প্রথম বাঙ্গালী নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

প্রথম বাঙ্গালী নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

১৮৬১ সাল বাঙালির ইতিহাসে নানা কারণে বিখ্যাত। এ বছর জন্মগ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।এ সময়েই লেখা হয় বাংলা সাহিত্যের একমাত্র স্বার্থক মহাকাব্য মাইকেল মধুসূদন রচিত মেঘনাদ বধ।আর ঐ বছরের ১৮ জুলাই জন্মগ্রহন করেন পাশ্চাত্য ধারার প্রথম বাঙালি নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার নারী শিক্ষাআন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সমর্থক ব্রজকিশোর বসুর কন্যা কাদম্বিনী।

ঐ সময় প্রাথমিক অবস্থায় পুরুষের মতো জ্ঞানঅর্জন ও অধ্যায়নের সুযোগ লাভকারী নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। তার মতো আরও যারা সুযোগ পেয়েছিলেন তারা হলেন আচার্য জগদীস চন্দ্রবসুর বোন স্বর্ণপ্রভা,দুর্গামোহন দাসের কন্যা সরলা দাস ও মোনমোহন ঘোষের বোন বিনোদমণি।নারী শিক্ষা আন্দোলনের ফলে ১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পান দুজন ছাত্রী। তারা হলেন সরলা দাস ও কাদম্বিনী বসু।তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন কি কারণে যেন সরলা দাস পরীক্ষা দিতে পারেন নি।শেষ পর্যন্ত কাদম্বিনী বসু পরীক্ষা অংশ নেন এবং দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রাস পাস করেন। ১৮৮৩ সালে কলকাতার বেথুন কলেজের ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী বসু বি এ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কৃতিত্বের সাথে বি এ ডিগ্রি লাব করেন। তখন তাকে বাংলার প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবে স্বিকৃতি দেয়া হয় । স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর কাদম্বিনী সিদ্বান্ত নেন মেডিকেলে পড়বেন। নারী শিক্ষার অতুৎসাহী সমর্থক পিতা ব্রজকিশোর বসু সানন্দে কন্যার সিদ্বান্তকে স্বাগত জানান। ১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী মেডিকেলে ভর্তি হলেন এবং ঐ বছরই তার বিয়ে হয়।

তিনি বিয়ে করেন মেডিকেল কলেজের স্বনাম খ্যাত শিক্ষক বিপত্নীক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে। বিয়ের সময় কাদম্বিনীর বয়স ছিলো ২১ আর দ্বারকানাথের ৩৯।দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়েছিলেন । বিয়ের পর স্বামীর অনুপ্রেরণায় কাদম্বিনী গাঙ্গুলী প্রবল উৎসাহ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন। তবে কলকাতার রক্ষণশীল মানুষেরা কাদম্বিনীর ডাক্তারী পড়াকে ভালো চোখে দেখেনি এবং তারা নানা রকম কুৎসা রটায়। রাত জেগে পড়া বা সংসারের কাজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে পড়া সবখানেই স্বামীর সপ্রশংস সহযোগিতা লাভ করেছেন কাদম্বিনী।

মেডিকেলের ছাত্রী হিসেবে সেসময় তিনি মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৮৮৬ সালে মেডিকেলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিলেন। লিখিত পরীক্ষার সব বিষয়ে পাস করলেন।কিন্তু ব্যবহারিক পরীক্ষার একটি অপরিহার্য অংশেঅকৃতকার্য হলেন। তারপরও কতৃপক্ষ তার দীর্ঘদিনের অধ্যায়ন ও নিষ্ঠার কথা বিবেচনা করে ১৮৮৬ সালে আকে গ্র্যাজুয়েট অব বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ ( জিবিএমসি ) ডিগ্রি দেন।এটি পাওয়ার পর তিনিই হন প্রথম ভারতীয় ডিগ্রিপ্রাপ্ত নারী চিকিৎসক। তিনি প্রথম বাঙালী নারী চিকিৎসক হিসেবে ১৮৮৮ সালে মাসিক তিনশ টাকা বেতনে যোগ দেন লেডি ডাফরিন মহিলা হাসপাতালে । ডাক্তারী পেশায় নির্দিষ্ট সময় থাকে না বলে না কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকেরোগীদের সাহায্যার্থে রাত দিনের যেকোনো সময় হাসপাতালে বা রোগীদের বাড়িতে যেতে হতো। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এ বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি।। তারা কাদম্বিনীর নামে নানা রকম নোংরা কথা রটিয়ে দেয়।১৮৯১ সালে সনাতনপন্থী সাময়িকী বঙ্গবাসী তাকে পরোভাবে বেশ্যা বলে অভিহিত করে। কাদম্বিনী গাঙ্গুলী বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক মহেশ পালের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। মামলায় কাদম্বিনী জয় লাভ করেন। মহেশ পালের ৬ মাসের কারাদন্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা হয়। কাদম্বিনী গাঙ্গুলী মামলায় জয়ী হওয়ার পর ১৮৯৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষার জন্য এডিনবার্গে যান।

সেখান থেকে সাফল্যজনক ভাবে শিক্ষা সমাপ্ত করে আবার দেশে ফিরে আসেন। আমৃত্যু তিনি চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করে গেছেন। কাদম্বিনী গাঙ্গুলী যেমন সফল চিকিৎসক তেমনি দায়িত্বশীল স্ত্রী ও স্বার্থক জননী ছিলেন। তাছাড়া সামাজিক জনসেবা,রাজনীতি,নারী শিক্ষার প্রসার,নারী অধিকার সংগ্রাম প্রভৃতি কার্যক্রমে রেখেছেন সক্রিয়ভূমিকা।
নারী শ্রমিকদের শোষণ-বঞ্চনার অবসানের জন্য তিনি গেছেন আসাম ও উড়িষ্যা। সেখানে জনমত সংগঠিত করেছেন। দক্ষিন আফ্র্রিকার ট্রান্সভালেন সত্যাগ্রহী শ্রমিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে কলকাতায় সমাবেশ করেন। চা-বাগানের নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন।

সমাজসেবক,রাজনীতিক ও প্রথম বাঙ্গালী নারী চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক মেয়ে মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করেন। তারা ও সফল চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।

Advertisements

বাংলা ভাষা ও আমাদের জাতীয়তাবোধ

বাংলা ভাষা ও আমাদের জাতীয়তাবোধ

১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের সময় আমি ছিলাম ছাত্র। ছাত্র ছিল এই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি। ভাষাসৈনিক বলতে যা বোঝায়, ব্যক্তিগতভাবে আমি ঠিক তার মধ্যে পড়ি না। তবে ছিলাম এই আন্দোলনের যথেষ্ট কাছে। আর তাই আমার মনে হয় সে প্রসঙ্গে কিছু বলার বিশেষ অধিকার আছে। আমি কিছু কথা বলতে পারি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। তখন পাকিস্তান হয়েছে মাত্র পাঁচ বছর হলো। পাকিস্তান হয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে। যে জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয় ব্রিটিশ ভারতের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। পাকিস্তান হওয়ার পর দেখা দেয় ভিন্ন পরিস্থিতি। তবে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন এই বিশেষ জাতীয়তাবাদকেই অস্বীকার করতে চাইনি। এই আন্দোলন হয়েছিল এই বিশেষ জাতীয়তাবাদের সাথে সঙ্গতি রেখেই।

আমরা আওয়াজ তুলেছিলাম, উর্দু-বাংলা ভাই ভাই, উর্দুর পাশে বাংলা চাই। আমরা যুক্তি দেখিয়েছিলাম কানাডা-বেলজিয়ামের মতো রাষ্ট্রের যদি প্রত্যেকের দু’টি করে রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে, তবে পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রেরও থাকতে পারে দু’টি রাষ্ট্রভাষা। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, জাতি গড়ে উঠতে হলে একটি রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজন। তিনি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন আমেরিকার কথা। আমেরিকায় বহু দেশ থেকে মানুষ গেছে কিন্তু ইংরেজিকে গ্রহণ করেছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে।

শিখেছে ইংরেজি ভাষা। আমরা এর উত্তরে বলেছিলাম, আমেরিকার লাগোয়া দেশ কানাডার রাষ্ট্রভাষা দু’টি, ইংরেজি ও ফারসি। কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কয়টি হবে সেটা নির্ভর করে সে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাস এক নয়। কানাডাতে হতে পেরেছে দু’টি রাষ্ট্রভাষা। অন্য দিকে ভাষা এক হলেই যে রাষ্ট্র এক হয় এমন নয়। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইংরেজি ভাষাভাষী, কিন্তু তা বলে তারা এক রাষ্ট্র নয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীন হতে উৎসাহ দিয়েছিল। আমার মনে পড়ে রাজশাহীতে ভাষা নিয়ে কোনো এক বিতর্ক সভায় আমরা এরকম বিতর্ক তুলেছিলাম ১৯৪৮ সালে। ভাষা আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু তা সে সময় নিতে পারেনি কোনো গণআন্দোলনের রূপ। ভাষা আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেই ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রমিছিলের ওপর গুলি চালানোর পর। এ সময় ইতিহাস নিয়ে অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। পুলিশ ছিল তদানীন্তন পূর্ববাংলা সরকারের অধীন। প্রাদেশিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমীন। এই গুলি চলার সাথে তখনকার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো যোগাযোগ ছিল না। পাকিস্তানে কোনো সামরিক স্বৈরশাসন ছিল না। নুরুল আমীনের প্রাদেশিক সরকারে ছিল না কোনো অনির্বাচিত সরকার।

১৯৪৬ সালে ইংরেজ আমলে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের ধারাবহ ছিল এই প্রাদেশিক সরকার। কিন্তু এখন অনেকেই ইতিহাস লিখেছেন এমনভাবে যে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছিল তদানীন্তন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সঙ্ঘাতের চিত্র। কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে এটাকে সত্য বলা যায় না। তখনো সাবেক পাকিস্তানে বাংলাভাষী মুসলিম জনসমাজ ভাবছিল না একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার কথা। তারা ভাবছিল পাকিস্তানের মধ্যে তাদের ভাষা- সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের কথা। ভাষা আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। পকিস্তান আমলেই ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেতে পারে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। আজ অনেকভাবেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আমরা জানি না ক’টা দেশে এই দিবস মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে নিশ্চয় একুশ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয় না। কারণ সে দেশে ভাষা সমস্যা একটা সমস্যা হয়েই আছে। ভারতে আসাম চাচ্ছে একটা ভাষাভিত্তিক পৃথক রাষ্ট্র থেকে, যা ভারতের অখণ্ডতার জন্য হয়ে উঠেছে হুমকি। যতগুলো কারণে ভারত সরকার চাচ্ছে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে আসামে যাওয়ার পথ তার একটা আশু কারণ হলো, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আসামে সেনা ও রণসম্ভার নিয়ে যেতে পারা। দমন করতে পারা আসামের স্বাধিকার আন্দোলনকে। আমরা ১৯৫২ সালে কোনো মাতৃভাষা আন্দোলন করিনি। আন্দোলন করেছিলাম বাংলাকে সাবেক পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। আমাদের সেই লক্ষ্য অর্জিত হতে পেরেছিল। আমাদের ভাষা আন্দোলন লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য পেয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের একটা পুরোপুরি ভুল ব্যাখ্যা দেয়ারই যেন চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনকে বলা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা, কিন্তু ভাষা আন্দোলনকে ঠিক এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। ১৯৫২ সালে যারা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মনে সে দিন ছিল না সাবেক পাকিস্তানকে ভেঙে দেয়ার ইচ্ছা। ’৫২ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ’৭১-এর রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অনেক ভিন্ন। এই দুই পরিস্থিতিকে এক করে বিচার করা বাস্তবতাসম্পন্ন নয়। কিন্তু আমরা সেটাই যেন করতে চাচ্ছি অনেকে। আমরা এখন প্রমাণ করতে চাচ্ছি, আমাদের জাতীয়তাবোধ সম্পূর্ণ ভাষাভিত্তিক। কিন্তু বাংলা যাদের মাতৃভাষা তাদের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ বাস করেন বর্তমান বাংলাদেশে। বাদবাকি ৪০ ভাগ বাস করেন ভারতে। কিন্তু ভারতের বাংলাভাষীরা কোনো ভাষা আন্দোলন করার প্রয়োজন দেখেননি। সংগঠিত হয়েছিল সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোরই মধ্যে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পাকিস্তানের ইতিহাসের সাথেই হয়ে থাকছে গ্রথিত।

ভারতে ভাষা নিয়ে কোনো আন্দোলন হয়নি তা নয়। ভাষা নিয়ে আন্দোলন করেছেন তামিলরা, বাংলাভাষীরা নয়। ইংরেজ আমলে ১৯৩৫ সালের অ্যাক্ট (ঞভপ বসংপড়ষশপষয় সফ ওষনমথ অধয়) অনুসারে ১৯৩৭ সালে হয়েছিল প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভারতের মাদ্রাজ প্রদেশে, তা এখন তামিলনাড়ু হিসেবে পরিচিত। ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস দল। কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে মাদ্রাজ প্রদেশের স্কুলে হিন্দি শিক্ষা করতে চায় বাধ্যতামূলক। তামিলরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। মাদ্রাজ শহর যার নাম এখন চেন্নাই। মিছিলের ওপর চলেছিল গুলি। গুলিতে মারা যান দুই ব্যক্তি। বন্ধ হয় মাদ্রাজের হিন্দি শেখানোর পরিকল্পনা। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে আন্দোলন করেছেন। কিন্তু বাংলাভাষীরা এ রকম কোনো আন্দোলন করার প্রয়োজন দেখেনি। ভারতের বাংলাভাষী আর আমাদের মনোভাব একসূত্রে গাঁথা নয়। আমরা ভাষা নিয়ে আন্দোলন করেছি। কিন্তু ভারতের বাঙালিরা তা করার প্রয়োজন দেখেননি। তারা হিন্দি শিখছেন আর বেঁচে থাকতে চাচ্ছেন ভারতীয় মহাজাতির অংশ হিসেবেই। আমাদের জাতীয়তাবোধ আর ভারতের জাতীয়তাবোধকে এক করে দেখার যে সচেষ্ট বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে তা খুবই বিভ্রান্তিকর। আমাদের জাতীয়তা বোধের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাষা। কিন্তু কখনোই তা একমাত্র নয়।

একেকটি জাতি গড়ে ওঠে এক একটি ইতিহাসের ধারায়। আমাদের জাতীয়তা বোধের মূলে থাকছে একটি ভিন্ন ইতিহাসের নানা ঘটনাপ্রবাহ। কারণ ভাষার বাস্তবতা দিয়ে ইতিহাসের সবটুকুকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। বিবেচনা করতে হয় আরো অনেক বাস্তবতাকে। সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ছিল ১৭০০ কিলোমিটারের ভৌগোলিক ব্যবধান। দুই অংশ ছিল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্নতা আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে করেছে বিশেষভাবেই প্রবাহিত।

সাবেক পাকিস্তানে বাংলাভাষী মানুষ ছিল সংখ্যাগুরু। তাই তাদের ভাষার দাবি ছিল খুবই ন্যায্য। পাকিস্তান হতে পেরেছিল বলে বাংলা ভাষার দাবিটা ওঠা সম্ভব হয়েছিল। না হলে উঠতে পারত বলে মনে হয় না। ইংরেজ আমলে যখন প্রশ্ন উঠত, ভাবি স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে তখন হিন্দুরা সাধারণত সমর্থন করতেন হিন্দিকে। হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মতামত দেন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) ১৯৪০ সালে নাগপুরে অনুষ্ঠিত হিন্দিসাহিত্য সম্মেলনে। ১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয় অলল ওষনমথ গৎঢ়লমশ All India Muslim Educational Conference (নিখিল ভারত মুলিম শিক্ষা সম্মেলন)। এই সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ফজলুল হক বলেন, হিন্দি নয় উর্দুই হতে হবে ভারতের Lingua franca (যোগাযোগের সাধারণ ভাষা)। রাষ্ট্রভাষা আর Lingua franca ঠিক সমর্থক নয়। কিন্তু ফজলুল হক সাহেব উর্দুকে বলেন Lingua franca করতে। তিনি উঠান না কোনো বাংলা ভাষার দাবি। যদিও বাংলা ভাষা সে সময় ভারতের যেকোনো ভাষা থেকে ছিল অনেক অগ্রসর। পাকিস্তান হওয়ার পর তাই বাংলা ভাষার দাবি যে উঠবে এটা কেউ আগে অনুমান করতে পারেননি। কিন্তু ১৯৪৮ সালেই উঠল বাংলাকে সাবেক পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কথা। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি কেন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলেন সেটা এখনো আমাদের অনেকের কাছেই সুস্পষ্ট হতে পারেনি।

জিন্নাহ ১৯৪৭ সালে শরৎ চন্দ্র বসু এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিলে যে পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পনা করেন তাতে দেন তার নীরব সমর্থন। এতে বলা হয়েছিলঃ ০১. বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, অন্য কোনো দেশের সাথে এই স্বাধীন দেশের কী সম্পর্ক হবে সেটা ঠিক করবে কেবল এ দেশেরই মানুষ; ০২. স্বাধীন বাংলাদেশের পার্লামেন্ট গঠিত হবে, সে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু পার্লামেন্টের সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট থাকবে। হিন্দু মুসলমানের জনসংখ্যার অনুপাতে; ০৩. স্বাধীন বাংলাদেশরই পার্লামেন্টের সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান অথবা অন্য কোনো দেশের সাথে যুক্ত হতে পারবে না। বাংলাদেশের মুসলিম লীগ বসু, সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনাকে পুরোপুরি সমর্থন করে। কিন্তু কংগ্রেস করে না। ভারতীয় কংগ্রেসও করে এর বিরোধিতা। গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল এই পরিকল্পনাকে চিহ্নিত করেন গ্রহণের সম্পূর্ণ অযোগ্য বলে। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ হতে পারে না।

যে জিন্নাহ, বসু, সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনাকে দিয়েছিলেন সমর্থন তিনি কেন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রসঙ্গটি এভাবে উঠালেন সেটা স্পষ্ট নয়। ইংরেজিকে যোগাযোগের ভাষা হিসেবে রাখলে ভাষা নিয়ে আন্দোলন সৃষ্টি হতো না। ভারত এখনো কার্যত ইংরেজিকেই রেখে চলেছে তার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যকার যোগাযোগের ভাষা, হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরও। ভবিষ্যতে ভারতেও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আন্দোলনের সম্ভাবনা থাকছে। ভারতের রাষ্ট্রভাষা সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। বিখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সন তার সম্পাদিত বিখ্যাত Linguistic Survey of India-তে বলেছেন, বাংলা, উড়িষা ও অহমিয়া (আসামি) এতই কাছের ভাষা যে, এদের জন্যই একটি সাধারণ ব্যাকরণ রচনা খুবই সহজ। গ্রিয়ার্সন বর্তমান বিহারের বোজপুরী, মাগধী ও মৈথুলী ভাষাকে একইভাবে বলেছেন বাংলা ভাষার খুব কাছাকাছি। কেবল ভাষাগত বাস্তবতাকেই নির্ভর করে যদি জাতীয়তাবাদের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটতে পারত, তবে বিস্তীর্ণ ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে একটি রাষ্ট্র না হলেও, ফেডারেশন গড়ে ওঠা সম্ভব হতো। এ রকমই আমরা অনুমান করতে পারি গ্রিয়ার্সনের জরিপে প্রদত্ত তথ্যাবলিকে নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তবে এ রকম ঘটেনি। বিহারের মানুষ ত্যাগ করেছে তাদের পূর্বপুরুষের ভাষা। শিখছে হিন্দি। হিন্দিই হয়ে উঠেছে বিহারের সাধারণ ভাষা। উড়িষ্যাতে চলেছে হিন্দি ভাষার চর্চা। পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীরা হিন্দি শিখছেন। বিহারের মতো একদিন পশ্চিমবঙ্গের ভাষাও হয়ে উঠতে পারে হিন্দি। কিন্তু আসামে ব্যতিক্রম হতে দেখা যাচ্ছে। অহমিয়ারা তাদের ভাষাকে নির্ভর করে চাচ্ছেন স্বাধীন আসাম রাষ্ট্র গড়তে। অহমিয়া বা আসামি, বাংলা ভাষার খুবই কাছের ভাষা। এই ভাষা লেখা হয় বাংলার মতো একই অক্ষরে। কেবল ‘র’ লেখা হয় ‘ব’ অক্ষরের পেট কেটে।

আসাম একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হলে, বাংলাদেশও আসামের মধ্যে ভাষাগত নৈকট্যের কারণে গড়ে উঠতে পারে একটা বিশেষ ধরনের মৈত্রী। ভারতের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছে বাংলাদেশ আসামের স্বাধীনতাবাদীদের মদদ দিচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এতই দুর্বল যে, এ রকম মদদ দেয়ার কোনো ক্ষমতাই সে রাখে না। আসামের স্বাধীনতাকামীরা অস্ত্র পাচ্ছে নিশ্চয় কোনো ভিন্ন উৎস থেকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আসামের স্বাধীনতা আন্দোলন বিশেষ গতিলাভ করেছে। এর কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদর্শ হিসেবে আসামকে জোগাচ্ছে অনুপ্রেরণা। এর মূলে বাংলাদেশ থেকে থাকছে না কোনো সাহায্য-সহযোগিতা। ভারত আসামের মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করছে সন্ত্রাসী হিসেবে। কিন্তু আমরা, বাংলাদেশের মানুষ আসামের স্বাধীনতাকামীদের চিহ্নিত করতে পারি না সন্ত্রাসী হিসেবে। প্রতিটি জাতি গড়ে উঠে ইতিহাসের ধারায়। আসামের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন তাদের নিজস্ব ইতিহাসসঞ্জাত। যেমন বাংলাদেশ স্বাধীনতা হতে পেরেছে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে। আসামেও সেরূপ ঘটা সম্ভব।

বাংলাদেশে এখন ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ সরকার। ক’দিন আগে বাংলা একাডেমীর বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ হলো একটি ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশ সরকার যেন চাচ্ছে না আসাম একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করুক। এ সরকার যেন চাচ্ছে ভারত সরকারকে সহযোগিতা করতে। আর সেই আসামের স্বাধীনতা সংগ্রামকেও বিনষ্ট করতে, যা আসামকে করে তুলতে পারে আমাদের ওপর বৈরী মনোভাবাপন্ন। ইংরেজ আমলে বহু লোক তখনকার বাংলার পূর্ব ও উত্তর অঞ্চল থেকে গিয়ে উপনিবেষ্ট হয়েছেন আসামে। এরা যেখানে গিয়ে বন কেটে গড়েছেন কৃষিক্ষেত্র, গড়েছেন সমৃদ্ধ জনপদ, উপনিবেষ্টদের সন্তান-সন্তানাদি হয়ে উঠেছেন অহমিয়া। কিন্তু বর্তমান সরকারের নীতি আদি অহমীয়দের বৈরী করে তুললে উপনিবেষ্টদের বাংলাদেশশের অধিবাসীর সন্তান-সন্তানাদির সাথে দেখা দিতে পারে সঙ্ঘাত। এই সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে এক বিরাট উদ্বাস্তু সমস্যা। বর্তমান সরকার ভারত সরকারের সাথে যে সহযোগিতা করতে যাচ্ছে, তাতে নিকট ভবিষ্যতেই দেখা দিতে পারে উদ্বেগজনক শরণার্থী সমস্যা। যে সমস্যা হবে আরাকান থেকে আসা রোহিঙ্গদের চেয়েও অনেক গভীর। ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে সাহায্যে করেছিল। ভারতের নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ টিকবে না। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠবে ভারতেরই অংশ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ভারতের অংশ হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদর্শ হিসেবে ভারতের অঙ্গরাজ্যকে অনুপ্রাণিত করতে পারে স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র সংগ্রামে।

সূত্র: ইন্টারনেট

স্বাগতম

আমার বাংলা ব্লগে আপনাকে স্বাগতম

সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও, তারপর পথ চল নিরবে।

আঁধারের ভাঁজ কেটে আসবে বিজয়, সূর্যের লগ্ন সে নিশ্চয়ঃ

Mamun Mollick

mamunsulay1

%d bloggers like this: