ইমাম বুখারি বলেছেন: যিয়াদ ইব্‌ন নুমাইরি থেকে যায়েদা ইব্‌ন আবির রাকাদ বর্ণিত হাদিস মুনকার।)

ড. আমের হাসান সাবরি বলেন: এর সনদ দুর্বল। দেখুন: “জাওয়ায়েদ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আহমদ ইব্‌ন হাম্বল ফিল মুসনাদ”: (পৃ.১৯৮)

দুই.

(( شهر رمضان أوله رحمه و أوسطه مغفرة و آخره عتق من النار ))

“রমযান মাসের প্রথম অংশ রহমত, মধ্যম অংশ মাগফেরাত ও শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তির”। এ হাদিস মুনকার।

দেখুন: “কিতাবুদ দুয়াফা” লিল উকাইলি: (২/১৬২), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্‌ন আদি: (১/১৬৫), “কিতাবু ইলালিল হাদিস” লি ইব্‌ন আবি হাতেম: (১/২৪৯), “সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ” লিল আলবানি: (২/২৬২) ও (৪/৭০)

তিন.

مَنْ أَفْطَرَ يَوْمًا مِنْ رَمَضَانَ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ وَلَا مَرَضٍ لَمْ يَقْضِهِ صِيَامُ الدَّهْرِ وَإِنْ صَامَهُ . حديث ضعيف .

“যে ব্যক্তি কোন কারণ ছাড়া রমযানের একদিন সওম ভঙ্গ করল অথবা অসুস্থতা ব্যতীত, পুরো বছরেও তার কাযা হবে না, যদিও সে পুরো বছর সওম পালন করে”। হাদিসটি দুর্বল।

ইমাম বুখারি তার সহিহ গ্রন্থে হাদিসটি টিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রমযান অধ্যায়: (৪/১৯৪), হাদিসটি তিনি দুর্বল ক্রিয়া দ্বারা উল্লেখ করে বলেন: এ হাদিস আবু হুরায়রা থেকে মারফূ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ইমাম আবু দাউদ: (২৩৯৬), তিরমিযি: (৭২৩), ইব্‌ন মাজাহ: (১৬৭২), ইব্‌ন খুযাইমাহ: (৩/২৩৮), হাদিস নং: (১৯৮৮), আহমদ: (২/৩৭৬) প্রমুখগণ সাওরি ও শুবা থেকে, তারা উভয়ে হাবিব ইব্‌ন আবি সাবেত থেকে, সে উমারা ইব্‌ন উমাইর থেকে, সে আবুল মিতওয়াস থেকে, সে তার পিতা থেকে, সে আবু হুরায়রা থেকে মুত্তাসিল সনদে উল্লেখ করেছেন।

তিরমিযি বলেন: এ সনদ ব্যতীত অন্য কোনভাবে আবু হুরায়রার হাদিস জানতে পারেনি, আমি মুহাম্মদ (অর্থাৎ বুখারী) কে বলতে শুনেছি: আবুল মিতওয়াসের নাম ইয়াজিদ ইব্‌ন মিতওয়াস, এ হাদিস ব্যতীত তার সনদে বর্ণিত অন্য কোন হাদিস সম্পর্কে জানি না।

ইব্‌ন খুযাইমাহ তার সহিহ: (৩/২৩৮), গ্রন্থে হাদিস নং: (১৯৮৮)-তে বলেন: যদি হাদিসটি সহিহ হয়, তবুও আমি ইব্‌ন মিতওয়াস ও তার পিতার পরিচয় জানি না।

ইব্‌ন আব্দুল বার “তামহিদ”: (৭/১৭৩) গ্রন্থে বলেন: এ হাদিস দুর্বল, এ ধরণের হাদিস দ্বারা দলিল দেয়া যায় না।

আবুল মিতওয়াস সম্পর্কে তিনটি বক্তব্য পাওয়া যায়: আবুল মিতওয়াস, ইব্নুল মিতওয়াস ও মিতওয়াস, সে একা এ হাদিস বর্ণনা করেছে। ইব্‌ন হিব্বান বলেছেন: তার একার বর্ণনাকৃত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা জায়েজ হবে না।

হাফেজ ইব্‌ন হাজার “তাগলিক”: (৩/১৭১) ও “ফাতহুল বারি”: (৪/১৯১) গ্রন্থে বলেন: বুখারি তার “তারিখে” বলেছেন: আবুল মিতওয়াস একা এ হাদিস বর্ণনা করেছে, তার পিতা আবু হুরায়রা থেকে শুনেছে কি-না বলতে পারি না।

আমার বক্তব্য, (অর্থাৎ ইব্‌ন হাজার): এ হাদিসের আরেক বর্ণনাকারী হাবিব ইব্‌ন আবি সাবেত (সাওরি ও শুবার উস্তাদ) সম্পর্কেও বিতর্ক রয়েছে, অতএব এ হাদিসে তিনটি দোষ বিদ্যমান: ইজতেরাব, আবুল মিতওয়াস সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং তার পিতার আবু হুরায়রা থেকে শ্রবণ করার ব্যাপারে সন্দেহ। ইমাম বুখারির নিকট হাদিস শুদ্ধ হওয়ার জন্য তৃতীয় শর্তটি জরুরী।

আলবানি “তামামুল মিন্নাহ”: (পৃ.৩৯৬) গ্রন্থে বলেন: এ হাদিস দুর্বল, এ দুর্বলতার দিকে ঈঙ্গিত করে ইমাম বুখারি ويذكر বলেছেন। ইব্‌ন খুযাইমাহ তার সহিহ গ্রন্থে এ হাদিস দুর্বল বলেছেন। ইমাম মুনাভির বর্ণনা মতে মুনযিরি, বগভি, কুরতুবি, যাহাবি ও দিমাইরি প্রমুখগণ হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

আলবানি তার “দায়িফাহ”: (২/২৮৩) গ্রন্থে বলেন: আবুল মিতওয়াস অপরিচিত বলে বুখারি প্রমুখগণ হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

হাদিস বিশারদদের উক্ত মতামত থেকে প্রমাণিত হয় যে, হাদিসটি দুর্বল, বরং অনেক আলেম বলেছেন: রমযানের দিনে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ইফতার করবে, সে তার বদলে একদিন কাযা করবে। এ হাদিসের ভিত্তিতে কেউ বলেননি রমযানের এক সওমের পরিবর্তে পুরো বছর সওম পালন করলেও আদায় হবে না, একমাত্র ইব্‌ন মাসউদ ব্যতীত, যেমন বুখারি বলেছেন আবু হুরায়রা বাদে শুধু ইব্‌ন মাসউদ এ কথা বলেছেন।

ইমাম বুখারি তাদেরও উল্লেখ করেছেন, যারা বলে যে রমযানের এক সওমের পরিবর্তে এক দিন সওম পালন করবে। তিনি বলেন: সায়িদ ইব্নুল মুসাইয়িব, শা’বি, ইব্‌ন জুবাইর, ইবরাহিম, কাতাদাহ ও হাম্মাদ বলেছেন: তার পরিবর্তে এক দিন কাযা করবে।

ইমাম বুখারি যাদের কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের বিস্তারিত সনদ যারা বর্ণনা করেছে, হাফেজ ইব্‌ন হাজার তাদের সব সনদ উল্লেখ করেছেন। তাদের প্রত্যেকের প্রায় অভিন্ন অভিমত যে, ইস্তেগফারসহ একদিনের পরিবর্তে এক দিন সওম কাযা করবে। বরং ইমাম বগভি “শারহুস সুন্নাহ”: (৬/২৯০) গ্রন্থে বলেন: আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, তার স্থানে এক দিন কাযা করবে।

আজিম আবাদি “আউনুল মাবুদ”: (৭/২৯) গ্রন্থে বলেন: অধিকাংশ আলেমদের অভিমত হচ্ছে যে, রমযানের এক সওমের পরিবর্তে এক সওম যথেষ্ট, যদিও তার সওম ভঙ্গের দিনগুলো বড় ও কঠিন গরমের হয়, আর কাযা করার দিনগুলো হয় ছোট ও ঠাণ্ডা মৌসুমের।

মাসআলা: যদি কোন সওম পালনকারী রমযানের দিনে শরয়ী কোন কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস ব্যতীত সওম ভঙ্গ করে, যেমন পানাহার, অথবা ধুমপান, অথবা যৌনাঙ্গ ব্যতীত স্ত্রীর সাথে মেলা-মেশার কারণে বীর্য বের হল, অথবা স্ত্রীকে উপভোগ করার সময় বীর্য বের হল ইত্যাদি। তার উপর কাযা ওয়াজিব। ইমাম আহমদ ও ইমাম শাফীর এক ফতোয়া অনুযায়ী তাকে এক সওমের পরিবর্তে একটি সওম কাযা করতে হবে। কারণ ওযর থাকা সত্বেও আল্লাহ তা‘আলা অসুস্থ ও মুসাফির ব্যক্তির উপর কাযা ওয়াজিব করেছেন, তাই ওযরহীন এর উপর অবশ্যই কাযা ওয়াজিব হবে। অবশিষ্ট দিন তাকে পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে, যেহেতু সে কারণ ছাড়া সওম ভঙ্গ করেছে। তার উপর কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও ইমাম শাফীর এক ফতোয়া মোতাবেক তার উপর কাযাসহ কাফ্ফারা ওয়াযিব হবে। তবে কেউ যদি দিনের শুরু থেকে সওম না রাখে তার উপর কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না। সওমের কাফ্ফারা সূরা মুজাদালায় বর্ণিত জিহারের কাফ্ফারার অনুরূপ। অর্থাৎ একটি গোলাম আযাদ করা, অথবা লাগাতার ষাটটি সওম পালন করা, অথবা ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করা। (দেখুন: সূরা মুজাদালা:৩-৪)

চার.

(( صوموا تصحوا )) حديث ضعيف .

“সওম পালন কর সুস্থ থাক” হাদিসটি দুর্বল”।

দেখুন: “তাখরিজুল ইহইয়া” লিল ইরাকি: (৩/৭৫), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্‌ন আদি: (২/৩৫৭), “কিতাবুশ সাজারাহ ফিল আহাদিসিল মুশতাহেরাহ” লি ইব্‌ন তুলুন: (১/৪৭৯), “আল-ফাওয়েদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৯), “মাকাসিদুল হাসানাহ” লিস সাখাভি: (১/৫৪৯), “কাশফুল খাফা” লিল আজুলুনি: (২/৫৩৯), “সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ” লিল আলবানি: (১/৪২০)

পাঁচ.

(( إن لله عند كل فطر عتقاء من النار )) حديث ضعيف .

“প্রত্যেক ইফতারের সময় জাহান্নাম থেকে আল্লাহর কিছু মুক্তি প্রাপ্ত বান্দা থাকে”। হাদিসটি দুর্বল।

দেখুন: “তানজিহুশ শারিয়াহ” লিল কিনানি: (২/১৫৫), “আল-ফাওয়াদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৭), “কাশফুল ইলাহি আন শাদিদিদ দায়িফ ওয়াল মাওদু ওয়াল ওয়াহি” লিত তারাবুলসি: (১২/২৩০), “জাখিরাতুল হিফাজ” লিল কায়সারানি: (২/৯৫৬), “শুআবুল ঈমান” লিল বায়হাকি: (৩/৩০৪), “আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল” লি ইব্‌ন আদি: (২/৪৫৫)

ছয়.

(( لو يعلم العباد مافي رمضان لتمنت أمتي أن يكون رمضان السنة كلها ، إن الجنة لتتزين لرمضان من رأس الحول إلى الحول……الخ ))

“বান্দারা যদি জানত যে, রমযানে কি রয়েছে, তাহলে তারা আশা করত পুরো বছর যেন রমযান হয়, নিশ্চয় জান্নাতকে বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রমযানের জন্য সুসজ্জিত করা হয়…”। হাদিসটি দুর্বল।

দেখুন: “আল-মাওদুয়াত” লি ইব্‌ন জাওজি: (২/১৮৮), “তানজিহুশ শারিয়াহ” লিল কিনানি: (২/১৫৩) “আল-ফাওয়াদুল মাজমুআহ ফিল আহাদিসিল মাওদুয়াহ” লিশ শাওকানি: (১/২৫৪), “মাজমাউজ জাওয়ায়েদ” লিল হায়সামি: (৩/১৪১)

অনুরূপ আরেকটি হাদিস:

( إن الجنة لتزخرف وتنجد من الحول إلى الحول لدخول رمضان فتقول الحور العين : يا رب ، اجعل لنا في هذا الشهر من عبادك أزواجًا )

নিশ্চয় জান্নাত এক বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রমযান আগমনের জন্য সজ্জিত ও পরিপাটি করা হয়। জান্নাতী হুররা বলে: হে আল্লাহ এ মাসে তোমার বান্দাদের থেকে আমাদের জন্য স্বামী নির্বাচন কর”। তাবরানি “আওসাত” ও “কাবির” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এ হাদিসের সনদে ওলিদ ইব্নুল ওলিদ আল-কালানাসি বিদ্যমান, সে দুর্বল।

সাত.

أن النبي صلى الله عليه و سلم كان يقول عند الإفطار : (( اللهم لك صمت و على رزقك أفطرت )) حديث ضعيف

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ইফতারের সময় বলত: হে আল্লাহ আপনার জন্য সওম পালন করছি এবং আপনার রিযকের দ্বারাই ইফতার করছি”। হাদিসটি দুর্বল।

দেখুন: “খুলাসাতুল বাদরুল মুনির” লি ইব্নুল মুলাক্কিন: (১/৩২৭), হাদিস নং: (১১২৬), “তালখিসুল হাবির” লিল হাফেজ ইব্‌ন হাজার: (২/২০২), হাদিস নং: (৯১১), “আল-আযকার” লিন নববী: (পৃ.১৭২), “মাজমাউজ জাওয়ায়েদ” লিল হায়সামি: (৩/১৫৬), “দায়িফুল জামে” লিল আলবানি, হাদিস নং: (৪৩৪৯)

আট.

‏جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ ‏‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏‏فَقَالَ : إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَال ،َ قَالَ :‏ ‏أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ أَتَشْهَدُ أَنَّ ‏‏مُحَمَّدًا ‏‏رَسُولُ اللَّهِ ، قَالَ : نَعَمْ ، قَالَ : يَا ‏‏بِلَالُ ‏‏أَذِّنْ ‏‏فِي النَّاسِ أَنْ يَصُومُوا غَدًا .

“এক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে: আমি চাঁদ দেখেছি, তিনি বললেন: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল? সে বলল: হ্যাঁ, তিনি বললেন: হে বেলাল মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামী কাল সওম পালন করে”।

আবু দাউদ: (২৩৪০), তিরমিযী: (৬৯১), নাসায়ি ফিল কুবরা: (২৪৩৩), (২৪৩৪), (২৪৩৫) (২৪৩৬), ইব্‌ন মাজাহ: (১৬৫২), তারা হাদিসটি বর্ণনা করেন সাম্মাক ইব্‌ন হারব সূত্রে, সে ইকরিমা থেকে, সে ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে।

সাম্মাক ইব্‌ন হারব সূত্রে বর্ণিত ইকরিমার হাদিসে ইজতেরাব রয়েছে, কখনো সে ইত্তেসাল সনদে বর্ণনা করে, কখনো মুরসাল সনদে।

যারা মুরসাল বর্ণনাকে গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে ইমাম তিরমিযি অন্যতম, তিনি বলেন: ইব্‌ন আব্বাসের হাদিসে ইখতিলাফ রয়েছে, সুফইয়ান সাওরি প্রমুখগণ সাম্মাক সূত্রে ইকরিমা থেকে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন। সাম্মাকের অধিকাংশ ছাত্র সাম্মাকের সনদে ইকরিমা থেকে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুরসাল বর্ণনা করেন।

নাসায়ি তার কুবরা: (২৪৩৫) ও (২৪৩৬) গ্রন্থে বলেন: হাদিসটি মুরসাল।

হাফেজ ইব্‌ন হাজার “তালখিস” গ্রন্থে বলেছেন: মূল বর্ণনাকারী থেকে সাম্মাক যখন একা বর্ণনা করবে, সেটা দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

শায়খ আলবানি “ইরওয়াউল গালিল”: (৯০৭) গ্রন্থে হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

মুরসাল: তাবেয়ি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যকার সূত্র, অর্থাৎ সাহাবি যে সনদে উল্লেখ থাকে না, হাদিস বিশারদদের নিকট তা মুরসাল হিসেবে পরিচিত। মুরসাল দুর্বল হাদিসের এক প্রকার। ইমাম তিরিমিযি বলেন: মুরসাল হাদিস অধিকাংশ আলেমের নিকট বিশুদ্ধ নয়, অর্থাৎ দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

মাসআলা: নেককার, সত্যবাদী ও মুসলিম একজন ব্যক্তির সাক্ষীর ভিত্তিতে ইমাম বা সরকার সওমের ঘোষণা দিতে পারবে, কিন্তু সওম ভঙ্গ বা শাওয়ালের চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে দুইজন ব্যক্তির সাক্ষী অপরিহার্য। ইমাম আবু হানিফা, আহমদ ও শাফেঈর এক ফতোয়া অনুরূপ। ইমাম মালেক বলেছেন রমযানের চাঁদের জন্যও দুইজন সাক্ষী জরুরী। দেখুন: তুহফাতুল আহওয়াজি: (পৃ.৩০৪), হাদিস নং: (৬৯১), হাদিস যদিও দুর্বল, কিন্তু আহলে ইলমদের আমল অনুরূপই।

নয়.

عَنْ عَامِرِ بْنِ مَسْعُودٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : “الْغَنِيمَةُ الْبَارِدَةُ الصَّوْمُ فِي الشِّتَاءِ ” .

আমের ইব্‌ন মাসউদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: “শীতকালীন সওম হচ্ছে ঠাণ্ডা গনিমত”। অর্থাৎ কষ্টহীন পূণ্য। হাদিসটি দুর্বল।

১. এ হাদিস ইব্‌ন মাসউদ থেকে আহমদ: (৪/৩৩৫), তিরমিযি: (৭৯৪), ইব্‌ন মাজাহ: (৩/৩০৯) প্রমুখগণ বর্ণনা করেছেন। এ সনদে দু’টি ইল্লত: নুমাইর ইব্‌ন আরিব অপরিচিত। দ্বিতীয়ত হাদিসটি মুরসাল।

২. আনাস থেকে তাবরানি ফিল কাবির: (৭১৬), শাজারি তার আমালি গ্রন্থে: (২/১১১) এবং ইব্‌ন আদি: (৩/১২১০) বর্ণনা করেছেন। এ সনদে তিনটি ইল্লত: সায়িদ ইব্‌ন বাশীর আযদি দুর্বল। ওলিদ ইব্‌ন মুসলিম ‘আনআনা’ দ্বারা বর্ণনা করেছে, এবং হাদিসটি মওকুফ।

৩. জাবের থেকেও ইব্‌ন আদি বর্ণনা করেছেন: (৩/১০৭৫), এ সনদে চারটি ইল্লত: আব্দুল ওয়াহহাব বালখি, সে হাদিসের ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত, বরং আবি হাতেম তাকে মিথ্যুক বলেছেন। ওলিদ ইব্‌ন মুসলিমের ‘আনাআনা’। শামিদের থেকে বর্ণনার ক্ষেত্রে জুহাইর ইব্‌ন মুহাম্মদ তামিমির দুর্বলতা, আর এটা সে শামিদের থেকেই। সনদের বৈপরিত্ব। দেখুন: যাখিরাতুল হুফ্‌ফাজ: (৩৪৩৭), আসনাল মাতালেব: (৮৩৬), তাবইদুস সাহিফা: (২৮),

অনুরূপ আরেকটি হাদিস:

 ( الشتاء ربيع المؤمن).

“শীতকাল হচ্ছে মুমিনের বসন্তকাল”। হাদিসটি দুর্বল, কিন্তু তার অর্থ সঠিক।

দশ.

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏: ‏قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ :‏ ‏أَحَبُّ عِبَادِي إِلَيَّ أَعْجَلُهُمْ فِطْرًا .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আমার নিকট প্রিয় বান্দা তারাই যারা দ্রুত ইফতার করে”।

তিরমিযি: (৭০০), আহমদ: (২/৩২৯), তিরমিযি বলেছেন: এ হাদিস হাসান, গরিব। শায়খ আহমদ শাকের “আল-মুসনাদ”: (১২/২৩১) গ্রন্থে হাদিসটি সহিহ বলেছেন, হাদিস নং: (৭২৪০) এ হাদিসের সনদে কুররা ইব্‌ন আব্দুর রহমান ইব্‌ন হাইউল নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন, যিনি বিতর্কিত:

ইমাম আহমদ বলেন: তার হাদিস খুব মুনকার।

ইমাম ইয়াহ ইব্‌ন মায়িন বলেন: তার হাদিস দুর্বল।

ইমাম আবু জুরআহ বলেন: সে মুনকার হাদিস বর্ণনা করে।

ইমাম আবু হাতেম ও নাসায়ি বলেছেন: সে নির্ভরযোগ্য নয়।

ইমাম আবু দাউদ বলেছেন: তার হাদিসগুলো মুনকার।

ইমাম মুসলিম অন্যদের সাথে তার হাদিস বর্ণনা করেছেন, এককভাবে তার কোন হাদিস বর্ণনা করেননি।

বিশেষ জ্ঞাতব্য:

বিভিন্ন সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত দ্রুত ইফতার করা সুন্নত, তাতে রয়েছে উম্মতের কল্যাণ। অতএব আমাদের উচিত এসব দুর্বল হাদিসের দিকে না তাকিয়ে সহিহ হাদিস গ্রহণ করা, যেমন:

عَنْ ‏‏سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏‏قَالَ :‏ ‏لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ . أخرجه البخاري (1957) ، ومسلم (1098) .

সাহাল ইব্‌ন সাদ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “লোকেরা যত দিন পর্যন্ত দ্রুত ইফতার করবে, তারা কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে”। বুখারি: (১৯৫৭), মুসলিম: (১০৯৮)

ইব্‌ন হাজার “ফাতহুল বারি”: (৪/১৯৮) গ্রন্থে বলেন: কতক জায়গায় নব সৃষ্ট ঘৃণিত কিছু বিদআত হচ্ছে রমযান মাসে ফজরের আধা ঘণ্টা বা পৌনে এক ঘণ্টা আগে আযান দেয়া, বাতি নিভিয়ে দেয়া ইত্যাদি, যা তাদের নিকট পানাহার নিষিদ্ধ হওয়ার আলামত, তারা এভাবে ইবাদতের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করে, অথচ এটা যে তাদের নিকট পানাহার বন্ধ করার আলামত অনেকে তা জানে। বস্তুত এভাবে তারা নিশ্চিত সময়ের আশায় দেরিতে আযান দেয়, ফলে তাদের ইফতার হয় দেরিতে, আর সেহরি হয় দ্রুত। তারা এভাবে সুন্নতের বরকত ও কল্যাণ থেকে মাহরুম হয়। এ জন্য তাদের মধ্যে কল্যাণের সংখ্যা খুব কম, অনিষ্ট খুব বেশী। আল্লাহ সাহায্যকারী।

এগার.

‏عَنْ النَّبِيِّ ‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏ ‏أَنَّهُ أَمَرَ ‏بِالْإِثْمِدِ ‏الْمُرَوَّحِ ‏عِنْدَ النَّوْمِ وَقَالَ : لِيَتَّقِهِ الصَّائِمُ ‏.

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি ঘুমের সময় সুগন্ধি যুক্ত সুরমার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন সওম পালনকারীর এর থেকে বেঁচে করা জরুরী”।

আবু দাউদ: (২৩৭৭), বুখারি ফিত তারিখিল কাবির: (৭/৩৯৮) আবু দাউদ বলেছেন: আমাকে ইয়াহ ইব্‌ন মায়িন বলেছেন: এটা মুনকার হাদিস, অথাৎ সুরমার হাদিস।

জায়লায়ি লিখেছেন: “তানকিহ”: এর লেখক বলেছেন: মা’বাদ ও তার ছেলে উভয় অপরিচিত, আর আব্দুর রহমানকে ইব্‌ন মায়িন দুর্বল বলেছেন, আবু হাতেম আমাকে বলেছে সে সাদুক”। জায়লায়ি: (২/৪৫৭)

ইমাম তিরমিযি সুরমা বিষয়ে বলেন: এ অধ্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন হাদিস প্রমাণিত নয়।

আরেকটি হাদিস:

( لا تكتحل بالنهار وأنت صائم )

“সওব অবস্থায় দিনে সুরমা ব্যবহার কর না”। আবু দাউদ: (২৩৭৭), ইব্‌ন মায়িন বলেছেন: এটা মুনকার হাদিস।

সওম অবস্থায় সুরমা ব্যবহার প্রসঙ্গে একাধিক হাদিস:

‏عَنْ ‏‏أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ‏قَالَ :‏ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏فَقَالَ ‏: ‏اشْتَكَتْ عَيْنِي أَفَأَكْتَحِلُ وَأَنَا صَائِمٌ ؟ قَالَ : نَعَمْ .

আনাস ইব্‌ন মালেক বলেন: “এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলে: আমার চোখে সমস্যা আমি সওম অবস্থায় সুরমা লাগাতে পারব? তিনি বললেন: হ্যাঁ”। তিরমিযি: (৭২৬), তিনি বলেন: আনাসের হাদিসের সনদ শক্তিশালী নয়, এ অধ্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ কোন বর্ণনা নেই, আবু আতেকাকে দুর্বল বলা হয়। আবু আতেকার মূল নাম হচ্ছে তারিফ ইব্‌ন সালমান, তাকে সালমান ইব্‌ন তারিফও বলা হয়।

আবু হাতেম বলেছেন: সে হাদিস ভুলে যায়।

বুখারি বলেছেন: তার হাদিস মুনকার।

নাসায়ি বলেছেন: সে নির্ভরযোগ্য নয়।

দারা কুতনি বলেছেন: দুর্বল।

ইব্‌ন হিব্বান বলেছেন: তার হাদিস খুব মুনকার। সে আনাস থেকে এমন হাদিস বর্ণনা করে, যা তার হাদিসের অনুরূপ নয়, আবার কখনো তার থেকে এমন হাদিস নকল করে, যা তার হাদিস নয়।

সুরমা সংক্রান্ত আরেকটি হাদিস:

عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَكْتَحِلُ وَهُوَ صَائِمٌ .

মুহাম্মদ ইব্‌ন উবাইদুল্লাহ নিজ পিতা থেকে, সে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওম অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করতেন”। ইব্‌ন খুযাইমা: (২০০৮), হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

نزل رسول الله صلى الله عليه وسلم خيبر ، ونزلت معه ، فدعاني بكحل إثمد ، فاكتحل في رمضان وهو صائم إثمد غير ممسك .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বারে অবতরণ করেন, আমিও তার সাথে অবতরণ করি। তিনি আমাকে ইসমিদের সুরমা আনতে বললেন, অতঃপর তিনি সওম অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করলেন। এ ইসমিদ শরীরের সাথ আঠার ন্যায় লেগে থাকা ইসমিদ নয়।

ইব্‌ন খুযাইমা বর্ণনা করে বলেন: আমি কোন দায়ভার নিচ্ছি না যে, এ সনদ মা’মার থেকে। অর্থাৎ এটা মা’মার বর্ণনা করেছেন এর নিশ্চয়তা আমি দিতে পারব না।

হাফেজ ইব্‌ন হাজার “তালখিস” গ্রন্থে বলেন: ইব্নু আবি হাতেম তার পিতা থেকে বলেছেন: এটা মুনকার হাদিস, তিনি মুহাম্মদের ব্যাপারে বলেছেন: তার হাদিস মুনকার, বুখারি অনুরূপ বলেছেন।

আমাদের উপরের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সওম পালনকারীদের সুরমা থেকে বিরত রাখার হাদিসগুলো সঠিক নয়।

মাআলালা: সওম অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করা বৈধ। জুমহুর আলেমদের নিকট নারী-পুরুষ সকলে সুরমা ব্যবহার করতে পারবে সওম অবস্থায়।

বার.

‏عَنْ ‏‏كَعْبِ بْنِ عَاصِمٍ الْأَشْعَرِيِّ -‏ ‏وَكَانَ مِنْ ‏أَصْحَابِ السَّقِيفَةِ ‏- ‏قَالَ ‏: ‏سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ‏‏صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‏‏يَقُولُ ‏: لَيْسَ مِنْ ‏امْبِرِّ ‏امْصِيَامُ فِي ‏امْسَفَرِ .

কাব ইব্‌ন আসেম আশআরি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “সফরে সওম পালন করা নেকির কাজ নয়”। আহমদ: (৫/৪৩৪), তাবরানি ফিল “কাবির”: (১৯/১৭২), হাদিস নং: (৩৮৭), তাবরানি ইমাম আহমদের ছেলে আব্দুল্লাহ সূত্রে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেন এ শব্দে:

 ليس من ام بر ام صيام في ام سفر .

হাদিসটি বায়হাকি তার “সুনান”: (৪/২২), গ্রন্থে আব্দুর রাজ্জাক সূত্রে বর্ণনা করেন।

হাফেজ ইব্‌ন হাজার “তালখিসুল হাবির” গ্রন্থে বলেছেন: “ইমাম আহমদ কাব ইব্‌ন আসেম আশআরি থেকে এ হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেন:

” لَيْسَ مِنْ ‏امْبِرِّ ‏امْصِيَامُ فِي ‏امْسَفَرِ ” .

এটা ইয়ামানের এক এলাকার ভাষা, তারা “মারেফার লাম” (নির্দিষ্ট করণের লাম) “মিম” দ্বারা পরিবর্তণ করে বলে। এমনও হতে পারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এভাবে সম্বোধন করেছেন, যেহেতু এটা তার আঞ্চলিক ভাষা। আবার এমনও হতে পারে আশআরি তা নিচের আঞ্চলিক ভাষায় পরিবর্তণ করে ব্যক্ত করেছেন। আর বর্ণনাকারীরা আশআরি থেকে তার শব্দ বর্ণনা করেছে। দ্বিতীয় অভিমতটি আমার নিকট অধিক যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ ভাল জানেন”। “তালখিসুল হাবির”: (২/২০৫)

আলবানি রাহিমাহুল্লাহ “সিলসিলাতুল আহাদিসিস দায়িফা” গ্রন্থে বলেছেন: হাদিসটি এভাবে শাজ… এ হাদিসের সনদ বাহ্যত বিশুদ্ধ, এর প্রেত্যেক বর্ণনাকারী মুসলিমের বর্ণনাকারী। তবে এ হাদিসের মূল সমস্যা হচ্ছে এটা শায্ ও অধিকাংশ মুহাদ্দিসের বর্ণিত হাদিসের বিপরীত। ইমাম আহমদ বলেন: সুফিয়ান এ হাদিসটি যুহরি থেকে আমাদেরকে বলেছেন এভাবে:

” ليس من البر الصيام في السفر ” .

ইমাম যুহরি থেকে ইব্‌ন জুরাইজ, ইউনুস, মুহাম্মদ ইব্‌ন আবি হাফসা ও জুবাইদি সকলে সুফিয়ানের অনুরূপ হাদিস বর্ণনা করেছেন। মা’মার নিজেও বায়হাকির বর্ণনাতে সুফিয়ানের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন যুহরি থেকে। আর এ বর্ণনাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংরক্ষিত।

কোন আলেম সন্দেহ করেন না যে, মা’মার বর্ণিত যে শব্দ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সাথে মিলে যায়, তার থেকে সেটা গ্রহণ করতে হবে, তার দিকে ধাবিত হবে, কিন্তু মা’মার বর্ণিত যে শব্দ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত হয়, তা গ্রহণ করা যাবে না, কারণ সে বর্ণনা দুর্বল, তার উপর নির্ভর করা যাবে না, বিশেষ করে মা’মার এর ক্ষেত্রে। মা’মার যদিও নির্ভরযোগ্য এবং হাদিসের বড় ইমামদের একজন, তবুও তার ব্যাপারে ইমাম যাহাবি বলেছেন: “তার থেকে সন্দেহমূলক প্রসিদ্ধ কিছু হাদিস রয়েছে, তার স্মরণ শক্তির দৃঢ়তা সত্বেও এসব সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। আবু হাতেম বলেছেন: তার হাদিসগুলো ভাল, কিন্তু বসরাতে তিনি যেসব হাদিস বলেছেন তাতে ভুল আছে”।

হাদিসের এ শব্দে মা’মার এর ভুলের বিষয়টি আরো নিশ্চিত হয় যে, সে অন্যান্য বর্ণনাকারীর বিপরীত বর্ণনা করেছেন। কারণ এ হাদিস কাব ইব্‌ন আসেম আশআরি ব্যতীত অন্যান্য সাহাবি এ হাদিস বর্ণনা করেছেন, যেমন জাবের ইব্‌ন আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আবি বারজাতাল আসলামি, আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর, আম্মার ইব্‌ন ইয়াসার, আবুদ দারদা প্রমুখগণ, তাদের থেকে বিভিন্ন সনদে এ হাদিস বর্ণিত আছে, তাদের সকলের বর্ণনাকৃত শব্দ হচ্ছে:

 ” ليس من البر الصيام في السفر ” .

তাদের সকলের হাদিস আমি “ইরওয়াউল গালিল” গ্রন্থে উল্লেখ করেছি, যার ইচ্ছা সেখানে দেখে নিতে পারেন। এখানে শুধু হাদিসের দুর্বলতা বলে দেয়াই উদ্দেশ্য। কারণ এ হাদিসটি ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকদের নিকট খুব প্রসিদ্ধ, বিশেষ করে যেহেতু ইব্‌ন হাজার তালখিসুল হাবির গ্রন্থে বলেছেন: “এটা ইয়ামানের কতক জনপদের ভাষা, তারা ‘মারেফা’র লামকে মিম দ্বারা পরিবর্তণ করে বলে, আবার এও সম্ভাবনা রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশআরিকে অনুরূপ শব্দেই সম্বোধন করেছেন, কারণ সেটা তার ভাষা, আবার এমনও হতে আশআরি তা নিজস্ব ভাষায় পরিবর্তণ করেছে, আর বর্ণনাকারীরা তার শব্দ বর্ণনা করেছে। দ্বিতীয় কারণটি আমার নিকট বেশী যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ ভাল জানেন”।

আমার আশঙ্কা: হাফেজ ইব্‌ন হাজার যেহেতু এর দু’টি কারণ উল্লেখ করেছেন, তাই অনেকের ধারণা হতে পারে যে, হাদিসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, শুধু সন্দেহ এখানে যে এ শব্দ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে না আশআরি থেকে, তিনি দ্বিতীয় মতটি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার এ অগ্রাধিকারের কোন কারণ নেই, যেহেতু আমরা প্রমাণ করেছি এ শব্দ হচ্ছে মা’মার কর্তৃক ওহাম, ধারণা বা ভুল। এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা আশআরি কেউ বলেননি। বরং সাফওয়ান ইব্‌ন আব্দুল্লাহ কিংবা যুহরি তাদের কেউ এভাবে বলেননি। এ কথাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ভাল করে জেনে রাখুন”। “সিলসিলাতুল আহাদিসিস দায়িফা”: (১১৩০)

আলবানি এ হাদিস প্রসঙ্গে “ইরওয়াউল গালিল” গ্রন্থের এক জায়গায় বলেন: “আশআরি থেকে বর্ণনাকারীগণ যদি আশআরি থেকে শ্রবণকৃত শব্দ বর্ণনা করতে পারে, তাহলে আশআরির অধিক উচিত ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণকৃত শব্দ হুবহু বর্ণনা করা”। ইরওয়াউল গালিল”: (৪/৫৮-৫৯), হাদিস নং: (৯২৫)

সারকথা:

ইমাম আহমদ মা’মার এর সনদে যুহরি থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

لَيْسَ مِنْ ‏امْبِرِّ ‏امْصِيَامُ فِي ‏امْسَفَرِ .

আবার মা’মার এর সাথী সুফিয়ানের সনদে যুহরি থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

” ليس من البر الصيام في السفر ” .

এখানে দেখা যাচ্ছে ইমাম যুহরির ছাত্র সুফিয়ান ও মা’মার এক হাদিস দুইভাবে বর্ণনা করেছেন।

ইমাম যুহরির অন্যান্য ছাত্র যেমন ইব্‌ন জুরাইজ, ইউনূস, মুহাম্মদ ইব্‌ন আবি হাফসা ও জুবাইদি প্রমুখগণ সুফিয়ানের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এমনকি খোদ মা’মার থেকে একটি বর্ণনা ইমাম বায়হাকি বর্ণনা করেছেন যা সুফিয়ানের বর্ণনার অনুরূপ। অতঃপর ইমাম বায়হাকি বলেছেন: এটাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সংরক্ষিত হাদিস।

অতএব এটা স্পষ্ট যে, এখানে ভুল হয়েছে মা’মার থেকে, কারণ ইমাম যুহরির অন্যান্য ছাত্র তার অনুরূপ বর্ণনা করেনি, দ্বিতীয়ত সে নিজেও তার এ হাদিসের বিপরীত বিশুদ্ধ শব্দ বর্ণনা করেছেন বায়হাকির নিকট, যার সাথে কারো দ্বিমত নেই।

ইমাম জাহাবি ও আবু হাতেম বলেছেন: মা’মার একজন বড় মাপের ও নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস হওয়া সত্বেও তার থেকে এ ধরণের ভুল হয়েছে। মূলত:

لَيْسَ مِنْ ‏امْبِرِّ ‏امْصِيَامُ فِي ‏امْسَفَرِ .

না যুহরি বলেছেন, না আশআরি, আর না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বরং এটা মা’মার এর ভুল।

শায়খ আলি ইব্‌ন হুসাইন হালবি (১৪৩০হি.) “ফিকহুস সিয়াম” শিরোনামে ১২-নং দরসে বলেন: “সফরে সিয়াম সংক্রান্ত একটি হাদিস আছে: “ليس مِن البِرِّ الصِّيامُ في السَّفَر”.

ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কতক ফেকার কিতাবে দেখা যায়, এ হাদিসটি অন্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ইয়ামানের হিমইয়ার বংশের আঞ্চলিক ভাষা, যারা লামকে মিম দ্বারা পরিবর্তণ করে পড়ে, যেমন:

” ليس مِن امْبِر امْصِيامُ في امْسَفر “.

এটাকে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বলেন। হাদিস এক, শুধু লামকে মিম দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ নয়, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়, বরং প্রমাণিত হচ্ছে জাবের থেকে বর্ণিত বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

” ليس مِن البِرِّ الصِّيامُ في السَّفَر “.

জ্ঞাতব্য: এখানে এ হাদিস উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হাদিসের বিশদ্ধ শব্দ চিহ্নিত করা। হাদিস দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, কারণ এ হাদিস সহিহ। ইমাম বুখারি ও মুসলিম তাদের সহিহ কিতাবে এর উল্লেখ করেছেন।

তের.

( إني رأيت البارحة عجبًا .. رأيت رجلاً من أمتي يلهث عطشًا كلما ورد حوضًا مُنع وطُرد . فجاءه صيامه فسقاه وأرواه )

আব্দুর রহমান ইব্‌ন সামুরা আত-তাওয়িল এর হাদিস: “আমি গত রাতে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি… আমার উম্মতের এক ব্যক্তিকে দেখলাম পিপাসায় কাতরাচ্ছে, যখনই সে আমার হাওজের কাছে আসে তাকে নিষেধ করা হয় ও তাড়িয়ে দেয়া হয়, অতঃপর তার সওম এসে তাকে পান করায় ও তার তৃষ্ণা নিবারণ করে”। তাবরানি দু’টি সনদে এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, তার একটি সনদে রয়েছে সুলাইমান ইব্‌ন আহমদ আল-ওয়াসেতি, আর অপরটি আছে খালেদ ইব্‌ন আব্দুর রহমান আল-মাখজুমি, তারা উভয়ে দুর্বল। দেখুন: “ইতহাফুস সাদাতুল মুত্তাকিন”: (৮/১১৯), ইব্‌ন রজব হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

চৌদ্দ.

( الصائمون ينفخ من أفواههم ريح المسك ، ويوضع لهم مائدة تحت العرش

“সওম পালনকারীদের মুখ থেকে মিসকের সুগন্ধি বের হবে এবং আরশের নিচে তাদের জন্য দস্তরখান বিছানো হবে”। “সুয়ূতি দুররুল মানসুর”: (১/১৮২) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইব্‌ন রজব প্রমুখগণ হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

পনের.

( الصائم إذا أُكل عنده صلت عليه الملائكة )

“সওম পালনকারীর নিকট যখন ভক্ষণ করা হয়, তার জন্য ফেরেশতাগণ তখন ইস্তেগফার করে”। ইব্‌ন খুজাইম, তিরমিযি: (৭৮৪), ইব্‌ন মাজাহ: (১৭৪৮), তায়ালিসি: (১৬৬৬), এ হাদিসটি দুর্বল। দেখুন: “সিলসিলাতুল আহাদিসুস দায়িফাহ”: (১৩৩২) 

ষোল.

( نوم الصائم عبادة )

“সওম পালনকারীর ঘুম ইবাদত”। হাদিসটি ইমাম সুয়ূতি “জামে সাগির”: (৯২৯৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বায়হাকির বরাতে উল্লেখ করে, বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আবু আওফার কারণে হাদিসটি দুর্বল বলেন। জায়নুদ্দিন ইরাকি, বায়হাকি ও সুয়ূতি প্রমুখগণ হাদিসটি দুর্বল বলেছেন। দেখুন: “আল-ফিরদাউস”: (৪/২৪৮), “ইতহাফুস সাদাত”: (৪/৩২২)

সতের.

( رب صائم حظه من صيامه الجوع والعطش ، ورب قائم حظه من قيامه السهر)

“অনেক সওম পালনকারী আছে, যাদের সওম হচ্ছে ক্ষুধা ও পিপাসা। অনেক রাত জাগরণকারী আছে, যাদের রাত জাগা হচ্ছে শুধু বিনিন্দ্রা রাত কাটানো”। ইব্‌ন মাজাহ: (১৬৯০), এর সনদে উসামা বিন যায়েদ আদাভি রয়েছে সে দুর্বল। তবে হাদিসের অর্থ সঠিক।

আঠার.

( من صلى العشاء الآخرة في جماعة في رمضان فقد أدرك ليلة القدر )

“রযমানে এশার সালাত যে জামাতের সাথে পড়ল, সে লাইলাতুল কদর লাভ করল”। ইস্পাহানি ও আবু মুসা মাদিনি হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। ইমাম মালেক তার “মুয়াত্তা”: (১/৩২১) গ্রন্থে হাদিসটি বালাগানি বলে উল্লেখ করেছেন, এটা মূলত ইব্নুল মুসাইয়্যিব এর বাণী। ইব্‌ন খুযাইমাহ: (২১৯৫), ইব্নুল মাদিনি বলেছেন এর সনদে বিদ্যমান উকবা ইব্‌ন আবিল হাসনা অপরিচিত, সে দুর্বল।

উনিশ.

( كان إذا دخلت العشر اجتنب النساء واغتسل بين الأذانين ، وجعل العشاء سحورًا )

“রমযানের শেষ দিন প্রবেশ করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের থেকে পৃথক থাকতেন ও দুই আযানের মধ্যবর্তী গোসল করতেন এবং রাতের খাবারকে সেহরি হিসেবে খেতেন”। হাদিসটি বাতিল, এ সনদে হাফস ইব্‌ন ওয়াকেদ রয়েছে। ইব্‌ন আদি বলেছেন: এ হাদিসটি আমাদের দেখা সব চেয়ে বেশী মুনকার। আরো কয়েকটি সনদে এ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটি দুর্বল।

বিশ.

( من صام بعد الفطر يومًا فكأنما صام السنة ) ، وحديث : ( الصائم بعد رمضان كالكار بعد الفار )

“ঈদুল ফিতরের পর যে ব্যক্তি একদিন সওম রাখল, সে যেন পুরো বছর সওম পালন করল”। হাদিস: “রমযানের পর সওম পালনকারী পালায়নের পর ফিরে আসা ব্যক্তির ন্যায়”। দেখুন: “কানজুল উম্মাল”: (২৪১৪২) মূলত: এটি কোন সহীহ সনদে বর্ণিত হয়নি।

একুশ.

 ( من صام رمضان وشوال والأربعاء والخميس دخل الجنة )

“যে বক্তি রমযান, শাওয়াল, বুধবার ও বৃহস্পতিবার সওম পালন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”। আহমদ: (৩/৪১৬), এ হাদিসে একজন বর্ণনাকারী নাম উল্লেখ করা হয়নি, হাদিসটি দুর্বল এতে সন্দেহ নেই।

বাইশ.

( ذاكر الله في رمضان مغفور له )

“রমযানে আল্লাহকে স্মরণকারী ক্ষমা প্রাপ্ত”।  হাদিসটি উল্লেখ করেছেন সুয়ূতি “জামেউস সাগির”: (৪৩১২) গ্রন্থে, “আওসাত” গ্রন্থে তিনি তাবরানির বরাতে উল্লেখ করেছন। হাদিসটি আরো উল্লেখ করেছেন বায়হাকি “শুআবুল ঈমান” গ্রন্থে। এ হাদিসের সনদে হিলাল ইব্‌ন আব্দুর রহমান বিদ্যমান সে দুর্বল।

তেইশ.

(استعينوا بطعام السحر على صيام النهار ، وبالقيلولة على قيام الليل)

“তোমরা সেহরি দ্বারা দিনের সওম এবং দিনের কায়লুলা দ্বারা রাতের কিয়ামের জন্য সাহায্য গ্রহণ কর”। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন হাকেম ও ইব্‌ন মাজাহ, এ হাদিসের সনদে জামআহ ইব্‌ন সালেহ ও সালমা ইব্‌ন হিরাম বিদ্যমান, তারা উভয়ে দুর্বল, তাই হাদিসও দুর্বল।

চব্বিশ.

( ثلاثة لا يفطرن الصائم : الحجامة والقيء والاحتلام )

“তিনটি বস্তুর কারণে সওম পালনকারী সওম ভঙ্গ হবে না: শিঙা, বমি ও স্বপ্ন দোষ”। তিরমিযি: (৭১৯), তিনি হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

মাসআলা: স্বপ্ন দোষের কারণে সওম ভঙ্গ হবে না।

পঁচিশ.

( تحفة الصائم الدهن والمجمر )

“সওম পালনকারীর হাদিয়া হচ্ছে তৈল ও ধূপদানি”। তিরমিযি: (৮০১), তিনি হাদিসটি দুর্বল বলেছেন, এ সনদে বিদ্যমান সাদ ইব্‌ন তারিফ দুর্বল।

ছাব্বিশ.

 ( إن لله في كل ليلة ستمائة ألف عتيق من النار ، فإذا كان آخر ليلة أعتق الله بعدد ما مضى )

“নিশ্চয় আল্লাহ প্রতি রাতে ছয় লাখ লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যখন সর্ব শেষ রাত আসে, তখন তিনি পূর্বের সম পরিমাণ মুক্ত করেন”। বায়হাকি, এটা মুরসাল, হাসান বসরির কথা।

সাতাশ.

( خصاء أمتي الصيام )

“আমার উম্মতের নপুংসকতা হচ্ছে সওম”। আলবানি “মিশকাতুল মাসাবিহ”: (১/২২৫), গ্রন্থে বলেন: এর সনদ জানতে পারিনি, কিন্তু শায়খ ক্বারি: (১/৪৬১), মিরাক থেকে বলেন, এতে সমস্যা রয়েছে।

আটাশ.

 ( الصوم نصف الصبر )

“সওম ধৈর্যের অর্ধেক”। এর সনদে মুসা ইব্‌ন উবাইদাহ বিদ্যমান, তার দুর্বলতার ব্যাপারে সবাই একমত। তিরমিযি: (৩৫১৯), ইব্‌ন মাজাহ: (১৭৪৫), আহমদ ও বায়হাকি। আলবানি “দায়িফুল জামে” গ্রন্থে হাদিসটি দুর্বল বলেছেন।

ঊনত্রিশ.

 ( من قام ليلة العيد ) . وفي لفظ : ( من أحياها محتسبًا لم يمت قلبه يوم تموت القلوب )

“যে ঈদের রাত জাগ্রত থাকে” অন্য বর্ণনায় আছে: “যে ব্যক্তি ঈদের রাত সওয়াবের নিয়তে জাগ্রত থাকে, তার অন্তর মারা যাবে না, যে দিন সকল অন্তর মারা যাবে”। ইব্‌ন মাজাহ, এ হাদিস দুর্বল।

ত্রিশ.

( ليس في الصوم رياء )

“সওমের রিয়া বা লৌকিতা নেই”। বায়হাকি। সনদটি দুর্বল।

একত্রিশ.
( صيام رمضان بالمدينة كصيام ألف شهر فيما سواه ) وفي لفظ : ( خير من ألف رمضان فيما سواه من البلدان )

“মদিনায় এক রমযান সওম, অন্যান্য শহরে হাজার মাসের সওমের সমান”। অন্য বর্ণনায় আছে: “দুনিয়ার অন্যান্য শহরে হাজার রমযানের তুলনায় উত্তম”। বায়হাকি, তিনি হাদিসটি দুর্বল বলেছেন। তাবরানি ফিল কাবির, দিয়া ফিল মুখতারাহ। হায়সামি বলেছেন: এ হাদিসের সনদে আব্দুল্লাহ ইব্‌ন কাসির বিদ্যমান, সে দুর্বল। ইমাম যাহাবী তার মিজানুল ই‘তিদাল গ্রন্থে বলেছেন: এর সনদ অন্ধকার।

বত্রিশ.

( سيد الشهور شهر رمضان وأعظمها حرمة ذو الحجة )

“সকল মাসের সরদার হচ্ছে রমযান, সব চেয়ে বেশী সম্মানিত হচ্ছে জিল হজ্জ”। বাযযার ও দায়লামি। হাদিসটি সঠিক নয়।

তেত্রিশ.

( إن في السماء ملائكة لا يعلم عددهم إلا الله فإذا دخل رمضان استأذنوا ربهم أن يحضروا مع أمة محمد – صلى الله عليه وسلم – صلاة التراويح )

“আসমানে এত সংখ্যাক ফেরেশতা রয়েছে, যার সংখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না, যখন রমযান আগমণ করে, তখন তারা উম্মতে মুহাম্মদির সাথে রমযানের তারাবিতে অংশ গ্রহণ করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করে”। বায়হাকি ফি শুআবুল ঈমান: (৩/৩৩৭), তিনি আলির কথা হিসেবে এটা বর্ণনা করেছেন। সুয়ূতি দুররুল মানসুর: (৮/৫৮২) একে দুর্বল বলেছেন। কানজুল উম্মাল: (৮/৪১০)

চৌত্রিশ.

( إن للصائم عنده فطره دعوة لا ترد )

“সওম পালনকারীর ইফতারের সময় দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয়”। আহমদ: (২/৩০৫), তিরমিযি: (৩৬৬৮), ইব্‌ন খুযাইমাহ: (১৯০১), ইব্‌ন মাজাহ: (১৭৫২), এ হাদিসের সনদে বিদ্যমান ইসহাক ইব্‌ন উবাইদুল্লাহ মাদানি অপরিচিত। ইবনুল কাইয়্যেম হাদিসটি “যাদুল মায়াদ” গ্রন্থে দুর্বল বলেছেন। ইমাম তিরমিযিও হাদিসটি দুর্বল বলেছেন। হাদিসটি দুর্বল।

জ্ঞাতব্য: আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী দুর্বল হাদিসের উপর আমল করা যাবে না, না ফাযায়েলে, না আহকামে, না অন্য কোন বিষয়ে। আমরা শুধু তারই অনুসরণ করব, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। দুর্বল হাদিস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সম্পৃক্ত করা বৈধ নয়, তবে মানুষদের জানানো জন্য ও দুর্বলতা প্রকাশ করার উদ্দেশ্য হলে তা বর্ণনা করা যাবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার উপর যে এমন কথা বলল, যা আমি বলেনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”।

আল্লাহ ভাল জানেন।

ইসলাম হাউস

কিডনি রোগ শুরুতে শনাক্ত হলে প্রতিরোধ সম্ভব

কিডনি রোগ শুরুতে শনাক্ত হলে প্রতিরোধ সম্ভব

কিডনি যখন নিজস্ব কোনো রোগে আক্রান্ত হয় অথবা অন্য কোনো রোগে কিডনি আক্রান্ত হয়, যার ফলে কিডনির কার্যকারিতা ৩ মাস বা ততোধিক সময় পর্যন্ত লোপ পেয়ে থাকে তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কিডনি রোগ ছাড়াও কিডনির কার্যকারিতা লোপ পায় তাহলেও তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা যেতে পারে। যেমন—ক্রনিক নেফ্রাইটিস কিডনির ফিল্টারকে আক্রমণ করে ক্রমান্বয়ে কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। তেমনি ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ কিডনি রোগ না হওয়া সত্ত্বেও কিডনির ফিল্টার/ছাকনি ধ্বংস করতে পারে। আবার কারও যদি জন্মগতভাবে কিডনির কার্যকারিতা কম থাকে অথবা কিডনির আকার ছোট বা বেশি বড় থাকে তাহলেও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ কী?
মানুষ জন্মগ্রহণ করার ৬ সপ্তাহের মধ্যেই কিডনির ছাকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়। অর্থাত্ কিডনি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিটি কিডনিতে প্রায় ১০-১২ লাখ ছাকনি রয়েছে এবং প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে। এই পরিশোধিত রক্তের মধ্যে ১-৩ লিটার শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়া হয়। সুতরাং কোনো কারণবশত যদি এ ধরনের ফিল্টার বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে।
কিডনির কার্যকারিতা যাচাই করার জন্য রক্তে ক্রিয়েটিনিন নামক জৈব পদার্থ পরিমাপ করা হয়, যার মাধ্যমে কিডনি কতটুকু কাজ করছে তা বোঝা যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই জৈব পদার্থটি ৫০ শতাংশ কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার পরই শরীরে বাড়তে পারে। একজন সুস্থ পুরুষ লোকের শরীরে ক্রিয়েটিনিন ১.৪ মিলিগ্রাম এবং মহিলা ১.৩ মিলিগ্রাম হিসেবে স্বাভাবিক ধরা হয়। এর বেশি মাত্রায় ক্রিয়েটিনিন ৩ মাস বা ততোধিক কাল স্থায়ী থাকলে তখন তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের জটিলতা
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগীদের কোনো উপসর্গ হয় না। ফলে বছরের পর বছর এরা চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয় না। যখন তাদের উপসর্গ দেখা দেয় তখন তাদের কিডনির কার্যকারিতা ৭৫ শতাংশ লোপ পায়। তখন ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করে পরিপূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে কিডনি যখন ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে তখন তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে যদি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিরূপণ করা যেত তাহলে চিকিত্সার মাধ্যমে এই রোগগুলোকে আংশিক বা পরিপূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব হতো। সুতরাং কোনো রোগী দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছে কিনা, এটা জানার ব্যাপারে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

দরকার নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
— যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের কিংবা যাদের বয়স ৪০ বছরের ওপর তাদের উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক, তার রক্তচাপ নিয়মিত পরিমাপ করা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নির্গত হচ্ছে কিনা তা জানা এবং ডায়াবেটিস আছে কিনা তা নিরূপণ করা প্রয়োজন।
— উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত একবার প্রস্রাবে অ্যালবুমিন ও মাইক্রো অ্যালবুমিন যাচ্ছে কিনা এবং রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক কিনা তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
— যাদের বংশে কিডনি রোগ আছে তাদের পরিবারের সবার প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করানো উচিত।
— যাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, যাদের বাল্যকালে প্রস্রাবে ইনফেকশন ছিল কিংবা যারা বার বার টনসিলে ভোগে তাদেরও এসব পরীক্ষা করিয়ে নেয়া দরকার।

কিডনি রোগের ভয়াবহতা
বেশিরভাগ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ হয় না। তাই তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় না। সুতরাং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের উপসর্গগুলো সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা প্রয়োজন। যদিও এ সময়ে বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, রক্তস্বল্পতা, শরীরে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট এবং প্রস্রাবের পরিমাণে তারতম্য, চর্মরোগ ছাড়াই শরীর চুলকানো এবং ক্রমান্বয়ে দৈনন্দিন কার্যকারিতা লোপ পাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ রোগী এই উপসর্গগুলো নিয়েই চিকিত্সকের শরণাপন্ন হয় এবং রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, কিডনির ৮০ ভাগ কার্যকারিতাই তখন নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি অকেজো হওয়ার ফলে উপরোক্ত উপসর্গ ছাড়াও শরীরে অনেক জটিলতা দেখা দেয়। যার মধ্যে প্রধান হলো হৃিপণ্ডের রোগ।

কিডনি রোগ প্রতিরোধের উপায়
এটা পরীক্ষিত যে, এসিই-ইনহেবিটরস এবং এআরবি জাতীয় উচ্চরক্তচাপের ওষুধ কিডনি রোগ প্রতিরোধে খুবই কার্যকর। ঠিক তেমনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা মাইক্রো-অ্যালবুমিন ধরা পড়লে জরুরি ভিত্তিতে চিকিত্সা করা প্রয়োজন।
— নিয়মিত ব্যায়াম, চর্বিজাতীয় ও ফাস্টফুড বর্জন করলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। এছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষে চর্বি নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ খেলে, ধূমপান না করলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হৃদরোগ থেকেও রেহাই পাওয়া যায়।
— প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ধরে হাঁটাহাঁটির অভ্যাস করা। অতিরিক্ত লবণ পরিহার করা এবং ওজন বেশি থাকলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা। এছাড়াও রক্তে চর্বি বেশি থাকলে প্রয়োজনে ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধূমপান পুরোপুরি বর্জন করা।
— যাদের নেফ্রোটিক সিনড্রোম বা প্রস্রাবের প্রদাহ রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে যথানিয়মে ওষুধ সেবন করা এবং নেফ্রোটক্সিক অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক বা এনালজেসিক ওষুধ পরিহার করা উচিত।
কিডনি রোগীদের সচেতন করে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সার ব্যবস্থা করলে লাখ লাখ কিডনি রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি কিডনি অকেজো রোগীরা ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের বিশাল খরচ থেকে মুক্তি পাবে। তবে এ রোগ প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা।

রমজান মাসের ফজিলত

রমজান মাসের ফজিলত

রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ (يونس: 58)

বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। সূরা ইউনুস : ৫৮
পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। যখন রমজানের আগমন হত তখন রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, তার সাহাবাদের বলতেন :—

أتاكم رمضان شهر مبارك

তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। এরপর তিনি এ মাসের কিছু ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন :—

فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتغل فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم. رواه النسائي

আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য সিয়াম পালন ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারসমূহ খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। বর্ণনায় : নাসায়ি

আমাদের কর্তব্য : আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা।

এ মাসের যে সকল ফজিলত রয়েছে তা হল :

এক. এ মাসের সাথে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে ; আর তা হলে সিয়াম পালন।
হজ যেমন জিলহজ মাসের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে সে মাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এমনি সিয়াম রমজান মাসে হওয়ার কারণে এ মাসের মর্যাদা বেড়ে গেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ. سورة البقرة : 183

হে মোমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর-যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। সূরা বাকারা : ১৮৩

রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ইসলাম যে পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তার একটি হল সিয়াম পালন। এ সিয়াম জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম ; যেমন হাদিসে এসেছে :—

من آمن بالله ورسولـه، وأقام الصلاة، وآتى الزكاة، وصام رمضان، كان حقاً على الله أن يدخله الجنة … رواه البخاري

যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, জাকাত আদায় করল, সিয়াম পালন করল রমজান মাসে, আল্লাহ তাআলার কর্তব্য হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো…। বোখারি

দুই. রমজান হল কোরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন –

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ : البقرة : 184

রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কোরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। সূরা বাকারা : ১৮৫

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কোরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। কোরআন নাজিলের দুটি স্তরই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল-কোরআনই নয় বরং ইবরাহিম আ.-এর সহিফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। (সহি আল-জামে)

এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পূর্ণ কোরআন শোনাতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও তাকে পূর্ণ কোরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দু বার পূর্ণ কোরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।

তিন. রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় শয়তানদের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وأغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين. وفي لفظ : (وسلسلت الشياطين) رواه مسلم

যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে-শয়তানের শিকল পড়ানো হয়। (মুসলিম)

তাই শয়তান রমজানের পূর্বে যে সকল স্থানে অবাধে বিচরণ করত রমজান মাস আসার ফলে সে সকল স্থানে যেতে পারে না। শয়তানের তৎপরতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় ব্যাপকভাবে মানুষ তওবা, ধর্মপরায়ণতা, ও সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয় ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে। তারপরও কিছু মানুষ অসৎ ও অন্যায় কাজ-কর্মে তৎপর থাকে। কারণ, শয়তানের কু-প্রভাবে তারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।

চার. রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন :—

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ﴿3﴾ تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ﴿4﴾ سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ ﴿5﴾ (القدر: 3-5)

লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনি উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। সূরা আল-কদর : ৩-৫

পাঁচ. রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :—

لكل مسلم دعوة مستجابة، يدعو بـها في رمضان. رواه أحمد

রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। (মুসনাদ আহমদ)

অন্য হাদিসে এসেছে –

إن لله تبارك وتعالى عتقاء في كل يوم وليلة، (يعني في رمضان) وإن لكل مسلم في كل يوم وليلة دعوة مستجابة. صحيح الترغيب والترهيب.

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। (সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব)

তাই প্রত্যেক মুসলমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের কল্যাণের জন্য যেমন দোয়া-প্রার্থনা করবে, তেমনি সকল মুসলিমের কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করবে।

ছয়. রমজান পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাস। যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসূল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :—

.. رغم أنف رجل، دخل عليه رمضان، ثم انسلخ قبل أن يغفر له. .رواه الترمذي

ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। (তিরমিজি)

সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।

সাত. রমজান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :—

إذا كان أول ليلة من رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار، فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب، وينادي مناد كل ليلة : يا باغي الخير أقبل! ويا باغي الشر أقصر! ولله عتقاء من النار، وذلك في كل ليلة. رواه الترمذي

রমজান মাসের প্রথম রজনির যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলোকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে আর তা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।  (তিরমিজি)

আট. রমজান মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। যেমন হাদিসে এসেছে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একটি হজের সওয়াব পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং, রমজান মাসে ওমরাহ করা আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ আদায়ের মর্যাদা রাখে। এমনিভাবে সকল ইবাদত-বন্দেগিসহ সকল সৎকাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বেশি দেয়া হয়।

নয়. রমজান ধৈর্য ও সবরের মাস। এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদি ও অন্যান্য সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনিভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন :—

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ. الزمر: 10

ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেয়া হবে। সূরা যুমার : ১০

%d bloggers like this: