খেদমতে খালক : আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ

খেদমতে খালক : আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ

খেদমত একটি সহজ ইবাদত। প্রবাদ আছে—‘খেদমতে খোদা মিলে’। কথাটি ভোরের সূর্যের মতোই সত্য। প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব কর্মক্ষেত্র থেকে তা করতে পারে। যে কোনো বয়সে যে কোনো ব্য³রি খেদমত করা যায়। আল্লাহতায়ালা খেদমতকারী ব্য³রি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। পরকালে তার জন্য রেখে দিয়েছেন জান্নাত। ইহকালেও মর্যাদার অন্ত নেই। আমাদের কাছে মাখদুমের কদর বেশি হলেও আল্লাহতায়ালার কাছে খাদেমের মূল্য বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) খেদমত সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্য³ িদুনিয়াতে কারও দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন, আল্লাহতায়ালা পরকালে তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন।’ খেদমতের ক্ষেত্রও অনেক। ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্যই খেদমত মহাপুণ্যের কাজ। মূলত এটিই হলো আল্লাহতায়ালাকে পাওয়ার সহজ উপায়।
পিতামাতা, গুরুজন ও আত্মীয়-স্বজনের খেদমত ছাড়াও কোনো পথিকের বোঝা উঠিয়ে দেয়া, বৃদ্ধ-দুর্বলকে সাহায্য করা, তার বোঝা বহন করা বা কোনো দুর্বল ব্য³ িট্রাফিক জ্যামে সড়ক পার হতে অক্ষম হলে তাকে সড়ক পার করে দেয়া, যদি কেউ বাসের অপেক্ষা করে অথবা ভিড়ের কারণে ধাক্কাধাক্কি ও চাপের মুখে পড়ে যায় তাহলে তাকে বাসে উঠিয়ে দিতে সাহায্য করা। যদি কোনো দুর্বল-বৃদ্ধলোক অথবা মহিলা বাসে উঠে সিট না পায়, তাহলে নিজের সিট ছেড়ে দিয়ে তাদের বসতে দেয়া। এমনিভাবে কোনো তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, কোনো অজ্ঞাত-অপরিচিত ব্য³কে পথের সন্ধান দেয়া, কলহে লিপ্ত দু’ব্য³রি মাঝে সন্ধি স্থাপন করে দেয়া—এসবই খেদমতে খলকের অন্তর্ভু³।
মানুষকে গোনাহ থেকে বাঁচানোও একটি খেদমত। এতে একজন মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের নিয়ামতরাজি ভোগের সুযোগ করে দেয়া হয়, এর চেয়ে বড় খেদমত আর কি হতে পারে। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ গোনাহ করতে থাকে, তাহলে তার ওপর জোরজরবদস্তি করা বা করজোরে তা থেকে পিছিয়ে যাওয়া কোনোটিই ঠিক নয়। কেননা অতিরি³ খোশামোদ ক্ষতি ও ঝগড়া-বিবাদের কারণ হতে পারে।
হাকিমুল উম্মত হজরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্বীয় ওস্তাদ হজরত শায়খুল হিন্দের (রহ.) এ ঘটনা বর্ণনা করেন, জনৈক ভদ্রলোক লক্ষেষ্টৗ থেকে হজরত শায়খুল হিন্দের (রহ.) খেদমতে উপস্থিত হলো। আর ওই ভদ্রলোকটি হলো একজন হিন্দু বেনিয়া। সে হিন্দু এবং তার সঙ্গে আগের কোনো সম্পর্কও ছিল না। এতদসত্ত্বেও বেনিয়াকে তার গৃহে আশ্রয় দিলেন এবং মেহমানদারী করলেন।
রাতে বারান্দায় একটি খাটে থাকার ব্যবস্থা করলেন। প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তাহাজ্জুদের সময় যখন ঘুম ভাঙল তখন এক অভিনব দৃশ্য দৃষ্টিগোচর করি। তাহলো হিন্দু ব্য³টি শুয়ে আছে আর হজরত শায়খুল হিন্দ (রহ.) তার পা দাবিয়ে দিচ্ছেন। ভদ্রলোক উঠে যেতে চাইলেও তিনি তাকে উঠতে দিচ্ছেন না। তবুও অন্যরকম এক অস্থিরতায় শেষ পর্যন্ত উঠেই পড়ল। মেহমানদের অন্য একজন এসে তাকে বললেন, হজরত আপনি এ কি করছেন! হজরত (রহ.) বললেন, সে আমার মেহমান। তার খেদমতের দায়িত্ব আমারই। দেখুন! একজন হিন্দু কাফেরের সঙ্গেও তাঁর আচরণ কেমন ছিল।
খেদমতে খালকের মাঝে কোনো বাদানুবাদ ও বিভাজন নেই। শুধু মানবতা ও মনুষ্যত্বের ভিত্তিতেই খেদমত করা উচিত। ইসলামে কাফেরদের অনুসরণ করা নিষেধ। তাদের ভ্রান্ত কাজে সম্পৃ³তাও নিষেধ। কিন্তু যেসব কাফেরের সঙ্গে মুসলমানদের নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ নেই, তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে নিষেধ নেই। বরং তা সওয়াবের কাজ। এতে আল্লাহতায়ালাও খুশি হন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্য³ িদুনিয়াতে কোনো মুমিনের কাজকর্ম সহজ করে দেয়, আল্লাহতায়ালা ইহকালে ও পরকালে তার যাবতীয় বিষয়াদি সহজ করে দেবেন।’ তিনি দুনিয়াতে মানুষের সহায় হওয়ার কারণেই এ পুরস্কার লাভ করবেন।
প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্য³ত্বি ডা. আবদুল হাই আরেফী (রহ.) বিভিন্ন সময় একথা বলতেন যে, আমি তোমাদের একটি বড় সাফল্যের কথা বলব, যা তোমাদের অনেকেরই জানা নেই। এটা এমন এক সাফল্য বা মর্যাদা, যা অর্জনে তোমাদের কেউ হিংসায় জ্বলে উঠবে না। আর ফজিলত—তা মানুষকে সোজা জান্নাতে নিয়ে যায়। সেই সাফল্য বা মর্যাদাটি হলো তুমি কারও খাদেম হয়ে যাও। এ মর্যাদার জন্য কেউ তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসবে না। কেউ কেড়ে নিতে চাইবে না যে, এটি আমাকে দিয়ে দাও। কেউ প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠবে না। কেউ শত্রুতে পরিণত হবে না। কেননা এগুলো ‘মাখদুম’ বা খেদমত গ্রহণ করার কারণে হয়ে থাকে। খাদেম হওয়াতে ঝগড়ার কোনো অবকাশ নেই। তাহলে দেখবে কেউ তোমার মোকাবিলায় অবতীর্ণ হবে না। বরং তুমি সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যাবে।
সর্বোপরি এটি একটি ইবাদত। এর নগদ একটি ফায়দা এই, যে ব্য³ িখেদমত করবে হিংসা-বিদ্বেষ ও অহঙ্কার তার কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। যদি কখনও অহঙ্কার এসে যায়, তখন সামান্য খেদমতের দ্বারাই তা দূর হয়ে যাবে। সুতরাং খেদমতে খালক অহঙ্কার দমনের এক মহৌষধ।
প্রত্যেকেরই নিজস্ব অবস্থানে থেকে খেদমতের জন্য লেগে যাওয়া জরুরি। আইনজীবীদের উচিত, আইন মারফত মাজলুমদের সাহায্য করা। তাদের মামলা-মোকদ্দমায় বিনা পারিশ্রমিকে সহায়তা করা। ডা³ারদের উচিত, প্রাথমিক ওষুধপত্রের মাধ্যমে সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। ফ্রি চিকিত্সার ব্যবস্থা করা এবং অতিরি³ ফি না নেয়া। এরকম প্রতিটি অঙ্গনের মানুষেরই নিজ নিজ পরিসরে খেদমতের সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে অন্যের সেবায় কিছু করার তাওফিক দান করুন।

2 Responses to “খেদমতে খালক : আল্লাহকে পাওয়ার সহজ পথ”

  1. tutorialmaker Says:

    হ্যা,আপনার সাইটটি খুব ভাল লেগেছে। আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল পোষ্ট সকলেরই ভাল লাগবে।অনেক তথ্যপূন্য এই সাইটটি আমার অসংখ্য ভাল লেগেছে।ভবিষ্যতে আরো ভাল ও আরো উন্নত তথ্য সমৃদ্ধ পোষ্ট চাই।


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: