সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে সাম্য ও সমতা সম্পর্কীয় যে উচ্চতর দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়, মানব জাতির অতীত কিংবা বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোথাও তা দেখা যায় না। ইসলাম সবাইকে অন্যায়-অবিচার, খুন খারাবি, সন্ত্রাস ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কুরআনুল কারিম মানবগোষ্ঠীকে জন্মগতভাবে সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। আর তোমাদের মধ্যে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকি।’ (আল-কুরআন, ৪৯ঃ ১৩)

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী সাঃ ঘোষণা করেছেন, ‘কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব। কোনো কালোর ওপর কোনো সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো সাদার ওপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব, তবে তাকওয়া ছাড়া।’ (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া)। তিনি আরো বলেছেন, ‘সব মানুষই আদমের সন্তান এবং আদম মাটির সৃষ্টি। হে আদম সন্তান, আজকের এই দিন, এই মাস, এই নগরী যেমন তোমাদের কাছে মর্যাদাসম্পন্ন, ঠিক তেমনিভাবে তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধনসম্পত্তিও মর্যাদাসম্পন্ন। মনে রেখো আঁধার যুগের সব নীতি, সব আচরণ আজ আমি পদতলে দলিত করছি। অজ্ঞতার যুগের রক্তপাত এবং তার প্রতিশোধের সব ঘটনা আজ থেকে বিস্মৃত হয়ে যাবে। সর্বপ্রথম আমি আমার পিতৃব্য ভ্রাতা ইবন রাবিয়া বিন হারিসের খুনের দাবি প্রত্যাহার করছি।’

কুরআন ও মহানবীর সাঃ বাণীর আলোকে সব মানুষ আইনের চোখে সমান মর্যাদার অধিকারী। রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলাম সমগ্র মানব জাতিকে এক সমতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। আর ঈমান ও ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে মুসলমানদের পরস্পর ভাই ভাই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছে। এরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় মু’মিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (আল-কুরআন, ৪৯ঃ ১০)

মহানবী সাঃ যে ইসলাম ধর্মের জয়গান ও প্রচার করেছেন তা ঝগড়া-বিবাদ, অন্যায়-অবিচার, খুন-খারাবি ও সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্বভ্রাতৃত্বের ধর্ম। এ এমন এক ধর্ম যেখানে জাতি-ধর্ম, ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় সব ভেদাভেদ মানুষের চিন্তা ও চেতনা থেকে মুছে ফেলার কথা বলা হয়েছে। তিনি বুদ্ধিমত্তার সাথে সামাজিক অসমতা দূর করেন, নারীদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেন, ক্রীতদাসদের অবস্থার উন্নতি বিধান করেন এবং মদ্যপান, জুয়া, রক্তপাত প্রভৃতি অসামাজিক প্রথা কঠোরহস্তে দমন ও দূর করে সামাজিক ও নৈতিক সংস্কার সাধন করেন। মানব জাতির মুক্তি, সবার মধ্যে সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা ছিল তার লক্ষ্য এবং আন্তরিকতা, সত্যনিষ্ঠা ও সততা ছিল তার জীবনের ব্রত।

ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এর মাঝেই শান্তি ও নিরাপত্তার অনাবিল সুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত। অন্যায়-অবিচার প্রশ্রয় পাওয়ার কিছুই তাতে নেই। স্থানমাফিক অবশ্যই তাতে কঠোরতা বিদ্যমান।

সাম্য প্রতিষ্ঠায় কোনো বাধা-বিপত্তি এলে প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের দু’টি দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে, অতঃপর তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে।’ (আল কুরআন, ৪৯ঃ ৯) অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার স্থান জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লানত করবেন ও তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।’ (আল কুরআন, ৪ঃ ৯৩)

হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত মহানবী সাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিল্লাতে ইসলামের অনুসরণ করে না বরং মুসলিম জামাত থেকে পৃথক হয়ে যায়, সে যদি এ অবস্থায় মারা যায় তবে সেটা কুফরি যুগের মৃতুø বিবেচিত হবে।’

সাম্য ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম সর্বদাই সন্ত্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সন্ত্রাস লালন-পালন, আশ্রয় দেয়নি কখনো। সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব বিনির্মাণে ইসলাম যে ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয়েছে ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণ অর্থাৎ গুণ ও কর্মের দ্বারা, বংশ গৌরব, ধনদৌলত, রাজনৈতিক ক্ষমতা বা পেশা দ্বারা নয়। ইসলাম সবাইকে সন্ত্রাসের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

মহানবী সাঃ সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব উপহার দিতে গিয়ে সাম্য, মৈত্রী, শান্তিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার বাণী শুনিয়েছিলেন, ন্যায় ও সদয় ব্যবহারে তার কাছে কখনো স্বধর্মী-বিধর্মী বিচার ছিল না। তাঁর পিতৃব্য আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু মহানবী সাঃ সব সময় তার সাথে পরম সদ্ভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছেন। হজরত বিধর্মী অতিথির মল-মূত্র স্বহস্তে ধৌত করেছেন। ইসলামের অতি বড় শত্রুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়েছেন। ইহুদি ও খ্রিষ্টানের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। অনেক সময় তাঁর মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করেছে। তিনি সবার সাথে সমভাবে মিলেমিশে সর্বপ্রকার দায়িত্ব পালন করেছেন। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় সাহাবিদের সাথে মাটি কেটেছেন এবং মাটির বোঝা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। এক সাহাবিকে তার ভৃত্যদের প্রহার করতে দেখে মহানবী সাঃ তাকে বললেন, ‘সে তোমার ভাই, তুমি যা খাও তাই তাকে খেতে দিও। তুমি যা পরিধান করবে তাই তাকে পরিধান করাও।’

মদিনায় হিজরতের পর মহানবী সাঃ আউস ও খাজরাজ গোত্রের শতাব্দীর বিবাদ ভুলিয়ে দেন এবং তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। (আল কুরআন, ৩ঃ ১৩)

ইসলামে সব মানুষের ধন-প্রাণের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মবিকাশের সুযোগ সুবিধা, শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপন এবং মানুষের প্রকৃত কল্যাণের সুব্যবস্থা রয়েছে।

সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেন্টক্যাথেরিন মঠের সাধু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে মহানবী সাঃ তাদের জীবন, ধর্ম ও সম্পদ রক্ষার যে সনদ প্রদান করেন, তা নিজ ধর্মের রাজাদের কাছ থেকেও তারা কখনো পাননি।

সনদের মূল কথা ছিলঃ ‘তাদের (অমুসলিম) শত্রুকে প্রতিরোধ করা হবে। ধর্ম পরিবর্তনে তাদের বাধ্য করা হবে না, তাদের ধন-প্রাণ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিষয়-সম্পত্তি সবই নিরাপদ থাকবে। তাদের স্থাবর-অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি তাদের অধিকারে থাকবে। তাদের পাদ্রী, পূজারী ও পুরোহিত কাউকেও বরখাস্ত করা হবে না এবং তাদের ক্রুশ ও দেবদেবীর মূর্তি বিনষ্ট করা হবে না। তারা নিজেও অত্যাচার করবে না এবং তাদের প্রতিও অত্যাচার করা হবে না। অজ্ঞতার যুগে রক্তের পরিবর্তে রক্ত নেয়ার যে প্রথা ছিল তা তারা পালন করতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে কোন ‘উশর’ (সম্পদের এক দশমাংশ) গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের সৈন্যবাহিনীর কোনো রশদ জোগাতে হবে না।’

তিনি আরো বলতেন, ‘যে ব্যক্তি জিম্মির প্রতি অন্যায় ব্যবহার করবে এবং সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেবে আমি পরলোকে তার জন্য অভিযোগকারী হবো।’

এ জন্যই Encyclopaedia of Religion and Ethics-এ বলা হয়েছে, The recognition of rival religious system as possessing a Divine revelation gave to Islam from the outset a theological basis for the toleration of non-Muslim.

এভাবেই ইসলাম মানুষকে সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে সমাজের সর্বত্র শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপন করেছে। জনগণের জানমাল, ইজ্জত আব্রুও হিফাজতের দায়িত্ব ও বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মানুষের আর্থিক দুর্গতি দূরীভূত করার সব বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: