কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?

 

কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ্‌র অসংখ্য প্রশংসা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যাকে আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত নবী ও রাসূলদের সর্বশেষে প্রেরণ করে এ ধারা বন্ধ করে দিয়েছেন। এবং যার দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার ওয়াদা করেছেন, যার পরে কোন নবী আসেনি  এবং আসবেওনা যদিও মিথ্যুকরা এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে কম করেনি।

আল্লাহ ইসলামকেই একমাত্রমনোনিত দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করেছেন সুতরাং কারো থেকে অন্য কোন দ্বীনের অনুসারী হওয়া মেনে নেবেননা। আল্লাহ বলেন:

 অর্থ্যাৎ: আর যে ইসলাম ছাড়া অপর কোন দ্বীন চায়, তার থেকে তা কখনো গ্রহন করা হবেনা, বরং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে গণ্য হবে। (সূরা আল ইমরান ৮৫)

ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে:

প্রথম স্তর: ইসলাম (বাহ্যিক দিক) এর ৫টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে।

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লার প্রেরিত পুরুষ রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়া।

২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. যাকাত প্রদান করা।

৪. রমজানের রোজা রাখা।

৫. সক্ষম ব্যক্তির জন্য আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের হজ্জ করা।

দ্বিতীয় স্তর: ঈমান (অভ্যন্তরীন দিক) এর ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে:

১. আল্লাহর উপর ঈমান আনা।

২. ফেরেশতাদের উপর ঈমান।

৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের উপর ঈমান, কুরআনে কারীমে সকল কিতাবের কথাই  এসেছে।

৪. আল্লাহর রাসূল সমূহের উপর ঈমান আনা যার ধারা শেষ হয়েছে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ দ্বারা যিনি আরবী; হাশেমী গোত্র থেকে ছিলেন, জন্ম ও নবী হিসেবে মনোনিত হয়েছিলেন মক্কাতে হিজরত ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন মদীনা মুনাওয়ারায়।

৫. আখেরাতের উপর ঈমান আনা।

৬. তাকদীর বা ভাগ্যের উপর ঈমান আনা, এমনভাবে যে, ভাল-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।

তৃতীয় স্তর: ইহ্‌সান, যার অর্থ হলো: প্রত্যেক মুমিন মুসলিম এমনভাবে আল্লাহর উপাসনা করবে যেমন সে তাকে দেখছে, আর যদি তা সম্ভব না হয়ে উঠে, তবে এমনভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন।

তবে ইসলামের (বাহ্যিক অংশের) ভিত্তি ও চুড়া হলো, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সঠিক কোন উপাস্য নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই প্রেরিত রাসূল।

 এ শাহাদাত বা সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে:

আল্লাহ ছাড়া কোন  উপাসনার যোগ্য সঠিক উপাস্য বা মাবুদ নেই। এ সব জানা, বুঝা, বিশ্বাস করা এবং মনে প্রাণে আঁকড়ে ধরা; আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ তার বান্দা, সুতরাং তার ইবাদত বা উপাসনা না করা, তিনি তাঁর রাসূল হেতু তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা; তিনি যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছেন সেগুলিকে সত্য বলে জানা তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন সে গুলিকে অনুসরণ করা, যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করা; আর আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে তার কথার উপর নির্ভর করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত পন্থা ছাড়া অন্য কোন পন্থায় আল্লাহর ইবাদত না করা, আর সে অনুসারে আমল করা, এবং অপরের কাছে সেটা পৌঁছানো, জানানো, বিবৃত করণ এবং অপরকে নির্দেশ দেয়া, আর যতটুকু সম্ভব এ ব্যাপারে বাধ্য থাকা বা আনুগত্য করা।

তবে এই সাক্ষ্য ঐ পর্যন্ত যথার্থভাবে সম্পন্ন হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষ্যদাতা এর অর্থ অন্তনিহিত তথ্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত না হবে, সাথে সাথে তার সে জ্ঞান হতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত; যার সামনে সন্দেহ ও অজ্ঞতার কোন স্থান থাকবে না, তিরোহিত দূরিভূত করবে মিথ্যার ও অসত্যের বেড়াজাল।

অনুরূপভাবে এ সাক্ষ্য সম্পন্ন হওয়ার অন্য আরেকটি শর্ত হলো: সাক্ষ্যদাতাকে সম্পূর্ণ কায়োমনোবাক্যে খাঁটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অবিকৃতভাবে তা মেনে নিতে হবে, যাতে করে তার বিপরীত শিরক্‌ বা বিদ‘আত সেখানে স্থান না পায়।

শিরক হলো, ইবাদতের কোন অংশকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের দিকে নিবদ্ধ করা, আর বিদ‘আত হলো ইবাদত বা উপাসনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত এর বিপরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া।

সুতরাং যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে তাকে শিরক বিদ‘আত স্পর্শ করতে পারবে না।

এমনিভাবে এ সাক্ষ্য হতে হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ওপূর্ণ বশ্যতার ভিত্তিতে যার সামনে এর অন্তর্নিহিত ও অবশ্যাম্ভাবী বস্তুসমূহে অস্বীকার বিদ্রোহ, ও ঘৃনার নাম তা ব্যত্ত থাকবেনা। আর তা হলো, শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত এবং কেবলমাত্র তাঁর রাসূলেরই অনুসরণ। আর এ সাক্ষ্য হতে হবে সম্পূর্ণভাবে এ সাক্ষ্য দান ও সাক্ষ্যদানকারীদের মনে প্রাণে ভালবেসে; যাতে করে এ সাক্ষ্য যারা দেয় না অন্তরের অন্তস্থলে তাদের প্রতি অপছন্দভাব ফুটে উঠবে; যা মূলত শির্ক ও বিদ‘আতকেই অপছন্দ করা এবং শির্ককারী মুশরিক ও বিদ‘আতকারীদেরকে এমন অপছন্দ করতে হবে যেমন তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা সে অপছন্দ করে।

এ বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার নীতির উপর ভিত্তি করে আমার প্রিয় ভাই রফি উনলা বাছিরি “কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?” এ প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। যদিও মুসলিমগণ তাদেরকে আগেই অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তাদের কাছ থেকে এটা স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এক মিথ্যুক নবুওয়াতের দাবীদারের অনুসারী। কিন্তু তারা ইসলাম নামের ছত্রছায়ায় সারা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক স্থানে শক্তিশালী আস্তানা গেড়ে তার মাধ্যমে ইসলামের বিকৃত চিত্র মানুষের কাছে পেশ করছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সাবধান করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে মিথ্যাবাদীদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর বাণীতে যেভাবে ধিকৃত করা হয়েছে তা প্রচার ও প্রসার করা আজকের দিনে খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“তার চেয়ে কে বেশী অত্যাচারী যে আল্লাহর উপর মিথ্যার সম্পর্কে দেখায় অথবা বলে আমার কাছে ওহী (বাণী) এসেছে অথচ তার কাছে কিছুই আসেনি”। [1]

অনুরুপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে পর্যন্ত ত্রিশ জনের মত মিথ্যুক প্রতারক, যাদের সবাই মনে করবে তারা আল্লাহর রাসূল, তারা প্রকাশ না পাবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না।”[2] তিনি আরও বলেন: “আমি সমস্ত নবীদের ধারা সমাপ্তকারী, আর আমার মসজিদ হলো শ্রেষ্টত্বের দিক থেকে সর্বশেষ মসজিদ”। [3]

সূতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে নবুওয়াতের দাবী করবে সে মিথ্যুক। আর এই কাদিয়ানীরা যদিও তার নিজেদের মুসলিম মনে করে থাকে; বস্তুত তারা ইসলামের উপর জঘণ্য আঘাত হেনেছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে, নবুওয়াতের মূলে করেছে কুঠারাঘাত, যে প্রধান মূলনীতির উপর ইসলামের প্রতিষ্ঠা সেটা নষ্ট করেছে; আর তা হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল তারা এ প্রধান বিশ্বাসকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। আল্লাহ তাদের সাথে প্রাপ্য ব্যাবহারই করুন এবং তাদের ফেৎনা ও অনুরূপ প্রত্যেক প্রতারকের ফেৎনা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন।

দো‘আ করি যেন আল্লাহ এর লিখককে উত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।

وصلى الله على خاتم الأنبياء ورسله وعلى آله وأصحابه أجمعين.

 

সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল আবুদ[4]

১০/০৯/১৪১৩ হি:

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

الحمد لله وحده، وصلوات الله وسلامه على من لا نبي بعده، وبعد!

কাদিয়ানীদের বাহ্যিক চাকচিক্যময় কথা-বার্তায় অনেকেই প্রতারিত হয় এবং প্রশ্ন রাখে কাদিয়ানীদেরকে খারাপ বল কেন? তারা তো নিজেদেরকে মুসলিমই বলে থাকে।

এ উদ্ভূত প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের নিম্নের কয়েকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

ক. তাদের ইতিহাস

খ. তাদের আকিদা বিশ্বাস

গ. তাদের দৈনন্দিন সম্পাদিত কার্যাদি, অর্থাৎ আরকানে ইসলাম সম্পর্কে তাদের মতামত।

ক. তাদের ইতিহাস

প্রথমেই যেটা লক্ষ্যণীয় তা হলো: ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সাহায্যে মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এ দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যারা ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশের আনুগত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান বলে সনদ লাভ করে এবং ১৯০০ সাথে ভারতস্থ ব্রিটিশ শাসনের অধীন ধর্মীয় দল হিসাবে নিবন্ধিত হয়।

১৯০৮ সালে যখন গোলাম আহমদ কাদিয়ানী মারা যায়, তখন থেকেই তাদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাপারে মত-পার্থক্য দেখা দিতে থাকে। ১৯১৪ সালে তা প্রকটরূপ লাভ করে, যার পরিনতিতে তারা দু’টি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

ক. কাদিয়ানী: যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তনয় মীর্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন.

খ. লাহোরী: যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নবুওয়াতের দাবীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক মৌলবী মুহাম্মাদ আলীর নেতৃত্বাধীন।

তাদের এ দু’টি উপদল ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের মাটিতে কাজ করছে,  তবে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান কর্তৃক তাদেরকে অমুসলিম সংখ্যালঘু বলে ঘোষিত হয়। ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে তাদের কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। ফলে তাদের বর্তমান নেতা: মীর্যা তাহের আহমাদ (গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর পৌত্র) পাকিস্তান থেকে পালিয়ে নিয়ে লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছে।

 এ দিকে তাদের লাহোরী গ্রুপ পাঞ্জাবের দারুস্‌সালাম পল্লীতে তাদের আস্তানা গাড়ে, তবে তাদের প্রচার ও প্রসার অপরটির তুলনায় বেশী নয়।

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক হলো যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটিগুলো, (যেমন শিকাগো ইসলামিক ইউনিভার্সিটি যা তাদের প্রতিষ্ঠিত), বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ছাত্র গ্রহণ করে এবং তাদেরকে ব্রেন ওয়াশ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার সুযোগ সুবিধা দ্বারা আকৃষ্ট করার ও ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

 

খ. তাদের আক্বীদা ও বিশ্বাস

১. আল্লাহর উপর ঈমান সম্পর্কে:

মুসলিম মাত্রই এটা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা‘আলার উপর বিশ্বাস তিন দিক থেকে হতে হয়:

এক: সমস্ত সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি করা, পালন করা, আইন দান, মৃত্যু ও জীবন দান এগুলো একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই বিশেষত্ব।

দুই: অনুরূপভাবে যিনি সৃষ্টি করেন, লালন করেন, জন্ম মৃত্যু প্রদান করেন জীবন বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন শুধু সে আল্লাহই যাবতীয় ইবাদত বা উপাসনার একমাত্র হক্কদার, অন্য কেউ এতে অংশীদার নয়। সুতরাং দো‘আ,  মান্নত, কুরবানী, বিপদমুক্তি, সাহায্য ইত্যাদি তথা সর্বপ্রকার ইবাদতে একমাত্র তাঁকেই উদ্দেশ্য করতে হবে।

তিন: আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল কতৃক আল্লাহর জন্য নির্দিষ্টকৃত নাম ও গুণাগুণকে কোন প্রকার পরিবর্তন ও বিকৃত না করে তাঁর উপযোগী যেভাবে হবে সেভাবে তার জন্য তা সাব্যস্ত করা।

কিন্তু যদি কাদিয়ানীদের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে তারা এ তিনটি বিশ্বাসেই মুসলিমদের আক্কীদা-বিশ্বাসের বিরোধিতা করছে। যেমন:

মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ‘শিরক ফির রাবুবিয়াত’ বা আল্লাহ তা‘আলার সাথে নিজেকেও সবকিছুর স্রষ্টা ও মালিক বলে দাবী করেছে। এ ব্যাপারে তার মতামত হলো: সে এ মর্মে ওহী বা বাণী পেয়েছে যে, তাকে বলা হচ্ছে:

“আমার যেমন আকাশ ও ভুমণ্ডলের মালিকানা রয়েছে তেমনি তা তোমারও।”[5]

এ কথা ঠিক রাখতেই সে তার উর্দু ‘তাওদীহুল মারাম[6] বইয়ে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক  অক্টোপাস[7] এর সাথে তুলনা করেছে।

অনুরূপভাবে ইবাদত যে, শুধুমাত্র আল্লাহকেই করতে হবে তাতেও সে দ্বিমত পোষণ করেছে, বরং আল্লাহর সাথে তারও ইবাদত করার জন্য সে লোকদের আহবান করেছে’ যেমন:  তার দাবী অনুযায়ী তার কাছে এই মর্মে বাণী এসেছে (!) যে:

“তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হলো, তুমি আমার সাথে একীভূত, একই সূত্রে গ্রথিত…… আল্লাহ তোমার পবিত্রতা জপ করছে ….. আর যে কেউ আল্লাহর প্রকাশ্য রূপের[8] সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তার কাছে কোন মঙ্গল নেই।”[9]

আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণবাহী কুরআন-হাদীস কর্তৃক প্রমাণিত আল্লাহর নাম ও গুনাবলীসমূহ সম্পর্কে তার মতামত আরো জঘন্য। সে আল্লাহকে এমন কতেক নাম ও গুণে বিভূষিত করেছে যা কক্ষনো আল্লাহর (স্রষ্টার) শান এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। বরং তা কেবল বান্দার (সৃষ্টিজগতের) গুণই হতে পারে; যেমন সে বলছে “আল্লাহ …. তরবারী নির্মাতা।”[10]

আরও বলছে: “আমার রব চৌকিদারের মত আমার সামনে সামনে হাঁটে।”[11]

উপরন্তু সে সর্বেশ্বরবাদ (وحدة الوجود-Pantheism) বা জগতের সবকিছু এক, তথা সৃষ্টি জগত এবং স্রষ্টা একই বস্তুর দুইদিক, এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রবক্তা। তাই সে তার আরবী গ্রন্থ (الاستفتاء) তে তার দাবী মোতাবেক আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় আল্লাহ তা‘আলা নাকি তাকে বলছে (!) “তুমি আমার থেকে, আর আমি তোমার থেকে।”[12]

 অন্য এক স্থানে আল্লাহকে তার মহৎ গুণাগুণের বিপরীত গুণে ভূষিত করেছে। যেমন: তার দাবী অনুসারে আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সময় তার কাছে নাকি এ মর্মে বাণী এসেছে যে,  “তোমার সাথে আমার সম্পর্ক পিতা পুত্রের সম্পর্ক, তুমি আমার পুত্রতুল্য।”[13]

এতেই শেষ নয় বরং অন্য স্থানে বলছে তার কাছে নাকি ওহী এসেছে এই বলে যে,  “হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পারি নি।”[14]

 এ হলো তাওহীদ বা একত্ববাদ  সম্পর্কে কাদিয়ানীদের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত বিশ্বাস।

প্রত্যেক মুসলিমকেই তাদের এ বিশ্বাস সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী হতে হবে। যাতে তারা কাদিয়ানীদের প্রকাশ্য কথা-বার্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধোকা না খায়; কারণ তারা প্রকাশ্যে শিরক থেকে মুক্ত থাকার অঙ্গিকার করে থাকে, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা নবুওয়াতের দাবীদারের সব গ্রন্থই শির্কে পরিপূর্ণ।

২. ফেরেশতার উপর ঈমান সম্পর্কে:

ফেরেশতা জগত সম্পর্কে ভণ্ড নবুওয়াতের দাবীদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর আক্বীদা ও বিশ্বাস হলো ফেরেশতা ও আল্লাহ একই বস্তু। তাই সে তার আরবী গ্রন্থ (حمامة البشرى) তে ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলছে: “এদেরকে আল্লাহ তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ রূপে তৈরী করেছেন”[15]

এর থেকে বুঝলাম যে, সে ফেরেশতাদের অস্তিত্বই মানে না, বরং ফেরেশতা বলতে, আল্লাহর অঙ্গপ্রত্যঙ্গই বুঝে।

মোটকথা: মুসলিমদের অবশ্যই তাদের এই বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে হবে; আর জ্ঞানীদের জন্য ইঙ্গিতই যথেষ্ট।

৩. ঐশী গ্রন্থ সমুহের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

ভণ্ড কাদিয়ানী তার আরবী গ্রন্থ (الاستفتاء) তে বলছে, “আল্লাহ …. আমার সাথে কথা বলেছেন যেমন তার রাসূলদের সাথে বলেছেন। …. আর আমি এই কালেমাসমূহের সত্যতার বিশ্বাস রাখি যেমন আল্লাহর অন্যান্য কিতাবের উপর রাখি” পৃষ্টা নং : ২২, ৮৬।

ফলে সে তার স্বহস্তে লিখিত বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন প্রবন্ধের সমষ্টি (تذكرة الوحي المقدس) বা ‘ঐশী বাণী স্মারক’ নামে যার নামকরণ করেছিল; সেটাকে আল্লাহর কাছ থেকে যথাযথ অবতীর্ণ অন্যান্য কিতাবাদীর সাথে তুলনা করেছে।

এটা প্রমাণ করতে গিয়ে তার অনুসারীরা সূরা আল-বাকারার আয়াত:

﴿وَٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ وَبِٱلۡأٓخِرَةِ هُمۡ يُوقِنُونَ ٤﴾ [البقرة: 4]

এর মধ্যকার (ٱلۡأٓخِرَةِ) শব্দের বিকৃত অর্থ (Distortion) করে বুঝতে চায় যে, (আখেরাত)[16] দ্বারা কাদিয়ানীর নবুওয়াতের কথা বুঝানো হয়েছে; অবশ্য তারা কুরআন হাদীসের অর্থ বিকৃত করার কায়দা কানুন তাদের পুর্বসূরী কাদিয়ানীর কাছ থেকেই নিয়েছে। ফলে যদি তার স্বহস্তে লিখা বিভিন্ন ভাষায় রচিত রচনাবলীকে ঐশী বাণী বলতে হয়, তবে কুরআনকেও বলতে হয় যে, মানুষের রচনা বা মানবের লিখা।[17] আল্লাহর কালাম নয়। (নাউযুবিল্লাহ)

৪. রাসূলদের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

মুসলিমদের বিশ্বাস হলো যে, নবীগণ পবিত্র নসল ও নসব থেকে নির্বাচিত হতে হয়ে থাকেন, সুতরাং তাদের নসব এ কোন প্রকার ব্যাভিচারের নাম গন্ধও নেই কিন্তু গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতে নবীদের আসল নসব পবিত্র হতে হবে এমন কোন কথা নেই, বরং সে তার উর্দু বই (কিসতিয়ে নুহ) তে মরিয়াম (আ) সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলছে, (সে তার গর্ভসহ বিবাহ বসতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তার স্বজাতীয় মুরব্বীরা তাকে বিবাহের জন্য পীড়াপীড়ি করছিল)[18]

তারপর তার নবুওয়াতের দাবীর দ্বিতীয় পর্যাযে সে যখন নিজকে ঈসা (আ) এর অনুরূপ বা স্বদৃশ্য (Analogous) বলে বর্ণনা করত, তখন বলত “ঈশার সদৃশ ব্যক্তি ঈশা থেকেও উত্তম”[19]

অতপর তার জীবনের তৃতীয় স্তরে যখন সে পূর্ণ নবুওয়াত দাবী করলো তখন সে স্পষ্টাক্ষরে নিজের নবুওয়াতের কথা বলতে নিরস্ত থেকে প্রথমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শানে না‘ত কসীদা লিখতে আরম্ভ করল, এ সমস্ত কসিদায় সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসায় সীমালঙ্গন করতে লাগল। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুই নাম ছিল, (মুহাম্মাদ, আহমাদ) সেহেতু সে এসব কসীদায় দ্বিতীয় নামটির ব্যবহার বেশী করে করতে লাগল; তবে এসব কিছুতে ধাঁধাঁ ও প্রহেলিকা এমন ব্যাপকহারে ব্যাবহার করতো যে, সে কি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রশংসা করছে নাকি আহমদ (নিজ নাম এর শেষাংশ) এর প্রশংসা করছে তা অনেকেই বুঝতে পারত না।

অতপর সে  সরাসরি আহমাদ দ্বারা নিজকে বুঝাবার এক চমৎকার পন্থা আবিস্কার করলো, এবং বললো “আমার এ জুব্বায় (পোষাকে) আল্লাহর নুর ছাড়া আর কিছুই নেই, আসহাবে সুফফা তোমার উপর দরুদ পাঠ করছে, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে মহীয়ানরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু আহমাদ সে আত্ম প্রকাশ করেছে, সম্মোহনীরূপ নিয়ে”[20]

অনুরূপভাবে ধাঁধাঁর ব্যবহার সম্পন্ন হওয়ার পর এক সময় সরাসরি নবুওয়াতের দাবী করে বললো: “আমি যা কিছুই বলেছি, সেটা আমার রব এর পক্ষ থেকে যে আমার নিত্য সঙ্গী”[21]

 তার অনুসারীরা তার নবুওয়াতের দাবীকে চাঙ্গা করতে সূরা আল-জুমু‘আ এর আয়াত (২-৩)

﴿هُوَ ٱلَّذِي بَعَثَ فِي ٱلۡأُمِّيِّ‍ۧنَ رَسُولٗا مِّنۡهُمۡ يَتۡلُواْ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتِهِۦ وَيُزَكِّيهِمۡ وَيُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَإِن كَانُواْ مِن قَبۡلُ لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٖ ٢ وَءَاخَرِينَ مِنۡهُمۡ لَمَّا يَلۡحَقُواْ بِهِمۡۚ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ٣﴾ْ [الجمعة: 2-3]

এর অনুবাদ করতে যেয়ে সম্পূর্ণ বিকৃত ভাবে (وَءَاخَرِينَ مِنۡهُمۡ لَمَّا يَلۡحَقُواْ بِهِمۡۚ) এর অনুবাদে এ কথা ঢোকালো যে, এর অর্থ হলো (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার গোলাম আহমাদ এর রূপ নিয়ে আবার দুনিয়ায় আসবে।[22] এর চেয়ে বড় কুফরী আর কি হতে পারে?

যেখানে সে নিজকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্ণজম্মের রূপ বলে দাবী করছে? [23]

মুসলিমরা এ ব্যাপারে যতটুকু সাবধান হয়েছে?

এ পুনর্জন্মবাদের এ বিশ্বাস হিন্দুদের থেকে ধার করা বুলি মাত্র।

৫. আখেরাতের উপর ঈমান সম্পর্কে:

প্রত্যেক মুসলিমই এটা বিশ্বাস করে যে, পরকাল আছে; যেখানে পাপ পূণ্যের বিচার হবে এবং প্রত্যেকের কাজ অনুযায়ী সে প্রতিফল ভোগ করবে, কিন্তু গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষন করে, সে ১৮৯৩ সর্বপ্রথম ১৩১১ হি মোতাবেক কেয়ামতের যে সমস্ত আলামত রয়েছে:

১. সেগুলোকে অস্বীকার করে। যেমন তার আরবী বই (حمامة البشرى) তে সূরা আ‘রাফ এর ১৮৭ নং আয়াত[24]

﴿يَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلسَّاعَةِ أَيَّانَ مُرۡسَىٰهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ رَبِّيۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقۡتِهَآ إِلَّا هُوَۚ ثَقُلَتۡ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَا تَأۡتِيكُمۡ إِلَّا بَغۡتَةٗۗ يَسۡ‍َٔلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنۡهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ ٱللَّهِ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ١٨٧﴾ [سورة الأعراف: 187]

এর ব্যাখ্যা বিকৃত করতে গিয়ে শব্দটিকে (بَغۡتَةٗۗ) হিসাবে লিখে:[25] আয়াতের ভুল ব্যাখ্যায় গিয়ে বলে যে, (بغطة) শব্দটি দ্বারা প্রকাশ্যভাবে বুঝায় যে, কিয়ামতের যে সমস্ত আকাট্য প্রমাণ বা প্রকাশিত হবে বলে বলা হয়, তা কখনো অনুষ্ঠিত হবে না।[26]

এতো গেল তার প্রথম প্রদক্ষেপ, দ্বিতীয় স্তরে এসে ১৩১৮ হিজরী মোতাবেক ১৯০১ সালে সে সরাসরি পরকাল অস্বীকার করার জন্য প্রথমে শব্দের নম্বর হিসাব করে গানিতীয় কায়দায় বললো “আজকের দিনে কাল তার সর্বশেষ গুর্ণায়নে পৌঁছেছে, সূরা ফাতেহায় বর্ণিত ইহকাল এর নির্ধারিত সময় সাত হাজার চন্দ্র বছর এবং সূর্য্য বছর শেষ হতে চলেছে”[27]

 এ কথার ব্যাখ্যায় তার ছেলে মাহমুদ বলে: “পরকাল মৃত্যুর পরেই শুরু হয়ে থাকে, মৃত্যু সময় থেকে পৃথক করে হাজার বছর পরে নির্দিষ্ট সময়ে পরকাল বলতে কিছু নেই”[28]

মোট কথা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী যখন দাবী করল যে, সেই হলো প্রতিশ্রুত মসীহ,[29] তখন থেকেই সে তার এ দাবীর সমর্থনে বলতে আরম্ভ করল যে, তার আবির্ভাবের পরবর্তী সময়টাই হলো কিয়ামত, আর এ ব্যাপারে তার যুক্তি হলো যে, প্রতিটি শব্দের গোপন একটা নম্বর রয়েছে। সেই শুধুমাত্র তা জানে আর সে অনুসারে হিসাব নিকাশ করে সে সিদ্ধান্ত নিয়াছে যে, ইহকালীন বয়স যত হবার কথা তা শেষ হয়ে গেছে তার আবির্ভাবের সাথে সাথেই; সুতরাং তার আবির্ভাবের পরবর্তী জীবনটাকে পরকালীন জীবন হিসাবে মানতে হবে। এভাবেই সে তার সমস্ত প্রচেষ্টা ইয়াহূদী নাসারাদের কিয়ামত সম্পর্কিত বিশ্বাস এর সাথে সম্পৃক্ত করতে চাইলো, কিন্তু যখন তার মারা যাওয়ার পরও দুনিয়ার অস্তিত্ব রয়ে গেল, তখন তার অনুসারীরা সেই বিশ্বাসটাকে নতুন করে সাজাবার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু হায়! তার সমস্ত পুস্তকাদী এব্যাপারে এত স্পষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণবহ যে সেটা কোন ব্যাখ্যাই গ্রহণ করছে না।

৬. তাকদীর বা ভাগ্যের উপর ঈমান আনা সম্পর্কে:

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী  অন্যান্য পাচঁটি রুকন এর মত এখানেও ভ্রষ্ট  হয়েছে।

এ ব্যাপারে সে তার আরবী বই (الاستفتاء) তে বলছে যে, আল্লাহ নাকি তাকে প্রেমের ভান বা ছিনালি করে বলছে “হে আল্লাহর নবী! আমি তোমাকে চিনতে পেরেছিলাম না”[30] [না‘উযুবিল্লাহ]

 এতে করে সে বুঝাতে চাইলো যে, আল্লাহ তার সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, এ জন্যই অনেক দেরীতে তাকে নবুওয়াতের খবর দিয়েছে। [না‘উযুবিল্লাহ]

এ সব দাবীর পিছনে যে রহস্যটা কাজ করেছে সেটা হলো, সে যে বারবার তার অবস্থান পরিবর্তন করত; সেটাকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা; কারণ সে কখনো নিজেকে বলতো প্রতিশ্রুত মসীহ, আবার কখনো বলতো: মাহদী, আবার ক্ষনিক পরেই বলতো, সে হলো মুজাদ্দিদ বা ধর্ম সংস্কারক, আবার কখনো বলতো, সে হলো নবী: আবার কখনো দাবী করতো যে, সে সমস্ত ধর্মের সংশোধনকারী।

সে যখন দেখলো যে, তার বিভিন্ন অবস্থান লোকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করবে, তখন দাবী করলো যে,  আল্লাহ তাকে প্রথমে চিনতে ভুল করেছিল। [না‘উযুবিল্লাহ]

অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী বইতেই সে বলছে যে, আল্লাহ তাকে বলছে “কোন কিছু করার ইচ্ছা করলে তখন তোমার শুধুমাত্র হও বলতে হবে, তাতেই তা হয়ে যাবে”[31]

 সে এটাকে তার গ্রহনীয় প্রার্থনা হিসাবে বর্ণনা করে তার আরবী বই তে বলছে “কখনো কখনো আল্লাহ তার অমোঘ ইচ্ছাকে ত্যাগ করে তার বান্দার প্রার্থনা শুনেন”[32]

যাতে বুঝা গেল যে, তার মতে আল্লাহর অমোঘ ইচ্ছা পরিবর্তনশীল, সুতরাং সে তাকদীরের উপর ঈমান রাখার প্রয়োজন মনে করে না।

আমরা যদি তার এ বিশ্বাসের মূল খুজতে যাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সে এ কথাগুলো মথি লিখিত সু সমাচার থেকে গ্রহণ করেছে, কারণ সেখানে ঈসা (আ) এর দিকে সম্পর্কিত করে বলা হয়েছে, তিনি নাকি তার সাথী পিটারকে বলেছেন “তুমি ধরাপৃষ্ঠে যা কিছু করবে তাই উর্ধ্বাকাশে গৃহিত হবে, আর ভূপৃষ্ঠে যাই সংগঠিত হবে,  উর্ধ্বাকাশেও তাই ঘটবে)[33]

সুতরাং যদি তার শিক্ষা ইসলামী ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী না হয়ে অন্যান্য বিভিন্ন মতবাদ থেকে নেয়া হয়ে থাকে বা মন গড়া কিছু কার্যকলাপকে ধর্মের রূপে রূপায়িত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তা হলে কিভাবে বলা যাবে যে, তার অনুসারীদেরকে মুসলিমরা অনাহুত নিন্দা করে? আর কিভাবেই বা তাদেরকে আমরা মুসলিম বলবো? সুতরাং তারা যেখানেই থাকুক অবশ্যই নিন্দনীয় ও ধিকৃত।

গ. তাদের রীতি নীতি

১. কালেমায়ে শাহাদাত (لا إله إلا الله محمد رسول الله) সম্পর্কে তাদের মতামত:

আগেই বলেছি ইবাদতের ক্ষেত্রে কাদিয়ানী নিজকে আল্লাহর সাথে ইবাদতের জন্য আহবান করেছে এবং নিজকে আল্লাহর প্রকাশ্য রূপ বলে দাবী করেছে।[34]

 অনুরূপভাবে অন্যস্থানে বলছে যে, “আল্লাহ নবীদের সাজে সজ্জিত হয়ে জগতে আগমন করেছেন” অর্থাৎ নবীরা পূজনীয় হবার ক্ষমতা রাখেন, অন্যস্থানে নিজকে মূসা (আ) এর সাথে তুলনা করে বলছে তার কাছে যে ওহী এসেছে তাতে আছে “তুমি উম্মতে মুহাম্মাদীয়ার জন্য মূসার মত”[35]

অর্থাৎ মূসা যেমন নতুন শরীয়ত নিয়ে এসেছিল তুমি তেমনি নতুন শরীয়ত নিয়ে প্রেরিত অনুরূপভাবে তুমি অন্যান্য নবীদের মত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

উপরোক্ত কথা দ্বারা ভণ্ড নবুওয়াতের দাবীদার নিজকে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য বলে সাব্যস্ত করছে। অপরদিকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবর্তে তাকেই সমীহ ও সম্মানের অধিকারী মনে করার জন্য তার অনুসারীদের চেষ্টার কারণও উদঘাটিত হয়েছে।

এ জন্যই সে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুটো রূপ সাব্যস্ত করেছে, প্রথমরূপে আরবীয় মুহাম্মাদ আর দ্বিতীয় রূপে; অনারব আহমদ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, আর এটা প্রমান করার জন্য সে বাস্তবকে অস্বীকার করতেই এমন অসার তর্কে যেতেও দ্বিধা করে নি।

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, কাদিয়ানীরা (لا إله إلا الله) (আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই) এটাকেই অস্বীকার করছে; (محمد رسول الله) বা মুহাম্মাদ আল্লাহর বাসূল বা প্রেরিত পুরুষ, এটার সাক্ষ্য তাদের কাছে পাওয়া তো অনেক দূরের কথা। ফলে তারা ইবাদতের জন্য যেমন গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ব্যক্তিত্বকে; তেমনি নবুওয়াতের জন্যও তারই সত্বাকে কল্পনা করবে এটাই স্বাভাবিক।

২. নামাজ কায়েম করা সম্পর্কে তাদের মতামত:

ইসলামের এ বিশেষ নিদর্শনের ব্যাপারে গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যে সব প্রকাশ্য বিরোধিতায় লিপ্ত তা হলো:

 # তার মতে যারা মসজিদে থাকবে তাদের জন্য মুয়াজ্জিনের আজানের জওয়াব দেয়া মুস্তাহাব নয়।[36]

# আরবী জানা সত্বেও যে কোন ভাষায় নামাজ পড়লেই শুদ্ধ হবে।[37]

# মাহিলাদের উপর জুমা ওয়াজিব, জুমা ওয়াজিব হওয়ার জন্য দুইজন লোকই যথেষ্ঠ; এমনকি কোন লোক তার স্ত্রী ব্যতীত কাউকে না পেলে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে জুমা পড়া তার উপর ওয়াজিব।[38]

অনুরূপভাবে সে সুফীবাদে বিখ্যাত নিরবিচ্ছিন্ন অনবরত চল্লিশ দিনের নির্জন বাস বা বদ্ধ ঘরে একাকীত্বে থাকাকে মনে প্রাণে সমর্থন দেয়, এবং এটাকে বিরাট পূণ্যের কাজ বলে মনে করে”[39]

যদিও সে পরকালে বিশ্বাস করে না তবুও মানুষকে ধোকা দেবার নিমিত্তে সে তার বই (الوصية) তে তার অনুসারী যারা বেহেস্তি কবরস্থান (যা ‘কাদিয়ান’ নামক স্থানে অবস্থিত) সেখানে দাফন হবে তাদেরকে বেহেস্তের ওয়াদা প্রদান করেছে।[40]

সুতরাং গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যদি তার অনুসারীদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পথের বাইরে নতুন নতুন নিয়ম কানুন জারী করে, তা হলে তাদেরকে নিন্দা করা কি প্রত্যেক মুমিনের জন্য ওয়াজিব নয়?  তাদের প্রকাশ্যরূপে মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয় সে ব্যাপারে লোকদেরকে সাবধান করা কি জরুরী নয়?

 প্রশ্ন হতে পারে : তারা তো, আমাদের মতই নামাজে হাত বেধে দাঁড়ায়, নিবিষ্ট মন নিয়ে নামাজ পড়ে। এমনকি সিজদায় যাবার সময় আগে হাত রেখে তারপর দুই হাটু স্থপন করে থাকেন।[41] আপনি বি বলতে চান তারা এটা তাদের মোনাফেকী?

 উত্তরে বলবো : হ্যাঁ নি:সন্দেহে এটা তাদের মোনাফেকী।

আল্লাহ তা‘আলা বলছেন:

﴿۞لَّيۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ﴾ [البقرة: 177]

(মুখ পূর্ব পশ্চিম ফিরানোর মাঝে কোন সওয়াব নেই, সওয়াব হলো ঐ ব্যক্তির জন্য যে, ঈমান এনেছে আল্লাহ পরকাল, ফেরেস্তা, আল্লাহর কিতাবাদী এবং তার রাসূলদের প্রতি।)[42]

৩. যাকাত আদায় করা সম্পর্কে তাদের মতামত:

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যাকাতকে নিজের মনগড়া ভাবে ফরয করেছে। কারণ সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে সমস্ত হাদীসে যাকাতের বিধান বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে অস্বীকার করেছে কারণ তার মতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসসমূহ কুরআনের বিরোধিত করছে। অনুরূপভাবে সে মনে করে যে, হাদীস লেখা হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর অনেক যুগ পরে। সুতরাং তা গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। উপরন্ত সে মুসলিমদেরকে এই বলে আক্রমন করে বসলো যে, “যারা হাদীসের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় তারা কুরআনের মর্যাদাহানি করে।”[43]

 এ জন্যই সে তার প্রথম ফতোয়াতেই এই বলে আহবান করেছে যে, “তার মতের বিপরিত যত সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস আছে তা বাদ দিতে হবে।”[44]

আর এজন্যই সে তার অনুসারীদের প্রত্যেক জীবিত লোকের উপর নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা তাদের আয় থেকে মাসিক ১/১৬ অংশ বা ১/১০ থেকে শুরু করে ১/৩ অংশ পর্যন্ত সবাইকেই আন্দেলনের বাক্স এ আন্দোলনের স্বার্থে জমা দিতে হবে।[45]

অনুরূপভাবে সে তার অনুসারী প্রত্যেক মৃত্যু পথ যাত্রীর উপর ধার্য করেছে যে, যদি সে বেহেস্তি কবরস্থানের সৌভাগ্যে গৌরবাম্বিত হতে চায় তবে যেন তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ১/১০ অংশ আন্দোলনের স্বার্থে দান করে যায়।[46]

তার এই নির্দেশ কাদিয়ানীদের উভয় গ্রুপ (কাদিয়ানী ও লাহোরী) এর মাঝে এখনো প্রচলিত রয়েছে।

এ সমস্ত কিছুর ফলে তারা: একদিকে নির্দিষ্ট পরিমান দান মনগড়াভাবে নিজেদের উপর ধার্য করলো, শরীয়ত এর হুকুমকে অস্বীকার করলো; অপর দিকে খৃষ্টানদের মত বেহেস্তের কেনা বেচার চেক হস্তান্তরের ন্যায় বেহেস্তি কবরস্থান বিক্রি করার অভিনব পদ্ধতি চালু করল।

 একবার ইসলামে যাকাত বিধানের দিকে তাকানো যাক, দেখা যাবে সেখানে অত্যন্ত ইনসাফের সাথে তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যেমন: যে সমস্ত ভূমিতে নিজ কষ্টে কৃষকরা ফসল ফলায় সেখানে ১/২০ অংশ, আর যেখানে কৃষকের কষ্ট ব্যতীত প্রাকৃতিক নিয়মে ফসল উৎপন্ন হয় সেখানে ১/১০ অংশ, বরং অন্যান্য সম্পদের উপর মাত্র ১/৪০ অংশ যাকাত ধার্য করা হয়েছে; যাতে ইনসাফ ও ন্যায়ের চরম উৎকর্ষতা ফুটে উঠেছে। এর সাথে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতামতের কি কোন তুলনা চলে?

৪. রমজানের রোজা সম্পর্কে তাদের মতামত:

গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মতে রমজানের রোজা ভাঙ্গা প্রত্যেক মুসাফির ও রোগীর উপর ওয়াজিব, চাই কি তার সফর দীর্ঘ হউক বা সংক্ষিপ্ত হোক, রোগ বেশী হোক আর কমই হউক সর্বাবস্থায়ই রোজা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে যারা ই‘তিকাফে থাকবে তাদের জন্য যে কোন দুনিয়ার কথা বলতে নিষেধ নেই, যেমনি ভাবে তারা ইচ্ছা করলে রোগীর দেখা শুনার জন্য বাহির হতে পারে।[47]

ফরজ রোজার ব্যাপারে উদাসীনতা স্বত্বেও সে সুফীদের থেকে ধার করে অনবরত ৮ মাস পর্যন্ত (১৮৭৫-১৮৭৬) নফল রোজা রাখার পদ্ধতি আবিস্কার করে।[48]

তার আরেক অনুসারী তার এ অন্তরীন থাকার ঘটনাকে ফলাও করে প্রচার করতে গিয়ে কিভাবে চল্লিশ দিন পর্যন্ত সুফীদের নির্জনবাসে অবস্থান করে ধন্য হয়েছে তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে।[49]

 বরং সে এ শরিয়ত গর্হিত কাজকে অশেষ পূণ্যের কাজ মনে করে বসেছে, এবং বলছে যে, সে এই নির্জন বাসের দ্বারা অদৃশ্যের পর্দাকে ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।

আর এখান থেকে বের হবার পরই সে ১৮৭৬ সালে তার বানোয়াট বিভিন্ন ভাষার ভুলে পরিপূর্ণ বাক্যাবলীকে ওহী বলে দাবী করতে লাগল।[50]

সুতরাং তার অবস্থা থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে, সে শয়তানের মন্ত্রনাকে ওহী বলে চালাতে চেষ্টা করেছে। তা হলে প্রত্যেক মুসলিমকে তার শয়তানী থাবা থেকে সাবধান করা কি জরূরী নয়?

৫. হজ্জ সম্পর্কে তাদের মতামত:

কাদিয়ানীদের চতুর্থ খলিফা মীর্যা তাহের আহমদ তার এক জুম‘আর আরবী খোতবায় এই বলে দাবী করেছে যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী আন্তরিক আকাংঙ্খা ছিল মক্কা মদীনায় কবরগুলিতে গিয়ে সেগুলির মাটি দ্বারা ধন্য হবে।[51] (তবে হজ্জ করবে এ জন্য নয়)

হজ্জের জন্য তার আকাংখা প্রকাশ না পাওয়ার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তার মুখপাত্র (মৌলবী সায়ফী কাদিয়ানী তার ইংরেজী বই (ملفوظات المسيح الموعود) এ বলছে (যার পড়শী ক্ষুধার্ত থাকবে, ফকির থাকবে, তার জন্য হজ্জ করা হারাম, বরং গরিবের প্রতি সমবেদনা এবং পড়শীর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বকে ইসলাম ফরয হজ্জের উপর স্থান দেয়।)[52]

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে সে হজ্জ না করার জন্য শস্তা একটা যুক্তি দাড় করাতে চেষ্টা করেছে।

তবুও ১৩১১ হি: (মোতাবেক ১৮৯৩) সালে তার সাথীরা তাকে নিজে স্বয়ং হজ্জ পালন করতে বললে সে শস্তা দামের জবাব দিল (حتى يأذن الله)[53] অর্থাৎ তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম হয় নি।

কিন্তু এতেও সে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ১৩১৫ হি: মোতাবেক ১৮৯৭ সালের দিকে তার আরবী বই (الاستفتاء) তে প্রহেলিকা এবং ধাঁধাঁর মত কিছু কথা বলে হজ্জের স্থান পরিবর্তন করতে উদ্বুদ্ধ করলো; তাই সে বলছে:

 (আল্লাহ চায় তোমাদের গুনাহ ঝরে যাক তোমাদের জিঞ্জির খসে যাক এবং শুস্ক ভূমি থেকে শষ্য শ্যামল ভূমিতে তোমরা স্থানান্তরিত হও। কিন্তু তোমরা নিজদের দেহ কে পাপ পঙ্কিলে রাখতে সচেষ্ট, তোমাদের প্রিয় ভূমি থেকে দুরে থাকতে তোমরা সন্তুষ্ট, আমি তোমদেরকে প্রাচীন ঘরের দিকে ডাকছি, তোমরা সেখান থেকে মূর্তির দিকে ধাবিত হচ্ছো, কতক্ষন তোমরা এ বিড়ম্বনায় থাকবে? )[54]

 এ সমস্ত ধাধা আর প্রহেলিকা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ‘কাদীয়ান’ নগরী, যেখানে মানুষ নামের জানোয়ারগুলো বাস করে। যেখানকার মুসলিমরা চতুস্পদ জন্তুর চেয়েও অধম, যেমন সে নিজেই তার অন্য বইতে তা লিখছে। (তিনি অর্থাৎ আল্লাহ হিন্দুস্তানের দিকে তাকিয়ে এ (কাদীয়ান)কেই একমাত্র খিলাফতের কেন্দ্রস্থল হিসাবে পেলেন।[55]

 এ সব কারণে তার অনুসারীদের যারা তখনো হজ্জে আগ্রহী ছিল তাদেরকে এই শর্ত আরোপ করতো যে, “হজ্জের জন্য বাধা-বিপত্তি দূরীভূত হওয়া দরকার”[56] তা হচ্ছে না বিধায় হজ্জ করা যাবে না। তার চেয়েও স্পষ্ট ভাবে নিজের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে সে বলছে “নিশ্চয়ই আমিই হচ্ছি হাজরে আসওয়াদ বা কৃষ্ণ পাথর। যমিনের উপর আমাকে গ্রহণ যোগ্য করা হয়েছে আমার স্পর্শতায় সবার জন্য বরকত নিহিত।”[57]

কিন্তু এ সমস্ত ইশারা ইঙ্গিতে তার অনুসারীরা নিরস্ত না হয়ে মক্কায় হজ্জ করার জন্য আগ্রহ দেখায়; অথচ তাদের নবী তার উর্দু বই (دافع البلاء)[58] তে বলছে, “আমি তাকে অবতীর্ণ করেছি কাদিয়ানের নিকটে”।

অনুরূপভাবে আরও স্পষ্টভাবে অন্য স্থানে বলছে “আর আল্লাহ তার কাদিয়ানের ঘরকে নি:শঙ্ক ভয়হীন হারামে পরিণত করেছেন …. অথচ এর আশে পাশে মানুষের উপর ছিনতাই হচ্ছে।[59]

বন্ধুরা !

কাদিয়ানীর এ সব প্রহেলিকা বাদ দিয়ে একবার কুরআনের বাণীর দিকে তাকান দেখবেন সেখানে কোন প্রহেলিকা বা ধাঁধাঁর ব্যাবস্থা করা হয়নি, যা বলা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে মানুষের শান্তি ও মুক্তির জন্য বিবৃত করা হয়েছে। সূরা আল-বাকারাহ এর ১৯৬ নং আয়াতের দিকে তাকান, দেখবেন যেখানে বলা হয়েছে “তোমরা আল্লাহর জন্যই হজ্জ এবং উমরা পূর্ণ করে আদায় করো।”[60]

তাহলে কাদিয়ানীদের বিরোধিতার কারণ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে আমরা আরও দেখতে পাই গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী স্পষ্টাক্ষরেই বলছে “আমি এ সবগুলিতে স্বাতন্ত্র বোধ করছি। সুতরাং তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে নামাজের স্থান বানাও।”[61]

এর উপর টীকা লিখতে গিয়ে সে লিখছে “আমাকে ইবরাহীম নামে নামকরণ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে আমাকে আদম থেকে খাতেমুর রাসূল মুহাম্মাদ পর্যন্ত সমস্ত নবীর নামে নামকরণ করা হয়েছে।”[62]

এসব কিছু বলার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই; আর তা’ হলো, এ কথা বলা যে, হাজরে আসওয়াদ এবং তাকে ইবরাহীম নামকরণ করার কারণে মাকামে ইবরাহীমে যে দুই রাকাত নামাজ পড়তে হতো তা পড়তে হবে সে যেখানে অবস্থান করছে সেখানে অর্থাৎ কাদিয়ানে।

তবে তারকথা (খাতেমুর রাসূল) দ্বারা সে বুঝাতে চাচ্ছে নবীদের মোহর বা আংটি; মুসলিমরা যা বিশ্বাস করে যে, (খাতেমুর রাসূল) অর্থ শেষ নবী এটা তার উদ্দেশ্য নয়।

কারণ সে নবুওয়াতের অভিনব নতুন ব্যাখ্যা সংযোজন করেছে, তার মতে নবুওয়াত দ্বারা “আল্লাহ কর্তৃক অধিক আলাপ সম্ভাষন”[63] করাকেই বুঝায়।

সুতরাং তার (খাতেমুর রাসূল) দ্বারা অর্থ নেয়, উৎকৃষ্ট নবী; যদিও আরবী ভাষায় এর অর্থ হলো শেষ নবী। কিন্তু তারা এ অর্থ করতে নারাজ; কারণ এতে করে তাদের প্রতিষ্ঠাতার নবুওয়াতের দাবী করাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলতে হয়।

সবশেষে আমার অনুরোধ আমরা যেন তাদের তৎপরতায় প্রতারিত না হই। আর এ জন্যই মুসলিম যুবকদেরকে তাদের প্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে এবং প্রচার প্রপাগান্ডা থেকে দুরে রাখার জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি।

সাথে সাথে অনুরোধ করব আমরা যেন আমাদের প্রতিটি সমাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের ব্যাপক প্রসার ঘটাই; কারণ যেখানেই সুন্নাতের ব্যাপক প্রসার হয়েছে সেখান থেকে এসব বাতিল মতবাদ তিরোহিত হয়েছে। পক্ষান্তরে যেখানেই মুসলিমরা সুন্নাতে রাসূল থেকে দুরে সরে এসেছে সেখানেই বাতিল দানা বেঁধে উঠেছে। কারণ কাদিয়ানী নিজেই তার নবুওয়াতের দাবীর উৎস হিসাবে ঐ অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কথা বলেছে, এ ব্যাপারে সে তার বইতে বলছে “তুমি মুসলিম যুবকদের দেখবে যে তারা ইসলামী আচার অনুষ্ঠান ত্যাগ করেছে, সুন্নাত ত্যাগ করেছে, দাড়ী কামিয়েছে, মাটি পর্যন্ত কাপড় পরিধান করছে, মোচ লম্বা রাখছে, খৃষ্টানদের যাবতীয় রসম রেওয়াজ তাদের মন মগজ দখল করে আছে।”[64]

পরিশেষে সবাইকে এ, ফেৎনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য আবারো অনুরোধ জানিয়ে শেষ করছি।

ওমা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ

সমাপ্ত

ইসলাম হাউস

Advertisements

মৃত ব্যক্তির প্রতি করণীয়

মৃত ব্যক্তির প্রতি করণীয়

ক্ষণস্থায়ী সুন্দর এ পৃথিবী থেকে প্রত্যেক প্রাণী মহান আল্লাহর দেয়া নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তার কাছে ফিরে যাওয়াই হলো মৃতুø। মৃতুøর অনিবার্যতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃতুøর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ মৃতুøর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠার সাথে সাথে মৃতুøকালীন এবং মৃতুø-পরবর্তী সময়ের জন্য জীবিত ব্যক্তির কিছু দায়িত্ব পালন অপরিহার্য।

মৃতুøকালীন কর্তব্যঃ কারো মৃতুøর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠলে তাকে ডান কাতে কেবলামুখী শয়ন করানো উচিত, তা সক্ষম না হলে শুধু মুখটা কেবলার দিকে রাখতে হবে। এ সময় কলেমার তালকিন (উচ্চৈঃস্বরে পড়তে থাকা) করতে হবে এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিতে হবে। পার্থিব জীবনের এমন কোনো কাজ বা কথা বলা যাবে না, যে কারণে তার মন দুনিয়ার দিকে ঝঁুকে পড়ে। কারো মুখ দিয়ে অযাচিত কথা বের হয়ে পড়লে সে দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কলেমার তালকিন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা ওই সময় শয়তান ঈমান নষ্ট করার জন্য মানুষের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। কলেমা একবার উচ্চারণ করলে অধিকবার পাঠ করানোর জন্য পীড়াপীড়ি করা যাবে না। তার পাশে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা মুস্তাহাব। মহানবী সাঃ বলেন, ‘মৃতুøমুখী লোককে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করাও এবং তার পাশে বসে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করো।’

মৃতুøর পরঃ ব্যক্তির মৃতুøর পর উপস্থিত লোকেরা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করবে। লোবান বা আগর বাতি জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। অতঃপর তার চক্ষুদ্বয় ‘বিস্‌মিল্লাহে ওয়া আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহ’ বলে কোমল হস্তে বন্ধ করে দিতে হবে। হাত-পা সোজা করে দিতে হবে। চেহারা সঠিক অবস্থায় থাকার জন্য রুমাল বা কাপড় দ্বারা থুঁতনি বেঁধে দিতে হবে। দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিও এ সময় পরস্পর বেঁধে দেয়া উচিত। মৃতদেহ মাটি কিংবা চারপায়া খাটিয়ার ওপর রাখা যাবে। অতিরিক্ত কাপড় খুলে চাদর দ্বারা শরীর ঢেকে দেয়া মুস্তাহাব। পুরুষ কিংবা মহিলা যাদের ওপর গোসল ফরজ তাদের মৃত ব্যক্তির কাছে থাকা ঠিক নয়। গোসল ও কাফন-দাফন দ্রুত সেরে নেয়া উচিত, বিলম্ব করা ঠিক নয়। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দ্রুত সংবাদ দেয়া উচিত, যাতে তারা যথাসময়ে জানাজায় উপস্থিত হতে পারে। গোসল দেয়ার আগে মৃতের কাছে কুরআন শরীফ পাঠ বৈধ নয়।

কান্নাকাটি করাঃ মৃতের জন্য উচ্চস্বরে কান্না করা যাবে না। ধৈর্য অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখতে হবে এবং মৃত ব্যক্তির পরকালীন জীবনের প্রতিটি স্তর যাতে সহজ হয় তার জন্য দোয়া করতে হবে। উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি রয়েছে বিধায় মহানবী সাঃ তা করতে নিষেধ করেছেন।

গোসল দানঃ সর্বাপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের গোসল দেয়া উত্তম। মৃতকে কাঠের ওপর শুইয়ে কাপড়গুলো খুলে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত একটি চাদর দ্বারা ঢেকে দিতে হবে। গোসলদাতা হাতমোজা বা অন্য কোনো কাপড় দুই হাতে পরে নেবে। মৃতকে প্রথমে কুলি এবং নাকে পানি দেয়া ব্যতীত অজু করাতে হবে। হালকা গরম পানিতে সম্ভব হলে কিছু বরই পাতা দিয়ে মৃতদেহকে তিনবার ধৌত করানো উচিত। শেষবারের গোসলে কর্পূর মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা উত্তম। গোসলের পর মৃতের সর্বাঙ্গ শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। কাফনের ওপর মৃতদেহ রাখার সময় স্ত্রীলোকের মাথায় এবং পুরুষের মাথায় ও দাড়িতে আতর এবং কপাল, নাক, উভয় হাতের তালু, উভয় হাঁটু ও পায়ে কর্পূর লাগানো যেতে পারে। কাফনে আতর লাগানো এবং কানে তুলা দেয়া ঠিক নয়। চুল আঁচড়ানো, নখ ও চুল কাটা ঠিক নয়। স্ত্রী স্বামীকে গোসল দিতে এবং কাফন পরাতে পারবে। কিন্তু মৃত স্ত্রীকে স্বামী স্পর্শ করতে ও হাত লাগাতে পারবে না। কিন্তু দেখা বা কাপড়ের ওপর দিয়ে হাত লাগানো যেতে পারে।

কাফনঃ পুরুষের জন্য তিনখানা (যথা­ ইজার, কোর্তা ও চাদর) এবং স্ত্রীলোকের জন্য পাঁচখানা (যথা­ চাদর, কোর্তা, ইজার, ছেরবন্দ ও সিনাবন্দ) কাপড় দেয়া সুন্নত। পুরুষের ইজার ও চাদর মাথা থেকে পা পর্যন্ত এবং কোর্তা আস্তিন ও কল্লি ব্যতীত কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত হওয়া উচিত। মহিলার কোর্তা কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত সিনাবন্ধ সিনা থেকে নাভি বা হাঁটু পর্যন্ত, ছেরবন্ধ তিন হাত দৈর্ঘø হবে, যার দ্বারা মাথার চুল বাঁধতে হয়। ইজার মাথা থেকে পা পর্যন্ত এবং চাদর মাথা থেকে পা পর্যন্ত হওয়া আবশ্যক। কাফনের জন্য সাদা রঙের সাধারণ কাপড় ব্যবহার করা উচিত। মহানবী সাঃ বলেছেন, ‘কাফনের জন্য অতি দামি কাপড় ব্যবহার করো না, কারণ তা সত্বর নষ্ট হয়ে যায়।’ কাফন পরানোর আগে তাতে তিনবার কিংবা পাঁচবার লোবান বা আগরবাতির ধুনি দেয়া উচিত।

জানাজার নামাজঃ মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়ার উদ্দেশ্যে ফরজে কেফায়া জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। মৃতের অলি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি ইমামতির উপযুক্ত। অতঃপর যারা তাকে অনুমতি দেয়। জানাজার নামাজ আদায়ের জন্য ওয়াক্তের শর্ত নেই। জানাজার জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া যেতে পারে। নাপাকমুক্ত জুতা পায়ে নামাজ পড়া যায়। তবে খুলে নিয়ে জুতার ওপর নামাজ পড়া উত্তম। কাফির বা মুরতাদ ব্যক্তির জানাজা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে বিদ্রোহী মুসলমান বাদশাহ, ডাকাত যদি বিদ্রোহ কিংবা ডাকাতি অবস্থায় মারা যায়, তাদের জানাজা পড়া যাবে না। পিতা-মাতার হন্তারক সন্তান যদি সাজাস্বরূপ মারা যায় তবে শাসনের উদ্দেশ্যে তার জানাজা পড়া যাবে না। ইচ্ছাপূর্বক আত্মহত্যাকারীর জানাজায় শীর্ষস্থানীয় আলেমদের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নয়। জানাজার পর আবার মুনাজাত করার প্রয়োজন নেই।

জানাজা বহনের নিয়মঃ মৃতব্যক্তিকে যথাশিগগির কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া উচিত। জানাজা বহনকারীদের অজু থাকা বাঞ্ছনীয়। জানাজার সাথে পায়ে চলা উত্তম, যানবাহনেও চলা যায়। বিনা প্রয়োজনে জানাজার আগে চলা এবং উচ্চৈঃস্বরে দোয়াকালাম পড়া মাকরুহ।

দাফন করাঃ কবরে লাশ রাখার সময় ‘বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহ’ বলতে হবে। মাইয়েতকে ডান কাতে কেবলামুখী করে শয়ন করিয়ে কাফনের বন্ধন খুলে দিতে হবে। কবরের উপরিভাগে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে ঢাকার পর পরিমাণমতো চাটাই দিয়ে মাটি চাপা দিতে হবে। উপস্থিত লোকেরা তিন মুষ্টি মাটি কবরে রাখবে। প্রথম মুষ্টি রাখার সময় বলবে ‘মিনহা খালাকনাকুম’, দ্বিতীয় মুষ্টির সময়ে বলবে ‘ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম’, তৃতীয় মুষ্টির সময় বলতে হবে ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। দাফনের পর মাথার দিকে সূরা বাকারার প্রথম তিন আয়াত এবং পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে শেষের তিন আয়াত পাঠ করা মুস্তাহাব। মাটি দেয়ার পর কবরে পানি ছিটিয়ে দেয়া, কোনো গাছের তাজা ডাল পঁুতে দেয়া মুস্তাহাব। সবশেষে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা সুন্নত। কবর অনেক উঁচু করা, চুন-সুরকি দিয়ে পাকা করা বা লেপা মাকরুহ তাহরিমি। সৌন্দর্যের জন্য কবরের ওপর গম্বুজ বা পাকাঘর বানানো হারাম।

সমবেদনা প্রকাশঃ মৃতলোকের ওয়ারিশগণকে সমবেদনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তাদের গৃহে যাওয়া, খাদ্য প্রেরণ করা, ধৈর্যধারণের পরামর্শ দেয়া সুন্নত।

সওয়াব বখশানোঃ অভাবী লোকদের সাহায্য সহযোগিতা, সদকায়ে জারিয়ার কোনো কাজ যেমন- মাদরাসা, মসজিদ নির্মাণ বা আর্থিক সহযোগিতা কিংবা কোনো জনহিতকর কার্য সম্পাদন অথবা ওয়াকফ করা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত প্রভৃতির মাধ্যমে প্রাপ্ত সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বখশানো যায়। মহানবী সাঃ-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাঃ! আমার মা মারা গেছেন। এখন তার জন্য আমি কী করব? মহানবী সাঃ বললেন, ‘তোমার মায়ের জন্য দোয়া করো এবং তার আত্মীয়স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তার ওয়াদাকৃত অসিয়ত থাকলে পূরণ করো, দেনা থাকলে পরিশোধ করো।’ মৃতুøর তিন দিন পর ও চল্লিশ দিনের দিন আমাদের সমাজে আনন্দভোজের মতো করে মানুষকে যে খাওয়ানো হয় তা সম্পূর্ণ বেদায়াত। এতে মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার হয় না।

জানাযার কিছু বিধান

জানাযার কিছু বিধান

তালকিন ও তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা

প্রশ্ন-১. তালকিন কি ও তার নিয়ম কি?

উত্তর: মুমূর্ষূ ব্যক্তিকে কালিমা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং তাকে কালিমা পাঠ করার দীক্ষা দানকে আরবিতে ‘তালকিন’ বলা হয়। যখন কারো উপর মৃত্যুর আলামত জাহির হয়, তখন উপস্থিত ব্যক্তিদের উচিত তাকে لا إله إلا الله বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহকে স্মরণ করতে বলা। উপস্থিত লোকদের সাথে এ কালিমা একবার পাঠ করাই তার জন্য যথেষ্ট, তবে পীড়াপীড়ি করে তাকে বিরক্ত করা নিষেধ।

প্রশ্ন-২. মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কিবলামুখী করার বিধান কি?

উত্তর: আলেমগণ মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করা মুস্তাহাব বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

 «الكعبة قبلتكم أحياء وأمواتا» (رواه أبوداود فى الوصايا بلفظ «البيت الحرام قبلتكم أحياء وأمواتا»(

“বায়তুল্লাহু তোমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবলা”। ইমাম আবু দাউদ ওসিয়ত অধ্যায়ে বর্ণনা করেন, “বায়তুল হারাম তোমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবলা”।   

প্রশ্ন-৩. দাফনের পর তালকিন করার বিধান কি ?

উত্তর: দাফনের পর তালকিন প্রসঙ্গে শরি‘আতে কোন প্রমাণ নেই, তাই এটা বিদাত। দাফনের পর তালকিন প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসগুলো জাল ও আমলের অযোগ্য, তাই তালকিন শুধু মুমূর্ষাবস্থায় করা, মৃত্যুর পর নয়।

প্রশ্ন-৪. অমুসলিম মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালিমার তালকিন করা বৈধ?

উত্তর: হ্যাঁ, সম্ভব হলে অমুসলিম ব্যক্তিকেও কালিমার তালকিন করা বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক ইয়াহূদী খাদেম মমূর্ষাবস্থায় পতিত হলে, তিনি তাকে দেখতে যান ও তাকে কালিমার তালকিন করে বললেন, বলঃ

 « أشْهَدُ أَنْ لاَإِلَه إلاّ اللهَ وأَنَّ مُحَمّدَ رَسُوْلُ اللهِ »

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল”। এ কথা শোনে বালকটি তার পিতা-মাতার দিকে তাকাল, তারা তাকে বললঃ “তুমি আবুল কাসেমের আনুগত্য কর”। এভাবে ইয়াহূদী বালকটি কালিমা পড়ে ইন্তেকাল করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “সমস্ত প্রসংশা মহান আল্লাহ তালার জন্যে যিনি আমার মাধ্যমে এ বালকটিকে জাহান্নামের অগুন থেকে মুক্ত করলেন।

প্রশ্ন-৫. উল্লেখিত হাদিস কি অমুসলিম খাদেম গ্রহণের বৈধতা প্রমাণ করে?

উত্তর: না, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ জীবনে ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে আরব উপদ্বীপ হতে বের করে দিতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদেরকে বের করে দিতে বলেছেন, খাদেম হিসাবে তাদেরকে ডেকে আনার কোন অর্থ নেই।

মৃতের গোসল ও কাফন

প্রশ্ন-১. সাহাবি ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস দ্বারা মৃত ব্যক্তির গোসলের পানিতে বড়ই পাতা দেয়া ওয়াজিব প্রমাণিত হয়?

উত্তর- মৃতের গোসলের পানিতে বড়ই বা কুলপাতা দেয়া শরীয়ত সম্মত, তবে ওয়াজিব নয়। আলেমগণ হাদিসের নির্দেশকে মুস্তাহাব বলেছেন। কারণ কুলপাতা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য খুব কার্যকরী। কুলপাতা না পাওয়া গেলে সাবান বা এ জাতীয় কিছু ব্যবহার করাই যথেষ্ট।

প্রশ্ন ২- এহরাম আবস্থায় মৃত ব্যক্তির গোসলের হুকুম কি?

উত্তর: এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তিকেও অন্যান্যদের ন্যায় গোসল দিতে হবে, তবে তার গাঁয়ে সুগন্ধি মাখবে না এবং তার মুখ ও মাথা ঢাকবে না। তার কাফন পাগড়ি ও জামা ব্যতীত শুধু এহরামের কাপড়ে সীমাবদ্ধ থাকবে। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে। এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির হজের অবশিষ্ট কাজ অন্য কাউকে সম্পূর্ণ করতে হবে না, তার মৃত্যু আরাফাতে অবস্থানের পর বা আগে যখনই হোক। কারণ এ ব্যাপারে রাসূলের কোন নির্দেশ নেই।

প্রশ্ন ৩- নারী ও পুরুষকে কাফন কাপড় পরানোর নিয়ম কি?

উত্তর- জামা ও পাগড়ী ব্যতীত পুরুষকে সাদা তিন কাপড়ে এবং নারীকে ইযার, কামিস, উড়না ও বড় দু’চাদরসহ মোট পাঁচ কাপড়ে কাফন দেয়া উত্তম। এ ছাড়া সতর ঢেকে যায় এমন এক কাপড়ে নারী কিংবা পুরুষকে কাফন দেয়াও বৈধ।

প্রশ্ন ৪- মৃত ব্যক্তির গোঁফ, নখ ইত্যাদি কাটার বিধান কি?

উত্তর- এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট কোন দলিল নেই, তাই কাটা না-কাটা উভয় সমান। কতক আলেম নখ ও গোঁফ কাটার স্বপক্ষ্যে প্রমাণ পেশ করেছেন, কিন্তু গোপন অঙ্গের পশম পরিষ্কার করা ও খতনা করার কোন দলিল নেই, তাই এ দু’কাজ কোন অবস্থাতেই করা যাবে না।

প্রশ্ন ৫- মৃত ব্যক্তির গোসলে কুলপাতা মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা কি সুন্নত?

উত্তর- যেহেতু কুলপাতা মিশ্রিত পানি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় খুব কার্যকরী, তাই অনেক ফেকাহবিদ এটাকে উত্তম বলেছেন, তবে বাধ্যতামূলক নয়।

প্রশ্ন ৬- দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়ার সময় রক্তের প্রবাহ বন্ধ করার জন্য অনেকে প্লাষ্টিক ইত্যাদির কাবার ব্যবহার করে, শরি‘আতের দৃষ্টিতে এর হুকুম কি?

উত্তর- রক্তের প্রবাহ বন্ধ করার জন্যে এ ধরণের কাবার ব্যবহারে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ৭- হাদিসঃ

« من غسل ميتا فستر عليه ستر الله عليه يوم القيامة »

“যে ব্যক্তি কোন মৃতকে গোসল দেয়, অতঃপর সে তার দোষত্রুটি ঢেকে রাখে, আল্লাহ তালা কিয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি ঢেকে রাখবেন”। হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর ৭- এ হাদিস সম্পর্কে আমাদের জানা নেই, তবে এ সম্পর্কে আমাদের নিকট বিশুদ্ধ হাদিস হচ্ছেঃ

«من ستر مسلما ستره الله في الدنيا والأخرة»

“যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তার দোষ ঢেকে রাখবেন”। (বুখারি ও মুসলিম) জীবিত ও মৃত সকল মুসলিম এ হুকুমের অন্তর্ভূক্ত।

প্রশ্ন ৮- সাতবার ধৌত করার পরও যদি মৃত ব্যক্তি পরিষ্কার না হয়, তাহলে এর অধিক ধৌত করার অনুমতি আছে?

উত্তর – প্রয়োজনে অধিকবার ধৌত করা বৈধ।

প্রশ্ন ৯- মৃতদের গোসল দানের পদ্ধতি শিখানোর জন্য প্রশিক্ষণ কোর্স খোলার বিধান কি?

উত্তর – মৃতদের গোসল দানের পদ্ধতি শিখানোর জন্য কোর্স খোলা শরীয়ত সম্মত ও একটি ভাল কাজ। অনেকে তা ভালভাবে করতে পারে না, তাই এর জন্য প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা খুব ভাল উদ্যোগ।

প্রশ্ন ১০- মৃতব্যক্তির গোসল তার পরিবারের লোকদের দেয়া কি উত্তম?

উত্তর – না, এটা জরুরী নয়, বরং বিশ্বস্ত এবং এ বিষয়ে ভাল জ্ঞান রাখে এ রকম লোকই উত্তম।

প্রশ্ন ১১- স্বামীর গোসল তার স্ত্রীর দেয়া উত্তম না অন্য কেউ দেবে?

উত্তর – স্ত্রী যদি অভিজ্ঞ হয় তাহলে তার স্বামীকে গোসল দিতে আপত্তি নেই, যেমন খলিফা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তার স্ত্রী ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা গোসল দিয়েছেন এবং আসমা বিনতে উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা তার স্বামী আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গোসল দিয়েছেন।

প্রশ্ন ১২- মৃত ব্যক্তি যদি তার গোসলের জন্য কাউকে অসিয়ত করে যায়, তার অসিয়ত পুরো করা কি জরুরি?

উত্তর – হ্যাঁ, তার অসিয়ত পুরো করা জরুরি।

প্রশ্ন ১৩- মৃতের কাফনের নির্দিষ্ট বাঁধন কয়টি?

উত্তর – কাফনের বাঁধনে নির্দিষ্ট কোন পরিমাণ নেই, উপরে নিচে ও মাঝে মোট তিনটিই যথেষ্ট। দু’টো হলেও আপত্তি নেই। মূল বিষয় হল কাফন যেন খুলে না যায় বরং আটকে থাকে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া।

প্রশ্ন ১৪- মৃতের গোসলে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত কোন সংখ্যা আছে কি?

উত্তর – গোসলদাতা ও তার একজন সহায়ক, মোট দু’জনেই যথেষ্ট।

প্রশ্ন ১৫- গোসলদাতা কি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে যে, সে সালাত আদায় করত কি-না?

উত্তর – যদি বাহ্যিকভাবে মুসলিম বুঝা যায় বা মৃতকে উপস্থিতকারীগণ মুসলিম হয়, তাহলে জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নেই। অনরূপ জানাযার সালাতের ক্ষেত্রে। অনেকে এ বিষয়টি সাধারণভেবে জিজ্ঞাসা করে, যার কারণে মৃতের ওয়রিসগণ বিব্রত ও লজ্জাবোধ করেন।

প্রশ্ন ১৬- তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার স্বামী গোসল দিতে পারবে?

উত্তর – তালাক যদি প্রত্যাহারযোগ্য হয় (দু’তালাক বা তিন তালাক) তাহলে মৃত স্ত্রীকে তার স্বামী গোসল দিতে পারবে অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ১৭- অনেক ফেকাহবিদ মন্তব্য করেছেন যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু নশ্বর এই জীবনেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে আপনাদের অভিমত কি?

উত্তর – উল্লিখিত মন্তব্য হাদিসের পরিপন্থী, বিদায় তার দিকে কর্ণপাত না করাই ভাল।

প্রশ্ন ১৮- গুপ্ত আঘাত ও নির্মমভাবে নিহত ব্যক্তিদের কি গোসল দেয়া হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, তাদেরকে গোসল দেয়া হবে এবং তাদের উপর সালাত পড়া হবে। যেমন খলীফা ওমর ইব্‌ন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু ও খলীফা ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন, অতঃপর তাদেরকে গোসল দেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর জানাযা পড়া হয়েছে। অনরূপ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু নির্মমভাবে শহীদ হয়ে ছিলেন, তাকেও গোসল দেয়া হয়েছে এবং তার উপর জানাযা পড়া হয়েছে।

প্রশ্ন ১৯- যুদ্ধের ময়দানে মৃত যদি নানা আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, তাকেও কি গোসল, জানাযা ও কাফন দেয়া হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, তাকেও গোসল ও কাফনসহ সব কিছু করা হবে, তার উপর জানাযা পড়া হবে। তার নিয়ত বিশুদ্ধ হলে ইনশাআল্লাহ সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।

প্রশ্ন ২০- কাফন পরানের পর যদি রক্ত নির্গত হয় তাহলে কি কাফন পরিবর্তন করতে হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, কাফন পরিবর্তন করবে বা ধোয়ে নিবে এবং রক্ত যেন বাহির না হয় সে ব্যবস্থা করবে।

প্রশ্ন ২১- মৃত এবং মৃতের কাফনে সুগন্ধি দেয়ার হুকুম কি?

উত্তর – মৃত যদি এহরাম অবস্থায় না হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তির গাঁয়ে ও তার কাফনে সুগন্ধি দেয়া সুন্নত।

প্রশ্ন ২২- গোসলদাতা মৃতের দোষ-ত্রুটি বা গুণাগুণ বর্ণনা করতে পারবে?

উত্তর – ভাল কিছু প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মন্দ কিছু প্রকাশ করবে না। কারণ এটা পরনিন্দা ও গীবতের অন্তর্ভূক্ত। নাম প্রকাশ না করে যদি বলে অনেক মৃতলোক খুব কালো ও কুৎসিত হয়ে যায় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে বলা যে, উমুককে গোসল দিয়েছিলাম তার মাঝে এ ধরণের দোষ দেখতে পেয়েছি, এভাবে বলা নিষেধ। কারণ এর ফলে মৃতের ওয়ারিসরা দুঃখ পায়, তাই এগুলো গিবতের অন্তর্ভুক্ত।

সালাতুল জানাযা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন -১ দাফনের পর সালাতে জানাযার হুকুম কি? তা কি একমাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ?

উত্তর – দাফনের পর জানাযা পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাফনের পর জানাযার সালাত পড়েছেন। যে ব্যক্তি জামাতের সহিত সালাত পাড়েনি সে দাফনের পর পড়বে। যে একবার পড়েছে সে ইচ্ছা করলে অন্যান্য মুসল্লিদের সাথে একাধিকবার পড়তে পারবে, এতে কোন সমস্যা নেই। আলেমদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে দাফনের একমাস পর পর্যন্ত জানাযার সালাত পড়া যায়।

প্রশ্ন ২- জানাযায় অংশগ্রহণকারীর যদি আংশিক সালাত ছুটে যায় তাহলে তা আদায় করতে হবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, ছুটে যাওয়া অংশ সাথে সাথে আদায় করে নিবে। যদি ইমামকে তৃতীয় তাকবীরে পায় তাহলে সে তাকবির বলে সূরা ফাতিহা পড়বে, ইমাম যখন চতুর্থ তাকবীর বলবে তখন সে দ্বিতীয় তাকবীর বলে রাসূলের উপর দরুদ পড়বে, ইমাম যখন সালাম ফিরাবে তখন সে তৃতীয় তাকবীর বলে দু’আ পড়বে অতঃপর চতুর্থ তাকবির দিয়ে সালাম ফিরাবে।

প্রশ্ন ৩- ছুটে যাওয়া আংশিক সালাত আদায়ের আগেই যদি লাশ তুলে নেয়া হয় তাহলে অবশিষ্ট সালাত কিভাবে আদায় করবে?

উত্তর – সাথে সাথে তাকবিরে তাহরিমা বলে সূরা ফাতিহা পড়বে, অতঃপর ইমামের সাথে তাকবির বলবে ও রাসূলের উপর দরুদ পড়বে। অতঃপর ইমাম সালাম ফিরালে সে তাকবির দিয়ে দো‘আ করবে, যার অর্থ: “হে আল্লাহ, তুমি এ মৃতকে ক্ষমা কর, অতঃপর তাকবির বলে সালাম ফিরাবে”। ইমামের সাথে দু’তাকবির পেলে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করবে।

প্রশ্ন ৪- জানাযার সালাতে ইমামের ডানপাশে কাতার বন্ধি জায়েয কি না?

উত্তর – প্রয়োজনে ইমামের ডান ও বাম দিকে কাতার বন্ধি করা যেতে পারে, তবে ইমামের পিছনে কাতার বন্ধি করাই সুন্নত, কিন্তু জায়গার সঙ্কীর্ণতার কারণে ইমামের ডান ও বামে কাতার হতে পারবে।

প্রশ্ন ৫- মুনাফেকের উপর জানাযার নামাজ পড়া যাবে কি?

উত্তর – যার নেফাক সুস্পষ্ট, তার উপর জানাযার সালাত পড়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا ٨٤﴾ [التوبة: 84]

“আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না”। সূরা আত-তাওবাহ: (৮৪) আর যদি নেফাকির বিষয়টি অস্পষ্ট বা অপবাদমুলক হয়, তাহলে তার উপর জানাযা পড়া যাবে, কারণ মৃতের উপর জানাযা পড়া অকাট্য দলীলের কারণে ওয়াজিব, যা কোন সন্দেহের দ্বারা রহিত হবে না।

প্রশ্ন ৬- লাশ দাফনের একমাস পর কবরের উপর জানাযা পড়া যাবে?

উত্তর – এ প্রসঙ্গে আলেমদের মতানৈক্য রয়েছে, তাই উত্তম হল একমাসের পর না পড়া। অধিকাংশ বর্ণনা মতে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস পর্যন্ত কবরের উপর জানাযা পড়েছেন, একমাসের বেশী সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নামাজ পড়ছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে জনাযা তো দাফনের পূর্বে পরে নয়।

প্রশ্ন ৭- জানাযার স্থানে পৌঁছতে অক্ষম ব্যক্তি গোসল খানায় জানাযা পড়তে পারবে?

উত্তর – হ্যাঁ, পড়তে পারবে যদি গোসলখানা পাক হয়।

প্রশ্ন ৮- মৃতব্যক্তিকে সালাত পর্যন্ত কোন কক্ষে রাখতে কোন অসুবিধা আছে কি?

উত্তর – না, তাতে কোন অসুবিধা নেই।

প্রশ্ন ৯- একটি হাদিস বলা হয় যে,

«إنَّ الشَّيَاطِيْنَ تَلْعَبُ بِالْمَيِّتِ»

“শয়তান মৃতব্যক্তিকে নিয়ে খেলা করে”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর – এটি একটি বিভ্রান্তিকর কাথা, আমাদের জানামতে ইসলামি শরি‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই।

প্রশ্ন ১০- যারা কবরের উপর নির্মিত মসজিদে নামায পড়া বৈধ মনে করে, তারা তাদের সপক্ষে দলিল পেশ করে যে, মসজিদে নববিও তো কবরের উপর, সেখানে কিভাবে সালাত শুদ্ধ হচ্ছে?

উত্তর – রাসূলের কবর মসজিদে নয় বরং রাসূলের কবর তাঁর ঘরের ভিতর। যারা ধারণা করে যে মসজিদে নববি রাসূলের কবরের উপর তাদের ধারণা ভুল।

প্রশ্ন ১১- জানাযার নামাজে ইমামতির জন্য মসজিদের স্থায়ী ইমাম অধিক হকদার, না মৃতের ওয়ারিসগণ?

উত্তর – জানাযা যদি মসজিদে হয়, তাহলে মসজিদের ইমামই জানাযা পড়াবে।

প্রশ্ন ১২- আমরা জানি যে দাফনের পর প্রায় একমাস পর্যন্ত মৃতের উপর নামাজ পড়া যায়। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে তাঁর শেষ জীবনে “জান্নাতুল বাকি”তে (মসজিদের নববির আশে অবস্থিত গোরস্তান) দাফন কৃত সাহাবাদের উপর জানাযা পড়েছেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন?

উত্তর – তাদের উপর জানাযা পড়েছেন, এর অর্থ হচ্ছে তাদের জন্যে দু’আ করেছেন, আর মৃতদের জন্যে দো‘আ যে কোন সময় হতে পারে।

প্রশ্ন ১৩- যে মসজিদে কবর বিদ্যমান, সেখানে কি সালাত পড়া যাবে?

উত্তর – না, যে মসজিদে কবর রয়েছে সেখানে সালাত পড়া যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে এ জন্যে অভিশাপ করেছেন যে, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল।

প্রশ্ন ১৪- যদি অবস্থা এমন হয় যে পুরা শহরে একটি মাত্র মসজিদ, আর তাতে রয়েছে কবর এমতাবস্থায় মুসলিমগণ কি ঐ মসজিদে নামায পড়বে?

উত্তর – মুসলিম কখনো সে মসজিদে সালাত পড়বে না। যদি কবরহীন অন্য কোন মসজিদ পাওয়া যায় তা হলে ঐ মসজিদে পড়বে অন্যথায ঘরেই সালাত পড়বে। কোন মসজিদে কবর থাকলে দেখতে হবে যে, মসজিদ আগে নির্মাণ হয়েছে না কবর আগে তৈরি হয়েছে, যদি মসজিদ আগে হয়ে থাকে তাহলে কর্তৃপক্ষের উপর ওয়াজিব হচ্ছে কবর খনন করে সেখান হতে অবশিষ্ট হাড্ডি মাংশ উত্তলন করে সাধারণ জনগনের জন্যে ব্যাবহারিত কবরস্থানে স্থানান্তর করা। আর যদি কবর পূর্ব হতে থাকে আর মসজিদ পরে নির্মাণ হয়। তাহলে সেখান থেকে মসজিদ ভেঙ্গে অন্য জায়গায় নির্মাণ করবে, যেখানে কোন কবর নেই।

কারণ আম্বিয়ায়ে কেরামের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। মুমিন জননী উম্মে সালমা ও উম্মে হাবীবাহ যখন সংবাদ দিলেন যে, হাবশায় তাঁরা এমন একটি গির্জা দেখেছেন যেখানে প্রতিমার ছবি নির্মিত। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তাদের মাঝে কোন সৎকর্মশীল লোক মারা গেলে তারা তাদের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করত এবং সেখানে তাদের প্রতিমা স্থাপন করত। তারা আল্লাহর নিকট এ ভূ-পৃষ্ঠের মধ্যে নিকৃষ্টতম প্রাণী”। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন ব্যক্তি কবরের উপর নির্মিত মসজিদে সালাত পড়লে তা বাতিল বলে গণ্য, এ সালাত পুনরায় পড়তে হবে।

প্রশ্ন ১৫- স্বেচ্ছাসেবামূলক রক্তদান জায়েয আছে কি না?

উত্তর – প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, তবে লক্ষ্য রাখাতে হবে যে দানকারীর যেন কোন কষ্ট না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ

﴿وَقَدۡ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيۡكُمۡ إِلَّا مَا ٱضۡطُرِرۡتُمۡ إِلَيۡهِۗ١١٩﴾ [الأنعام:119]

“অথচ তিনি তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা তোমাদের উপর হারাম করেছেন। তবে যার প্রতি তোমরা বাধ্য হয়েছ”। সূরা আল-আনআম: (১১৯)

প্রশ্ন ১৬- জানাযার নিয়ম কি ?

উত্তর – জানাযার নিয়ম এই যে, প্রথমে তাকবির বলে ইমাম সাহেব আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা-ফাতিহা পড়বে। সূরা ফাতিহার সাথে সূরায়ে ইখলাস বা সূরায়ে ‘আসরের ন্যায় কোরআনের কোন ছোট সূরা বা কিছু আয়াত মিলিয়ে নেয়া মুস্তাহাব। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সূরা মিলিয়ে জানাযা পড়তেন। অতঃপর দ্বিতীয় তাকবির দিয়ে রাসূলের উপর দরুদ পড়বে, যেমন অন্যান্য নামাযের শেষ বৈঠকে পড়া হয়। অতঃপর তৃতীয় তাকবির দিয়ে মৃতের জন্যে দু’আ করবে, দু’আর সময় নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে শব্দের আভিধানিক পরিবর্তন প্রয়োগ করবে, একাধিক জানাযা হলে বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করবে। অতঃপর চতুর্থ তাকবির বলবে এবং ক্ষণকাল চুপ থেকে ডান দিকে এক সালাম ফিরিয়ে জানাযা শেষ করবে।

আর ছানা ইচ্ছা করলে পড়তেও পারে, আবার ইচ্ছা করলে ছেড়েও দিতে পারে। তবে তা পরিত্যাগ করাই উত্তম হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা জানাযা নিয়ে তাড়াতাড়ি করবে।” (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৭- যে ব্যক্তি জানাযা ও দাফনে অংশগ্রহণ করবে সে কি দু’কিরাত নেকি পাবে?

উত্তর – হ্যাঁ, সে দু’কিরাত নেকি পাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«من تبع الجنازة حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل أحد»

“যে ব্যক্তি জানাযায় অংশগ্রহণ করবে এবং লাশ দাফন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে দু’কিরাত নেকী নিয়ে বাড়ি ফিরবে, প্রতিটি কিরাত ওহুদ পাহাড় সমান”। (বুখারি)

ولقوله صلى الله عليه وسلم «من شهد الجنازة حتى يصلى عليها فله قيراط ومن شهدها حتى تدفن فله قيراطان» قيل يارسول الله: وما القيراطان ؟ قال: «مثل الجبلين العظيمين»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাযায় অংশগ্রণ করত নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে এক কিরাত নেকি পাবে, আর যে জানাযায় অংশগ্রহণ করে দাফন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে দু’কিরাত নেকি পাবে”। জিজ্ঞসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! দু’কিরাত বলতে কি বুঝায়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “দুইটি বড় পাহাড় সমপরিমাণ”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৮- ইসলামে বিশেষ অবদান রেখেছেন এমন ব্যক্তির জানাযা একদিন বা ততোধিক বিলম্ব করা যাবে?

উত্তর – বিলম্ব করাতে যদি কল্যাণ থাকে তাহলে করা যাবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়েছে সোমবার অথচ তাঁর দাফন হয়েছে বুধবার রাতে। তাই ইসলামের সেবায় নিবেদিত এমন ব্যক্তির দাফন বিলম্বে যদি কোন কল্যাণ থাকে, যেমন তার আত্মীয় স্বজনের আগমন ইত্যাদি, তাহলে বিলম্ব করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ১৯- কোন মৃতের উপর একাধিক বার জানাযা পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – বিশেষ কারণে একাধিক বার জানাযা পড়া যেতে পারে, যেমন জানাযা শেষে কিছু লোক উপস্থিত হলো, তাহলে এরা মৃতের উপর দাফনের পূর্বে বা পরে জানাযা পড়তে পারবে। এমনিভাবে যে একবার সবার সাথে জানাযা পড়েছে সে আগত লোকদের সাথে লাশ দাফনের পরে ও পুনরায় জানাযা পড়তে পারবে। কারণ এতে সালাত আদায়কারী ও মৃত ব্যক্তি উভয়ের জন্য কল্যাণ রয়েছে।

প্রশ্ন ২০- মায়ের গর্ভে মৃত সন্তানের জানাযা পড়া যাবে কি?

উত্তর – পাঁচ মাস বা ততোধিক সময় গর্ভে অবস্থান করে যদি কোন শন্তান মৃত ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলে তাকে গোসল দেবে, তার জানাযা পড়বে ও তাকে মুসলিমদের গোরস্থানে দাফন করবে।

প্রশ্ন ২১- আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়া যাবে কি?

উত্তর – যেহেতু আহলে সূন্নত ওয়াল জামায়াতের মতানুসারে আত্মহত্যার কারণে কেউ মুসলিমদের গন্ডি হতে বেরিয়ে যায় না, তাই অন্যান্য অপরাধীদের ন্যায় তার উপরও কিছু সংখ্যক লোক জানাযা পড়ে নিবে।

প্রশ্ন ২২- নিষিদ্ধ সময়ে জানাযার নামাজা পড়ার বিধান কি?

উত্তর – নিষিদ্ধ সময়ে জানাযা পড়া যাবে না, তবে নিষিদ্ধ সময়টি যদি লম্বা হয়, যেমন ফজরের সালাতের পর হতে সূর্য উঠা পর্যন্ত এবং আসরের সালাতের পর হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত, বিশেষ প্রয়োজনে এ দু’সময়ে জানাযা পড়া ও লাশ দাফন করা যাবে। আর যদি নিষিদ্ধ সময়টি স্বল্প হয় তাহলে জানাযা ও দাফন কিছুই করা যাবে না। আর সল্প সময় বলতে বুঝায় ঠিক বেলা উঠার পূর্ব মুহূর্ত এবং ঠিক দ্বিপ্রহর ও সুর্যাস্তের সময়। সাহাবি উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«ثلاث ساعات كان رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهانا أن نصلي فيهن و أن نقبر فيهن موتانا: حين تطلع الشمس بازغة حتى ترفع وحين يقوم قائم الظهيرة حتى تزول وحين تضيّف الشمس للغروب».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন সময়ে আমাদেরকে জানাযা পড়তে ও তাতে আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন, সুর্যোদয়ের সময় যতক্ষণ না তা পরিপূর্ণরূপে উদয় হয়, ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যায়  এবং ঠিক সূর্যাস্তের সময়। [মুসলিম]

প্রশ্ন ২৩- বিদ’আতির জানাযায় অংশ গ্রহণ না করার বিধান কি?

উত্তর – বিদ’আতির বিদ‘আত যদি বিত’আতিকে কুফর পর্যন্ত নিয়ে যায়, যেমন খারেযি, মুতাযিলা ও জাহমিয়া প্রমূখ পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের বিদ‘আত। তাহলে এরূপ বিদ’আতির জানাযায় অংশ গ্রহণ করা কারো পক্ষেই জায়েয নয়।

আর যদি তার বিদ‘আত এ পর্যায়ের না হয়, তবুও আলেমদের উচিত বিত’আতের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে তার জানাযা পরিত্যাগ করা।

প্রশ্ন ২৪- আলেমদের ন্যায় জনসাধারণ কি বিদ’আতির জানাযা পরিত্যাগ করবে না ?

উত্তর – প্রতিটি মুসলিমের জানাযা পড়া ওয়াজিব, যদিও সে বিদ’আতি হয়। সুতরাং বিদ‘আত যদি কুফরের পর্যায়ের না হয়, তাহলে এরূপ বিদ’আতির জানাযা মুষ্টিমেয় কিছু লোক পড়ে নেবে। আর যদি বিদ‘আত কুফরের পর্যায়ের হয়, যেমন খারেযি, রাফেযি, মুতাযিলা ও জাহমিয়া প্রমূখদের বিদ‘আত, যারা বিপদে-আপদে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও রাসূলের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের শরণাপন্ন হয়, তাদেরকে আহ্বান করে, তাহলে এরূপ বিদ‘আতিদের জানাযায় অংশগ্রহণ করা কাহারো জন্যই জায়েয নেয়। আল্লাহ তাআলা মুনাফেক ও তাদের ন্যায় অন্যান্য কাফেরদের প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا وَلَا تَقُمۡ عَلَىٰ قَبۡرِهِۦٓۖ إِنَّهُمۡ كَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَمَاتُواْ وَهُمۡ فَٰسِقُونَ ٨٤﴾ [التوبة: 84]

“আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের উপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে”। সূরা আত-তাওবাহ: (৮৪)

প্রশ্ন ২৫- জানাযায় অধিক সংখ্যক লোকের অংশ গ্রহণে কি বিশেষ কোন ফজিলত আছে?

উত্তর – সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«ما من رجل مسلم يموت فيقوم على جنازته أربعون رجلا لايشركون بالله شيئاً إلا شفعهم الله فيه»

“যদি কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করে, আর তার জানাযায় চল্লিশ জন লোক এমন উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে না, আল্লাহ মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করবেন”। (মুসলিম)

তাই আলেমগণ বলেছেন, যে মসজিদে মুসল্লি বেশী হয়, জানাযার জন্য ঐ মসজিদ অন্বেষণ করা মুস্তাহাব, মুসল্লি যত বেশী হবে ততই মৃতের জন্যে কল্যাণ হবে, কারণ এতে সে অধিক মানুষের দু’আ পাবে।

প্রশ্ন ২৬- জানাযার সালাতে ইমামের দাঁড়ানোর নিয়ম কি?

উত্তর – সুন্নত হচ্ছে ইমাম পুরুষদের মাথা বরাবর আর মহিলাদের মাঝা বরাবর দাঁড়াবে। জানাযা একাধিক লোকের হলে প্রথমে সালাবক পুরুষদের লাশ, অতঃপর নাবালেক ছেলেদের লাশ, অতঃপর সাবালক নারীদের লাশ, অতঃপর নাবালেক মেয়েদের লাশ রাখবে। একই সাথে সবার উপর নামাজ পড়ার জন্য প্রথমে পুরুষদের লাশ লাখবে, অতঃপর তাদের মাথা বরাবর বাচ্ছাদের মাথা রাখাবে, অতঃপর তাদের মাথা বরাবর নারী ও মেয়েদের কোমর রাখবে।

প্রশ্ন ২৭- জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

« صلوا كما رأيتموني أصلي »

“তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ, সেভাবেই সালাত আদায় কর”। (বুখারি)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

« لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب »

“ঐ ব্যক্তির কোন সালাত হয়নি, যে সূরা ফাতিহা পাঠ করে নি”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ২৮- চতুর্থ তাকবির শেষে কিছু পড়ার বিধান আছে কি?

উত্তর – চতুর্থ তাকবির শেষে কিছু পড়ার প্রমাণ নেই, তবে চতুর্থ তাকবির শেষে একটু চুপ থেকে অতঃপর সালাম ফিরাবে।

প্রশ্ন ২৯- ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ মৃতলোকের জানাযায় অতিরিক্ত তাকবির বলা যাবে কি?

উত্তর – প্রচলিত নিয়ম তথা চার তাকবিরের উপর সীমাবদ্ধ থাকাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ জীবনে জানাযার পদ্ধতি এরূপই ছিল। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী অত্যন্ত সম্মানী মানুষ হওয়া সত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযায় চারের অধিক তাকবির বলেননি।

প্রশ্ন ৩০- জানাযার নামাজে রাসূলের উপর দরূদ পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – ওলামায়ে কেরামের প্রশিদ্ধ উক্তি অনুযায়ী জানাযার সালাতে রাসূলের উপর দরূদ পড়া ওয়াজিব। মুসল্লিরা জানাযায় কখনো রাসূলের উপর দরূদ পরিত্যাগ করবে না।

প্রশ্ন ৩১- জানাযায় সূরা-ফাতিহা পড়ার বিধান কি?

উত্তর – সূরা ফাতিহা পড়া উত্তম, সাহাবি ইব্‌ন ইব্বাস রাদিআল্লাহ আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়তেন।

প্রশ্ন ৩২- জানাযার প্রতি তাকবিরে হাত উঠানো কি সুন্নত ?

উত্তর – জানাযার প্রতি তাকবিরে হাত উঠানো সুন্নত। বর্ণিত আছে যে, সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর ও আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস প্রতি তাকবিরে হাত উঠাতেন। (দারা কুতনি)

প্রশ্ন ৩৩- জনৈক ব্যক্তি জানাযা পড়তে মসজিদে প্রবেশ করল, কিন্তু তখনো সে ফরজ সালাত পড়েনি, এমতাবস্থায় সে কি প্রথমে ফরজ নামাজ পড়বে, না অন্যান্য লোকদের সাথে জানাযায় অংশগ্রহণ করবে। যদি ইতিমধ্যে লাশ তুলে নেয়া হয় তাহলে সে জানাযার নামাজ পড়বে কি না?

উত্তর -এমতাবস্থায় সে প্রথমে জানাযার নামাজ আদায় করবে অতঃপর ফরজ নামাজ পড়বে, কারণ তখন যদি সে জানাযা না পড়ে পরবর্তীতে পড়তে পারবে না, পক্ষান্তরে ফরজ নামাজ তো পরেও পড়া যাচ্ছে। লাশ তুলে নেয়ার হলে দাফনের পর জানাযা পড়বে।

প্রশ্ন ৩৪- আমাদেরে কর্মক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোন সহকর্মী মারা গেলে বিজ্ঞাপন বিতরণ করা হয়, যাতে জানাযার সময় ও দাফনের স্থানের উল্লেখ থাকে, এ ব্যাপারে শরি‘আতের হুকুম কি?

উত্তর – যদি এরূপ বলা হয় যে অমুক মসজিদে অমুকের জানাযা হবে ইত্যাদি, তাহলে আমার জানা মতে দোষের কিছু নেই, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাশির ব্যাপারে বলেছিলেন।

প্রশ্ন ৩৫- গায়েবানা জানাযার বিধান কি?

উত্তর – প্রসিদ্ধ মতানুসারে এটা নাজ্জাশীর জন্যে নির্দিষ্ট ছিল। তবে কতিপয় আলেম বলেছেন যে, মৃত ব্যক্তি যদি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়, যেমন বড় আলেম, বড় দায়ি, ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যার বিশেষ অবদান রয়েছে, এরূপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গায়েবানা জানাযা পড়া যেতে পারে। কিন্তু আমাদের জানা মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক নাজ্জাশি ছাড়া অন্য কারো উপর গায়েবানা জানাযা পড়েননি, অথচ তাঁর নিকট মক্কাতুল মুক্কারামাহসহ বিভিন্ন স্থান হতে অনেক সাহাবিদের মৃত্যুর সংবাদ এসে ছিল। বাস্তবতার নিরিখে এটাই সত্য মনে হচ্ছে যে, গায়েবানা জানাযা নাজ্জাশির জন্যেই নির্দিষ্ট ছিল, তথাপিও যদি কেউ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী যেমন আলেম ও সরকারী কর্মকর্তা প্রমূখদের উপর পড়তে চায়, তাহলে পড়ার অবকাশ রয়েছে।

প্রশ্ন ৩৬- জানাযায় অধিক কাতার মুস্তাহাব, তাই প্রথম কাতারে জায়গা রেখে দ্বিতীয় কাতার করা যাবে কি?

উত্তর – ফরজ নামাজের কাতারের ন্যায় জানাযার নামাজের কাতার হবে। তাই আগে প্রথম কাতার পূর্ণ করবে অতঃপর দ্বিতীয় কাতার। এক্ষেত্রে সাহাবি মালেক ইব্‌ন হুবাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে না, কারণ তার বর্ণিত হাদিসটি বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রথম কাতার পূরণ করা ওয়াজীব।

প্রশ্ন ৩৭- জানাযার নামাজ কি মাঠে পড়া উত্তম না মসজিদে?

উত্তর – সম্ভব হলে মাঠে পড়াই উত্তম। তবে মসজিদে পড়াও জায়েয আছে, যেমন মুমিন জননী আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়জা নামীয় ব্যক্তির দু’পুত্রের জানাযা মসজিদেই পড়েছেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন ৩৮- জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়া সুন্নত, এ ব্যাপারে লোকজনকে অবগত করার জন্যে মাঝে মধ্যে তা স্বশব্দে পড়া কেমন?

উত্তর – কখনো কখনো সূরা ফাতিহা স্বশব্দে পড়তে সমস্যা নেই, যদি সূরা ফাতিহার সাথে অন্য কোন ছোট একটি সূরা বা কিছু আয়াত মিলিয়ে নেয়া হয় তাহলে আরও ভাল। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে নিতেন। তবে যদি শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে তাও যথেষ্ট।

প্রশ্ন ৩৯- গায়েবানা জানাযার পদ্ধতি কি?

উত্তর – লাশ উপস্থিত থাক আর না থাক জানাযার পদ্ধতি একই।

দাফন ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন ১- কবরের উপর পাথরকুচি রাখা ও পানি দেয়ার বিধান কি?

উত্তর – যদি সম্ভব হয় কবরের উপর পাথরকুচি রাখা মুস্তাহাব, কেননা এর ফলে কবরের মাটি জমে থাকে। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের উপর কাঁচ ভাঙ্গা রাখা হয়েছিল। কবরের উপর পানি ঢালা মুস্তাহাব, যেন মাটিগুলো জমে যায় ও সহজে মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, ফলে মানুষ তার অবমাননা থেকে মুক্ত থাকবে।

প্রশ্ন ২- লাশ কবরে রেখে মুখ খুলে দেবে কি?

উত্তর – মুখ খুলবে না বরং ঢেকে রাখবে। হ্যাঁ, এহরামাস্থায় যার মৃত্যু হয় তার মুখ খুলে দেবে। আরাফাতের ময়দানে এহরাম অবস্থায় জনৈক ব্যক্তির মূত্য হলে লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার দাফন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

«إغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تخمروا رأسه ولا وجهه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا»

“তাকে কুলপাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা গোসল দাও এবং এহরামের দু’কাপড়ে কাফন দাও, তার মাথা ও মুখ ঢেকো না, কারণ কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ৩- অনেকেই মুখ খোলা রাখা ও পাথর রাখার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দেয়, মূলত এর কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – এ ধরণের কথার কোন ভিত্তি নেই, এটা মুর্খতা ও অজ্ঞতার আলামত।

প্রশ্ন ৪- মৃত ব্যক্তি যদি তার লাশ অন্য কোন শহরে দাফন করার জন্য অসিয়ত করে, তাহলে তার এ অসিয়ত পুরো করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – না, তার এ অসিয়ত পুরো করা ওয়াজিব নয়, সে যদি কোন মুসলিম শহরে মারা যায়, তাহলে তাকে ঐ শহরেই দাফন করা বাঞ্চনীয়।

প্রশ্ন ৫- দাফন করার সময় মহিলাদের কবর ঢেকে রাখার বিধান কি?

উত্তর – এটা উত্তম।

প্রশ্ন ৬- মৃত ব্যক্তি যদি জীবিতদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়, তাহলে সে তালকিন অবশ্যই শুনতে পাবে, এ ধরণের মন্তব্য কতটুকু সঠিক?

উত্তর – শরিয়ত অনুমোদিত সকল ইবাদত নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ, এতে অনুমান বা ধারণার কোন অবকাশ নেই। মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পায়ের ধ্বনি শোনে ঠিক, কিন্তু এর ফলে তার কোন ফায়দা হয় না।

মৃত্যুর ফলে মানুষ দুনিয়া হতে আখেরাতে ফিরে যায়, কর্মস্থল ত্যাগ করে ভোগের জায়গায় প্রত্যাবর্তন করে।

প্রশ্ন ৭- কবর খননের লাহাদ ও শেক তথা সিন্দুক ও বগলি এ দু’প্রকারের মধ্যে কোনটি উত্তম এবং দাফন শেষে কবর কতটুকু উঁচু করবে?

উত্তর – মদীনাবাসী লাহাদ খননেই অভ্যস্ত ছিল, তবে কখনো কখনো শেকও খনন করত, যেহেতু আল্লাহ তাআলা তার হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে লাহাদ পছন্দ করেছেন, তাই লাহাদই উত্তম, তবে শেকও জায়েয, বিশেষ করে যখন কোন প্রয়োজন দেখা দেয়। সাহাবি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

اللحد لنا والشق لغيرنا

“লাহাদ আমাদের জন্যে আর শেক অন্যদের জন্যে”। এ হাদিসটি খুবই দুর্বল। কারণ এ হাদিসের সনদে বিদ্যমান আব্দুল-আ’লা আছ্ছালাবী নামক জনৈক বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। আর কবর উঁচু করা হবে এক বিঘত বা তার কাছাকাছি পরিমাণ।

প্রশ্ন ৮- অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মৃতের ওলী ওয়ারিসগণ উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সম্মানিত উপস্থিতি আপনারা আপনাদের দাবি-দাবা মাফ করেদিন, তাকে ক্ষমা করে দিন, তার জন্যে সবাই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এ জাতীয় প্রথা কি শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এ জাতীয় প্রথার কোন ভিত্তি আছে আমার জানা নেই। হ্যাঁ, যদি জানা থাকে যে, মৃত্যুবরণকারী লোকটি মানুষের উপর জুলুম করেছে তাহলে বলা যেতে পারে যে, আপনারা আপনাদের দাবী মাফ করেদিন। অন্যথায় শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, আপনারা তার জন্যে আল্লাহর নিকট দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

প্রশ্ন ৯- কবর বা কবরস্থানের রাস্তা আলোকৃত করার বিধান কি?

উত্তর – যদি তা মানুষের উপকার্থে বা লাশ দাফনের সুবিদার্থে করা হয় তাহলে জায়েয, যেমন প্রাচীর ঘেরা গোরস্থান যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো নেই, লাশ দাফনের সুবিধার্থে সেখানে আলোর ব্যবস্থা করা বৈধ। অন্যথায় কবরের উপর বাতি জালানো বা কবরকে আলোকসজ্জা করা নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم زائرات القبور والمتخذين عليها المساجد والسرج» (رواه الترمذي)

“কবর যিয়ারতকারী নারী, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ও তাতে আলোকসজ্জাকারীদের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন”। (তিরমিজি)

অনুরূপ যদি মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তায় বাতি দেয়া হয় আর তাতে কবর কিছুটা আলোকৃত হয় তবুও দোষের কিছু নেই। অনুরূপ লাশ দাফনের জন্যে বাতি জালানোতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ১০- মাইয়্যেতের সাথে চলার সুন্নত তরিকা কি?

উত্তর – মাইয়্যেতের সাথে জানাযার স্থানে যাবে, অতঃপর গোরস্থানে দাফন শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من تبع جنازة مسلم إيمانا واحتسابا وكان معها حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل جبل أحد» (رواه البخاري)

“যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত ও সাওয়াবের আশায় কোন মুসলিমের জানাযায় অংশ গ্রহন করল এবং দাফন পর্যন্ত তার সাথে থাকল ও তার দাফন কর্ম শেষ করল, সে দু’কিরাত নেকি নিয়ে ফিরবে, প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পাহাড় পরিমাণ”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১১- মৃত ব্যক্তির জন্য ইস্তেকামাতের দু’আ কখন করবে, দাফনের পর না দাফনের মাঝে?

উত্তর – দাফন শেষ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম দাফনের কাজ শেষ করে কবরের পাশে দাড়িয়ে বলেছিলেন,

 «استغفروا لأخيكم ، واسألوا الله له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা পার্থনা কর এবং আল্লাহর নিকট তার জন্য ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হবে। [আবু দাউদ]

«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ» (رواه ابوداود)

“আল্লাহর নামে ও তার রাসূলের তরিকা অনুযায়ী এ লাশ দাফন করছি”। (আবু দাউদ)

প্রশ্ন ১২- কবর আযাব প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যেমন জনৈক ব্যক্তিকে দাফন করার উদ্দেশ্যে কবরে রাখা হলে সাপ বেরিয়ে আসে, যখন অন্য কবরে রাখা হয় সেখানেও সাপ বেরিয়ে আসে ইত্যাদি, এ সবরে ভিত্তি কতটুকু?

উত্তর – ঘটনার সত্যতা সমন্ধে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, তবে এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আল্লামা ইবনে রজন রাহিমাহুল্লাহ নিজ গ্রন্থ “আহওয়ালুল কবর” এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রশ্ন ১৩- ওয়াজ ও নসিহতের সময় এসব ঘটনা উপাস্থাপন বলা কি ঠিক?

উত্তর – এসব ঘটনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যেহেতু জানা যায়নি, তাই এগুলো না বলা উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা যা প্রমাণিত তাই যথেষ্ট। মূল বিষয় হচ্ছে মানুষদেরকে ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দান করা ও গুনাহের প্রতি নিরুৎসাহিত করা। যেমনটি করেছিলেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কিরাম। এ ছাড়া বাস্তব-অবাস্তব কিচ্ছা-কাহিনী না বলাই ভাল।

প্রশ্ন ১৪- এক কবরে নারী-পুরুষ উভয়কে দাফন করা কি জায়েয?

উত্তর – এতে কোন সমস্যা নেই, প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, যখন যুদ্ধ বা মহামারি ইত্যাদি কারণে অনেক লাশ একত্র জমা হয়।

প্রশ্ন ১৫- লাশ কবরে রেখে বাঁধন খুলে দেবে কি?

উত্তর – বাঁধন খুলে দেয়া উত্তম, সাহাবিগণ এরূপ করতেন।

প্রশ্ন ১৬- কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করা জায়েয আছে কি?

উত্তর – কবরের উপর পাথর, হাড্ডি বা লোহা ইত্যাদি দ্বারা চিহ্ন স্থাপন করার দোষণীয় নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি ওসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

প্রশ্ন ১৭- মৃতকে কেবলামুখি করে রাখা সুন্নত না মুস্তাহাব?

উত্তর – মৃতকে কেবলামুখী করে রাখা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الكعبة قبلتكم أحياء و أمواتا» (رواه أبو داود)

“জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায়ই বাইতুল্লাহ তোমাদের কিবলা”। (আবুদাউদ)

তাই মৃতকে ডান পাঁজরে শুইয়ে কেবলামুখী করে রাখবে।

প্রশ্ন ১৮- কবর সংস্কার করা কি জায়েয?

উত্তর – প্রয়োজন হলে কবর সংস্কার করা যায়, যেমন কবরের নির্দিষ্ট জায়গা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা অন্য কোন প্রয়োজনে।

প্রশ্ন ১৯- মৃতুদের হাড্ডি জীর্ণ হয়ে গেলে সেগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা কি জায়েয?

উত্তর –  প্রয়োজন হলে স্থানান্তর করা যাবে, অন্যথায় নিজ স্থানে কবর বহাল থাকবে।

প্রশ্ন ২০- দিনে লাশ দাফন করা উত্তম, এ কথার ভিত্তি কি?

উত্তর – নিষিদ্ধ তিন সময় ব্যতীত যে কোন সময় লাশ দাফন করা বৈধ, সাহাবি উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন সময় নামাজ পড়তে ও আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় ও ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়, যতক্ষণ না তা হেলে যায়।

প্রশ্ন ২১- মৃত ব্যক্তি যদি মহিলা হয়, আর তার কোন অভিভাবক যদি উপস্থিত না থাকে, তাহলে পুরুষগণ স্বেচ্ছায় তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে কি সহযোগিতা করতে পারবে?

উত্তর – মৃত মহিলার অভিভাবক উপস্থিত থাকা সত্বেও তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে স্বেচ্ছায় পুরুষরা সহযোগিতা করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত থাকা সত্বেও তাঁর এক মেয়ের লাশ অন্য পুরুষরা কবরে নামিয়ে ছিল।

প্রশ্ন ২২- কোন মসজিদে যদি কবর থাকে, যা স্থানান্তরে ফিতনার আশঙ্কা হয়, তাহলে সে কবরটি স্থানান্তর করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – এমতাবস্থায় দেখতে হবে যে কোনটি আগে, কবর না মসজিদ, যদি মসজিদ আগে নির্মাণ হয়, তাহলে মসজিদ ঠিক রেখে কবর নিঃশেষ করতে হবে, তবে এ কাজটি আদালত বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা যেন কোন ধরণের ফিতনা সৃষ্টি না হয়। আর যদি কবর আগে স্থাপিত হয়, তাহলে কবর ঠিক রেখে মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (متفق على صحته)

“ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (বুখারি ও মুসলিম)

এমনিভাবে মুমিন জননী উম্মে-সালমা ও উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাবশায় অবস্থিত গীর্জা ও তাতে নির্মিত মূর্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ দিলে, তিনি বলেনঃ

«أولئك إذا مات فيهم الرجل الصالح بنوا على قبره مسجدا وصوروا فيه تلك الصور أولئك شرار الخلق عند الله» (رواه البخاري ومسلم)

“তারা এমন যে, যখন তাদের কোন নেককার লোক মারা যায়, তারা তার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করে ও তাতে তার ছবি অঙ্কন করে, এরাই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম মাখলুক”। (বুখারি ও মুসলিম)

হাদিস দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কবরের উপর নির্মিত মসজিদে নামাজ পড়লে তার নামাজ শুদ্ধ হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরণের মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন, কারণ এটা শিরকে আকরের মাধ্যে গণ্য।

প্রশ্ন ২৩- এক কবরে দু’লাশ রাখার পদ্ধতি কি?

উত্তর – দু’জনের মধ্যে যে অধিক সম্মানী তাকে প্রথমে কিবলা মুখী করে রাখবে, অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে রাখবে। উভয়কে ডান পাজরের উপর কিবলামুখী করে শোয়াবে। যদি তিন ব্যক্তিকে একই কবরে দাফন করতে হয়, তাহলে তৃতীয় ব্যক্তিকে পূর্বের দু’জনের পাশে শোয়াবে। বর্ণিত আছে যে, ওহুদ যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী সাহাবাদের লাশের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দু’জন, দু’জন ও তিনজন তিনজন করে এক-এক কবরে দাফন কর। যে কোরআনে অধিক পারদর্শী তাকে আগে রাখ।

প্রশ্ন ২৪- দাফন করার সময় নিম্নে বর্ণিত আয়াত পাঠ করার বিধান কি?

﴿مِنۡهَا خَلَقۡنَٰكُمۡ وَفِيهَا نُعِيدُكُمۡ وَمِنۡهَا نُخۡرِجُكُمۡ تَارَةً أُخۡرَىٰ ٥٥﴾ [طه:55]

 “মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব এবং এ মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব”। সূরা তা-হা: (৫৫)

উত্তর – দাফনের সময় এ আয়াত বলা সুন্নত তবে এর সাথে আরো যুক্ত করবে—

بسم الله والله اكبر

প্রশ্ন ২৫- কাফনের কাপড়ে কালিমায়ে তাইয়্যিবা লিখা, অথবা কাগজে লিখে তা কাফনে রেখে দেয়া কেমন?

উত্তর – এ ধরণের কাজের কোন ভিত্তি নেই। শরিয়ত স্বীকৃত কাজ হচ্ছে উপস্থিত লোকজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালিমায়ে তাইয়্যিবা তালকিন করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لقنوا موتاكم لا إله إلا الله» (رواه مسلم)

“তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর তালকিন কর”। (মুসলিম) যেন মৃতের সর্বশেষ কথা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হয়। এ ছাড়া কাফনের উপর বা কবরের দেয়ালে কালিমা লেখার কোন বিধান নেই।

প্রশ্ন ২৬- কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করা কেমন?

উত্তর – কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করতে নিষেধ নেই, এটা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়, সাহাবি বারা ইব্‌ন  আজেব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করেছেন।

সান্ত্বনা দান ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন ১- শোকবার্তা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ও তাদের সাথে বৈঠক করা কি বৈধ?

উত্তর – শোকাহত মুসলিম পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়া মুস্তাহাব, এর মাধ্যমে তাদেরকে সুহৃদয়তা দেখানো হয়। এ সময় যদি তাদের নিকট চা, কফি ইত্যাদি পান করে বা আতর ইত্যাদি গ্রহণ করে, যা সাধারণত অন্যান্য সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে করা হয়, এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ২- শোক প্রকাশের সময় এ কথা বলা কেমন যে, সে তার শেষ ঠিকানায় চলে গেছে?

উত্তর – আমার জানামতে তাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ দুনিয়ার তুলনায় পরকাল নিশ্চয় তার শেষ ঠিকানা। তবে মুমিনদের সত্যিকারের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত আর কাফেরদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।

প্রশ্ন ৩- সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্যেঃ

﴿يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧﴾ [الفجر:27]

“হে প্রশান্ত আত্মা” [ফজর: ২৭] বলে মৃতকে সম্বোধন করা কেমন?

উত্তর – এ ধরণের বাক্য পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ তাদের জানা নেই যে মৃতের আত্মা বাস্তবিকেই কেমন। শরিয়ত অনুমোদিত আমল হচ্ছে মৃতের জন্যে প্রার্থনা করা, তার জন্যে ক্ষমা ও রহমতের দো‘আ করা।

প্রশ্ন ৪- পেপার পত্রিকায় শোকপ্রকাশ করা কেমন, এটাকি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর – এটা নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত না হলেও বর্জন করা উচিত, কারণ এতে নিষ্প্রয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়।

প্রশ্ন ৫- মৃতের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তিন দিন পর্যন্ত মৃতের বাড়িতে অবস্থান করে, এটা কেমন?

উত্তর – মৃতের পরিবারের সাথে হৃদ্যতা প্রকাশের জন্য সেখানে তিন অবস্থান করা বৈধ, তবে এ ক্ষেত্রে ওলিমার ন্যায় লোকদের জন্য খাওয়ার অনুষ্ঠান করবে না।

প্রশ্ন ৬ – সান্ত্বনা দেয়ার জন্য কি কোন নির্ধারিত সময় আছে?

উত্তর – আমার জানামতে এর জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই।

প্রশ্ন ৭- শোকাহত পরিবারকে খানা পৌঁছানো বাবদ জবেহকৃত প্রাণী পাঠিয়ে দেয়া কেমন?

উত্তর – দেয়া যেতে পারে, নিকটতম আত্মীয়দের দ্বারা তা রান্না করে নেবে। মুতার যুদ্ধে সাহাবি জাফর ইবন আবু তালিব শাহাদত বরণ করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা তৈরি করে পাঠিয়ে দাও, কারণ তারা কঠিন বিপদগ্রস্ত খানা তৈরির মানষিকতা তাদের নেই।

প্রশ্ন ৮- মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করেছে যে, তার ইন্তেকালের পর যেন বিলাপ করা না হয়, তবও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে, তাহলে কি মৃতকে আযাব দেয়া হবে?

উত্তর – তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, প্রত্যেকের উচিত তার আপনজনদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা। ওয়ারিসদের সতর্ক করার পরও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে তাহলে ইনশাল্লাহ সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ١٨﴾ [فاطر:18]

“আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”। সূরা ফাতিরঃ (১৮)

প্রশ্ন ৯- শোকাহত পরিবারের জন্য প্রেরিত দুপর বা রাতের খাবারে অন্য কেউ অংশগ্রণ করলে তা কি মাতম বা বিলাপে পরিণত হবে?

উত্তর – না, তা মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কারণ আগত লোকদের জন্য শোকাহত পরিবার খানার ব্যাবস্থা করেনি, বরং অন্যরা তাদের জন্য ব্যাবস্থা করেছে, আর তা অতিরিক্ত হওয়ায় অন্যরা তাতে অংশগ্রহণ করেছে, তাই এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ১০ – অনিচ্ছায় যদি ক্রন্দনের মধ্যে বিলাপ এসে যায় তাহলে তার হুকুম কি?

উত্তর – বিলাপ সর্বাস্থায় না জায়েয, তবে চক্ষু অশ্রুশিক্ত ও অন্তর বিষণ্ন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহিমের ইন্তেকালের পর তিনি বলেছেন,

«العين تدمع و القلب يحزن ولا نقول إلا ما يرضى الرب و إنا لفراقك يا إبراهيم لمحزونون» رواه البخاري)

“চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করছে, অন্তর ব্যথিত হচ্ছে, তবুও প্রভূর অসন্তুষ্টির কারণ হয় এমন কথা বলব না, হে ইব্রাহীম, তোমার বিরহে আমরা ব্যথিত”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১১ – শোকপ্রকাশের জন্য সফর করা ও শোকাহত লোকদের নিকট অবস্থান করা কেমন?

উত্তর – এ বিষয়টি শোকাহত লোকদের অবস্থার উপর নির্ভর করবে, তারা যদি এতে আন্দবোধ করে তাহলে তাদের নিকট অবস্থান করতে কোন সমস্যা নেই, অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ১২ – ফকিহগণ বলেছেন, স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য সর্বোচ্চ তিন দিন শোক প্রকাশ করা বৈধ, অর্থাৎ সাজসজ্জ্বা ত্যাগ করা, কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর – কথাটি সম্পূর্ণ সঠিক, বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «لا تحد امرأة على ميت فوق ثلاث إلا على زوج أربعة أشهر وعشرا» (متفق عليه)

“কোন নারী মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ করেব না, তবে তার স্বামীর জন্য চারমাস দশদিন শোক প্রকাশ করবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৩ – শোকাহত পরিবার নিজেদের খানা নিজেরা পাক করতে পারবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, তারা নিজেদের খানা নিজেরা রান্না করবে, এতে কোন সমস্যা নেই, তবে কারো জন্য পাকাবে না।

প্রশ্ন ১৪ – মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা কি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর – মৃতকে উদ্দেশ্যে করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা হারাম ও নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে কারো প্রশংসায় সীমাতিরিক্ত করা কোন অবস্থাতে জায়েয হবে না। যেমন করে থাকে কবি ও গায়কগণ।

প্রশ্ন ১৫ – পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শোকবার্তা পাঠনো কেমন?

উত্তর – বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষ, কারণ এটা একটি ব্যয়বহুল কাজ, তবুও যদি সত্যবাণী দ্বারা শোকপ্রকাশ করা হয় তবে জায়েয, তবে এভাবে না করাই উত্তম। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তাদের নিকট পত্র পাঠাবে বা মোবাইল করবে, বা সাক্ষাত করবে।

কবর যিয়ারত

প্রশ্ন ১ – কবর দৃষ্টিগোচর হলে বা কবরের দেয়াল অতিক্রম করলে কবরবাসীদেরকে সালাম করতে হবে কি?

উত্তর – পথিক হলেও সালাম দেয়া উত্তম, এরূপ ব্যক্তির যিয়ারতের নিয়ত করে নেয়া উত্তম।

প্রশ্ন ২ – যিয়ারতকারীর নির্দিষ্ট কবরের পাশে গিয়ে যিয়ারত করার হুকুম কি?

উত্তর – গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ করাই যথেষ্ট, তবুও যদি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ ও সালাম করতে চায় করতে পারবে।

প্রশ্ন ৩ – মৃত ব্যক্তি যিয়ারতকারীকে চিনতে পারে?

উত্তর – কতিপয় হাদিসে এসেছে যে, যিয়ারতকারী যদি এমন হয় যে দুনিয়াতে তার সাথে পরিচয় ছিল তাহলে আল্লাহ যিয়ারতকারীর সালামের উত্তর দেয়ার জন্য তার রুহ ফিরিয়ে দেন । কিন্তু এ হাদিসের সনদে কিছু ত্রুটি রয়েছে। অবশ্য আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

প্রশ্ন ৪ – উম্মে আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত,

«نهينا عن اتباع الجنائز ولم يعزم علينا»

“আমাদেরকে জানাযার সাথে চলতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি”। হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – আবস্থা দৃষ্টে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, বর্ণনাকারীর  মতে নিষেধটি কঠোর নয়, তবে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে প্রত্যেক নিষেধ হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।

«ما نهيتكم عنه فاجتنبوه وما أمرتكم به فأتوا منه ما استطعتم» (متفق عليه)

“আমি যার থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তোমরা তা পরিত্যাগ কর, আর আমি তোমাদেরকে যার আদেশ দেই, তোমরা তা সাধ্যানুসারে পালন কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, মহিলাদের জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত যাওয়া হারাম, তবে পুরুষদের ন্যায় তারা জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে।

প্রশ্ন ৫ – একটি হাদিসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটতে দেখে বললেন, হে জুতা ওয়ালা! তোমার জুতাদ্বয় খুলে নাও। এ হাদিসের উপর কি আমল করা যাবে? জুতা নিয়ে কেউ কবরের উপর হাটা-চলা করতে চাইলে তাকে কি নিষেধ করা হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে, সুতরাং কোন অবস্থাতেই কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটা-চলা করা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, বিশেষ প্রয়োজনে যেমন কবরের উপর যদি কাঁটাদার গাছ থাকে বা মাটি অত্যন্ত গরম হয়, যে কারণে খালিপায়ে চলা অসম্ভব হয়, এমতাবস্থায় জুতা নিয়ে কবরের উপর হাঁটা যেতে পারে, এরূপ কোন বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাকে অবশ্যই নিষেধ করা হবে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। তাকে শরি‘আতের হুকুম জানিয়ে দেবে।

প্রশ্ন ৬ – গোরস্থানে প্রবেশকালে জুতা খুলার বিধান কি?

উত্তর – কবরের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে জুতা অবশ্যই খুলতে হবে, আর যদি কবরের উপর দিয়ে না হেটে গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়, তা হলে জুতা খুলতে হবে না।

প্রশ্ন ৭ – জনৈক মহিলাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দরত আবস্থায় দেখে বলেছিলেন,

«اتقي الله واصبري»

“আল্লাহকে ভয়কর ও ধৈর্যধারণ কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস কি মহিলাদের কবর যিয়ারত বৈধ প্রমাণ করে না?

উত্তর – সম্ভবত উল্লিখিত ঘটনাটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য কবর যিয়ারত বৈধ থাকাকালিন সময়ের ঘটনা। আর মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষিদ্ধকারী হাদিস এ হাদিসের জন্যে নাসেখ বা এ হাদিসকে রহিতকারী।

প্রশ্ন ৮ – কিছু কিছু শহরে অনেক মানুষ কববের উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এটা নেহায়েত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ, এ কাজের দ্বারা কবরবাসীদের অপমান করা হয়, তাই তাদেরকে এ কাজ হতে বারণ করা এবং শরি‘আতের বিধান সম্পর্কে অবহিত করা জরুরী। তারা এসব কবরের উপর যেসব সালাত আদায় করেছে, তা সব বাতিল ও বৃথা। এ অবস্থায় কবরের উপর বসাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বলেছেন,

« لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها » (رواه مسلم)

“কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না”। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লম আরো বলেছেন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (رواه البخاري)

“আল্লাহ ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর লানত করেছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (বুখারি ও মুসলিম)

এ হাদিস সম্পর্কে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা তাদেরকে তাদের গর্হিত কাজের জন্য সতর্ক করেছেন।

প্রশ্ন ৯ – জনৈক ব্যক্তির কবরের উপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হল, আর ঐ ব্রিজের উপর দিয়ে একটি যাত্রিবাহী গাড়ি যাওয়ার সময় বিরত দিল, যাত্রীদের মাঝে একজন মহিলাও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গাড়িটির যাত্রা বিরতির কারণে সে মহিলা কি কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে, সে মহিলা কি কবরবাসীদের সালাম করবে?

উত্তর – না, মহিলা কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না, ব্রিজ কেন কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কবর যিয়ারতকারী বলে গণ্য হবে না। মহিলা যদি পথচারী হয়, তবুও তার পক্ষে কবরবাসীদের সালাম না করা উত্তম।

প্রশ্ন ১০ – একটি হাদিস প্রচলিত আছে,

« اذا مررتم بقبر كافر فبشروه بالنار »

“যখন তোমরা কোন কাফেরের কবরের পাশ দিয়ে যাও, তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর – আমার জানা মতে এ হাদিসের বিশুদ্ধ কোন সনদ নেই।

প্রশ্ন ১১- মহিলারা কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম দেবে কি?

উত্তর – আমার জানা মতে কবরবাসীদেরকে মহিলাদের সালাম না-করা উচিৎ। কারণ সালাম বিনিময় কবর যিয়ারতের রাস্তা উম্মুক্ত করবে, দ্বিতীয়ত সালাম দেয়া কবর জিয়ারতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মহিলাদের উপর ওয়াজি হচ্ছে সালাম বর্জন করা, তারা যিয়ারত ব্যতীত মৃতদের জন্য শুধু দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের নিয়ম কি?

উত্তর – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের সুন্নত তরিকা এই যে, কবরের দিকে মুখ করে সালাম দেবে, অতঃপর তাঁর দু’সাথী আবু-বকর ও ওমরকে সালাম দেবে, অতঃপর ইচ্ছা করলে অন্য জায়গায় গিয়ে কিবলামুখী হয়ে নিজের জন্য দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১৩ – মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করা নিষেধ, যেসব হাদিসে মহিলাদের কবর যিয়ারত থেকে বারণ করা হয়েছে, সেখানে রাসূলের কবরও অন্তর্ভুক্ত, তাই তাদের জন্য জরুরী হচ্ছে রাসূলের কবর যিয়ারত না-করা। মহিলাদের জন্য রাসূলের কবর যিয়ারত বৈধ না অবৈধ এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম দু’ভাগে বিভক্ত, তাই সুন্নতের অনুসরণ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য মহিলাদের জন্য যে কোন কবর যিয়ারত ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। তা ছাড়া মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ সংক্রান্ত হাদিসে রাসূলের কবরকে বাদ দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় হাদিসের ব্যাপকতার উপর আমল করাই ওয়াজিব, যতক্ষণ না এর বিপরীত কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ১৪ – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলকে শুধু সালাম করবে, শুধু কবর জিয়াতর উদ্দেশ্যে যাবে না, তবে মাঝে-সাজে যেতে পারে।

প্রশ্ন ১৫ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা কি জায়েয?

উত্তর – মসজিদে নববি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। তাই মসজিদে নববির যিয়ারত মূল উদ্দেশ্য করে সফর করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে নবীর কবর যিয়ারত করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لاتشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد: المسجد الحرام ومسجدي هذا والمسجد الاقصى» (رواه البخاري)

“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা যাবে নাঃ মাসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদে আকসা”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১৬ – কবর জিয়ারতের জন্য জুমার দিনকে নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – এর কোন ভিত্তি নেই। যিয়ারতকারী সুযোগ বুঝে যখন ইচ্ছা যিয়ারত করবে। জিয়ারতের জন্য কোন দিন বা রাতকে নির্ধারিত করা বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«من احدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের এ দ্বীনে যে কেউ নতুন কিছু আবিষ্কার করল, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

«من عمل عملا ليس عيه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ নয়, তা পরিত্যক্ত”। হাদিসটি ইমাম মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন ১৭ – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিভাবে কবর জিয়ারতের দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন?

উত্তর – কবর যিয়ারত প্রথমে সবার জন্য নিষেধ ছিল, অতঃপর সবার জন্য জায়েয হয়, অতঃপর শুধু মহিলাদের জন্য নিষেধ হয়। এ ব্যাখ্যার পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আহাকে কবর জিয়ারতের আদব তখন শিক্ষা দিয়েছিলেন যখন তা সবার জন্য জায়েয ছিল।

প্রশ্ন ১৮ – কবরের পাশে দো‘আ কি দু’হাত তুলে করতে হবে?

উত্তর – কবরের পাশে দু’হাত তুলে দো‘আ করা জায়েয আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে কবরবাসীদের জন্য দু’হাত তুলে দো‘আ করেছেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৯ – কবরের পাশে সম্মিলিত দোয়ার কি হুকুম?

উত্তর – কাউকে দো‘আ করতে দেখে শ্রোতাদের আমিন আমিন বলায় কোন বাঁধা নেই। তবে পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত দো‘আ করা যাবে না। অকস্মাৎ কাউকে দো‘আ করতে দেখে তার সাথে সাথে আমিন আমিন বলা যাবে, কারণ এটাকে সম্মিলিত দো‘আ বলা হয় না।

প্রশ্ন ২০ – গোরস্থানের প্রথমাংশে সালাম দিলে সমস্ত কবরবাসীর জন্য সালাম বিবেচ্য হবে?

উত্তর – এ সালামই যথেষ্ট, সে ইনশাল্লাহ জিয়ারতের সাওয়াব পেয়ে যাবে। যদি গোরস্থান অনেক বড় হয় আর সে ঘুরে ঘুরে সব দিক দিয়ে সালাম বিনিময় করতে চায় তাও করতে পারবে।

প্রশ্ন ২১ – অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা কি জায়েয?

উত্তর – শিক্ষা গ্রহণের জন্য হলে অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে তাঁর জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে এ বিষয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি। শুধু জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ২২ – দু’ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করার কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, যিয়ারতকারীর যখন সুযোগ হবে তখন সে যিয়ারত করবে, এটাই সুন্নত।

প্রশ্ন ২৩ – মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কবর মুখী হয়ে দো‘আ করা কি নিষেধ?

উত্তর – না, নিষেধ নয়, মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কেবলামুখী ও কবরমুখী উভয় বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির দাফন শেষে বললেন,

 «استغفروا لأخيكم واسألوا له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা কর এবং তার ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কেননা তাকে এখন প্রশ্ন করা হবে”। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেননি যে, কিবলামুখী হয়ে দো‘আ কর।

সুতরাং কিবলামুখী হয়ে দো‘আ করুক আর কবরমুখী হয়ে দো‘আ করুক উভয়ই জায়েয। রাসূলের সাহাবিগণ কবরের চতুর্পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করতেন।

প্রশ্ন ২৪- দু’হাত তুলে মৃতের জন্য দো‘আ করা কি জায়েয?

উত্তর – কিছু কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কবর যিয়ারত করে দো‘আ করতেন তখন দু’হাত তুলেই দো‘আ করতেন। যেমন ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে তাদের জন্য দো‘আ করার সময় দু’হাত তুলেছেন।

প্রশ্ন ২৫ – আমাদের এখানে কিছু সৎকর্মী যুবক বাস করে, তারা নিজেদের সাথে কতক গাফেল লোকদেরকে কবর জিয়ারতের জন্য নিয়ে যেতে চায়, হয়ত তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সঞ্চার হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের মত কি?

উত্তর – এটা একটি মহৎ কাজ, এতে কোন বাঁধা নেই। এটা ভাল কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

প্রশ্ন ২৬ – কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করার হুকুম কি?

উত্তর – লিখা বা নাম্বারিং করা ব্যতীত শুধু পরিচয়ের জন্য কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করা যেতে পারে। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন, আর নাম্বারিং করাও লিখার অন্তর্ভূক্ত। তবে কবরস্থ লোকের পরিচয়ের জন্য শুধু পাথর ইত্যাদি রাখা যাবে, কালো বা হলুদ রঙের পাথরও রাখা যাবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি উসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

জানাযা বিষয়ে বিভিন্ন ফতোয়া

প্রশ্ন ১ – ব্রেইন স্ট্রোকে মৃত্যুবরণকারীর অঙ্গদানের বিধান কি?

উত্তর – জীবিত হোক আর মৃত হোক প্রতিটি মুসলিম অত্যন্ত সম্মানের অধিকারী, সুতরাং তার সাথে এমন কোন আচরণ করা উচিৎ হবে না, যা তার জন্য কষ্টকর বা তার আকৃতি বিকৃতির শামিল, যেমন হাড় বাঙ্গা বা টুকরো টুকরো করা ইত্যাদি। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كسر عظم الميت ككسره حيا »( رواه أبوداود)

“মৃতের হাড় ভাঙ্গা তার জীবিত অবস্থায় হাড় ভাঙ্গার ন্যায়”। (আবুদাউদ) উল্লেখিত হাদিস এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কোন জীবিত ব্যক্তির উপকারার্থে মৃত  ব্যক্তির অঙ্গহানি করা, যেমন রিদপিন্ড বা কলিজা ইত্যাদি কর্তন করা জায়েয নয়, কারণ এটা হাড় ভাঙ্গা হতেও জঘন্য। মানবাঙ্গ দান করা জায়েয কি না এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। কতিপয় আলেম বলেছেন বর্তমান সময়ে অঙ্গদানের অধিক প্রয়োজন দেখা দেয়ার কারণে তা বৈধ। কিন্তু তাদের এ উক্তি সঠিক নয়। পূর্বোল্লিখিত হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, অঙ্গদান জায়েয নেই। এবং এতে যেমন মৃত ব্যক্তির অঙ্গের সাথে খেল-তামাশা করা হয়, অনুরূপ তাকে অপমানও করা হয়।

বাস্তব সত্য হল এই যে, মৃতের ওয়ারিসগণ সম্পদের লোভে মৃতের মানহানীর বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করে না, তা ছাড়া ওয়ারিসগণ তো শুধু মৃতের মালের ওয়ারিস হয় তার দেহের ওয়ারিস তো কেউ হয় না।

প্রশ্ন ২ – মৃত কাফেরের হাড় বিচ্ছিন্ন করার হুকুম কি?

 উত্তর – এ বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ, যদি মৃত কাফের জিম্মি অথবা চুক্তিভুক্ত বা নিরাপত্তা কামী হয়, তাহলে তার হাড় বিচ্ছিন্ন করা জায়েয হবে না, কারণ সে মুসলিমদের ন্যায় সম্মানী, আর যদি সে যুদ্ধরত দেশের হয় তাহলে জায়েয হবে।

প্রশ্ন ৩ – প্রতিশোধ বা কিসাস হিসাবে মৃতব্যক্তির হাড্ডি বিচ্ছিন্ন করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – ওয়াজিব নয়, কারণ কিসাস তো চলে শর্তসাপক্ষে শুধু জীবিতদের মাঝে।

প্রশ্ন ৪ – মৃতব্যক্তি অঙ্গদানের অসিয়ত করলে তা কি বাস্তবায়ন করা হবে?

উত্তর – পূর্বের ফতোয়ার কারণে তার অসিয়ত বাস্তবায়ন করা হবে না। যদিও সে অসিয়ত করে যায়, কারণ তার দেহের মালিক সে নিজে নয়।

প্রশ্ন ৫ – মৃতের সম্পদ থেকে প্রথমে কাফন ও সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন সুগন্ধি ইত্যাদির খরচ কি আলাদা করা হবে?

উত্তর – মৃতের ত্যাজ্য সম্পদ হতে সর্বপ্রথম কাফন দাফন যেমন লাশের গোসল দেয়া, কবর খনন করা ইত্যাদির খরচ বের করা হবে, অতপর বন্ধকের বিনিময়ে গৃহিত ঋণ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সাধারণ করজ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সম্পদের এক তৃতীয়াংশ হতে ওয়ারিস ব্যতীত অন্যদের জন্য কৃত অসিয়ত পূরণ করা হবে।

প্রশ্ন ৬ – কোন ব্যক্তির যদি ব্রেইন স্ট্রোক হয়, তাহলে তাকে তৎক্ষণাৎ মৃত বলা যাবে?

উত্তর – না, তাকে মৃত বলা যাবে না, তাকে মৃত ঘোষণা করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবে না, বরং মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অনেক সময় ডাক্তারগণ রুগির কলিজা ইত্যাদি কেটে নেয়ার জন্য এ বিষয়ে হাড়াহুড়ো করে, এবং মৃতকে নিয়ে যাই ইচ্ছা তাই করতে থাকে এগুলো সম্পুর্ণ না জায়েয।

প্রশ্ন ৭ – ডাক্তারগণ দাবি করেন যে, ব্রেইন স্ট্রোকের মানুষ কখনো জীবন ফিরে পায় না, কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর – তাদের এ দাবি নির্ভরযোগ্য নয়। আমাদের নিকট এমন অনেক তথ্য আছে যে, ব্রেইন স্ট্রোককৃত মানুষ জীবন ফিরে পেয়েছে এবং দীর্ঘদিন জীবিত ছিল। মূল কথা হচ্ছে ব্রেইন স্ট্রোককৃত ব্যক্তিকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রশ্ন ৮ – মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসিন ব্যতীত অন্য কোন সূরা পড়া জায়েয আছে কি?

উত্তর – যেহেতু হাদিস শরিফে সূরা ইয়াসিন পড়ার কথা এসেছে তাই ঐ সূরা পড়াই উত্তম, কিন্তু তার সাথে অন্য সূরা পড়লেও কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ৯ – মৃত ব্যক্তিকে চুম্বন করা জায়েয আছে কি?

উত্তর – মৃত ব্যক্তিকে পুরুষ বা এমন মহিলা চুম্বন করতে পারবে যার সাথে বিয়ে বন্ধন চিরতরের জন্য হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এন্তেকাল হলে সাহাবি আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কপালে চুমু দিয়ে ছিলেন।

প্রশ্ন ১০ -মৃতকে রিফ্রিজারেটরে রেখে মৃত্যুর ছয়মাস পর জানাযা পড়া কেমন?

উত্তর – প্রয়োজনে ছয়মাস বা ততোধিক সময় দেরি করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ১১ – হজে গমনকরী যে ব্যক্তির হজ নষ্ট হয়ে গেছে, তার মৃত্যু হলে বিধান কি?

উত্তর – তার সাথেও শুদ্ধ হজে গমনকারী ব্যক্তির ন্যায় আচরণ করা হবে। তাকে তার কাপড়েই সুগন্ধি ছাড়া মাথা ও মুখ খোলা রেখে কাফন দয়া হবে। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, জনৈক হাজি বাহন হতে পড়ে মৃত্যুবরণ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে বললেন,

«اغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تحنطوه ولا تخمروا وجهه ولا رأسه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا» (متفق عليه)

“তাকে কুলপাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা গোসল দাও, এহরামের দু’কাপড়ে কাফন দাও এবং তার মাথা ও মুখ খোলা রাখ, কেননা সে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণী ব্যক্তির উপর জানাযার নামাজ কেন পড়তেন না?

উত্তর – ইসলামের শুরুতে ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহী করা ও গৃহিত ঋণ দ্রুত পরিশোধের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে যায়, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণমুক্ত, ঋণগ্রস্ত সকলের উপর জানাযা পড়তেন।

প্রশ্ন ১৩ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «وأنتم شهداء الله في أرضه»

“তোমরা আল্লাহর জমিনে তার সাক্ষী”। উল্লেখিত হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – এ হাদিসটি সে ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে তার ভাল-মন্দ সব কিছু মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেয়, কাজেই মানুষ তার কর্মের উপর সাক্ষী হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা নিজ উম্মতদিগকে মন্দকাজ করা ও তা প্রকাশে বারণ করেছেন এবং ভাল কাজ করা ও তা প্রকাশের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

প্রশ্ন ১৪- জীবিতদের কোন আমল মৃতদের নিকট পৌঁছে কি?

উত্তর – যেসব আমল মৃতদের নিকট পৌঁছার কথা হাদিসে এসেছে সে সব আমল পৌঁছে যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

«إذا مات ابن آدم انقطع عمله إلا من ثلاث : صدقة جارية أو علم ينتفع به أو ولد صالح يدعوله» (رواه مسلم)

“যখন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, শুধু তিনটি ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়াহ অথবা মানুষের উপকার হয় এমন এলেম অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দো‘আ করে”। (মুসলিম) এ ছাড়া সাদকাহ, দোয়া, হজ, ওমরাহ ইত্যাদি মৃতের নিকট পৌঁছার কথা হাদিসে এসেছে। কিন্তু সালাত সিয়াম কোরআন তিলাওয়াতে তওয়াফ ইত্যাদি মৃতদের নিকট পৌঁছার কোন প্রমাণ নেই, তাই এগুলো পরিহার করা উচিৎ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

 «من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد» ( رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ মোতাবেক নয়, তা পরিত্যক্ত”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৫ – মৃতরা জীবিতদের কতক আমল দ্বারা উপকৃত হবে আর কতক আমল দ্বারা হবে না, এর প্রমাণ কি?

উত্তর – এসব বিষয় ওহী নির্ভর, এখানে মানুষের ধারণা বা অনুমানের কোন অবকাশ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের দ্বীনে যে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৬ – মৃত ব্যক্তিরা জীবিত নিকট আত্মীয়দের আমল সম্পর্কে অবগত হন কি?

উত্তর – আমার জানামতে শরি‘আতে এর কোন প্রমাণ নেই।

প্রশ্ন ১৭ – ধর্মযুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন কাফেরকে গালি দেয়া যাবে কি?

উত্তর – যদি কোন কাফের ইসলামের বিরোধীতা বা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে, তাহলে তাকে গালি দেয়া শরিয়ত সম্মত। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের একজামা’ত যেমন আবুজাহেল, ওতবা ইবন রাবিয়া, শায়বা ইবন রবিয়ার উপর অভিশাপ করেছেন।

প্রশ্ন ১৮ – বিপদের সময় শোকর করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – বিপদের সময় সবর করা ওয়াজিব, কিন্তু তার উপর সন্তুষ্ট থাকা ও শোকর করা মুস্তাহাব। এখানে তিনটি স্তর রয়েছে, (ক) ধৈর্যধরণ, এটা ওয়াজিব। (খ) বিপদের উপর সন্তুষ্ট থাকা, এটা সুন্নত। (ঘ) বিপদের উপর শুকরিয়া আদায় করা, এটাই সর্বোত্তম।

প্রশ্ন ১৯ – অনেক মেডিকেল কলেজগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া হতে গবেষণার জন্য লাশ আনা হয় এবং পরীক্ষা করার জন্য লাশ কাটা-ছেড়া করা হয়, শরিয়ত দৃষ্টে এ কাজ কেমন?

উত্তর – লাশটি যদি এরূপ কাফের সম্প্রদায়ের হয় যাদের সাথে নিরাপত্তার কোন চুক্তি নেই তাহলে বৈধ, অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ২০ – সন্ধেহভাজন মৃত ব্যক্তির অঙ্গ বিচ্ছেদ করা কেমন?

উত্তর – শরিয়ত সম্মত কারণে করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ২১ – জানাযা নিয়ে দ্রুতচলা কি সুন্নত?

উত্তর – জানাযা নিয়ে সাধ্যানুযায়ী দ্রুতচলা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «أسرعوا بالجنازة فإن تك صالحة فخير تقدمونها إليه وإن كان سوى ذلك فشر تضعونه عن رقابكم» (رواه البخاري)

“তোমরা জানাযা নিয়ে দ্রুতচল, যদি পূণ্যবান হয় তাহলে তোমরা তাকে ভাল পরিণতির দিকে দ্রুত পৌঁছে দিলে, আর যদি পাপী হয়, তাহলে একটি মন্দবস্তুকে তোমাদের কাঁধ থেকে দ্রুত সরালে। (বুখারি)

প্রশ্ন ২২ – জানাযায় দ্রুত করার অর্থ কি গোসল ও নামাজে দ্রুত করা?

উত্তর – এর অর্থ হচ্ছে চলার পথে দ্রুত চলা, কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে গোসল, কাফন, দাফন ও নামাজ সব এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন ২৩ – উম্মে আতিয়া সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রয়েছেঃ

 «نهينا عن اتباع الجنائز»

“আমাদেরকে জানাযার সাথে যেতে নিষেধ করা হয়েছে”। এ হাদিসের ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – নিষেধের উদ্দেশ্য হচ্ছে গোরস্থানে যাওয়া। জানাযা পড়তে নিষেধ করা হয়নি, জানাযা পুরুষদের জন্য যেমন বৈধ মহিলাদের জন্যও বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মহিলারাও রাসূলের সাথে জানাযায় অংশ গ্রহণ করতেন।

প্রশ্ন ২৪ – জানাযার সাথে গমনকারীদের জন্য সুন্নত তরিকা কি?

উত্তর – জানাযার সাথে গমনকারীদের জন্য সুন্নত হচ্ছে পুরুষরা যতক্ষণ না কাঁধ থেকে লাশ জমিনে না রাখবে, কেউ বসবে না। আর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সুন্নত হচ্ছে যতক্ষণ না লাশ দাফন শেষ হয় অপেক্ষা করবে, যাতে সালাত ও দাফন উভয় আমলের পরিপূর্ণ নেকি লাভ করা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من تبع جنازة مسلم فكان معها حتى يصلى عليها و يفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل جبل أحد» (رواه البخاري)

“যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের জানাযায় অংশ গ্রহণ করে, অতঃপর তার সাথেই থাকে যতক্ষণ না তার উপর সালাত আদায় করা হয় ও তার দাফন শেষ হয়, সে সে দু’কিরাত পূণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরবে, প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পাহাড়ের সমান”। (বুখারি)

প্রশ্ন ২৫ – মৃত ব্যক্তিকে কিভাবে কবরে রাখবে?

উত্তর – আব্দুল্লাহ ইবন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিস প্রমাণ করে যে, মৃত ব্যক্তিকে পায়ের দিক হতে প্রবেশ করিয়ে মাথার দিকে টেনে আনবে এবং কেবলামুখী করে ডান পাঁজরে শোয়াবে এবং নিম্নের দো‘আ পড়বেঃ

 «بسم الله وعلى ملة رسولِ لله»

“আল্লাহর নামে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মোতাবেক রাখছি”। (আবুদাউদ)

প্রশ্ন ২৬ – কাফেরের জানাযা দেখে দাঁড়ানো যাবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, কাফেরের জানাযা দেখেও দাঁড়ানো যাবে, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « إذا رأيتم الجنازة فقوموا » وجاء في بعض الروايات: قالوا : يارسول الله إنها جنازة يهودي فقال : « أليست نفسا» وفي لفظ « إنما قمنا للملائكة » وفي لفظ « إن للموت لفزعا» (رواه أحمد)

“যখন তোমরা জানাযা দেখ, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সাহাবগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! এটাতো এক ইয়াহূদীর জানাযা”। তিনি বললেনঃ “এটা কি প্রাণী নয়?” অন্য বর্ণনায় আছে যে, “আমরা তো ফেরেশতাদের সম্মানার্থে দাঁড়িয়েছি”। অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, “মৃত্যুর রয়েছে বিভীষিকা রয়েছে”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৭ – কোন মুসলিম মসজিদে অবস্থান করছেন, এমতাবস্থায় কোন জানাযা যাইতে দেখলে দাঁড়াতে হবে কি?

উত্তর – হাদিসের বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে এমতাবস্থায়ও দাঁড়ানো মুস্তাহাব। না দাঁড়ালেও সমস্যা নেই কারণ এটা সুন্নত বা ওয়াজিব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একসময় জানাযা দেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবার অন্য সময় দাঁড়াননি।

জানাযা বিষয়ে প্রশ্নাবলি

প্রশ্ন ১ – পুরুষদের কবর কতটুকু গভীর হবে আর নারীদের কবর কতটুকু গভীর হবে?

উত্তর – উত্তম হচ্ছে উভয়ের কবর মানবাকৃতির অর্ধেক পরিমাণ গভীর করা, যেন হিংস্রপ্রাণীর আক্রমণ হতে নিরাপদ থাকে।

প্রশ্ন ২ – পাহাড়ি এলাকায় মৃতব্যক্তিকে পাহাড়ের গর্তে বা গুহায় দাফন করা হয় এটা কেমন?

উত্তর – সম্ভব হলে কবর খনন করা এবং কাচা ইটের দেয়াল তৈরি করে দেয়া উত্তম। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে পাহাড়ের গুহায় মাটি দেবে এবং হিংস্রজন্তু হতে নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ ١٦﴾ [التغابن:16]

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর”। সূরা আত্তাগাবুনঃ (১৬)

প্রশ্ন ৩ – কাচা ইট পাওয়া না গেলে পাথর ব্যাবহার করা যাবে কি?

উত্তর – বর্ণিত আয়াতের দ্বারা বুঝা যায় যে কাচা ইট পাওয়া না গেলে কাঠ, পাথর, পাত ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে, যার দ্বারা মৃতের সুরক্ষা হয়, অতঃপর মাটি দেবে। আল্লাহ তালা বলেছেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ ١٦﴾ [التغابن:16]

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর”। সূরা আত্তাগাবুনঃ (১৬)

অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 «إذا أمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم» (رواه البخاري)

“আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ করি, তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী তা বাস্তবায়ন কর”। (বুখারি)

প্রশ্ন ৪ – অনেক জায়গায় দেখা যায় যে, নারী-পুরুষের কবর সহজে পার্থক্য করার জন্য, নারীদের জন্য একধরনের চিহ্ন আর পুরুষদের জন্য অন্য ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের কাজের কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, সুন্নত হচ্ছে দাফন, উচ্চতা ও গভীরতা নারী-পুরুষ সকলের জন্য সমান হবে।

প্রশ্ন ৫ – সহজে পার্থক্য করার সুবিধার্থে গোরস্থানের কিছু অংশ পুরুষদের জন্য আর কিছু অংশ মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – আমার জানা মতে এর কোন ভিত্তি নেই। শরিয়ত সম্মত নিয়ম হল সমগ্র গোরস্থান সকলের জন্য সমপর্যায়ের থাকবে, এটাই সকলের জন্য সহজতর উপায়। ইসলামের ঊষালগ্ন হতে অধ্যাবদি এ পদ্ধতিই চলে আসছে। মদিনার ‘জান্নাতুল বাকি’ নামক গোরস্থান নারী-পুরুষের জন্য সমান ছিল, আর সমস্ত কল্যাণ ও মঙ্গল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাগণের অনুসরণের মধ্যেই বিদ্যমান।

প্রশ্ন ৬ – সহজে পরিচিতির জন্য অনেক গোরস্থানের প্রতিরক্ষা দেয়ালে নম্বর লাগানো হয় এটা কেমন?

উত্তর – অনেক ক্ষেত্রে কবরের উপর লিখার কারণে কবর কেন্দ্রিক ফেতনা সৃষ্টি হয়, তাই কবরের উপর লিখা সম্পুর্ণ নিষেধ ও না-জায়েয। আর প্রতিরক্ষা দেয়ালে নম্বর লাগানো নিষেধ হওয়া সম্পর্কে আমার নিকট যদিও কোন প্রমাণ নেই, তবুও বলব যেহেতু এটাও কবরের উপর লিখার সাদৃশ্য তাই এটা বর্জন করা উচিৎ।

প্রশ্ন ৭ – অনেক সান্ত্বনা প্রদানকারীকে দেখা যায় যে, সহজে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তারা শোকাহত লোকদেরকে কবর হতে দূরে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে তাদের সাথে কথা-বার্তা বলে, এরূপ করা কেমন?

উত্তর – আমার জানামতে এরূপকরাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ এতে সান্ত্বনা জ্ঞাপন সহজ হয়।

প্রশ্ন ৮ – মুমূর্ষু বা মৃত মহিলাদেরকে মেহেদী দেয়া কেমন?

উত্তর – আমার জানা মতে এর কোন ভত্তি নেই।

প্রশ্ন ৯ – মৃত ব্যক্তিকে মিসওয়াক করানো কেমন?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, শরি‘আতের বিধান হচ্ছে মৃতকে অযু করানো, অযু করানোর সময় যখন কুলি করানো হয় তখন যদি জীবিতদের ন্যায় তাকেও মিসওয়াক করিয়ে দেয়া হয়, তাহলে করানো যেতে পারে।

প্রশ্ন ১০ – উপস্থিত লোকজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কিভাবে কিবলামুখী করবে?

উত্তর – ডানপাশে শোয়াবে এবং মুখমন্ডল কিবলামুখী করে দেবে, যেমনটি করা হয় কবরে শোয়াবার সময়।

প্রশ্ন ১১ – মৃতের উপর কোরআন মজিদ রেখে দেয়া কেমন?

উত্তর – এ ধরণের কাজ শরিয়ত সম্মত নয়, শরি‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই, বরং এগুলো বিদ‘আত।

প্রশ্ন ১২ – জানাযার নামাজ মাঠে পড়াই উত্তম বলে সুবিদিত, তাই গোরস্থানের একাংশ জানাযার জন্য নির্দিষ্ট করব না ঈদের মাঠেই জানাযা পড়ব?

উত্তর – জানাযার জন্য যদি নির্ধারিত কোন স্থান থাকে তাহলে সেখানেই পড়বে অন্যথায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জানাযা মসজিদেই পড়বে। জানাযার নামাজ মসজিদে পড়তে কোন সমস্যা নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়জা নামী ব্যক্তির দু’পুত্রের জানাযা মসজিদেই পড়েছেন।

প্রশ্ন ১৩ – কোন মুসল্লি নিজ মহল্লায় ফরজ নামাজ পড়লেন অতঃপর জানাযার জন্য গিয়ে দেখলেন যে, ঐ মসজিদে এখনও ফরজ নামাজের জামাত হয়নি। এমতাবস্থায় সে জানাযার জন্য অপেক্ষা করবে না অন্যদের সাথে নামাজে শরিক হবে? এমনিভাবে যে ব্যক্তি এত বিলম্বে আসল যে, নামাজ তিন রাকাত হয়ে গেছে, যদি সে জামাতে শরিক হয় তাহলে তার জানাযাও ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমতাবস্থায় সে কি করবে?

উত্তর – কোন মুসলিম যদি মসজিদে এসে দেখতে পায় যে, মুসল্লিগণ জামাতের সহিত নামাজ পড়ছে তখন সেও জামাতে শরিক হয়ে যাবে, এ নামাজ তার জন্য নফল হবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুজর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন,

«صل الصلاة لوقتها فإن أقيمت وأنت في المسجد فصل معهم فإنها لك نافلة» ( رواه مسلم)

“হে আবুজর, সময়মত নামাজ পড়, যদি নামাজের ইকামত হয় আর তুমি তখন মসজিদে থাক, তখন তাদের সাথেও নামাজ পড়, এটা তোমার জন্য নফল হবে”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিদায় হজে মিনায় অবস্থান করছিলেন, দু’ব্যক্তিকে রাসূলের নিকট আনা হল যারা জামাতে অংশগ্রহণ করে নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,

«ما منعكما أن تصليا معنا ؟» فقالا : يا رسول الله قد صلينا في رحالنا . قال : «لا تفعلا إذا صليتما في رحالكما ثم أتيتما مسجد جماعة فصليا معهم فإنها لكم نافلة»

“আমাদের সাথে তোমরা কেন নামাজ পড়নি” তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আমাদের দলের সাথে নামাজ পড়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: “এরূপ কর না, যখন তোমরা তোমাদের তাবুতে নামাজ পড়ে নাও, অতঃপর কোন মসজিদের জামাতে এসে উপস্থিত হও, তখন তাদের সাথেও নামাজ পড়, এটা তোমাদের জন্য নফল হবে”।

প্রশ্ন ১৪ – মৃত ব্যক্তি যদি এই মর্মে অসিয়ত করে যে, তার জানাযার নামাজ অমুক ব্যক্তি পড়াবে, তাহলে ইমামতির জন্য অসিয়তকৃত ব্যক্তি উত্তম হবে না নির্ধারিত ইমাম?

উত্তর – অসিয়তকৃত ব্যক্তির তুলনায় মসজিদের নির্ধারিত ইমামই উত্তম, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « لا يؤمن الرجل الرجل في سلطانه» (رواه مسلم)

“কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কর্তৃত্বের জায়গায় ইমামতি করবে না”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৫ – ইমামের সামনে জানাযার জন্য লাশ রাখার নিয়ম কি?

উত্তর – মৃত পুরুষের লাশ এভাবে রাখবে যে, লাশের মাথা যেন ইমাম বরাবর হয়, আর মৃত মহিলার লাশ এভাবে রাখবে যে, লাশের কোমর যেন ইমাম বরাবর হয়। এপদ্ধতিই সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর যদি লাশ নারী-পুরুষ উভয়ের হয়, যেমন নারী, পুরুষ ও বাচ্ছা, তাহলে ইমামের সামনে প্রথমে পুরুষের লাশ, অতঃপর বালকের লাশ, অতঃপর মহিলার লাশ, অতঃপর বালিকার লাশ রাখবে। লাশ রাখার ক্ষেত্রে পুরুষের মাথা বরাবর মহিলাদের কোমর হবে, যেন সকল লাশের অবস্থান ইমামের সামনে শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে হয়।

প্রশ্ন ১৬ – এহরামরত মহিলার লাশকে কিভাবে কাফন পড়াবে?

উত্তর – অন্যান্য মহিলাদের ন্যায় তাকেও ইযার (দেহের নিম্নাংশের পরিধেয় বস্ত্র), উড়না, জামা ও দু’চাদর দ্বারা কাফন পড়াবে। মাথা ঢেকে দেবে তবে নেকাব ব্যতীত। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহরামত মৃত মহিলাকে নেকাব পড়াতে নিষেধ করেছেন, যেহেতু সে এহরামরত তাই সুগন্ধিও লাগাবে না।

প্রশ্ন ১৭ – ভিডিওর মাধ্যমে মৃতের গোসল ও কাফন দাফন শিখানো কেমন?

উত্তর – বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, ছবি অঙ্কন করা নিষেধ, ছবি অঙ্কনকারীগণ অভিশপ্ত, তাই ভিডিও ছাড়া অন্য উপায়ে মৃতের গোসল ও কাফন-দাফন শিখাবে।

প্রশ্ন ১৮ – শহরের ভেতর অবস্থিত গোরস্থান ঈদগাহের একেবারে নিকটে এমতাবস্থায় ঈদগাহ পরিবর্তন করার হুকুম কি?

উত্তর – এটা আদালতের কাজ, আদালত বিবেচনা করবে এ অবস্থায় শরি‘আতের দৃষ্টিতে কি করা উচিৎ।

প্রশ্ন ১৯ – গোরস্থানের গেটে গোরস্থানে প্রবেশের দো‘আ লেখার হুকুম কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই। এর বিপরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন বলে প্রমাণিত, তা ছাড়া কবরের গেটের উপর লেখার অনুমোদন, কবরের উপর লেখার প্রচলনকে প্রসারিত করবে, তাই কবরের গেটের উপর দো‘আ ইত্যাদি লেখা ঠিক হবে না।

প্রশ্ন ২০ – কবরের উপর কাচা খেজুর গাছের ডালা স্থাপন করার হুকুম কি?

উত্তর – এটা শরিয়ত সম্মত নয় বরং বিদআত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, অমুক দু’কবরে আযাব হচ্ছে, তাই তিনি ঐ দু’কবরের উপর খেজুরের ডালা স্থাপন করেছেন, যাতে কবর আযাব বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া অন্য কোন কবরের উপর তিনি তা স্থাপন করেননি। এতে বুঝাগেল যে এ কাজটি ঐ দু’কবরের সাথে সীমাবদ্ধ ছিল, তাই অন্য কোথায় এ কাজ করা বৈধ হবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যে বিষয়ে আমাদের আদর্শ নেই, তা পরিত্যক্ত”। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

« من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের এ দ্বীনে যে নতুন কিছুর উদ্ভাবন করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম)

বর্ণিত হাদিসদ্বয় একথার প্রমাণ যে, কবরের উপর লিখা, ফুল দেয়া ইত্যাদি সম্পূর্ণ না-জায়েয। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে চুনা করতে, কবরের উপর ঘর বানাতে, বসতে ও লিখতে নিষেধ করেছেন।

প্রশ্ন ২১ – মুক্তাদির যদি জানা না থাকে যে, মৃত ব্যক্তি নারী কি পুরুষ, এমতাবস্থায় সে কিভাবে দো‘আ পড়বে?

উত্তর – দোয়ার বিষয়টি ব্যাপক, তাই এখানে যদি পুংলিঙ্গের স্থলে স্ত্রীলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গের স্থলে পুংলিঙ্গের সর্বনাম ব্যবহার করা হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ২২ – বালকদের জানাযায় কোন দো‘আ পড়বে?

উত্তর – বড়দের জন্য যে দো‘আ পড়া হয় বালকদের জন্য অনুরূপ দোয়াই পড়বে। হ্যাঁ, তাদের জন্য সহিহ হাদিস দ্বারা যে অতিরিক্ত দো‘আ প্রমাণিত, তা হচ্ছেঃ

« اللهم اجعله ذخرا لوالديه وفرطا وشفيعا مجابا اللهم أعظم به أجورهما وثقل به موازينهما وألحقه بصالح سلف المؤمنين واجعله في كفالة إبراهيم عليه الصلاة والسلام و قه برحمتك عذاب الجحيم »

“হে আল্লাহ, এই বাচ্চাকে তার পিতা-মাতার জন্য অগ্রবর্তী নেকী ও সযত্নে রক্ষিত সম্পদ হিসাবে কবুল কর এবং তাকে এমন সুপারিশকারী বানাও যার সুপারিশ কবুল করা হয়। হে আল্লাহ, এই বাচ্চার দ্বারা তার পিতা-মাতার সওয়াব আরো বৃদ্ধি কর। এর দ্বারা তাদের নেকীর পাল্লা আরো ভারী করে দাও। আর একে নেককার মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত কর এবং তাকে ইবরাহীম  আলাইহিস সালামের যিম্মায় রাখ। তাকে তোমার রহমতের দ্বারা দোযখের আযাব হতে বাঁচিয়ে দাও”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

 «الطفل يصلى عليه ويدعى لوالديه» (رواه أحمد)

“বাচ্চার উপর নামাজ পড়া হবে, কিন্তু দো‘আ তার পিতা-মাতার জন্য করা হবে”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৩ – মৃত যদি কোন ভিন্ন দেশের শ্রমিক হয় এবং তার অভিভাকগণ লাশের দাবি করে, কিন্তু লাশ পৌঁছানোর প্রচুর খরচের সাথে সাথে তাকে দীর্ঘদিন বক্সে রাখতে হয়, যার কারণে তার নাড়িভুড়ি পর্যন্ত গলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এমতাবস্থায় কফিল কি তাকে মৃত্যুর স্থানেই দাফন করবে, না অভিভাকদের দাবি অনুযায়ী তার দেশে পাঠিয়ে দেবে?

উত্তর – জীবিত-মৃত সর্বাবস্থায় প্রতিটি মুসলিম মর্যাদার অধিকারী, তাই কোন মুসলমানের লাশ স্থান্তরের মধ্যে যদি প্রশ্নে বর্ণিত সমস্যার সম্ভাবনা থাকে তাহলে কোন অবস্থাতেই একজন মুসলমানের লাশ স্থান্তর করা জায়েয হবে না। যেখানে তার মৃত্যু হয়েছে সেখানেই তার দাফন হবে, এটাই শরিয়ত স্বীকৃত নিয়ম। হ্যাঁ, যদি তার লাশ স্থানন্তরের উপর ধর্মীয় কোন কল্যাণ নির্ভরশীল হয়, এবং স্থানন্তর না করলে মুসলিমগণ তা হতে বঞ্চিত হবে, আর স্থানন্তর দ্বারা প্রশ্নে বর্ণিত লাশ বিকৃতির সমস্যাও না-থাকে তাহলে স্থানন্তর করা যেতে পারে।

হ্যাঁ, যদি আরব উপদ্বীপে কোন কাফেরের মৃত্যু হয় তাহলে অবশ্যই তার লাশ স্থানান্তর করতে হবে। কোন অবস্থাতেই তাকে আরব উপদ্বীপে দাফন করা জায়েয হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়ার জন্য অসিয়ত করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

«لايجتمع فيها دينان» (رواه أحمد)

“আরব উপদ্বীপে কখনো দু’টি ধর্ম একত্র হতে পারে না”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৪ – জনৈক মহিলা কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই মৃতদের গোসল দিতেন, যা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ, তবুও তিনি কাজটি এ জন্য ছেড়ে দিয়েছেন যে, এ কাজের দ্বারা মানুষ নির্বোধ ও নির্দয় হয়ে যায়। তার এ মন্তব্যের উপর আমরা একমত পোষণ করব কি না?

উত্তর – মুসলিমদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে এ মহিলার জন্য উচিৎ যে, তিনি নিয়মিতভাবে মৃতদের গোসল দিয়ে যাবেন এবং আল্লাহর নিকট হতে পুরুস্কারের দৃঢ় আশা রাখবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « من كان في حاجة أخيه كان الله في حاجته» (متفق عليه)

“যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরো করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরো করবেন”। (বুখারি ও মুসলিম)

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

« والله في عون العبد ما كان العبد في عون أخيه» (رواه مسلم)

“আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে লেগে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহয্যে লেগে থাকে”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ২৫ – মৃতের জানাযার নামাজ পড়ার জন্য সফর করার হুকুম কি?

উত্তর– জানাযার জন্য সফর করা যেতে পারে, কোন সমস্যা নেই।

দরুদ ও সালাম নাযিল হোক মুহাম্মদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পরিবার এবং সমস্ত সাহাবি ও মুমিনদের উপর।

সূত্র: ইসলাম হাউস

মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে

 মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে


অবশেষে সুন্দরবনপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ হলো। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতায় সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে সাশ্রয়ীমূল্যে মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোট দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স অব নেচার ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তির প্রেক্ষিতে গতরাত ১২-০১ মিনিট থেকেই মেসেজের মাধ্যমে ভোট প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভোটিং করে সুন্দরবনকে বিজয়ী করার একটি সহজ ক্ষেত্র তৈরী হলো।  এক্ষেত্রে ‘টেলিটক’ বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশের  অন্যান্য মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে গেটওয়ে সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবহৃত সকল অপারেটরের প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকগণই এসএমএস-এ সুন্দরবনকে ভোট প্রদান করতে পারবেন। 
জানা গেছে, এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোটদানের ক্ষেত্রে যে কোন মোবাইল ফোন থেকে  মেসেজ অপশনে গিয়ে ঝই লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে ‘১৬৩৩৩’ নম্বরে। এসএমএসটি গৃহীত হলে ভোটদানকারী একটি ‘কনফার্মেশন’ ফিরতি এসএমএস পাবেন। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে  সুন্দরবনের জন্য ‘কী-ওয়ার্ড’ ঝই । অন্য স্থানগুলোর কী-ওয়ার্ডসহ বিস্তারিত তথ্য টেলিটকের ওয়েবসাইটে http://www.teletalk.com.bd/ পাওয়া যাচ্ছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী গতরাত ১২টা-১ মিনিট হতেই যে কেউ মোবাইলের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ভোট দিতে পারছেন। সুন্দরবন বাদেও যে কোন ব্যক্তি যে কোন মোবাইল থেকেই তার পছন্দের প্রাকৃতিক স্থানকে যতবার খুশি ততবার ভোট দিতে পারবেন। ভোটগ্রহণ চলবে চলতি বছরের ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত। এসএমএস-এ ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ২ টাকা এবং ভ্যাট হিসেবে আরও ৩০ পয়সাসহ মোট ২ টাকা ৩০ পয়সা  কাটা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সুন্দরবন সমর্থন কমিটি-বাংলাদেশসহ সুন্দরবনপ্রেমীরা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনের ভোট প্রদানের নাম্বারটি ‘টোল ফ্রি’ করার আবেদন করে আসছিল। এ ক্ষেত্রে সরকারও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ টেকনিক্যাল কারণে বিষয়টিতে অনুমোদন দেয়নি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপামর মানুষের প্রকৃতির প্রতি ভালবাসার অন্যন্যসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি  এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা এবং সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় এনে নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ  বিকল্প হিসেবে এসএমএস-এর মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে ভোট প্রদানের দাবিটিতে অনুমোদন দিয়েছে। এসএমএস-এর মাধ্যমে এই ভোট প্রদানের বিষয়টিতে নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুন্দরবন সমর্থক কমিটি-বাংলাদেশের আহবায়ক পূর্বাঞ্চল সম্পাদক আলহাজ্ব লিয়াকত আলী, সদস্য সচিব উন্নয়ন সংগঠন রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন এবং সমন্বয়কারী একে হিরু সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সুন্দরবনপ্রেমীদের পক্ষে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।  ল্যান্ডফোন, মোবাইল ফোন এবং এসএমএসসহ ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত  ভোটের ভিত্তিতে ১১ নভেম্বর জগতের ৭টি নতুন সপ্তাশ্চর্যের নাম ঘোষণা করা হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সুন্দরবনসহ ২৮টি প্রাকৃতিক সম্পদ ফাইনাল রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।  বিটিআরসি কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু এবং পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদসহ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চেয়ারম্যান বিটিআরসি এবং মোবাইল ফোন অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত  থেকে মেসেজের ভোটিং করার সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। 

সূত্র: নেট

ইসলামে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) এর বিধান

ইসলামে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) এর বিধান

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) বা বহুজাত বিশিষ্ট পণ্য বাজারজাত পদ্ধতি বাংলাদেশে নতুন হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্ধ শতকের বেশি সময় আগে এটি চালু হয়েছিল। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, ডিরেক্ট সেলিং ও রেফারেন্স মার্কেটিং হিসাবেও এটি পরিচিত। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং মূলত ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার একটি প্রক্রিয়া। আধুনিক অভিধানে এর সংজ্ঞা এভাবে দেয়া হয় : (Multi-level marketing, also known as MLM or network marketing, is a business
structure where products are sold through a networking process as opposed to a
storefront. … is a way of selling goods and services through distributors) অর্থাৎ মাল্টি লেভেল মর্কেটিং যা এএলএম বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং নামেও পরিচিত, তা হল একটা ব্যবসায় পদ্ধতি যেখানে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করা হয় … আর তা মূলত ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় আপলাইন ও ডাউনলাইন নামে বহু স্তরের (Multi level) ডিস্ট্রিবিউটর তৈরি হয়। ডাউনলাইনের কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বিক্রিত পণ্যদ্রব্যের একটি কমিশন আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটররা পেয়ে থাকে। একে সংক্ষেপে MLM বলা হয়। যেসব দেশে এ ব্যবসা প্রচলিত রয়েছে সেখানে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো আইন না থাকায় তা এখনও চালু রয়েছে। ব্যক্তিস্বাধীনতার সর্বোচ্চ বিকাশের কারণে অনেকাংশেই ব্যবসাটি বহাল রয়েছে। কিন্তু সেসব দেশের সচেতন মহল প্রতিনিয়তই জনগণকে এ ব্যবসায় সম্পৃক্ত হতে নিরুৎসাহিত করছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের জনবহুল দেশগুলোর অন্যতম। এ দেশে যেমনি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি তেমনি বেকার লোকের সংখ্যাও কম নয়। শতকরা ৬৫ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে দরিদ্র ও বেকারদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে এমএলএম ব্যবসায়। কিন্তু যেহেতু এদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সেহেতু মু’মিনদের অন্তরে একটি সংশয় রয়েই যাচ্ছে যে এ ব্যবসাটি শরী‘আতের সাথে সংগতিপূর্ণ কিনা? আমরা আমাদের এ প্রবন্ধে সে দিকটিই তুলে ধরার প্রয়াস চালাবো ইনশাআল্লাহ।

 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর শরয়ী বিধান :

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং-এর শরয়ী বিধান আলোচনা করার পূর্বে ইসলামি শরী‘আতের কতিপয় বিধান ও নীতিমালা যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা ও লেনদেনের বৈধতা-অবৈধতা নির্ভর করে সেগুলো আলোচনা করা দরকার। নিম্নে সংক্ষেপে তা আলোকপাত করা হলো:

(ক) ইসলামি শরী‘আতে হালাল ও হারাম উভয়টিই সুস্পষ্ট। শরী‘আত যেটা হালাল করেছে সেটাকে হারাম করা বা ঘোষণা দেয়া আবার যেটা হারাম করেছে সেটাকে হালাল ঘোষণা দেয়ার অধিকার আল্লাহ্ ভিন্ন অন্য কারও জন্য প্রযোজ্য নয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে সীমালঙ্ঘনকারীদের সাবধান করে ঘোষণা দিয়েছেন,

﴿قُلۡ أَرَءَيۡتُم مَّآ أَنزَلَ ٱللَّهُ لَكُم مِّن رِّزۡقٖ فَجَعَلۡتُم مِّنۡهُ حَرَامٗا وَحَلَٰلٗا قُلۡ ءَآللَّهُ أَذِنَ لَكُمۡۖ أَمۡ عَلَى ٱللَّهِ تَفۡتَرُونَ ٥٩﴾ [يونس: 59]

‘‘তুমি বল, তোমরা কি কখনো এ কথা চিন্তা করে দেখেছ, আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের জন্য যে রিযক নাযিল করেছেন তার মধ্য থেকে কিছু অংশকে তোমরা হারাম আর কিছু অংশকে হালাল করে নিয়েছ; তুমি বল, এসব হালাল-হারামের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের কোনো অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহ্‌র প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ? [সূরা ইউনুস, আয়াত : ৫৯]

(খ) ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো তা বৈধ ও অনুমোদিত।[1] সুতরাং যে ব্যবসার ক্ষেত্রে শরী‘আতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেগুলো ছাড়া অন্য সকল ব্যবসা বৈধ। কোনো ব্যবসাকে হারাম সাব্যস্ত করতে হলে এর পক্ষে শরয়ী নিষেধাজ্ঞা থাকতে হবে। কোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে শরয়ী নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ধরে নিতে হবে তা হালাল ও অনুমোদিত।

(গ) ইসলামি শরী‘আত যা যা হালাল করেছে এবং যা যা হারাম করেছে তা সম্পূর্ণ ইনসাফের ভিত্তিতে করেছে। যার মধ্যে মানুষের কল্যাণ রয়েছে শরী‘আত প্রণেতা শুধু তাই তাদের জন্য হালাল করেছেন এবং যার মধ্যে তাদের অকল্যাণ রয়েছে তাই তাদের জন্য হারাম করেছেন। আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানে হালালের কল্যাণ এবং হারামের অকল্যাণ বুঝে আসুক বা না আসুক তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের দাবি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন,

﴿وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيۡهِمُ ٱلۡخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَٰلَ ٱلَّتِي كَانَتۡ عَلَيۡهِمۡۚ﴾ [الأعراف: 157]

‘‘যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে; আর যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে, যা তাদের ওপর ছিল।’’ [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ১৫৭]।

(ঘ) ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতি ও আন্তরিক সন্তুষ্টি থাকা। বেচা-কেনা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য একটি শর্ত হলো ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতি ও সন্তুষ্টি। মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এ মর্মে ঘোষণা করেছেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ﴾ [النساء: 29]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাযী হয়ে ব্যবসা করা বৈধ’’ [সূরা আন-নিসা : ২৯]।

তবে সম্মতি ও সন্তুষ্টি বলতে সব ধরনের সম্মতি ও সন্তুষ্টিই এখানে উদ্দেশ্য নয়। বরং হাদীস থেকে জানা যায় এখানে সম্মতি ও সন্তুষ্টি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বেচা-কেনার ক্ষেত্রে শরী‘আত যে সকল নীতিমালা নির্ধারণ করেছে সেগুলোর আওতায় থেকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতি ও আন্তরিক সন্তুষ্টি থাকা। কাজেই শরী‘আত অসংগত কোনো বিষয়ে কারও পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি ও সম্মতি থাকলেও সেটা ইসলামি শরী‘আতের বিচারে হালাল ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত হবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, মদ ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর যদি ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে সম্মতি ও আন্তরিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তথাপি তা বৈধ হবে না। কারণ মদটাকে ইসলাম হারাম করেছে। অনুরূপ সুদের কারবার যদি কেউ সন্তুষ্টচিত্তে করে তথাপি তা বৈধ হবে না। কারণ ইসলাম সুদকে হারাম করেছে। আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে যদি প্রতারণা ও ধোঁকার আশ্রয় নেয়া হয় তবে সেখানেও ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতি ও আন্তরিক সন্তুষ্টি সেটাকে বৈধ করতে পারে না। কারণ ইসলাম প্রতারণাকে হারাম করেছে।

আমরা আমাদের এ প্রবন্ধে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর বৈধতা-অবৈধতার বিষয়টি দু’টি দিক থেকে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ্‌।

প্রথমত : ভিত্তিগত (substantive and theoretical)

দ্বিতীয়ত : পদ্ধতিগত (procedural)

ভিত্তিগত দিক : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর পদ্ধতি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের হলেও তত্ত্বগত ভিত্তিটি (theoretical basis) সবসময় একই। তা হলো, নিম্ন লেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর কর্তৃক বিক্রিত পণ্যের একটি কমিশন সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত পায়। যেটাকে এক কথায় ‘শ্রমের বহুস্তর সুবিধা’ বলা যায়। কোনো কোনো লেখক এর নাম দিয়েছেন ‘‘Chain reaction of labour’’, কেউবা আবার ব্যক্ত করেছেন ‘‘Chain pyramidal commission’’ কিংবা ‘‘Compound brokerage’’ ইত্যাদি নামে। তাদের এ নীতিটির সাথে ইসলামের শ্রমনীতির রয়েছে সরাসরি সংঘর্ষ। কারণ ইসলামের শ্রমনীতি হলো,

﴿أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰ ٣٨ وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ ٣٩﴾[النجم: 38-39]

‘‘কোনো মানুষই অপরের বোঝা উঠাবে না। মানুষ ততটুকুই পাবে যতটুকু সে চেষ্টা করে’’ [সূরা আন-নাজম, আয়াত : ৩৮-৩৯]। এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, মানুষ কেবল তার নিজের শ্রমের প্রত্যক্ষ ফল লাভের অধিকারী। কারও নিযুক্ত কর্মী না হলে একজন আরেকজনের শ্রমের ফলে অংশীদার হতে পারে না। একইভাবে মানুষ তার শ্রমের ফল কেবল নিকটবর্তী লেভেল থেকে আশা করতে পারে। কোনো ক্রমেই তা বহুস্তর (multi level) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না। এটি যেমন ইসলামি শ্রমনীতির সাথে অসংগতিপূর্ণ তেমনি মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনায় অস্বীকৃত। কারণ, এ ব্যবসায় এক পর্যায়ে দেখা যায় নিম্নলেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর ফরিদপুরের মাসুদ উচ্চলেভেলের ডিস্ট্রিবিউটর বরিশালের নোমানকে চিনে না, তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ ও কথা-বার্তা নেই অথচ নিম্নলেভেলের মাসুদ থেকে উচ্চলেভেলের নোমান কমিশন পাচ্ছে। মানবীয় সুস্থ বিবেক বলছে, কোনো পণ্যের পেছনে যে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়েছে কেবলমাত্র সেই পারিশ্রমিক পেতে বাধ্য। কিন্তু যে পরোক্ষ শ্রম দিয়েছে সে পারিশ্রমিক পেতে বাধ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন শিক্ষক সে তার প্রত্যক্ষ শ্রমের ফল হিসেবে বেতন দাবি করতে পারে। কিন্তু সে যদি দাবি করে, তার ছাত্ররা যত জনকে শিক্ষিত করে কর্মক্ষম করে তুলবে এবং ভবিষ্যতে তারা আরও যাদেরকে শিক্ষিত করে তুলবে তাদের প্রত্যেকের আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ উর্ধবতন শিক্ষককে কমিশন হিসেবে দিতে হবে তাহলে বিষয়টি মেনে নেয়ার মত নয়। কারণ এখানে শিক্ষকের শ্রম শুধু তার সরাসরি ছাত্রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার ছাত্রদের ছাত্র বা তাদের ছাত্রের প্রতি তাঁর কোনো শ্রম নেই। তার শ্রমের ভিত্তিতে সরাসরি তার ছাত্রদের কাছ থেকে সে বেতন বা সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে কিন্তু ডাউনলাইনের ছাত্রদের কাছ থেকে সে কিসের ভিত্তিতে কমিশন বা বেতন ভোগ করবে?

সুতরাং ইসলামি শ্রমনীতি ও মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনায় শ্রমের বহুস্তর সুবিধা (multi level benefit of labour) নীতিটি শরী‘আত সম্মত হতে পারে না। অথচ এ নীতিটিই মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ভিত্তি। এ ভিত্তি সরিয়ে ফেললে এ প্রকার ব্যবসার অস্তিত্বই থাকবে না। কোনো সাধারণ কোম্পানি থেকে পণ্য কিনে অপরজনের কাছে বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার বৈধ অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। অনুরূপ কোনো ক্রেতা সংগ্রহ করে দেয়ার মাধ্যমে কোম্পানির কাছ থেকে দালালীর কমিশন (brokerage fee) নেয়ার অধিকারও প্রত্যেকের রয়েছে। কারণ এ উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ শ্রম জড়িয়ে আছে। এ প্রত্যক্ষ শ্রমের প্রত্যক্ষ সুবিধা নিকটতম স্তর থেকে একবারই পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট ভ্যালুর পণ্য কিনে দালালীর অধিকার অর্জন করা যা বাস্তবায়ন করতে প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে নতুন ক্রেতা সংগ্রহ করতে হয়। যে যত বেশি ক্রেতা সংগ্রহ করতে পারে সে ততজনের কমিশন লাভ করার অধিকার রাখে। কিন্তু কোনো ক্রমেই আপলেভেলের প্রত্যক্ষ শ্রম স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সুদূর-বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না। অথচ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ তা-ই ঘটে।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেক ব্যক্তির আয় ও দায় (income and liability) সবসময় ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তবে এ স্বাভাবিক নীতির ব্যতিক্রম যে সকল বৈধতা শরী‘আতে পাওয়া যায় তা শরী‘আতের বিধান হিসেবে সমালোচনার উর্ধ্বে। যেমন ধনীর সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার, সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব, গোনাহে জারিয়া ইত্যাদি। এগুলো শরী‘আত প্রণেতা কর্তৃক গৃহীত। কাজেই তা স্বাভাবিক নিয়ম বহির্ভূত।

পদ্ধতিগত দিক : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর তাত্ত্বিক ভিত্তি (Theoretical Basis)-এর সাথে ইসলামের প্রতিষ্ঠিত শ্রমনীতি ও মানবীয় বুদ্ধি বিবেচনার সাংঘর্ষিক দিকটি আলোচনা করার পর এবার আমরা এর কিছু পদ্ধতিগত সংঘাত নিয়ে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ্‌।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা নেটওয়ার্ক-এর পদ্ধতিসমূহের মধ্যে শরী‘আত নিষিদ্ধ বহু বিষয় বিদ্যমান। যার প্রধানগুলো নিম্নরূপ :

  1. শ্রমবিহীন বিনিময় এবং বিনিময়বিহীন শ্রম (الأجرة بلا عمل والعمل بلا أجرة)

  2. একটি আকদ (চুক্তি)-এর জন্য আরেকটিকে শর্ত করা (جمع الصفقتين في صفقة)

  3. অর্জিত হওয়া না-হওয়ার অনিশ্চয়তা (الغرر)

  4. সুদের সাদৃশ্য ও দৃঢ় সন্দেহ (شبهة الربا)

  5. জুয়ার সাদৃশ্য (شبهة الميسر)

  6. বাতিল পন্থায় মানুষের মাল ভক্ষণ (أكل أموال الناس بالباطل)

  7. প্রতারণা ও ধোঁকা (الغش)

  8. বর্ধিত মূল্যে বিক্রয় (البيع بالسعر الغالي)

  9. ‘আকদুল ইজারাহ’-এর উসূল পরিপন্থী (خلاف أصول عقد الإجارة)

নিম্নে প্রতিটির বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো :

(ক) শ্রমবিহীন বিনিময় এবং বিনিময়বিহীন শ্রম (الأجرة بلا عمل والعمل بلا أجرة) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতি শরী‘আতের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো এতে ‘শ্রমবিহীন বিনিময় এবং বিনিময়বিহীন শ্রম’ রয়েছে যা ইসলামি আইন সমর্থন করে না।

বিনিময়বিহীন শ্রমের বিষয়টি ফুটে উঠে তাদের প্রচলিত সে নীতিতে যাতে রয়েছে, একজন ডিস্ট্রিবিউটর (পরিবেশক)-এর ডান ও বাম উভয় দিকের নেট না চললে সে কমিশন পাবে না। অর্থাৎ কেউ যদি নির্ধারিত পয়েন্টের একজন ক্রেতা জোগাড় করে কিন্তু আরেকজন জোগাড় করতে অক্ষম হয়, তবে লোকটি কমিশন থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবে। এমনিভাবে কেউ যদি দু’জন ক্রেতাও কোম্পানিকে এনে দেয়, কিন্তু তারা কোম্পানির নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে কম পয়েন্টের মালামাল ক্রয় করে তবে এর জন্যও ঐ ব্যক্তি কমিশন পায় না। ফলে এটি বিনিময়বিহীন শ্রমে পরিণত হয় যা ইসলামি আইনে নিষিদ্ধ। হাদীসে কুদসীতে রয়েছে, আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন,

« ثَلاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رَجُلٌ أَعْطَى بِي ثُمَّ غَدَرَ وَرَجُلٌ بَاعَ حُرًّا فَأَكَلَ ثَمَنَهُ وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِ أَجْرَهُ »

‘‘কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির সাথে ঝগড়া করবো। (এক) যে ব্যক্তি আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে। (দুই) যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে তার মূল্য ভোগ করে এবং (তিন) যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার কাছ থেকে কাজ আদায় করার পর মজুরী পরিশোধ করে না’’ [সহীহ বুখারী : ২২২৭]।

ইসলামি শরী‘আতে ‘একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজ করতে না পারলে পারিশ্রমিক পাবে না’ এ ধরনের শর্ত দিয়ে কোনো চুক্তি করা বৈধ নয়। আল্লামা ইবন রুশদ তার ‘আল-মুকাদ্দামাত’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘কাপড়ের নির্দিষ্ট সংখ্যার ওপর এ চুক্তি করে লোক নিয়োগ দেয়া যে, ‘কাপড়ের এত সংখ্যক বিক্রয় করতে না পারলে সে কোনো পারিশ্রমিক পাবে না’ তাহলে চুক্তিটি বৈধ হবে না। কারণ এরূপ ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা কর্মচারীর অল্প সংখ্যক বিক্রয় দ্বারা যে উপকৃত হচ্ছে তা তার জন্য বৈধ হবে না।’’ [২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৯]

আর শ্রমবিহীন বিনিময়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠে তাদের ভিত্তিগত দিকে যা ইতোপূর্বে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায়, তাদের নীতিমালা রয়েছে, কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য খরিদান্তে ডিস্ট্রিবিউটর (পরিবেশেক) হওয়ার পর যদি সে দু’জন ক্রেতা নিয়ে আসে এবং তারা প্রত্যেকে আরও দু’জনকে এবং সে চার জন আরও আটজনকে কোম্পানির সাথে যুক্ত করে, তবে প্রথম ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় লেভেলের দু’ব্যক্তি নিম্ন লেভেলের আট ব্যক্তি ক্রেতা-পরিবেশকের সুবাদেও কোম্পানি থেকে কমিশন পেয়ে থাকে। অথচ এ আটজনের কাউকেই প্রথম ব্যক্তি ও দ্বিতীয় লেভেলের দু’ব্যক্তি কোম্পনির সাথে যুক্ত করে নি; বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নীতি অনুযায়ী এরা কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের সরাসরি ওপরের ব্যক্তির রেফারেন্সে এবং এর জন্য ঐ ব্যক্তি নির্ধারিত হারে কমিশনও পাবে। এটি সুস্পষ্টই শ্রমবিহীন বিনিময় যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, তাদের এ কারবারে বিনিময়বিহীন শ্রম ও শ্রমবিহীন বিনিময় দু’টিই পুরোপুরিভাবে বিদ্যমান রয়েছে যা শরী‘আতের দৃষ্টিতে বৈধ নয়।

(খ) একটি আকদ (চুক্তি)-এর জন্য আরেকটিকে শর্ত করা (جمع الصفقتين في صفقة) : মাল্টি লেভেল নেটওয়াকিং বৈধ না হওয়ার আরও একটি অন্যতম কারণ হলো এতে হাদীসে নিষিদ্ধ ‘একই চুক্তির জন্য আরেকটিকে শর্ত করা’-এর বিষয়টি রয়েছে। কারণ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ পণ্য ক্রয়ের শর্তেই শুধু ডিস্ট্রিবিউটর হওয়া যায়। অর্থাৎ কোম্পানি থেকে পণ্য ক্রয় ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে এখানে পণ্য ক্রয়কে ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার জন্য শর্ত করা হচ্ছে, যা হাদীসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« لاَ تَحِلُّ صَفْقَتَانِ فِيْ صَفْقَةٍ »

‘‘একই আকদের জন্য আরেকটিকে শর্ত করা হালাল নয়’’ [তবারানী : ১৬১০]।

অপর এক হাদীসে রয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন,

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَفْقَتَيْنِ فِي صَفْقَةٍ وَاحِدَةٍ

‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই আকদে (চুক্তিতে) দু’টি আকদ (চুক্তি) করতে নিষেধ করেছেন’’ [মুসনাদ আহমাদ : ৩৭৮৩]।

এ প্রকারের বেচা-কেনা সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন,

صَفْقَتَانِ فِيْ صَفْقَةٍ رِبًا

‘‘একটি আকদ (চুক্তি)-এর জন্য আরেকটিকে শর্ত করা সুদী কারবার।’’ [সহীহ ইবন হিব্বান : ১০৫৩]

ইমাম শাফিঈ রহ. এ ধরনের হাদীসের দু’টি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন,

এক. বিক্রেতা বলল, আমি এ পণ্যটি তোমার নিকট নগদে বিক্রি করলে এত টাকায় বিক্রি করব আর বাকিতে বিক্রি করলে এত টাকায় বিক্রি করবো। অর্থাৎ নগদে কিনলে মূল্য কম ধরা হবে।

দুই. বিক্রেতা বলল, আমি তোমার নিকট এটি ধরা যাক একশত টাকায় বিক্রি করছি, তবে শর্ত হলো আমার নিকট তোমার ঘরটি এত টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে হবে।

ইসলামিক স্কলারদের সর্বসম্মতিক্রমে এ দু’প্রকারের লেনদেনই বাতিল ও অবৈধ। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর পদ্ধতি ইমাম শাফিঈর ব্যাখ্যার দ্বিতীয়টির সাথে মিলে যায়। কারণ তারা ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার জন্য পণ্য ক্রয়কে শর্ত করে থাকে। যা আকদের ওপর আকদের নামান্তর।

কোনো কোনো মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি উপরোক্ত শরয়ী সমস্যা এড়ানোর জন্য দু’টি পৃথক ফরমের ব্যবস্থা করেছে। একটি পণ্য ক্রয়ের অর্ডার ফরম, অন্যটি ডিস্ট্রিবিউটরশীপের আবেদন ফরম। তারা বুঝাতে চেয়েছে, এখানে পৃথক দু’টি চুক্তি হচ্ছে। অথচ মূলত কার্যক্ষেত্রে একটি চুক্তির জন্য অন্যটি এখনও জরুরি। অর্থাৎ পণ্য-ক্রয় ছাড়া ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া দুই ফরমবিশিষ্ট এ ধরনের কোম্পানির নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে, ‘‘আপনি কি জানেন যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয় ছাড়া এখানে ডিস্ট্রিবিউটর হবার কোন সুযোগ নেই?’’ [ডেসটিনি-২০০০ লিমিডেট, বিক্রয় ও বিপনন পদ্ধতি, পৃষ্ঠা : ২৬] এমনকি এ সকল কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ ফরমেও বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে এসেছে। আবার ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার জন্য পণ্য ক্রয়ের শর্তের কথাতো দুই ফরমধারীগণও অস্বীকার করেন না; বরং তারা তো ডিস্ট্রিবিউটরদেরকে ‘ক্রেতা ডিস্ট্রিবিউটর’ নামেই উল্লেখ করেন।

সুতরাং দুই ফরমের ব্যবস্থা করায় ব্যবসাটি উপরোক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞা থেকে বের হয়ে যায় নি, বরং যথারীতি আগের অবস্থাতেই বহাল আছে যা শরী‘আতে নিষিদ্ধ।

(গ) হাসিল হওয়া না-হওয়ার অনিশ্চয়তা (الغرر) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং অবৈধ হওয়ার আরো একটি কারণ হলো তাতে হাদীসে নিষিদ্ধ الغرر (হাসিল হওয়া না-হওয়ার অনিশ্চয়তা) রয়েছে। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন,

«نَهَى رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ»

রাসূলুল্লাহ স. নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করে ক্রয়-বিক্রয় সাব্যস্ত করা এবং বাইয়ুল গারার (অনিশ্চিত ক্রয়-বিক্রয় করা) থেকে বারণ করেছেন। [সহীহ মুসলিম : ৩৮৮১]

বাইয়ুল গারারের সংজ্ঞা : ইসলামি পণ্ডিতগণ বাইয়ুল গারার -এর সংজ্ঞা বিভিন্নভাবে প্রদান করেছেন। নিম্নে তা প্রদত্ত হলো :

(ক) আল্লামা কাসানী রাহ. বলেন, ‘‘গারার হচ্ছে এমন একটি অনিশ্চয়তা, যাতে হওয়া এবং না-হওয়া উভয় দিক বিদ্যমান।’’ [বাদায়ে‘উস সানায়ে‘উ, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩৬৬]

(খ) আল্লামা ইবনুল আসীর জাযারী রাহ. বলেন, ‘‘যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে যা দ্বারা মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়; কিন্তু এমন অদৃশ্য কারণ রয়েছে যে কারণে তা অস্পষ্ট। এর প্রকাশ্য রূপ ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে। আর এর ভিতরের রূপ অজানা’’ [জামেউল উসূল, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫২৭]

(গ) আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন, ‘‘বাইয়ুল গারার ঐ কারবারকে বলা হয় যাতে পণ্য বা সেবা পাওয়া যাবে কিনা তা অনিশ্চিত অথবা চুক্তিভুক্ত ব্যক্তি নিজে তা যোগান দিতে অক্ষম অথবা যারা পরিণাম অজানা’’ [যাদুল মা‘আদ, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৭২৫]।

(ঘ) কারো কারো মতে, বাইয়ুল গারার হলো, ‘‘যে কোনো কারবারের চুক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তা।’’ যেমন, পুকুরে বা নদীতে মাছ কেনা-বেচা, আকাশে উড়ন্ত পাখি বেচা-কেনা ইত্যাদি।

মোটকথা, যাতে হাসিল হওয়া বা না-হওয়ার অনিশ্চয়তা রয়েছে তাই হচ্ছে আল-গারার। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী যে ব্যবসায় এ গারার পাওয়া যাবে তা অবৈধ ও নাজায়িয। আল্লামা ইবন কুদামাহ তার ‘আশ-শারহুল কাবীর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইবরাহীম হারবীকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, কোনো লোক যদি এ শর্তে মোরগ ভাড়া নিতে চায় যে, এ মোরগ তাকে সালাতের সময় ঘুম থেকে জাগাবে তবে এ ধরনের কারবার জায়িয হবে কি না? তিনি উত্তর দিলেন, না। কারণ এটি অনিশ্চিত কারবার। হতে পারে কখনো কখনো মোরগ ডাকবে না, আবার কখনো সালাতের সময়ের আগে ডাকবে বা পরে ডাকবে, আবার কখনো হয়তো তার মুখ থেকে ডাক বের করার জন্য প্রহারের প্রয়োজন হবে ইত্যাদি। সুতরাং নানাবিদ অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা থাকায় এ ধরনের চুক্তি জায়িয নেই। [খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৩১৯]

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির পদ্ধতির দিকে তাকালে অনুমেয় হয় যে, সেখানে বহু পদ্ধতিতে গারারের উপস্থিতি রয়েছে। একজন ডিস্ট্রিবিউটর যে চুক্তিতে কোম্পানির সাথে যুক্ত হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো, লোকটি তার ডাউনলাইন থেকে কমিশন লাভ করতে থাকবে। অথচ তার নিজের বানানো দু’জন ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের বিষয়টি সম্পূর্ণই অনিশ্চিত এবং অন্যের কাজের ওপর নির্ভরশীল। কারণ তার নিম্নের নেটগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্রসর না করলে লোকটি কমিশন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে; যে কমিশনকে কেন্দ্র করেই সে মূলত এ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়েছে।

কোনো কোনো মাল্টি লেভেল কোম্পানিতে ‘ট্রি প্লান্টেশন’ নামে একটি পদ্ধতি রয়েছে। বছরখানেক আগে এ প্রতারণা নিয়ে পত্রিকায় ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। ৮০০০ (আট হাজার) টাকা নিয়ে ১২ বছর পর ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) টাকা অথবা সমপরিমাণ অর্থের গাছ প্রদানের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করা হয়। গাছ লাগানোর জন্য আদৌ কোনো জায়গা ক্রয়া করা হয়েছে কি না বা কতজন গাছ লাগানোর জন্য টাকা দিয়েছে— এসব বিষয়ে একটা অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে। এ সকল অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতার কারণে ইসলামি শরী‘আত এ লেনদেনকে বৈধ সাব্যস্ত করে না।

(ঘ) সুদের সাদৃশ্য ও দৃঢ় সন্দেহ (شبهة الربا) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং হালাল না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, এতে শরী‘আত নিষিদ্ধ সুদের সাদৃশ্য ও সন্দেহ বিদ্যমান। ইসলামি আইন অনুযায়ী যে সকল কারবারে সুদের সাদৃশ্য ও সন্দেহ রয়েছে তা না জায়িয। ইসলামি আইনবিদগণ এ কারণে বহু কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কারণ রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,

«الْحَلالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لاَ يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وَقَعَ فِي الْحَرَامِ»

‘‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট। এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহ ও সাদৃশ্য বিষয় যা অধিকাংশ মানুষই জানে না। কাজেই যে সাদৃশ্য ও সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকে সে নিজের দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষা করল। আর তাতে জড়ালো সে হারামে নিপতিত হলো’’ [সহীহ বুখারী : ৫২]।

অপর এক হাদীসে এসেছে,

«دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَالا يَرِيبُكَ»

‘‘তোমাকে যা সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে তুমি নিশ্চিত জিনিসের দিকে ধাবিত হও।’’ [সুনান তিরমিযী : ২৫১৮, হাদীসটি সহীহ]

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,

إِنَّ آخِرَ مَا نَزَلَ مِنْ الْقُرْآنِ آيَةُ الرِّبَا وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُبِضَ وَلَمْ يُفَسِّرْهَا فَدَعُوا الرِّبَا وَالرِّيبَةَ

‘‘কুরআনের সর্বশেষ আয়াত হচ্ছে রিবা (সুদ)-এর আয়াত। রাসূলুল্লাহ স.-এর মৃত্যু হয়ে গিয়েছে কিন্তু তিনি সুদের আয়াতের ব্যাখ্যা দেন নি। কাজেই তোমরা সুদ এবং এমন জিনিস যাতে সুদের সন্দেহ রয়েছে তা বর্জন করো’’ [মিশকাত : ২৮৩০, সুনান ইবন মাজাহ : ২৪৭, হাদীসটি সহীহ]।

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘোষণা হলো, যেহেতু রাসূলুল্লাহ স. রিবার আয়াতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে যান নি সেহেতু যাতে সরাসরি রিবা রয়েছে তাতো বর্জন করতেই হবে পাশাপাশি যাতে রিবার সন্দেহ ও সাদৃশ্য রয়েছে তাও বর্জন করতে হবে।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ সুদের সাদৃশ্য-এর বিবরণ এভাবে দেয়া যায় যে, এসব কোম্পানিগুলোতে ডিস্ট্রিবিউটররা পণ্য ক্রয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ হয় কমিশন পাওয়ার আশায়। এতে বুঝা যায়, সে পণ্য ক্রয় বাবদ যে টাকাটি দিয়েছে তা শুধু ঐ পণ্যের মূল্য হিসেবেই দেইনি বরং তা দেয়ার পেছনে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ডাউনলাইনদের কাছ থেকে কমিশন ভোগ করা। পণ্যের মূল্য প্রদানের পাশাপশি কমিশনের যে সুযোগের আশায় সে এ কারবারটি করছে তাই ইসলামি শরী‘আতের পরিভাষায় সুদের সাদৃশ্য।

কারও নেট চলমান থাকার কারণে সে নির্দিষ্ট টাকার মোকাবেলায় কমিশন পাওয়ার বিষয়টি যেমনি সুদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তেমনি যার নেট একেবারেই অগ্রসর হয় নি তার বিষয়টিও সুদের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত নয়। কারণ সে তো টাকা দিয়েছিল পণ্য এবং ডিস্ট্রিবিউটর হয়ে কমিশন ভোগ করার জন্য। অথচ ডিস্ট্রিবিউটরের কোনো সুবিধাই সে পায় নি। তথা কিছু টাকা বিনিময়ের অতিরিক্ত থেকেই যাচ্ছে যা ইসলামি আইনের দৃষ্টিতে সুদের সাদৃশ্য বা সন্দেহমূলক সুদ।

আর তাছাড়া উপরে আমরা পদ্ধতিগত দিকের প্রথম যে কারণ ‘শ্রমবিহীন বিনিময় এবং বিনিময়বিহীন শ্রম’ উল্লেখ করেছি তাও ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে সন্দেহমূলক সুদের আওতাভুক্ত। কারণ সেখানে শ্রম না দিয়ে বিনিময় নেয়াটি যেমন সুদ সাদৃশ্য তেমনি শ্রম নিয়ে বিনিময় না দেয়াটিও সুদ সাদৃশ্য।

(ঙ) জুয়ার সাদৃশ্য (شبهة الميسر) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা না জায়িয হওয়ার আরও একটি কারণ হলো, এর সাথে জুয়ার সাদৃশ্য রয়েছে। ইসলামি পণ্ডিতগণ এ ব্যবসাকে জুয়ার সাথে তুলনা করে একে হারাম ফতোয়া দিয়েছেন। এ ব্যবসায় একজন ডিস্ট্রিবিউটর পণ্য ক্রয় করার পর সে যদি তার ডান ও বাম হাত উভয় দিকে সমান্তরাল ডিস্ট্রিবিউটর বাড়াতে পারে তবে সে কমিশন পাবে অন্যথায় সে কোনো কিছুই পাবে না। এটি জুয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর জুয়াকে ইসলামি আইন হারাম করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্‌ বলেছেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلۡخَمۡرُ وَٱلۡمَيۡسِرُ وَٱلۡأَنصَابُ وَٱلۡأَزۡلَٰمُ رِجۡسٞ مِّنۡ عَمَلِ ٱلشَّيۡطَٰنِ فَٱجۡتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٩٠﴾ [المائدة: 90]

‘‘হে মু’মিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপুজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কার্য। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো— যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’’ [সূরা মায়িদা, আয়াত নম্বর : ৯০]।

ইন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত এক ফতোয়ায় মাল্টি লেভেল মার্কেটিংকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। তারা এ সিস্টেমে আপলাইনের দালালদের যে কমিশন দেয়া হয়া তা বৈধ দালালির ফি’র মতো নয় বলে জানান। বরং তারা প্রমাণ করেন যে, এতে সুস্পষ্ট জুয়াবাজী নিহিত রয়েছে।

(চ) বাতিল পন্থায় মানুষের মাল ভক্ষণ (أكل أموال الناس بالباطل) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং হালাল না হওয়ার আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, এর মাধ্যমে ‘অন্যায়ভাবে অন্যের মাল ভক্ষণ’ করা হয় যা ইসলামি আইনে নিষিদ্ধ। এ ব্যবসায় আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটররা ডাউনলাইন ডিস্ট্রিবিউটরের বিক্রি থেকে ‘‘তত্ত্বাবধানের’’ নাম দিয়ে যে বিশাল কমিশন ভোগ করে, ইসলামি আইনের পণ্ডিতগণ সেটাকে ‘অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কারণ তাতে শ্রমবিহীন বিনিময় রয়েছে যা আমরা ইতোপূর্বের আলোচনায় সাব্যস্ত করে এসেছি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্‌ অন্যায়ভাবে অন্যের মাল ভক্ষণকে সম্পূর্ণভাবে হারাম করে ঘোষণা দিয়েছেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٖ مِّنكُمۡۚ﴾ [النساء:29]

‘‘হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা’’ [সূরা আন-নিসা : ২৯]। বিখ্যাত মুফাসসির আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এবং প্রখ্যাত তাবিঈ হাসান বসরী রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘‘বিনিময়ের শর্তযুক্ত চুক্তিতে বিনিময়বিহীন উপার্জনই হল বাতিল পন্থায় উপার্জন’’ [আহকামুল কুরআন (জাসসাস) খণ্ড ২, পৃষ্ঠা : ১৭২]

মোটকথা: অত্র আয়াতে ‘‘অন্যায়ভাবে’’ বলতে এমন সব কারবারকে বুঝানো হয়েছে যা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, এখানে ‘‘অন্যায়ভাবে’’ বলতে ‘‘এমন সব পদ্ধতির কথা বুঝানো হয়েছে যা সত্য ও ন্যায়নীতি বিরোধী এবং নৈতিক দিক দিয়ে ও শরী‘আতের দৃষ্টিতে নাজায়িয’’ [সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯]

ওআইসি‘র ইন্টারন্যাশনাল ফিকহ একাডেমির চীফ স্কলার প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তার আবু গুদ্দাহ এ সংক্রান্ত তার ফতোয়ায় বিষয়টি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “…compound brokerage falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it. The main factor that contributes to this is the fact that compound brokerage automatically implies that a portion from the sales of the down line will be channeled to the up line.” [The Awakening, November 2008; http://theawakening.blogspot.com/2008]

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এর কমিশন পদ্ধতিতে কিভাবে ‘‘জুয়াবাজী’’ ও ‘‘অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ’’ জড়িয়ে আছে তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে শেখ সালীম আল-হিলালী বলেন, “This type of business is pure gambling because the purpose is to develop continuous network of people. With this network, large number of people at the bottom of the pyramid (down line) pays money to a few people at the top (up line). In this scheme, no new wealth is created; the only wealth gained by any participation is wealth lost by other participants. Each new member pays for the chance to profit from payment of others who might join later.” [The Awakening, November 2008; http://theawakening.blogspot.com/2008]

(ছ) Business Fraud বা প্রতারণা (الغش) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং হালাল না হওয়ার আরো একটি কারণ হলো, তাতে রয়েছে বড় ধরনের প্রতারণা। অর্থনীতির হিসাবে কোনো অবস্থাতেই তাদের এ ব্যবসায় এক মাসে ১০ বা ২০ শতাংশ লাভ হতে পারে না। তাই এ ধরনের লাভ দিতে হলে কাউকে না কাউকে ঠকাতে হবেই। ফলে শর্তের মারপ্যাঁচ বুঝে উঠার আগেই প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এক শ্রেণীর লোকেরা। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي»

‘‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়’’ [সহীহ মুসলিম : ১৯৫]।

গ্রাম পর্যায়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে এ সকল কোম্পানির অধিকাংশ ক্রেতাই আপলাইনের অগণিত মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশনের কথা জানে না। এ হিসেবে তো এটি সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল। পৃথিবীতে যত মাল্টি লেভেল ব্যবসা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ সফল হয়েছে মিশিগানের ‘অ্যামওয়ে’ নামের এমএলএম কোম্পানি। সেখানে ১০ শতাংশ ডিস্ট্রিবিউটর লাভ বা সফলতার মুখ দেখেছে, বাকী ৯০ শতাংশ তাদের কস্টার্জিত অর্থ কোম্পানির ওই ১০শতাংশের পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেরা প্রতারিত হয়েছে। 

(জ) বর্ধিত মূল্যে বিক্রয় (البيع بالسعر الغالي) : মাল্টি লেভেল মার্কেটিং না জায়িয হওয়ার আরও একটি কারণ হলো, এ সকল কোম্পানি পণ্যের যথাযথ মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে তা বিক্রয় করে থাকে। আর এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নেয় যা শরী‘আত অসঙ্গত। আমরা জানি, ট্রাডিশনাল মার্কেটিং-এ একটি পণ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে উৎপাদক + এজেন্ট + পাইকার + খুচরা বিক্রেতা + ভোক্তা ইত্যাদি কতিপয় মধ্যস্বত্বভোগী থাকে। কিন্তু মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ এসকল মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের বাদ দিয়ে তারা নিজেরাই ডাউনলাইন ও আপলাইন নাম দিয়ে শত সহস্র মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি করে চলছে। এ বিপুল সংখ্যক মধ্যস্বত্বভোগীকে কমিশন দিতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানিকে বর্ধিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হয়। তাই তারা প্রচলিত পণ্যদ্রব্য পরিহার করে এমন পণ্য মার্কেটে নিয়ে আসে যেগুলো সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘‘নাইজেলা’’ নামক তৈল যার প্যাকেজ মূল্য ৬০০০ টাকা। মাত্র এ ৬০০০ টাকায় কোম্পানি ২৭৭৫ টাকা লাভ করে বলে স্বীকার করা হয়। এভাবে অন্যান্য পণ্যগুলোও দ্বিগুন বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

ইসলামি শরী‘আতে ক্রয়-বিক্রয় ও যাবতীয় চুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার প্রতি জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। ইসলামি আইনে পণ্যের গুণগত মান ও ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে। ভিন্ন কোনো পদ্ধতিতে বাজার প্রভাবিত করা শরী‘আতে নিষিদ্ধ। সুতরাং পণ্যের মান বৃদ্ধি না করে কোনো কৌশল অবলম্বন করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করাকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। যে সব কৌশলের মাধ্যমে দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হয় তার প্রতিটিই ইসলাম হারাম করেছে। যেমন দাম বাড়ানোর জন্য দ্রব্য মজুত করা। যারা এরূপ করে ইসলামের পরিভাষায় তারা অভিশপ্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنِ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ»

‘‘যে ব্যক্তি বর্ধিত মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে পণ্য আটকে রাখে সে গুনাহগার’’ [সহীহ মুসলিম : ২১৬৪]।

অনুরূপ কৌশলে শহরের বাইরে থেকে আগত লোকদের থেকে অল্প মূল্যে মাল ক্রয় করে তা বেশি দামে বিক্রি করা হলে তা থেকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরত থাকতে বলেছেন। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

أَنَّ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- «نَهَى أَنْ يَبِيعَ حَاضِرٌ لِبَادٍ»

‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহরে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি শহরের বাইরে থেকে আগত কোনো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য কিনে তা শহরের বাসিন্দাদের কাছে বিক্রি করা থেকে বারণ করেছেন’’ [সহীহ মুসলিম: ৩৫২৪] এ নিষেধাজ্ঞার ফলে শহরে বসবাসরত মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের অল্প পরিশ্রমে অধিক মুনাফা লাভের বিষয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তারা একটু বেশি পরিশ্রম দেখানোর জন্য আগে-ভাগে শহরের বাইরে গিয়ে পথিমধ্যে বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে তা শহরে এনে বেশি দামে বিক্রয় করার কৌশল অবলম্বন করলে সে ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- «نَهَى عَنِ التَّلَقِّى لِلرُّكْبَانِ»

‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহরবাসীকে শহরমুখী ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাৎ করে পণ্য ক্রয় করে তা শহরে এনে বেশি দামে বিক্রয় করতে বারণ করেছেন’’ [সহীহ মুসলিম : ৩৮৯১]

সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, ইসলামি আইন দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি গুরুত্বসহ নিয়েছে। কোনো প্রকার কৌশল অবলম্বন বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা শরীআত সঙ্গত নয়। বৃহৎ অর্থনীতির অনিবার্য ক্ষেত্রসমূহে কিছু নিয়ন্ত্রিত মধ্যস্বত্বভোগীর অনুমতি দিলেও ভোক্তা ও উৎপাদকের মাঝে অনর্থক মধ্যস্বত্ত্বভোগীর সংখ্যা বাড়ানো ইসলামে নিষিদ্ধ।

(ঝ) ইজারা চুক্তির উসূলের পরিপন্থী (خلاف أصول عقد الإجارة) : এমএলএম অবৈধ হওয়ার আরও একটি কারণ হলো তাদের কোনো কোনো পদ্ধতি ইজারা চুক্তির মূলনীতির পরিপন্থী। আমরা জানি, এ সকল কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তিটি শরী‘আতের দৃষ্টিতে ‘আকদুল ইজারাহ।’ আর ‘আকদুল ইজারাহ’-এর দু’টি মৌলিক দিক রয়েছে। ১. শ্রম বা সেবা, ২. পারিশ্রমিক বা বিনিময়। আকদুল ইজারাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য এ দু’টি শর্ত বিদ্যমান থাকতেই হয়। কিন্তু কোনো কারবারে যদি এ দু’টির কোনো একটি না থাকে তথা সেবা বা শ্রম পাওয়া গেল কিন্তু বিনিময় পাওয়া গেল না কিংবা সেবা বা শ্রম ছাড়াই বিনিময় পাওয়া গেল তবে সে কারবারটি ইসলামি আইনে বৈধ নয়।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ যেহেতু দুটোরই সম্ভাবনাই রয়েছে সেহেতু এ কারবার ও ব্যবসা হালাল নয়।

 

আরও কতিপয় ত্রুটি : প্রাগুক্ত আলোচনায় আমরা শরী‘আতের নীতিমালার সাথে অসংগতিপূর্ণ বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে পর্যালোচনা করেছি। নিম্নে তাদের আরো কতিপয় ত্রুটি তুলে ধরছি :

 (ক) আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার স্বপ্ন : দারিদ্র পীড়িত ও বেকারত্বের এ দেশে অনেকেই বাকপটু পরিবেশকের কথার মারপেঁচে পড়ে অথবা সেমিনার দেখে কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও পণ্য ক্রয় করে পরিবেশক হয়ে যায়। পরবর্তীতে দেখা যায়, সে কোনক্রমেই অন্য কোনো ক্রেতা যোগাড় করতে পারে না। ফলে তার ধনী হওয়ার স্বপ্ন রূপান্তরিত হয় দুঃস্বপ্নে।

(খ) অন্যের ওপর চাপ সৃষ্টি : কখনো কখনো দেখা যায়, কোনো কোনো পরিবেশক তার নেট অগ্রসর করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ফলে সে তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে কোম্পানির সাথে যুক্ত করতে জোর আবদার করে। আবার কখনো নিজ থেকে টাকা ঋণ দিয়ে তাদের জন্য পণ্য সরবরাহ করে থাকে। তাদের পীড়াপিড়ির কারণে অনেকের ইচ্ছ না থাকা সত্ত্বেও পণ্যটি কিনতে বাধ্য হয়।

(গ) মূল পেশায় দায়িত্বশীলতা হ্রাস পাওয়া : এমএলএম-এর মূল কাজ যেহেতু ক্রেতা জোগাড় করা তাই অন্যান্য চাকুরির পাশাপাশি এটি করা খুবই সহজ। ফলে দেখা যায়, অনেকেই এ কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করার কারণে পেশাগত কাজের ফাঁকে ফাঁকে বা অফিস সময়ের পর ক্রেতার খোঁজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে বাধ্য হয়। এতে একদিকে পেশাগত কাজে ফাঁকি দেয়া হয় অন্যদিকে পেশাগত কাজে তার উদ্যম ও কর্মতৎপরতার ভাটা পড়ে। যা একসময় জাতীয় বিপর্যয়ও হতে পারে।

এমএলএম-এর সমর্থকদের যুক্তি ও তা খণ্ডন : যারা এ ব্যবসাকে বৈধ বলে তারা বহুস্তর সুবিধাকে জায়িয করার জন্য যে সকল যুক্তি প্রদান করে থাকে তার কিছু আমরা উপর্যুক্ত আলোচনায় অপনোদন করেছি। যেমন, দু’ফরমের ব্যবস্থা। নিম্নে তাদের আরও কিছু যুক্তি তুলে ধরে সেগুলো খণ্ডন করা হলো :

প্রথম যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাসদকায়ে জারিয়ার ন্যায় :

এই কারবারের সমর্থকরা শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে তুলনা করে বলেন, ‘‘সদকায়ে জারিয়ায় ব্যক্তি যেমন একবার শ্রম দিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এর ফল ভোগ করতে পারে তেমনি এখানে একজন একবার প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তা ভোগ করার বৈধতা রাখে’’।

যুক্তি খণ্ডন : তাদের এ যুক্তির ৩টি উত্তর রয়েছে।

১. সদকায়ে জারিয়া একটি আধ্যাত্মিক বিষয় যার সাথে অর্থ ও শ্রম নীতির কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ সদকায়ে জারিয়ায় ব্যক্তি যেই ফল পায় তা হলো ছাওয়াব যার কোনো আর্থিক মূল্য নেই। সুতরাং তাদের এ তুলনা বা কিয়াসটি যথাযথ হয় নি। নিরেট ছাওয়াবের বিষয়কে আর্থিক মূল্যের সাথে তুলনা না করাই নীতিগত বিষয়।

২. সদকায়ে জারিয়ার সাথে এমএলএম-এর তুলনা করতে হলে কোম্পানিগুলোকে ঘোষণা দিতে হবে যে, ‘‘প্রতিটি ব্যক্তি তার প্রত্যক্ষ শ্রমের ভিত্তিতে সে সরাসরি যার নিকট পণ্য বিক্রি করবে শুধু তার নিকট থেকে কমিশন পাবে। বাদবাকি যাদের ক্ষেত্রে তার প্রত্যক্ষ শ্রম নেই তাদের উপকার করার কারণে তাদের কাছ থেকে শুধু ছাওয়াবের আশা করবে।’’ তারা এরূপ ঘোষণা দিলে তাদের সাথে ইসলামও একমত।

৩. সদকায়ে জারিয়ার বিষয়টি শরী‘আত প্রণেতা কর্তৃক স্বীকৃত এবং এর ছাওয়াব তিনি নিজ ভাণ্ডার থেকে দেন। এতে অন্য কারো ক্ষতি হচ্ছে না। কিন্তু এমএলএম কোম্পানিগুলো কমিশনটি নিজেদের তহবিল বা ভাণ্ডার থেকে দেয় না বরং তা নতুন ক্রেতার নিকট কমদামি পণ্যটি চড়া দামে বিক্রি করার মাধ্যমে বর্ধিত মূল্যের একটি অংশকে কেটে কেটে প্রদান করে। কাজেই সদকায়ে জারিয়ার সাথে এর তুলনা অমূলক।

দ্বিতীয় যুক্ত : ডাউনলাইনের লোকদের পেছনে আপলাইনের লোকদের কোনো না কোনো শ্রম থাকে

তারা বলে, ‘‘আপলাইনের লোককে তার নেট সম্প্রসারণের জন্য প্রচুর পরিমানে খাটতে হয়। সে ঘরে বসে থাকলে তার নেট অগ্রসর হতো না’’ অথবা ‘‘যেহেতু আপলাইনের লোকের সরাসরি প্রচেষ্টায় দু’জন লোক যুক্ত হয়েছে এবং তাদের মাধ্যমে আরো দু’জন, এভাবে নেট সম্প্রসারিত হয়েছে। কাজেই ধরে নেয়া যায় যে, সকল ক্ষেত্রেই তার শ্রম রয়েছে’’।

যুক্তির খণ্ডন : ইসলামি শরী‘আতের আইন মতে তাদের এ যুক্তিটি বাতিল যুক্তি। কারণ শরী‘আতের দৃষ্টিতে কোনো কারবার বৈধ-অবৈধ হওয়ার ভিত্তি হচ্ছে এর চুক্তিনামার শর্তাবলি। অর্থাৎ কোনো চুক্তিতে শরী‘আত নিষিদ্ধ ধারা উল্লেখ থাকলে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। যেহেতু এমএলএম আইন অনুযায়ী অধীনস্থ নেট সম্প্রসারণে উপরস্থ ব্যক্তির শ্রম থাকুক বা না থাকুক নেট চালু থাকলে প্রত্যেকেই চুক্তি অনুযায়ী কমিশন লাভ করবে সেহেতু এ চুক্তিটিই শরী‘আত সম্মত হয় নি। আর তাদের দ্বিতীয় বাণী, ‘‘ধরে নেয়া যায় যে, সকল ক্ষেত্রেই তাদের শ্রম রয়েছে’’ এটি ভিত্তিহীন। কারণ আপলেভেলে দু’ব্যক্তিকে যুক্ত করার কারণে ডাউনলেভেলের সকলের অন্তর্ভুক্তিতে তার শ্রম রয়েছে- এমন কথা সুস্থ বিবেক মেনে নিতে পারে না।

তৃতীয় যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাবইয়ের প্রচার স্বত্ত্বের মতো

তারা বলে, একজন লেখক তার বইয়ের প্রতি সংস্করণের জন্য প্রকাশক থেকে টাকা পেয়ে থাকে, এমএলএম-এর কমিশনও সে ধরনের কিছু।

যুক্তির খণ্ডন : বইয়ের প্রচার স্বত্বের সাথে এর তুলনা অবান্তর। কারণ বই যতই বের হোক, তাতে তো লেখকের চিন্তা থেকে বের হওয়া খাটুনিমাখা লেখাই থাকছে। একটি বইয়ের মূল উপাদান তো আর কাগজ-কালি নয়; বরং এর ভেতরের জ্ঞানই এর মূল সম্পদ। অথচ এমএলএম-এর কমিশন কার সম্পদ?

চতুর্থ যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাপুত্রের আয়ে পিতার হক ও অংশের মতো

তারা বলে, কোনো পিতা যেমনিভাবে তার পুত্রের পেছনে বিনিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের কারণে পুত্রের আয়ে বৈধ হক রাখে তেমনিভাবে এমএলএম-এ আপলাইন ‘তত্ত্বাবধানের’ দায়িত্ব নিয়ে ডাউনলাইনের আয়ে বৈধ হক রাখে।

যুক্তির খণ্ডন : তাদের এ যুক্তিটি একাধিক কারণে সঠিক নয়। যথা :

১. পুত্রের আয়ে পিতার বৈধ হকের বিষয়টি পুত্রের ওপর পিতার বিনিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের কারণে নয় বরং তা শরী‘আত প্রণেতার মিরাছ আইনের কারণে। তা বিনিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের সাথে সম্পৃক্ত নয়। তা হলে কন্যার আয়েও পিতার বৈধ হক থাকত। কারণ সেখানেও বিনিয়োগ ও তত্ত্বাবধানের বিষয়টি রয়েছে।

২. পুত্রের আয়ে পিতার হকের কোনো মাল্টি-লেভেল প্রভাব নেই। পুত্র কাউকে কাজে লাগালে সেখান থেকে পিতা কোনো সুবিধা পাওয়ার হক রাখে না। আবার পিতা একই সময়ে একাধিক লেভেল যেমন পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্র থেকে আথির্ক সুবিধা দাবি করতে পারে না যেমনটা এমএলএম-এ করা হয়।

পঞ্চম যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাঅনাথ শিশুকে কর্মক্ষম করলে তার উপার্জনে প্রাপ্য অংশের ন্যায় :

তারা বলে, একটি অনাথ শিশুর পিছনে বিনিয়োগ ও শ্রম দিয়ে তাকে শিক্ষিত ও কর্মক্ষম করে তুললে তার উপার্জনে উক্ত অভিভাবকের যেমনিভাবে একটি বৈধ অংশ সৃষ্টি হয় তেমনিভাবে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং-এ একজন প্রতিনিধি প্রত্যক্ষ শ্রম দিয়ে কোনো নতুন ব্যক্তিকে এর অন্তর্ভুক্ত করলে তার ভবিষ্যৎ নিম্নলেভেলের চুক্তিসমূহের মধ্যেও প্রতিনিধির একটি বৈধ অংশ সৃষ্টি হয়ে যায়।

যুক্তির খণ্ডন : তাদের এ যুক্তিতে যদিও যথেষ্ট বিচক্ষণতা রয়েছে তথাপি তাদের এ যুক্তিটি মাল্টি লেভেলের সুবিধাকে সমর্থন করে না। কারণ এ ক্ষেত্রে যে তার পিছনে বিনিয়োগ করল সে একদিকে পাবে ছাওয়াব যার আর্থিক মূল্য নেই অন্যদিকে সে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল তা পাওয়ার অধিকার রাখলেও সেটার সাথে বহুস্তর পর্যন্ত সুবিধা ভোগের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ এ ক্ষেত্রে অনাথের পেছনে বিনিয়োগকারী শুধুমাত্র তার বিনিয়োগকৃত টাকারই হকদার। এর অতিরিক্ত কোনো কিছুর সে হকদার নয়।

ষষ্ঠ যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাবাড়ি ভাড়া ভোগের মতো :

তারা বলে, ‘‘একবার শ্রম ও বিনিয়োগ করে বাড়ির মালিকরা সারাজীবন বসে বসে ঐ বাড়ির ভাড়া ভোগ করার যেমন বৈধতা রয়েছে তেমনি এমএলএম-এ একবার শ্রম দিয়ে ডাউনলাইন তৈরি করে তা থেকে কমিশন ভোগ করার বৈধতাও রয়েছে। কারণ, নীতি সব স্থানে একই রকম হওয়া উচিত’’।

যুক্তির খণ্ডন : এ যুক্তিতে তাদের মারপেঁচে তারাই ধরা খায়। কারণ একটি বাড়ি করার পেছনে দু’ধরনের বিনিয়োগ থাকে। মালিকের অর্থ ও শ্রমিকের শ্রম। যদি শ্রমের বহুস্তর সুবিধাকে মেনে নেয়া হয় তাহলে প্রতিটি বাড়ির ওপর শ্রমিকেরও সুবিধা ভোগের একটি স্থায়ী অধিকার অর্জিত হতো। কিন্তু বাস্তবে তো শ্রমিক সে বাড়ির কোনো সুবিধা ভোগ করে না। কারণ এক্ষেত্রে মালিক অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাড়ি অর্জন করেছে যা ভাড়া দেয়ার যোগ্য আর শ্রমিক শ্রম বিনিয়োগ করে টাকা অর্জন করেছে যা ভাড়া দেয়ার যোগ্য নয়। দু’পক্ষই দু’টি স্বতন্ত্র জিনিস অর্জন করেছে। এতে এটিই প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেকে তার শ্রমের একস্তর সুবিধা নিকটতম স্তর থেকেই পেয়ে থাকে; বহুস্তর থেকে নয়। বাড়ি, জমি, দোকান-পাঠ ইত্যাদি ভাড়া দিয়ে তা থেকে সুবিধা ভোগ করা যায়। কিন্তু তাতে বহুস্তর সুবিধা ভোগের কোনো বিষয় নেই। কিন্তু টাকা-পয়সা, খাদ্যদ্রব্য ধার বা ঋণ দিয়ে তা থেকে কোনো রকমের সুবিধা নেয়া সুস্পষ্ট সুদ।

সপ্তম যুক্তি : বহুস্তর সুবিধামালিক বসে থেকে শ্রমিকদের দ্বারা মুনাফা লাভের মতো :

একজন মহাজন কয়েক বছর শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে দোকানে বসে শ্রমিকের দ্বারা তা বিক্রি করিয়ে বসে বসে টাকা গুনে। এটা যদি বৈধ হয় তবে এমএলএম-এ বহুস্তর সুবিধা বৈধ হবে না কেন?

যুক্তির খণ্ডন : অধিকার ও দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে দু’টি ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের ফলে একটিকে অপরটির সাথে তুলনা করা সঠিক হয় নি। কারণ এরূপ ক্ষেত্রে কর্মচারীদেরকে নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও আইনগত দায়-দায়িত্ব দেয়া মালিকের ওপর থাকে যা এমএলএম-এ নেই। তাছাড়া এ ক্ষেত্রেও শ্রমের বহুস্তরের সুবিধার বিষয়টি পাওয়া যায় না। কেননা, এ ক্ষেত্রে মহাজন তার নিযুক্ত কর্মচারীর বিক্রিত পণ্যের লাভ একবারই পাচ্ছে। মহাজনের দোকান থেকে যে ক্রয় করে অন্যের নিকট বিক্রয় করলো তার নিকট থেকে মহাজন কোনো কমিশন থাকছে না; আর পরের স্তরগুলোর কথা বাদই দিলাম।

অষ্টম যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাপেনশনের মতো

তারা বলে, ‘‘একজন কর্মীর জন্য তার চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোন প্রকার শ্রম ছাড়াই যেমন পেনশন গ্রহণ করা বৈধ তেমনি আমাদের এখানেও শ্রম ছাড়া বহুস্তর সুবিধা বৈধ’’।

যুক্তির খণ্ডন : বহুস্তরের সুবিধাকে পেনশনের সাথে তুলনা করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ সরকার বা প্রাইভেট কোম্পানি একজন কর্মচারীর পেছনে যে খরচের হিসাব করে থাকে তার মধ্যে পেনশনও অন্তর্ভুক্ত থাকে। কাজেই পেনশন তা পারিশ্রমিকেরই একটি অংশ এবং আইনগত অধিকারও বটে। কিন্তু এমএলএম কোম্পানিতে নিম্নের নেটের জন্য প্রদেয় কমিশন কি তার প্রথম দু’জন ক্রেতা বানাবার পারিশ্রমিকের অংশ? যদি তাই হয় তবে তো নিম্নের নেট না চললেও সে তা পাবার অধিকার দাবি করতে পারে।

নবম যুক্তি : বহুস্তর সুবিধাপারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ :

তারা বলে, ‘‘ইসলাম ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসাকে বৈধ করেছে। আমাদের এ কারবারে পুরোপুরি পারস্পরিক সম্মতি রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক লোকেরা স্বেচ্ছায় আমাদের সাথে চুক্তি করছে। কাজেই আমাদের এ কারবার বৈধ।

যুক্তির খণ্ডন : আমরা শুরুতেই ব্যবসায়িক কিছু নীতিমালা উল্লেখ করেছি। সেখানে এ নীতিমালার ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে, পারস্পরিক সম্মতিটি অবশ্যই হতে হবে কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বৈধ বিষয়ের ক্ষেত্রে। কুরআন ও হাদীস যা অবৈধ করেছে সে ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতি থাকলেও তা বৈধ হবে না। দরিদ্র পীড়িত ও বেকারত্বের দেশে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সে সম্মতি নেয়া হয় কুরআনের এ সম্মতির অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লামা আসাদ বলেন, ‘‘ঈমানদারদেরকে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেতে নিষেধ করা হয়েছে; এমনকি অপর পক্ষ (দুর্বল হওয়ার কারণে) পরিস্থিতির চাপে বঞ্চনা ও শোষণমূলক চুক্তিতে সম্মতি দিলেও’’ [Asad: The Message of the Quran, pp 142-4]।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং সম্পর্কে বিশিষ্ট পণ্ডিতগণের অভিমত : বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এ ব্যবসাটি প্রচলিত রয়েছে। তাই এর বৈধতা-অবৈধতা ও উপকার-অপকার নিয়ে বিশিষ্ট পণ্ডিতগণ বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নিম্নে বিশেষ বিশেষ কতিপয় মন্তব্য প্রদত্ব হলো :

(ক) ইসলামী ফিকহ একাডেমি ১৭ জুন ২০০৩ সালে এর তৃতীয় অধিবেশনে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা হল : ‘‘বিজনাস কোম্পানি ও এর মত অন্য সকল মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের কোম্পানি সমূহের ব্যবসায় অংশগ্রহণ করা শরী‘আতে জায়েয হবে না।…..’’ লিংক:

http://www.islamway.com/index.php?iw_s=Fatawa&iw_a=view&fatwa_id=31900

 

(খ) সউদি আরবের উচ্চ ওলামা পরিষদ মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ব্যাপারে নিম্নবর্ণিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন :

‘‘পিরামিড স্কিমের উপর ভিত্তি করে যে ব্যবসা চলছে, যাকে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বলে অভিহিত করা হয়, তা হারাম। কেননা এ ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির নতুন সদস্য বানিয়ে কমিশন অর্জন, কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য বিক্রয় থেকে অর্জিত লাভ মূল উদ্দেশ্য নয়। যখন কমিশনের পরিমাণ পৌঁছে যায় দশ-হাজার (রিয়াল), একই সময় তখন উৎপাদিত পণ্যের মূল্য মাত্র কয়েক শত (রিয়াল)ও অতিক্রম করে না। যে কোন বুদ্ধিমান মানুষকে এ দুটোর কোনটা গ্রহণ করবে জিজ্ঞাসা করা হলে সে অবশ্যই কমিশন এখতিয়ার করবে।

এজন্যই এ কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রচার ও মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে বিশাল কমিশন প্রাপ্তির বিষয়টি উপস্থাপন করে, যা অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা লাভ করবে এবং কাস্টমারদেরকে পণ্যের সামান্য মূল্যের মোকাবেলায় বড় ধরনের লাভ দেয়ার লোভ দেখায়। আর কোম্পানি যে পণ্যের মার্কেটিং করে বেড়ায়, সেটা শুধুই কমিশন লাভের একটা মাধ্যম মাত্র। কোম্পানির লেনদেনের এ বাস্তবতার কারণে এ ব্যবসাটি হারাম। হারাম হওয়ার কারণগুলো বিস্তারিতভাবে নিম্নরূপ :

১. এ ব্যবসায় দু’ প্রকার সুদই বিদ্যমান :-

   ক. রিবা আল-ফাদল

   খ. রিবা আন-নাসীআহ

কেননা গ্রাহক অল্প কিছু টাকা দিয়ে অনেক বেশি টাকা অর্জন করে থাকে। ফলে তা টাকার বিনিময়ে পরবর্তিতে অতিরিক্তসহ টাকা প্রদান হয়ে যাচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে সে রিবা বা সুদ যা কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা হারাম সাব্যস্ত হয়েছে। আর কোম্পানি কর্তৃক বিক্রীত পণ্য শুধু আড়াল ও মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্রয় করা গ্রাহকের উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং পণ্য ক্রয় করা সত্ত্বেও এ লেনদেন বৈধ হবে না।

২. এটা এমন ‘গারার’ ও অশ্চিয়তামূলক লেনেদেনের অন্তর্ভুক্ত যা শরী‘আতে হারাম। কেননা গ্রাহক জানে না সে প্রয়েজনীয় সংখ্যক কাস্টমার যোগাড় করতে পারবে কি-না। আর পিরামিড বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং যতই চলতে থাকুক, তা কোন এক সময় অবশ্যই শেষ পর্যায়ে উপনীত হতে বাধ্য। আর গ্রাহক জানে না যে, সে কি পিরামিড স্কিমে সম্পৃক্ত হয়ে সবের্বাচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে লাভবান হতে পারবে? নাকি সর্বনিম্ন স্তরে থেকে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে? অবশ্য প্রথম দিকের কিছু গ্রাহকই শুধু লাভবান হবেন, আর অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটাই হচ্ছে অনিশ্চয়তামূলক লেনদেনের বাস্তবতা। আর তা হলো দুদিকের এ টানাটানি। তবে খারাপ ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেনদেনের অনিশ্চয়তায় সম্পৃক্ত হতে নিষেধ করেছেন। [সহীহ মুসলিম]

৩. এ লেনদেনের মধ্যে রয়েছে কোম্পানি কর্তৃক মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ; কেননা কোম্পানি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে অন্যরা এ ধরনের চুক্তি থেকে লাভবান হয় না। অবশ্য কোম্পানি গ্রাহকদের কিছু সংখ্যককে লাভ প্রদান করে অন্যদেরকে প্রতারিত করার জন্য। এ বিষয়টিকে হারাম বলে কুরআনে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা বাতিল পন্থায় তোমাদের নিজেদের সম্পদ ভক্ষণ করো না।’’ [আন-নিসা : ২৯]

৪. এ লেনেদেনের মধ্যে রয়েছে প্রতারণা, অস্পষ্টতা ও মানুষকে সংশয়াচ্ছন্ন রাখা। যেমন এখানে পণ্য ক্রয় এমনভাবে দেখানো হয় যেন সেটাই এ লেনদেনের মূল উদ্দেশ্য। অথচ প্রকৃত অবস্থা এর বিপরীত। তদুপরি এখানে বড় ধরনের কমিশনের লোভ দেখানো হয়, যা অধিকাংশ সময়ই বাস্তবায়িত হয় না। আর এটাই হল সে প্রতারণা যা শরী‘আতে হারাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে আমাদেরকে প্রতারিত করল সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়।’’ [সহীহ মুসলিম] তিনি আরো বলেছেন, ‘‘ক্রেতা-বিক্রেতা পৃথক না হওয়া পর্যন্ত তাদের এখতিয়ার থাকবে। যদি তারা সত্যবাদী হয় ও সবকিছু বিশদভাবে স্পষ্ট করে তাহলে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে ও গোপন করে তবে তাদের বেচাকেনার বরকত চলে যায়।’’ [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]

আর যে বলা হয়, এ লেনদেন হচ্ছে এক ধরনের দালালি, সে দাবি শুদ্ধ নয়। কারণ দালালি হচ্ছে এক ধরনের চুক্তি, যার ফলে পণ্য বেচাকেনা সম্পন্ন হলে দালাল তার পারিশ্রমিক পায়। অথচ নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের গ্রাহকই পণ্য বিক্রয়ের মূল্য পরিশোধ করে। তদুপরি দালালির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পণ্যের প্রকৃত মার্কেটিং, অথচ মাল্টি লেভেল মার্কেটিং হল এর সম্পূর্ণ বিপরীত; কেননা এর মূল উদ্দেশ্য কমিশনের মার্কেটিং, পণ্যের নয়। এ কারণেই মাল্টি লেভেলের গ্রাহক চেষ্টা করে একের পর এক এ কমিশন বাণিজ্যের মার্কেটিংয়ের যা দালালির বিপরীত। কারণ দালাল এ ব্যক্তির কাছে মার্কেটিং করে যে প্রকৃতই পণ্য ক্রয় করতে চায়। ফলে উভয়ের পার্থক্য খুবই স্পষ্ট।

অনুরূপভাবে এ কমিশনকে হেবা বা অনুদান হিসেবে মনে করা যাবে না। আর যদি একে হেবা বা অনুদান বলে চালিয়ে দেয়া হয়, তবে মনে রাখতে হবে সকল হেবা শরী‘আতে জায়েয নেই। যেমন ঋণের উপর হেবা দেয়া-নেয়া সুদ বলে গণ্য। এজন্যই আবদুল্লাহ ইবন সালাম রা. আবু বুরদাহ রা.কে বলেছিলেন, ‘‘তুমি এমন যমীনে আছ, যেখানে সুদ প্রচলিত। যখন কোন ব্যক্তির কাছে তোমার কোন পাওনা থাকে< এরপর সে যদি তোমাকে এক বোঝা ঘাস, অথবা যব কিংবা এক বোঝা গো-খাদ্য প্রদান করে তাহলে তা হবে সুদ।’’ [সহীহ বুখারী]

যে উদ্দেশ্যে হেবা প্রদান করা হয় সে উদ্দেশ্যের শরয়ী বিধান কি হবে সে আলোকে হেবার হুকম নির্ধারিত হবে। এজন্যই যাকাত আদায়কারী কর্মচারী যে এসে বলেছিল, ‘এটা আপনাদের জন্য আর এটা আমাকে হাদিয়া দেয়া হয়েছে’, তার ব্যপারে নবী সা. বলেছেন, ‘‘তুমি কেন তোমার বাবা-মায়ের বাড়িতে বসে থাক নি? তাহলে দেখতে তোমাকে হাদিয়া দেয়া হয় কি-না!’’ [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের এ কমিশন দেয়া হয় শুধুই নেটওয়ার্ক মার্কেটিংয়ের জন্য, একে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, চাই হাদিয়া বা হেবা কিংবা অন্য কোন নামে, তাতে এর প্রকৃত অবস্থা ও বিধানের কোন কিছুই পরিবর্তিত হবে না।…’’

গবেষণা ও ফাতওয়ার স্থায়ী কমিটি, সউদী আরব

সভাপতি :

শাইখ আবদুল আযীয আল-শাইখ

সদস্যবৃন্দ :

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান

শাইখ আবদুল্লাহ আল-গুদাইয়ান

শাইখ আবদুল্লাহ আল-মুতলাক

শাইখ আবদুল্লাহ আর-রাকবান

শাইখ আহমাদ আল-মুবারাকী

[ফতওয়া নং- ২২৯৩৫; তাং ১৪-০৩-১৪২৫ হি.]

লিংক: http://www.islamqa.com/en/ref/42579

(গ) বিশিষ্ট লেখক, অধ্যাপক ও মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ রবার্ট লরেন্স ফিৎসপ্যাট্রিক এ ব্যবসার ওপর ১৪ বছর গবেষণা করেছেন এবং নিজেও কানাডার একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘Its promoters would like you to believe that it is the wave of the future, a business model that is gaining momentum, growing in acceptance and legitimacy, and will eventually replace most other forms of marketing. Many people are led to believe that success will come to anyone who believes in the system and adheres to its methods. Unfortunately, the MLM business model is a hoax that is hidden beneath misleading slogans.’ অর্থাৎ ‘এর উদ্যোক্তারা চায় আপনি এ বিশ্বাস করবেন যে, এটা ভবিষ্যতের ধারা, একটা বিজনেস মডেল, যা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, এর আইনি যৌক্তিকতা বাড়ছে এবং অচিরেই এটি মার্কেটিংয়ের অন্য সব ধরনের স্থান দখল করে নেবে। অনেককে এটাও বিশ্বাস করানো হয় যে, যারা এ সিস্টেমের প্রতি আস্থা রাখে, সাফল্য তাদেরকেই ধরা দেবে। দূর্ভাগ্যক্রমে, এমএলএম বিজনেস মডেল হল একটি প্রতারণা যা লুকিয়ে আছে ভুল শ্লোগানের আড়ালে।’ [সূত্র : ইন্টারনেট] তার একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ রয়েছে যার শিরোনাম ‘‘এমএলএম ব্যবসায় ১০টি বড় মিথ্যা’’।

(ঘ) ওয়াল্টার জে কার্ল ওয়েস্টার্ন জার্নাল অব কমিউনিকেশনে লিখেছেন ‘‘MLM organizations have been described by some as cults, pyramid schemes or organizations rife with misleading, deceptive, and unethical behavior, such as the questionable use of evangelical discourse to promote the business, and the exploitation of personal relationships for financial gain’’ [সূত্র : ইন্টারনেট]

(ঘ) মালেশিয়ার বিশিষ্ট পন্ডিত যাহারুদ্দীন আব্দুর রহমান এমএলএম-এর কমিশন ভোগকে হারাম গণ্য করে বলেন, “Generally, commission that is earned through sales of goods and services (like brokerage fee) is permissible in Islam. …However the commission in MLM and pyramid schemes may convert to haram status if (1) sales commission of the network is tied to his/her personal sale….” (2) Commission originates from an unknown down line because the network is too big. As a result, the upline seem to enjoy commission without the need to put any effort. This could be classified as compound brokerage (broker on broker on broker…) which falls under the category of eating up another’s property unjustly and has an element of gambling in it.” [www.zaharuddin.net]

উপসংহার:

সবশেষে আমরা এ কথা বলতে পারি যে, এ ব্যবসা শুধু শরী‘আতের সাথেই সাংঘর্ষিক নয় বরং স্বাভাবিক বুদ্ধি বিবেচনায়ও এটি অসংগতিপূর্ণ। মুখরোচক গল্প শুনিয়ে, ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে শর্তের বেড়াজালে আটকে এ ব্যবসার ধ্বজাধারীরা শত শত মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে, ছিনিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সরকার, মসজিদের ইমাম-খতীব, সমাজের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ব হল এ ব্যাপারে সমাজের লোকদের সচেতন করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ ব্যবসার খপ্পরে পড়া থেকে রক্ষা করুন। আমীন!!


[1] এটি একটি প্রসিদ্ধ মত। এর বিপরীত মত হচ্ছে যে, যতক্ষণ শরী‘আতসম্মত না হবে, ততক্ষণ কোন কিছুই হালাল নয়। [সম্পাদক]

সূত্র: ইসলাম হাউস

কম্পিউটারের কিছু সমস্যা ও সমাধান

কম্পিউটারের কিছু সমস্যা ও সমাধান

 

সমস্যা : ০১

আমি উইন্ডোজ xp সার্ভিস প্যাক টু ব্যবহার করি। কিন্তু কিছুদিন ধরে কম্পিউটারের সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এমপিথ্রি চালানোর সময় ‘There may not be a sound device installed on your computer’ বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ০১

আপনার সাউন্ড সিস্টেমটি বিল্টইন না এক্সটারনাল, জানালে ভালো হতো। যদি বিল্টইন সাউন্ড সিস্টেম হয়, তাহলে আপনাকে নতুন করে সাউন্ড ড্রাইভারটি ইনস্টল করতে হবে। এঙ্টারনাল হলে সাউন্ড সিস্টেমটি খুলে পরিষ্কার করার পর আবার সঠিকভাবে সংযোগ দিতে হবে।

সমস্যা : ০২

আমি অফিস ২০০৩ সংস্করণ ব্যবহার করি। আমার ওয়ার্ড প্রোগ্রামে ঋড়ৎসধঃ মেন্যুটি নেই। এটি কি ভাইরাসের কারণে হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো সমস্যা?

সমাধান : ০২

আপনার ব্যবহৃত অফিস ২০০৩ সংস্করণটিতে সম্ভবত সমস্যা রয়েছে। তাই সফটওয়্যারটি আন-ইনস্টল করে নতুন করে ভালো মানের অফিস ২০০৩ ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ০৩

আমি অনেক পুরনো মডেলের কম্পিউটার ব্যবহার করি। আমার কম্পিউটার চালু করার ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর আবার চেষ্টা করলে কম্পিউটার চালু হলেও একই সমস্যা হয়।

সমাধান : ০৩

আপনার কম্পিউটারের পাওয়ার সাপ্লাইতে সম্ভবত সমস্যা রয়েছে। এ জন্য পাওয়ার সাপ্লাই পরিবর্তন করার পাশাপাশি প্রসেসর, র্যা ম ও মাদারবোর্ড পরিবর্তন করে আপনার কম্পিউটারটি হালনাগাদ করে নিন। তা না হলে এ ধরনের সমস্যা নিয়মিত হবে।

সমস্যা : ০৪

আমার কম্পিউটারের মাদারবোর্ডের সিডি হারিয়ে গেছে। তাই উইন্ডোজ সেটআপ করার সময় কয়েকটি ড্রাইভার ফাইল মিসিং দেখায় এবং অডিও-ভিডিও ফাইল চলে না।

সমাধান : ০৪

আপনি যে মডেলের মাদারবোর্ড ব্যবহার করেন, সেই মাদারবোর্ডটির ড্রাইভার ফাইল ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন কম্পিউটার বিক্রেতা অথবা সার্ভিস সেন্টার থেকে মাদারবোর্ডের ড্রাইভার সিডি সংগ্রহ করতে পারেন।

সমস্যা : ০৫

আমার কম্পিউটার চালু হতে অনেক সময় নেয় এবং একসময় কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়। তখন কি-বোর্ডের F1 চাপলে কম্পিউটার চালু হয়। এ ছাড়া চালু হওয়ার পর কম্পিউটার খুব ধীরগতিতে কাজ করে।

সমাধান : ০৫

আপনি কম্পিউটারের বায়োস সেটিংসে প্রবেশ করে ফ্লপি ড্রাইভ অপশনটি ‘হড়হব’ করে দিন। এবার নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন এবং উন্নত সংস্করণের লাইসেন্সকৃত অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন।

সমস্যা : ০৬

আমার কম্পিউটারে একসঙ্গে কয়েকটি ওয়ার্ড ফাইল চালু করলে কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়। তবে মাঝে মাঝে কী-বোর্ডের ctrl+alt+delete কী চাপলে আবার চালু হয়।

সমাধান : ০৬

কম গতিসম্পন্ন কম্পিউটারে একসঙ্গে অনেক ফাইল চালু করলে এ ধরনের সমস্যা হয়। আপনি কম্পিউটারের র্যানম বাড়িয়ে নিন। এ ছাড়াও হার্ডডিস্কের অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলো মুছে ফেলুন এবং অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন।

সমস্যা : ০৭

আমি মজিলা ফায়ারফক্স ব্রাউজার ব্যবহার করি। কিছুদিন ধরে আমার ব্রাউজার চালু করার সময় ‘windows cannot find c:program filesjavajre6.exe’ বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ০৭

আপনার ব্রাউজারটির ডেসটিনিশন অর্থাৎ ইনস্টল লোকেশনে সমস্যা রয়েছে। আপনি ব্রাউজারটি আনইনস্টল করে নতুন করে ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ০৮

কম্পিউটারে বাংলা কম্পোজ করার সময় মাউসের কার্সার নিজ থেকে স্থান পরিবর্তন করে। অর্থাৎ মাউস ব্যবহার করে যেকোনো জায়গা নির্দিষ্ট করা হলেও কার্সার অন্য জায়গায় চলে যায়।

সমাধান : ০৮

আপনার কম্পিউটারটি ভাইরাসে আক্রান্ত। আপনি লাইসেন্স করা উন্নতমানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করে কম্পিউটার স্ক্যান করুন। মাউসটি অন্য কম্পিউটারে সংযোগ দিয়ে দেখুন ঠিক আছে কি না।

সমস্যা : ০৯

ইউএসবি পোর্টের মাধ্যমে কম্পিউটারের সঙ্গে ডিজিটাল ক্যামেরার সংযোগ দিলেও কম্পিউটার ক্যামেরাটি শনাক্ত করতে পারে না। তবে মাঝে মাঝে ‘new hardware found’ বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ০৯

আপনার ক্যামেরার সঙ্গের ড্রাইভারটি কম্পিউটারে ইনস্টল করে নিন। কম্পিউটারের সঙ্গে ক্যামেরার সংযোগটি সঠিকভাবে রয়েছে কি না পরীক্ষা করুন। অনেক সময় অপারেটিং সিস্টেমের কারণে এ ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে।

সমস্যা : ১০

আমার কম্পিউটারে এমপিফোর ফরমেটের কোনো ভিডিও চলে না। আমি ভিএলসি প্লেয়ার এবং উইন্ডোজ মিডিয়া প্লেয়ার ব্যবহার করি।

সমাধান : ১০

আপনার মিডিয়া প্লেয়ারে সমস্যা রয়েছে। ইন্টারনেট থেকে এমপিফোর ফরমেটে কাজ করতে সক্ষম প্লেয়ার কম্পিউটারে ইনস্টল করুন। এ ছাড়াও আপনার এমপিফোর ফরমেটের ভিডিওগুলো ঠিক আছে কি না তা যাচাই করুন।

সমস্যা : ১১

আমার কম্পিউটারের ব্যাকগ্রাউন্ড সেটিংস বারবার কালো হয়ে যায়। ব্যাকগ্রাউন্ড সেটিংস ঠিক করার কিছুক্ষণ পর আবারও একই ধরনের সমস্যা হয় এবং “you may be a victim of software counterfeiting” বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ১১  

কম্পিউটারে নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন। এ ছাড়া মনিটরটি ঠিক আছে কি না দেখে নতুন করে সংযোগ দিন এবং মানসম্পন্ন অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করে হার্ডডিস্কের সব ড্রাইভ স্ক্যান করুন।

সমস্যা : ১২

নতুন করে উইন্ডোজ ইনস্টল করা হলেও কম্পিউটার আগের মতোই ধীরগতিতে কাজ করে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে কম্পিউটার চালুর সময় ‘diskboot failure’ বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ১২

আপনার কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের সংযোগ সঠিকভাবে লাগিয়ে নিন। হার্ডডিস্ক থেকে অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলো মুছে ফেলুন। গতি বাড়ানোর জন্য র্যা মের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন।

সমস্যা : ১৩

আমার কম্পিউটারের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে স্পিকারে ঠিকভাবে গান শোনা যায়। তবে হেডফোনের সংযোগ দেওয়া হলে কম্পিউটারে চালু থাকা অডিও বা ভিডিও ফাইল বন্ধ হয়ে যায়।

সমাধান : ১৩

আপনার হেডফোনটিতে সম্ভবত সমস্যা রয়েছে। হেডফোনের সংযোগস্থলে বিদ্যুৎ আসে কি না দেখে নিন। সাউন্ড সিস্টেমে ভালো মানের স্পিকার এবং হেডফোন ব্যবহার করুন।

সমস্যা : ১৪

কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা বিভিন্ন ওয়ার্ড ফাইল পরবর্তী সময়ে খুলতে গেলে ওয়ার্ড প্রোগাম বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি বারবার চেষ্টা করলে কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়।

সমাধান :  ১৪

আপনার কম্পিউটারে ভাইরাস রয়েছে। এ কারণে সংরক্ষণ করা বিভিন্ন ওয়ার্ড ফাইল খুলছে না। উন্নতমানের লাইসেন্স করা অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করুন এবং নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ১৫

আমার প্রিন্টারে রঙিন প্রিন্ট করার ক্ষমতা থাকলেও প্রিন্ট করার সময় শুধু সাদাকালো প্রিন্ট বের হয়। আমি প্রিন্টারে কালি পরিবর্তন করেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

সমাধান : ১৫

আপনি প্রিন্টারের কালি পরিবর্তন বলতে কি রিফিল করেছেন? তা হলে এ ধরনের সমস্যা হয়। আপনি প্রিন্টারের জন্য নতুন কালো এবং রঙিন কাট্রর্িজ কিনে নতুন করে ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ১৬

আমার কম্পিউটার থেকে টেক্সট ফাইল প্রিন্ট করা গেলেও কোনো ধরনের জেপিইজি (jpeg) ফরম্যাটের ফাইল প্রিন্ট হয় না। এমনকি ইন্টারনেট থেকে সরাসরি কোনো টেক্সট ফাইলও প্রিন্ট করা যায় না।

সমাধান : ১৬

আপনি জেপিইজি ফাইলটি আগে ফটোশপ অথবা ইলাস্ট্রেটর ব্যবহার করে খুলুন। এবার জেপিইজি ফরম্যাটের ফাইল প্রিন্ট করা যায় কি না দেখুন। ইন্টারনেট থেকে প্রিন্ট করার সময় ফাইলটিতে প্রিন্ট অপশন আছে কি না দেখুন।

সমস্যা : ১৭

পেনড্রাইভ থেকে কোনো ফাইল কম্পিউটারে কপি করা যায় না। কিন্তু কম্পিউটার থেকে সব ধরনের ফাইল পেনড্রাইভে স্থানান্তর করা যায়। অনেক সময় পেনড্রাইভের সব ফাইলও দেখা যায় না।

সমাধান :  ১৭

আপনার পেনড্রাইভটি ভাইরাসে আক্রান্ত। লাইসেন্সকৃত উন্নতমানের অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে একে আগে মুক্ত করুন এবং পিসিটিও স্ক্যান করে নিন।

সমস্যা : ১৮

আমার কম্পিউটার চালু হওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে হ্যাং হয়ে যায় এবং এক ধরনের আওয়াজ করে। কম্পিউটার চালু করার জন্য রিস্টার্ট দিলে অনেকক্ষণ পর চালু হয়।

সমাধান :  ১৮

আপনার কম্পিউটারের কেসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত পাওয়ার সাপ্লাইটি পরিবর্তন করতে হবে। এ ছাড়া হার্ডডিস্কের ‘সি ড্রাইভ’ ফরম্যাট করার পাশাপাশি নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ১৯

কম্পিউটার চালু করলে মনিটরে কোনো কিছু দেখা যায় না। এমনকি কম্পিউটার রিস্টার্ট করলেও রিস্টার্ট হয় না। তবে কম্পিউটারের পাওয়ার সুইচ বন্ধ করলে কম্পিউটার বন্ধ করা যায়।

সমাধান : ১৯

আপনার কম্পিউটারের সঙ্গে মনিটরের সংযোগ কেব্ল্ ঠিক আছে কি না তা পরীক্ষা করুন। এবার মাদারবোর্ড থেকে প্রসেসরটি খুলে প্রসেসর ফ্যানটি পরিষ্কার করে লাগিয়ে নিন। এবার মাদারবোর্ড থেকে র্যা ম খুলে পরিষ্কার করে আবার সংযোগ দিন।

সমস্যা : ২০

কম্পিউটারে ঠিকমতো কাজ করা গেলেও যখন কম্পিউটার চালু করা হয়, তখন কম্পিউটারের ঘড়িতে ভুল সময় প্রদর্শন করে।

সমাধান :  ২০

আপনি ডেস্কটপের নিচের বারে কম্পিউটারের ঘড়ি আইকনটিতে ডাবল ক্লিক করুন। ঘড়িটির বিস্তারিত তথ্য আপনি দেখতে পারবেন। এবার ঘড়িটির সময়, তারিখ ও সাল পরিবর্তন করে নিন।

সমস্যা : ২১

আমার ল্যাপটপে আগে গেইম খেলা গেলেও Windows XP Servise Pack 2 সেটআপ করার পর থেকে আর কোনো গেইম চলছে না।

সমাধান :  ২১

আপনার Windows XP Servise Pack 2-এর সব ফাংশন সঠিকভাবে ইনস্টল হয়নি বলে এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আপনি নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম এবং গ্রাফিকস কার্ডের ড্রাইভার সঠিকভাবে ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ২২

আমি কম্পিউটারে ফায়ারফঙ্ ব্রাউজার ব্যবহার করি। কিন্তু কিছুদিন ধরে একসঙ্গে কয়েকটি ওয়েবপেইজ চালু করতে গেলে ফায়ারফঙ্ হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মাঝে মাঝে কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়।

সমাধান : ২২

আপনাকে ফায়ারফক্সের সর্বশেষ সংস্করণের ভার্সণ ব্যবহার করতে হবে পাশাপাশি ভাল মানের এন্টিভাইরাস ব্যবহার করুন।

সমস্যা : ২৩

ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক থেকে কোনো ফাইল মেইলে অ্যাটাচ করা যায় না। তবে মেইল থেকে ফাইল হার্ডডিস্ক ডাউনলোড করা যায়।

সমাধান : ২৩

আপনার ব্রাউজারটিতে সমস্যা রয়েছে। আপনি হালনাগাদ সংস্করণের ব্রাউজার ব্যবহার করুন। এ ছাড়া সব সময় দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।

সমস্যা : ২৪

কম্পিউটারে পেনড্রাইভ প্রবেশ করালেই কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়। আমি কম্পিউটারে হালনাগাদ সংস্করণের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করি এবং নিয়মিত কম্পিউটার ও পেনড্রাইভ ভাইরাস স্ক্যান করি।

সমাধান :  ২৪

আপনি যে অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করছেন তা আপনার কম্পিউটারে থাকা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারছে না। অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করে কম্পিউটার এবং পেনড্রাইভ ভাইরাসমুক্ত করুন। সমাধান না হলে নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ২৫

কম্পিউটারে কোনো ওয়ার্ড ফাইল তৈরির পর সেভ করলে একটির বদলে দুটি ফাইল সেভ হয়। পরবর্তী সময়ে ফাইলটি ব্যবহার করতে গেলে কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়।

সমাধান : ২৫

ভাইরাসের কারণে আপনার ওয়ার্ড ফাইলে একাধিক ফাইল সেভ হচ্ছে। হালনাগাদ সংস্করণের লাইসেন্সকৃত অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহারের পাশাপাশি আপনি নতুন করে অফিস ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ২৬

আমার কম্পিউটারে অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর ১০.০ সংস্করণের সফটওয়্যার ব্যবহার করি। কিন্তু সফটওয়্যারটি একবার আনইনস্টল করলে আর ইনস্টল করা যায় না। পরবর্তী সময়ে আমাকে আবার নতুন করে উইন্ডোজ সেটআপ দিতে হয়।

সমাধান : ২৬

পিসিতে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করার সময় লক্ষ করবেন কোনো ফাইল যেন মিসিং না হয়। ইলাস্ট্রেটর আনইনস্টল করার সময় দেখতে সম্পূর্ণভাবে আনইনস্টল হয়েছে কি না।

সমস্যা : ২৭

আমার ল্যাপটপে উইন্ডোজ এঙ্পি ইনস্টল করার সময় সাউন্ড ড্রাইভার সঠিকভাবে ইনস্টল হলেও সাউন্ড আসে না। আমি আগে উইন্ডোজ ৭ ব্যবহার করতাম।

সমাধান : ২৭

অনেক ল্যাপটপে নরম্যাল এঙ্পি সঠিকভাবে কাজ করে না, সে ক্ষেত্রে আপনাকে আপডেট উইন্ডোজ ব্যবহার করতে হবে। আপনি আবার উইন্ডোজ ৭ ইনস্টল করে দেখুন।

সমস্যা : ২৮

কম্পিউটারে কাজ করার সময় কোনো ফাইল সেভ করতে অনেক বেশি সময় প্রয়োজন হয়। মাঝেমধ্যে কম্পিউটার রিস্টার্ট হয়ে যায় এবং কয়েকবার চেষ্টার পর কম্পিউটার চালু করা যায়।

সমাধান : ২৮

আপনি ডিস্ক ক্লিনআপ ব্যবহার করে পিসিটি থেকে অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলো মুছে ফেলুন। সম্ভব হলে পিসিটি আপডেট করে নিন। পাওয়ার সাপ্লাই পরিবর্তন করে নিন।

সমস্যা : ২৯

কম্পিউটারে পেনড্রাইভ প্রবেশ করালেই কম্পিউটার হ্যাং হয়ে যায়। আমি কম্পিউটারে হালনাগাদ সংস্করণের অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবহার করি এবং নিয়মিত কম্পিউটার ও পেনড্রাইভ ভাইরাস স্ক্যান করি।

সমাধান :  ২৯

আপনি যে অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবহার করছেন, তা আপনার কম্পিউটারে থাকা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারছে না। অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবহার করে কম্পিউটার এবং পেনড্রাইভ ভাইরাসমুক্ত করুন। সমাধান না হলে নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ৩০

আমার কম্পিউটারে দুটি হার্ডডিস্ক ব্যবহার করা হলেও একটি হার্ডডিস্ক প্রদর্শন করে। তবে হার্ডডিস্ক খুলে আবার সংযোগ দিলে তখন দুটি হার্ডডিস্কই প্রদর্শন করে। কিছুদিন পর আবার একটি হার্ডডিস্ক প্রদর্শন করে।

সমাধান :  ৩০

কম্পিউটারের একটি হার্ডডিস্কের জাম্পার খুলে দিন। যে হার্ডডিস্কটি প্রদর্শন করে না, এর কেব্ল্গুলো পরিবর্তন করে ভালোভাবে সংযোগ দিন।

সমস্যা : ৩১

আমি কোর আই৩ প্রসেসরের কম্পিউটার ব্যবহার করি। কিন্তু আমার কম্পিউটারে সব গেইম ভালোভাবে খেলা যায় না। বিশেষ করে ফুটবল, ক্রিকেট, জিটিএ : ভাইস সিটি ইত্যাদি গেইম খুব ধীরে ধীরে চলে এবং স্ক্রিন মাঝেমধ্যে আটকে যায়।

সমাধান :  ৩১

শুধু উচ্চক্ষমতার প্রসেসর ব্যবহার করলেই সব ভিডিও গেইম সঠিকভাবে খেলা যায় না। উচ্চ রেজ্যুলেশনের ভিডিও গেইম খেলার জন্য উচ্চক্ষমতার গ্রাফিকস কার্ড এবং র্যাচম প্রয়োজন হয়। গেইমের চাহিদানুযায়ী আপনার কম্পিউটারে গ্রাফিকস কার্ড এবং র্যাচম ব্যবহার করুন।

সমস্যা : ৩২

আমি ইউম্যক্স অষ্ট্রা ৫৬০০ মডেলের স্ক্যানার ব্যবহার করি। কিন্তু কিছুদিন ধরে স্ক্যানারটি ব্যবহারের সময় ‘ব্লগ’ দেখাচ্ছে। স্ক্যানারটির ড্রাইভার মুছে আবার নতুন করে ইনষ্টল করেছি। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় নি।

সমাধান : ৩২

আপনার স্ক্যানারটিতে হার্ডওয়্যারজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যা স্ক্যানারটি পরীক্ষা না করলে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। স্ক্যানারটির বিক্রয়োত্তর সেবার মেয়াদ থাকলে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ে যান।

সমস্যা : ৩৩

আমার কম্পিউটারে বাংলা ফন্ট ইনষ্টল করা থাকলেও ইন্টারনেটে কোনো সংবাদপত্র পড়তে পারিনা। আমি বেশ কয়েকবার ফন্ট ইনষ্টল করলেও সমস্যার সমাধান হয় নি।

সমাধান : ৩৩

কম্পিউটার বাংলা ফন্ট থাকলে সেটাকে ফন্ট অপশনে সেটআপ করে নিতে হবে। আপনি নতুন করে বাংলা ফন্টের যেকোনো সফটওয়্যার ইনস্টল করে ফন্ট অপশনে সেট করুন।

সমস্যা : ৩৪

কম্পিউটারে গান শোনার সময় শব্দ নিজ থেকেই কমবেশি হয়। আবার মাঝেমধ্যে কোনো গান চালু করলে কোনো শব্দ শোনা যায় না।

সমাধান :  ৩৪

আপনার স্পিকারের জ্যাকটি সম্ভবত সঠিকভাবে সংযোগ দেওয়া হয়নি। সঠিকভাবে স্পিকারের জ্যাকটি সংযোগ দেওয়ার পর কাজ না হলে স্পিকারের কেব্ল্টি পরিবর্তন করতে হবে।

সমস্যা : ৩৫

আমার কম্পিউটারের মাই কম্পিউটার থেকে কোনো ড্রাইভ খোলা যাচ্ছে না। তবে ডেস্কটপে থাকা ফাইল ব্যবহারের পাশাপাশি এঙ্প্লোর অপশন ব্যবহার করে ড্রাইভগুলো খোলা যায়।

সমাধান : ৩৫

আপনি প্রথমে ভাইরাস স্ক্যান করে নিন। কাজ না হলে নতুন অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করুন। আগের ইনস্টল অপারেটিং সিস্টেমটির ফাংশন মিসিং আছে।

সমস্যা : ৩৬

আমি কম্পিউটারে উইন্ডোজ এঙ্পি ব্যবহার করি। আমার কম্পিউটারে নতুন করে উইন্ডোজ এঙ্পি ইনস্টল করার পর যেসব গেইম আমি আগে খেলতাম, তা চালু হচ্ছে না। গেইম চালুর সময় ‘দি অ্যাপ্লিকেশন হ্যাজ ফেইলড টু স্টার্ট’_এ রকম একটি বাক্য দেখায়।

সমাধান :  ৩৬

কোনো কম্পিউটারে নতুন করে যেকোনো সফটওয়্যার ইনস্টল করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সি ড্রাইভে ইনস্টল হয়। সে জন্য আপনি উইন্ডোজ ইনস্টল করায় সফটওয়্যারগুলো কাজ করছে না। নতুন করে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ৩৭

আমি কম্পিউটারে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। কিন্তু যখনই আমি মোবাইল ফোন কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করি তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম্পিউটারে তথ্য বিনিময় হয়।

সমাধান :  ৩৭

কম্পিউটারের প্লাগ অ্যান্ড প্লে চালু থাকায় আপনার মোবাইল ফোন কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য বিনিময় হচ্ছে। আপনি প্লাগ অ্যান্ড প্লে সুবিধা বন্ধ করে দিলে এ সমস্যা হবে না।

সমস্যা : ৩৮

কম্পিউটার বন্ধ করার জন্য শাট ডাউন কমান্ড দেওয়ার পর বন্ধ হতে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় নেয়। এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার চালু করার সময়ও আগের তুলনায় অনেক ধীরগতিতে চালু হয়।

সমাধান : ৩৮

আপনার কম্পিউটারটির কনফিগারেশন জানালে ভালো হতো। আপনি নিয়মিত ডিস্ক ক্লিনআপ ব্যবহার করে আপনার কম্পিউটার থেকে অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলো মুছে ফেলুন।

সমস্যা : ৩৯

কম্পিউটারে কাজ করার সময় মাঝেমধ্যে ‘নট রেসপন্ডিং’ বার্তা প্রদর্শন করে। ওয়ার্ড ফাইলে কাজ করার সময় এ ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। আমার কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ নেই।

সমাধান :  ৩৯

আপনার কম্পিউটারে ব্যবহার করা এমএস অফিস সফটওয়্যারটি ঠিকমতো কাজ করছে না। নতুন করে ইনস্টল করুন এবং অপ্রয়োজনীয় ফাইলগুলো মুছে ফেলুন।

সমস্যা : ৪০

আমার কম্পিউটারে মাদারবোর্ডের সিডি ইনস্টল হচ্ছে না; যার কারণে শব্দ শোনা যায় না। এ ছাড়া কম্পিউটার বন্ধ করার জন্য কমান্ড দিলেও বন্ধ না হয়ে ‘It is now safe to turn off your computer’ বার্তা প্রদর্শন করে।

সমাধান : ৪০

আপনার পিসিতে অপারেটিং সিস্টেমটি সঠিকভাবে ইনস্টল হয়নি। আপনি নতুন করে উইন্ডোজ এঙ্পি উন্নতমানের সিডি থেকে ইনস্টল করুন এবং কোনো ফাইল যেন বাদ না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখুন।

সমস্যা : ৪১

কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে তিনটি পার্টিশন অর্থাৎ সিডি এবং ই-ড্রাইভ থাকলেও দুটি ড্রাইভে প্রবেশ করা যায় না। তবে কোনো ফাইল ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করার সময় সেই ড্রাইভগুলোতে ডাউনলোড করা যায়।

সমাধান :  ৪১

আপনার কম্পিউটারের হার্ডডিস্কটি নতুন করে পার্টিশন করতে হবে। তারপর প্রতিটি ড্রাইভ ফরম্যাট করে নিন। এবার নতুন করে অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল করে প্রয়োজনীয় ড্রাইভগুলো সঠিকভাবে ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ৪২

আমি ইয়াহু মেইল ব্যবহার করি। বেশ কিছুদিন ধরে আমার ই-মেইল অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করার পর মেইল পড়া গেলেও মেইলের সঙ্গে থাকা কোনো অ্যাটাচমেন্ট পড়া যায় না। অর্থাৎ অ্যাটাচমেন্টে ক্লিক করার পর অনেক সময় পার হয়ে গেলেও তা চালু হয় না।

সমাধান :  ৪২

যদি আপনি মনে করেন আপনার কম্পিউটার ভাইরাসমুক্ত, তাহলে নতুন করে অপারেটিং সিস্টেমটি ইনস্টল করার পাশাপাশি হালনাগাদ সংস্করণের ব্রাউজার ইনস্টল করুন।

সমস্যা : ৪৩

কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক থেকে কোনো ফাইল পেনড্রাইভে স্থানান্তর করা যায় না। তবে পেনড্রাইভ থেকে হার্ডডিস্কে ফাইল স্থানান্তর করা যায়।

সমাধান : ৪৩

আপনার পেনড্রাইভটি প্রথমে ভাইরাসমুক্ত করুন। সমস্যার সমাধান না হলে আপনার পেনড্রাইভটি নতুন করে ফরম্যাট করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নতমানের অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করে আপনার কম্পিউটারে ভাইরাস স্ক্যান করে নিন।

সমস্যা : ৪৪

কম্পিউটারে ওয়েবক্যাম চালু করলেই কম্পিউটার খুব ধীরগতিতে কাজ করে। এমনকি মাঝেমধ্যে কম্পিউটার রিস্টার্ট হয়ে যায়।

সমাধান :  ৪৪

ইন্টারনেটের গতি যদি ভালো মানের না হয়, তাহলে কম্পিউটার ধীরে কাজ করবে। এ জন্য আপনি দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি র্যা মের গতি বাড়িয়ে নিন। কম্পিউটারের প্রসেসরের ফ্যানটি সঠিকভাবে চলে কি না তা পরীক্ষা করুন।

সমস্যা : ৪৫

আমি কম্পিউটারে একটি অতিরিক্ত হার্ডডিস্ক ব্যবহার করি। কম্পিউটার চালু অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর হার্ডডিস্কটির ড্রাইভগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু অন্য হার্ডডিস্কের ড্রাইভগুলো ঠিকই দেখা যাচ্ছে। পরে হার্ডডিস্কটি নতুন করে পার্টিশন করলেও সি ড্রাইভ বারবার মুছে যাচ্ছে।

সমাধান : ৪৫

আপনি অতিরিক্ত হার্ডডিস্কটির সঙ্গে কম্পিউটারের আবার সংযোগ দিন। সমস্যার সমাধান না হলে হার্ডডিস্কটির জাম্পার খুলে সংযোগ দিতে হবে। হার্ডডিস্ক পার্টিশন করার সময় সঠিকভাবে পার্টিশন করুন।

সূত্র: নেট

করলার পুষ্টিগুণ

করলার পুষ্টিগুণ

করলা জন্মায় ট্রপিক্যাল  দেশগুলিতে। যেমন- এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপূঞ্জ, দক্ষিণ আমেরিকা। করলা স্বাদে তিতা, তবে উপকারী অ-নে-ক। এশিয়া অঞ্চলে হাজার বছর ধরে এটি ওষুধ হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান অঞ্চলের আদিবাসীরাও বহু বছর ধরেই করলাকে ডায়াবেটিস, পেটের গ্যাস, হাম ও হেপাটাইটিসের ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। ব্যবহার করে আসছে উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, ম্যালেরিয়া জ্বরে এবং মাথা ব্যথায়ও।

করলায় আছে পালং শাকের চেয়ে দ্বিগুণ ক্যালশিয়াম আর কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম। আছে যথেষ্ট লৌহ, প্রচুর ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং আঁশ। ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি এন্টি অক্সিডেন্ট; বার্ধক্য ঠেকিয়ে রাখে, শরীরের কোষগুলোকে রক্ষা করে। আছে লুটিন আর লাইকোপিন।  এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। লাইকোপিন শক্তিশালী এন্টি অক্সিডেন্ট।

করলা অন্ত্রনালী কর্তৃক গ্লুকোজ শোষণ কমায়। রক্তের সুগার কমাতে করলা ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর। অনেক গবেষণাই করলাকে ডায়াবেটিস চিকিত্সায় কার্যকর প্রমাণ করেছে। ফিলিপাইনে ডায়াবেটিস চিকিত্সায় ভেষজ ওষুধ হিসাবে করলা অনুমোদিত। করলায় কমপক্ষে তিনটি উপাদান আছে যেগুলো রক্তের সুগার কমিয়ে ডায়াবেটিসে উপকার করে। এগুলো হচ্ছে চ্যারান্টিন, ইনসুলিনের মত পেপটাইড এবং এলকালয়েড। তিতা করলা অগ্নাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরণকারী কোষ ‘বিটা সেল’- এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে। তাই করলা অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ করায় বলে ধারণা করা হয়।

করলা ইনসুলিন রেজিস্টেন্স কমায়। করলা এডিনোসিন মনোফসফেট অ্যাকটিভেটেড প্রোটিন কাইনেজ নামক এনজাইম বা আমিষ বৃদ্ধি করে রক্ত থেকে শরীরের কোষগুলোর সুগার গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। শরীরের কোষের ভিতর গ্লুকোজের বিপাক ক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের সুগার কমে যায়।

 

করলা আরও যেসব উপকার করে:

০০         রক্তের চর্বি তথা ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় কিন্তু ভাল কলোস্টেরল এইচ.ডি.এল বাড়ায়।

০০         রক্তচাপ কমায়।

০০         ক্রিমিনাশক।

০০         ভাইরাস নাশক-হেপাটাইটিস এ, হারপিস ভাইরাস, ফ্লু, ইত্যাদির বিরুদ্ধে কার্যকর।

০০ ক্যান্সাররোধী-লিভার ক্যান্সার, লিউকোমিয়া, মেলানোমা, ইত্যাদি প্রতিরোধ করে।

০০         ল্যাক্সেটিভ- পায়খানাকে নরম রাখে, কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে।

০০         জীবাণুনাশী-বিশেষ করে ই-কোলাই নামক জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্য়কর।

%d bloggers like this: