সৌন্দর্যের অপার সুন্দরবন

সুন্দরবন- অপার সৌন্দর্যের হাতছানি

 

sundarban

 

 

সুন্দরবন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন – সুন্দরবন। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিবঙ্গের অংশবিশেষ নিয়ে সুন্দরবনের বিস্তার। এ বনেই বাস করে ভূবন-বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য হাতছানি দেয় দেশী-বিদেশী নানা রঙের মানুষকে। চিত্রল হরিণ, সুন্দরী গাছ, জলের কুমির আর নানা জাতের মাছ, গাছে গাছে শত শত প্রজাতির রং-বেরঙের পাখিই এই আকর্ষণের মূল কারণ।

বনভূমি ও বন্য প্রাণী দেখতে প্রতিনিয়ত সুন্দরবনে ভিড় করছে পর্যটকরা। প্রকৃতির অপরূপ অনাবিল সৌন্দর্যমন্ডিত রহস্যঘেরা এ বনভূমি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত পর্যটন সুবিধা। সুন্দরবন বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রল হরিণের জন্য। কিন্তু বর্তমানে সেখানে বানর, কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন, অজগর ও বন মোরগ ছাড়াও রয়েছে ৩৩০ প্রজাতির গাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির বন্য প্রাণী ও ৩২ প্রজাতির চিংড়িসহ ২১০ প্রজাতির মাছ। এসব বন্য প্রাণী ও সুন্দরবনের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা প্রতিনিয়ত সেখানে ছুটে যাচ্ছেন। পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা এবং পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সরকার কিংবা বনবিভাগ তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি। ফলে দেশের বৃহত্তর পর্যটন শিল্পটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সুন্দরবন থেকে।

 

যেভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হয়

খুলনা কিংবা মংলা থেকে নৌ পথে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রবেশ করা যায়। মংলার অদূরেই ঢাইনমারীতে রয়েছে বন বিভাগের কার্যালয়। সেখান থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের আনুষাঙ্গিকতা সারতে হয়। পর্যটকদের জনপ্রতি ৫০ টাকা, বিদেশী পর্যটকদের জন্য ৭০০ টাকা, প্রতি লঞ্চ ২৫শটাকা ও ছোট লঞ্চের জন্য প্রবেশ ফি কম রয়েছে। পর্যটকদের সাথে ভিডিও ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত একশটাকা বন বিভাগকে দিতে হয়। এসব ঝামেলা পর্যটকদের পোহাতে হয় না। ট্যুরিজম লিমিটেডের লোকজনই আনুষঙ্গিকতা সেরে নেবে। ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষকে শুধুমাত্র নির্ধারিত ৩/৫ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই তিন রাত দুদিন সুন্দরবনে ভ্রমণ ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে তারা।

সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থান

ঢাইনমারি অতিক্রম করলেই মংলার বহির্নোঙ্গরে দেখা যাবে একের পর এক বিদেশী জাহাজ। দেশ-বিদেশের পতাকাবাহী এসব বড় বড় জাহাজ দেখতে দেখতেই চোখে ভেসে উঠবে সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনী। এসব কেওড়া, গরাণ, সুন্দরী গাছ আর গোলপাতার বাগান দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব কচিখালী, কটকা কিংবা হিরণ পয়েন্টে। পর্যটকদের এখন মূল আকর্ষণ কটকা। হিরণ পয়েন্টের চেয়েও কটকা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সেখানে পৌঁছাতে মংলা থেকে সময় লাগবে ১২/১৪ ঘন্টা। কটকায় খুব সহজেই ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ দেখা যায়। ছোট ট্রলার কিংবা নৌকায় করে কটকার এপার-ওপার ঘুরে হরিণ ও বানরসহ বিরল প্রজাতির পাখি দেখা সম্ভব। এখানে দেখা সম্ভব হরিণ ও বানরের মিতালী। বানর গাছ থেকে খাবার নীচে ফেলে দেয়। হরিণ নীচে বসে অনায়াসে খাবার খায়। বাঘ আসতে দেখলে আগেভাগেই বানর হরিণকে সংকেত দেয়। হরিণ সংকেত পেয়ে পালিয়ে যায়। কটকায় রয়েছে বন বিভাগের ওয়াচ টাওয়ার। গাছের সমান উঁচু ঐ টাওয়ারে পর্যটকরা অনায়াসেই উঠে পড়েন এবং সুন্দরবনকে উপর থেকে এক নজর দেখে নেন।

কটকায় ভ্রমনের জন্য কিছু বিপদও রয়েছে। সেখানে রয়েছে বাঘের অবাধ বিচরণ। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে বাগানে প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তখন সেখানে রাজত্ব গেড়ে বসে বাঘ। তাই ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। কটকার পাশেই বঙ্গোপসাগর। সেখানে ছোট একটি বিচ রয়েছে। কিন্তু ২০০৪ সালে ঐ বিচে ভ্রমণ করতে গিয়ে জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারিয়েছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। তারপর থেকে ঐ বিচে ভ্রমণের ব্যাপারে বনবিভাগ কিছু নিয়ম-কানুন বেধে দিয়েছে। এছাড়াও বাঘের বিচরণ এলাকায় বনবিভাগ বিপজ্জনক সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। এতসব ভয়ংকর গল্পের পরও পর্যটকরা সশস্ত্র বন রক্ষিদের সাথে নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। সুন্দরবন এলাকায় প্রবেশ করার সময় ঢাইনমারি বিট অফিস থেকে অস্ত্র ও পোশাকধারী দুজন বনরক্ষিকে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সাথে দিয়ে দেয়া হয়। তারাই সুন্দরবনের হিংস্র প্রাণী কিংবা জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে তিন দিনের সাথী হয়ে থাকে।

দুবলার চর
 
 
 

 

সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে মানুষের দেখা না মিললেও বন থেকে ফেরার পথে আলোরকোল হয়ে দুবলার চরে যাত্রা বিরতি করলে দেখা মিলবে হাজার হাজার মৎস্য শিকারীর। সাগর সংলগ্ন বনের একটি অংশ কেটে সেখানে ৫ মাসের জন্য অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার জেলে। এদের মধ্যে কেউ বরিয়ালী, কেউ বাওয়ালী ও জেলে। প্রতি বছর অক্টোবর মাস আসলেই এরা দল বেঁধে ছুটে আসে দুবলার চরে। ফেব্রুয়ারী মাস শেষ হলেই ফিরে যায় বাড়িঘরে। বঙ্গোপসাগরে মৎস্য শিকারের জন্য অস্থায়ীভাবে দুবলার চরে তাদের বসবাস। জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা সেখানে সংঘটিত। হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পেতে অস্থায়ী জেলে পল্লীকে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। ফলে বন্য প্রাণী কোনক্রমেই জেলে পল্লীতে প্রবেশ করতে পারে না। দুবলার ৯টি চরে প্রায় ২৫ হাজার জেলে রয়েছে। এরা বিভিন্ন বহরে কাজ করে থাকেন। এক একটি বহরে ১০০/১৫০ জেলে কাজ করে। দুবলার চরের মুল ভূখন্ডে রয়েছে ৯ জন বহরদার। এদের মধ্যে অনিল বহরদার ও সাবের কোম্পানী পুরনো। এ দুজন জানায়, সাগরের দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই ১৯৮৫ সালে দুবলা ফিশারমেন গ্রুপ গঠন করা হয়। ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান সুন্দরবনের রহস্য পুরুষ মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন। এ সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহানূর রহমান শামীম জানান, এক সময় সুন্দরবনে মৎস্য শিকার করতে আসা জেলেরা শান্তিতে ঘুমাতে পারত না। এখন তারা লাখ লাখ টাকা বালির মধ্যে পুতে রেখে ঘুমিয়ে থাকে। কেউ তাদের কিছু বলে না।

সুন্দরবনের রহস্য পুরুষ

কেউ তাকে বলে সুন্দরবনের রহস্য পুরুষ। আবার কেউ বা বলেন সুন্দরবনের স্বপ্নের পুরুষ। বিশেষণ যাই হউক না কেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনের একক আধিপত্য প্রভাব বিস্তারকারী সুপুরুষ হিসেবে মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিনের নামই শোনা যায়। সেখানে মৎস্য শিকারে যাওয়া জেলেরা মেজর জিয়াউদ্দিনের উপর মহাখুশী। দুবলার চরে মৎস্য শিকারে আসা মিজানুর রহমান জানান, ১৯৮০ সালের দিকে এখানে মৎস্য শিকারে আসলে জেলেদের জাল, নৌকা এমনকি খাবার পর্যন্ত দস্যুরা নিয়ে যেত। মেজর জিয়াউদ্দিন তখন দুবলার ৬/৭টি চর নিয়ে একটি জেলে ইউনিট গঠন করেন। মৎস্য শিকারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করায় জলদস্যু, বনদস্যু, বনরক্ষি ও পুলিশের হয়রানি তাদের উপর অনেক কমে গেছে।

সুন্দরবনে প্রতিপক্ষকে মেজর জিয়া টিকতে দেন না এ রকম অভিযোগ থাকলেও মেজর জিয়া তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, দস্যুদের দমন করতে কখনো কখনো তাদের কঠোর হতে হয়। তিনি বলেন, যখন একটি জেলে নৌকা থেকে সবকিছু লুটপাটের পর ঐ জেলেকে পঙ্গু করে দেয়া হয় তখন সেই জলদস্যু ধরা পড়লে তার ব্যাপারে কঠোর হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। সুন্দরবনে মেজর জিয়ার টাইগার চিংড়ির ব্যবসা থাকলেও তার পরিসর ছোট। সেখানে মূল ব্যবসার পসরা সাজিয়ে বসেছেন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। এক একজন বহরদার এ মৌসুমে প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।
 
 
 

 

 

মৎস্য শিকার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সবকিছুই সম্পন্ন করা হয় দুবলার চরে। এ মৌসুমে জেলেরা শিকার করে রূপচাঁদা, লইট্টা, টেটা, ফ্যাইশা ও বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি। চিংড়িসহ তাজা মাছ চলে যায় খুলনায়। শুঁটকি পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। এসব ব্যবসা মেজর জিয়াউদ্দিনের নখদর্পণে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি সুন্দরবনে ঘাঁটি গেড়ে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ৪৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিজের দখলে রেখেছেন। তাই সুন্দরবনের মানচিত্র এখনো তার মুখস্ত। জীবনের অনেক সোনালী সকাল, উত্তপ্ত দুপুর, উদাস বিকেল আর মায়াবি সন্ধ্যা তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে। তাই তার এক কথা সুন্দরবনকে তিনি খুব বেশী ভালবাসেন। সুন্দরবনকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন। সুন্দরবন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠুক এটাই তার কাম্য।

 

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

সুন্দরবনে অস্থায়ী ঘর তৈরী ও মৎস্য শিকারের জন্য প্রতি পদে পদে টাকা দিতে হয় বন বিভাগকে। পুরো টাকা আবার সরকারী কোষাগারে জমা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সুন্দরবনে মৎস্য শিকারের জন্য বরিয়ালীদের প্রতি সপ্তাহে ৭ টাকা করে বন বিভাগকে দিতে হয়। নৌকা প্রতি ২৫ টাকা। যারা ঘাঁটি গেড়ে মৎস্য শিকার করেন তাদেরকে ৫ মাসের জন্য জমা দিতে হয় মোট ৪০ টাকা। বন বিভাগের গাছ কর্তনের জন্য নিয়মানুযায়ী টাকা পরিশোধ করতে হয়। সেখানে ৫ মাসের জন্য অস্থায়ী দোকান কিংবা যে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বন বিভাগকে নির্ধারিত টাকা দিতে হয়। ঐ টাকার একতৃতীয়াংশের রশিদ ধরিয়ে দেয়া হয় আগতদের। বাকী টাকা বন বিভাগের লোকজনই হজম করেন।


অভয়ারণ্য

কটকাসহ সুন্দরবনের বেশ কিছু এলাকাকে সরকারীভাবে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় বন্য প্রাণী শিকার নিষিদ্ধ। বাগেরহাট জেলার মধ্যে মূলতঃ শরণখোলা ও চানপাই রেঞ্জ থেকে সুন্দরবনকে নিয়ন্ত্রণ করে বন বিভাগ। কিন্তু বন কর্মীদের থাকা-খাওয়ার জন্য সুন্দরবনে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে বন বিভাগের অধিকাংশ লোকরাই সুন্দরবনে থাকেন না। মাঝে মধ্যে কর্মস্থলে গিয়ে হাজিরা দিয়ে আসেন। কটকায় গিয়ে দেখা গেছে সেখানের বিট অফিসার অনুপস্থিত। ফরেস্ট গার্ড পরিমল দাস জানান, ঐ বিটের অধীনে ৯ জন রয়েছে। এর মধ্যে রেঞ্জার ও তিনি বাদে একজন বনরক্ষি, সামাজিক বনায়ন রক্ষায় একজন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দুজন ও ৩ জন বোটম্যান রয়েছে। ফরেস্ট গার্ড শফিকুল আলম ও বোটম্যান আবু তালেব জানান, তাদের থাকা-খাওয়ার জন্য সেখানে কোন ব্যবস্থা নেই। বন বিভাগের একটি রেষ্ট হাউসের বাইরে যে দুটি ঘর ছিল তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মাণ করা ৫টি ঘরের মধ্যে দুটি ঘরে বন বিভাগের লোকজন বসবাস করেন। সেখানে তারা থাকা-খাওয়া ও অফিসের কাজকর্ম সারেন। পরিবেশ অধিদপ্তর কটকাসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন চরে ঘর নির্মাণ করলেও সেখানে এখন কেউ থাকেন না। স্থানীয়রা জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর বেতন বন্ধ করে দেয়ায় তাদের কর্মীরা দুবছর পূর্বে সুন্দরবন ছাড়েন।

 

সুন্দরবনে পর্যটন সুবিধা নেই

নয়নাভিরাম সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটকদের আকর্ষণ থাকলেও আজ পর্যন্ত সেখানে পর্যটন সুবিধা গড়ে ওঠেনি। কটকায় বন বিভাগের একটি গেস্ট হাউস থাকলেও তার ভাড়া বেশী। কটকার রেস্ট হাউসে ৮ জনের বেশী থাকা যায় না। কচিখালী গেস্ট হাউসে থাকা যায় ৬ জন। এসব রেস্ট হাউসে ভাড়া ৩ হাজার টাকা করে। গেস্ট হাউস দেখাশুনার জন্য একজন বনকর্মী রয়েছে। কটকা কিংবা কচিখালীতে পৌঁছে গেস্ট হাউস ভাড়া করা সম্ভব নয়। বাগেরহাটের ডিএফওর কাছ থেকে গেস্ট হাউস ভাড়া নিতে হয়। গেস্ট হাউসে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় পর্যটকরা রাত কাটান লঞ্চে।


সুন্দরবনে ২৩ বছর

বন বিভাগের নিম্নপদে যারা চাকরি করেন তাদের সারা জীবন কেটে যায় সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে। ২০/২৫ বছর সুন্দরবনে থাকেন এ রকম বনকর্মীর সংখ্যাই বেশী। এদের রয়েছে বন্য প্রাণী নিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে বৃদ্ধ আব্দুর রউফ জানান, ২৩ বছর যাবৎ তিনি সুন্দরবনে আছেন। কখনো সাতক্ষীরা, কখনো কোবাদক্ষ আবার কখনো বা শরণখোলা কিংবা ঢাইনমারিতে কেটে গেছে তার জীবনের সোনালী দিনগুলো। নিজের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। বিয়ের পরে স্ত্রীকে নিয়ে কর্মস্থলে থেকেছেন হাতেগোনা কয়েক দিন। চাকরির খাতিরে একাকি ঘুরে বেড়িয়েছেন কটকা থেকে কোবাদক্ষ। বয়সের ভারে নতজানু রউফ এখনো অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ান সুন্দরবনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ২৩ বছরে সুন্দরবনের বাঘ, ভাল্লুকের পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের সাথে লড়াই করে এখনো বেঁচে আছেন। জীবন সংগ্রামের শেষ বেলাভূমিতে দাড়িয়ে নিজেকে নিয়ে আর কোন স্বপ্ন নেই তার। এক ছেলে ও এক মেয়ে মধ্যে ছেলে মেধাবী। সে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর চাকরি নিয়েছে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। পরিবার পরিজন সবাই থাকে ঢাকা ও টাঙ্গাইলে। তিনি এখনো ঘুরে বেড়ান সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে।

ট্যুরিজম মালিকদের অভিযোগ
 
 
 

 

সুন্দরবনের পর্যটন সুবিধা নেই বলে ট্যুরিজম মালিকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সুন্দরবনকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে ট্যুরিজম মালিকরা। তাদের অভিযোগ বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যটনের ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ নেই। পর্যটকরা সুন্দরবনে না গেলে তাদের গাছ কাটা ও মাছ ধরা কিংবা মধু সংগ্রহ করতে সুবিধা হয়। পর্যটকদের সামনে তারা হরিণ শিকার করতে পারেন না। তাই পর্যটকরা যাতে সুন্দরবনে না যায় সে রকমই মনোভাব থাকে বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

 

boat-in-sundarban1

বনকর্মীদের বক্তব্য

বন বিভাগের লোকজন পর্যটকদের এ ধরনের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, চাকরির পরে তাদেরকে সুন্দরবনে বদলি করা হলেও থাকা-খাওয়ার কোন ব্যবস্থা বনে নেই। জেলেদের মাধ্যমে স্থল পথ থেকে নেয়া খাবার খেয়ে তারা সুন্দরবনে বেঁচে থাকেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলে জেলেরা নির্ধারিত সময় সুন্দরবনে না গেলে তাদেরকে না খেয়ে থাকতে হয়। বৃহত্তর এ বনাঞ্চলকে রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল কিংবা নৌযান নেই। বিট অফিসের ৫ কিলোমিটার দূর থেকেও গাছ কেটে নিলে বন রক্ষিদের করার কিছু থাকে না। কারণ নদী পাড় হয়ে তাদের সেখানে যাওয়ার উপায় থাকে না। তাদের কাছে অস্ত্র থাকলেও গুলি করার অনুমতি নেই। তাই তারা অস্ত্র রক্ষার জন্যই বনদস্যুদের ভয়ে উৎকণ্ঠিত থাকেন। বনকর্মীরা জানায়, তাদের চেয়ে বনদস্যুদের কাছে শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। বনদস্যুদের হাতে লোক মারা গেলে তেমন ঝামেলা নেই। কিন্তু তাদের গুলিতে বনদস্যু মারা গেলেও পরবর্তীতে সে জেলে হয়ে যায়। বনদস্যুরা নিজেদের জেলে পরিচয় দিয়ে বন বিভাগ থেকে পাস সংগ্রহ করে বনে প্রবেশ করে কাঠ পাচার করে।

 

দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা

খুলনা ও মংলা হয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। মংলা থেকে পর্যটন কেন্দ্র কটকায় পৌঁছাতে সময় লাগে ১৪/১৫ ঘন্টা। অথচ বরগুনার পাথরঘাটা থেকে কটকায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ২ ঘন্টা। কিন্তু পাথরঘাটা থেকে পর্যটকদের সুন্দরবনে যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা নেই। পাথরঘাটা থেকে শুধুমাত্র জেলেরা সুন্দরবনে মৎস্য শিকারে যান। এ সহজ পথে জেলেদের ট্রলারে উঠে সুন্দরবনে পাড়ি জমান বন বিভাগের লোকজন। তারা জানান, পাথরঘাটা থেকে পর্যটকরা যাতায়াত করলে সুন্দরবন দেখার জন্য তাদের আর বে {mosimage}অব বেঙ্গল ঘুরতে হবে না। পাথরঘাটার ব্যবসায়ী বাবুল খান পর্যটকদের জন্য দুট লঞ্চ ক্রয় করলেও তা এখন পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন শুরু করেনি। কটকায় লঞ্চ ভিড়ানোর জন্য এখন পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়নি কোন টার্মিনাল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সেখানে একটি ঘাট নির্মাণের জন্য ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ঘাট নির্মাণ হলে পর্যটকরা লঞ্চ থেকে সরাসরি কটকার বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবেন।


উপসংহার
সুন্দরবন শুধুআমাদেরই নয়, সারা পৃথিবীর প্রকৃতিপ্রেমিকদের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান। স্রষ্টার এই অপার দান আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। ভালবাসতে হবে এর সৌন্দর্য। আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে এর সংরক্ষণে। 

 

Advertisements
সৌন্দর্যের অপার সুন্দরবন তে মন্তব্য বন্ধ
%d bloggers like this: