কেউ হারে, কেউ হারে না

কেউ হারে, কেউ হারে না  

 

 
গনি মিয়ার বড় মেয়ে রমেলার শখ জাগলো কম্পিউটার শেখার। তাই ভালো একটা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার খোঁজার উদ্দেশ্যে বের হলো সে। সেই সুবাদে হঠাৎ ঢাকার আসাদ গেইটে আড়ংয়ের সামনে আমার সাথে রমেলার দেখা। দেখা মাত্র আমি কিছু জিজ্ঞাসা না করতেই সে সব কিছু খুলে বললো। রমেলা একজন রিক্সা চালকের মেয়ে। এমনিতেই অভাবী সংসার, আমাদের কলেজের প্রফেসর ওসমান স্যারের সহযোগিতায় বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ হয়েছে তার। তা না হলে হয়তো শিক্ষার আলো পড়তো না রমেলার জীবনে। কিন্তু কম্পিউটার শিখতে যে অনেক টাকার প্রয়োজন তা হয়তো সে জানে না। বন্ধু হিসাবে রমেলাকে বিষয়টি বুঝানো দরকার মনে করে আমি আর রমেলা হাঁটতে হাঁটতে সংসদ ভবনের কাছে গিয়ে বসলাম। রমেলাকে বললাম, পারলে লেখাপড়া শেষ করে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটা চাকরি খোঁজ, নতুবা গ্রামে গিয়ে কোনো একটা স্কুলে ছেলে-মেয়ে পড়াও। নয়তো, সাধারণ কোনো হাতের কাজের প্রশি‹ণ নাও, দেখবে জীবনটাকে চালিয়ে নিতে পারবে।
আমার কথা শেষ না হতেই রমেলা উঠতে চাইলো। বললো, আজ নয়, অন্য একদিন আবার কথা হবে। তার কথা মতো সংসদ ভবনের কাছ থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসাদ গেইট এসে রমেলাকে রিক্সায় তুলে দিলাম। রমেলা চলে গেলো, যাবার সময় অনুরোধ করলো বাসায় যাবার জন্য। কিন্তু কখন কোন দিন যাব তা কিছু বলে গেল না। আমি একটা রিক্সা নিয়ে বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিলাম। তার পরের দিন হঠাৎ আমার শরীর অসুস্খ হয়ে পড়ে। জ্বর, বমি, মাথা ব্যথায় এক সপ্তাহ কলেজে যাওয়া হয়নি। রমেলা কলেজে এসেছিল কিনা তাও জানি না।
নয় দিনের মাথায় আমি সুস্খ হয়ে উঠি। দশ দিনের দিন কলেজে গিয়ে আর ভেতরে ঢুকতে পারলাম না, গেইটের কাছে গিয়ে দেখি নোটিশ বোর্ডে লেখা উন্নয়নমূলক কাজের কারণে এক সপ্তাহ কলেজ বন্ধ। আর তখনই সিদ্ধাìত্ম নিলাম এই সুযোগেই রমেলাদের বাসায় যাব। অনেক দিন হয় রমেলাকে দেখি না, জানি না, রমেলার মা-বাবা রমেলা কেমন আছে।
কলেজ থেকেই রিক্সা নিলাম টিক্কাপাড়া বþিত্মতে যাবো বলে। রিক্সা টিক্কাপাড়া বþিত্মর সামনে এলে, চালককে বিদায় করে একটা চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞাস করলাম। চা দোকানদার ইশারায় গণি মিয়ার ঘরটি দেখিয়ে দিলেন। আমি রমেলাদের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম ঘরের ভেতর রমেলা এক মহিলার কাছে দর্জির কাজ ট্রেনিং নিচ্ছে।
আমি কাশি দিয়ে বললাম, আসতে পারি? রমেলা আমাকে দেখে চমকে গেলো। বললো, গরীবের গরে হাতির পাড়া। আসেন মোহন ভাই, ভেতরে আসেন। আমি ভেতরে গিয়ে পিড়িতে বসলাম। রমেলা কাজ ফেলে ব্যþত্ম হয়ে গেলো আমাকে কি খাওয়াবে তা নিয়ে। আমি বললাম, রমেলা কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। কিছু আনলে আমি উঠে যাব! রমেলা আমার মুখের উপর বলে উঠলো, কিছু না খেলে ধরে নিবো আমাদের ঘৃণা করেন। তার কথা শুনে কষ্ট পেলাম কিন্তু না খেয়ে আর পারলাম না। দোকান থেকে মুড়ি চানাচুর আনা হলো। তেল, মরিচ দিয়ে বানিয়ে আমার সামনে দিলো। মুড়ি খেতে খেতে দু’জনে অনেক বিষয়ে আলাপ আলোচনা করলাম। রমেলা অবশেষে সব চিìত্মা ভুলে আমার পরামর্শ মোতাবেক দর্জির কাজে হাত দিল। আর এই কাজে আমি যতোটা খুশি না হয়েছি, তার চেয়ে রমেলার বাবা-মা আরো বেশি খুশি হয়েছেন। আর অপে‹া না করে রমেলাকে বললাম, কাল আমাদের বাসায় যাবে। তোমার সাথে আমার কিছু গোপনীয় কথা আছে। কি যাবে না? রমেলা রাজি হলো। আমি হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে রিক্সা নিয়ে চলে এলাম।
আমাকে যতক্ষণ তাদের বাসা থেকে দেখা যায়, ততো‹ণ তাকিয়ে রইলো। আমি সোজা বাসায় এসে পড়লাম। বাসায় এসে মনে হলো একটা ভুল করেছি। সেটা হলো রমেলার বাবা-মা কেমন আছেন, কোথায় গেছেন- তা জিজ্ঞাসা করতে একটুও স্মরণ ছিলো না। ভাবলাম এক সময় রমেলার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবো। এখন একটু বিশ্রাম নিই। চোখ বুজতে না বুজতেই মা আমার রুমে এসে বললেন, কোথায় গিয়েছিলে বাবা মোহন? মাকে বললাম, আমার এক ক্লাসমেটের বাসায়, আগামীকাল তাকে আসতে বলেছি। কাল এলে তুমি দেখতে পারবা, এখন যাও আমি একটু ঘুমাব। মা বের হয়ে গেল, আমি শুয়ে পরলাম।
পরের দিন আমার কথা মতো ঠিক সময়ে রমেলা এসে উপস্খিত হলো। ঘরের ভেতর বসিয়ে মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। মা রমেলার পরিচয় জেনে খুব খুশি হলেন। মাকে বললাম, তুমি আমাদের জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্খা করো। আমরা বসে গল্প করি।
মা চলে গেলে রমেলা বললো, মোহন আজ গল্প করার সময় নেই। অন্য একদিন গল্প করা যাবে। কাজের কথা বলো, আমাকে কেনো আসতে বলেছো? তোমার কি গোপন কথা আছে?
রমেলাকে বললাম, তুমিতো জানো আমার বাবা তৃতীয় শ্রেণীর একজন সামান্য কর্মচারী। কোনো মতে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে আছি।  তোমার সাথে গোপন কথা তেমন কিছুই নয়। আমি মায়ের সাথে তোমার ব্যাপারে কথা বলেছি, তুমি যদি খুশি মুখে গ্রহণ করো আমি তোমাকে একটা জিনিস দিব যা তুমি না নিলে আমিসহ আমার ঘরের সবাই মনে কষ্ট পাবেন। রমেলাকে কি জিনিস দিব তা রমেলাকে খুলে বললাম, তুমি যখন দর্জির কাজ ট্রেনিং নিচ্ছো তাই তোমাকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দিতে চাচ্ছি। এ ব্যাপারে আমার মা-বাবা সবাই রাজি হয়েছেন।
কথা শেষ না হতেই মা চলে এলো, রমেলা নাþত্মা খেয়ে চলে গেলো, যাবার সময় বলে গেল এ ব্যাপারে তোমাকে আমি পরে জানাবো। এ কথার উপরে রমেলাকে রিক্সায় তুলে দিলাম। রমেলা হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানালো। আমি রমেলাকে বললাম অবশ্যই আবার আসবে।
এরপর প্রায় একমাস রমেলার সাথে আমার দেখা নেই। মনে করলাম হয়তো রমেলা আমার উপর রাগ করেছে, নয়তো কোনো সমস্যায় আছে। হঠাৎ রমেলার সাথে আবার সেই আড়ংয়ের সামনে দেখা হয়। রমেলাই আমাকে ডাক দেয়।  ডাক দিয়ে বলে, মোহন ভাই কেমন আছেন? ভালো। আমিও রমেলাকে প্রশ্ন করলাম রমেলাও বললো, ভালো আছি। সাথে সাথে রমেলার কাছ থেকে জানতে পারলাম তার শুভ সংবাদ, সে দর্জির পুরো কাজ শিখে ফেলেছে এখন মেশিন হলেই কলেজে পড়াশুনার পাশাপাশি বাসায় বসে আয়ও করতে পারবে। তার কথা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। আরো বেশি খুশি হয়েছি এই কারণে যে রমেলার বাবা-মা আমার কাছ থেকে সেলাই মেশিন নেবার অনুমতি দিয়েছেন।
তাকে বললাম, তুমি কালই আমার বাসায় এসে মেশিন নিয়ে যাবে। সে আমার কথা মতো পরের দিন আমাদের বাসায় এসে সেলাই মেশিন নিয়ে গেল। এখন হয়তো রমেলাদের সংসারে তার সহযোগিতায় কিছুটা হলেও অভাব দূর হবে। দিনে দিনে হয়তো কাটিয়ে উঠতে পারবে দরিদ্রতা। যে দরিদ্রতা আর অভাব রিক্সাচালক গণি মিয়াকে অনেক দিন কুড়ে কুড়ে খেয়েছে।

Advertisements
কেউ হারে, কেউ হারে না তে মন্তব্য বন্ধ
%d bloggers like this: