এতিম মিসকিন ও দুস্থ মানুষের অধিকার

এতিম মিসকিন ও দুস্থ মানুষের অধিকার

সত্য-সুন্দরের প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সব ক্ষেত্রে ইসলাম দিয়েছে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য শ্রেষ্ঠতম রীতিনীতি। মানুষে মানুষে বিবাদ নয়! ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছে সাম্য-সম্প্রীতির সুদৃঢ় প্রাসাদ। ইসলামের বিধানে মুসলিমরা পরস্পর ভাই ভাই। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিনগণ একে অন্যের ভাই।’ (সূরা হুজরাত-১০)।

রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই ভাই (বুখারি)।

সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিজন। আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই ব্যক্তি যে তার সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করে।

ইসলাম সব মানুষের সাথে সদাচারের শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে সমাজের এতিম, দুস্থ, অসহায় ও মজলুম মানুষকে সহায়তা দানের প্রতি ইসলাম অধিক গুরুত্ব আরোপ করে।

আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে সমাজের বিত্তশালী সব মানুষকে এতিম, দুস্থ ও মজলুম মানুষের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জন্য উদ্বুদ্ধ করে বিভিন্ন ভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।

এতিমের হক আদায় না করা ও মিসকিনদের খাবার না দেয়ার প্রতি ভর্ৎসনা করে আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তুমি কি এমন লোককে দেখেছ, যে দ্বীনকে অস্বীকার করে? সে তো ওই ব্যক্তি যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। আর সে মিসকিনদের খাবার দানে মানুষকে উৎসাহিত করে না। (সূরা মাউন ১-৩)।

আল কুরআনের অপর আয়াতে এতিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য উৎসাহিত করে ইরশাদ হচ্ছে, কখনো এরূপ নয়! বরং তোমরা এতিমদের সম্মান করো না। আর মিসকিনদের খাদ্যদানে উৎসাহিত করো না। (সূরা ফাজর ১৭-১৮)।

এখানে এতিমদের সম্মান না করার অর্থ হলো তাদের হক অধিকার তথা তাদের প্রয়োজনীয় খোঁজখবর ও দেখাশোনা না করা।

যারা দুনিয়ার জীবনে এতিম, মিসকিন ও বন্দীদের সাহায্য করে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের চিরসুখের জান্নাতে এর প্রতিদান দেয়ার ওয়াদা দিয়েছেন।

এতিম-মিসকিনদের সহায়তা করা মুমিনের পরিচয়, জান্নাতি মানুষের স্বভাব। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, তারা দুনিয়ার জীবনে খাদ্যদ্রব্যের প্রতি নিজেদের প্রয়োজনীয় আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও কয়েদিদের খাবার প্রদান করে। (সূরা দাহর-৮)।

ইসলাম অসহায় ও দুস্থ মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে, প্রত্যেক মানুষকে ইসলাম শিক্ষা দেয় পরস্পরকে ভালোবাসতে। অন্তত কেউ যেন অন্যকে কোনোভাবেই কষ্ট না দেয়, কারো ক্ষতিসাধন না করে, কারো প্রতি যেন জুলুম-অত্যাচার না করে, আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে! তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের শান্তির জন্য, কল্যাণের জন্য। (সূরা আল ইমরান-১১০)।

এতিম, অসহায় ও মজলুম মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করার ফজিলত সম্পর্কে আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব দুঃখ, কষ্ট দূর করবে আল্লাহ তার কিয়ামতের দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি এতিম, অসহায় ও সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন ও সঙ্কট নিরসন করবে আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় সঙ্কট নিরসন করবেন। আর আল্লাহ তায়ালা ততক্ষণ মানুষের সাথে থাকেন যতক্ষণ মানুষ এতিম মিসকিন, অসহায় ও মজলুম মানুষের সাহায্যরত থাকে।

(বুখারি-মুসলিম)।

আর যারা এতিম মিসকিনদের সাহায্য করে না তাদের সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেন, আল্লাহর কসম সে ব্যক্তি ঈমানদার নয় যে তৃপ্তি সহকারে খায় অথচ তার গরিব মিসকিন প্রতিবেশী থাকে অভুক্ত অবস্থায় (মিশকাত)।

পৃথিবীতে ইসলামের আগমনই হলো মানব সমাজের কল্যাণের জন্য। মানবতার মুক্তির জন্য। সুন্দর, সুশৃঙ্খল, সাম্য-সম্প্রীতিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র ইসলামই দিয়েছে এর সুন্দরতম সুবিবেচিত বিধান।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় মানুষ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করলেই সবার মুক্তি ও সফলতা আসবে। ব্যক্তি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যদি ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করা যায় তাহলে সমাজে কোনো বিশৃঙ্খলা থাকবে না। ইসলামী বিধান অনুযায়ী যদি সম্পদশালীরা তাদের অর্জিত সম্পদের জাকাত দেন তাহলে দারিদ্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি পাবে কোটি কোটি দারিদ্র্য নিপীড়িত মানুষ।

ধনীরা যদি তাদের জাকাত দেন এবং মানুষ হয়ে মানুষের প্রতি যে মানবিক কর্তব্য থাকা প্রয়োজন তা যদি আমরা পালন করি তাহলে সমাজে দরিদ্র মানুষ থাকবে কিন্তু বিনা চিকিৎসায় কিংবা না খেয়ে মানুষ মরবে এমনটা সমাজে ঘটবে না।

আজ লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে রাস্তায় ঘুমায়। তাদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাদের পরিবারে হাজার হাজার সন্তান বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষাদীক্ষাসহ সামাজিক সব অধিকার থেকে। আজ বিশ্বে যদি ইসলামী বিচারব্যবস্থা চালু হয় তাহলে কেউ গ্রাস করতে পারবে না এতিমের সম্পদ। নির্মম নির্যাতন করতে পারত না অসহায় মজলুম মানুষের ওপর। কিন্তু আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে চলছে অন্যায়-অবিচার, মানুষের চোখে-মুখে হতাশা, হাহাকার কিন্তু এর কি কোনো সমাধান নেই? মুক্তি নেই! এটাই কি তাদের অবধারিত নিয়তি, অবশ্যই সে সমাধান পেতে হলে ফিরে আসতে হবে ইসলামের ছায়াতলে।

বস্তুত ইসলাম মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এবং জুলুম-অত্যাচার বন্ধের কার্যকর বিধান দিয়েছে, এর অনুকরণ আমাদের সবার ঈমানী কর্তব্য।

একমাত্র ইসলামী অনুশাসনই পারে সমাজের সব অন্যায়-অবিচার দূর করে গরিব, দুঃখী, এতিম, দুস্থ, মিসকিনদের মুখে হাসি ফোটাতে। বিশ্বকে উপহার দিতে পারে সাম্য-সম্প্রীতির এক মহামিলনের সৌহার্দøপূর্ণ সুখময় শান্তিময় সমাজ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: