শবেবরাত

শবেবরাত

১৪ শাবান দিবাগত রাতকে শবেবরাত বলা হয়। শব ফারসি শব্দ, অর্থ রাত। একে আরবিতে লাইলা বা লাইলাতু বলা হয়। বরাত অর্থ অব্যাহতি। তাই লাইলাতুল বরাত অর্থ দাঁড়ায় অব্যাহতি তথা মুক্তির রাত।
মানুষ জীবনের চলার পথে বিভিন্ন লোভ-প্রলোভন ও ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়ে যেসব অপরাধে লিপ্ত হয়, ভবিষ্যতে একই অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত হবে না—এরূপ দৃঢ়সংকল্প সহকারে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি যে কোনো সময় বান্দার অপরাধ মার্জনা করতে পারেন। এছাড়া সারা বছরের বিভিন্ন সময়-ক্ষণের মধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যেগুলোতে তিনি বান্দার কাতর ফরিয়াদমিশ্রিত দোয়া অধিক শুনে থাকেন। তার মধ্যে পবিত্র রমজান মাসের মহান সংযম প্রশিক্ষণের পূর্বপ্রস্তুতির মাস শাবান। হাদিস শরীফে এ মাসের যথেষ্ট গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরীফে হজরত আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস—‘আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) রমজান মাস ছাড়া শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এত অধিক রোজা রাখতে দেখিনি। তিনি দু’একদিন ছাড়া কোনো সময় শাবানের পুরো মাসই রোজা রাখতেন। তবে মহানবী (সা.) নিজে তা করলেও উম্মতকে এ মাসের প্রতিদিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। মহানবী (সা.) পবিত্র রমজানের আগের দু’মাসে অধিক পরিমাণে এ দোয়া করতেন—‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ও শাবান ও বাল্লিগনা রমাজান’—অর্থাত্ ‘হে আল্লাহ! আমাদের রজব ও শাবান মাসের বরকত দান করুন এবং (এ অবস্থায়) রমজানে নিয়ে পৌঁছান।’ শাবান মাসের এ গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করলে ১৪ শাবান দিবাগত রাতের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘আইয়ামে বিয’ তথা প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ দিবাগত রাতের মর্যাদা এমনিতেও স্বীকৃত। তার ওপর শাবানের মাস হওয়ায় সে গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। এছাড়া মহানবী (সা.) এ রাতে নির্জনভাবে গুনাহমাফির জন্যও আল্লাহর কাছে অধিক কান্নাকাটি করেছেন বলে হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং এসব গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে এ রাতকে শবেবরাত বা মুক্তির রাত বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তবে তাই বলে কোরআনে বর্ণিত ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদরের মতো শবে বরাতকে গুরুত্ব দেয়ার দ্ব্যর্থহীন প্রমাণ কোরআন-হাদিসে অনুপস্থিত।
শবে বরাত মুসলমানদের মনে ইবাদত ও নেক কাজের স্পৃহাকে জাগিয়ে তোলে। এ উপলক্ষে সমবেত মুসলমানদের মনের বিশেষ ভাবগতি ধর্মীয় অন্যান্য বিষয় পালনের আগ্রহ সৃষ্টিতে বিরাট সহায়ক হয়। বিশেষ করে জুমার দিনের তুলনায় শবে বরাতে মুসল্লিদের উপস্থিতির সংখ্যা অধিক থাকে বিধায় সবাই সামনে রমজানের সিয়াম সাধনা সংক্রান্ত মাসলা-মাসায়েল, সিয়ামের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ও তাত্পর্য সম্পর্কে তাদের অবগত করার বিরাট সুযোগ ঘটে। এমনকি অনেকে সাধারণভাবে মসজিদে বড় একটা না গেলেও যেহেতু ওই রাতে মসজিদে যায়, তখন বিজ্ঞ আলেম-ইমামদের ওয়াজ-নসিহতের দ্বারা এ শ্রেণীর লোকের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তি থাকলেও তা দূরীভূত হয়ে যায়। অতঃপর দেখা গেছে, ওই ব্যক্তিই ওয়াজের তাসিরে নিয়মিত নামাজিতে পরিণত হয়ে যায়।
এজন্য শবে বরাতের শরয়ি গুরুত্বের নির্দিষ্টতার প্রশ্ন তুলে দ্বীনের যথার্থ শিক্ষা আদর্শকে কোরআন-হাদিসের আলোকে তুলে ধরার এ সুযোগকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা কিছুতেই সঙ্গত নয়। বিশেষ করে পাশ্চাত্য বস্তুবাদী শিক্ষা, জীবনবোধের প্রভাবে বর্তমান ধর্মবিমুখতা এমনকি ধর্মদ্রোহিতার এ যুগেও আমাদের দেশের মুসলমানদের অন্তরে এ রাতটি যে মর্যাদার আসন করে নিয়েছে, তা দ্বীনি চিন্তাকর্মের উন্নতি, বিকাশ ও প্রচারের এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে। এদিক থেকেও এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আহত করা অনুচিত। ইমাম গাযযালির দর্শন অনুযায়ী নেক ভাববর্ধক কাজও নেকের কাজ। বিশেষ করে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মুহাদ্দিসিনে কেরাম ফজিলতের হাদিস বর্ণনায় যেখানে মৌলিক কোনো কিছুর সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে সনদে তার চুলচেরা বাছ-বিচারের ব্যাপারে শিথিলতার অবকাশ রেখেছেন, সেখানে বিষয়টিকে প্রান্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা মানুষের কাছে ইসলামী শিক্ষা-আদর্শ উপস্থাপনের একটি মাধ্যমকে নিষ্ক্রিয় করার নামান্তর হবে।
শবে বরাত তথা শাবান মাসের মধ্য রজনীতে কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগি ও জিকির-আসকার করা, মুর্দারের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা সবার বাঞ্ছনীয়। এ রাতে আল্লাহর দরবারে নিজের পূর্ববর্তী গুনাহখাতার ব্যাপারে তওবা করে পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ একান্ত জরুরি। তবে এ রাতের নফল ইবাদত-গুজারি যাতে ফজরের ফরজ নামাজ হারানোর নিমিত্ত হয়ে না দাঁড়ায়। এরূপ হলে সবই বরবাদ। সেজন্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
শবে বরাত উপলক্ষে আতশবাজি পোড়ানো, মাজারে গিয়ে কবর সিজদা করা, কবরে বাতি দেয়া ইত্যাদি বেদায়াত-শিরকি কাজ যাতে না হয়, সেদিকে মসজিদের ইমাম সাহেবরা ও এলাকার মুরুব্বি শ্রেণীর লোকদের বিশেষ লক্ষ্য রাখা কর্তব্য।
অন্যথায় কল্যাণের বদলে তা অকল্যাণই বয়ে আনবে। খানাপিনার আয়োজন ও ব্যস্ততা অনেক সময় শবে বরাত ও শবে কদরের ইবাদত নষ্ট করে। খানাপিনার প্রতি সবার মনোযোগ আকৃষ্ট করে শয়তান ওই রাতের ফজিলত থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখে। সেদিকও সবার লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। এ উপলক্ষে সম্মিলিতভাবে খাবারের আয়োজন করতে চাইলে ওই দিনটির আগের বা পরের দিন তা করা গেলে উভয় দিকই রক্ষা পেতে পারে। পবিত্র রমজানের পূর্বপ্রস্তুতির এই মাসের এই রাত আমরা যেন আল কোরআন ও সুন্নাতে রাসুলের (সা.) অনুসরণে নিজেদের যথাযথ আত্মশুদ্ধিতে এগিয়ে যেতে পারি—আল্লাহ আমাদের তওফিক দিন। আমিন!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: