ইসলামী আইনবিজ্ঞান

ইসলামী আইনবিজ্ঞান

ভোজনরসিক মাত্রেই যেমন পৃথিবী বিখ্যাত রন্ধন প্রণালী বলতে চীনা, ফরাসি ও তুর্কি পদ্ধতিকে বোঝেন; আইনবিশারদ মাত্রেই তেমনি বিশ্বমাত্রিক স্বীকৃত আইন পদ্ধতি বলতে রোমান, অ্যাংলো-স্যাক্সন ও ইসলামী আইনবিজ্ঞানকে বোঝেন, যাদের তীর্থভূমি হচ্ছে যথাক্রমে বোলোনিয়া, অক্সফোর্ড হার্ভার্ড ও কায়রো। এই কায়রোই হচ্ছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামী আইনবিদ ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস আল শাফি-ঈ (৭৬৭-৮২০) এর সমাধিস্থান। ইসলামী আইনবিজ্ঞানের ওপর তার গবেষণাকর্ম রিসালাহ্‌ এবং তাবারি (৮৩৯-৯২৩)-এর তাফসির মৌলিকত্বের বিচারে জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে জাস্টিনিয়ান-এর ‘কপার্স জুরিস সিভিলিস্‌’ এর সমতুল্য। এই তিনটি বিখ্যাত আইন পদ্ধতির মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়; এর তিনটিই গঠনরীতি হিসেবে রাষ্ট্রপ্রণীত আইন নয়, বরং মূল আইনবিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামী ও রোমান আইন যেমন বিদ্যা প্রতিষ্ঠার কর্তৃক রূপায়িত তাত্ত্বিক আইনের কাছে ঋণী, ইউরোপীয় সাধারণ আইন তেমনি বিচারক প্রণীত আইনের কাছে ঋণী।

কিন্তু তথাপি ইসলামী আইনবিজ্ঞান তার মৌলিক স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল; চার্চ কর্তৃক জারিকৃত আইনগুলোর সামান্য ব্যত্যয় ছাড়া এই তিনের মধ্যে ইসলামী আইনই একমাত্র ইলাহি প্রত্যাদেশগত বিধান। এ কারণে এটিকে পরিষ্কারভাবে নির্দেশিত মুক্তির পথ (শরিয়াহ্‌) বলা হয়; যা অবশ্য পালনীয়। ইসলামী পরিভাষায় এটাকে ফিকহ্‌ বা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের সম্যক উপলব্ধি/অন্তদৃêষ্টি বা প্রজ্ঞা বলা হয়।

যদিও এখন পর্যন্ত এই সাধারণ সংজ্ঞার কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি, তবুও বিংশ শতকের প্রথম ভাগ থেকে শারিয়াহ্‌ ও ফিকাহ-এর মধ্যে সংজ্ঞাগত পার্থক্য নির্ণয়ের একটি প্রচেষ্টা চলে আসছে, কারণ উৎসের বিচারে এর একটি হচ্ছে মৌলিক ঐশী আইন (শারিয়াহ্‌) ; এবং অপরটি (যদিও এরই ভিত্তিতে প্রণীত) আইনবিশারদগণের প্রদত্ত আইন (ফিকহ্‌), তবুও চূড়ান্ত বিচারে মানব নির্ণীত তো বটে।

শুধু উৎসের বিচারেই নয়, প্রয়োগযোগ্য আওতার বিচারেও ইসলামী আইন পাশ্চাত্য আইন থেকে পৃথক। ইসলামে মানব জীবনের কোনো ক্ষেত্রই আইনের আওতামুক্ত নয়। ইসলামী আইন এমন একটি জীবন বিধানের প্রতিনিধিত্ব করে যা মূসায়ী আইনের মতো মানব জীবনের যাবতীয় ক্ষেত্রকে ইলাহি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে, যেখানে খুঁটিনাটি কার্যপদ্ধতি এবং সাধারণ আচরণবিধিগুলোও প্রণালীবদ্ধ কানুনধর্মী। এ কারণে মুসলিম ধর্মবিজ্ঞান এবং আইনবিজ্ঞানের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয় না। ধর্মবিজ্ঞান ও আইনবিজ্ঞানের মধ্যে এই সমন্বয়ের কারণে যুগপৎ একটি বিশ্বাস ও সভ্যতা হিসেবে; ধর্ম ও সংস্কৃতি হিসেবে ইসলামকে পুরোপুরি বুঝতে গেলে এর আইনবিজ্ঞানকে বাদ দেয়া চলে না।

আল ফিকাহ্‌-এর সামগ্রিকতাটি ইসলামী আইনের সাধারণ সরলতার মধ্য দিয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে, যেখানে আইনের প্রাথমিক পাঠগুলো নিতান্তই প্রার্থনার নিয়মনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা বর্ণনা করে মাত্র।

পাশ্চাত্য আইনব্যবস্থার মতো ইসলামী আইনবিজ্ঞানঃ

? আইন ও নৈতিকতা, ? রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত আইন, ? পদ্ধতিগত ও বিষয়গত, ? ফৌজদারি ও সামাজিক অপরাধ, ? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নির্ণয় করে না।

প্রাথমিক দৃষ্টিতে ইসলামী আইনের এমন সরল, ঢালাও বর্ণনাকে একজন অগভীর দ্রষ্টার কাছে বিশ্লেষণের ঘাটতিজনিত জগাখিচুড়ি বলে মনে হতে পারে। কুরআনের মধ্যে রয়েছে মাত্র সামান্য কয়টি পরিষ্কার আদর্শগত বিধান। আর রয়েছে কিছু উপদেশ, যার দ্বারা ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত এবং মন্দ কাজ থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; কিন্তু এই সব মন্দ কাজের জন্য কোনো জাগতিক শাস্তির বিধান রাখা হয়নি (যেমন সমকামিতা)। আদর্শগত বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে শূকরমাংস ভক্ষণ ও জুয়াখেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা। আবার এর মধ্যে কয়েকটি বিধিনিষেধ রয়েছে অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক প্রকৃতির; যেমন সুদ (রিবা)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা, যার ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য সুদবৃত্তি (টঢ়ৎড়ী)-এর একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা পৌঁছানো প্রয়োজন।

যেকোনো মৌখিক বাক্য সর্বদাই ভিন্নরূপ ব্যাখ্যাযোগ্য, এবং এ কারণেই সম্যক উপলব্ধির জন্য বক্তার নিজস্ব ব্যাখ্যাই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য ও প্রয়োজনীয় প্রতিপাদ্য বিষয়। তবুও কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে রাসূল সাঃকেই মনুষ্যজগতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাদাতা বলে বিশ্বাস করা হয়। কারণ, প্রাথমিকভাবে তার প্রতিই এই গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হয়, অর্থাৎ তিনিই এর সাক্ষাৎ গ্রহীতা। মানুষ তাঁর মুখ থেকেই এই বাণী প্রথম শুনেছে, যদিও তিনি এগুলোর প্রকৃত বক্তা নন। এটাই হলো সুন্নাহ; স্বয়ং নবী করিম সাঃ কুরআনের বাণীকে যেভাবে উপলব্ধি ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেছিলেন তার লিখিত বিবরণ, যা সাধারণভাবে হাদিস শাস্ত্র হিসেবে পরিচিত, যা হচ্ছে ইসলামী আইনের দ্বিতীয় উৎস। যদিও এমন তথ্য, যা সরাসরি রাসূল সাঃ-এর মুখনিসৃত না হলেও তার সাহাবিদের কাছ থেকে শ্রুত মাত্র, সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত হবে কি না তা নিয়ে এখনো বিতর্ক বর্তমান।

অবশ্য ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎসটিও প্রকৃতপক্ষে প্রথম উৎস তথা কুরআনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে রাসূল সাঃ-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তিনি যা কিছু বলেছেন, করেছেন অথবা এমন কিছু কাজ যা তাঁর সামনে করা হয়েছে অথচ তিনি নিষেধ করেননি, তার সবই নৈতিকতা ও আদর্শে তথা নির্দ্বিধায় অনুকরণীয় আচরণের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। (এ কারণেই ইসলামি জীবন ব্যবস্থার সম্যক উপলব্ধির জন্য একমাত্র কুরআনের অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়)। সময়ের গতিতে পরবর্তী যুগের মুসলমান আইনবিশারদগণকে অবশ্য এমন সব প্রশ্নের উত্তর হাজির করতে হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস উভয়েই নিশ্চুপ। সুতরাং তাদেরকে কুরআন ও হাদিসের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তিকে যুক্তিসিদ্ধ অনুসিদ্ধান্ত টানতে হয়েছে (ইজতিহাদ)। যুক্তিসিদ্ধ অনুসিদ্ধান্ত দ্বারা নতুন সমাধান প্রদান করাই যে শুধু অনুমতিসিদ্ধ তাই নয়, বরং এই প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন আইন সম্প্রসারণও সমানভাবে অনুমতিসিদ্ধ, যদিও তা নিতান্তই দুর্লভ। কুরআনের এতদসংক্রান্ত ঘোষণা হচ্ছেঃ

‘তোমরাই (এই দুনিয়ার) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে… (সর্বোপরি) নিজেরাও তোমরা আল্লাহর ওপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে। … [সূরা আলে ইমরান ৩ঃ ১০]

এই আয়াতটি অবশ্য এই মর্মে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত অঙ্গীকার বলে ধরে নেয়া হয়েছিল, সামগ্রিকভাবে মুসলমান সম্প্রদায় কখনো একযোগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না।

সুতরাং এটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে, শুরু থেকেই ইসলামী আইন জনস্বার্থকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথেষ্ট নমনীয় ছিল, কিন্তু ঠিক একই কারণে এর মধ্যে কিছু ইসলাম-পূর্ব রীতিনীতি ও সংস্কারের পুনঃআত্মীকরণের সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত রয়ে গিয়েছিল। যদিও ইসলামী আইন আজ পর্যন্ত ইউরোপীয় ধারার ‘প্রাকৃতিক আইন’ (ষথয়ৎড়থল লথা), ‘আচারসিদ্ধ’ (ধৎঢ়য়সশথড়ী লথা) এবং নৈতিক বিধানগুচ্ছ (লথা সফ পক্ষৎময়ী) এর ধারণাসমূহকে গ্রহণ করেনি।

কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এটাই, ইসলামী আইনবিজ্ঞান পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত বিধানকে আইনের একটি সিদ্ধ উৎস বলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এ প্রসঙ্গে দর্শনটি হচ্ছে এই, আইনকে উদ্ভাবন বা জারি করা যায় না, বরং ঐশী প্রত্যাদেশ সিদ্ধ ভাণ্ডার থেকে আহরণ করতে হয়, ওপরে বর্ণিত চারটি বা এর যেকোনো একটির মধ্যে (কুরআন, সুন্নাহ, তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য) যার প্রাচুর্যের অভাব নেই।

ক্ষমতায় ও দায়িত্বে প্রাথমিক যুগের ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা এক অনন্য ভূমিকা পালন করতেন, যা পাশ্চাত্য আইনবিশারদরা কল্পনাই করতে পারেন না। ক্ষমতার বিচারে বর্তমান বিশ্বের মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাই সম্ভবত তাদের সমতুল্য হতে পারেন, আর তাদের দায়িত্বের বোঝাটি এমনই গুরুভার ছিল, একটি মীমাংসা বা সিদ্ধান্তের কারণে তাদের প্রায়ই রাজরোষের শিকার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হতো। এই অবস্থাটি এখনো বর্তমান, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আজকের দিনেও পালক মাতৃত্বের আইনগত অবস্থান বা ইত্যাকার সমসাময়িক বিষয়ে ‘শাইখুল আজহার’; কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত (ফাতাওয়া) নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া হয়।

অথচ তাত্ত্বিক বাস্তবতার বিপরীতে পাশ্চাত্য বিশ্বের অনুকরণে অটোমান সম্রাটেরা যখন তাদের ১৮৭৭ খিষ্টাব্দের গপধপললপ সিভিল কোড-এর দ্বারা মুসলিম আইনকে কাঠামোবদ্ধ করার প্রয়াস পান তখন থেকেই একমাত্র সৌদি আরব ছাড়া বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশের বিধান ব্যবস্থা এই উদ্দেশ্য সাধনে গলদঘর্ম হলেও সারা বিশ্বের স্বীকৃত মুসলিম আইনবিশারদগণ ঘোষণা করে চলেছেন, যে আইন কুরআনের পরিপন্থী তা স্বতঃই অস্তিত্বহীন বা বাতিল, সুতরাং প্রথম সুযোগেই সেগুলোকে বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

রমজানকে বিদায় জানানো

রমজানকে বিদায় জানানো

এক সময় আমরা রমজানের অপেক্ষা করেছি, এখন আমরা রমজানকে বিদায় দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এভাবেই আমাদের জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। মানুষ বলতেই কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন অতিবাহিত হয় তার জীবনের একটি অংশ ঘষে পড়ে। এ রমজানও চলে যাবে, যেমন আসতে ছিল। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি রাত-দিন, মাস-বছর অতিবাহিত করেন। এতে রয়েছে মুত্তাকিদের নসিহত, উপদেশ গ্রহণকারীর জন্য উপদেশ।

এ রমজানও অন্যান্য বছরের ন্যায় চলে যাবে। সে তার আমল নামা বন্ধ করে ফেলবে, যা কিয়ামতের দিন ছাড়া খোলা হবে না। আমাগী রমজান পাব কিনা আমরাও তা জানি না। আল্লাহ সাহায্যকারী।

রমজানের জন্য কাঁদা উচিত। একজন মুমিন রমজানের জন্য কিভাবে না কাঁদবে, অথচ এ রমজানে জান্নাতের দরজাসমূহ উম্মুক্ত করা হয়। একজন গোনাগার কি জন্য রমজানের জন্য আফসোস না করবে, অথচ রমজানে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়। কেন শয়তান রমজানের কারণে জ্বলেপুড়ে না মরবে, অথচ তাতে সে আবদ্ধ থাকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা এতে কাদোঁ। হে মুত্তাকিগণ, তোমরা এতে উপার্জন কর।

রমজানে নেককারদের অবস্থা :

রমজানে তারা আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান থাকে, তার শাস্তিকে ভয় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿ يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ [الزمر:9]

‘তারা আখেরাতকে ভয় করে এবং নিজ রবের রহমত প্রত্যাশা করে।‘ (জুমার : ৯)

তারা আল্লাহর এবাদতে নিমগ্ন থাকে, দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের অন্তরে আল্লাহর চিন্তা ভিন্ন কোন চিন্তা বিরাজ করে না। তারা প্রকৃত পক্ষে দাউদ তায়ীর বাণীর অনুকরণ করে। একদিন তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথপোকথনে বলতে ছিলেন, ‘তোমার চিন্তা আমার সমস্ত চিন্তা দূর করে দিয়েছে। তোমার চিন্তা আমার আনন্দ-বিনোদন শেষ করে দিয়েছে। তোমার সাক্ষাত ইচ্ছা আমার স্বাদ বিস্বাদ করে দিয়েছে এবং প্রবৃত্তির আড়াল হয়ে গেছে।‘ (লাতায়েফুল মাআরেফ : ৩৪৮)

এ হচ্ছে রোজাদেরর অবস্থা। তাদের স্থান মসজিদ ও লক্ষ নির্জনতা। তারা লম্বা কেরাত পড়ে, কুরআন তিলাওয়াত করে, আল্লাহর সামনে রোনাজারি করে। তারা আল্লাহ মুখি হওয়ার প্রতিজ্ঞা করে এবং রহমানের সঙ্গে মোনাজাত করে। অথচ অন্যরা তখন শয়তানের আসরে বসে থাকে, গোনাগারদের সঙ্গে আড্ডা দেয়।

তারা কি জন্য আমল করে ?

তারা কেন আমল করে? কি তাদের উদ্দেশ? কেন তাদের এতো লম্বা কেরাত? কেন তাদের এতো রাত জাগা ও পরিশ্রম করা? উত্তর : তারা লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করে। যে রাত হাজার রাতের তুলনায় উত্তম। যদি মসজিদের মুখ থাকতো, সে বলে উঠত, হে লাইলাতুল কদর, তোমায় এবাদতকারীদের দেখে নাও। হে সালাত আদায়কারী, তুমি রুকু কর, সেজদা কর। হে প্রার্থনাকারী, এ রাতে তুমি খুব প্রার্থনা কর।‘ (লাতায়েফ : ৩৪৯)

এ রমজান চলে যাবে, তবে এর রাতসমূহ এতে ক্রন্দনকারী, তওবাকারী, ইস্তেগফাকারী, তিলাওয়াতকারী ও সদকাকারীদের চেনে নেবে। তারা আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করে, তারা জানে যে, আল্লাহ ক্ষমাকারী, তাই তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।

গোনাহগাররা যদি আল্লাহর মাগফেরাত সম্পর্কে না জানতো, তবে তাদের অন্তর জ্বলে যেত, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যেত। কিন্ত তারা যখন আল্লাহর ক্ষমার কথা স্বরণ করে, তাদের অন্তর তৃপ্তিতে ভরে যায়। তাদের কেউ বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমাদের গোনাহ অনেক, কিন্তু তোমার মাগফেরাত খুব বড়। হে আল্লাহ, আমার গোনাহ ও তোমার মাগফেরাতের মধ্যে তুলনা করে দেখ।‘ (লাতায়েফ : ৩৭০)

এ হচ্ছে নেককারদের দোয়া। তারা এভাবেই রমজান অতিবাহিত করেন। তাদেরই শোভা পায় এর সমাপ্তিতে ক্রন্দন করা। কারণ, এর মর্যাদা তারা বুঝে। এতদ সত্বেও তারা ভীত থাকে, কবুল না হওয়ার ভয়ে সঙ্কীত থাকে। তারা জানে আসল বিষয় হচ্ছে কবুল হওয়া, পরিশ্রম করা নয়। অন্তরের পবিত্রতাই আসল পবিত্রতা, শরীরের পবিত্রতা নয়।

মাহরুম কত রাত জাগরণকারী, মাহরুম কত ঘুমন্ত ব্যক্তি। কত ঘুমন্ত অন্তর আল্লাহর জিকিরে মশগুল, কত জাগ্রত অন্তর আল্লাহর অপরাধে লিপ্ত। কিন্তু বান্দাদের উচিত নেককাজের জন্য চেষ্টা করা এবং তার কবুলের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা। এটাই নেককারদের অভ্যাস।

ইয়াহইয়া ইবনে কাসির বলেছেন, ‘আল্লাহর কতক নেক বান্দাদের দোয়া ছিল, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাকে রমজানের নিকট সোপর্দ কর ও রমজানকে আমার নিকট সোপর্দ কর। এবং রমজানকে আমার কাছ থেকে কবুল করে নাও।‘ (হুলইয়াতুল আউলিয়া : ৩/৬৯)

ইবনে দিনার বলেন, ‘কবুল না হওয়ার ভয়, আমল করার চেয়েও বেশি কষ্টের।‘

আব্দুল আজিজ আবুদাউদ বলেন, ‘আমি তাদের খুব আমল করতে দেখেছি, তবুও আমল শেষে তারা কবুল না হওয়ার শঙ্কায় ভীত থাকত।‘ (লাতায়েফ : ৩৭৫)

আমল কবুল হওয়ার আলামত :

রমজানের পরেও ধারাবাহিক আমল করে যাওয়া আমল কবুল হওয়ার সব চেয়ে বড় আলামত। কেউ বলেছেন, ‘নেকির সওয়াব হচ্ছে, নেকির পর নেকি করা। এক নেক আমলের পর দ্বিতীয় নেক আমল করা, প্রথম আমলটি কবুল হওয়ার আলামত। যেমন নেক আমল করার পর গোনা করা, নেক আমল কবুল না হওয়ার আলামত।‘

রমজান পেয়ে ও তাতে সিয়াম-কিয়াম করে, রমজানের পর গোনা করা, মূলত আল্লাহর নিয়ামতকে গোনাহের মোকাবেলায় দাঁড় করা। যদি কেউ রমজানেই রমজান পরিবর্তী গোনা করার ইচ্ছা করে থাকে, তবে তার রোজা তার ওপরই পতিত হবে এবং তওবা না করা পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দরজা বন্ধ থাকবে।

কত সুন্দর! গোনার পর নেকি করা, তাতে গোনা মিটে যায়, আর নেকির পর নেকি করা আরো সুন্দর! খুবই খারাপ নেকির পর গোনা করা, যার কারণে নেকি নষ্ট হয়ে যায়। তওবা করার পর একটি গোনা করা, তওবার পূর্বে সত্তুরটি গোনার চেয়েও খারাপ। তওবার করার পর তাওবা ভঙ্গ করা খুবই খারাপ। এবাদতের সম্মান লাভ করে গোনার অসম্মান মাথায় নেয়া বড়ই লজ্জাকর।

হে তওবাকারীরা, রমজানের পর তোমরা গোনাতে ফিরে যেয়ো না। তোমরা ঈমানের স্বাদের ওপর গোনার প্রবৃত্তি প্রধান্য দিয়ো না। তোমরা আল্লাহর জন্য ধৈর্য ধারণ কর। তিনি তোমাদের উত্তম জিনিস দান করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿ إِن يَعْلَمِ اللّهُ فِي قُلُوبِكُمْ خَيْراً يُؤْتِكُمْ خَيْراً مِّمَّا أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [الأنفال:70].

‘যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তরে কোন কল্যাণ আছে বলে জানেন, তাহলে তোমাদের থেকে যা নেয়া হয়েছে, তার চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।‘ (আনফাল : ৭০)

হে এবাদত গোজার বান্দারা, যে সব এবাদতের মাধ্যমে তোমরা রমজানে আল্লাহর এবাদত করেছো, সে এবাদত এখনো বিদ্যমান। রমজানের সঙ্গে সঙ্গে তা চলে যায়নি। হয়তো তোমরা তা পুরোপুরি করতে পারবে না, কিন্তু একেবারে ছেড়ে দিয়ো না। বিশর হাফিকে বলা হয়েছে, ‘কতক লোক রযেছে, যারা রমজানে খুব এবাদত ও পরিশ্রম করে। তিনি বলেন, তারা খুবই খারাপ, যারা রমজান ছাড়া আল্লাহকে চিনে না। নেককার সে ব্যক্তি যে সব সময় আল্লাহর এবাদত করে। (লাতায়েফ : ৩৯৬)

এ নীতিই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জারি করে গেছেন। তিনি বলেন,

{ أحب الأعمال إلى الله أدومها وإن قل } [رواه البخاري;43 ومسلم:782]،

‘কম হলেও, ধারাবাহিক আমল আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয়।‘ (বুখারি : ৪৩, মুসলিম : ৭৮২) আয়েশা রা. বলেন,

{ وكان أحب الدين إليه ما داوم عليه صاحبة } [رواه البخاري:43].

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ধারাবাহিক আমলই বেশি প্রিয় ছিল।‘ (বুখারি : ৪৩)

রমজানের রব, সব মাসেরই রব, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুমিনের আমলের শেষ নেই। হাসান রহ. বলেন,

‘আল্লাহ তাআলা মৃত্যু ছাড়া মুমিনদের আমলের জন্য কোন সময় নির্ধারণ করেননি।‘ আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿ وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ [الحجر:99] [اللطائف:398].

‘মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত তুমি তোমার রবের এবাদত কর।‘ (হিজর : ৯৯) লাতায়েফ : ৩৯৮)

তাদের কি লজ্জা হয় না, রমজানের সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদ, কুরআন তিলাওয়াত ত্যাগ করে দেয় এবং পুনরায় গোনাতে লিপ্ত হয়। আল্লাহ, তোমার কাছে পানাহ চাই। আমাদেরকে তাদের অন্তরভুক্ত করো না। এ উপদেশ হচ্ছে তাদের জন্য যারা রমজানে রোজা রাখে ও এবাদত করে অতিবাহিত করেছে, কিন্তু যারা রমজান পেয়েও গান-বাদ্য এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় অতিবাহিত করেছে, তাদের জন্য কি বলব?

এর চেয়ে ভাল কথা আর তাদের বলতে পারি না যে, তোমরা তোমাদের রবের নিকট তওবা কর। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿ قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ [الزمر:35].

‘বল, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (জুমার : ৫৩)

তুমি রমজান নষ্ট করেছ, তাই তোমার পুরো জীবন তুমি নষ্ট কর না। তওবা কর, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করতে পারেন। কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।

আমরা কিভাবে রমজানকে বিদায় জানাবো?

ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. তার গভর্নদের লিখে পাঠান যে, তোমরা রমজান মাস ইস্তেগফার ও সদকার মাধ্যমে খতম কর। কারণ, সদকা রোজাদারের জন্য পবিত্রতা স্বরূপ আর ইস্তেগফার রোজার জন্য পবিত্রতা স্বরূপ। আর এ জন্য কেউ বলেছেন, ‘সদকাতুল ফিতর হচ্ছে সেজদায়ে সাহুর ন্যায়।‘ আব্দুল আজিজ তার পত্রে বলেন, ‘তোমরা আবু বকরের ন্যায় বল,

﴿ رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ [الأعراف:23]

তারা বলল, হে আমাদের রব, আমরা নিজদের উপর যুলক করেছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদেরকে দয়া না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। (আরাফ : ২৩)

﴿ وَإِلاَّ تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ [هود:47]            

আর যদি আপনি আমাকে মাফ না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (হুদ : ৪৭)

﴿ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ [الشعراء:83]

আর যিনি আশা করি, বিচার বিদসে আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেবেন। (শুআরা : ৮২)

﴿ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي [القصص:16]

হে আল্লাহ, আমি আমার ওপর যুলক করেছি, তুমি আমাকে ক্ষমা কর।‘ (কাসাস : ১৬)

﴿ لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ [الأنبياء:87] ) [اللطائف:387].

আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম। (আম্বিয়া : ৮৭)

(লাতায়েফ : ৩৮৭)

ঈদের রাতের আমল :

রমজানের মাগফেরাত যেহেতু রোজা ও কিয়ামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা রমজান শেষে তার শুকরিয়া আদায় ও তাকবির বলার নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি বলেন,

﴿ وَلِتُكْمِلُواْ الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ اللّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ [البقرة:185]

‘তার জন্য তোমরা আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর। (বাকারা : ১৮৫)

এর ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ বলেন, আল্লাহর পরিপূর্ণ তাওয়া অর্জন করা। অর্থাৎ তার এবাদত করা গোনা না করা। তার স্বরণ করা তাকে না ভুলা এবং তার শুকরিয়া আদায় করা তার কুফরি না করা।‘ (তাফসিরে ইবনে আবি হাতেম : ২/৪৪৬) ঈদের দিনের সূর্যাস্ত থেকে ঈদের সালাত আদায় পর্যন্ত তাকবির বলা বিধেয়। পুরুষরা মসজিদে, বাজারে ও ঘরে জোড়ে জোড়ে তাকবির বলবে।


ঈদের দিনের সুন্নত :

সালাতে যাওয়ার আগে ঈদের দিন খেজুর খাওয়া। বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত। আনাস রা. বলেন,

{ كان رسول الله – صلى الله عليه وسلم – لا يغدو يوم الفطر حتى يأكل تمرات ويأكلهن وتراً } [أخرجه البخاري:953].  

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর না খেয়ে ঈদের সালাতের জন্য বের হতেন না, তিনি বিজোর সংখ্যায় খেজুর খেতেন।‘ (বুখারি : ৯৫৩)

নারীরাও তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে ঈগগাহে যাবে। তারা সালাতে ও জিকিরে অংশ গ্রহণ করবে।

আমাদের অনেকেই নিজ সন্তানদের পোষাক আশাকের ক্ষেত্রে উদাসীন থাকি, এটা মোটেও ঠিক নয়। বরং তাদের ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক পোশাক-আষাক পড়তে বাধ্য করা।

আবার অনেককে দেখা যায়, ঈদ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বের হয়ে যায়, গান-বাদ্যতে রাত কাটিয়ে দেয়, এটা কখনো ঠিক নয়। বরং এবাদত, ইস্তেগফার ইত্যাদির মাধ্যম ঈদ অতিবাহিত করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে তওফিক দান করুন।   

জাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

জাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

জাকাত ইসলামী জীবন বিধানের অন্যতম মৌল ভিত্তি ও অবশ্য পালনীয় ফরজ ইবাদত। অর্থসম্পদের দিক দিয়ে সামর্থøবান প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ। আর্থিক সামর্থøবান বলতে জাকাতযোগ্য সম্পদের মালিক হওয়াকে বোঝায়।

জাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে জাকাত বলতে­ ধনীদের মালে আল্লাহর নির্ধারিত অংশকে বোঝায়। বস্তুত জাকাত হচ্ছে সম্পদশালীদের সম্পদে আল্লাহর নির্ধারিত সেই ফরজ অংশ যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর রহমত লাভের আশায় নির্ধারিত খাতে দান করা। জাকাত সুন্দর সমাজ গড়ার অন্যতম হাতিয়ার। কেননা জাকাতের মাধ্যমে ফকির-মিসকিন অসহায় মানুষ কিছুটা হলেও তার অভাব পূরণ করার প্রয়াস পান। এর মাধ্যমে সমাজের সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া জাকাত ও সদকা হলো রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের মাধ্যম। আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে রাসূল) আপনি তাদের সম্পদ থেকে জাকাত গ্রহণ করুন, এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন (সূরা তাওবা-১০৩)। জাকাত প্রদানের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসূল সাঃ-এর একটি হাদিস­ হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত আছে এক বেদুঈন ব্যক্তি নবী করিম সাঃ-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যা করে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। রাসূল সাঃ বললেন, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে তার সাথে কাউকে শরিক করবে না, নামাজ আদায় করবে, রোজা রাখবে এবং ফরজ জাকাত আদায় করবে। এরপর সে বলল, ‘যার হাতে আমার প্রাণ সেই আল্লাহর কসম আমি এর থেকে কম বা বেশি কোনোটাই করব না।’ যখন সে ফিরে যাচ্ছিল তখন রাসূল সাঃ বললেন, যদি তোমরা জান্নাতি কোনো ব্যক্তিকে দেখতে চাও তাহলে তাকে দেখো (বুখারি)। মূলত জাকাত একটি সুখময় সমাজ গঠনের জন্য ইসলামের এক চিরন্তন বিধান। কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট ভাষায় জাকাতের বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারিমের ৩২ জায়গায় জাকাতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জায়গায় নামাজ ও জাকাতের কথা একসাথে বলা হয়েছে। আলকুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু পূর্বে প্রেরণ করবে আল্লাহর নিকট তা পাবে, তোমরা যা কিছু করো অবশ্যই আল্লাহ তা দেখেন (সূরা বাকারা-১১০)।

বস্তুত ইসলামে নামাজ ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ নেই। দু’টি ইবাদতই অবশ্য পালনীয় ফরজ। যার মধ্যে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদ রাঃ বলেন, ‘নামাজ ও জাকাত উভয়ই ফরজ­ এ দু’টির মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।’

জাকাত আদায়ের পুরস্কার ও জাকাত না দেয়ার জন্য কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূল সাঃ। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি আল্লাহর পুরস্কারের আশায় জাকাত দেয় তাহলে সে আল্লাহ তায়ালার কাছে উত্তম ও সম্মানজনক পুরস্কার পাবে। কিন্তু যে জাকাত আদায়ে অস্বীকার করবে তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে জাকাত আদায় করা হবে। এবং আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি তো আছেই’ (বুখারি, মুসলিম ও বায়হাকি)। আলকুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ মুসরিকদের তারা জাকাত দেয় না এবং আখেরাতেও অবিশ্বাসী (সূরা হামিম-৬-৭)।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের ভ্রাতৃত্বের সীমার মধ্যে শামিল হওয়ার জন্য জাকাত আদায় করাকে শর্ত করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যদি তারা তাওবা করে নামাজ পড়ে, জাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের (মুমিনদের) দ্বীনি ভাই’ (সূরা তাওবা-১১)।

যে ব্যক্তি বা যে সমাজের মানুষ জাকাত দেয় তাদের ওপর মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত নাজিল হয়, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার রহমত সব কিছু পরিব্যাপ্ত করে আছে। সুতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করব যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত দেয় এবং আমার নিদর্শনের প্রতি ঈমান রাখে (সূরা আরাফ-১৫৬)।

মূলত ইসলাম জাকাতের মাধ্যমে সমাজের এ সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করেছে। কেননা মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের অন্যতম প্রকৃষ্ট উপায় হলো ধনসম্পদ বণ্টনের সুষম ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সাম্য-সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাকাতের একটি বিশেষত্ব এই যে, এটি গোপনে দান করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। জাকাত অন্তরকে উদার ও সহানুভূতিশীল করে তুলতে সাহায্য করে। মানুষ একান্তভাবে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, সমাজ ও দেশের কল্যাণকর্মে নিয়োজিত হওয়ার শিক্ষা লাভ করে। এতে বিশ্বমানবতার সাথে একাত্মবোধের সৃষ্টি হয়। পার্থিব সম্পদরাজি ও পারলৌকিক পুরস্কার এ দুয়ের সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা থাকার মধ্যেই জীবনের সফলতা নিহিত।

সতেজ থাকুন দিনভর

সতেজ থাকুন দিনভর

 

গরমের মধ্যে একেবারে সতেজ থাকতে চান? কিংবা গরমে ত্বককে কুল বা ঠাণ্ডা রাখতে চান? এজন্য যা করবেন তা হলো—
* পানির মধ্যে চন্দন পাউডার মিশিয়ে ওই পানি গরম করে নিন। গোসলের পানির মধ্যে ওই পানি মিশিয়ে গোসল করুন। এতে আপনার মধ্যে দিনভর সতেজ ভাব বজায় থাকবে।
* গরমে ক্লিনজিং মিল্ক ব্যবহার না করে এস্ট্রিজেন ব্যবহার করুন। এতে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর হয়ে যাবে।
* সুতি কাপড়ের মধ্যে বরফের টুকরো নিয়ে সারা মুখে মালিশ করুন। এরপর ৫ মিনিট বাতাসে মুখটা শুকিয়ে নিন। ঘাড়ের পেছনেও বরফের টুকরো দিয়ে মালিশ করুন।
 * ত্বকে স্কিন টোনার লাগান। এতে ত্বকের রোম ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাবে। বেশি ঘাম হবে না।

আপনার সন্তানকে তাওহীদের শিক্ষা দিন

আপনার সন্তানকে তাওহীদের শিক্ষা দিন

একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সন্তানকে বুদ্ধি বিকাশের প্রথম প্রহরেই দীন সম্পর্কে ধারণা দিতে ইচ্ছুক থাকি। সন্তান কথা বলা শুরু করতেই আমরা অনেকে আল্লাহ, আব্বু-আম্মু শিক্ষা দেই। কালেমায়ে শাহাদাহ শেখাই। তারপর ক্রমেই তাকে সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদতের সঙ্গে পরিচিত করাই। কিন্তু যে কাজটি আমরা করি না তা হলো সন্তানকে শুধু কালেমা শেখানোই নয়; তাকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া, ঈমানের মোটামুটি বিস্তারিত শিক্ষা দেয়া এবং তাওহীদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দিকগুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়া।

তাইতো দেখা যায় আমাদের সন্তানরা বড় হয়েও অবচেতন মনে তাওহীদের শিক্ষা পরিপন্থী কাজ করে বসে। শিরকের গন্ধ মিশ্রিত কথা বলে বসে। শিশুকালের এই ঘাটতি আর সারা জীবন পূরণ হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় পরবর্তীতে তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি এটাকে অপমান হিসেবে দেখেন। এমনকি অনেকে বলেই বসেন, হ্যা, বাপ-দাদার আমল থেকে কি তবে ভুলই করে আসছি!

অথচ সাহাবীদের অবস্থা দেখুন। তাঁরা বুদ্ধির উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই শিশুকে তাওহীদ শেখাতেন। ঈমানের শিক্ষাকে তাঁরা এলেম ও আমলের শিক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দিতেন। কারণ, এলেম ও আমলেরও আগে ঈমান। জুনদুব বিন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُنَّا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ وَنَحْنُ فِتْيَانٌ حَزَاوِرَةٌ ، فَتَعَلَّمْنَا الإِيمَانَ قَبْلَ أَنْ نَتَعَلَّمَ الْقُرْآنَ ، ثُمَّ تَعَلَّمْنَا الْقُرْآنَ , فَازْدَدْنَا بِهِ إِيمَانًا»

‘আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে থাকতাম। তখন আমরা টগবগে যুবা ছিলাম। সে সময় আমরা ঈমান শিখি আমাদের কুরআন শেখার আগে। এরপর আমরা কুরআন শিখি। এতে করে আমাদের ঈমান বেড়ে যায় বহুগুণে।’ (সহীহ ইবন মাজা : ৬১।)

এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে কুরআন শেখানোর আগে ঈমান শিক্ষা দেন। আর ঈমান হলো- হাদীসে যেমন এসেছে : আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الإِيمَانِ».

‘ঈমানের সত্তরের কিছু বেশি অথবা (বর্ণনাকারীর মতে তিনি বলেছেন) ষাটের কিছু বেশি শাখা রয়েছে। এসবের সর্বোচ্চটি হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা এবং সর্বনিম্নটি হলো পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জা ঈমানের একটি অংশ।’ (মুসলিম : ১৬২; মুসনাদ আহমদ : ৯৩৫০।) 

প্রিয় পাঠক, আপনি নিশ্চয় দেখে থাকবেন, ছোট্র শিশু যে এখনো ভালো করে কথা বলতেও শেখেনি। যখন সে আজানের বাক্য শুনতে পায়, এর সুরে সুর মিলিয়ে, মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের অনুকরণে সেও তার আওয়াজ লম্বা করে। এমনকি উপস্থিত ব্যক্তিদের অলক্ষ্যে সে প্রায়শই প্রতিবার আজানের সময় সচকিত ও উৎকর্ণ হয়। তারপর সে নিজের থেকেই তাওহীদের কালেমা, তাওহীদের নবীর রেসালাতের সাক্ষ্যের কালেমা আবৃত্তি করতে থাকে।

আমার পাশের বাসার ছয় বছর বয়েসী নার্সারিতে পড়া বাচ্চাটি রোজ আজান দেয়। মসজিদের আজান শুরু হওয়া মাত্র পশ্চিম দিকের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সেও শুরু করে আজান দেয়া। বিস্ময়কর এবং ঈমান জাগানিয়া ব্যাপার হলো, বাচ্চাটির আজান হয় প্রায় নির্ভুল এবং উচ্চারণ ও কণ্ঠস্বর বেশ আকর্ষণীয়। সুতরাং প্রতিটি অভিভাবকেরই উচিত, কুঁড়ি থেকে মুকুলিত হবার আগেই নিজের শিশু সন্তানের যত্ন নেয়া। সুন্দর উচ্চারণে শিশুকে কালেমায়ে তাওহীদ তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিক্ষা দেয়া। তারপর কালেমার মর্ম ও মাহাত্ম্য শিখিয়ে দেয়া।

সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, আপনি যদি (‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’) কালেমায়ে তাওহীদের মর্ম উপলব্ধি করতেন, এর মাহাত্ম্য ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হতেন, তবে নিশ্চয় তা নিজের ভেতর দৃঢভাবে ধারণ করতেন এবং নিজ সন্তানকে এ কালেমা বারবার উচ্চারণ ও আবৃত্তি করার নির্দেশ দিতেন। আহমদ বিন হাম্বল রহ. আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ نُوحًا صلى الله عليه وسلم لَمَّا حَضَرَتْهُ الْوَفَاةُ قَالَ لِابْنِهِ : إِنِّي قَاصٌّ عَلَيْكَ الْوَصِيَّةَ ، آمُرُكَ بِاثْنَتَيْنِ ، وَأَنْهَاكَ عَنِ اثْنَتَيْنِ : آمُرُكَ بِلاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ ، فَإِنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالأَرَضِينَ السَّبْعَ ، لَوْ وُضِعْنَ فِي كِفَّةٍ وَوُضِعَتْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فِي كِفَّةٍ لَرَجَحَتْ بِهِنَّ ، وَلَوْ أَنَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعَ وَالأَرَضِينَ السَّبْعَ كُنَّ حَلْقَةً مُبْهَمَةً لَقَصَمَتْهُنَّ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ».

‘নূহ আলাইহিস সালামের যখন মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি তখন তার পুত্রের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি তোমাকে সংক্ষেপে অসিয়ত করছি। তোমাকে দুটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি এবং দুটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর। কেননা সাত আকাশ আর সাত যমীনকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কে রাখা হয় আরেক পাল্লায় তবে সাত আসমান ও যমীনের চেয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র পাল্লাই ভারী হবে। যদি সাত আসমান আর সাত যমীন কোনো হেঁয়ালীপূর্ণ বৃত্ত ধারণ করে তবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তা ভেদ করে চলে যাবে। [আল-আদাবুল মুফরাদ : ৫৪৮; মুসনাদ আহমদ : ৬৫৮৩।]

উদ্দেশ্য হলো, সন্তান যখন আধো আধো ভাষায় অস্ফূটকণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে, প্রথম যখন তার বাকপ্রতিভার অভিষেক ঘটে, তখন ঈমানের শাখাগুলোর মধ্যে প্রথম ও সর্বোচ্চটি তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মাধ্যমেই তা করার চেষ্টা করা উচিত।

একটি বিদেশি পত্রিকায় আমি একটি কার্টুন দেখেছিলাম। এর ক্যাপশনটি ছিল এমন : নিজ সন্তানের প্রথম বাক্যোচ্চারণ শুনে তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে গায়ক স্বামী তার স্ত্রীকে বলছেন, দেখ, আমাদের বাবুটি গড না বলে প্রথমেই বলছে ‘রাত’!! একজন কণ্ঠশিল্পীর শিশুর কাছে অবশ্য এমনটি অতি বেশি আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু বিপত্তি হলো আজকালের মুসলিম পরিচয়ধারী ভাইদের থেকেও এমন ঘটনা ঘটছে। যারা ইসলামের অনুসরণকে ধর্মান্ধতা (?) ভাবলেও নিজেরাই আবার পশ্চিমাদের অনুকরণ করেন অন্ধভাবে। ইদানীং এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। কেবল একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যাক :

এক ভদ্রলোক তার নিষ্পাপ শিশুকে নিয়ে পথ চলছেন। বয়স তার অনুর্ধ্ব চার বছর। পথে দেখা হলে তার এক বন্ধু বাচ্চাটিকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? বাচ্চাটি একজন পপ গায়কের নামে তার পরিচয় দিল। বন্ধুটি বললেন, বাহ্! তুমি কি ওই শিল্পীর মতো গান গাইতে পারো? শিশুর বাবা গর্বিত কণ্ঠে বললেন, হ্যা, অবশ্যই। এমনকি তিনি সন্তানকে গান শুনিয়ে দিতেও নির্দেশ দিলেন। বাবার নির্দেশ পেয়ে শিশুটি গাইতে শুরু করলো। অথচ শিশুটি এখনো অনেক শব্দ উচ্চারণ করতে শেখেনি! ট কে সে বলছিল ত আর কঠিন শব্দগুলো উচ্চারণ করছিল তার কল্পনা মতো।

আশা করি শিক্ষণীয় বিষয়টি বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। হ্যা, বলছিলাম নিজের শিশুটিকে শুরু থেকেই আল্লাহর নাফরমানীতে অভ্যস্ত না করে তাঁর প্রশংসা ও বড়ত্ব সূচক সুন্দর বাক্য উচ্চারণে অভ্যস্ত করা উচিত। আমাদের ভেবে দেখা দরকার নিজ সন্তানকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আমরা আর কোথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী? কোথায় তাঁদের সন্তান আর কোথায় আমাদের সন্তান?

﴿فَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يَهۡدِيَهُۥ يَشۡرَحۡ صَدۡرَهُۥ لِلۡإِسۡلَٰمِۖ وَمَن يُرِدۡ أَن يُضِلَّهُۥ يَجۡعَلۡ صَدۡرَهُۥ ضَيِّقًا حَرَجٗا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي ٱلسَّمَآءِۚ كَذَٰلِكَ يَجۡعَلُ ٱللَّهُ ٱلرِّجۡسَ عَلَى ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ﴾  [البقرة:125]

‘সুতরাং যাকে আল্লাহ হিদায়াত করতে চান, ইসলামের জন্য তার বুক উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না’।

হে আল্লাহ, আমাদের বক্ষগুলোকে আপনার হিদায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আমাদের সন্তাদের আপনার সন্তুষ্টিমাফিক গড়ে তোলার তাওফীক দেন। আমীন।

ইসলাম হাউস

%d bloggers like this: