বাবা-মায়ের অধিকার

বাবা-মায়ের অধিকার

এই সুন্দর পৃথিবীতে সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের মতো আপনজন আর কেউ নেই। পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার পরে বাবা-মা সন্তানের জন্য সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় এবং সম্মানীয়। বাবা-মায়ের অসিলায়ই সন্তান এ মায়াময় বিশ্ব জগতের মুখ দেখতে পায় এবং তাদের অপত্য স্নেহ-মমতা, ভালোবাসামাখা যত্নে লালিত-পালিত হয়ে পরিপূর্ণ মানুষ রূপে গড়ে ওঠে। সন্তানের জন্য বাবা-মাই করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে সেরা উপহার। বাবা-মা সর্বাবস্থায় সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। এমন হিতাকাঙ্ক্ষী বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের ওপর যথেষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপ করেছে ইসলাম। বাবা-মা যাতে সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারেন, সেদিকে সন্তানের সুদৃষ্টি রাখতে হবে। সন্তানের এমন কোনো কাজ করা উচিত হবে না, যাতে বাবা-মায়ের মনে আঘাত লাগে।

বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করা ফরজ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর পথে জিহাদ করার চেয়েও উত্তম ইবাদত।

দয়াময় আল্লাহ মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। তার মধ্যে উত্তম নিয়ামত হলো বাবা-মা। মানুষের জন্মের সূচনাতেই বাবা-মা তার ভবিষ্যৎ সন্তানের মঙ্গল চিন্তায় অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠেন, যাতে গর্ভস্থ সন্তানের কোনো রকম অকল্যাণ ও অমঙ্গল না হতে পারে। এতে সম্ভাব্য সব রকম বৈষয়িক প্রচেষ্টার পর তারা দয়াময় প্রভুর কাছে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তার কল্যাণের জন্য মুনাজাত করতে থাকেন। পবিত্র কুরআন মজিদে মহান আল্লাহ তায়ালা বাবা-মার মনের গোপন কামনাটি তুলে ধরেছেন। ‘হে প্রভু তুমি যদি আমাদেরকে সুস্থ নিখঁুত সন্তান দান করো তাহলে আমরা মনখুলে তোমার শুকরিয়া আদায় করব। (সূরা-আল আরাফ-আয়াত-১৮৯ আয়াতের শেষাংশ)

বাবা-মা কষ্ট ভুলে সন্তানের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করেন। আর মা বুকের দুধ ও স্নেহ-মমতা দিয়ে তিল তিল করে সন্তানকে বড় করে তোলেন। সন্তানের জন্য অনেক সময় মাকে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়, অনেক জ্বালাতন সহ্য করতে হয়। সন্তান লালন-পালনে কত কষ্ট স্বীকার করতে হয় তা একমাত্র মায়েরাই অনুভব করতে পারেন। এ পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে ঋণী বাবা-মায়ের কাছে। বিশেষ করে বাবা-মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তারা সন্তানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ সময় যাতে তাদের সামান্যতম দুঃখ-কষ্ট না হয়, তার প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে।

বাবা-মা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের বিশেষভাবে সেবা-যত্ন করা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি তাদের সামনে কর্কশ ভাষায় কথা বলবে না। তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। তাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের সাথে বাহু প্রসারিত করে দাও। তাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করো।’

(সূরা-বনি ইসরাইল, আয়াত-৩-৪)

তাই তো দয়াময় আল্লাহ্‌ পাক পবিত্র কুরআনুল কারিমে তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের পরপরই মানুষকে সর্বপ্রথম বাবা-মায়ের ইহসান ও সহানুভূতির নির্দেশ দান করেছেন। ‘তোমার রব ফায়সালা করিয়া দিয়াছেন তোমরা কাহারও ইবাদত করিবে না- কেবল তাহারই ইবাদত করিবে এবং বাবা-মায়ের সহিত ভালো ব্যবহার করিবে।’ (সূরা- বনি ইসরাইল-আয়াত-২৩)

‘আমি মানুষকে তার বাবা-মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি।’ (সূরা-লোকমান-আয়াত-১৪)

‘আর উপাসনা করো- আল্লাহ্‌র, শরিক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। বাবা-মায়ের সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো।’ (সূরা- নিসা-আয়াত-৩৬)

মহান রাব্বুল আলামিন আল কুরআনে আরো বলেন, ‘যখন আমি বনি ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, এতিম ও দ্বীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সূরা- আল-বাকারা-আয়াত-৮৩)

‘আমি মানুষকে নিজেদের বাবা-মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। (সূরা-আল-আনকাবুত, আয়াত-৮)

মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন­ ‘আমি মানুষকে পথনির্দেশ দিয়েছি যে, তারা যেন নিজেদের বাবা-মায়ের সাথে নেক আচরণ করে।’ (সূরা-আল-আহকাফ-আয়াত-১৫)

বাবা-মায়ের হক ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সহানুভূতি সম্পর্কে মহানবী সাঃ-এর শিক্ষা ও আদর্শ অতুলনীয়। একদা প্রিয় নবীজী সাঃ তিনবার বললেন, সে লাঞ্ছিত হোক। জিজ্ঞাসা করা হলো সে ব্যক্তিকে? নবীজী সাঃ বললেন, যে ব্যক্তি বাবা-মা উভয়কে বা তাদের একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়ে তাদের সদ্ব্যবহারের দ্বারা সে বেহেশতের অধিকারী হতে পারেনি। (মুসলিম শরিফ)

প্রিয় নবী সাঃ বলেছেন, বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর বাবা-মায়ের অসন্তুষ্টি আল্লাহর অসন্তুষ্টি। (তিরমিজি শরিফ)

দয়ার নবী সাঃ বলেছেন, কোনো হতভাগার বাবা-মা যদি তার প্রতি অসন্তুষ্ট অবস্থায় মারা যায়, তবে সে যদি তাদের জন্য আজীবন দোয়া ও মাগফিরাত কামনা করতে থাকে, তা হলে তাকে আল্লাহ বাবা-মায়ের সন্তুষ্টিভাজন গণ্য করে নেবেন। (মিশকাত শরিফ)। প্রিয় নবীজী সাঃ বলেছেন, তিন প্রকার লোকের ওপর আল্লাহ বেহেশতকে হারাম করেছেন। এক­ অভ্যস্ত মদ্যপানকারী। দুই- বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান। তিন­ দাইয়ুছ, যে নিজ পরিবারের নির্লজ্জ ও বেহায়াপনাকে সমর্থন করে। (সহি তারগিব ও তারহিব)

নবী করিম সাঃ আরো এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির দিবসের যাত্রা শুরু হয় বাবা-মায়ের বা তাদের যেকোনো একজনের নাফরমানির মধ্য দিয়ে, তার জন্য জাহান্নামের দরজা খোলা থাকে। বাবা-মায়ের মান-মর্যাদার দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের সাথে নরম স্বরে কথা বলতে হবে। তাদের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে তারা অহেতুক বিরক্ত করতে পারেন। সে অবস্থায় তাদের সেই আচরণ সইতে হবে। কখনো বিরক্ত হওয়া যাবে না। এমন কথা উচ্চারণ করা যাবে না­ যা তাদের মান-সম্মানের পরিপন্থী হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশঃ ‘তুমি তাদের প্রতি উহ! (ঘৃণা বা দুঃখব্যঞ্জক) শব্দটিও বলো না এবং তাদের তিরস্কার করো না; বরং তাদের সাথে অতি সম্মানের সাথে কথা বলো।’ (সূরা- বনি ইসরাইল)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা-মা জীবিত আছেন কি? তিনি বললেন জি জীবিত আছেন। নবীজী সাঃ বললেন, তাহলে তুমি বাবা-মায়ের সেবাযত্নে আত্মনিয়োগ করেই জিহাদ করো। (বোখারি শরিফ)। অর্থাৎ তাদের সেবাযত্নের মাধ্যমেই তুমি জিহাদের সওয়াব পেয়ে যাবে। অন্য রেওয়ায়েতে এর সাথে এ কথাও উল্লিখিত রয়েছে যে, লোকটি বললঃ আমি বাবা-মাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন, যাও, তাদের হাসাও। যেমন কাঁদিয়েছ অর্থাৎ তাদেরকে গিয়ে বলো, এখন আমি আপনাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জিহাদে যাব না।

মহান আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, ‘যদি বাবা-মা তোমাদের ওপর শিরক করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে, যা তোমার বোধগম্য নয়, তাহলে তাদের কথা মেনে নিয়ো না। কিন্তু পার্থিব জীবনে উৎকৃষ্ট পন্থায় তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখো।’ (সূরা- লোকমান-আয়াত-১৫)

বাবা-মায়ের মৃতুøর পর নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করে এবং সে বয়সের অসহায় ও দুর্বলতার কথা মনে করে, ভালোবাসা ও রহমতের আবেগে বারবার আল্লাহর দরবারে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এই দোয়া পড়তে হবে…. ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা।’

‘হে প্রভূ! তাদের ওপর রহমত করো যেমন শিশুকালে তারা আমাকে রহমত ও অপত্য স্নেহ দিয়ে লালন-পালন করেছিলেন।’ (সূরা-বনি ইসরাইল-আয়াত-২৩-২৪)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: