সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে সাম্য ও সমতা সম্পর্কীয় যে উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়, মানব জাতির অতীত কিংবা বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোথাও তা দেখা যায় না। ইসলাম সবাইকে অন্যায়-অবিচার, খুন খারাবি, সন্ত্রাস ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কুরআনুল কারিম মানবগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। আর তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি।’ (আল-কুরআন, ৪৯ঃ ১৩)

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী সাঃ ঘোষণা করেছেন, ‘কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব। কোনো কালোর ওপর কোনো সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো সাদার ওপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব, তবে তাকওয়া ছাড়া।’ (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া)। তিনি আরো বলেছেন, ‘সব মানুষই আদমের সন্তান এবং আদম মাটির সৃষ্টি। হে আদম সন্তান, আজকের এই দিন, এই মাস, এই নগরী যেমন তোমাদের কাছে মর্যাদাসম্পন্ন, ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধনসম্পত্তিও মর্যাদাসম্পন্ন। মনে রেখো আঁধার যুগের সব নীতি, সব আচরণ আজ আমি পদতলে দলিত করছি। অজ্ঞতার যুগের রক্তপাত এবং তার প্রতিশোধের সব ঘটনা আজ থেকে বিস্মৃত হয়ে যাবে। সর্বপ্রথম আমি আমার পিতৃব্য ভ্রাতা ইবন রাবিয়া বিন হারিসের খুনের দাবি প্রত্যাহার করছি।’

কুরআন ও মহানবীর সাঃ বাণীর আলোকে সব মানুষ আইনের চোখে সমান মর্যাদার অধিকারী। রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলাম সমগ্র মানব জাতিকে এক সমতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আর ঈমান ও ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে মুসলমানদের পরস্পর ভাই ভাই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় মু’মিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (আল-কুরআন, ৪৯ঃ ১০)

মহানবী সাঃ যে ইসলাম ধর্মের জয়গান ও প্রচার করেছেন তা ঝগড়া-বিবাদ, অন্যায়-অবিচার, খুন-খারাবি ও সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্বভ্রাতৃত্বের ধর্ম। এ এমন এক ধর্ম যেখানে জাতি-ধর্ম, ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় সব ভেদাভেদ মানুষের চিন্তা ও চেতনা থেকে মুছে ফেলার কথা বলা হয়েছে। তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে সামাজিক অসমতা দূর করেন, নারীদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেন, ক্রীতদাসদের অবস্থার উন্নতি বিধান করেন এবং মদ্যপান, জুয়া, রক্তপাত প্রভৃতি অসামাজিক প্রথা কঠোরহস্তে দমন ও দূর করে সামাজিক ও নৈতিক সংস্কার সাধন করেন। মানব জাতির মুক্তি, সবার মধ্যে সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা ছিল তার লক্ষ্য এবং আন্তরিকতা, সত্যনিষ্ঠা ও সততা ছিল তার জীবনের ব্রত।

ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এর মাঝেই শান্তি ও নিরাপত্তার অনাবিল সুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত। অন্যায়-অবিচার প্রশ্রয় পাওয়ার কিছুই তাতে নেই। স্থানমাফিক অবশ্যই তাতে কঠোরতা বিদ্যমান।

সাম্য প্রতিষ্ঠায় কোনো বাধা-বিপত্তি এলে প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের দু’টি দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে, অতঃপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।’ (আল কুরআন, ৪৯ঃ ৯) অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার স্থান জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লানত করবেন ও তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।’ (আল কুরআন, ৪ঃ ৯৩)

হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত মহানবী সাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিল্লাতে ইসলামের অনুসরণ করে না বরং মুসলিম জামাত থেকে পৃথক হয়ে যায়, সে যদি এ অবস্থায় মারা যায় তবে সেটা কুফরি যুগের মৃতুø বিবেচিত হবে।’

সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম সর্বদাই সন্ত্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সন্ত্রাস লালন-পালন, আশ্রয় দেয়নি কখনো। সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব বিনির্মাণে ইসলাম যে ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয়েছে ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণ অর্থাৎ গুণ ও কর্মের দ্বারা, বংশ গৌরব, ধনদৌলত, রাজনৈতিক ক্ষমতা বা পেশা দ্বারা নয়। ইসলাম সবাইকে সন্ত্রাসের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

মহানবী সাঃ সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব উপহার দিতে গিয়ে সাম্য, মৈত্রী, শান্তিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার বাণী শুনিয়েছিলেন, ন্যায় ও সদয় ব্যবহারে তার কাছে কখনো স্বধর্মী-বিধর্মী বিচার ছিল না। তাঁর পিতৃব্য আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু মহানবী সাঃ সব সময় তার সাথে পরম সদ্ভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছেন। হজরত বিধর্মী অতিথির মল-মূত্র স্বহস্তে ধৌত করেছেন। ইসলামের অতি বড় শত্রুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়েছেন। ইহুদি ও খ্রিষ্টানের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। অনেক সময় তাঁর মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করেছে। তিনি সবার সাথে সমভাবে মিলেমিশে সর্বপ্রকার দায়িত্ব পালন করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় সাহাবিদের সাথে মাটি কেটেছেন এবং মাটির বোঝা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। এক সাহাবিকে তার ভৃত্যদের প্রহার করতে দেখে মহানবী সাঃ তাকে বললেন, ‘সে তোমার ভাই, তুমি যা খাও তাই তাকে খেতে দিও। তুমি যা পরিধান করবে তাই তাকে পরিধান করাও।’

মদিনায় হিজরতের পর মহানবী সাঃ আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে দেন এবং তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। (আল কুরআন, ৩ঃ ১৩)

ইসলামে সব মানুষের ধন-প্রাণের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মবিকাশের সুযোগ সুবিধা, শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপন এবং মানুষের প্রকৃত কল্যাণের সুব্যবস্থা রয়েছে।

সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে মহানবী সাঃ তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পদ রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি।

সনদের মূল কথা ছিলঃ ‘তাদের (অমুসলিম) শত্রুকে প্রতিরোধ করা হবে। ধর্ম পরিবর্তনে তাদের বাধ্য করা হবে না, তাদের ধন-প্রাণ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিষয়-সম্পত্তি সবই নিরাপদ থাকবে। তাদের স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি তাদের অধিকারে থাকবে। তাদের পাদ্রী, পূজারী ও পুরোহিত কাউকেও বরখাস্ত করা হবে না এবং তাদের ক্রুশ ও দেবদেবীর মূর্তি বিনষ্ট করা হবে না। তারা নিজেও অত্যাচার করবে না এবং তাদের প্রতিও অত্যাচার করা হবে না। অজ্ঞতার যুগে রক্তের পরিবর্তে রক্ত নেয়ার যে প্রথা ছিল তা তারা পালন করতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে কোন ‘উশর’ (সম্পদের এক দশমাংশ) গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের সৈন্যবাহিনীর কোনো রশদ জোগাতে হবে না।’

তিনি আরো বলতেন, ‘যে ব্যক্তি জিম্মির প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেবে আমি পরলোকে তার জন্য অভিযোগকারী হবো।’

এ জন্যই Encyclopaedia of Religion and Ethics-এ বলা হয়েছে, The recognition of rival religious system as possessing a Divine revelation gave to Islam from the outset a theological basis for the toleration of non-Muslim.

এভাবেই ইসলাম মানুষকে সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে সমাজের সর্বত্র শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপন করেছে। জনগণের জানমাল, ইজ্জত আব্রুও হিফাজতের দায়িত্ব ও বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মানুষের আর্থিক দুর্গতি দূরীভূত করার সব বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

Advertisements

যেভাবে স্বাগত জানাব মাহে রমজানকে

যেভাবে স্বাগত জানাব মাহে রমজানকে

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি আমাদেরকে নিয়ামত হিসেবে দিয়েছেন সৎকাজ করার বিভিন্ন মৌসুম। যিনি রমজানকে করেছেন মহিমান্বিত, বরকতময়। যিনি উৎসাহ দিয়েছেন মাহে রমজানে ইবাদত-বন্দেগী যথার্থরূপে পালন করতে। পুণ্যময় কাজসমূহে অধিকমাত্রায় রত হতে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি তার অফুরান নেয়ামতের জন্য।  শুকরিয়া করছি তাঁর অঢেল করুণার জন্য। দরুদ ও সালাম তাঁর প্রতি যিনি নামাজ ও রোজা আদায়কারীদের মধ্যে ছিলেন সর্বোত্তম। যিনি তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল সম্পাদনকারীদের মধ্যে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তার প্রতি রহমত ও বরকত নাযিল করুন। তাঁর সাহাবাদের প্রতিও রহমত বর্ষণ করুন। তাবেয়ীন ও ঐকান্তিকতার সাথে, পৃথিবীতে আলো অন্ধকার যতদিন থাকবে, ততদিন যারাই তাদের অনুসরণ করবে তাদের সবার প্রতি বর্ষিত হোক আল্লাহর অফুরান রহতম ।

আল্লাহ তাআলা বড়-বড় উপলক্ষ্য রেখেছেন যা হৃদয়ে ইমানকে শানিত করে, অন্তরাত্মায় আন্দোলিত করে উচ্ছ্বসিত অনুভূতি। অতঃপর বাড়িয়ে দেয় ইবাদত আরাধনার অনুঘটনা, সঙ্কুচিত করে দেয় সমাজে পাপ ও অন্যায়ের ক্ষেত্রসমূহ । রমজান মুসলমানদেরকে দেয় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, স্বচ্ছতা, সহমর্মিতা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা,পবিত্রতা, উত্তমতা, সবর ও শৌর্যবীর্যের দীক্ষা। ইহা একটি সুমিষ্ট পানিয়ের প্রস্রবণ। ইহা ইবাদতকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ভূমি, আনুগত্যকারীদের জন্য দুর্পার দুর্গ। যারা পাপী তাদের জন্য ইহা একটি সুযোগ, যাতে তারা তাদের গুনাহ থেকে তাওবা করতে পারে। তাদের জীবন-ইতিহাসে  স্বচ্ছ কিছু অধ্যায় রচিত করতে পারে। তাদের জীবনকে ভরে দিতে পারে উত্তম আমলে, উৎকৃষ্ট চরিত্রে।

রমজানের ফজিলত

কালের বিবেচনায় এসব উপলক্ষ্যের  মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, সম্মানের বিবেচনায় সর্বশ্রেষ্ঠ, প্রভাবের বিবেচনায় সুদূর বিস্তৃত উপলক্ষ্য হল সম্মানিত  মাহে রমজান যার টলটলে রস আস্বাদন করে আমরা হই পরিতৃপ্ত । চুমুকে চুমুকে তুলে নিই তার মধু। নাক ভরে শুঁকে নেই তার সুগন্ধি। মাহে রমজান ছাওয়াব-পুণ্য বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার মাস। দরজা বুলন্দ হওয়ার মাস। পাপ-গুনাহ মোচন হওয়ার মাস। পদস্খলন থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শয়তানকে আবদ্ধ করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে রোজা রাখবে, তারাবিহ পড়বে ইমান ও ছাওয়াব লাভের আশায়, তার অতীত জীবনের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ হাদিসে এভাবেই এসেছে: আবু হুরায়রা (রাযি) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাব – আল্লাহর কাছ থেকে ছাওয়াব প্রাপ্তির আশায় সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।[ বুখারি ও মুসলিম] { যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবসহ রমজানের রাত্রি যাপন করবে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। [ বুখারি ও মুসলিম]

মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ: রমজান মুসলমানদের জন্য বিশাল এক আনন্দের মাস। মহাকালের পরিক্রমায় ঘুরে ঘুরে আসে রমজান। আসে এই সম্মানিত মৌসুম। আসে এই মহান মাস। আসে প্রিয় মেহমান হয়ে, সম্মানিত অতিথি হয়ে। এই উম্মতের জন্য মাহে রমজান আল্লাহর এক নেয়ামত।  কেননা এ মাসের রয়েছে বহু গুণাবলি, বৈশিষ্ট্য। আবু হুরাইরা (রাযি) হতে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে: {যখন রমজান আসে বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। শয়তানকে শিকল পড়িয়ে দেয়া হয়। [ বুখারি ও মুসলিম]

এটা নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। এটা এক সম্মানিত উপলক্ষ্য যেখানে স্বচ্ছতা পায় অন্তরাত্মা। ধাবিত হয় যার প্রতি হৃদয়। যাতে বেড়ে যায় ভাল কাজ করার উৎসাহ-উদ্যম। উন্মুক্ত হয়ে যায় জান্নাত, নাযিল হয় অফুরান রহমত। বুলন্দ হয় দরজা, মাফ করা হয় গুনাহ।

রমজান  তাহাজ্জুদ ও তারাবির মাস। যিকির ও তাসবিহর মাস। রমজান কুরআন তিলাওয়াত ও নামাজের মাস। দান সাদকার মাস। যিকির-আযকার ও দুআর মাস। আহাজারি ও কান্নার মাস।

যে কারণে রমজান আমাদের প্রয়োজন

মুসলিম ভাইয়েরা ! জাতির জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়া জরুরি যখন আত্মার পরিশুদ্ধি ও তৃপ্তি সম্পন্ন হবে। যখন ইমানের মাইলফলকগুলো নবায়ন করা হবে। যা কিছু নষ্ট হয়েছে তা সংস্কার করা হবে। যেসব রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছে তা সারিয়ে তোলা হবে। রমজান সেই আধ্যাত্মিক মুহূর্ত যেখানে মুসলিম উম্মাহ তাদের বিভিন্ন অবস্থা সংস্কার করার সুযোগ পায়, তাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়। তাদের অতীতকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়। এটা আত্মিক ও চারিত্রিক বল ফিরিয়ে আনার একটি মাস। আর এ আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক শক্তি ফিরিয়ে আনা প্রতিটি জাতিরই কর্তব্য। মুসলমানরা এ মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে অধীর আগ্রহে। এটা ইমান নবায়নের একটা বিদ্যাপীঠ। চরিত্র মাধুর্যমণ্ডিত করার সময়। আত্মাকে শানিত করার সময়। নাফসকে ইসলাহ করার সময়। প্রবৃত্তিকে কনট্রৌল করার সময়। কুপ্রবৃত্তিকে দমন করার সময়।

রমজানে অর্জন হয় তাকওয়া। রমজানে বাস্তবায়ন হয় আল্লাহর নির্দেশমালা। শাণিত হয় ইচ্ছা। রমজানে একজন মুসলিম প্রশিক্ষণ নেয় আত্মদানের। শাহাতদতবরণের। রমজানে অর্জিত হয় ঐক্য, মহব্বত, ভ্রাতৃত্ব, ও মিলমিলাপ। এ মাসে মুসলমানরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়ার অনুভূতি অর্জন করে। অনুভব করে ক্ষুধার্তের ক্ষুধা। রোজা ত্যাগ, বদান্যতা ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার সময়। এটা সত্যিই চরিত্রের জন্য সহায়ক। রহমতের প্রস্রবণ। যে ব্যক্তি সত্যি সত্যি রোজা রাখল তার রুহ পরিচ্ছন্ন হল। তার হৃদয় নরম হল। তার আত্মা পরিশুদ্ধ হল। তার অনুভূতিসমূহ ঠিকরে পড়ল ও শাণিত হল। তার আরচরণসমূহ বিনম্র হল।

মুসলমানদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের মোক্ষম সময় হল রমজান। অতঃপর তাদের উচিত রমজান এলে আত্বসমালোচনায় মনোযোগী হওয়া। রমজানের হেকমতসমূহ খোঁজে নেওয়া তাদের জন্য কতোই না জরুরি। রমাজানের দানসমূহ থেকে উপকৃত হওয়া তাদের জন্য কতোই না প্রয়োজন। রমাজানের উত্তম ফলাফল আহরণ করা কতোই না প্রয়োজন।

আমরা কীভাবে রমজানকে স্বাগত জানাব?

প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রথমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। সকল পাপ-গুনাহ থেকে তাওবার মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। সকল প্রকার জুলুম অন্যায় থেকে বের হয়ে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। যাদের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের কাছে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। ভাল কাজের মাধ্যমে রমজানের দিবস-রজনী যাপনের মানসিকতা নিয়ে রমজানকে স্বাগত জানাতে হবে। এ ধরনের আবেগ অনুভূতির মাধ্যমেই আশাসমূহ পূর্ণ হয়। ব্যক্তি ও সমাজ তাদের সম্মান ফিরে পায়। এর বিপরীতে রমজান যদি কেবলই একটি অন্ধ অনুকরণের বিষয় হয়। কেবলই কিছু সীমিত প্রভাবের নিষ্প্রাণ আচার পালনের নাম হয় । যদি এমন হয় যে রমজানে, পুণ্যের বদলে, পাপ ও বক্রতা কারও কারও জীবনে বেড়ে যায়, তবে এটা নিশ্চয়ই একটি আত্মিক পরাজয়, এটা নিশ্চয় শয়তানের ক্রীড়া, যার বিরূপ প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের উপর পড়তে  বাধ্য।

এই মহান মাসের আগমনে মুসলমানদের জীবনে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধি। সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জীবনে এ  মহান মৌসুমের আগমনে বয়ে যাক আনন্দের ফল্গুধারা। যারা আনুগত্যশীল, এ মাস তাদের নেক কাজ বাড়িয়ে দেওয়ার। যারা পাপী, তাদের জন্য এ মাস  পাপ থেকে ফিরে আসার। মুমিন বেহেশতের দরজাসমূহের উন্মুক্তিতে  খুশি না হয়ে পারে  না?  পাপী, দোযখের দরজাসমূহ এ মাসে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুশি হবে বই কি। এ এক বিশাল সুযোগ যা থেকে মাহরুম ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেও বঞ্চিত হয় না। সিয়াম ও কিয়ামের মাস রমজানের আগমন মুসলমানদের জন্য বিরাট সুখের সংবাদ। অতঃপর হে আল্লাহর বান্দারা আপনারা সিরিয়াস হোন, ঐকান্তিক হোন, রোজাকে কখনো কঠিন ভাববেন না। রোজার দিবসকে দীর্ঘ মনে করবেন না। রোজা ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকুন। আত্মিক ও বস্তুকেন্দ্রিক সকল প্রকার রোজাভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকুন।

রোজার হাকীকত

অনেক এমন রয়েছে যারা রোজার হাকীকত সম্পর্কে বেখবর। তারা রোজাকে কেবলই খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছে। তাদের রোজা মিথ্যাচারিতায় জবান দরাজ করতে  বারণ করে না। চোখের ও কানের লাগাম তারা উন্মুক্ত করে দেয়। তারা গুনাহ ও পাপে নিপতিত হতে সামান্যও উৎকণ্ঠিত হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: { যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, সে অনুযায়ী কাজ এবং  মূর্খতা পরিত্যাগ করল  না, তার খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।

কবি সত্যই বলেছেন:

রক্ষিত যদি না হয় কর্ণ

দৃষ্টিতে  না থাকে বাধা

তবে বুঝে নিও

আমার রোজা কেবলই তৃষ্ণা ও পিপাসা।

যদি বলি আমি আজ রোজা,

মনে করিও আমি আদৌ রোজাদার নই।

 রমজান ও উম্মতের হালত

প্রিয় ভাইয়েরা! মুসলমানরা বর্তমানে খুব কঠিন কালপর্ব যাপন করছে। সে হিসেবে তাদের  উচিত এ সময়টাকে একটা কঠিন সময় হিসেবে নেওয়া। এ মাসটাকে একটা পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হিসেবে গণ্য করা। এ মাসে ইখতিলাফ ও মতানৈক্য থেকে নিষ্কৃতির পাওয়ার উপায় খোঁজে নেওয়া জরুরি। ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্যের বন্ধন মজবুত করা জরুরি। চিন্তা ও মনোজগৎ ও মতামতে পরিবর্তন জরুরি। এ মাসে আমাদের চলার  পথ ও পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহর চাঁচে গড়ে তুলতে হবে। সালাফে সালেহীনদের নমুনায় ঢেলে সাজাতে হবে নিজেদেরকে। আর এভাবেই হারিয়ে যাওয়া সোনালি অতীতকে, সম্মান ও মর্যাদার অতীতকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে। যে অতীতের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের বহু ঘটনা অনুঘটনা নির্মিত হয়েছিল মুবারক এ মাহে রমজানে। বদর, ফতহে মক্কা, হিত্তিন যুদ্ধ, আইন জালুত যুদ্ধসহ আরো বহু অতি উজ্জ্বল ইতিহাস নির্মিত হয়েছিল এ মাসেই।

প্রিয় ভাইয়েরা ! আমাদের এ সম্মানিত মাস আমাদের  দ্বারপ্রান্তে। অথচ মুসলিম উম্মাহর দেহে রয়েছে অঝর ধারায় ক্ষরিত হওয়া লহুর বহু জখম। বেদনাবিদ্ধ বহু ঘটনার অনুরণন।

বায়তুল মাকদেসের পড়শী মুসলমানরা কী অবস্থায় এ মাসকে স্বাগত জানাবে, তারা তো ক্রিমিনাল জয়েনিষ্টদের ধারালো কুঠারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত।

যেসব মুসলিম ভাইবোনদেরকে তাদের ঘরবাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, সম্পদ থেকে মূলোৎপাটিত করে দেশান্তরিত করা হয়েছে সেই মুসলিম ভাইয়েরা কী হালতে স্বাগত জানাবে মাহে রমজানকে?

ফিলিস্তিন সমস্যার অব্যাহত থাকা, বায়তুল মাকদেস, যা দুই কেবলার মধ্যে প্রথম, যা জিন-ইনসানের সরদারের ইসরার স্থল, যা পবিত্রতম তিন মসজিদের মধ্যে তৃতীয়, সেই বায়তুল মাকদেস এখনো ইসরাইলীদের দখলদারিত্বে থাকা মুসলমানদের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ, বুদ্ধি ও ধর্মীয় আদর্শের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ, আদল-ইনসাফ, শান্তি ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। মুসলমানরা বহু জায়গায় আধুনিক যুগের নৃশংস যুদ্ধের অনলে জ্বলছে, নি:শেষ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ক্ষুধা, হত্যা , ভিটামাটি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদির শিকার হচ্ছে। এ অবস্থায় তারা কীভাবে যে রমজানকে স্বাগত জানাবে  তা ভাববার বিষয়।

রমজান প্রজন্ম গড়ার শিক্ষালয়

রোজাদার ভাইয়েরা! মাহে রমজানে মুসলিম উম্মাহ ঐকান্তিকতার শিক্ষা নেয়, খেল-তামাশা থেকে বিমুক্ত হয়ে সিরিয়াসনেস অবলম্বনের শিক্ষা নেয়, জিহ্বায় লাগাম লাগানো, যা কিছু বললে পাপ হয় সেসব থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা নেয় এই মাহে রমজানে। হৃদয় পরিচ্ছন্ন রাখার, হিংসা, দ্বেষ, রেষারেষি থেকে মুক্তি লাভের শিক্ষা নেয় রমজানের এই পবিত্র মাসে বিশেষ করে উলামা ও দাওয়াতকর্মীগণ। ফলে বিচ্ছিন্ন হৃদয়গুলো অভিন্ন সুতোয় নিজেদেরকে বেঁধে নেওয়ার সুযোগ পায়। বিচ্ছিন্ন মেহনত-প্রচেষ্টা একীভূত হয় গঠনমূলক কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে, কমন শত্রুকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে। এ মাসে আমরা সবাই  খুঁটিনাটী ভুল ধরা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নিতে পারি। কে কোথায় সামান্য হোঁচট খেল তা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খোঁজে নিতে পারি। কে কোথায় ভুল করল তা ফুঁক দিয়ে ফুলিয়ে প্রচার করার প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে পারি। কার কি উদ্দেশ্য সে বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।

রমজান মাসে আমাদের যুবকদের কাছে প্রত্যাশা, তারা তাদের ভূমিকা যথার্থরূপে পালন করবে। তারা তাদের মিশনকে ভালভাবে আয়ত্ত করবে। তারা তাদের রবের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে। তারা তাদের সরকার প্রধানদের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে। মাতা-পিতা ও সমাজের অধিকার বিষয়ে সচেতন হবে।

রমজানে মুসলমানদের শাসক ও শাসিতের মাঝে যোগাযোগের একটি উপলক্ষ্য সৃষ্টি হয়। উলামা ও সাধারণ মানুষের মাঝে, ছোট ও বড়র মাঝে সেতুবন্ধনের লক্ষণসমূহ দৃশ্যমান হয়। সবাই একহাত হয়ে, একশরীর হয়ে কাজ করার সুযোগ আসে, ফেতনা ফাসাদ দূর করার স্বার্থে, নির্যাতনে নিপতিত হওয়ার উপলক্ষ্যসমূহ দূরে ঠেলে দেওয়ার স্বার্থে, নৌকা যাতে ফুটো করা না হয়, বিল্ডিং যাতে ভেঙ্গে না পড়ে, সামাজিক ও চিন্তাগত অস্থিরতা যেন জায়গা করে নিতে না পারে সে উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়ার স্বার্থে।

রমজানে ভাল কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়, হৃদয়ে ঝোঁক সৃষ্টি হয়। এটা দাওয়াতকর্মী ও সংস্কারকদের জন্য একটা বিরাট সুযোগ। সৎকাজের নির্দেশদাতা ও অসৎ কাজ থেকে বারণকারীদের জন্য বিরাট সুযোগ, যারা অন্যদেরকে দীক্ষিত করে তুলতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছে তাদের জন্য বিরাট সুযোগ যে তারা তাদের কল্যাণকর্মসমূহ এ মাসে উত্তমরূপে পালন করতে পারবে। কেননা সুযোগ দ্বারপ্রান্তে, মানুষের হৃদয়েও রয়েছে প্রস্তুতি।

অত:পর আল্লাহকে ভয় করুন হে আল্লাহর বান্দারা! রমজানের হাকীকতকে জানুন। রমজানের আদব ও আহকামকে জানুন। রমজানের দিবস রজনীকে সৎ কাজ দিয়ে ভরে দিন। রমজানের রোজাসমূহকে ত্রুটি থেকে  বাঁচান। তাওবা নবায়ন করুন। তাওবার শর্তসমূহ পূরণ করুন। আশা করা যায় আল্লাহ আপনার পাপসমূহ মার্জনা করে দেবেন। যাদেরকে তিনি তাঁর রহমত ও করুণায় ভূষিত করবেন, দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন আপনাকে তাদের মধ্যে শামিল করে নেবেন।

মাহে রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমধিক বদান্য ব্যক্তি ছিলেন। মাহে রমজানে তাঁর দানশীলতার মাত্রা আরো বেড়ে যেত বহুগুণে। ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ছিল পূর্ণাঙ্গতম আদর্শ, উদ্দেশ্য সাধনে সর্বোত্তম আদর্শ। মানুষের পক্ষে পালনযোগ্য সহজতর আদর্শ। আর রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে আদর্শ ছিল: সকল প্রকার ইবাদত বাড়িয়ে দেয়া। এ মাসে জিব্রিল ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  নিয়ে কুরআন পঠন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে দান-খয়রাত বাড়িয়ে দিতেন। কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিতেন। নামাজ ও যিকির বাড়িয়ে দিতেন। এ মাসে তিনি ইতিকাফ করতেন এবং এমন ইবাদতে এ মাসকে বিশেষিত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করতেন না।

সালাফে সালেহীনগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আদর্শ অনুসরণে সচেষ্ট হয়েছেন। তারা উত্তমরূপে রোজা পালনের ক্ষেত্রে সুন্দরতম আদর্শ স্থাপন করেছেন। তারা রোজার উদ্দেশ্য হাকীকতকে ভালভাবে আয়ত্তে এনেছেন এবং মাহে রমজানের দিবস-রজনীকে আমলে সালেহ দিয়ে ভরে রেখেছেন।

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা!

আপনারা যেভাবে এ মাসটিকে স্বাগত জানিয়েছেন একইরূপে আপনারা তাকে অচিরেই বিদায় দেবেন। আমরা এ মাসকে স্বাগত জানিয়েছি তবে জানি না পুরো মাস রোজা রাখার ভাগ্য আমাদের সবার হবে কি-না। আমরা তো প্রতিদিন বহু মানুষের জানাযা পড়ছি, যাদের সাথে আমরা অতীতে রোজা রেখেছি তাদের সবাই কি আমাদের মাঝে আছে?!

বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি যে রমজানকে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে নেয়। নিজের বক্রতাকে সোজা করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। মৃত্যু তাকে অতর্কিতে হামলা করার পূর্বেই নিজের নফসকে আল্লাহর ইবাদতের প্রতি বাধ্য করে। আর মৃত্যু যদি চলে আসে তবে সৎকাজ ব্যতীত অন্য কিছু কোনো কাজে আসবার নয়। অতঃপর এ মাসে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হোন। তাওবা করুন, লজ্জিত হোন, পাপ-গুনাহ থেকে ফিরে আসুন। নিজের  জন্য, আত্মীয়স্বজনদের জন্য ও গোটা মুসলিম উম্মার জন্য  দুআ মুনাজাতে খুবই পরিশ্রমী হোন।

وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه وسلم 

শ্বাসকষ্টজনিত হৃদরোগ

শ্বাসকষ্টজনিত হৃদরোগ

যক্ষ্মা আমাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গে এবং অংশে হতে পারে। আমাদের শরীরের এমন কোনো অংশ নেই যা যক্ষ্মার ছোবল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে। আমরা প্রায় সবাই জানি যে, যক্ষ্মা সাধারণত ফুসফুসেই হয়ে থাকে। তখন রোগীর জ্বর, কাশি, রক্তকাশি, বুকে ব্যথা, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, রাতে ঘাম হতে দেখা যায়। আবার অনেকে গ্ল্যান্ড টিবির নামও হয়তো শুনেছেন, যেখানে ঘাড়ের পাশে বড় বড় গ্রন্থি ফুলে ওঠে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, আজকাল প্রচুরসংখ্যক গ্ল্যান্ড টিবির রোগী দেখা যাচ্ছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখিছি, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মেয়েদের মধ্যে গ্ল্যান্ড টিবি হতে বেশি দেখা যায়। যদিও যেকোনো বয়সে এবং পুরুষের মধ্যেও গ্ল্যান্ড টিবি অবশ্যই হতে পারে।

নাড়িতে টিবি হয়েছে এমন এক মেয়ের ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। মেয়েটির বয়স ২২ বছর। আড়াই বছর আগে বিয়ে হয়েছে। দেড় বছরের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে তার। স্বামী বিদেশে চাকরি করেন। প্রায় এক বছর ধরে মেয়েটি বমি করে। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পেপটিক আলসার ভেবে আলসারের বিভিন্ন চিকিৎসা দিয়েছেন। কিন্তু বমি আর সারে না। যেটাই খায় তাই বমি করে ফেলে দেয়। মেয়েটির পেট পরীক্ষা করে দেখা গেল, পেটে কয়েকটি চাকা। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো অপারেশনের মাধ্যমে দেখতে হবে যে পেটের ভেতর কী আছে! পেট কেটে দেখা গেল, নাড়ির পাঁচটি জায়গায় চাকাগুলো পুরো নাড়িকে বন্ধ করে দিয়েছে। বায়োপসি করে দেখা গেল, চাকাগুলো যক্ষ্মার ফলেই হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী যক্ষ্মার ওষুধ দেয়াতে রোগী এখন দ্রুত আরোগ্যের পথে। অরেকটি রোগীর কথা বলি। তার বয়স ৫০ বছর। পেট বেশ ফোলা। কোনো কোনো চিকিৎসক সিপেসি সন্দেহ করেছিলেন। কারণ পেটে ছিল প্রচুর পানি। আলট্রাসনোগ্রাম করেও দেখা গেল পেটে পানি; কিন্তু এক চিকিৎসকের সন্দেহ হলো, বোধ হয় পেটে অন্য কিছু থাকতেও পারে। রোগীর আত্মীয়স্বজনকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে অপারেশন করা হলো। সার্জন লক্ষ করলেন, পেটের ভেতর জায়গায় জায়গায় রয়েছে যক্ষ্মা জীবাণুর টিউবারকল। বায়োপসি করেও দেখা গেল যক্ষ্মা। আর যক্ষ্মার ওষুধ দেয়ার ফলে একজন মৃতুøপথযাত্রী রোগীও খুঁজে পেল নতুন জীবনের স্বাদ। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, সব সিরোসিস বা পেটে পানির কারণ যক্ষ্মা নয়। এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। এমন আরো অনেক রোগী আছেন যারা কিডনির প্রদাহে মাসের পর মাস ভুগছেন। প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছেন অথচ ভালো হচ্ছেন না। যক্ষ্মা সন্দেহ করে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর চিকিৎসা দেয়ায় সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছেন। অনেক বন্ধ্যা মহিলার ঘটনা জানি, যাদের জরায়ুতে যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেছে। পরে ওষুধ ব্যবহার করার পর তারা সন্তানের মা হতে সক্ষম হয়েছেন।

আমার চেম্বারে এমন অনেক রোগী আসেন যাদের মাসের পর মাস জ্বর ছাড়ছে না অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও তেমন কিছু ধরা পড়ছে না। অথচ যক্ষ্মার ওষুধ টেস্ট ডোজ হিসেবে প্রয়োগ করার পর জ্বর ছেড়ে গেছে। সার্জন ক্রোফটন এক দিন একটি কনফারেন্সে আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মতো অনুন্নত দেশে জ্বরে আক্রান্ত কোনো রোগীকেই এক কোর্স যক্ষ্মার ওষুধ না খাইয়ে মরতে দেয়া উচিত নয়। কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে যেখানে প্রায় ছয় লাখ ছোঁয়াচে যক্ষ্মা রোগী রয়েছে এবং প্রায় ৫০ লাখ সন্দেহজনক যক্ষ্মা রোগী রয়েছে সেখানে অন্য কোনো রোগের উপস্থিতি নির্ণয় করতে না পারলে যক্ষ্মা সন্দেহ করে অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কারণ যক্ষ্মা বাংলাদেশে দ্বিতীয় ঘাতকব্যাধি। মরণব্যাধি এইডসের আবির্ভাবে যক্ষ্মা আরো নতুন নতুন রূপে আবিভূêত হবে­ এটাই আশঙ্কা করা যেতে পারে।

এক রোগীর কথা মনে পড়ে। তার বয়স ২৮ বছর। জ্বরে ভুগছেন। এক্স-রে পরীক্ষায় দেখা গেল হৃৎপিণ্ড বেশ বড় হয়ে গেছে। ইকোকার্ডিওগ্রাম করে দেখা গেল হৃৎপিণ্ডের পর্দায় পানি জমেছে। রোগীটিকে আমি সরাসরি যক্ষ্মার ওষুধ প্রয়োগ করাতে জ্বর কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে গেল। এমন অনেক ঘটনা এবং অনেক অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের চিকিৎসকদের রয়েছে। এখানে যক্ষ্মার কিছু ভিন্ন ভিন্ন রূপের কথা উল্লেখ করলাম। যদিও আরো অনেক রোগ যেমন- ক্যান্সার, সারকয়ডোসিস রয়েছে যা বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হতে পারে। তবে যক্ষ্মার ব্যাপারে একজন চিকিৎসককে সব সময়ই মনের সন্দেহের জানালা খুলে রাখতে হবে। তা না হলে অনেক সময় অতি পরিচিত একটি রোগ নির্ণয় পর্দার আড়ালেই রয়ে যাবে। অথচ যক্ষ্মা এমনই একটা রোগ যা ওষুধ পরিপূর্ণ মাত্রায় খেলে এবং নিয়মিত খেলে রোগী সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়।

মাথাব্যথার চিকিত্সা

মাথাব্যথার চিকিত্সা


মাথাব্যথার সাময়িক চিকিত্সার জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়। কখনও কখনও শক্ত এনালজেসিক্স ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। মাইগ্রেন রোগীদের প্রতিষেধক হিসেবে দুশ্চিন্তা কমার ওষুধ (যেমন—ইন্ডেভার, ট্রেনকুলাইজার, পিজোটিফেন ইত্যাদি) দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ধরনের ওষুধ হঠাত্ বন্ধ করলে আবার মাথাব্যথার পুনরাবৃত্তি ঘটে। দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ ব্যবহার করলে মাথাব্যথার তীব্রতা ও অ্যাটাকের হার আস্তে আস্তে কমে যায় এবং এক সময় ব্যথামুক্ত অবস্থার সৃষ্টি হয়। তবে ওষুধের ব্যবহারের কারণে মাথাব্যথা দেখা দিলে সেক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করে বিকল্প ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যদি দীর্ঘমেয়াদে মাথাব্যথা থাকে এবং তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় তাহলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কোনো টিউমার আছে কিনা সেজন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত।

গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন মস্ত বড় জুলুম

গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন মস্ত বড় জুলুম

আজকের আধুনিক সভ্য সমাজে, তথাকথিত শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ও ভদ্র পরিবারে শিশু গৃহকর্মী বিশেষত কাজের মেয়েদের ওপর যেরকম অমানবিক আচরণ ও লোমহর্ষক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়, তা আইয়্যামে জাহেলিয়াতের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতাকেও বহুগুণে হার মানিয়েছে। জাহেলি যুগে দাস-দাসীদের সঙ্গে যেরকম নির্মম আচরণ করা হতো, তার চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় ভয়াবহ ও কঠোরতর আচরণ করা হয়। দুর্বল, অসহায়, নিরীহ গৃহকর্মীদের ওপর এমন জুলুম, হিংস্র আচরণ দেখে বোঝা যায় না কথিত শিক্ষিত ভদ্র গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা মানুষ নাকি দ্বিপদ জন্তু। নতুবা তাদের দৃষ্টিতে গৃহকর্মীরা মানুষ নয়, পশু। কাজের মেয়ে বা গৃহকর্মীকে যদি মানুষ মনে করা হয় তাহলে এ ধরনের ঘটনা মানুষ কীভাবে ঘটাতে পারে তা চিন্তা করাও কঠিন। শুধু মানুষ কেন, কোনো পশুর সঙ্গেও এ ধরনের আচরণকে মানুষ ও মনুষ্যত্বের অন্তর্ভুক্ত আচরণ বলা যায় না।
আজকাল পত্র-পত্রিকায় গৃহকর্মী, গার্মেন্টকর্মী বা বিভিন্ন কাজের লোকের ওপর নির্মম আচরণ, জুলুম-নির্যাতনের বিষয়টি নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে। গত ২৫ মে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় এরকম গৃহকর্মী নির্যাতনের তদন্ত প্রতিবেদনমূলক একটি সংবাদ ও ছবি দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। সংবাদটির কিছু অংশ পড়ার পর শরীরের পশম খাড়া হয়ে যায়, চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে পড়ে। মনে মনে চিন্তা করি, কোন যুগে আমরা বসবাস করছি! মানুষের ওপর মানুষ এত হিংস্র হয়? এত নিষ্ঠুর হয়? তাহলে বনের জীবজন্তুগুলো বেশি হিংস্র নাকি ‘শ্রেষ্ঠ মাখলুক’ মানুষ হিংস্র? সংবাদটির শিরোনাম ছিল : নির্যাতনে মৃত্যুর শিকার শিশু গৃহকর্মী, প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ৫ বছরে ৩৯৩টি মৃত্যু এবং মামলা হলেও তদন্ত হয়নি। নির্যাতনের ভয়াবহ মাত্রা অনুধাবনের জন্য সংবাদটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি, ‘বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে এসব শিশু নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়। কখনও বা ওরা বাড়ি ফেরে লাশ হয়ে, গৃহকর্তার বাড়িতে ওদের লাশ পাওয়া যায় কখনও ঝুলন্ত অবস্থায়। আবার কখনও বা রক্তাক্ত জখমের দায় এড়াতে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছে বলে চালানো হয়। কখনও উপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী শিশু ও নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, সচিব, পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং চিত্রনায়িকার বাড়িতেও ঘটেছে গৃহকর্মী নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না। বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী দরিদ্র অসহায় পরিবার। গৃহকর্মীর পায়ে শেকল বেঁধে আটকে রেখে খুন্তি দিয়ে সেঁকা দেয়া ও শরীর ক্ষতবিক্ষত করার লোমহর্ষক ঘটনা অহরহ ঘটছে। প্রায়ই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ও নারী গৃহকর্মী নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এমনকি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষিত এই নারী কখনও বা কলঙ্ক ঘোচাতে নিজেই জীবন বিসর্জন দেয়।’
সংবাদের উদ্ধৃত অংশটুকু পড়লে বোঝা যায়, মানুষ ও মনুষ্যত্বের অধঃপতন কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, মানবিক আচরণ ও স্বভাব-চরিত্র কত ভয়ঙ্কর হিংস্রতায় রূপ নিয়েছে। পশু ও পাশবিকতাও যেখানে হার মেনেছে, অধীনস্থ লোকদের ব্যাপারে ‘মানবতাবোধ’ কীভাবে দাফন হয়ে গেছে। কত বিচিত্ররূপে, কত নিষ্ঠুর পাশবিক কায়দায় মানব শ্রেণীর এই ‘দুর্বল অংশটির’ উপর নির্যাতন চলে তা ভাষায় বর্ণনা করাও মুশকিল। কোথায় শিক্ষা, কোথায় ধর্ম, কোথায় নীতি-নৈতিকতা, কোথায় সভ্যতা, মানবতা, কোথায় সুশাসন, বিচার ব্যবস্থা, মানবতাবোধ, মমত্ববোধ ও সাধারণ নৈতিকতাবোধ হারানোর মতো কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যাওয়া গৃহকর্মী খুন ও নির্যাতনের ঘটনাবলী নিঃসন্দেহে দেশ, সমাজ ব্যবস্থা ও মানবজাতির জন্য মহাসর্বনাশের সুস্পষ্ট সঙ্কেত। কিন্তু সরকার, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থার সামনেও মিডিয়ার প্রতিবাদী উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন বার বার এসব ঘটনা ঘটছে? আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে? অবশ্যই এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, তার কিছু কারণ এখানে উল্লেখ করছি :
এক. এসব নির্মম ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হল—কর্তৃত্ব ও প্রভুত্বমূলক আচরণের হিংস্র প্রয়োগ। কর্তা-কর্ত্রীর শক্তি ও ক্ষমতার দম্ভ সক্রিয় থাকে বেশি এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রের পাশবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে চরমভাবে। আর গৃহকর্মী মানুষের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও অক্ষমতাকে উগ্রভাবে শিকার করা হয়। যে কারণে তাদের প্রতি সীমা লঙ্ঘিত জুলুম-অত্যাচার বা অন্তত লঘু অপরাধে গুরুদণ্ডদানের ঘটনা খুব সহজেই ঘটতে থাকে। সাধারণ চড়-থাপ্পড় বা হঠাত্ রাগের বশবর্তী হয়ে করা কোনো আচরণের পর্যায়ে না থেকে অত্যাচারটা চলে হিংস্র কায়দায়। কথিত ‘অপরাধ’র শাস্তিটা চলে অসীম বর্বরতায়।
দুই. আরেকটি কারণ হলো কাজের লোক বা গৃহকর্মীদের দাস-দাসী মনে করা। প্রকৃত দাস-দাসী মনে করা না হলেও কাজে-কর্মে, আচার-আচরণে, দুর্ব্যবহারে, খানাপিনার ক্ষেত্রে দাস-দাসীর মতোই আচরণ করা হয়। মনে রাখতে হবে, কাজের লোক বা গৃহকর্মীরা কেউ দাস-দাসী নয়। ইসলাম চিরতরে দাসপ্রথার বিলুপ্ত সাধন করেছে। তাই এরা আমাদের মতোই স্বাধীন মানুষ, সব মানবিক অধিকারে সমান অংশীদার, এরা হলো মানবজাতির সে অংশ যারা সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত, দারিদ্র্য, অভাব-অনটনের কারণে, ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হয়ে বা অন্যের অধীনে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। যদি তাদের দাস-দাসী মেনে নেয়াও হয়, তবুও তারা কি এমন নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ পাওয়ার যোগ্য? কখনোই না। এই সুবিধাবঞ্চিত ও দুর্বল শ্রেণীর প্রতি যেন কোনো ধরনের অন্যায় অবহেলা করা না হয় বরং তাদের প্রতি যেন কোমল, বিনম্র আচরণ ও সদ্ব্যবহার করা হয়—ইসলাম বহুভাবে তার নির্দেশ দিয়েছে। তাদের হক যথাযথ আদায় করার তাগিদ দিয়েছে। ইসলাম বলেছে, তোমরা নিজেরা যা খাবে-পরবে, কাজের লোকদেরও তাই খেতে-পরতে দেবে। তাদের হক ও প্রাপ্যের ব্যাপারে অবহেলা বা ঠকানোকে জুলুম বলা হয়েছে।
তিন. কাজ উদ্ধারে বল প্রয়োগের নীতি অবলম্বন করা। কাজের লোক বা গৃহকর্মীদের থেকে কাজ আদায় করে নেয়ার জন্য তাদের উপর চাপ, প্রেসার, গালি-গালাজ, মানসিক আঘাত এমনকি চড়-থাপ্পড় ও মারধর পর্যন্ত করা হয়, আর এটাকে কাজের লোকদের থেকে কর্মোদ্ধার ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার ভালো কৌশল মনে করা হয়, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে এমন জঘন্য বর্বরতা পর্যায়ে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে ইসলাম ধর্মের প্রসঙ্গ যুক্ত না করলেও নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ ধরনের আচরণে মানবতা ও নৈতিকতার নাম-গন্ধও নেই। আর ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ তো বড় জালেমানা কৌশল।
চার. গৃহের অভ্যন্তরে চালানো এসব খুন-নির্যাতনের ঘটনার জন্য কোনো ধরনের জবাবদিহিতার যেমন প্রশ্ন উঠে না, তেমনি তাদের মনেও কোন ধরনের অপরাধবোধ জাগ্রত হয় না। আর যেসব ঘটনা মিডিয়া ও প্রশাসনের নজরে আসে সেগুলোও প্রভাবশালীদের ‘প্রভাব ও ক্ষমতা’ বলে বালির নিচে চাপা পড়ে যায়। বিচার ও শাস্তি উভয় থেকে শতভাগ নিশ্চিন্ত-নিরাপদ থাকে। ফলে এমন হিংস্র ও বর্বর খুন-নির্যাতন ও ন্যক্কারজনক ঘটনা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। আর দেশ, সমাজ ও মানবজাতির সম্মুখে নতুন জাহেলিয়াত, ধ্বংস ও বিপর্যয়ের ছায়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
ইসলামের আলোকে করণীয়
এক. মানব সমাজ ও পারিবারিক জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপকরণ মন্দ স্বভাব ও রুক্ষ মানসিকতা পরিত্যাগ করা। কারণ এর ভিত্তিতেই মানুষ অন্যের উপর জুলুম-নির্যাতন চালায়, খুন-খারাবির ঘটনা ঘটায়। তাই মন্দ স্বভাব ও জুলুম-অত্যাচার সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করতে হবে। সন্দেহ নেই, গৃহকর্মী বা যে কোনো কাজের লোকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, গালমন্দ, অত্যাচার-নির্যাতন তথা যে কোনো ধরনের অন্যায়-আচরণ জঘন্য অপরাধ ও বড় ধরনের জুলুম। জুলুম ও জুলুমকারীর পরিণতি সম্পর্কে কোরআনের বহু আয়াতে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অনুরূপভাবে হাদিস শরীফেও এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। গৃহকর্মীরা বা অধীনস্থ লোকদের উপর জুলুম-নির্যাতনের ক্ষেত্রে বান্দার হক বিনষ্টকরণ, ইজ্জত ও সম্মানহানির অভিযোগ বা অপরাধও সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত। দুনিয়ার জগতে জবাবদিহিতা, বিচারিক কার্যক্রম ও শাস্তির খড়গ হতে ‘ক্ষমতা’ বলে রেহাই পেলেও পরকালে এসব জুলুম-নির্যাতনের অবশ্যই বিচার হবে এবং পরিপূর্ণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, অবশ্যই কিয়ামতের দিন হকদারকে তার প্রাপ্য হক পরিশোধ করা হবে। এমনকি শিংবিশিষ্ট বকরী থেকে শিংবিহীন বকরীর প্রতিশোধ নেয়া হবে। মুসলিম শরীফ। অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জুলুম কিয়ামতের দিন জালেমের জন্য বহু অন্ধকার তথা মহাবিপদের কারণ হবে। বুখারি মুসলিম। নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালার যে কোনো শাস্তিই অনেক কঠিন ও খুবই ভয়াবহ। তাই এর থেকে বাঁচার জন্য অবশ্যই প্রথম করণীয় হলো—অধীনস্থ লোকদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন পরিত্যাগ করা।
দুই. গৃহকর্মী বা কাজের লোকদের সঙ্গে মায়া-মমতা ও ভালোবাসার আচরণ করা এবং তাদের সঙ্গে কঠোরতা ও রুক্ষ স্বভাব পরিহার করা। তাদের সঙ্গে কঠোরতার পরিবর্তে কোমলতা, বিনম্র প্রদর্শনের জন্য কোরআন হাদিসে বার বার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ইসলাম তাদের সঙ্গে স্নেহ ও অনুগ্রহ, সহমর্মিতা ও উত্তম ব্যবহারের শিক্ষা দিয়েছে। হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দয়াবান ব্যক্তিদের প্রতি আল্লাহ রাহমানুর রাহীম দয়া করেন। অতএব তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া কর, আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। তিরমিজি ও আবু দাউদ। মানুষের প্রতি দয়া না করলে আল্লাহও দয়া করেন না। যেমন এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা সেই ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করেন না, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করেন না। বুখারি মুসলিম। পক্ষান্তরে ইসলাম কঠোরতাকে নিন্দা করেছে এবং অকল্যাণের কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশাকে (রা.) উদ্দেশ করে আল্লাহর রাসুল বলেন, কোমলতা নিজের জন্য বাধ্যতামূলক করে নাও এবং কঠোরতা ও নির্লজ্জতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়া রাখ, বস্তুত যে জিনিসে নম্রতা ও কোমলতা থাকে সেটা তার শ্রীবৃদ্ধি করে। আর যে জিনিস থেকে তা প্রত্যাহার করা হয় সেটা ত্রুটিপূর্ণ হয়। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ কোমল। তিনি কোমলতাকে ভালোবাসেন। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কঠোর ও রুক্ষ স্বভাবের ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করবে না। আবু দাউদ। প্রকৃত কথা হলো—দয়া ও কোমলতার কারণে মানুষ অতিসহজেই আনুগত্যশীল হয়ে যায়। তখন কাজ আদায় করে নেয়াও সহজ হয়, যা কঠোরতার কারণে হয় না।
তিন. অধীনস্থ লোকদের ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারে শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমার দিককেই প্রাধান্য দেয়া। মানব জীবনের সৌন্দর্য, চারিত্রিক উত্কর্ষতা, পারস্পরিক হক আদায় ও অন্যায়-অনাচার থেকে বাঁচার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ক্ষমা প্রদর্শন। ক্ষমার গুণে গুণান্বিত হলে মানুষ আল্লাহ ও বান্দা সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষমাশীলদের জীবন কল্যাণ, খায়ের, বরকত ও পুণ্যতায় ভরে ওঠে। ক্ষমা করা মুত্তাকীর পরিচয়। ক্ষমা দুনিয়া-আখিরাতে মুক্তির চাবিকাঠি। আল্লাহতায়ালা মুত্তাকিদের পরিচয় বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্তুত, আল্লাহ সত্কর্মশীলদের ভালোবাসেন। সূরা আলে ইমরান-১৩৪। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কোরআনের আয়াত ‘মন্দকে ভালো দ্বারা দমন কর’। এর প্রকৃত মর্ম হলো—ক্রোধের সময় ধৈর্যধারণ করা এবং মন্দ ব্যবহার করা। ‘যখন মানুষ এই নীতি অবলম্বন করবে, তখন আল্লাহতায়ালা তাদের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং শত্রুদের এমনভাবে অনুগত করে দেবেন যেন তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বুখারি তা’লীক হিসেবে। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত, এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন—ইয়া রাসুলুল্লাহ আমরা কাজের লোককে কতবার ক্ষমা করব? রাসুলুল্লাহ চুপ থাকলেন। প্রশ্নকারী আবার জিজ্ঞেস করলেন, এবারও আল্লাহর রাসুল চুপ থাকলেন; তৃতীয়বার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা করবে। তিরমিজি, আবু দাউদ। ইসলামের শিক্ষা ও ক্ষমার আদর্শ যদি প্রতিটি পরিবারে প্রতিষ্ঠিত হয় তবে মানুষ মানুষের দ্বারা নির্যাতিত হবে না। খুন হবে না। বরং শান্তির পরিবেশ সর্বত্র কায়েম হবে।

খেদমতে খালক : আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ

খেদমতে খালক : আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ

খেদমত একটি সহজ ইবাদত। প্রবাদ আছে—‘খেদমতে খোদা মিলে’। কথাটি ভোরের সূর্যের মতোই সত্য। প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব কর্মক্ষেত্র থেকে তা করতে পারে। যে কোনো বয়সে যে কোনো ব্য³রি খেদমত করা যায়। আল্লাহতায়ালা খেদমতকারী ব্য³রি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। পরকালে তার জন্য রেখে দিয়েছেন জান্নাত। ইহকালেও মর্যাদার অন্ত নেই। আমাদের কাছে মাখদুমের কদর বেশি হলেও আল্লাহতায়ালার কাছে খাদেমের মূল্য বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) খেদমত সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্য³ িদুনিয়াতে কারও দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন, আল্লাহতায়ালা পরকালে তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন।’ খেদমতের ক্ষেত্রও অনেক। ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্যই খেদমত মহাপুণ্যের কাজ। মূলত এটিই হলো আল্লাহতায়ালাকে পাওয়ার সহজ উপায়।
পিতামাতা, গুরুজন ও আত্মীয়-স্বজনের খেদমত ছাড়াও কোনো পথিকের বোঝা উঠিয়ে দেয়া, বৃদ্ধ-দুর্বলকে সাহায্য করা, তার বোঝা বহন করা বা কোনো দুর্বল ব্য³ িট্রাফিক জ্যামে সড়ক পার হতে অক্ষম হলে তাকে সড়ক পার করে দেয়া, যদি কেউ বাসের অপেক্ষা করে অথবা ভিড়ের কারণে ধাক্কাধাক্কি ও চাপের মুখে পড়ে যায় তাহলে তাকে বাসে উঠিয়ে দিতে সাহায্য করা। যদি কোনো দুর্বল-বৃদ্ধলোক অথবা মহিলা বাসে উঠে সিট না পায়, তাহলে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে তাদের বসতে দেয়া। এমনিভাবে কোনো তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, কোনো অজ্ঞাত-অপরিচিত ব্য³কে পথের সন্ধান দেয়া, কলহে লিপ্ত দু’ব্য³রি মাঝে সন্ধি স্থাপন করে দেয়া—এসবই খেদমতে খলকের অন্তর্ভু³।
মানুষকে গোনাহ থেকে বাঁচানোও একটি খেদমত। এতে একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের নিয়ামতরাজি ভোগের সুযোগ করে দেয়া হয়, এর চেয়ে বড় খেদমত আর কি হতে পারে। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ গোনাহ করতে থাকে, তাহলে তার ওপর জোরজরবদস্তি করা বা করজোরে তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া কোনোটিই ঠিক নয়। কেননা অতিরি³ খোশামোদ ক্ষতি ও ঝগড়া-বিবাদের কারণ হতে পারে।
হাকিমুল উম্মত হজরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্বীয় ওস্তাদ হজরত শায়খুল হিন্দের (রহ.) এ ঘটনা বর্ণনা করেন, জনৈক ভদ্রলোক লক্ষেষ্টৗ থেকে হজরত শায়খুল হিন্দের (রহ.) খেদমতে উপস্থিত হলো। আর ওই ভদ্রলোকটি হলো একজন হিন্দু বেনিয়া। সে হিন্দু এবং তার সঙ্গে আগের কোনো সম্পর্কও ছিল না। এতদসত্ত্বেও বেনিয়াকে তার গৃহে আশ্রয় দিলেন এবং মেহমানদারী করলেন।
রাতে বারান্দায় একটি খাটে থাকার ব্যবস্থা করলেন। প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তাহাজ্জুদের সময় যখন ঘুম ভাঙল তখন এক অভিনব দৃশ্য দৃষ্টিগোচর করি। তাহলো হিন্দু ব্য³টি শুয়ে আছে আর হজরত শায়খুল হিন্দ (রহ.) তার পা দাবিয়ে দিচ্ছেন। ভদ্রলোক উঠে যেতে চাইলেও তিনি তাকে উঠতে দিচ্ছেন না। তবুও অন্যরকম এক অস্থিরতায় শেষ পর্যন্ত উঠেই পড়ল। মেহমানদের অন্য একজন এসে তাকে বললেন, হজরত আপনি এ কি করছেন! হজরত (রহ.) বললেন, সে আমার মেহমান। তার খেদমতের দায়িত্ব আমারই। দেখুন! একজন হিন্দু কাফেরের সঙ্গেও তাঁর আচরণ কেমন ছিল।
খেদমতে খালকের মাঝে কোনো বাদানুবাদ ও বিভাজন নেই। শুধু মানবতা ও মনুষ্যত্বের ভিত্তিতেই খেদমত করা উচিত। ইসলামে কাফেরদের অনুসরণ করা নিষেধ। তাদের ভ্রান্ত কাজে সম্পৃ³তাও নিষেধ। কিন্তু যেসব কাফেরের সঙ্গে মুসলমানদের নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ নেই, তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে নিষেধ নেই। বরং তা সওয়াবের কাজ। এতে আল্লাহতায়ালাও খুশি হন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্য³ িদুনিয়াতে কোনো মুমিনের কাজকর্ম সহজ করে দেয়, আল্লাহতায়ালা ইহকালে ও পরকালে তার যাবতীয় বিষয়াদি সহজ করে দেবেন।’ তিনি দুনিয়াতে মানুষের সহায় হওয়ার কারণেই এ পুরস্কার লাভ করবেন।
প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্য³ত্বি ডা. আবদুল হাই আরেফী (রহ.) বিভিন্ন সময় একথা বলতেন যে, আমি তোমাদের একটি বড় সাফল্যের কথা বলব, যা তোমাদের অনেকেরই জানা নেই। এটা এমন এক সাফল্য বা মর্যাদা, যা অর্জনে তোমাদের কেউ হিংসায় জ্বলে উঠবে না। আর ফজিলত—তা মানুষকে সোজা জান্নাতে নিয়ে যায়। সেই সাফল্য বা মর্যাদাটি হলো তুমি কারও খাদেম হয়ে যাও। এ মর্যাদার জন্য কেউ তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসবে না। কেউ কেড়ে নিতে চাইবে না যে, এটি আমাকে দিয়ে দাও। কেউ প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠবে না। কেউ শত্রুতে পরিণত হবে না। কেননা এগুলো ‘মাখদুম’ বা খেদমত গ্রহণ করার কারণে হয়ে থাকে। খাদেম হওয়াতে ঝগড়ার কোনো অবকাশ নেই। তাহলে দেখবে কেউ তোমার মোকাবিলায় অবতীর্ণ হবে না। বরং তুমি সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যাবে।
সর্বোপরি এটি একটি ইবাদত। এর নগদ একটি ফায়দা এই, যে ব্য³ িখেদমত করবে হিংসা-বিদ্বেষ ও অহঙ্কার তার কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। যদি কখনও অহঙ্কার এসে যায়, তখন সামান্য খেদমতের দ্বারাই তা দূর হয়ে যাবে। সুতরাং খেদমতে খালক অহঙ্কার দমনের এক মহৌষধ।
প্রত্যেকেরই নিজস্ব অবস্থানে থেকে খেদমতের জন্য লেগে যাওয়া জরুরি। আইনজীবীদের উচিত, আইন মারফত মাজলুমদের সাহায্য করা। তাদের মামলা-মোকদ্দমায় বিনা পারিশ্রমিকে সহায়তা করা। ডা³ারদের উচিত, প্রাথমিক ওষুধপত্রের মাধ্যমে সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। ফ্রি চিকিত্সার ব্যবস্থা করা এবং অতিরি³ ফি না নেয়া। এরকম প্রতিটি অঙ্গনের মানুষেরই নিজ নিজ পরিসরে খেদমতের সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে অন্যের সেবায় কিছু করার তাওফিক দান করুন।

ক্যান্সার প্রতিরোধে ভেষজ

ক্যান্সার প্রতিরোধে ভেষজ

 

গ্রিন টি মুখের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে সম্প্রতি ক্যান্সার প্রিভেনশন রিসার্চ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, গ্রিন টি মুখের ক্ষত যা পরে ক্যান্সারে পরিণত হয় তা থেকে মুখকে রক্ষা করতে পারে।

৪১ জন রোগীর ওপর একটি পরীক্ষা করা হয় যাদের প্রত্যেকের মুখে প্রিম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে এমন) ক্ষত আছে। এদেরকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে ভিন্ন ঘনত্বের গ্রিন টির নির্যাস খেতে দেয়া হয় দিনে তিনবার ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত। পরীক্ষা শেষে দেখা যায় যাদের বেশি ঘনত্বের গ্রিন টির নির্যাস দেয়া হয়েছিল তাদের মুখের ক্ষত ৫৮.৮ শতাংশ ভালো হয়েছে এবং পুরনো ক্ষত আর বৃদ্ধি পায়নি। যারা কম ঘনত্বের নির্যাস গ্রহণ করেছে তাদের ৩৬.৪ শতাংশ ক্ষত প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং প্লাসিবো বা কিছুই দেয়া হয়নি যাদের তাদের ১৮.২ শতাংশ উন্নতি হয়েছে।

মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গ্রিন টির এটিই প্রথম পরীক্ষা যা থেকে মুখের ক্ষত প্রতিরোধ করার প্রমাণ পাওয়া যায়। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে গ্রিন টির ক্যান্সার রোধ করার ক্ষমতা আরো গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হবে।

সয়াবিন ও হলুদ প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

অতি সম্প্রতি আমেরিকার একদল গবেষক সয়াবিনে বিদ্যমান সয়া আইসোফ্ল্যাভোন ও হলুদে বিদ্যমান কুরকুমিনের প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার প্রতিরোধী গুণের উন্মোচন করেন। বিস্তার ও মৃতুøর হারের দিক থেকে সর্বপ্রকার ক্যান্সারের মধ্যে প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সারের অবস্থান চতুর্থ। আর তাই এর ভয়াবহতা রোধ খুবই জরুরি। বিজ্ঞানীরা বলেন, সয়াবিনে বিদ্যমান সয়া আইসোফ্ল্যাভোন ও হলুদে বিদ্যমান কুরকুমিন যৌথভাবে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী জিনের কার্যকারিতা বন্ধ করার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে।

আমেরিকার ওই গবেষকদল প্রথমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাবের ওপর তথ্য সংগ্রহ করেন। তারা লক্ষ করেন এশিয়া মহাদেশের অধিবাসীদের মধ্যে এই ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব কম এবং পাশাপাশি তারা এ বিষয়টিও লক্ষ করেন যে, এ মহাদেশের লোকজন সয়াবিন ও হলুদ বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে থাকে। আর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গবেষকেরা ধারণা করেন যে, সম্ভবত অধিক সয়াবিন ও হলুদ গ্রহণই এশিয়ানদের মধ্যে প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

আর এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা তাদের গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন। গবেষকরা গবেষণাগারে চাষ (কালচার) করা ক্যান্সার কোষের ওপর সয়াবিন থেকে প্রাপ্ত সয়া আইসোফ্ল্যাভোন ও হলুদ থেকে প্রাপ্ত কুরকুমিন যৌথ ও আলাদা আলাদাভাবে প্রয়োগ করেন। তারা দেখতে পান যে, ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ ও স্বাভাবিক মৃতুø ঘটাতে (অহসহয়সঢ়মঢ়) সয়া আইসোফ্ল্যাভোন ও কুরকুমিনের যৌথ প্রয়োগ আলাদা আলাদা প্রয়োগ করা অপেক্ষা অনেক বেশি কার্যকর।

বিজ্ঞানীরা বলেন, সয়াবিনে বিদ্যমান সয়া আইসোফ্ল্যাভোন ও হলুদে বিদ্যমান কুরকুমিন ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর কাপ্পা বি (ঘঋ-কই)-এর কার্যকারিতা বন্ধ করার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। তাই প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার প্রতিরোধে আমাদের সয়াবিন দিয়ে তৈরী খাবার ও কুরকুমিন সমৃদ্ধ হলুদ খাওয়া উচিত। আমরা যদি প্রতিদিন অল্প পরিমাণ কাঁচা হলুদ খাই তবে তা হতে পারে প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সারসহ সর্বপ্রকার ক্যান্সার ও অন্যান্য জটিল রোগ প্রতিরোধের এক অনন্য হাতিয়ার।

সর্বপ্রকার কপিজাতীয় সবজি প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক

প্রোস্টেট ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তারের ওপর পরিচালিত এক গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা বলেন, কেউ যদি নিয়মিতভাবে সপ্তাহে অন্তত এক বেলা কপিজাতীয় সবজি (ফুলকপি, বাধাকপি, ব্রকলি) খায় তবে তার প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার ঝঁুকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে কালচার (চাষ) করা প্রোস্টেট ক্যান্সার কোষের ওপর এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত বিভিন্ন প্রাণীদেহে কপিজাতীয় সবজির নির্যাস প্রয়োগ করার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, কপিজাতীয় সবজিতে বিদ্যমান আইসোথায়োসায়ানেট নামক জৈব রাসায়নিক উপাদানটি প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিককালে গবেষকরা এক বছর ধরে মানবদেহেও কপিজাতীয় সবজির প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধী কার্যকারিতার ওপর এক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেন।

এ গবেষণার প্রথম ধাপে কিছুসংখ্যক লোককে (পুরুষ) দু’টি দলে ভাগ করেন। এক দলকে কপিজাতীয় খাবার খেতে দেন এবং অপর দলকে মটরসমৃদ্ধ খাবার খেতে দেন। এই গবেষণাটি এক বছর সময় নিয়ে পরিচালিত হয়। এ গবেষণার শুরুতে গবেষণা চলাকালীন এবং গবেষণার শেষে সবার প্রোস্টেটের বায়োপসি করা হয় এবং তাদের প্রোস্টেটে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী জিনের কার্যকারিতা দেখা হয়। গবেষকরা এ গবেষণায় দেখতে পান যে, যারা নিয়মিত কপিজাতীয় খাবার গ্রহণ করেছিলেন তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সার ও প্রদাহ সৃষ্টিকারী জিনের কার্যকারিতার তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল, যা প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।

এ গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গবেষকরা বলেন, যারা নিয়মিত কপিজাতীয় সবজি খাবে তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সারসহ অন্যান্য জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

ব্রকলি ব্রেস্ট ক্যান্সারের স্টেম সেলের বৃদ্ধি রোধ করে

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সালফোরাফেন নামে একটি যৌগ যা ব্রকলি এবং ব্রকলি স্প্রাউটে পাওয়া যায়, এই যৌগটি ক্যান্সার স্টেম সেল ধ্বংস করতে পারে। কেমোথেরাপির সাহায্যে যে সব ক্যান্সার স্টেম সেল ধ্বংস হয় না কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য একটি ব্যাপার হলো ব্রকলির সালফোরাফেন ব্রেস্ট ক্যান্সার সেলের পুনরুৎপাদন, বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধ করতে পারে।

ডুক্সিন সুন, পিএচডি এবং তার সহকর্মীরা ব্রকলির নির্যাস সালফোরাফেনের বিভিন্ন মাত্রার ইনজেকশন পুশ করেন মানুষের ব্রেস্ট ক্যান্সার টিউমার সেল সংযুক্ত ইঁদুরদের। পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, টিউমারের স্টেম সেলের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং স্বাভাবিক সেল কোনো রকম আক্রান্ত হয়নি। আরো দেখা যায়, ক্যান্সার-আক্রান্ত প্রাণী যারা সালফোরাফেন গ্রহণ করেছে, তাদের কোষ নিয়ে অন্য সুস্থ প্রাণীকে আক্রান্ত করার পর তাদের দেহে টিউমার সেল বৃদ্ধি পায়নি।

অতীতের গবেষণা থেকে ক্যান্সারের ওপর সালফোরাফেনের প্রভাব সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু এই নতুন গবেষণা থেকে দেখা যায়, ব্রেস্ট ক্যান্সার স্টেম সেলের বৃদ্ধিকে সালফোরাফেন বাধা দেয়।

%d bloggers like this: