মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে

 মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে


অবশেষে সুন্দরবনপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ হলো। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতায় সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে সাশ্রয়ীমূল্যে মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোট দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স অব নেচার ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তির প্রেক্ষিতে গতরাত ১২-০১ মিনিট থেকেই মেসেজের মাধ্যমে ভোট প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভোটিং করে সুন্দরবনকে বিজয়ী করার একটি সহজ ক্ষেত্র তৈরী হলো।  এক্ষেত্রে ‘টেলিটক’ বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশের  অন্যান্য মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে গেটওয়ে সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবহৃত সকল অপারেটরের প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকগণই এসএমএস-এ সুন্দরবনকে ভোট প্রদান করতে পারবেন। 
জানা গেছে, এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোটদানের ক্ষেত্রে যে কোন মোবাইল ফোন থেকে  মেসেজ অপশনে গিয়ে ঝই লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে ‘১৬৩৩৩’ নম্বরে। এসএমএসটি গৃহীত হলে ভোটদানকারী একটি ‘কনফার্মেশন’ ফিরতি এসএমএস পাবেন। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে  সুন্দরবনের জন্য ‘কী-ওয়ার্ড’ ঝই । অন্য স্থানগুলোর কী-ওয়ার্ডসহ বিস্তারিত তথ্য টেলিটকের ওয়েবসাইটে http://www.teletalk.com.bd/ পাওয়া যাচ্ছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী গতরাত ১২টা-১ মিনিট হতেই যে কেউ মোবাইলের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ভোট দিতে পারছেন। সুন্দরবন বাদেও যে কোন ব্যক্তি যে কোন মোবাইল থেকেই তার পছন্দের প্রাকৃতিক স্থানকে যতবার খুশি ততবার ভোট দিতে পারবেন। ভোটগ্রহণ চলবে চলতি বছরের ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত। এসএমএস-এ ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ২ টাকা এবং ভ্যাট হিসেবে আরও ৩০ পয়সাসহ মোট ২ টাকা ৩০ পয়সা  কাটা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সুন্দরবন সমর্থন কমিটি-বাংলাদেশসহ সুন্দরবনপ্রেমীরা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনের ভোট প্রদানের নাম্বারটি ‘টোল ফ্রি’ করার আবেদন করে আসছিল। এ ক্ষেত্রে সরকারও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ টেকনিক্যাল কারণে বিষয়টিতে অনুমোদন দেয়নি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপামর মানুষের প্রকৃতির প্রতি ভালবাসার অন্যন্যসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি  এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা এবং সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় এনে নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ  বিকল্প হিসেবে এসএমএস-এর মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে ভোট প্রদানের দাবিটিতে অনুমোদন দিয়েছে। এসএমএস-এর মাধ্যমে এই ভোট প্রদানের বিষয়টিতে নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুন্দরবন সমর্থক কমিটি-বাংলাদেশের আহবায়ক পূর্বাঞ্চল সম্পাদক আলহাজ্ব লিয়াকত আলী, সদস্য সচিব উন্নয়ন সংগঠন রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন এবং সমন্বয়কারী একে হিরু সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সুন্দরবনপ্রেমীদের পক্ষে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।  ল্যান্ডফোন, মোবাইল ফোন এবং এসএমএসসহ ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত  ভোটের ভিত্তিতে ১১ নভেম্বর জগতের ৭টি নতুন সপ্তাশ্চর্যের নাম ঘোষণা করা হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সুন্দরবনসহ ২৮টি প্রাকৃতিক সম্পদ ফাইনাল রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।  বিটিআরসি কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু এবং পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদসহ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চেয়ারম্যান বিটিআরসি এবং মোবাইল ফোন অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত  থেকে মেসেজের ভোটিং করার সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। 

সূত্র: নেট

Advertisements

হুমকির মুখে সুন্দরবন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সিডর, আইলা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, অতিরিক্ত শীত, যথাযথ সময়ে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় না হওয়া এসবই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। কমে যাচ্ছে দেশের বনভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে লবণ পানি। দেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর ১০টি ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর ১৩টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত হওয়ার পথে আরও ১৫০ প্রজাতির প্রাণী।

প্রকৃতির বৈরী আচরণ : বিশ্বজুড়ে বৈরী আচরণ করছে প্রকৃতি। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্বজুড়ে ধারাবাহিকভাবে চলছে দাবানল, ছাই-মেঘ, বন্যা, তুষারঝড়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও শৈত্যপ্রবাহ। কয়েক বছর ধরেই পৃথিবীর বুকে আঘাত হানছে বৈরী আবহাওয়া। ২০০৭ সালে সিডর, ২০০৯ সালে আইলা, ২০১০ সালে এক দিনে সর্বকালের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের পর আট বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে তীব্র শীতের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। ১ জুন থেকে পুরোদমে বর্ষা শুরুর পূর্বাভাস থাকলেও এখনও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়নি।

আইপিসিসির ফোর্থ রিপোর্ট : জলবায়ু বিষয়ক ফোর্থ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট অন ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অব ক্লাইমেট (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা ২৭ থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে। যদি এ উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার বাড়ে তবে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে।

সুন্দরবনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়েছে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হিসেবে সুন্দরবনের সামনে হাজির হয়েছে পানির লবণাক্ততা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবন অঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। লবণাক্ত পানির এ আগ্রাসনে মরতে বসেছে সুন্দরবনের অন্যতম সম্পদ সুন্দরী গাছ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার লবণপানি পানের কারণে আক্রান্ত হচ্ছে প্রাণঘাতী লিভার সিরোসিসে। হারিয়ে যেতে বসেছে সুন্দরবনের পুরো ইকো সিস্টেম। ধারণা করা হচ্ছে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সুন্দরবন। এতে নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে সমগ্র উপকূল।

কমছে বনভূমি : একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। অথচ বন মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১০ থেকে ১২ ভাগ বনভূমি রয়েছে। বেসরকারি সংস্থার কয়েকটি জরিপমতে অবশ্য বনভূমির পরিমাণ ৬ ভাগ বলে জানা গেছে।

বিলুপ্ত ২৩ প্রজাতির প্রাণী : জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে দেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর ১০টি ও মেরুীদন্ড প্রাণীর ১৩টি প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৫০ প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে। ৪৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪৭ প্রজাতির পাখি, ৮ প্রজাতির উভচর ও ৬৩ প্রজাতির সরীসৃপের অস্তিস্তও বিপন্ন। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ ছয়টি স্থানকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা হলেও নজরদারি ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে সেগুলোরও বিপন্নদশা। নতুন ঘোষিত ২১টি সংরক্ষিত এলাকায় পরিবেশ দূষণ চলছে।
দূষণের নগরী ঢাকা : রাজধানী ঢাকার পানি-বাতাস খুবই অনিরাপদ। গৃহস্থালি, শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্য হুমকি হয়ে হাজির হয়েছে ঢাকার প্রায় ২ কোটি মানুষের সামনে। বাতাস, পানি, মাটি দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দদূষণ। বিষাক্ত সিসার কারণে রাজধানীর বাতাস দিনের পর দিন ভারী হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম নগরী ঢাকার পরিবেশের যে অবস্থা, তাতে অধিবাসীরা ভয়ানক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের মতে, রোগব্যাধির যে বোঝা নাগরিকদের টানতে হয়, তার কমপক্ষে ২২ শতাংশের জন্য পরিবেশ দূষণের বিষয়গুলো সরাসরি দায়ী। এক্ষেত্রে বায়ুদূষণ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভূপৃষ্ঠের পানিদূষণ এ তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন তারা।
পরিবেশ আদালতে ৮ বছরে শাস্তি হয়নি একজনেরও : এদিকে পরিবেশ দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও আদালত। পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধ করেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ আইনের অধীনে গঠিত ঢাকা বিভাগীয় পরিবেশ আদালতে গত আট বছরে মামলা হয়েছে ৪০৩টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১১২টি। ২৮১টি মামলা নিষ্পত্তি হলেও কারাদ হয়নি একজনেরও।

সূত্র: নেট

চোখ জুড়ানো হিরণ পয়েন্ট!

চোখ জুড়ানো হিরণ পয়েন্ট!


অনেক দিনের প্রতীক্ষার পর বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ সুন্দরবন দেখার সৌভাগ্য হলো। ভ্রমণের প্রধান স্থান নির্ধারণ করা হলো সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট, সেখানে পৌঁছা সময়সাপেক্ষ। আমরা ভ্রমণপিপাসু ৯ বন্ধু যথাক্রমে আমি জাভেদ হাকিম, জসিম, মোস্তাক, কামাল, কচি, মিলন, সাগর, লিটন ও আলাল। ভ্রমণে সার্বিক সহযোগিতা করলেন মংলা পৌরসভার কমিশনার আবদুল কাদের। রাতে গাড়িতে চড়ে খুব ভোরে মংলা ঘাটে পৌঁছে পূর্ব নির্ধারিত জালি বোটে উঠলাম। কমিশনারের মাধ্যমে জনসংখ্যা অনুযায়ী কাঁচাবাজার, ওষুধ, ফল ও মিনারেল পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা ছিল। কারণ আমাদের ভ্রমণের সময় জালি বোটে অবস্থান করতে হয়েছিল। জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে বোট হিরণ পয়েন্টের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে কী আনন্দ, বলে বোঝানো সম্ভব নয়। একটা সময় এলো সেলফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে চলে এলাম। পশুর নদীর ওপর দিয়ে চলছি, চারদিকে অথৈ পানি, দূর থেকে সুন্দরী গাছগুলো যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। পশুর, শিবসা ও হংসরাজ—এ তিনটি নদীর মোহনায় পৌঁছে এক অনন্য দৃশ্য অবলোকন করলাম আমরা। পশুর নদীর পানি থেকে হংসরাজের পানির উচ্চতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। পশুর নদীর পানি স্বচ্ছ এবং হংসরাজ নদীর পানি ঘোলা, সত্যিই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। সকাল পেরিয়ে দুপুরের খাবারের পর্ব চলছে। কিন্তু এখনও বাঘ, হরিণ, কুমির তো দূরের কথা—একটি গাংচিলের দেখাও মিলল না। দূরবীন নিয়ে যারা ব্যস্ত, তারাও হতাশ। হঠাত্ মোস্তাক চিত্কার দিয়ে উঠল—দেখা পেয়েছি। হ্যাঁ, আমরা সবাই খালি চোখেই দেখতে পেলাম এক পাল হরিণ পড়ন্ত বিকালে ঘাস খাচ্ছে। আনন্দে সবাই আত্মহারা। ধীরে ধীরে আমাদের চোখে ধরা পড়তে লাগল গাংচিল, বক, অচেনা পাখিসহ মাছ ধরার দৃশ্য। বোট থেকেই দেখে নিলাম উলির চর। প্রায় সন্ধ্যার সময় নীল কমল নদীর তীরে স্বপ্নের সেই হিরণ পয়েন্টের জেটিতে এসে পৌঁছলাম। হিরণ পয়েন্টের রেস্ট হাউসে উঠে আমাদের মনে হলো আমরা যেন কিছু একটা জয় করে বীরের বেশে এখানে অবস্থান করছি। মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। আমরা ছাড়া আর কোনো ট্যুরিস্ট তিন তলার বিশাল রেস্ট হাউসে ছিল না এবং আশপাশে কোথাও না। সম্ভবত দুর্গম পথ ও বাঘের পদচারণ বেশি হওয়ায় এখানে পর্যটক আসার দুঃসাহস দেখায় না। সেদিক থেকে আমরা একটু ব্যতিক্রম। যেখানে ভয় সেখানেই আমাদের ভ্রমণের জয়। প্রকৃতি আমাদের সহায়, বিদ্যুিবহীন জোছনা রাত। পূর্ণিমার আলোতে মিঠা পানির পুকুরের পাশে বারবিকিউর আয়োজন হলো। সেদিন জোছনা রাত না হলে হয়তো রাতটা সাদামাটাই কেটে যেত। রেস্ট হাউসের কর্মকর্তাদের সতর্কবাণী বেশি রাত পর্যন্ত রুমের বাইরে থাকবেন না, যে কোনো সময় মামা চলে আসতে পারে। ওখানকার লোকেরা বাঘকে মামা বলে। অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে অবস্থান করলাম, মামাকে স্বাগত জানানোর জন্য। মামা (বাঘ) এলো না, সম্ভবত অভিমান করেছিল এতগুলো ভাগ্নে একত্রে থাকার জন্য। বাঘ দেখতে না পাওয়ার হতাশা আমাদের কাটিয়ে দিয়েছিল পূর্ণিমা রাতের আলো। সুন্দরবনের গভীরে মেঘ কিংবা কুয়াশাবিহীন পূর্ণিমা চাঁদ দীর্ঘদিন চোখের ফ্রেমে এঁটে থাকা এক অপরূপ ফটো। স্কুলের পাঠ্য বইয়ের সেই দুটি লাইন ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। পুরো সুন্দরবন ভ্রমণে আমরা এই লাইন দুটি মনে রেখেছিলাম।

হিরণ পয়েন্টের পাশেই কেওড়া সুতি। এখানে না গেলে যেন ভ্রমণের অপূর্ণতাই থেকে যেত। আমাদের সঙ্গে দুই ফরেস্ট অফিসার। বনের ভেতর কাঠের পাটাতনের ব্রিজ, এরপর অনেকদূর পর্যন্ত মাটির রাস্তা। দলে দলে হরিণের পাল ছোটাছুটি করছে। হঠাত্ উত্কট গন্ধ। বাঘের পায়ের চিহ্ন। কিঞ্চিত্ ভয়, কিন্তু বাঘ মামাকে দেখার বাসনাই বেশি। ফরেস্ট কর্মকর্তারা বললেন পায়ের চিহ্নে োঝা যায় মামা (বাঘ) সম্ভবত ২-৩ ঘণ্টা আগে এখানে এসেছিল। সুতরাং আপনারা আর বেশি দূর এগুবেন না এবং দল বেঁধে থাকবেন। কে শুনে কার বাণী যে যার মতো করে বাঘের সাক্ষাত্ পাওয়ায় ব্যস্ত। অবশেষে বাঘের পায়ের চিহ্নের স্মৃতি নিয়েই ফিরতে হলো সেখান থেকে। এবার যাচ্ছি দুবলার চরের আলোর কুল। বোট থেকেই দেখতে পেলাম সিডরের ভয়াবহতা। সুন্দরবনের দেহ থেকে এখনও সিডরের আঘাতের দাগ মোছেনি। আলোর কুল পৌঁছে দেখলাম বাহারি মাছের শুঁটকি। জেলেরা আমাদের টাটকা চিংড়ি উপহার দিল। ওদের নিঃস্বার্থ উপহার আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রইল। আলোর কুল ঘুরে এখন চলছি দুবলার চরের একাংশ মেহের আলি চরে। মেহের আলি চর পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। পর্যাপ্ত হরিণ দেখে মনে হয় যেন গৃহপালিত। সেই সঙ্গে প্রচুর বানরের কিচিরমিচির। চরের একপাশে বঙ্গোপসাগর আর অন্য পাশে নোনা জলের পশুর নদী। সুন্দরী গাছের চেয়ে গোলপাতা, ম্যানগ্রোভ আর কেওড়া গাছের আধিক্য বেশি। ইচ্ছে করলে জেলেদের কাছ থেকে বিনামূল্যে সাগরের মাছ নিয়ে খেতে পারেন। এই চরে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র আছে। দুর্ভাগ্য ঘটনাক্রমে আমাদের সেখানে রাতে আশ্রয় হলো না। অগত্যা পালাবদল করে জালি বোটেই ঘুমাতে হলো। শহরের ধনীর দুলালদের জালি বোটের পাটাতনে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা হলো। সেও বা কম কিসের, ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঝুলি একধাপ সমৃদ্ধ হলো। শেষ রাতে জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে জালি বোট স্টার্ট নিল। প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙল সবার। আলো আঁধারের মাঝে উপভোগ করলাম এক অন্যরকম সকাল। কচির ধুন কথা, জসিমের বেঁচে থাকার বাসনা, মোস্তাক ও সাগরের অফুরন্ত চুটকি, আলালের কেনা শুঁটকির গন্ধতে তিন দিনের ভ্রমণ হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য। বোট চলছে মংলার উদ্দেশে মাঝে তিন জায়গায় বিরতি নিয়ে কিছুটা সময় ঘোরা হলো। প্রথমে হারবারীয়া ভেতরটা বন বিভাগ দ্বারা সাজানো গোছানো, দ্বিতীয় স্পট জয়মনি ঘোল গ্রাম, খুবই সুন্দর। মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। বোট থেকেই দেখা হলো বদ্রা। সেখানে কুমিরের উপদ্রব রয়েছে। সময় নিয়ে অবস্থান করলে নোনাজলের কুমির দেখা যায়। তৃতীয় স্পট করম জল, সেখানে রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ওর থেকে সুন্দর বনের রূপ দেখা যায়। তৃতীয় স্পট করম জল, সেখানে রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ওপর থেকে সুন্দরবনের রূপ দেখা যায়। সত্যিই সুন্দরবন নামের পূর্ণ সার্থকতা রয়েছে। ম্যানগ্রোভ এই বনকে নিয়ে আমরা বিশ্বের ভ্রমণ পিয়াসীদের কাছে গর্ব করতে পারি নিঃসন্দেহে। ভ্রমণ সার্থক ও সুন্দরবন ভ্রমণে সহযোগিতা করেছেন সচিবালয়ের সরকারি কর্মকর্তা শরফুদ্দিন আহমেদ রাজু, ডাক্তার আতিয়া রহমান এবং পর্যটন করপোরেশনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
ভ্রমণের প্রয়োজনীয় কিছু টিপস:
১. প্রাণবন্ত উদার মানসকিতা
২. প্রয়োজনীয় অর্থ
৩. ভ্রমণের স্থান সম্পর্কে পূর্ব ধারণা
৪. প্রকৃতিকে উপভোগ করার দৃষ্টি
৫. নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলতা

মো. জাভেদ হাকিম

আমরা কি সুন্দরবন হারাতে যাচ্ছি?

আমরা কি সুন্দরবন হারাতে যাচ্ছি? 


বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ তথা কাদাপানির বন সুন্দরবন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে এক নম্বর স্থান পাওয়া উচিত এবং চলতি প্রতিযোগিতায় তা যোগ্যতম দাবিদার। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম জোয়ারবিধৌত গরান বনভূমি। এই বনের বর্তমান আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বিগত শতকেও এর আয়তন ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। মানুষের আগ্রাসনে বর্তমানে সুন্দরবন সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। বনের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের, বাকিটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের। এখানে বিরল প্রজাতির প্রায় ৫০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ৩০ হাজার হরিণ রয়েছে। হাঙ্গর, কুমির, বানর, নানা প্রজাতির পাখি, পতঙ্গ, অজগর সাপসহ তিন হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ২১৭ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির জলজ প্রাণী, ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং দুই হাজার ১০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। ১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বা বিশ্ব ঐতিহ্য উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। এই সুন্দরবন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ছয় লাখ লোকের জীবিকার উৎস। বিগত সিডর ও আইলায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সুন্দরবন দ্রুত প্রাকৃতিক শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে আমরা যখন ভোটযুদ্ধে প্রচার বিপ্লবে মুখরিত, আমাদের লক্ষ্য যেমন করেই হোক ছিনিয়ে আনতে হবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্যের রানীর মুকুট। যার ফলে বিকশিত গর্বে উদ্ভাসিত হবে প্রিয় সুন্দরবন। এমনই এক বিজয়মুখর ঝঙ্কারের মাঝে খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে মাত্র ১০ কিলোমিটার অদূরে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার কৃষি ও মৎস্য চাষের স্বর্গ সাপমারী, কৈগরদাসকাটি, কাটাখালি মৌজায় সম্পূর্ণ কৃষিজমিতে প্রতিষ্ঠিত হতে চলছে ভারতীয় আর্থিক সহযোগিতায় ২৬৪০ মেগাওয়াট বিদুøৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদুøৎ প্রকল্প। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, আমরা উন্নয়ন চাই, দেশের বিদুøৎ সমস্যা সমাধান হোক আমরা তা কামনা করি। তবে নানা কারণে বিগত কয়েক দশক থেকে হয়তো বা বাধ্য হয়ে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ স্থানগুলোতে মানবীয় কার্যাবলি দানবীয় রূপ ধারণ করতে চলেছে।

ফলে পরিবেশ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আশা করা যায়, দেশের গণমুখী গণতান্ত্রিক সরকার এ ধরনের কাজ অবশ্যই নিরুৎসাহিত করে দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

একজন পরিবেশবাদী, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বলতে চাই, এ দুরভিসন্ধিমূলক প্রকল্প প্রিয় সুন্দরবনকে অদূরভবিষ্যতে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। হাজার হাজার কৃষক হবে গৃহহীন, কর্মহীন। স্বভাবত ‘সুন্দরবন বাঁচাও, সুন্দরবন সাজাও’ স্বার্থে কয়লাভিত্তিক বিদুøৎ প্রকল্প এই স্থানে প্রতিষ্ঠাকে কেউই ভালো চোখে দেখছে না। যদি প্রস্তাবিত তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আমরা কি অদূরভবিষ্যতে আমাদের প্রিয় সুন্দরবনকে হারাতে চাচ্ছি, নাকি দেশের অন্যত্র কোথাও এই প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎ প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠার মতো জায়গা নেই? দুর্ভাগ্য আমাদের বলতেই হবে, যে জায়গাটি সরকারের এবং সরকার নিয়োজিত দেশের বরেণ্য পরিবেশবিদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা সংশ্লিষ্ট চিন্তাবিদরা স্থান নির্ধারণ করেছেন, তাদের কি একবারও চোখে পড়েনি, এমন অসংখ্য হাজার হাজার একর জায়গা পড়ে আছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে। এ কারণে বাংলাদেশের হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক আদেশে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আদেশে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সন্নিকটে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র কেন বাতিল করা হবে না। একই সাথে ওই প্রস্তাবিত বিদুøৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

আমাদের প্রস্তাব ‘সুন্দরবন বাঁচাও, সুন্দরবন সাজাও’-এর বাস্তবিকতায় দেশ জাতির কল্যাণে তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হোক জেগে ওঠা বিশাল চরাঞ্চল বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকায় মাদারীপুর জেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর পাশে। মূলত কয়লা আমদানিনির্ভর এই প্রস্তাবিত প্রকল্প, এটা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য যে, বাংলাদেশের কয়লার খনি উত্তরবঙ্গে আর কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্রের প্রস্তাব করা হয়েছে দক্ষিণবঙ্গে। সুতরাং কয়লা আসবে ভারত থেকে আর শুধু খরচ বাঁচাতে সুন্দরবনের সর্বনাশ ডেকে আনা হচ্ছে­ এটাই কি সুন্দরবনের প্রতি আমাদের ভালোবাসা? সে যা-ই হোক, একজন দেশপ্রেমিকের চাওয়া পাওয়া হবে­ সুজলা বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎ প্রকল্প যদি করতে হয়, তা হলে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা দিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হোক কয়লা ইয়ার্ড, প্রতিষ্ঠিত হোক এখানে তাপবিদুøৎ প্রকল্পের অবকাঠামো। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে করতে হবে নদী খনন। ফলে মরে যাওয়া নদী ফিরে পাবে নাব্যতা, বন্যার কবল থেকে মুক্তি পাবে বৃহত্তর ফরিদপুরবাসী আর সমাধান হবে সীমাহীন বিদুøৎ সমস্যা। সেই সাথে বেঁচে যাবে আমাদের প্রিয় সুন্দরবন।

সুন্দরবন বিশ্ববাসীর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পৃথিবীর বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নান্দনিক পরিবেশের তুলনায় সুন্দরবনের তাপমাত্রা সুষম এবং বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ সুন্দরবন, সবুজে ঘেরা এ অপরূপ সুন্দরবনের গাছপালার বেশির ভাগই ম্যানগ্রোভ ধরনের সৌন্দর্য দেখতে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটছে এবং অদূরভবিষ্যতে ব্যাপক প্রসার ঘটবে নিঃসন্দেহে। যা বলার অপেক্ষা না।

আমরা বিশ্বাস করি বিদুøতের সীমাহীন চাহিদা রয়েছে, বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যার মধ্যে বিদুøৎ একটি। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান দিতে গিয়ে সুন্দরবনের মতো একটি অমিত সম্ভাবনার প্রতীককে তো ধ্বংস করতে দিতে পারি না। এটা যেন মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার মতো। অতি সম্প্রতি সম্ভবত এ কারণে ‘সেভ দ্য সুন্দরবন’ নামে একটি সংগঠন সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। যেখানে বলা হয়েছে, সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রস্তাবিত তাপবিদুøৎ কেন্দ্রকে না বলুন। কারণ প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবন বিশ্বের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, এ সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে এবং বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের এ সুন্দরবনকে সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে নিয়ে যেতে জোর ভোটিং চলছে বিশ্বজুড়ে। সুন্দরবন বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব আধার। সুন্দরবন মূলত উদ্ভিদ সম্পদের সমাহার।

উদ্ভিদ বা গাছপালা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে রয়েছে, যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য গাছপালা ও ফলফলাদিতে আল্লাহ্‌র নিদর্শন রয়েছে। গাছ লাগানো এমন একটা সাদকা-ই-জারিয়া যার ফজিলত বৃক্ষরোপকের মৃতুøর পরও অক্ষুণ্ন থাকে। নিজের প্রয়োজনে গাছ লাগালে তা-ও সৎকর্ম। গাছ সম্পর্কে বিশ্বের গুণীজনও বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন­ বুদ্ধ বলতেন, অরণ্য একটা অসামান্য জীব। অপরিসীম দয়া ও বদান্যতার আধার। প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই তার আনন্দ। নিজের জীবনধারণের জন্য সৃষ্ট উপাদানগুলোও সে বিলিয়ে দেয় অন্যের প্রয়োজনে। এমনকি যে কাঠুরে তাকে ধ্বংস করে, সেই কাঠুরেকেও ছায়া দিতে কার্পণ্য করে না। স্যার জগদীশ বসু-ই প্রথম মেটাল-ফ্যাটিগের ওপর গবেষণা করে লক্ষ করেন গাছেরও প্রাণ আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘সমস্ত জীবনের অগ্রগামী গাছ, সূর্যের দিকে জোড় হাত তুলে বলছে­ আমি থাকব, আমি বাঁচব, আমি চিরপথিক, মৃতুøর পর মৃতুøর মধ্যে দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশতীর্থে যাত্রা করব রৌদ্রে-বাদলে, দিনে-রাত্রে।’ বর্তমানে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, গাছেরা গান শুনতেও ভালোবাসে। আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, যে দেশের রোগ সে দেশের গাছগাছড়ায় তার নিরাময়। যে উদ্ভিদকে নিয়ে এত কথা, সেই উদ্ভিদরাজির ভাণ্ডার সুন্দরবনকে যেকোনোভাবেই বাঁচাতে হবে।


সবশেষে বলব, হাজার হাজার বছরের পরিপূর্ণতায় যে অনন্য সুন্দরবন তৈরি হয়েছে তা পরিবেশ বিনষ্টকারী কোনো কর্মকাণ্ড দিয়ে বিনষ্টের উদ্যোগ নেয়া যাবে না। ম্যানগ্রোভ বন অন্যান্য দেশে আছে, কম-বেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে (কলকাতায়) আছে। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ যেভাবে সুন্দরবনকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে আমাদেরও তাই করা অত্যাবশ্যক, বরং আরো বেশি যত্ন নিয়ে করা উচিত। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে যা করা হচ্ছে না, তা আমাদের সুন্দরবনেও করা সঠিক হবে না। বলতে হবে­ এক সুন্দরবন দুই রূপ নিতে পারে না। স্থানীয় জনসাধারণ তা চাইতে পারে না। মনে রাখতে হবে সুন্দরবন বাংলাদেশের নয়, এটা বিশ্ববাসীর। কোনো সুন্দরবনপ্রেমীরই এটা কোনো অবস্থায় ভালো লাগার কথা নয়। সুন্দরবনের এক অংশে হবে কয়লাভিক্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র আর অন্যত্র থাকবে নির্মল ঠাণ্ডা সমীরণ। সুতরাং ভোটের সাথে সাথে সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে।

তাই আমাদের স্পষ্ট বিশ্লেষণঃ ১. সুন্দরবনের সাথে সংলগ্ন করে তাপবিদুøৎ কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে কথাটি প্রচার হলে বা স্থাপনের কাজ শুরু হলে সুন্দরবনের পক্ষে ভোট দেয়ার হার কমে যাবে, এর ঐতিহ্যমূল্য কমে যাবে। ২. বর্তমানে স্যাটেলাইট ছবিতে স্পষ্টই দেখা যায় যে, ১০ বছর আগে ২০০০ সালে ভারতীয় সুন্দরবন ছিল ফাঁকা শূন্যস্থানে পূর্ণ, অথচ বর্তমানের ছবিতে দেখা যায় সেখানকার সুন্দরবন ঘন সবুজ অথচ বাংলাদেশ অংশে প্রচুর ফাঁকা স্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা আগে ঘন সবুজ বন ছিল। এটাই প্রমাণ করে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ কত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বনায়ন করা হয়েছে। অথচ আমরা এখন যৌথভাবে বাংলাদেশের সুন্দরবন ধ্বংসের খেলা শুরু করেছি। ৩. সুন্দরবনের পাশে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে দেখা যাবে কয়েক বছর পর সেখানে শুধু কয়লার ডিপো স্থাপন করা হচ্ছে, বিদুøৎ উৎপাদনের নামে হবে দেদার গাছ কাটা, বনে আগুন লাগানো, বাঘ, হরিণ, কুমির প্রভৃতি ধরা।

সুন্দরবনে ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে ১৯৬ জনের মৃত্যু

সুন্দরবনে ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে ১৯৬ জনের মৃত্যু


সুন্দরবনে গত ১০ বছরে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণে ১৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সুন্দরবনে মারা গেছে ২৬টি বাঘ। সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের সংরক্ষিত নথি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। জানা যায়, নিহত লোকজনের বেশির ভাগই বনজীবী, যারা বৈধ পাশ নিয়ে বনজ সম্পদ আহরণে বনে গিয়েছিল। এদিকে ১০ বছরে গ্রামবাসীর হাতে মারা গেছে ১২টি বাঘ।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে জানান, ২০০১ সাল থেকে চলতি বছরের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় বাঘের আক্রমণে একজন নারীসহ মোট ২৬ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ময়না মণ্ডল নামের মংলার জয়মনি এলাকার একজন গ্রামবাসী ছাড়া সবাই বনজীবী। নিহত লোকজনের মধ্যে ১৪ জনের বাড়ি বাগেরহাটের সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলায়, ছয়জনের মংলা উপজেলায়, একজনের রামপাল উপজেলায়, পাঁচজনের বাড়ি খুলনার দাকোপ ও পাইকগাছা এবং বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায়। একই সময়ে চারটি পৃথক ঘটনায় বাঘের আক্রমণে একজন বনকর্মীসহ নয়জন আহত হয়।

মিহির কুমার দো আরও জানান, একই সময়ে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে মোট ১২টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা গেছে। এর মধ্যে মংলা ও শরণখোলা উপজেলার লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় চারটি বাঘকে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বাভাবিক মৃত্যু হয় অন্তত দুটি বাঘের। একটি বাঘ মারা যায় ২০০৭ সালে সিডরের সময়। বাকি বাঘগুলো চোরা শিকারিদের হামলায় মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০০১ সাল থেকে ১০ বছরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় ১৬৮ জন বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছে। নিহত লোকজনের বেশির ভাগই বনজীবী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন নদী-খালে চিংড়ির রেণু আহরণকারী। সর্বশেষ গত শনিবার খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ স্টেশনের মঠবাড়ী এলাকায় আরমান গাজী (৪৫) নামের এক ব্যক্তি বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। তিনি জানান, একই সময়ে ওই এলাকায় মোট ১৪টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় মানুষের হাতে নিহত হয় আটটি বাঘ।

বনজীবীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সুন্দরবনে কুমিরের আক্রমণে অনেক মানুষ মারা গেলেও সুন্দরবন পূর্ব বা পশ্চিম বন বিভাগের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য না থাকায় কুমিরের আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে জানা যায়নি।

সূত্র: প্রথম আলো, ৬ই ডিসেম্বর ২০১০

সুন্দরবন হতে পারে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র

সুন্দরবন হতে পারে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র


সুন্দরবনের দৃশ্য নয়নাভিরাম অপরূপ এবং গুরুগম্ভীর। আর এ নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি ২৪ ঘণ্টায় বদলায় কমপক্ষে ৬ বার। সুন্দরবনের অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি ও বিভিন্ন শ্রেণীর পর্যটকদের সব সময় বিমোহিত করে। বন বিভাগের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত অর্থবছরে ৮০ হাজার ১০২ জন পর্যটক সুন্দরবনে আসেন। ইকো ট্যুরিজম থেকে বন বিভাগের গত অর্থবছরে আয় হয় ২৬ লাখ ২১ হাজার ৬০ টাকা। পর্যটক সংখ্যা ও এ খাতে আয় আরো বৃদ্ধি পাবে। সরকার উদ্যোগ নিলে আগামীতে সুন্দরবন হতে পারে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। সুন্দরবনের বিশেষ আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পশুর নদীর তীরে ৩০ হেক্টর জমির ওপর করমজল পর্যটন কেন্দ্র, চাঁদপাই রেঞ্জে মংলা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হারবারিয়া, সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মংলা বন্দর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে কটকা রেস্ট হাউস, সমুদ্র সৈকত সংবলিত কচিখালী, নীলকমল অভয়ারণ্য, মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রসিদ্ধ দুবলার চর, শিবসা নদীর তীরে ৪০০ বছরের পুরনো মন্দির আর ঐতিহাসিক শেখেরবাড়ী নিয়ে শেখেরটেক, মান্দারবাড়িয়া দুর্গম অভয়ারণ্য। এ ছাড়া হিরণ পয়েন্টে বন বিভাগ ও মংলা বন্দরের নিজস্ব পাইলট রেস্ট হাউস ও বাতিঘর দর্শনীয় স্থান।

করমজলঃ মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে সামান্য দূরে পশুর নদীর তীরে ৩০ হেক্টর জমির ওপর বন বিভাগের আকর্ষণীয় এক পর্যটনস্থল করমজল। করমজলকে বন বিভাগ সুন্দরবনের মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে আসেন। একদিনে সুন্দরবন ভ্রমণ এবং সুন্দরবন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান করমজল। এখানকার প্রধান প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে হরিণ, কুমির, বানর, কাঠের ট্রেইল, টাওয়ার, নৌকা চালনা, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। দেশে প্রাকৃতিকভাবে কুমির প্রজননের একমাত্র কেন্দ্র এখানে অবস্থিত।

হারবাড়িয়াঃ বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের অন্তর্গত পশুর নদীর তীরে মংলা বন্দর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হারবাড়িয়া নামক স্থানটি অবস্থিত। এখানকার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি যে কোনো পর্যটককেই বিমোহিত করে। এ স্থানটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে বন বিভাগ ইতিমধ্যে কাঠের তৈরি ২টি ট্রেইলসহ গোলঘর যার একটি পুকুর সংলগ্ন কাঠের তৈরি পুল ইত্যাদি গড়ে তোলা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক ও উন্নয়নমূলক আরো কিছু পদড়্গেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

কটকাঃ সুন্দরবনের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত কটকা সুন্দরবনের আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য। মংলা বন্দর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কটকা সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের প্রধান কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের জন্য বন বিভাগের একটি রেস্ট হাউস রয়েছে। লঞ্চ থেকে নেমে কাঠের জেটি দিয়ে কিছু দূর হাঁটলেই রেস্ট হাউস। তার সামনে সাগরের বিশাল জলরাশি। অন্য পাশে বনরাজি। পর্যটকদের আকর্ষণ করে সহজেই। কটকার আশপাশে রয়েছে অসংখ্য খাল। এসব খালে নৌকা নিয়ে ভ্রমণ খুবই মজাদার। খালগুলোর ২ পাশে রয়েছে বিভিন্ন বন্য প্রাণীর সদা আনাগোনা। কটকার জামতলা পর্যবেড়্গণ টাওয়ার থেকে দেখা যায় বন্য প্রাণীর অপূর্ব বিচরণ। কখনো কখনো টাওয়ার থেকে বাঘের দেখা পাওয়া যায়। রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঘের চলাফেরায় শিহরিত হন পর্যটকরা।

কচিখালীঃ মংলা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে কচিখালী। সমুদ্র সৈকতের প্রধান আকর্ষণ। কটকার জামতলা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে কচিখালী সমুদ্র সৈকত হয়ে বন বিভাগের কচিখালী স্টেশন পর্যন্ত হাঁটা পথ। এ পথের পাশে ঘন অরণ্যে বাঘ, হরিণ, শূকর, বিষধর সাপ ইত্যাদির এক ছমছম পরিবেশ যা দুঃসাহসী পর্যটকদের জন্য মনোমুগ্ধকর। এ সৈকতে প্রায়ই বাঘের অনাগোনা দেখা যায়। তাই পর্যটকদের ভ্রমণে বন বিভাগের সশস্ত্র রড়্গীদের সহায়তা নিতে হয়। এখানে বন বিভাগের একটি রেস্ট হাউস রয়েছে।

নীলকমলঃ মংলা বন্দর থেকে এটিও প্রায় ১০০ কিলোমিটার দড়্গিণে অবস্থিত। সুন্দরবন দক্ষিণ অভয়ারণ্যের এটি প্রশাসনিক কেন্দ্র। নীলকমলের অন্য নাম হিরণ পয়েন্ট। এ নামেই এটি বেশি পরিচিত। ১৯৯৭ সালে ঘোষিত ৫২২তম বিশ্ব ঐতিহ্যের ফলক এখানেই উন্মোচিত করা হয়। পর্যটকদের জন্য বন বিভাগ ও মংলা বন্দরের পৃথক রেস্ট হাউস এখানে রয়েছে।

দুবলার চরঃ সুন্দরবনের সর্ব দিক্ষড়্গিণে অবস্থিত দুবলার চর একটি দ্বীপ বিশেষ। মৎস্য আহরণ, মৎস্য শিকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য দুবলার চর বিশেষভাবে পরিচিত। এ জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জেলেরা এখানে অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করেন। প্রতি বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হিন্দুদের পুণ্যস্নান উপলক্ষে দুবলার চরে রাসমেলা বসে। রাসমেলায় হাজার হাজার দেশি-বিদেশি তীর্থযাত্রী ও পর্যটক দুবলার চরে আসেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এটি অবশ্য একটি ভয়ঙ্কর স্থান।

শেখেরটেকঃ শিবসা নদীর তীরে গহিন বনের ভেতর শেখেরটেক মন্দির। এক সময় এখানে জনপদ ছিল বলে জানা যায়। শেখের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ঘরবাড়ির চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। যদিও এর ইতিহাস বিষয়ে এখনো তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় এখানে বেশ সমৃদ্ধ একটি জনপদ এক সময় ছিল। সংস্কারের অভাবে মন্দিরটির ভগ্নদশা। গভীর বনের মাঝে মন্দির ও ভগ্ন স্থাপনা পর্যটকদের মাঝে কৌতূহলের সৃষ্টি করে।

মান্দারবাড়িয়াঃ সুন্দরবনের সর্ব দড়্গিণ কোণে সুন্দরবনের পশ্চিম অভয়ারণ্যে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর দুর্গম এ স্থানটি পর্যটনের পাশাপাশি গবেষণার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ঘন বনে অতি ক্ষুদ্রাকার প্রাণী থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, শূকর, কচ্ছপ, কুমির, সাপ, কাঁকড়া প্রভৃতি প্রাণী অবাধে বিচরণ করে। সুন্দরবনে সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায় মান্দারবাড়িয়ায়।

প্রতি বছর অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। ফলে রাজস্ব বাবদ সরকারের বেশ আয় হয়। বন বিভাগের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত অর্থবছরে ৮০ হাজার ১০২ জন পর্যটক সুন্দরবনে আসেন। ইকো ট্যুরিজম থেকে বন বিভাগের গত অর্থবছরে আয় হয় ২৬ লাখ ২১ হাজার ৬০ টাকা। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৯৬ হাজার ৭ জন পর্যটক আসেন এবং আয় হয় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ৮৬৮ টাকা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৯৪ হাজার ২১৪ জন পর্যটক সুন্দরবন দেখতে আসেন। আয় হয় ৩২ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮৮ টাকা।

সুন্দরবন ভ্রমণে আসা পর্যটকরা খুব সহজেই ট্রলার, ছোট লঞ্চ বা স্পিডবোটে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারেন। দেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

 

 

 

*********************************

%d bloggers like this: