একটি বিজ্ঞাপন কয়েকটি প্রশ্ন

একটি বিজ্ঞাপন কয়েকটি প্রশ্ন

আলী হাসান তৈয়ব

 

 

নীতিহীন পুঁজিবাদের আধিপত্যের যুগে বিজ্ঞাপন ব্যবসা এখন তুঙ্গে। বর্তমানে দেশের সর্বত্র সব মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। এসব বিজ্ঞাপনের অধিকাংশই নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডে অনুত্তীর্ণ। বিজ্ঞাপন-কুশীলবদের পোশাকের ফ্যাশন বা বাচনিক স্টাইল- কোনোটাই দেশের বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই নয়। অনেক বিজ্ঞাপনে নারীকে উপস্থাপন করা হয় পণ্য হিসেবে। কিছু বিজ্ঞাপন সরাসরি ইভটিজিংয়ের রসদ যোগান দেয়। আবার অনেক বিজ্ঞাপন ব্যাখ্যাতীত অশ্লীতার দোষে দুষ্ট। ইতোপূর্বে এইডস বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির বিজ্ঞাপনে কনডমের বাজির দৃশ্য সুস্থ বোধসম্পন্ন অনেক অমুসলিম অভিভাবককে সমালোচনামুখর করে তুলেছিল। এখনো রোজ বেড়ে চলেছে শিল্প রুচিহীন বিকার মানসিকতার বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও তার প্রচার। মাঝে মধ্যেই এ সংক্রান্ত বিভিন্ন লেখা পত্র-পত্রিকা মারফত নজরে পড়ে। বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের ঈদ সাময়িকীতে বিজ্ঞাপনে শারীরিক কসরতের সমালোচনা করে জনপ্রিয় কৌতুকবিদ হানিফ সংকেত একটি সরস রচনাই লিখেন ‘কী জ্ঞাপনের বিজ্ঞাপন’ শিরোনামে। মূলত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে জ্ঞাপন করা হয় তথা কোনো পণ্যের সংবাদ দেয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞাপনে পণ্যের চেয়ে নারীদের শরীরী উপস্থাপনা এত বেশি যে এটি কি পণ্য না শরীরের বিজ্ঞাপন সে প্রশ্ন উত্থাপনও সঙ্গত হয়ে ওঠে?   

অনেক দিন ধরে গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়ে আসছে। গ্রামীণফোন ইন্টারনেট মোডেমের বিজ্ঞাপন সেটি। ‘আলো আসবেই’ শীর্ষক এই বিজ্ঞাপনটিতে দেখানো হয় প্রভাতপূর্ব আঁধার চিরে আলো ফুটছে। দুয়ার-বাতায়ন পেড়িয়ে ঘরে অনাবিল আলো ঢুকছে। আলোর দেখা পেয়ে সবাই ছুটছে বাহির পানে। এরপরেই দেখানো হচ্ছে, গ্রাম্য মক্তবের বালক-বালিকা দল আলোর দেখে তাদের কায়দা-আমপারা ও কুরআন-কেতাব ফেলে বাইরে ছুটছে।  

ছোটবোনের জন্য সিম কিনতে গ্রামীণফোনের এক কাস্টমার সেন্টারে গিয়েছিলাম। সেখানে স্থাপিত বিজ্ঞাপনের পর্দায় প্রথম এ বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। অমনোযোগের সঙ্গে প্রথমবার দেখলেও টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত বালকদের রেহাল-কায়দা ফেলে ছুটে যাওয়ার দৃশ্য আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। মুহূর্তকাল পরেই আমার দৃষ্টি ফিরে এলো সেই পর্দার দিকে। সবিস্ময়ে আমি লক্ষ্য করি মডেমের ওপর নির্মিত এই বিজ্ঞাপনটি। চেষ্টা করি এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে। অবশ্য বেশি দেরি লাগে না। আমার সামনে পরিষ্কার ধরা পড়ে, কুরআনের শিক্ষাকে যারা পশ্চাৎপদতা বলে অভিহিত করেন, মাদরাসা শিক্ষাকে যারা জঙ্গিবাদের উস্কানিদাতা বলে মনে করেন, তাদের উর্বর মগজ থেকেই ধার নেয়া হয়েছে এই বিজ্ঞাপনের থিম। শিউরে উঠলাম এ কথা জেনে, বিজ্ঞাপনটি নাকি টিভি চ্যালেনগুলোতেও ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এ দৃশ্য দিয়ে স্পষ্টতই এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, মক্তব তথা কুরআনের শিক্ষা মানে অন্ধকারের শিক্ষা! ইন্টারনেটের আলো আসা মাত্র এ শিক্ষা ফেলে সবার ছুটে যাওয়া থেকে অন্তত তা-ই প্রতিভাত হয়। কুরআন ও কুরআনী শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের নিরুৎসাহিত করতে চলচ্চিত্র তৈরির পর এখন দেখি বিজ্ঞাপন বানানোও শুরু হয়েছে! জানি না এ কোন অশনি সংকেত। দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করি আমাদের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থী ভাইয়েরা ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি জেনে না জেনে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব লালন করেন।

এখন প্রশ্ন হলো, আসলেই কি কুরআনী শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে অন্ধকারের শিক্ষা দেয়া হয়? বাস্তবেই কি কুরআনের শিক্ষা অন্ধতা ও উগ্রতা ছড়ায়? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আসুন নিচের প্রশ্নগুলোর প্রতি একটু নজর দেয়া যাক।

ক. দেশে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। যৌতুকের বলি হয় অসহায় নারী। ধর্ষণের শিকার হয় বিপন্ন রমণী। এসব অপরাধের কয়টি সংঘটিত হয় কুরআন পড়ুয়াদের হাতে?

খ. প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইভটিজিংয়ের ঘটনা ঘটছে। ইভটিজিংয়ের জ্বালা সইতে না পেরে অনেকে তরুণী আত্মহত্যা করছে। ইভটিজিংয়ে বাধা দেয়ায় শিক্ষককে পর্যন্ত পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। কঠোর আইন আর দেশজুড়ে সমালোচনা সত্ত্বেও এই বখাটেদের নিবৃত করা যাচ্ছে না। এদের কয়জন মক্তবে পড়ুয়া?

গ. প্রেম-পরকীয়ার রেশ ধরে অহরহ খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী আবার স্ত্রীর হাতে স্বামীও খুন হচ্ছে। কোনো প্রচার বা সচেতনতা অভিযান চালিয়েই এদের বাঁচানো যাচ্ছে না। এসব অমানুষদের কয়জন কুরআনী শিক্ষায় শিক্ষিত?

ঘ. কয়দিন পরপরই মিডিয়ায় সশস্ত্র ছাত্রদের মহড়া দেখা যায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। হল দখল ও চাঁদাবাদি-টেন্ডারবাজির শিকার হয়ে খুন হয় নিরপরাধ ছাত্র-ছাত্রীরা। এসব কি কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান?

ঙ. দেশে মাদক ও অবৈধ দেহ ব্যবসা দৈনিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকাসক্তদের হাতে প্রাণ হারাতে হচ্ছে নারী ও শিশু এমনকি আপন পিতামাতাকে। আবাসিক হোটেলগুলো থেকে আপত্তিকর অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে হররোজ ধরে পড়ছে অনেক স্মার্ট ও ভদ্রবেশী তরুণ-তরুণী। এরা কি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত?

আমরা নিশ্চিত কোনো কট্টর কুরআন বিদ্বেষীও এসবের উত্তরে কুরআনী শিক্ষার প্রশংসা বৈ নিন্দা গাইতে পারবেন না। তাহলে কুরআনী শিক্ষার দিকে কেন অন্ধকারের ইঙ্গিত? আসলে এটি ইউরোপ-আমেরিকা ফেরত বুদ্ধিবেপারীদের দালালি আবিষ্কার। এ শুধু ইসলাম আর ইসলামী পোশাকে যাদের এলার্জি রয়েছে তাদের সুরে কথা বলা। যে পশ্চিমা বিশ্ব সন্ত্রাসের মিথ্যা অভিযোগে ইরাক-আফগানে হামলা করে এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থায় পড়েছে, মানবাধিকারের বুলি ফেরি করে বেরানো যে পশ্চিমা প্রভুরা ইরাক-আফগানে নিরীহ নাগরিকদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের সর্বশেষ গোপন নথি প্রকাশ হওয়ায় মহাবিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে- এ কেবল তাদের নির্দেশে পুচ্ছ দুলনো।   

কুরআনী শিক্ষাকে কটাক্ষ করার এই রোগ ইদানীং পশ্চিমের দানাপানি না পাওয়া অনেকের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। সাদা প্রভুদের দান-দাক্ষিণ্যের ভাগ নিয়ে বিলাসী জীবনের স্বপ্নে বিভোর অনেক কালো মনের মানুষও এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছে। এই শ্রেণীর লোকেরাই নির্মাণ করেছে কুরআনী শিক্ষা তথা মক্তব-মাদরাসার দিকে মন্দ ও কুৎসিত ইঙ্গিতপূর্ণ চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ ও ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এবং মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ‘রানওয়ে’ ও ‘প্রতীক্ষা’ ইত্যাদি সিনেমা। খবরের কাগজ ও মিডিয়ার লোকদের মাধ্যমে অন্তত আমি এমনই জেনেছি।

অথচ বাস্তবে একমাত্র কুরআনী শিক্ষাই পারে মানুষকে আলোকিত করতে। শুধু পারে তাই নয়; অতীতে পেরেছে, বর্তমানে পারছে এবং ভবিষ্যতেও পারবে। অতীতে এ কুরআনী আখলাকের বাস্তব নমুনা পেশ করেছেন অন্ধকার পৃথিবীকে আলোয় ভরে দিতে পৃথিবীতে আগমনকারী মুহাম্মাদ রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁর জীবন এতটা আলোকময় ছিল যে অমুসলিম মনীষীরাও তা স্বীকার করেছেন  অকৃপণভাবে। তাই তো তাঁকে একজন অমুসলিম মাইকেল এইচ হার্ট পৃথিবীর সেরা শত মনীষীর জীবনীতে তাঁকে প্রথম স্থানে রাখেন। কী এমন উপাদান, কী এমন বৈশিষ্ট ছিল তাঁর জীবনীতে? চলুন তবে তাঁর সহধর্মিনীর জবানীতে শোনা যাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র কেমন ছিল এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ

‘হুবহু কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।’ [মুসনাদ আহমদ : ২৫১০৮; আল-আদাবুল মুফরাদ : ৩০৮।]

আর ভবিষ্যতেও পারার গ্যারান্টি শুধু কুরআনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, কিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকার গ্যারান্টি শুধু এ মহাগ্রন্থেরই রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ﴾  [الحجر :09]

‘নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী।’ {সূরা আল-হিজর, আয়াত : ০৯}

কুরআনের শিক্ষাই চৌদ্দশ বছর আগে জাহিলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত মরু অধিবাসীদের পরিণত করেছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবগোষ্ঠী। এ কুরআনী শিক্ষাই পেরেছিল অশান্তি ও হানাহানিপূর্ণ পৃথিবীকে শান্তিতে ভরে দিতে। যেদিন থেকে ধূলির ধরায় কুরআনের আগম ঘটেছে সেদিন থেকেই এ শিক্ষা তার ধারক-বাহকদের বানিয়েছে আলোকিত মানুষ। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশে তারাই সবচে সুনাগরিক যারা কুরআনের আলোয় আলোকিত। কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

﴿قَدۡ جَآءَكُم مِّنَ ٱللَّهِ نُورٞ وَكِتَٰبٞ مُّبِين﴾  [الحجر :[15

‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।’ {সূরা আল-মায়িদা, আয়াত : ১৫) অর্থাৎ, এ কুরআন মানব জীবনে আলোর উৎস। মানব চরিত্রে আলোর যোগানদাতা। কুরআনের আলোয় উদ্ভাসিত জীবনই আলোকিত জীবন।   

প্রসঙ্গত বলা দরকার, আমাদের মিডিয়াগুলো এইডস, মাদক ও যৌতুকের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সরব। শুধু তাই নয়, অনেক পত্রিকাকে দেখা যায়, মাদক ও যৌতুকের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে। অথচ তারা একটিবার একথা বলেন না, বাংলাদেশের লাখ লাখ কুরআনী শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের কেউই মাদকাসক্ত নয়। এদের কাউকে ধূমপান ছাড়াতে কোনো প্রচারণাও চালাতে হয় না। এদের কেউই যৌতুকের জন্য স্ত্রীর ওপর নির্যাতন চালান না। এরা সবাই সব ধরনের জেনা-ব্যভিচার থেকে দূরে থাকার ফলে এইডসসহ যাবতীয় মারণব্যাধি থেকে মুক্ত।

কৈশোরের ঊষালগ্নে যখন শিশুদের বুদ্ধির উন্মেষ ঘটে তাদের হৃদয়-মন থাকে তখন সফেদ নির্মল। সেখানে যা-ই রাখা হয় স্থায়ীভাবে তা-ই অঙ্কিত হয়ে যায়। সেখানে যদি সত্য, সুন্দর ও সুকর্মের বীজ বপণ করা হয়, তা-ই হয় তার আজীবনের পাথেয়। এ জন্যই প্রতিটি বুদ্ধিমান জাতি নিজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিস্তরঙ্গ শৈশবে তার ভেতরে আদর্শ ও ঐতিহ্যের বীজ বুনে দেয়। শিশুরা যদি শিক্ষা জীবনের শুরুতেই মক্তব বা পাঠশালায় কুরআনের শিক্ষায় আলোকিত হতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ জীবনে তারা যেখানেই পড়ুক কিংবা যাই পড়ুক তা তাদেরকে সুপথ দেখাবে।

তাই আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, কুরআনী শিক্ষার প্রতি সব ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। সন্ত্রাস ও অশান্তিমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে চাইলে, আদর্শ ও সুনাগরিক সৃষ্টি করতে হলে কুরআনী শিক্ষার প্রসার ঘটান। দেশের প্রতিটি এলাকায় কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন। নতুন শিক্ষানীতিতে কুরআনী শিক্ষাকে উপেক্ষা নয়; বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নিন। অন্যথায় দেশের সুখ-সমৃদ্ধি অধরাই থেকে যাবে। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবার জীবনকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করুন। কুরআনের ছাঁচে আমাদের জীবন গড়ার তাওফীক দিন। আমীন।

 

ইসলাম হাউস

Advertisements

শিশুর মানসিক বিকাশে

শিশুর মানসিক বিকাশে

প্রাকৃতিক ভাবেই একটি শিশু বেড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে তার মেধা ও মনন। শিশুর এই মানসিক বিকাশ অনেকখানিই নির্ভর করে তার পরিচর্যার উপর। শিশুর সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে অভিভাবকদেরও তাই কিছু দায়িত্ব ও করণীয় আছে। 

১. দুষ্টমি করাই শিশুর স্বাভাবিক  ধর্ম। তাকে সারাক্ষণ কড়া শাসনের  মধ্যে রাখবেন না।

২. সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু স্বভাবতই চঞ্চল। তাকে প্রতিনিয়ত উত্সাহ  দিন এবং শক্তি ও সাহস যোগান। অহেতুক ভয় দেখিয়ে তাকে ভীত করে তুলবেন না।

৩. শিশুকে বইয়ের বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে গল্প বলুন। তাকে ছবির বই এর বিভিন্ন প্রাণী, ফুল, ফল এবং প্রাকৃতিক জিনিসের নাম,রং চিনিয়ে দিন। 

৪.  শিশুর মনে সারাক্ষণই নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়। তার সকল কৌতুহলী প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না, উত্তর দিন বুদ্ধি খাটিয়ে। ধমক দিবেন না।

৫. শিশুকে নিয়ে প্রতিদিন কিছুক্ষণের জন্য বেড়াতে বের হোন এবং চারপাশের সবকিছু সম্পর্কে তার সাথে কথা বলুন।

৬. শিশু সঠিক কাজ করলে তাকে প্রশংসা করুন এবং তাকে  উত্সাহিত করুন আর ভুল কিছু করলে বকাবকি না করে বা শাস্তি না দিয়ে তাকে ভালভাবে বুঝিয়ে ভুলটি ধরিয়ে দিন।

৭.     শিশুকে খুব বেশী পরনির্ভরশীল করবেন না।

৮. শিশুর সামনে ঝগড়া ঝাটি, কান্নাকাটি, জিনিস ছুঁড়ে শব্দ করা, বকা বা মারধোর করা ইত্যাদি করা থেকে দূরে থাকুন। 

৯. লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশুকে খেলাধুলা বা অন্যকিছুতে উত্সাহ দিন। তার হাতে পেন্সিল, কাগজ দিয়ে ছবি আঁঁকা শেখান।

কীভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসব?

কীভাবে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসব?

মুমিন মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত পোষণ করে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত রাখা ঈমানের এক অপরিহার্য অংশ। পরম শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা আর বিপুল মমতার এক চমৎকার সংমিশ্রণের সমন্বিত রূপ হচ্ছে ‘মহব্বত’ নামের এ আরবী অভিব্যক্তিটি। 

ঈমানের আলোকে আলোকিত প্রত্যেক মুমিনের হৃদয় আলোড়িত হয়, শিহরিত হয়, মনে আনন্দের বীনা বাজতে থাকে যখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারিত হয়, তাঁর জীবন-চরিত আলোচিত হয় কিংবা তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী পাঠ করা হয়। সত্যের দীক্ষায় দীক্ষিত হৃদয় তাঁর আদর্শের শ্রেষ্ঠতায় ও সৌন্দর্যে মোহিত হয়, উম্মতের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসায় আপ্লুত হয়। তাঁর একনিষ্ঠ দিক নির্দেশনায় পথ খুঁজে পায় পথহারা বিভ্রান্ত মানব সন্তানেরা, আর দুর্বল চিত্তের লোকেরা ফিরে পায় মনোবল। মানবতার কল্যাণকামীরূপেই আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করেছেন এ বিপর্যস্ত ধরাধামে। সত্যিই তিনি তাঁর যুগের যমীনকে মুক্ত করেছেন অশান্তির দাবানল হতে, উদ্ধার করেছেন অজ্ঞানতা ও মুর্খতার নিকষ অন্ধকার হতে। তাইতো জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে বরণ করে নিয়েছে মানবতার বন্ধুরূপে।

সত্যের এহেন প্রতিষ্ঠাতা, চারিত্রিক মাধূর্য ও ব্যবহারিক সৌন্দর্যের এমন রূপকারের প্রতি একটু বেশী পরিমাণে ভালোবাসা পোষণ করা এবং তাঁর প্রতি পাহাড়সম প্রগাঢ় শ্রদ্ধা রাখা মুমিন জীবনে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ইসলামী শরী‘আত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত পোষণকে ওয়াজিব ও অপরিহার্য বলে আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ বলেন,

﴿قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُكُمۡ وَإِخۡوَٰنُكُمۡ وَأَزۡوَٰجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٰلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَٰرَةٞ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡكُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٖ فِي سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِيَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَٰسِقِينَ ٢٤﴾  [التوبة: 24]

‘‘বল, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দ হওয়ার আশংকা তোমরা করছ, এবং সে বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তার পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত।’’ [আত-তাওবাহ: ২৪]

যাদের কাছে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক প্রিয় নয়, তাদেরকে আল্লাহ এ আয়াতটিতে ভীষণ আযাবের হুমকি দিয়েছেন। ওয়াজিব ও অপরিহার্য কাজ বর্জন না করলে এ ধরনের হুমকি দেয়া হয় না।

ইমাম বুখারী রাহেমাহুল্লাহ আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِه»

‘‘শপথ ঐ সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান হতে অধিকতর প্রিয় হব।’’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩]

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»

‘‘তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয়তম না হই।’’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮]

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ না করলে ঈমানদার বলে কেউ বিবেচিত হবে না। অতএব ঈমানের অনিবার্য দাবী হল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা।

তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা পোষণে আমাদের সমাজের সকল মুসলিম ভাই ও বোনেরা ব্যালেন্স রক্ষা করতে পারেন না। দেখা যায় যে, একদল লোক তাঁর মহব্বতে পাগলপারা হয়ে তাকে অতিমানবীয় পর্যায়ে উন্নীত করে এবং তাঁকে আল্লাহর বহু গুণাবলীতে শরীক করে। যেমন তিনি গায়েব জানেন, মৃত্যুর পরও মানুষের ভাল-মন্দ করতে পারেন, মানুষের জন্য দো‘আ করেন ও দো‘আ কবুল করতে পারেন, তিনি এখনই আমাদের শাফা‘আত কবুল করতে পারেন ইত্যাদি আরো নানাবিধ ভ্রান্তিপূর্ণ আকীদা পোষণ। আরেকদিকে অন্যদল তাকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে ফেলে অন্য মানুষের মতই তাকে ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয় বলে বিশ্বাস করে। এদের কেউ কেউ তাঁর মুখনিঃসৃত কোন কোন হাদীস ও আমলকে অস্বীকার করে। ফলে তাঁকে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা এ প্রকার লোকেরা অনুভব করে না।

এ উভয় শ্রেণীর লোকেরা প্রকৃতপক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যিকার ভাবে মহব্বত করা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করছে। কারণ তারা এমন সব কাজ করছে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তাদের মহব্বতের দাবীর অসারতা প্রমাণ করছে। এসব কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

১. প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ থেকে দূরে সরে থাকা:

সুন্নাহ থেকে অপ্রকাশ্যে দূরে থাকার উদাহরণ হল: যেমন মৌলিক ইবাদতসমূহকে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব প্রথা মনে করা এবং আল্লাহর কাছে সাওয়াবের আশা না করেই এগুলো পালন করা, অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা ও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা, তাঁর প্রতি হৃদয়ে মহব্বত পোষণ না করা, সুন্নাহ ভুলে যাওয়া ও তা না শেখা এবং এর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করা।

আর প্রকাশ্যে সুন্নাহ থেকে দূরে সরে থাকার উদাহরণ হল: ওয়াজিব ও মুস্তাহাব পর্যায়ের দৃশ্যমান সুন্নতী আমল ত্যাগ করা, যেমন ‘‘রাতেব’’ তথা সুন্নাতে মোয়াক্কাদা নামের সালাতসমূহ, বিতর এর সালাত, খাওয়া ও পরার সুন্নাতসহ, হজ্জ ও সিয়ামের নানাবিধ সুন্নাত পরিত্যাগ করা। এমন কি কেউ কেউ এগুলোকে নিতান্ত ফুজুলী বা অতিরিক্ত কাজ বলে মনে করে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একটি  হাদীসে বলেন,

«فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي»

‘‘অতঃপর যারা আমার সুন্নাত থেকে বিরাগভাজন হয়, তারা আমার দলভুক্ত নয়।’’[সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৬৩ , সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৪৬৯]

২. বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ প্রত্যাখ্যান করাঃ

যুক্তির বিচারে উত্তীর্ণ নয় কিংবা বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ নয় অথবা এ হাদীস অনুযায়ী বর্তমানে আমল করা সম্ভব নয় ইত্যাদি নানা যুক্তিতে সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীস অস্বীকার করা কিংবা সেগুলোকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে অপব্যাখ্যা করে মনগড়া অর্থে প্রণয়ন করা। অনেকে একজন রাবীর বর্ণনা হওয়ার কারণেও খবরে আহাদকে অস্বীকার করে। কেউ কেউ আবার শুধুমাত্র কুরআন দ্বারা আমালের অজুহাত দেখিয়ে সুন্নাহকে অস্বীকার করে। অথচ আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ﴾ [الحشر:7]

‘‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।’’ [সূরা আল হাশরঃ ৭]

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত অনুসরণ থেকে সরে আসাঃ

প্রগতি ও উন্নতির প্রভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত ও আদর্শ অনুসরণ হতে সরে এসে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতি ঝুঁকে পড়তে দেখা যায় অনেককে। এর চেয়ে মারাত্মক হল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজের সাথে অন্যদের কথা-কাজ তুলনা করে সাধারণের উদ্দেশ্যে পেশ করা। এতে সাধারণ মানুষ রাসূলের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজ ইসলামী শরী‘আতেরই অংশ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [النجم:8]

‘‘এতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি প্রেরণ করা হয়।’’ [আন নাজমঃ ৪]

৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আলোচনার সময় মনসংযোগ না করা এবং আগ্রহের সাথে শ্রবণ না করা অথচ আল্লাহ বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَرۡفَعُوٓاْ أَصۡوَٰتَكُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ ٱلنَّبِيِّ وَلَا تَجۡهَرُواْ لَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ كَجَهۡرِ بَعۡضِكُمۡ لِبَعۡضٍ﴾ْ [الحجرات:2]

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর আওয়াজের উপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চস্বরে কথা বল, তার সাথে সেকরকম উচ্চস্বরে কথা বলো না।’’ [সূরা হুজুরাতঃ ২]

৫. সুন্নার যারা প্রকৃত অনুসারী তাদেরকে ত্যাগ করা, তাদের গীবিত করা ও তাদেরকে উপহাস করা।

৬. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য ও তার মুজিযাসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান না রাখা।

৭. দ্বীনের মধ্যে নানা প্রকার বিদআত চাল করা।

দেখা যায়, অনেক লোক ইবাদাতের নামে নানাবিধ বিদ‘আত চালু করেছে আমাদের সমাজে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদ‘আত থেকে উম্মতকে সাবধান করেছেন। এদেরকে যখন বিদ‘আত ছেড়ে দেয়ার আহবান জানানো হয়, তখন তারা বিদ‘আতকে আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে।

৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্কে বাড়াবাড়িঃ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বাড়াবাড়ির অর্থ হচ্ছে তাঁকে নবুওয়াত ও রিসালাতের উর্ধ্বে স্থান দেয়া এবং অনেকক্ষেত্রে আল্লাহর গুণাবলীতে তাঁকে শরীক করা ও তাঁর কাছে দো‘আ করা, শাফা‘আত চাওয়া ইত্যাদি। অথচ সহীহ বুখারীর বর্ণনায় তিনি স্বয়ং বলেন,

«لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ»

‘‘তোমরা আমার সম্পর্কে অতিরঞ্জন করো না, যেমন নাসারাগণ অতিরঞ্জন করেছে ইবনু মারইয়াম সম্পর্কে। আমি তো শুধূ আল্লাহর বান্দা। বরং তোমরা বলো – (আমি) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।’’

সুনান আবি দাউদে একটি হাদীসে বলা হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«لا تجعلوا قبري عيدا وصلوا علي فإن صلاتكم تبلغني حيث كنتم»

‘‘তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থলে পরিণত করো না, আর আমার উপর সালাত পড়। কেননা তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের সালাত আমার কাছে পৌঁছে।’’ [সহীহ সুনান আবি দাউদ, হাদীস নং ২০৪২]

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় তিনি আরো বলেন,

«لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسْجِدًا»

‘‘আল্লাহ লানত করুন ইহুদী ও নাসারাদেরকে, তারা তাদের নবীদের কবরকে মাসজিদরূপে গ্রহণ করেছে।’’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৩০, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১২]

৯. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত ও দরূদ পাঠ না করাঃ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পাঠ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। অথচ তার নাম উচ্চারণ করে অথবা শুনে অনেকেই দরূদ ও সালাম পাঠ করে না। তিরমিযীর একটি বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

‘‘ঐ ব্যক্তির নাক ধুলি ধুসরিত হোক যার কাছে আমার উলেস্নখ করা হয় কিন্তু সে আমার উপর সালাত পাঠ করেনি।’’

তিরমিযী অন্য আরেকটি বর্ণনায় তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

‘‘কৃপণ ঐ ব্যক্তি, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হয় অথচ সে আমার উপর সালাত পাঠ করেনি।’’

উপরোক্ত বিষয়ের সবগুলোই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহব্বতের পরিপন্থি। সুতরাং আজ যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার শরয়ী দায়িত্ব পালন করে নিজেদের ঈমানের যথার্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়, তাদের উচিত উপরোক্ত দল দু’টির চিন্তা-চেতনা ও কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে আসা এবং শরী‘আত তাঁর জন্য ভালোবাসার যে উপায়, উপকরণ ও উপাদান নির্ধারণ করেছে তা সত্যিকারভাবে অনুসরণ করা। ‘তাঁকে ভালবাসি’ – মুখে এ দাবী করে জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁকে ও তাঁর আদর্শকে উপেক্ষা করা যেমন ভালোবাসার দাবীকে অসার প্রমাণিত করে, তেমনি অতিরিক্ত ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে তাঁকে স্রষ্টার সমপর্যায়ে উন্নীত করাও অত্যন্ত গর্হিত ও শরী‘আতের দৃষ্টিতে প্রত্যাখ্যাত।

ইসলামী শরীআত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যেভাবে ভালোবাসার নির্দেশনা আমাদেরকে দিয়েছে নিম্নে আমরা সে বিষয়টি তুলে ধরছিঃ

১. সকল মানবের উপর রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়াঃ

আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টির আদি ও অন্তের সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন সর্বশেষ নবী, নবীদের নেতা ও সর্দার। সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِى هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِى مِنْ بَنِى هَاشِمٍ»

‘‘আল্লাহ ইসমাঈলের সন্তান থেকে কিনানাকে চয়ন করেছেন এবং কিনানা থেকে কুরাইশকে নির্বাচন করেচেন। আর কুরাইশ থেকে চয়ন করেছেন বনু হাশিমকে এবং আমাকে চয়ন করেছেন বনু হাশিম থেকে।’’ [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬০৭৭]

সহীহ মুসলিমের আরেকটি বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ فَخْرَ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ»

‘‘আমি আদম সন্তানের নেতা এবং এতে কোন অহংকার নেই। আর আমি ঐ ব্যক্তি প্রথম যার কবর বিদীর্ণ হবে, প্রথম যিনি শাফা‘আতকারী হবে এবং প্রথম যার শাফা‘আত কবুল করা হবে।’’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বের আকীদা, মনে-মগজে ধারণ করার অর্থই হল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্ভ্রম পোষণ করা এবং তাকে যাবতীয় সম্মান ও মর্যাদা দেয়া।

২. সকল ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আদব ও শিষ্টাচার রক্ষা করাঃ

নিম্ন বর্ণিত রূপে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শিষ্টাচার রক্ষা করা যায়।

ক. উপযুক্ত বাক্য দ্বারা তার প্রশংসা করা। এক্ষেত্রে আল্লাহ রাববুল আলামীন যেভাবে তার প্রশংসা করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং তাঁর নিজ সম্পর্কে বলার জন্য যা শিখিয়ে দিয়েছেন, তাই হলো তাঁর প্রশংসা করার জন্য সর্বোত্তম অভিব্যক্তি। সালাত ও সালাম পেশের মাধ্যমে এ কাজটি অতি উত্তমভাবে আদায় হয়। আল্লাহ বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا ٥٦﴾ [الأحزاب:56]

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতাগণ নবীর উপর সালাত পেশ করেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার উপর সালাত ও সালাম পেশ কর।’’ [সূরা আহযাবঃ ৫৬]

সালাত ও সালাম রাসূলের স্তুতি বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম বলেই তাশাহুদ, খুতবা, সালাতুল জানাযা, আযানের পর ও যে কোন দো‘আর সময়সহ আরো বহু ইবাদাতে তা পেশ করার নিয়ম করে দেয়া হয়েছে; বরং তার উপর সালাত ও সালাম পেশ আলাদাভাবেই একটি ইবাদাত হিসেবে স্বীকৃত।

খ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা, ফযীলত, বৈশিষ্ট্য, মু‘জিয়া ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তাঁকে বেশী বেশী স্মরণ করা। মানুষকে তাঁর সুন্নাহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা, তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও উম্মতের উপর তাঁর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, তাঁর সীরাতকে সদাপাঠ্য বিষয় বস্তুতে পরিণত করা। এর মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সদা জাগরুক থাকবে।

গ. শুধু ‘মুহাম্মদ’ নামে তাকে উল্লেখ না করা, বরং এর সাথে ‘নবী’ বা ‘রাসূল’ সংযোজন করে সালাত ও সালাম পাঠ করা। আল্লাহ বলেন,

﴿لَّا تَجۡعَلُواْ دُعَآءَ ٱلرَّسُولِ بَيۡنَكُمۡ كَدُعَآءِ بَعۡضِكُم بَعۡضٗاۚ﴾ [النور:63]

‘‘তোমরা একে অপরকে যেভাবে ডাক, রাসূলকে তোমাদের মধ্যে সেভাবে আহবান করো না।’’ [সূরা নূরঃ ৬৩]

ঘ. মসজিদে নববীতে কেউ এলে এ মসজিদের আদব রক্ষা করা, বিশেষ করে তাঁর কবরের পাশে এসে স্বর উচ্চ না করা। উমর রাদিয়াল্লাহ আনহু একদল লোককে এজন্য খুব সতর্ক করেছিলেন। পাশাপাশি তাঁর শহর মদীনা মুনাওয়ারার সম্মান রক্ষা করাও অপরিহার্য।

ঙ. তাঁর হাদীসের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, হাদীস শোনার সময় ধৈর্য ও আদবের পরিচয় দেয়া, হাদীস শেখার প্রতি অনুপ্রাণিত হওয়া। এক্ষেত্রে এ উম্মতের প্রথম প্রজন্মসমূহের আদর্শ অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সব বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য বলে প্রতিপন্ন করাঃ

এসব বিষয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল- ঈমানের মৌলিক বিষয়সমূহ, দ্বীনের মৌল স্তম্ভসমূহ, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে তাঁর দেয়া যাবতীয় সংবাদ ইত্যাদি। তাঁর সত্যতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

﴿وَٱلنَّجۡمِ إِذَا هَوَىٰ ١ مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمۡ وَمَا غَوَىٰ ٢ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [النجم:1-4]

‘‘শপথ তারকার, যখন তা অস্ত যায়। তোমাদের সাথী (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  ভ্রষ্ট হননি  এবং বিভ্রান্তও হননি। তিনি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কোন বক্তব্য প্রদান করেননি। এতো শুধুই ওহী, যা তাঁর কাছে প্রেরিত হয়।’’ (সূরা নাজমঃ ১-৪)

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেয়া সংবাদকে অসত্য বলা ও একে কোন অপবাদ দেয়া হল সম্পূর্ণ কুফুরী ও মারাত্মক অশিষ্টতা, যার কোন ক্ষমা আল্লাহর কাছে নেই। আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَا كَانَ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانُ أَن يُفۡتَرَىٰ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلَٰكِن تَصۡدِيقَ ٱلَّذِي بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَتَفۡصِيلَ ٱلۡكِتَٰبِ لَا رَيۡبَ فِيهِ مِن رَّبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٣٧ أَمۡ يَقُولُونَ ٱفۡتَرَىٰهُۖ قُلۡ فَأۡتُواْ بِسُورَةٖ مِّثۡلِهِۦ وَٱدۡعُواْ مَنِ ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣٨ بَلۡ كَذَّبُواْ بِمَا لَمۡ يُحِيطُواْ بِعِلۡمِهِۦ وَلَمَّا يَأۡتِهِمۡ تَأۡوِيلُهُۥۚ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۖ فَٱنظُرۡ كَيۡفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلظَّٰلِمِينَ ٣٩﴾ [يونس:37-39]

 ‘‘আর এ কুরআন তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো থেকে রচিত নয়, বরং এ হচ্ছে তার পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপাদনকারী এবং সে গ্রন্থের বিশদ বিবরণ যা রাববুল আলামীনের পক্ষ থেকে সন্দেহাতীতভাবে অবতীর্ণ। তারা কি বলে যে, সে তা রচনা করেছে? বল, তাহলে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে এস এবং তোমাদের সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক। বরং যে জ্ঞান তাদের আয়ত্বে নেই সে সম্পর্কে তারা মিথ্যাচার করছে….।’’(সূরা ইউনুসঃ ৩৭-৩৯)

ইমাম ইবনুল কাইয়েম বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শিষ্টাচারিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল- তাঁর সবকিছু পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়া ও তাঁর নির্দেশের আনুগত্য করা, তাঁর দেয়া সব সংবাদ সত্য বলে মেনে নেয়া এবং খেয়ালের বশবর্তী হয়ে যুক্তির খাতিরে তা প্রত্যাখ্যান না করা কিংবা কোন সংশয়ের কারণে তাতে সন্দেহ প্রকাশ না করা অথবা অন্য লোকদের মতামত ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্যাসকে তাঁর উপর প্রাধান্য না দেয়া।’’ [মাদারিজুস সালেকীন ২/৩৮৭]

৪. তাঁর ইত্তেবা করা, আনুগত্য পোষণ ও তাঁর হিদায়াতের আলোকে পরিচালিত হওয়াঃ

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا ٢١ ﴾ [الأحزاب:21]

 ‘‘নিশ্চয় রাসূলুল্লাহর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ, বিশেষ করে ঐ ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা পোষণ করে এবং আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করে।’’ [সূরা আহযাবঃ ২১]

ইমাম ইবনু কাসীর বলেন, ‘‘সকল কথা, কাজ ও অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণের ক্ষেত্রে এ আয়াতটি একটি মৌলিক দলীল।’’ [তাফসীরুল কুরআনিল আযীম: ৩/৪৭৫]

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

﴿مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظٗا ٨٠﴾ [النساء:80]

 ‘‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল আমি তো তোমাকে তাদের হেফাযতকারী রূপে প্রেরণ করিনি।’’ [সূরা নিসাঃ ৮০]

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا ٥٩﴾ [النساء:59]

 ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুসরণ কর আল্লাহর এবং অনুসরণ কর রাসূলের; আর তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তাদের। আর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিতণ্ডায় লিপ্ত হও, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের (সমাধানের) দিকে ফিরে আস, যদি তোমরা ঈমান পোষণ করে থাক আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি। এটাই পরিণামের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম।’’ [সূরা নিসাঃ ৫৯]

এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই অসংখ্য হাদীসে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেছেন।

৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের বিধান দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়াঃ

এ বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার অন্যতম একটি মানদন্ড। এর বাস্তবায়ন না হলে ভালোবাসা তো নয়ই বরং ঈমানের দাবীও কেউ করতে পারে না। সেটিই আল্লাহ বলেছেন এভাবে,

﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء:65]

 ‘‘তোমার রবের শপথ! কক্ষণও নয়, তারা ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না তারা তোমাকে নিজেদের মধ্যকার বাদানুবাদের ক্ষেত্রে হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নেয়, অতঃপর তুমি যে মিমাংসা করে দাও তাতে তাদের মনে কোন দ্বিধা তারা রাখে না এবং পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়।’’ [সূরা নিসাঃ ৬৫]

ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘‘যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত থেকে বের হয়ে যায়, আল্লাহ নিজে তাঁর পবিত্র সত্ত্বার কসম করে বলেছেন যে, তারা ঈমানদার নয়।’’ [মাজমু আল ফাতাওয়া ২৮/৪৭১]

৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে অবস্থান নেয়াঃ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহব্বত করার একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ও বড় উপায় হচ্ছে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেয়া ও তাঁকে সাহায্য করা। আল্লাহ বলেন,

﴿لِلۡفُقَرَآءِ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمۡ وَأَمۡوَٰلِهِمۡ يَبۡتَغُونَ فَضۡلٗا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٗا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ ٨﴾ [الحشر:8]

‘‘যে সকল দরিদ্র মুহাজিরকে তার বাসস্থান ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত করা হয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে, তারাই হল সত্যবাদী।’’ [সূরা হাশরঃ ৮]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে অবস্থান নেয়া ও তাঁকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে চমৎকার ও সত্যিকার সব উদাহরণ পেশ করেছেন তাঁরই প্রিয় সাহাবাগণ। আজকের প্রেক্ষাপটে যেখানে বিভিন্ন দেশের অমুসলিমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্নক কথা বলছে, সেখানে আমাদের উচিত তার প্রতিবাদ করা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে অবস্থান নেয়া। অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশের সারবত্তা তুলে ধরা ও মানুষকে তা মেনে নেয়ার আহবান জানানোই হল মূলত আজকের প্রেক্ষাপটে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য করার অর্থ।

৭. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহব্বত করার আরেকটি উপায় হল তাঁর প্রিয় সাহাবাদেরকে ভালোবাসা ও তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়া, তাদেরকে আমাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ ও তাদের সুন্নাতের অনুসরণ করা। আল কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সাহাবাদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন এবং তাদের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন ও তাদের প্রতি তিনি যে সন্তুষ্ট সে ঘোষণাও দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে সাহাবাগণের প্রতি ভালোবাসা পোষণের মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা আরো পাকাপোক্ত হয়।

৮. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের প্রচার ও প্রসার করা তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণের অন্যতম একটি উপায়। নিজের জীবনে সুন্নাতকে বাস্তবায়ন না করে এবং সুন্নাতের প্রচার প্রসারের জন্য কোনরূপ চেষ্টা না করে শুধু মৌখিকভাবে তাঁকে ভালোবাসার দাবী করলেই তাঁর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা হয় না- বিষয়টি সবার কাছেই স্পষ্ট। আজ আমাদের সমাজে যেখানে সুন্নাত ও বিদ‘আতের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ঘটেছে, অথবা যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্নাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিংবা তথাকথিত কতিপয় আধুনিক শিক্ষিতরা সুন্নাতের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করছে, সেখানে সত্যিকার সুন্নাতের বিপুল প্রচার ও প্রসার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার দাবীদারদের উপর এক অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে এ কথা বলে শেষ করবো যে, আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে জানা, বোঝা ও আমল করার মাধ্যমে আমাদের প্রিয় নেতা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রকৃত অর্থেই ভালোবাসার তাওফীক  দিয়ে আমাদের ঈমানকে পরিপূর্ণ করে দেন। আমীন।

ইসলাম হাউস

%d bloggers like this: