মৃত ব্যক্তির প্রতি করণীয়

মৃত ব্যক্তির প্রতি করণীয়

ক্ষণস্থায়ী সুন্দর এ পৃথিবী থেকে প্রত্যেক প্রাণী মহান আল্লাহর দেয়া নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর তার কাছে ফিরে যাওয়াই হলো মৃতুø। মৃতুøর অনিবার্যতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃতুøর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ মৃতুøর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠার সাথে সাথে মৃতুøকালীন এবং মৃতুø-পরবর্তী সময়ের জন্য জীবিত ব্যক্তির কিছু দায়িত্ব পালন অপরিহার্য।

মৃতুøকালীন কর্তব্যঃ কারো মৃতুøর লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠলে তাকে ডান কাতে কেবলামুখী শয়ন করানো উচিত, তা সক্ষম না হলে শুধু মুখটা কেবলার দিকে রাখতে হবে। এ সময় কলেমার তালকিন (উচ্চৈঃস্বরে পড়তে থাকা) করতে হবে এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিতে হবে। পার্থিব জীবনের এমন কোনো কাজ বা কথা বলা যাবে না, যে কারণে তার মন দুনিয়ার দিকে ঝঁুকে পড়ে। কারো মুখ দিয়ে অযাচিত কথা বের হয়ে পড়লে সে দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কলেমার তালকিন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা ওই সময় শয়তান ঈমান নষ্ট করার জন্য মানুষের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। কলেমা একবার উচ্চারণ করলে অধিকবার পাঠ করানোর জন্য পীড়াপীড়ি করা যাবে না। তার পাশে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা মুস্তাহাব। মহানবী সাঃ বলেন, ‘মৃতুøমুখী লোককে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করাও এবং তার পাশে বসে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করো।’

মৃতুøর পরঃ ব্যক্তির মৃতুøর পর উপস্থিত লোকেরা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করবে। লোবান বা আগর বাতি জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। অতঃপর তার চক্ষুদ্বয় ‘বিস্‌মিল্লাহে ওয়া আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহ’ বলে কোমল হস্তে বন্ধ করে দিতে হবে। হাত-পা সোজা করে দিতে হবে। চেহারা সঠিক অবস্থায় থাকার জন্য রুমাল বা কাপড় দ্বারা থুঁতনি বেঁধে দিতে হবে। দুই পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিও এ সময় পরস্পর বেঁধে দেয়া উচিত। মৃতদেহ মাটি কিংবা চারপায়া খাটিয়ার ওপর রাখা যাবে। অতিরিক্ত কাপড় খুলে চাদর দ্বারা শরীর ঢেকে দেয়া মুস্তাহাব। পুরুষ কিংবা মহিলা যাদের ওপর গোসল ফরজ তাদের মৃত ব্যক্তির কাছে থাকা ঠিক নয়। গোসল ও কাফন-দাফন দ্রুত সেরে নেয়া উচিত, বিলম্ব করা ঠিক নয়। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দ্রুত সংবাদ দেয়া উচিত, যাতে তারা যথাসময়ে জানাজায় উপস্থিত হতে পারে। গোসল দেয়ার আগে মৃতের কাছে কুরআন শরীফ পাঠ বৈধ নয়।

কান্নাকাটি করাঃ মৃতের জন্য উচ্চস্বরে কান্না করা যাবে না। ধৈর্য অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখতে হবে এবং মৃত ব্যক্তির পরকালীন জীবনের প্রতিটি স্তর যাতে সহজ হয় তার জন্য দোয়া করতে হবে। উচ্চৈঃস্বরে কান্নাকাটির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি রয়েছে বিধায় মহানবী সাঃ তা করতে নিষেধ করেছেন।

গোসল দানঃ সর্বাপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী আত্মীয়ের গোসল দেয়া উত্তম। মৃতকে কাঠের ওপর শুইয়ে কাপড়গুলো খুলে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত একটি চাদর দ্বারা ঢেকে দিতে হবে। গোসলদাতা হাতমোজা বা অন্য কোনো কাপড় দুই হাতে পরে নেবে। মৃতকে প্রথমে কুলি এবং নাকে পানি দেয়া ব্যতীত অজু করাতে হবে। হালকা গরম পানিতে সম্ভব হলে কিছু বরই পাতা দিয়ে মৃতদেহকে তিনবার ধৌত করানো উচিত। শেষবারের গোসলে কর্পূর মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা উত্তম। গোসলের পর মৃতের সর্বাঙ্গ শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। কাফনের ওপর মৃতদেহ রাখার সময় স্ত্রীলোকের মাথায় এবং পুরুষের মাথায় ও দাড়িতে আতর এবং কপাল, নাক, উভয় হাতের তালু, উভয় হাঁটু ও পায়ে কর্পূর লাগানো যেতে পারে। কাফনে আতর লাগানো এবং কানে তুলা দেয়া ঠিক নয়। চুল আঁচড়ানো, নখ ও চুল কাটা ঠিক নয়। স্ত্রী স্বামীকে গোসল দিতে এবং কাফন পরাতে পারবে। কিন্তু মৃত স্ত্রীকে স্বামী স্পর্শ করতে ও হাত লাগাতে পারবে না। কিন্তু দেখা বা কাপড়ের ওপর দিয়ে হাত লাগানো যেতে পারে।

কাফনঃ পুরুষের জন্য তিনখানা (যথা­ ইজার, কোর্তা ও চাদর) এবং স্ত্রীলোকের জন্য পাঁচখানা (যথা­ চাদর, কোর্তা, ইজার, ছেরবন্দ ও সিনাবন্দ) কাপড় দেয়া সুন্নত। পুরুষের ইজার ও চাদর মাথা থেকে পা পর্যন্ত এবং কোর্তা আস্তিন ও কল্লি ব্যতীত কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত হওয়া উচিত। মহিলার কোর্তা কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত সিনাবন্ধ সিনা থেকে নাভি বা হাঁটু পর্যন্ত, ছেরবন্ধ তিন হাত দৈর্ঘø হবে, যার দ্বারা মাথার চুল বাঁধতে হয়। ইজার মাথা থেকে পা পর্যন্ত এবং চাদর মাথা থেকে পা পর্যন্ত হওয়া আবশ্যক। কাফনের জন্য সাদা রঙের সাধারণ কাপড় ব্যবহার করা উচিত। মহানবী সাঃ বলেছেন, ‘কাফনের জন্য অতি দামি কাপড় ব্যবহার করো না, কারণ তা সত্বর নষ্ট হয়ে যায়।’ কাফন পরানোর আগে তাতে তিনবার কিংবা পাঁচবার লোবান বা আগরবাতির ধুনি দেয়া উচিত।

জানাজার নামাজঃ মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়ার উদ্দেশ্যে ফরজে কেফায়া জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। মৃতের অলি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি ইমামতির উপযুক্ত। অতঃপর যারা তাকে অনুমতি দেয়। জানাজার নামাজ আদায়ের জন্য ওয়াক্তের শর্ত নেই। জানাজার জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুম করে নামাজ পড়া যেতে পারে। নাপাকমুক্ত জুতা পায়ে নামাজ পড়া যায়। তবে খুলে নিয়ে জুতার ওপর নামাজ পড়া উত্তম। কাফির বা মুরতাদ ব্যক্তির জানাজা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে বিদ্রোহী মুসলমান বাদশাহ, ডাকাত যদি বিদ্রোহ কিংবা ডাকাতি অবস্থায় মারা যায়, তাদের জানাজা পড়া যাবে না। পিতা-মাতার হন্তারক সন্তান যদি সাজাস্বরূপ মারা যায় তবে শাসনের উদ্দেশ্যে তার জানাজা পড়া যাবে না। ইচ্ছাপূর্বক আত্মহত্যাকারীর জানাজায় শীর্ষস্থানীয় আলেমদের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় নয়। জানাজার পর আবার মুনাজাত করার প্রয়োজন নেই।

জানাজা বহনের নিয়মঃ মৃতব্যক্তিকে যথাশিগগির কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া উচিত। জানাজা বহনকারীদের অজু থাকা বাঞ্ছনীয়। জানাজার সাথে পায়ে চলা উত্তম, যানবাহনেও চলা যায়। বিনা প্রয়োজনে জানাজার আগে চলা এবং উচ্চৈঃস্বরে দোয়াকালাম পড়া মাকরুহ।

দাফন করাঃ কবরে লাশ রাখার সময় ‘বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতে রাসূলিল্লাহ’ বলতে হবে। মাইয়েতকে ডান কাতে কেবলামুখী করে শয়ন করিয়ে কাফনের বন্ধন খুলে দিতে হবে। কবরের উপরিভাগে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে ঢাকার পর পরিমাণমতো চাটাই দিয়ে মাটি চাপা দিতে হবে। উপস্থিত লোকেরা তিন মুষ্টি মাটি কবরে রাখবে। প্রথম মুষ্টি রাখার সময় বলবে ‘মিনহা খালাকনাকুম’, দ্বিতীয় মুষ্টির সময়ে বলবে ‘ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম’, তৃতীয় মুষ্টির সময় বলতে হবে ‘ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা’। দাফনের পর মাথার দিকে সূরা বাকারার প্রথম তিন আয়াত এবং পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে শেষের তিন আয়াত পাঠ করা মুস্তাহাব। মাটি দেয়ার পর কবরে পানি ছিটিয়ে দেয়া, কোনো গাছের তাজা ডাল পঁুতে দেয়া মুস্তাহাব। সবশেষে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা সুন্নত। কবর অনেক উঁচু করা, চুন-সুরকি দিয়ে পাকা করা বা লেপা মাকরুহ তাহরিমি। সৌন্দর্যের জন্য কবরের ওপর গম্বুজ বা পাকাঘর বানানো হারাম।

সমবেদনা প্রকাশঃ মৃতলোকের ওয়ারিশগণকে সমবেদনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তাদের গৃহে যাওয়া, খাদ্য প্রেরণ করা, ধৈর্যধারণের পরামর্শ দেয়া সুন্নত।

সওয়াব বখশানোঃ অভাবী লোকদের সাহায্য সহযোগিতা, সদকায়ে জারিয়ার কোনো কাজ যেমন- মাদরাসা, মসজিদ নির্মাণ বা আর্থিক সহযোগিতা কিংবা কোনো জনহিতকর কার্য সম্পাদন অথবা ওয়াকফ করা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, নফল ইবাদত প্রভৃতির মাধ্যমে প্রাপ্ত সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বখশানো যায়। মহানবী সাঃ-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাঃ! আমার মা মারা গেছেন। এখন তার জন্য আমি কী করব? মহানবী সাঃ বললেন, ‘তোমার মায়ের জন্য দোয়া করো এবং তার আত্মীয়স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তার ওয়াদাকৃত অসিয়ত থাকলে পূরণ করো, দেনা থাকলে পরিশোধ করো।’ মৃতুøর তিন দিন পর ও চল্লিশ দিনের দিন আমাদের সমাজে আনন্দভোজের মতো করে মানুষকে যে খাওয়ানো হয় তা সম্পূর্ণ বেদায়াত। এতে মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার হয় না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: