যাপিত যামিনী

যাপিত যামিনী
 

ধীরে ধীরে জীবন শেষ বেলার চৌকাঠে। পশ্চিমের কোলে সূর্য ঢলে পড়েছে বিষণíতায়। রেখে গেছে মিষ্টি আলোর আভা। দিন বিদায়ের কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে আমার হৃদয়ের আকাশে। বহুদিন এ ধরনের দৃশ্য থেকে বঞ্চিত। আসলে যান্ত্রিকতা, আধুনিকতা এবং বিজ্ঞানের অপরিহার্য চাপে সব ভুলতে বসেছি। ডালে ডালে ঘরে ফেরা পাখির কিচিরমিচির শব্দ দৃশ্যগুলো মন কেড়ে নিতে একটুও দ্বিধা করে না বরং অসীম সাহস হঠাৎ করেই মনের মন্দিরে ঢুকে পড়ে। কষ্ট আর অভিমানে ফেটে যাওয়া আমাকেই দেখলে কিন্তু ভালোবাসার উত্তপ্ততা অনুধাবন করলে না। হঠাৎ কিছু না বলে কেন চলে গেলে বসন্তের ভূমি থেকে, এও কি সম্ভব। একি বাস্তবের বৈভব নাকি এটাই জীবন? অথচ অযথা ভালোবাসার ভেলায় চড়িয়ে প্রেমের উত্তাল সমুদ্র পার করার কথা বলেছিলে। কোথায় গেল সেই প্রতিশ্রুতির কথা? মহানুভবতার কোষে এখন বিষ পিঁপড়ার বসবাস। বুকে না, না, বুকে নয় ঐ বাইপাস করা হার্টেও করোনারীতে হাত রেখে সত্যি করে বলো, কতটুকু অস্তিত্ব আছে তোমার নিজের হাতে জ্বেলে দেয়া নিভু নিভু ভালবাসার প্রদীপটায়, আর তাইতো সমাজের তো দূরের কথা, সমুদ্রের ভয়াল তরঙ্গ একেবারে পুরোপুরি নি:শব্দ হয়ে গেল। থেমে গেল রঙ চঙা জীবনের ঢং ঢং ঘন্টা।
চারপাশ নি:শ্চুপ হলেও জীবন থেমে থাকে না। বহতা নতীর মতো বয়ে যায়। এক পর্বের সমাপ্তি দ্বিতীয় পর্বের অর্থাৎ দীর্ঘ দু:খের সুগম রাস্তা তৈরি হয়ে যায় আপণে আপনা। এর জন্য কে দায়ী আমি না প্রবাল। প্রায় অনেক বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখার চেষ্টা সবই যখন বৃথা তখনই দেশে ফেরা মনস্খির হয়ে গেল। সত্যকে উপেক্ষা করার সৎসাহস কারোরই নেই। প্রবঞ্চনার যন্ত্রণায় নীল হতে হতে সাত সমুদ্র তের নদী এবং কিছু অহেতুক স্মৃতিকে পিছনে ফেলে রেখে অবশেষে স্বদেশেই প্রত্যাবর্তন। অহেতুক বটে। যে স্মৃতি বাঁচার আশ্বাস দিয়েছিল। সুখের ফোয়ারা বয়েছিল আজ তা নিস্তব্ধ। ব-দ্বীপের প্রতি ভালবাসার টান সত্যি আঁচ করা গেল। অথচ ভালভাবে বাঁচার ইচ্ছা নিয়েই দেশান্তরিত হয়েছিলাম। জন্মেছিল স্বপ্নের জানালায় সুবর্ণ উচ্চাশার অর্কিড। অথচ জঞ্জাল আবর্জনায় ভরা সময়ের পঙ্কিল স্রোত সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। স্রোতকে প্রতিরোধ করার অক্ষমতা বেড়েই চললো ক্রমেই। ডুবে যাচ্ছিলাম ভালোবাসাহীন পঙ্কিল কাদায়। ভাঙনের তীরে বসে শুধু অসহায়ের মতো সমুদ্রের ঢেউ গোনাই একমাত্র কাজ। তবে মনের গভীরে ছোট ছোট স্বপ্নের স্রোত ধারার অভাব ছিল না।
আশা ও আশ্বাসের পথ আঁকড়ে ধরেই তোমার তিক্ততা মিশানো ভূমিহীন দলিলে কোন একদিন নির্বিকার চিত্তে সই করেছিলাম বসত বাড়ির প্রয়োজনে। বুঝতে ভুল করেছিলাম, তুমিতো ছিলে গোত্রহীন উদাসী নক্ষত্র। বিলাসী অন্ধকার কুড়ে কুড়ে খেয়েছে স্বাধীনতা। মননে কেবলি ধ্যান, নির্বোধ প্রতিবিম্বর ছায়া, বোঝাপড়া ক্রমশ: পলাতক অবিশ্বাসের আবর্ত, রক্তের অক্ষর, আবেগ অনুভূতির সব কিছুই যেন বিলুপ্তি বাসনাতে ব্যস্ত বাঁধভাঙ্গা বন্যার পানির মতো উপচেপড়া বীভৎস ক্রাইসিস হঠাৎ ঢুকে পড়ল দু:শ্চিন্তার শরীরে। ভাবনার প্রহর শুধু প্রলম্বিত হয়, কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যের প্রকাশ মিলে না। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে ভাল লাগে না। ক্লান্তির ক্রান্তি লগ্ন। ব্লাড প্রেসারের বাড়াবাড়ি। স্বপ্নের চোখে ঘুম ধরেছে তবুও স্বপ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। দীর্ঘ নি:শ্বাসে জানালার কাঁচে কষ্টের কিছু শিশির জমেছে শাসিত চাঁদের ম্লান আলোয় যদিও গোচরের বাইরে। তবে আমার চোখ নড়ায়নি। থেকে থেকে কাঁদি। উত্তেজিত হয় নির্ঘুম রাত, রাত যায় গভীরে কিন্তু ঘুম নামের শব্দটা এখন মরিচীকা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার আকাশের বুক থেকে খসে পড়ল যেন একটা উল্কা।
কোথায় পড়লো কোনদিন হয়ত তলিয়ে দেখা হবে না। হয়তবা আমরই মতন এক ধরনের পতন তার হয়েছে এটা নিশ্চিত। কত তারা ঝরে পৃথিবী কি তা মনে রাখে। এভাবেই কেটে যায় বছরের পর আমার বিনিদ্র রজনী। কঠিন বাস্তবের দেয়াল চারপাশে, ইচ্ছা করলে জীবনের রঙ ছবি টাঙ্গানো যায় না। সারাক্ষণই কসাই এর আনাগোনা আমায় বুলিয়ে রাখে। মাংসপিণ্ড ছাড়িয়ে নেয়, পড়ে থাকে স্বপ্নের কিছু কংকাল। তবুও সবুজ কাঠের শব্দের ভিতরে বেজে ওঠে সেই সুর। অশান্তির কালো ছায়া এসে ঢেকে দিয়ে যায় সুদূর ভবিষ্যতের পথ।
আমি কিন্তু প্রচণ্ড জেদী। অনড় সিদ্ধান্তে অটল। মনে মনে সংকল্প আঁটলাম সম্পর্কের সিঁড়ি বেয়েই, ভালোবাসার মহাপ্লাবনের সূত্র ধরেই। প্রয়োজনে দু:খের ডিঙ্গিতে সেই তোমায় আমার স্বপ্নের মহলে পৌঁছাবোই। নিজের অস্তিত্ব অটুট রাখার জন্য অনেক লড়াই করেছি। আগের চেয়ে প্রয়োজনের ব্যাপকতা বর্তমানে একটু বেশি। অনেক ঝড়-তুফান বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে স্বার্থের কথা ভেবেই সর্বাঙ্গীনভাবে নিজেকে তুলে ধরবো আশ্রয় নামক বিচিত্র বিলাস ভবনে। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই নিজেকে একটু লোভী তৈরি করি। কারণ নানাবিধ। তবে এ পৃথিবীতে শিশু না কাঁদলে মাও দুধ দেয় না। কেড়ে নেয়ার প্রবণতা ইদানীংকালের। সরলতা, সুখের মিষ্টি ইনোসেন্ট ভাব এগুলোই কাল। নিজেকে নতুন ছাঁচে ফেলে নতুন ঢঙ্গে রাঙাবো। দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা কিছুটা আড়াল।
কেটে যায় অপ্রত্যাশিত দিনরাত লজ্জাহীন নারীর মতো। আবেগকে বন্দী করলাম কর্মের চত্বরে। অফিস আর বাসা, ব্যাস। প্রায় এক বছর হয়ে গেল সেই কবে টেলিফোন করে খোঁজ নিয়েছিলে আমি কেমন আছি। ঘেন্যায় সেদিন কথা বলিনি। তবে কেন ফোন করেছিলে? জানার সাধ জাগে এখনো? মানুষের চরিত্র স্খলনের বহুবিধ উদাহরণ চোখে জ্বল জ্বল করে। ভাবনার শিরা উপশিরা অকেজো মেশিন এখন দম বন্ধ হয়ে যাবার পালা। বোধকে হত্যা করার দীর্ঘ প্রয়াস চালিয়েছি। আতল দংশনে কারাগারে বন্দী থেকেছি। তবুও সংকল্প এখনো একাকী প্রতীক্ষায় অনড়। অথচ তুমি স্বর্গভ্রষ্ট দুরারোগ্য বুদ্ধির কবলে। হাওয়ায় হাওয়ায় অনেক খবর ভাসে। ভাসে ভবিষ্যতের ডিঙ্গি। হৃদয়ের চর্ব চোষ্য লুণ্ঠিত। সামাজিক অবস্খান খুব দুর্বল। অপমানের আঁচড়ে মাংসপিণ্ড খসে পড়ছে একেক করে। তবুও তুমি সর্বস্ত ভেবেই আজন্ম উপোসী। খুঁজে নেব তোমায় যুগান্তরের ঘূর্ণি চক্রে। অকস্মাৎ সাগরের গহীনে চিরদিনের চির হাহাকারের তৃপ্ত পূর্ণতায়। অতিচেনা পদশব্দে খুলে দেব স্বপ্নের দরজা জানালা। নীরবে নিত্য অকুণ্ঠ আবেগে সুনিশ্চিত ভালবাসার দাবিতে।
ভাবনার চক্করে ভেসে কখন যে কাকডাকা ভোর হয়ে এলো তা বোঝার আগেই দরজার ওপাশ থেকে কে যেন ডাকছে, কিরে অফিসে যাবি না, বেলা হয়ে গেলো যে? নাস্তা-টাস্তা খাবি না? যাই মা বলে বাথরুমের নিত্যকর্ম শেষ করে সকালের নামাজ শেষ করে, জলদি করে তৈরি হয়ে নিলাম। পিকক ব্লু শাড়ী তার সাথে একটা সাদামাটা হাতখোঁপা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। নাস্তা না খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। মা কিন্তু পিছন পিছন ডাকছে। কিরে সুক্তি না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস। শরীর খারাপ করবে যে, দুটো মুখে দিয়ে যা প্লিজ। সোনা মা আমার, এই অরেকটা বাধা। মা পৃথিবীর মায়া ছাড়তে দেয় না কিছুতেই। মায়ের কথায় কর্নপাত না করেই বেরিয়ে পড়লাম। বললাম, মা আমার একটা জরুরি কাজ আছে। আজ তাড়াতাড়ি যেতেই হবে।
বেরুতেই একটা রিকশা পেয়ে গেলাম। কিছু না বলেই চট করে উঠে পড়লাম। বাইরে সকালের মিষ্টি হাওয়া চমৎকার দেখাচ্ছে। শীতের সকাল, ফুরফুরে বাতাসে শাড়ীর আঁচল উড়ছে। তার সাথে দোল খায় আমার খণ্ড বিখণ্ড স্বপ্নের ডাল পালা। তন্ময়, স্খির দৃষ্টি। হঠাৎ সম্বিত ফিরে এলো একটা চিৎকার শুনে। একটি ছেলের কণ্ঠ, ম্যাডাম! ম্যাডাম!
আপনার শাড়ীর আঁচল। আঁচলটা টেনে জড়সড় হয়ে বসলাম।
আমার অস্তিত্বে তোমার বিলীন ঘটিয়ে চোখের আড়াল হয়তো হয়েছো, মনের আড়ালতো হওনি। অবশ্য কথায় বলে ঙঁ: ড়ভ ংরময:, ড়ঁ: ড়ভ সরহফ সত্যি কি তাই! পেরেছো কী আমার একেকটা স্পর্শের মৃত্যু ঘটাতে? পারবে কি লেপ্টে থাকা তোমার শরীরে আমার নি:শ্বাসের মৃদু মাদলের রিনি-ঝিনি বন্ধ করতে? উপস্খিতির মূল্য এতটাই অপারজেয়, কীসের তৈরি তুমি?
না পাওয়ার হাহাকারে যে শূন্যতার সৃষ্টি, হৃদয়ের সরোবরে কতটুকু ঠেলে নিয়ে যাবে তা কে জানে।
আর পারছি না মাগো।
পৃথিবীতে পরম প্রাপ্তি বলে কিছু নেই। সে জন্যে জীবন মানে এক ধরনের দু:খ বিলাসিতা। জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিজ কর্মের দক্ষতা অদক্ষতা সবকিছুই নিজের পিঠে বহন করতে হয়।
চিন্তা করে কি আর লাভ। বুদ্ধিমত্তা নিয়েই চলতে হবে আসন্ন দিনগুলোর জন্যে। অফিসের কাছে রিকশা ভাড়া চুকিয়ে ভিতরে ঢুকেই অবাক। গেইটলক। শুধু সিকিউরিটি গার্ড বসে আছে। আমাকে দেখেই দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার ম্যাডাম, আজ এতো সকাল সকাল?
কেন? ঠিক সময়ে এসেছি।
না ম্যাডাম, এখনতো সকাল ৮.৩০ মিনিট।
কি বলছিস?
হাতের দিকে তাকাতেই দেখি ঘড়িও পরিনি। আসলে গত রাতের পর কি করে মাথা ঠাণ্ডা থাকে? আবার প্রশ্নের ধাক্কা। সিকিউরিটি গার্ড বললো, ম্যাডাম, আপনার কি শরীর খারাপ? প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলাম, টেবিল কি পরিষ্কার করা হয়েছে?
জী ম্যাডাম।
রুমে ঢুকেই জানালার পর্দা সরিয়ে দিলাম। বাইরে কী ঝলোমলো আলো। অথচ শহরের প্রাসাদ সভ্যতার অত্যাচারে সকালের মোলায়েম রোদ রুমে ঢোকার সাহসটুকুও হারিয়েছে। তবুও সব ভেদ করে একটা সুন্দর প্রজাপতি উড়ে এসে বসলো আমার চেয়ারে। মনে হল কোন বার্তা নিয়ে এসেছে। বিশ্বাস করি না। অবশ্য মুরুব্বিরা এটা বলে থাকেন।
এমন সুন্দর সকাল দেখার ভাগ্য হবে কি না আর জানি না। তবুও শীত আসবে আবার। জোয়ারের নদীতে বান আসবেই। ফলে ফুলে ভরে উঠবে হয়তো কোন অনাবাদী জমি। এ আর এমন নতুন কি?
জীবন তার নিয়মের স্রোতেই চলবে।

Advertisements
যাপিত যামিনী তে মন্তব্য বন্ধ
%d bloggers like this: