ইসলামী আইনবিজ্ঞান

ইসলামী আইনবিজ্ঞান

ভোজনরসিক মাত্রেই যেমন পৃথিবী বিখ্যাত রন্ধন প্রণালী বলতে চীনা, ফরাসি ও তুর্কি পদ্ধতিকে বোঝেন; আইনবিশারদ মাত্রেই তেমনি বিশ্বমাত্রিক স্বীকৃত আইন পদ্ধতি বলতে রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সন ও ইসলামী আইনবিজ্ঞানকে বোঝেন, যাদের তীর্থভূমি হচ্ছে যথাক্রমে বোলোনিয়া, অক্সফোর্ড হার্ভার্ড ও কায়রো। এই কায়রোই হচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামী আইনবিদ ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস আল শাফি-ঈ (৭৬৭-৮২০) এর সমাধিস্থান। ইসলামী আইনবিজ্ঞানের ওপর তার গবেষণাকর্ম রিসালাহ্‌ এবং তাবারি (৮৩৯-৯২৩)-এর তাফসির মৌলিকত্বের বিচারে জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে জাস্টিনিয়ান-এর ‘কপার্স জুরিস সিভিলিস্‌’ এর সমতুল্য। এই তিনটি বিখ্যাত আইন পদ্ধতির মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়; এর তিনটিই গঠনরীতি হিসেবে রাষ্ট্রপ্রণীত আইন নয়, বরং মূল আইনবিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামী ও রোমান আইন যেমন বিদ্যা প্রতিষ্ঠার কর্তৃক রূপায়িত তাত্ত্বিক আইনের কাছে ঋণী, ইউরোপীয় সাধারণ আইন তেমনি বিচারক প্রণীত আইনের কাছে ঋণী।

কিন্তু তথাপি ইসলামী আইনবিজ্ঞান তার মৌলিক স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল; চার্চ কর্তৃক জারিকৃত আইনগুলোর সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এই তিনের মধ্যে ইসলামী আইনই একমাত্র ইলাহি প্রত্যাদেশগত বিধান। এ কারণে এটিকে পরিষ্কারভাবে নির্দেশিত মুক্তির পথ (শরিয়াহ্‌) বলা হয়; যা অবশ্য পালনীয়। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে ফিকহ্‌ বা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের সম্যক উপলব্ধি/অন্তদৃêষ্টি বা প্রজ্ঞা বলা হয়।

যদিও এখন পর্যন্ত এই সাধারণ সংজ্ঞার কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি, তবুও বিংশ শতকের প্রথম ভাগ থেকে শারিয়াহ্‌ ও ফিকাহ-এর মধ্যে সংজ্ঞাগত পার্থক্য নির্ণয়ের একটি প্রচেষ্টা চলে আসছে, কারণ উৎসের বিচারে এর একটি হচ্ছে মৌলিক ঐশী আইন (শারিয়াহ্‌) ; এবং অপরটি (যদিও এরই ভিত্তিতে প্রণীত) আইনবিশারদগণের প্রদত্ত আইন (ফিকহ্‌), তবুও চূড়ান্ত বিচারে মানব নির্ণীত তো বটে।

শুধু উৎসের বিচারেই নয়, প্রয়োগযোগ্য আওতার বিচারেও ইসলামী আইন পাশ্চাত্য আইন থেকে পৃথক। ইসলামে মানব জীবনের কোনো ক্ষেত্রই আইনের আওতামুক্ত নয়। ইসলামী আইন এমন একটি জীবন বিধানের প্রতিনিধিত্ব করে যা মূসায়ী আইনের মতো মানব জীবনের যাবতীয় ক্ষেত্রকে ইলাহি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে, যেখানে খুঁটিনাটি কার্যপদ্ধতি এবং সাধারণ আচরণবিধিগুলোও প্রণালীবদ্ধ কানুনধর্মী। এ কারণে মুসলিম ধর্মবিজ্ঞান এবং আইনবিজ্ঞানের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয় না। ধর্মবিজ্ঞান ও আইনবিজ্ঞানের মধ্যে এই সমন্বয়ের কারণে যুগপৎ একটি বিশ্বাস ও সভ্যতা হিসেবে; ধর্ম ও সংস্কৃতি হিসেবে ইসলামকে পুরোপুরি বুঝতে গেলে এর আইনবিজ্ঞানকে বাদ দেয়া চলে না।

আল ফিকাহ্‌-এর সামগ্রিকতাটি ইসলামী আইনের সাধারণ সরলতার মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে, যেখানে আইনের প্রাথমিক পাঠগুলো নিতান্তই প্রার্থনার নিয়মনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা করে মাত্র।

পাশ্চাত্য আইনব্যবস্থার মতো ইসলামী আইনবিজ্ঞানঃ

? আইন ও নৈতিকতা, ? রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত আইন, ? পদ্ধতিগত ও বিষয়গত, ? ফৌজদারি ও সামাজিক অপরাধ, ? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নির্ণয় করে না।

প্রাথমিক দৃষ্টিতে ইসলামী আইনের এমন সরল, ঢালাও বর্ণনাকে একজন অগভীর দ্রষ্টার কাছে বিশ্লেষণের ঘাটতিজনিত জগাখিচুড়ি বলে মনে হতে পারে। কুরআনের মধ্যে রয়েছে মাত্র সামান্য কয়টি পরিষ্কার আদর্শগত বিধান। আর রয়েছে কিছু উপদেশ, যার দ্বারা ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত এবং মন্দ কাজ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; কিন্তু এই সব মন্দ কাজের জন্য কোনো জাগতিক শাস্তির বিধান রাখা হয়নি (যেমন সমকামিতা)। আদর্শগত বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে শূকরমাংস ভক্ষণ ও জুয়াখেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা। আবার এর মধ্যে কয়েকটি বিধিনিষেধ রয়েছে অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক প্রকৃতির; যেমন সুদ (রিবা)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা, যার ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য সুদবৃত্তি (টঢ়ৎড়ী)-এর একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা পৌঁছানো প্রয়োজন।

যেকোনো মৌখিক বাক্য সর্বদাই ভিন্নরূপ ব্যাখ্যাযোগ্য, এবং এ কারণেই সম্যক উপলব্ধির জন্য বক্তার নিজস্ব ব্যাখ্যাই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োজনীয় প্রতিপাদ্য বিষয়। তবুও কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে রাসূল সাঃকেই মনুষ্যজগতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাদাতা বলে বিশ্বাস করা হয়। কারণ, প্রাথমিকভাবে তার প্রতিই এই গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হয়, অর্থাৎ তিনিই এর সাক্ষাৎ গ্রহীতা। মানুষ তাঁর মুখ থেকেই এই বাণী প্রথম শুনেছে, যদিও তিনি এগুলোর প্রকৃত বক্তা নন। এটাই হলো সুন্নাহ; স্বয়ং নবী করিম সাঃ কুরআনের বাণীকে যেভাবে উপলব্ধি ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেছিলেন তার লিখিত বিবরণ, যা সাধারণভাবে হাদিস শাস্ত্র হিসেবে পরিচিত, যা হচ্ছে ইসলামী আইনের দ্বিতীয় উৎস। যদিও এমন তথ্য, যা সরাসরি রাসূল সাঃ-এর মুখনিসৃত না হলেও তার সাহাবিদের কাছ থেকে শ্রুত মাত্র, সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত হবে কি না তা নিয়ে এখনো বিতর্ক বর্তমান।

অবশ্য ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎসটিও প্রকৃতপক্ষে প্রথম উৎস তথা কুরআনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে রাসূল সাঃ-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তিনি যা কিছু বলেছেন, করেছেন অথবা এমন কিছু কাজ যা তাঁর সামনে করা হয়েছে অথচ তিনি নিষেধ করেননি, তার সবই নৈতিকতা ও আদর্শে তথা নির্দ্বিধায় অনুকরণীয় আচরণের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। (এ কারণেই ইসলামি জীবন ব্যবস্থার সম্যক উপলব্ধির জন্য একমাত্র কুরআনের অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়)। সময়ের গতিতে পরবর্তী যুগের মুসলমান আইনবিশারদগণকে অবশ্য এমন সব প্রশ্নের উত্তর হাজির করতে হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস উভয়েই নিশ্চুপ। সুতরাং তাদেরকে কুরআন ও হাদিসের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তিকে যুক্তিসিদ্ধ অনুসিদ্ধান্ত টানতে হয়েছে (ইজতিহাদ)। যুক্তিসিদ্ধ অনুসিদ্ধান্ত দ্বারা নতুন সমাধান প্রদান করাই যে শুধু অনুমতিসিদ্ধ তাই নয়, বরং এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন আইন সম্প্রসারণও সমানভাবে অনুমতিসিদ্ধ, যদিও তা নিতান্তই দুর্লভ। কুরআনের এতদসংক্রান্ত ঘোষণা হচ্ছেঃ

‘তোমরাই (এই দুনিয়ার) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে… (সর্বোপরি) নিজেরাও তোমরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে। … [সূরা আলে ইমরান ৩ঃ ১০]

এই আয়াতটি অবশ্য এই মর্মে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত অঙ্গীকার বলে ধরে নেয়া হয়েছিল, সামগ্রিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায় কখনো একযোগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না।

সুতরাং এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, শুরু থেকেই ইসলামী আইন জনস্বার্থকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথেষ্ট নমনীয় ছিল, কিন্তু ঠিক একই কারণে এর মধ্যে কিছু ইসলাম-পূর্ব রীতিনীতি ও সংস্কারের পুনঃআত্মীকরণের সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত রয়ে গিয়েছিল। যদিও ইসলামী আইন আজ পর্যন্ত ইউরোপীয় ধারার ‘প্রাকৃতিক আইন’ (ষথয়ৎড়থল লথা), ‘আচারসিদ্ধ’ (ধৎঢ়য়সশথড়ী লথা) এবং নৈতিক বিধানগুচ্ছ (লথা সফ পক্ষৎময়ী) এর ধারণাসমূহকে গ্রহণ করেনি।

কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এটাই, ইসলামী আইনবিজ্ঞান পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত বিধানকে আইনের একটি সিদ্ধ উৎস বলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এ প্রসঙ্গে দর্শনটি হচ্ছে এই, আইনকে উদ্ভাবন বা জারি করা যায় না, বরং ঐশী প্রত্যাদেশ সিদ্ধ ভাণ্ডার থেকে আহরণ করতে হয়, ওপরে বর্ণিত চারটি বা এর যেকোনো একটির মধ্যে (কুরআন, সুন্নাহ, তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য) যার প্রাচুর্যের অভাব নেই।

ক্ষমতায় ও দায়িত্বে প্রাথমিক যুগের ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা এক অনন্য ভূমিকা পালন করতেন, যা পাশ্চাত্য আইনবিশারদরা কল্পনাই করতে পারেন না। ক্ষমতার বিচারে বর্তমান বিশ্বের মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাই সম্ভবত তাদের সমতুল্য হতে পারেন, আর তাদের দায়িত্বের বোঝাটি এমনই গুরুভার ছিল, একটি মীমাংসা বা সিদ্ধান্তের কারণে তাদের প্রায়ই রাজরোষের শিকার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হতো। এই অবস্থাটি এখনো বর্তমান, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আজকের দিনেও পালক মাতৃত্বের আইনগত অবস্থান বা ইত্যাকার সমসাময়িক বিষয়ে ‘শাইখুল আজহার’; কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত (ফাতাওয়া) নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া হয়।

অথচ তাত্ত্বিক বাস্তবতার বিপরীতে পাশ্চাত্য বিশ্বের অনুকরণে অটোমান সম্রাটেরা যখন তাদের ১৮৭৭ খিষ্টাব্দের গপধপললপ সিভিল কোড-এর দ্বারা মুসলিম আইনকে কাঠামোবদ্ধ করার প্রয়াস পান তখন থেকেই একমাত্র সৌদি আরব ছাড়া বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশের বিধান ব্যবস্থা এই উদ্দেশ্য সাধনে গলদঘর্ম হলেও সারা বিশ্বের স্বীকৃত মুসলিম আইনবিশারদগণ ঘোষণা করে চলেছেন, যে আইন কুরআনের পরিপন্থী তা স্বতঃই অস্তিত্বহীন বা বাতিল, সুতরাং প্রথম সুযোগেই সেগুলোকে বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: