সন্তানের হক

সন্তানের হক

নবী করিম সাঃ বলেছেন, প্রত্যেক নবজাতক তার স্বভাবজাত ধর্ম ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে [সহি বুখারি] । আমাদের সমাজব্যবস্থা দিন দিন যেভাবে অপসংস্কৃতি, অনৈতিকতা এবং চরিত্রবিধ্বংসী কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের সন্তানের ওপর যেসব দায়িত্ব আছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সন্তানকে লালন-পালন করা ঈমানের অন্যতম দাবি। আমাদের ওপর সন্তানদের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করা হলোঃ

১. কানে আজান দেয়াঃ সন্তান দুনিয়াতে আসার পর গোসল দিয়ে পরিষ্কার করে তার ডান কানে আজান দেয়া, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এটি বাবা-মায়ের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছে দেয়া এবং ওঁৎ পেতে থাকা শয়তান যাতে তার কোনো ক্ষতি না করতে পারে। হাদিসে এসেছে, আবু রাফে রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাঃ-কে হাসান ইবনে আলীর কানে আজান দিতে দেখেছি [সুনানে আবু দাউদ] ২. সুন্দর নাম রাখাঃ শিশুর জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাম অর্থবহ হওয়া নামের সৌন্দর্য। । কেননা হাদিসে এসেছে, আবু দারদা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের সুন্দর নাম রাখো। [মুসনাদে আহমাদ] ৩. আকিকা করাঃ ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো­ সন্তানের আকিকা করা । ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আল্লাহর নামে জবেহ করা, তবে ছেলের পক্ষ থেকে একটি দিলেও চলবে। এর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা করা সুন্নাহ পদ্ধতি নয়। হাদিসে এসেছে, সামুরা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, সব নবজাতক তার আকিকার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ওই দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। [সুনানে আবু দাউদ] ৪. সদকাহ করাঃ ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নত। আলী রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ হাসান রাঃ-এর পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা! তার মাথা মুণ্ডন করো এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করো [সুনান আততিরমিজি]। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাঃ শিশুদেরকে খেজুর দিয়ে তাহনিক এবং বরকতের জন্য দোয়া করতেন [সহি বুখারি ও মুসলিম]। ৫. খতনা করাঃ ছেলেদের খতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নত। হাদিসে এসেছে, জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ হাসান এবং হুসাইন রাঃ-এর সপ্তম দিবসে আকিকা এবং খতনা করিয়েছেন [সুনানে আততিরমিজি]। ৬. তাওহিদ শিক্ষা দেয়াঃ শিশু যখন কথা বলা আরম্ভ করবে তখন থেকেই আল্লাহর তাওহিদ শিক্ষা দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাঃ মায়াজ বিন জাবাল রাঃ-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘সর্বপ্রথম তুমি তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার তাওহিদের শিক্ষা দেবে’ [সহি বুখারি]। ৭. কুরআন শিক্ষা দানঃ ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা কুরআন শিক্ষা করা ফরজ। আলী রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও [জামিউল কাবির]। কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। ৮. সালাত শিক্ষা দেয়া ও সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করাঃ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যে, বাবা-মা তার সন্তানকে সালাত শিক্ষা দেবেন এবং সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করাবেন। হাদিসে এসেছে, নবী সাঃ ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সালাতের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য মৃদু প্রহার করো [সুনানে আবু দাউদ]। ৯. আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানদের আচরণ শিক্ষা দেয়া বাবা-মায়ের ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বললেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর জমিনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, তোমার আওয়াজ নিচু করো; নিশ্চয় সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ’ [সূরা লুকমান ১৮, ১৯]। ১০. আদর স্নেহ ও ভালোবাসা দেয়াঃ সন্তানদের স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে হবে। আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ হাসান ইবনে আলী রাঃ-কে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস রাঃও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমার তো দশটি সন্তান, কিন্তু আমি তো কখনো আমার সন্তানদেরকে আদর স্নেহ করিনি। রাসূলে করিম সাঃ তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যে অন্যের প্রতি রহম করে না, আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না [সহি বুখারি]। ১১. দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়া ফরজ করা হয়েছে। কারণ দ্বীনি ইলম না জানা থাকলে সে বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হাদিসে এসেছে, আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ [সুনানে ইবনে মাজাহ]। ১২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করাঃ সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে। উম্মে সালামাহ রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ-কে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আবু সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি এতে আমার জন্য কী প্রতিদান রয়েছে? নবী সাঃ বললেন, হঁ্যা যত দিন তুমি খরচ করবে তত দিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে (সহি বুখারি)। ১৩. সক্ষম করে তোলাঃ সন্তানদের এমনভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলা, তারা যেন উপার্জন করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে । সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ আমাকে এভাবে বলেছেন, তিনি তোমাদের সন্তানসন্ততিদের সক্ষম ও স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম [সহি বুখারি]। ১৪. বিবাহ দেয়াঃ সুন্নাহ পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়া এবং বিবাহের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহের ব্যবস্থা করা। আবু হুরায়রা রাঃ থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই বাবার ওপর সন্তানের হকের মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দেবে [জামিউল কাবির]। ১৫. দ্বীনের পথে পরিচালিত করাঃ বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো, সন্তানদের দ্বীনের পথে, কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালনা করা, দ্বীনের বিধান পালনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ত করে তোলা। কুরআনে এসেছে, ‘বলো, এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’ [সূরা-ইউসুফঃ ১০৮]। সন্তানকে দ্বীনের পথে পরিচালনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। ১৬. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করাঃ সন্তানেরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে ইনসাফ আশা করে এবং তাদের মাঝে ইনসাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবী সাঃ এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো’ [সহি বুখারি ও মুসলিম]। ১৭. ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে বিরত রাখাঃ ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে তাদেরকে বিরত না রাখলে এই সন্তানরাই কিয়ামতে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কুরআনে এসেছে, হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও [সূরা তাহরিম-৬]। আর কাফেররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয় [সূরা হা-মীম আসসিজদাহ-২৯]। ১৮. পাপকাজ, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, অপসংস্কৃতি থেকে বিরত রাখাঃ সন্তান দুনিয়ায় আসার সাথে সাথে শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং বিভিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে, পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে, বিভিন্ন ফ্যাশনে, বিভিন্ন ডিজাইনে, বিভিন্ন শিক্ষার নামে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাই বাবা-মাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও

সন্তান­সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। আর যদি তোমরা মার্জনা করো, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু [সূরা তাগাবুন-১৪]। হাদিসে এসেছে, ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন [সহি বুখারি]। আবদুল্লাহ বিন আমর রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে [সুনানে আবু দাউদ]। ১৯. দোয়া করাঃ আমাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে­ আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন [সূরা আলফুরকান-৭৪]। জাকারিয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’ [সূরা আলে ইমরান-৩৮]।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: