চোখ দিয়ে পানি পড়া

চোখ দিয়ে পানি পড়া

সুন্দর সুস্থ চোখ কার না কাম্য? কিন্তু  সেই চোখ হতে কান্না ব্যতিত অনবরত পানি পড়তে থাকলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।

কারন কি?

স্বাভাবিক চোখ সবসময় একটু ভেজা থাকে। অতিরিক্ত পানি চোখের ভেতরের কোনায় অবস্থিত নল (নেত্রনালী) দিয়ে নাকে চলে যায় এবং শোষিত হয়। কোন কারণে চোখে অতিরিক্ত পানি তৈরী হলে, অথবা নেত্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে চোখের পানি উপচে পড়ে, একে লেক্রিমেশন বা এপিফোরা বলে।

শিশুর জন্মের পর পর যদি নেত্রনালী বন্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে চোখ হতে পানি পড়তে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণত: এক বছরের মধ্যে আপনি আপনিই নেত্রনালী খুলে গিয়ে পানি পড়া ভাল হয়ে যায়।

তরুণ বয়সে নেত্রনালীর প্রদাহজনিত কারণে নেত্রনালী সরু হয়ে চোখ হতে পানি পড়তে পারে। এক্ষেত্রে নেত্রনালীতে ইনফেকশন হয়ে পূঁজ জমতে পারে। চোখের ভেতরের কোনায় চাপ দিলে পানি ও পূঁজ বের হতে পারে।

বয়স্ক লোকের নেত্রনালী বয়সজনীত পরিবর্তনের কারণে সরু হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও বয়সের কারণে চোখের চারদিকের মাংশপেশী দূর্বল হবার কারণেও নেত্রনালী অকার্যকর হয়ে চোখ হতে পানি পড়তে পারে।

এছাড়াও নেত্রনালীর সমস্যা ছাড়াও চোখের এ্যালার্জী, চোখ ওঠা রোগ, গ্লুকোমা, কর্ণিয়ার ঘা, চোখের আঘাত ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে যে কোন বয়সে চোখ দিয়ে পানি পড়তে পারে। অতিরিক্ত সর্দি হলে নাকের প্রদাহের কারণে নেত্রনালীর ছিদ্র মুখ বন্ধ হয়ে চোখ হতে পানি পড়তে পারে।

করনীয়:

শিশুদের ক্ষেত্রে নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি পড়লে ডাক্তারের পরামর্শে চোখের কোনায় মালিশ এবং এন্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহারে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পানি পড়া বন্ধ হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রোবিং সার্জারীর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করতে হয়।

তরুণ বয়সে নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি পড়লে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক ড্রপ, কোন কোন ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক / স্টেরইড এর মিশ্রণ ব্যবহার করলে এ সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হয়। চোখে জমে থাকা পূঁজ চোখের কোনায় চাপ দিয়ে নিয়মিত পরিস্কার করা প্রয়োজন। ওষুধে ভাল না হলে ‘ডিসিআর’ অপারেশনের মাধ্যমে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব। বেশী বয়স্কদের নেত্রনালী সংকুচিত হওয়ার কারণে ডিসিআর অপারেশন করা সম্ভব হয়না। সেক্ষেত্রে ডিসিটি অপারেশন করা হয়।  এক্ষেত্রে পূঁজ জমা বন্ধ হয়, কিন্তু পানি পড়া বন্ধ হয়না। যে সব বয়স্ক লোকের ছানিরোগ আছে, আবার তাদের যদি নেত্রনালীর সমস্যার কারণে চোখ হতে পানি ও পূঁজ পড়ে, সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই ছানি অপারেশনের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শে বয়সভেদে ডিসিআর অথবা ডিসিটি অপারেশন করতে হবে, না হলে চোখের কোনায় জমে থাকা জীবানু ছানি অপারেশনের সময় চোখের ভেতরে ঢুকে মারাত্মক ইনফেকশন করতে পারে।  নেত্রনালী সমস্যা ব্যাতিত অন্য কারণে পানি পড়লে সেই কারণ চিহ্নিত করে ডাক্তারের পরামর্শে তার চিকিত্সা করাতে হবে। বর্তমানে লেসার রশ্নির সাহায্যে চামড়া না কেটে অল্পসময়ে ডিসিআর অপারেশন করা সম্ভব, ফলে অপারেশনের পরে চামড়ায় দাগ পড়েনা।

Advertisements

আল্লাহ’তে যার পূর্ণ ঈমান

আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান

ইসলামী ঐতিহ্য কাজী নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ইসলামের পুনর্জাগরণ বা মুসলিম ঐতিহ্য নজরুলের কবিতায় বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়েছিল। তিনি সুফিতত্ত্ব বা সুফিবাদ দ্বারাও প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। ইসলামকে নজরুল তার বিশ্বাসে মণ্ডিত করে প্রকাশ করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলাম যেমন শোষিত মানুষের কবি, বিদ্রোহের কবি, মানবিকতার কবি, তেমনি ইসলামী আকিদা ও ইসলামী সাম্যবাদেরও কবি। ইসলামকে কবি মনে প্রাণে গ্রহণ করেছেন। আবির্ভাব ও তিরোভাব এই দু’টি কবিতার সমন্বয়ে তিনি রচনা করেন ফাতেহা-ই-দোয়াজ দহম কবিতাটি। ইসলামী জোশ সঞ্জীবিত রাখার ক্ষেত্রে নজরুল তার কবিতা ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছেন। ইসলামের ঝাণ্ডাকে নজরুল সবার ঊর্ধ্বে ঠাঁই দিয়েছিলেন। আন্তরিক উচ্চারণে তিনি ছিলেন আল্লাহর রাহে নিবেদিত। নজরুল তাই উচ্চারণ করেনঃ

‘হাসানের মতো পিব পিয়ালা সে জহরের,

হোসেনের মতো নিব বুকে কহরের।

আসগর সম দিব বাচ্চারে কোরবান,

জালিমের দাদ নেবো, দেবো আজ গোর জান।’

নজরুল কাব্যে অধ্যাত্মবাদ এবং ইসলামী সাম্য সূচিত হয়েছে মানবিকতায়। তার ইসলামী কবিতা মানবাত্মার বিকাশ ও মানবিকতার উদ্বোধন। আধ্যাত্মিক শক্তি তার আপন আত্মার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মানবিক ধর্ম হচ্ছে আত্মত্যাগ। এই আত্মত্যাগে ইসলাম আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। ভোগীদের সংহার করার প্রেরণা নজরুল কবিতায় উচ্চারিতঃ

‘কোরবানিরই রঙে রঙিন পরে লেবাস

পিরহানে মাখরে

ত্যাগের গুল-সুবাস,

হিংসা ভুলে প্রেমে মেতে

ঈদগাহেরই পথে যেতে

হে মোবারকবাদ দীনের বাদশাহে।’

নজরুলের ইসলামী গানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য আমাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে আপ্লুত করে। তার ইসলামী চৈতন্য আমাদের আলোড়িত করে। তিনি তার বিশ্বাসকেই মণ্ডিত করেছেন ইসলামী গানে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর জীবন ও কর্মভাষিক কাঠামো পেয়েছে তার কবিতায়ঃ

‘কত যে রূপে তুমি এলে হযরত এই দুনিয়ায়।

তোমার ভেদ যে জানে আখেরি নবী কয় না তোমায়।

আদমের আগে ছিলে আরশ পাকে তার আগে খোদায়।

আদমের পেশানীতে দেখেছি তব জ্যোতি চমকায়।

ছিলে ইব্রাহিমের মধ্যে তুমি ফুল হলো তাই নমরুদের আগুন।

নুহের মধ্যে ছিলে তাই কিশতী তার ডুবলো না দারিয়ায়’

নজরুল তার কবিতায় দেখিয়েছেন যে, ইসলামের যে ধর্মীয় অনুশাসন, সেই অনুশাসনই প্রকৃত পক্ষে মানুষের ধর্ম। নজরুলের কবিতায় যে আত্মোপলব্ধি, সেই আত্মোপলব্ধিই হচ্ছে অধ্যাত্মবাদের মূল কথা; যা ইসলাম ধর্মের শান্তির উপলব্ধির সাথে একাত্মঃ

১। ‘তৌহিদ আর বহুত্ববাদে

বেঁধেছে আজিকে মহাসমর

লা শরিক এক হবে জয়ী

কহিছে আল্লাহু আকবর’

২। ‘মান আরাফা নফসাহু ফাকাদ আরাফা রব্বাহু’

ইসলাম অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো কাজী নজরুল ইসলামের অন্তরের অন্তস্তলে প্রবহমান ছিল। আর তাই ইসলামের অনুশাসনে তিনি তার যাপিত জীবনের আলো হিসেবে ভেবেছেন। আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বাসে, কর্মে তার জীবনে ইসলাম ছিল অবিকল্প। ‘খেয়াপাড়ের তরণী’ কবিতায় নজরুল তাই উচ্চারণ করেনঃ

‘কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা

দাড়ি মুখে সারি গান লা-শরিক আল্লাহ।’

‘মহররম’ কবিতায় নজরুল উচ্চারণ করেনঃ

১। ‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা,

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’

২। ‘লাল শিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া,

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া।’

পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রত্যয়ী হওয়াই নজরুলের ইসলামী গানের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর প্রকৃতি সম্পর্কে নজরুল তাই উচ্চারণ করেনঃ

সকল রঙের খেলার ঊর্ধ্বে পরম জ্যোতি আল্লাহর

দেখেনি যেজন, বুঝিবে না এই আল্লাহর খেলা সংসারে;

নজরুলের কাব্যজীবন স্বভাব ও সচেতনতায় অসাধারণ স্বচ্ছ। কোনো অবস্থাতেই তিনি স্বজাতি ও স্বধর্মকে ভুলে যাননি। বরং রেনেসাঁসী মানুষ হিসেবে নজরুল মুসলিম রেনেসাঁর জন্য অকৃপণভাবে কবিতা ও গান রচনা করেছেন। নজরুল তাই উচ্চারণ করেনঃ

১। ‘আবুবকর উসমান উমর আলী হায়দার

দাঁড়ি যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর।

কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা,

দাড়ি মুখে সারি গান­ ‘লা-শরিক আল্লাহ।’

নজরুল হামদ ও নাত অসংখ্য রচনা করেছেন। আল্লাহর নৈকট্য লাভের ইচ্ছা, প্রার্থনা ও ক্ষমা ভিক্ষাই হচ্ছে হামদের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। ক্ষমা ভিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি যে বিচিত্র কৌশল প্রয়োগ করেছেন, তা আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। হামদে নজরুল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছেন পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার কাছে। এ ক্ষেত্রে তার মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ও সংশয় ছিল না। কায়মনোবাক্যে নজরুল আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করে উচ্চারণ করেনঃ

১। ‘করিও ক্ষমা হে খোদা আমি গোনাহগার অসহায়।’

২। ‘ইয়া আল্লাহ, তোমার দয়া কত, তাই দেখাবে বলে

রোজ-হাশরে দেখা দেবে বিচার করার স্থলে।’

৩। ‘দীন-ভিখারী বলে আমি

ভিক্ষা যখন চাইবো স্বামী,

শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবে নাকো আর।’

মুসলমানদের সামাজিক তামুদ্দুনিক মননের ঐতিহ্যভিত্তিক রূপায়ণে অনির্বাণ প্রেরণার মশাল জ্বালিয়েছেন নজরুল। মুমূর্ষু সমাজের নিপীড়িত মানুষের আলেখ্য রচনার পাশাপাশি সমকালীন যুগসমস্যা ও ইসলামের আদর্শকে সমুন্নত করেছেন তিনি কবিতায়। কালের করালস্রোতে যা কেনো দিনই ভেসে যাওয়া তো দূরে থাক, ্লানও হবে না। নজরুল তার ঈমান রক্ষা ও সুদৃঢ় করার জন্য সমর্পিতচিত্তে ও আন্তরিক উচ্চারণে ইসলামী গান রচনা করেছেনঃ

১। ‘দিকে দিকে পুনঃ জ্বালিয়ে উঠিছে দীন ই ইসলামী লাল মশাল

ওরে বে খবর, তুইও ওঠ জেগে তুইও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল

গাজী মুস্তাফা কামালের সাথে জেগেছে তুর্কী সূর্য-তাজ,

রেজা পহ্‌লবী সাথে জাগিয়াছে বিরানমুলুক ইরানও আজ;

গোলামি বিসরি জেগেছে মিসরী জগলুল সাথে প্রাণ মাতাল।’

২। ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা

শির উঁচু মুসলমান।

দাওয়াত এসেছে নয়া জমানার

ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান।

মুখেতে কলেমা হাতে তলোয়ার

বুকে ইসলামী জোশ দুর্বার

হৃদয়ে লইয়া এশক আল্লাহর

চল আগে চল বাজে বিষাণ।’

মদিনা নজরুলের কাছে কল্পনার প্রতীক নয়, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতীক। তিনি আল্লাহকে নৌকা ভেবে সেই নৌকায় চড়ে মদিনায় যাবার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেনঃ

‘আল্লাহ নামের নায়ে চড়ি যাব মদিনায়

মোহাম্মদের নাম হবে মোর

ও ভাই নদী পথে পূবাল বায়।।

চার ইয়ারের নাম হবে­ মোর সেই তরণীর দাঁড়

কলমা শাহাদাতের বাণী হাল ধরিবে তাঁর।

খোদার শত নামের গুণ টানিব

ও ভাই নাও যদি না যেতে চায়।’

মদিনাকে নিয়ে নজরুলের গুণগানের শেষ নেই। দ্বীনের দাওয়াত, দ্বীন প্রতিষ্ঠায় মদিনার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। আমাদের প্রিয় নবী সে দেশে হিজরত করছিলেন। হাসান হোসেন ফাতেমার পুণ্যস্মৃতিময় এই মদিনায় ভেসে বেড়ায় তৌহিদের বাণী।

%d bloggers like this: