মানব হূদয়ে মৃত্যু চিন্তা

মানব হূদয়ে মৃত্যু চিন্তা

এ বিশ্বে মানুষের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। এ নশ্বর দুনিয়ায় তার দিনগুলো সীমাবদ্ধ। বেঁচে থাকার আগ্রহ মানুষের এক স্বভাবজাত প্রবৃত্তি, দুনিয়ায় তার প্রয়োজন অফুরন্ত। অসীম তার আশা-আকাঙ্খা, কিন্তু এরপরও তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। প্রতিটি প্রাণী বা প্রাণশীল সৃষ্টিকেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যু আসবে। আমাদের সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। মৃত্যু চিরন্তন সত্য। এ সম্বন্ধে কুরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে ‘প্রতিটি নাফ্স (প্রাণসত্তা)-ই মৃত্যুবরণ করবে’ পৃথিবীর বুকে আমাদের এ জীবন নিতান্তই সাময়িক। মৃত্যু আমাদের এ জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেয়। ইসলাম আমাদের এ কথাটি মনে রাখতে বলে যে, মৃত্যু যেকোনো সময় এসে হাজির হতে পারে। কেবল আল্লাহতায়ালাই জানেন কখন তার কোনো বান্দা মৃত্যুবরণ করবে। কোনো মানুষই এ সুন্দর মনোরম পৃথিবীতে চিরস্থায়ী হয়ে আসেনি। এক এক করে প্রত্যেক মানুষকে এই সুন্দর মনোরম পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে। একদিন তাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। বিংশ শতাব্দীর মানুষ অনেক আশ্চর্যজনক বস্তু আবিষ্কার করেছে। এই বিশ্বের মানুষকে বিজ্ঞান অনেক কিছু দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর কোল থেকে বেঁচে থাকার কোনো বস্তু আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি মানুষ। এই মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের জীবনের পরিসমাপ্তি টেনে দেয়, মানুষের স্বপ্নসাধ খান খান করে দেয়। মৃত্যুর সামনে সকলেই অসহায়। মৃত্যুর আনাগোনা শুধু দারিদ্র্যের পর্ণকুটিরে নয়, রাজার রাজপ্রাসাদে, সেনাপতির সুরক্ষিত দুর্গ, বিজ্ঞানীর গবেষণাগারে সর্বত্র। সব প্রাণীরই মৃত্যু অনিবার্য।

ধনী-দরিদ্র, বালক-বৃদ্ধ, সবল-দুর্বল, পাপী-পুণ্যবান নির্বিশেষে সব মানুষেরই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কেউই মৃত্যুর কঠিন গ্রাস হতে রক্ষা পাবে না। ইসলাম মৃত্যুকে মানব জীবনের অবসান বলে স্বীকার করে না বরং একে চিরস্থায়ী পারত্রিক জীবনের একটি প্রবেশপথ বলে মনে করে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী মৃত্যুই পারলৌকিক স্থায়ী জীবনের প্রারম্ভ। ইহজগতে মানুষের স্থিতিকাল নিতান্তই অল্প, ৬০, ৭০ কিংবা ১০০ বছর মানুষ এই সামান্য সময়ের জন্য পৃথিবীতে বাস করতে যেয়ে তার বহুমুখী জ্ঞান-পিপাসা মিটাবার জন্য আকাশ, পাতাল, সাগর, পাহাড় সর্বত্রই বিচরণ ও পর্যবেক্ষণ করছে। এমনকি পদার্থের অণুকে দেখে এখন পরমাণুকে ভেঙ্গে তার শক্তি পরীক্ষা ও ব্যবহার করছে। আর তার অনন্তকাল বাসের আবাস যে পরজগতে তা সম্বন্ধে মানুষের ধারণা যা আছে তা একান্তই ভাসা ভাসা। মহত্ লোকের জন্য মৃত্যু পরম আকাঙ্ক্ষিত বস্তু, কারণ মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের জাগতিক সব দুঃখ যাতনার অবসান হয়, সব ব্যথা বেদনার ইতি হয়। মৃত্যুকে আমরা বুঝতে পারি না যদিও আমরা তা নিত্য দেখছি। যখন অতিপরিচিত বা অতি আপন কেউ মারা যায় তখনই হয়তো কিছুটা সচেতন হই। এ জীবনের অবসান যে ঘটবে জীবনে এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত। কিন্তু খুব কম সংখ্যক লোকই মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কোনো কোনো লোক গুণাহ করেও মৃত্যুর কথা স্মরণ করে না, অথচ যারা সত্যিকারের মুমিন তারা সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করে থাকেন।

Advertisements

হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসা এখন হাতের মুঠোয়

হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসা এখন হাতের মুঠোয়

বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে অনেক আলোচনাই হয়। প্রচারণার দিক দিয়ে এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস সার্জারি অনেক এগিয়ে। যারা এ চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন তাদের সাথে আলাপ করলেই এর ভালো-মন্দ দিক বেরিয়ে আসে। অপারেশন ছাড়াও যে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীর ব্লকের চিকিৎসা করা যায়, এটা কোনো কোনো চিকিৎসক মানতেই চান না। এ ক্ষেত্রে যুক্তি বিবেচনা ও আন্তর্জাতিক অগ্রগতির তথ্যপ্রমাণের তারা ধার ধারেন না। অথচ দেখুন, দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কী বলেছেন। বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার অবঃ আবদুল মালিক সম্প্রতি কোয়ান্টামের মুক্ত আলোচনায় প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ‘হৃদরোগের অনেক আধুনিক চিকিৎসা এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। কিন্তু এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস অপারেশনসহ এ সব চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুলও বটে। এ ছাড়া ওষুধের পেছনেও হৃদরোগীদের খরচ খুব একটা কম নয়। আর এ সব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো আছেই। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে মেডিটেশন এবং লাইফস্টাইল-ভিত্তিক বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। আমেরিকার ডা. ডিন অরনিশের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, ব্যায়াম ও মেডিটেশনের মাধ্যমে হাজার হাজার হৃদরোগী অপারেশন ও এনজিওপ্লাস্টি ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠেছেন।’

শ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপকের এ বক্তব্যের সাথে সবিনয়ে আমি দুটো পয়েন্ট যোগ করব। সেই সাথে এই লেখায় একাধিক কেস স্টাডির উল্লেখও থাকবে। উল্লেখিত হৃদরোগীদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বরসহ তুলে দেয়া হচ্ছে। যে কেউ সহজেই প্রমাণ করতে পারবেন, আমরা ঠিক বলছি, নাকি মানুষকে বিভ্রান্ত করছি।

এবার আসা যাক ওই দু’টি পয়েন্টে। এক. চিলেশন থেরাপি; দুই. ইসিপি। দুটোই হচ্ছে হৃদরোগের বিকল্প চিকিৎসার ব্যথাহীন আধুনিকতম পদ্ধতি। প্রথম পদ্ধতিতে স্যালাইনের মতো শিরায় তরল ওষুধ সেবন করতে হয়। আবিষ্কারের খবরটি বিভিন্ন দেশের অনেক চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকায় স্থান পেয়েছে। ফলে ১৯৭৩ সালে চিকিৎসকদের হৃদরোগের চিকিৎসায় ইডিটিএ চিলেশন থেরাপির ব্যবহার শেখাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমেরিকান কলেজ ফর অ্যাডভান্সমেন্ট ইন মেডিসিন, এসিএএম।

আর দ্বিতীয়টি ইসিপি ব্লাডপ্রেসার মাপার সময়ে যে কাপড় জড়াতে হয়, সে রকমই বস্তু দুই পায়ে জড়িয়ে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এটাকে বলা হয় ইসিপি। এই যন্ত্রটি সমান্তরাল রক্ত-চ্যানেল সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। মেশিনটি কৃত্রিমভাবে ধমনীতে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। মেশিনের এক ঘণ্টার সহায়তায় এই সমান্তরাল আর্টারি/ক্যাপিলারি সিস্টেম চালু করে দেয় এবং হৃৎপিণ্ডের পেশিতে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন শুরু করে। সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক চ্যানেল চালু করার জন্য এই মেশিনের মাধ্যমে পঁয়ত্রিশটির মতো সেশনের প্রয়োজন পড়ে। এভাবে খুব সহজেই বাইপাস সার্জারির বিকল্প হতে পারে এই মেশিন। ইউএস এফডিএ স্বীকৃত।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, মেডিটেশন ও চিলেশন থেরাপি ও ইসিপি’র মাধ্যমে চিকিৎসায় সাফল্যের প্রমাণ

কেস স্টাডি-১

আমি মোঃ আসালত জামান। বয়স ৬১ বছর। আমি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। হঠাৎ করে একদিন বুকে ব্যথা শুরু হলো। ১৫-০৩-২০০৮ তারিখে বুকে ব্যথা নিয়ে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে ভর্তি হলাম। এনজিওগ্রাম করা হলো। ডাক্তারেরা আমাকে জরুরি ভিত্তিতে বাইপাস অপারেশন করতে বললেন। কারণ আমার হার্টের মেইন আর্টারিতে ৭০ ভাগ, এলএডি-তে ৯৯ ভাগ, ৯৯ ভাগ (দুইটা), এলসিএক্স-এ ৯০ ভাগ ও আরসিএ-তে ১০০ ভাগ মোট পাঁচটি ব্লক ধরা পড়ে। আমার হার্টের আর্টারি খুবই খারাপ, তাই বাইপাস করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তখন ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাসের বিনা অপারেশনে চিকিৎসা, যেমন খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, মেডিটেশন, প্রাণায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করেন। কিছু দিন পর চিলেশন থেরাপিও দিতে শুরু করেন। সপ্তাহে দু’টা করে মোট ৩০টা থেরাপি নিয়েছি। বাইপাস সার্জারি করতে ব্যর্থ হওয়ার ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালের ১৫ মার্চ আবারো এনজিওগ্রাম করালাম। এ রিপোর্টে দেখা গেল আমার হার্টের আর্টারির ব্লকেজ ৫০ ভাগ কমেছে।

কেস স্টাডি-২

আমার নাম মোঃ নাসিরউদ্দিন। বয়স ৫৭ বছর। আমার হার্টের এলএডি-তে ১০০ ভাগ দুইটা, এলসিএক্স ৮০ ভাগ একটা, ৯০ ভাগ একটা ও আরসিএ-তে ১০০ ভাগ মোট পাঁচটা ব্লক আছে। তখন ডাক্তার জরুরি বাইপাস অপারেশন করাতে হবে বলে আরো কিছু পরীক্ষা করাতে বলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেখালে ডাক্তার বললেন, আমার হার্টে অপারেশন করা যাবে না। কারণ আমার হার্টের আর্টারি খুবই সরু এবং অজ্ঞান করলে জ্ঞান ফিরে আসবে না। হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টারের দেয়া খাবারের নিয়ম, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন ও চিলেশন থেরাপি নিয়ে আমি এখন অনেক ভালো আছি। বর্তমানে আমি প্রতিদিন সকালে মর্নিং ওয়ার্কের সময় কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে আমার ভালো থাকার কথা বলি, আর প্রাতঃভ্রমণ শেষে হলিস্টিকের শিখিয়ে দেয়া যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম ও মেডিটেশন শেখাই।

কেস স্টাডি-৩

আমি এস এম আসলাম হোসেন সাচ্চু। আমার অগ্নিপতি একজন হার্টের রোগী, নাম মোঃ মোফাজ্জল হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা)।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা স্থানীয় জেলা হাসপাতালে ভর্তি করাই। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করলে সেখানে ডাক্তারেরা চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর অবস্থান উন্নতি করেন এবং এনজিওগ্রাম করান। এনজিওগ্রামে চারটি ব্লক ধরা পড়ে। ব্লকগুলোর একটি ১০০ ভাগ, একটি ৯৫ ভাগ, একটি ৮০ ভাগ এবং অন্যটি ৬০ ভাগ। যা হোক রাজশাহীর ডাক্তারেরা রোগীকে ঢাকায় নিয়ে বাইপাস অপারেশন অথবা রিং পরানোর পরামর্শ দেন। সেই মোতাবেক আমরা ৮ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে রোগীকে ঢাকায় নিয়ে আসি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে একটি পরীক্ষা (এমপিআই) করাতে বলেন। পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্টে দেখা গেল রোগীর হার্টের অবস্থা মোটেই ভালো নয়; তার কোনো ধরনের অপারেশন করা যাবে না। মোট কথা রোগী অপারেশনের অযোগ্য। এমনকি রিংও পরানো যাবে না। আল্লাহর অশেষ কৃপায় হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টারে চিকিৎসা নিতে শুরু করার। দু-তিন দিনের মধ্যেই ওষুধ ছাড়া ঘুম এবং টয়লেট নিয়মিত হতে শুরু করে। এটা আমার কাছে অলৌকিক ব্যাপার বলেই মনে হয়। আমরা চিকিৎসা নিতে শুরু করি প্রায় চার মাস হলো এবং এর মধ্যে ৩০টির মতো চিলেশন থেরাপি নিয়েছি। ডা. সাহেবের কাছে প্রথমে খাবারের তালিকার নিয়ম মেনে, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন পরে চিলেশন থেরাপি নিয়ে রোগী এখন অনেক সুস্থ সবল। আমরা এখন অনেক আশাবাদী।

%d bloggers like this: