অতিরিক্ত গরম ও স্বাস্থ্য সমস্যা

অতিরিক্ত গরম ও স্বাস্থ্য সমস্যা

চলছে গ্রীষ্মকাল। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরমে চারদিক বেশ অস্থির। সেই সঙ্গে রয়েছে আর্দ্রতা। ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত। বাড়ছে গরমের স্বাস্থ্য সমস্যা, রোগ-জ্বরা। ঘামাচি কিংবা পানিস্বল্পতার মতো সমস্যা প্রায় প্রত্যেকেরই হচ্ছে, আবার কেউ কেউ হিটস্ট্রোকের মতো মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এর সঙ্গে হতে পারে অবসাদ, এলার্জি, সূর্যরশ্মিতে চামড়া পুড়ে যাওয়া, হজমের অভাবে বমি বা ডায়রিয়াজনিত রোগ ইত্যাদি।

গরমের কারণে সৃষ্ট সমস্যা
গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয় তা হলো পানিস্বল্পতা। প্রচুর ঘামের কারণে পানির সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। সাধারণত এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা গরমের খুবই সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি এবং যারা বাইরে কাজ করেন ও প্রয়োজনমত পানি পান করার সুযোগ পান না, তারাই মারাত্মক পানিস্বল্পতায় আক্রান্ত হন বেশি। এক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং কিডনির সমস্যা হওয়াও বিচিত্র নয়।
পানিস্বল্পতা ছাড়াও গরমের কারণে ত্বকে ঘামাচি ও এলার্জি হতে পারে। গরমের কারণে অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হয় যার চাপে ঘর্মগ্রন্থি ও নালী ফেটে যায়, ফলে ত্বকের নিচে ঘাম জমতে থাকে। এটাই ঘামাচি। অনেক সময় ঘাম ও ময়লা জমে ঘর্মনালীর মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং সেখানে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। এতে ঘামাচি ও এলার্জি বেড়ে যায় এবং ঘামে প্রচুর গন্ধ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া ছাড়াও ঘাম ও ময়লার কারণে ছত্রাকজনিত রোগও এসময়ে বেশি হয়।
গরমে যারা সরাসরি সূর্যের আলোর নিচে বেশিক্ষণ থাকেন তাদের ত্বক পুড়ে যেতে পারে। এতে ত্বক লাল হয়ে যায়, জ্বালাপোড়া করে, চুলকায় এবং ফোস্কা পড়ে। মূলত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিই এর জন্য দায়ী। যারা একটু ফর্সা বা যাদের ত্বক নাজুক, তাদের এ সমস্যা বেশি হয়।
গরমের সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো হিটস্ট্রোক। শুরুতে হিট স্ট্রোকের আগে হিট ক্যাম্প দেখা দেয় যাতে শরীরে ব্যাথা করে, দুর্বল লাগে এবং প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। পরে হিট এক্সহসশানে দেখা দেয়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, মাথা ব্যথা করে এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফা. ছাড়িয়ে যায়। একে হিট স্ট্রোক বলে।

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
তাপমাত্রা দ্রুত ১০৫ ডিগ্রি ফা. ছাড়িয়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায় এবং ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যায়, নিঃশ্বাস দ্রুত হয়, নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, রক্তচাপ কমে যায়, খিঁচুনি হয়, মাথা ঝিমঝিম করে এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ করতে থাকে। রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, অজ্ঞান হয়ে যায়। এ অবস্থায় রোগী শকেও চলে যেতে পারে।
গরমের সরাসরি প্রভাব ছাড়াও অন্য আনুষঙ্গিক সমস্যা হতে পারে। অনেকেই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে বাইরে পানি বা শরবত খান, যা অনেক সময় বিশুদ্ধ হয় না। ফলে ডায়রিয়া ও বমিতে আক্রান্ত হতে পারেন। একই কারণে এসময় পানিবাহিত অন্যান্য রোগ যেমন টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ইত্যাদি বেশি হয়। গরমে অনেকে প্রচুর পানি পান করেন কিন্তু তাতে পর্যাপ্ত লবণ থাকে না, ফলে লবণের অভাব দেখা দেয়। গরমে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওই খাবার খেলে বদহজমসহ অনেক পেটের পীড়া দেখা দিতে পারে।

এ সময় যা করতে হবে
— যথাসম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়াযুক্ত স্থানে থাকতে হবে।
— বাইরে বের হলে সরাসরি রোদ যত সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজনে টুপি বা ছাতা ব্যবহার করতে হবে। পরনের কাপড় হতে হবে হাল্কা, ঢিলেঢালা, সুতি। শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে।
— শরীরের উন্মুক্ত স্থানে সম্ভব হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে, যা রোদে পোড়া থেকে সুরক্ষা দেবে।
— প্রচুর পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। যেহেতু ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ দুই-ই বের হয়ে যায়, সেহেতু লবণযুক্ত পানীয় যেমন খাবার স্যালাইন, ফলের রস ইত্যাদিও বেশি করে পান করতে হবে। অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে। চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।
— প্রয়োজনমত গোসল করতে হবে এবং শরীর ঘাম ও ময়লামুক্ত রাখতে হবে।
— শ্রমসাধ্য কাজ যথাসম্ভব কম করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে।
— গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সাধারণ খাবার যেমন ভাত, ডাল, সবজি, মাছ ইত্যাদি খাওয়াই ভাল। খাবার যেন টাটকা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নানা রকম ফল যেমন আম, তরমুজ ইত্যাদি এবং লেবুর শরবত শরীরের প্রয়োজনীয় পানি ও লবণের ঘাটতি মেটাবে।

আরও প্রয়োজনীয় কিছু পরামর্শ
প্রচণ্ড গরমে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে যায় তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীকে দ্রুত শীতল কোনো স্থানে নিয়ে যেতে হবে, ফ্যান বা এসি ছেড়ে দিতে হবে, সম্ভব না হলে পাখা দিয়ে বাতাস করতে হবে। রোগীর গরম কাপড় খুলে ফেলতে হবে এবং ভেজা কাপড়ে শরীর মুছে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে গোসল করাতে হবে। রোগীকে প্রচুর পানি ও খাবার স্যালাইন পান করতে দিতে হবে। যদি কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় এবং অজ্ঞান হয়ে যায় তবে দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমাতে হবে। এক্ষেত্রে রোগীকে অবশ্যই দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, ঘরে চিকিত্সা করার কোনো সুযোগ নেই।
গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের বেলায় আরও জরুরি। স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে দহনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

Advertisements

জীবন গড়ি কোরআনের আলোয়

জীবন গড়ি কোরআনের আলোয়

 

সমগ্র মানবজাতির জন্য পবিত্র কোরআনুল করীম চিরন্তন সংবিধান। এই চিরন্তন সংবিধানের ব্যাখ্যাকারী, স্বীয় বাস্তবজীবনে অনুসরণকারী আমাদের মহানবী হজরত রাসূলে মকবুল (স.)। আল্লাহর রাসূল (স.) পবিত্র কোরআনের আলোকে আদর্শ বিশ্ববাসীর কাছে স্থাপন করে গেছেন। তা চিরকালের জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। আল্লাহ পাক স্বয়ং কোরআনুল মজিদে ঘোষণা করেছেন, ‘লাক্কাদ কানালাকুম ফি রাসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানা।’ অর্থাত্ নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্য সুন্দর চমত্কার আদর্শ রয়েছে। তাই মানবজীবন গঠন করার জন্য মহানবী হজরত রাসূলে মকবুল (স.)-এর কাছে আল্লাহর তরফ থেকে যে ওহি প্রত্যাদেশ, আইন, বিধান, অনুশাসনপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা-ই আমাদের শুধু সহায় বা পাথেয় যা পালন করা অতীব কর্তব্য। আল্লাহ পাক মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলিফা, প্রতিনিধি হিসেবে। মানুষ যাতে পথভ্রষ্ট হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয়, সেজন্য তিনি ইসলামকেই শুধু জীবনব্যবস্থারূপে আমাদের জন্য মনোনীত করেছেন। পবিত্র কোরআনে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একমাত্র দ্বীন, ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম এবং পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে মানবজীবনের লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহ পাকের রাজি, খুশি, সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ইহকালীন/আখেরাতে পরিত্রাণ পাওয়া। কাজেই আমাদের সর্বোত প্রচেষ্টা থাকতে হবে, আমাদের গোটা জীবন মৃত্যু পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের আলোকে গড়ে তোলা। এ সম্পর্কে আল কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘ওমা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিয়াবুদুন’, অর্থাত্ আমি মানব ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাই পবিত্র ইসলামে পরিবার, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা অনস্বীকার্য। জীবন গঠন ও জীবন ধারণের জন্য ইসলামী নীতিমালা, জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অবশ্য কর্তব্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটা সর্বতোভাবে বাস্তব সত্য মানুষের অধিকার রক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের দায়িত্ব, সামাজিক, নৈতিক অপরাধ নির্মূলে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা সর্বকালের জন্য অনুসরণীয়। বাস্তবক্ষেত্রে এটা পালনীয় ও করণীয় যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পরকালীন জীবনে মুক্তির জন্য, জান্নাতপ্রাপ্তিতে পবিত্র কোরআনের অনুসৃত বিধান অনুযায়ী আমল-আখলাকে জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির জন্য অবশ্য অবশ্য পালনীয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শিখে, বুঝে, খুঁজতে হবে জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের অনুসরণ, মহানবী হজরত রাসূলে পাক (স.)-এর অতুলনীয় মহান আদর্শ। অর্থাত্ সুন্নাতে রাসুলুল্লাহ (স.) এর মহান শিক্ষা, মহান পথচলা মানুষের জীবনকে মহত্তম করে গড়ে তোলে। মহত্তম আদর্শের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শুধু আমাদের রাসূলে মকবুল (স.) তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল সব নবী-রাসুল ও সংস্কারকদের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাঁর সব চিন্তা ও কর্মের মহত্-উন্নত মানুষের রূপ বিদ্যমান। মহানবী (স.) নিজে যা নৈতিক শিক্ষা-আদর্শের কথা বলতেন, গৃহের পরিবেশেও তিনি সেই অনুসারে চলতেন। একবার হযরত আয়শা (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল হজরত রাসূলে পাক (স.)-এর স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেছিলেন- তাঁর স্বভাব ছিল হুবহু কোরআনেরই দৃষ্টান্ত। এছাড়া হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) আরও বলেছেন, আল্লাহর পেয়ারা হাবীব হজরত (স.) কাউকে তিরস্কার করতেন না। মন্দ, খারাপ ব্যবহার করতেন না। বরং ক্ষমা করে দিতেন।
অতএব, যে মহত্ চরিত্র আমাদের জীবনকে করবে উন্নত, যে সুন্দরতম চরিত্র আমাদের জন্য হবে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, সেই চরিত্রের বিকাশ আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত। তাই পবিত্র কোরআনের আলোকে জীবন গঠনের জন্য মানবিক গুণাবলি অর্জন করা আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। এই দুনিয়ার জীবনে সফলকাম মানুষ সেই ব্যক্তি, যার মধ্যে দৃঢ় সংকল্প এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য, সহনশীলতা, বীরত্ব, সাহস, ত্যাগের মহিমা, সংযম, আত্মসংযম, ওয়াদা পালন, আনুগত্য, নিষ্ঠা, পবিত্রতা, ভদ্রতা, সৌজন্য ও নিষ্ঠাচার প্রভৃতি গুণ বিদ্যমান। এসব গুণ গরিমার মহিমায় শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ, উন্নয়ন ও পূর্ণতাসাধিত হয়। প্রসঙ্গত আমার আশা দেশের সর্বত্র হিফজুল কোরআন মাদরাসা, কোরআনিক শিক্ষাকেন্দ্র, প্রতিষ্ঠা করতে সরকার ও ধনাঢ্য, বিত্তশালী, শিল্পপতি ও সামর্থ্যবান মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই এবং এ দ্বারা আমরা যেন সত্যিকার শিক্ষালাভ করে কামেলে ইনসান হই।

মুড ভালো রাখতে চান?

মুড ভালো রাখতে চান?

সকালে ঘুম ভাঙতেই রাজ্যের কাজ এসে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁধে। আমাদের শহুরে জীবনটাই এমন। বাড়িতে নানান কাজের ঝক্কি সামলে যখন আপনি নামবেন রাজপথে অফিস যাত্রা করতে, তখন আপনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে রাস্তার বেধড়ক ট্রাফিক জ্যাম আর অস্বস্তিকর গরম। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে জলবায়ু যেমন চরম ভাবাপন্ন তেমনি আপনার মেজাজটাও কিন্তু একই রকম উত্তপ্ত। আর এই উত্তাপ অনেকটাই ক্রমবর্ধমান। অফিসে ঢুকেই বসের ঝাড়ি। এরপর অগোছালো কাজগুলোকে গোছাতে গোছাতেই ২-৪টা মিটিং এসে হাজির হবে। সব কাজ শেষে যখন আপনি একটু একটু করে অফিস থেকে বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করেছেন, তখনই বস ডেকে পাঠাবে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য। ব্যস! আপনার মেজাজটা আর একবার খিচড়ে গেল। এরপর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পর নিজেকে সংসারের সুখ-দুঃখের মাঝে গা ভাসানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন সময় অস্থির মনকে বশে আনার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় টিপস্ থাকছে এই সংখ্যা কড়চায়। মাথা ঠাণ্ডা করে একটু স্মরণ করে এই টিপসগুলো মেনে চললে সহজেই আপনি জীবনটাকে আর একটু সহজভাবে গ্রহণ করতে পারবেন।
— সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড়িয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। নিজের জন্য একটু সময় বের করে নিন। অন্তত ১৫ মিনিট সময় রাখুন নিজের জন্য। এই সময়টাতে একটু শরীরচর্চা, যোগাসন এসব করলে শরীরে প্রশান্তি আসবে। সমস্যার মোকাবিলা আরও সহজে করতে পারবেন। যদি শরীর চর্চায় খুব অনীহা থাকে তাহলে নিজের ওপর জোর খাটাতে যাবেন না। চেষ্টা করুন নিজের পছন্দের কোনো কাজ করতে। যেমন ধরুন ফুলের টবে পানি দেয়া, বারান্দায় একটু হাঁটা, একটু সময় নিয়ে পত্রিকা পড়া কিংবা পছন্দের কোনো গান শোনা। এমন কিছু টুকটাক কাজে আপনার মন হালকা থাকবে।
— ঘরের কাজের সব দায়িত্ব নিজের হাতে নেবেন না। এতে অহেতুক চাপ বাড়বে, পাশাপাশি কাজও অনেক এলোমেলো হয়ে যাবে। পরিবারের বাকি সদস্যদের মাঝে কাজগুলো ভাগ করে দিন। পুরুষরা অবশ্যই গৃহিণীর ওপর সব কাজের চাপ দেবেন না। আবার সব নিজেও করতে যাবেন না। পছন্দের কাজগুলো দুজন মিলে ভাগ করে নিন। আর গিন্নিরাও সব কাজ নিজে না করে চেষ্টা করুন স্বামীর সঙ্গে কিছু কাজ ভাগ করে নিতে। নাস্তাটা আপনি তৈরি করতে ব্যস্ত থাকলে কর্তাকে বলুন ছেলেমেয়েদের স্কুলের জন্য তৈরি করে দিতে।
— ধরুন আজ অফিসে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই কোনো কারণে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল। সেক্ষেত্রে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতিটাকে একটু রাঙ্গিয়ে তুলুন। নিজের ঘরে একটু সময় নিয়ে সেজেগুজে তৈরি হন মেয়েরা। পছন্দের কোনো শাড়ি কিংবা কামিজ পরুন। একটু সাজুন। আর গায়ে মেখে নিন নিজের সবচেয়ে পছন্দের পারফিউমটি। ছেলের ক্ষেত্রেও তাই। মুডে পরিবর্তন আনতে আজ একটু কালারফুল একটা টাই ট্রাই করে দেখুন। শু-টা হয়তো ২-৩ দিন কালি করা হয় না। আজ একটু কালি মাখিয়ে ঝকঝকে করে নিন। কচকচে ভাজ খোলা একটা শার্ট পরে রওনা দিন অফিসের দিকে। দেখবেন মুহূর্তে আপনার কালি মাখা মুডটা কেমন ঝকমক করে ওঠে।
— অফিস থেকে যাত্রাপথে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে পছন্দের কোনো মিউজিক ট্রাই করতে পারেন। সঙ্গে চেষ্টা করুন পানির বোতল রাখতে। এক চুমুক খাবার পানিও কিন্তু অনেক সময় তেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ ঠাণ্ডা করতেও সহায়ক হয়ে থাকে।
— অফিস থেকে বের হওয়ার শেষ সময়টাতেও মেজাজ গরম হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে চেষ্টা করুন অফিস থেকে সোজা বাড়ি না গিয়ে একটু শপিংয়ে বেরুতে। আর কারও জন্য নয়, কেবল নিজের জন্য কিছু শপিং করুন বাড়ি ফেরার সময়। দেখবেন মেজাজটা একেবারে চনমনে হয়ে যাবে।

সন্তানের হক

সন্তানের হক

নবী করিম সাঃ বলেছেন, প্রত্যেক নবজাতক তার স্বভাবজাত ধর্ম ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে [সহি বুখারি] । আমাদের সমাজব্যবস্থা দিন দিন যেভাবে অপসংস্কৃতি, অনৈতিকতা এবং চরিত্রবিধ্বংসী কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের সন্তানের ওপর যেসব দায়িত্ব আছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সন্তানকে লালন-পালন করা ঈমানের অন্যতম দাবি। আমাদের ওপর সন্তানদের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করা হলোঃ

১. কানে আজান দেয়াঃ সন্তান দুনিয়াতে আসার পর গোসল দিয়ে পরিষ্কার করে তার ডান কানে আজান দেয়া, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এটি বাবা-মায়ের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে, শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছে দেয়া এবং ওঁৎ পেতে থাকা শয়তান যাতে তার কোনো ক্ষতি না করতে পারে। হাদিসে এসেছে, আবু রাফে রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাঃ-কে হাসান ইবনে আলীর কানে আজান দিতে দেখেছি [সুনানে আবু দাউদ] ২. সুন্দর নাম রাখাঃ শিশুর জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাম অর্থবহ হওয়া নামের সৌন্দর্য। । কেননা হাদিসে এসেছে, আবু দারদা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের সুন্দর নাম রাখো। [মুসনাদে আহমাদ] ৩. আকিকা করাঃ ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো­ সন্তানের আকিকা করা । ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আল্লাহর নামে জবেহ করা, তবে ছেলের পক্ষ থেকে একটি দিলেও চলবে। এর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা করা সুন্নাহ পদ্ধতি নয়। হাদিসে এসেছে, সামুরা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, সব নবজাতক তার আকিকার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ওই দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। [সুনানে আবু দাউদ] ৪. সদকাহ করাঃ ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নত। আলী রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ হাসান রাঃ-এর পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা! তার মাথা মুণ্ডন করো এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করো [সুনান আততিরমিজি]। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাঃ শিশুদেরকে খেজুর দিয়ে তাহনিক এবং বরকতের জন্য দোয়া করতেন [সহি বুখারি ও মুসলিম]। ৫. খতনা করাঃ ছেলেদের খতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নত। হাদিসে এসেছে, জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ হাসান এবং হুসাইন রাঃ-এর সপ্তম দিবসে আকিকা এবং খতনা করিয়েছেন [সুনানে আততিরমিজি]। ৬. তাওহিদ শিক্ষা দেয়াঃ শিশু যখন কথা বলা আরম্ভ করবে তখন থেকেই আল্লাহর তাওহিদ শিক্ষা দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাঃ মায়াজ বিন জাবাল রাঃ-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘সর্বপ্রথম তুমি তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার তাওহিদের শিক্ষা দেবে’ [সহি বুখারি]। ৭. কুরআন শিক্ষা দানঃ ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা কুরআন শিক্ষা করা ফরজ। আলী রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও [জামিউল কাবির]। কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। ৮. সালাত শিক্ষা দেয়া ও সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করাঃ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যে, বাবা-মা তার সন্তানকে সালাত শিক্ষা দেবেন এবং সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করাবেন। হাদিসে এসেছে, নবী সাঃ ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সালাতের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে সালাতের জন্য মৃদু প্রহার করো [সুনানে আবু দাউদ]। ৯. আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানদের আচরণ শিক্ষা দেয়া বাবা-মায়ের ওপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বললেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর জমিনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, তোমার আওয়াজ নিচু করো; নিশ্চয় সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ’ [সূরা লুকমান ১৮, ১৯]। ১০. আদর স্নেহ ও ভালোবাসা দেয়াঃ সন্তানদের স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে হবে। আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ হাসান ইবনে আলী রাঃ-কে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস রাঃও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমার তো দশটি সন্তান, কিন্তু আমি তো কখনো আমার সন্তানদেরকে আদর স্নেহ করিনি। রাসূলে করিম সাঃ তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যে অন্যের প্রতি রহম করে না, আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না [সহি বুখারি]। ১১. দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়া ফরজ করা হয়েছে। কারণ দ্বীনি ইলম না জানা থাকলে সে বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। হাদিসে এসেছে, আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরজ [সুনানে ইবনে মাজাহ]। ১২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করাঃ সন্তানদের প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে। উম্মে সালামাহ রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ-কে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আবু সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি এতে আমার জন্য কী প্রতিদান রয়েছে? নবী সাঃ বললেন, হঁ্যা যত দিন তুমি খরচ করবে তত দিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে (সহি বুখারি)। ১৩. সক্ষম করে তোলাঃ সন্তানদের এমনভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলা, তারা যেন উপার্জন করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারে । সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাঃ আমাকে এভাবে বলেছেন, তিনি তোমাদের সন্তানসন্ততিদের সক্ষম ও স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম [সহি বুখারি]। ১৪. বিবাহ দেয়াঃ সুন্নাহ পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়া এবং বিবাহের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহের ব্যবস্থা করা। আবু হুরায়রা রাঃ থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই বাবার ওপর সন্তানের হকের মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দেবে [জামিউল কাবির]। ১৫. দ্বীনের পথে পরিচালিত করাঃ বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো, সন্তানদের দ্বীনের পথে, কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালনা করা, দ্বীনের বিধান পালনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ত করে তোলা। কুরআনে এসেছে, ‘বলো, এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’ [সূরা-ইউসুফঃ ১০৮]। সন্তানকে দ্বীনের পথে পরিচালনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। ১৬. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করাঃ সন্তানেরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে ইনসাফ আশা করে এবং তাদের মাঝে ইনসাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবী সাঃ এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করো’ [সহি বুখারি ও মুসলিম]। ১৭. ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে বিরত রাখাঃ ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে তাদেরকে বিরত না রাখলে এই সন্তানরাই কিয়ামতে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কুরআনে এসেছে, হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও [সূরা তাহরিম-৬]। আর কাফেররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয় [সূরা হা-মীম আসসিজদাহ-২৯]। ১৮. পাপকাজ, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, অপসংস্কৃতি থেকে বিরত রাখাঃ সন্তান দুনিয়ায় আসার সাথে সাথে শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং বিভিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে, পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে, বিভিন্ন ফ্যাশনে, বিভিন্ন ডিজাইনে, বিভিন্ন শিক্ষার নামে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাই বাবা-মাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও

সন্তান­সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। আর যদি তোমরা মার্জনা করো, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু [সূরা তাগাবুন-১৪]। হাদিসে এসেছে, ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন [সহি বুখারি]। আবদুল্লাহ বিন আমর রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সাঃ বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে [সুনানে আবু দাউদ]। ১৯. দোয়া করাঃ আমাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে­ আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন [সূরা আলফুরকান-৭৪]। জাকারিয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’ [সূরা আলে ইমরান-৩৮]।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না এলে করণীয়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না এলে করণীয়

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসছে না! ডাক্তারের পরামর্শমত নিয়মিত ওষুধ সেবন করছি, ইনসুলিনও নিচ্ছি তার ওপর মুটিয়ে যাচ্ছি, কী করব? এ ধরনের প্রশ্ন অনেক রোগীর। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার, এর পাশাপাশি খুব সহজ একটা কাজ করার আছে, সেটা হলো হাঁটা। প্রতিদিন এক ঘণ্টা (ষাট মিনিট) জোরে জোরে হাঁটা এবং অন্তত দুই মাইল হাঁটবেন। হাঁটার কোনো সময় নেই তবে সকাল অথবা বিকাল, যখন সূর্যের আলোর প্রখরতা কম থাকে তখনই হাঁটার সবচেয়ে ভালো সময়। সুতরাং যখনই হাঁটুন, যতবার হাঁটুন—দুই মাইল হাঁটতে হবে এবং এতে বেশ ভালো ফল পাওয়া যাবে। গবেষকদের মতে, যারা নিয়মিত অন্তত দুই মাইল হাঁটে তাদের বডি মাস ইনডেক্স (ইগও) কমে, শরীরের ওজন কমে শরীরটা হালকা লাগে, তলপেটের মেদ কমে এবং উন্নত হয় ইনসুলিনের প্রতি দেহকোষের সংবেদনশীলতা। সর্বোপরি কমে যায় ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত শরীরের অন্যান্য ঝুঁকি। তাছাড়া একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন দুই মাইল হাঁটলে ডায়াবেটিস রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে এবং এর প্রতিরোধও সম্ভব।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মেথি একটি গুরুত্ববহ প্রাকৃতিক পথ্য। মেথিকে মসলা, খাবার ও পথ্য তিনটিই বলা চলে। মেথি স্বাদে তিতা হলেও এতে রয়েছে রক্তে সুগার বা শর্করা নিয়ন্ত্রণের বিস্ময়কর শক্তি। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চামচ চিনি চিবিয়ে খেলে বা এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি সকালে খালি পেটে পান করলে শরীরের রোগ জীবাণু মরে, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে, রক্তের ক্ষতিকর চর্বির (কোলেস্টেরল) মাত্রা কমে, শরীরে কৃমি থাকলে মারা যায়, গরম জনিত ত্বকের অসুখাদি দূর হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত সকালে মেথি খান তাদের ডায়াবেটিস জনিত অন্যান্য অসুখ কম হয়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম থাকে। সুতরাং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মেথি হলো শ্রেষ্ঠ পথ্য তবে তার সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্যাবলেট বা ইনসুলিন সঠিকভাবে ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে। যাদের ডায়াবেটিস নেই তাদের জন্যও মেথি উপকারী, যেমন— মাতৃদুগ্ধ বৃদ্ধির জন্য, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, শরীরকে সতেজ রাখার জন্য, রক্তের উপাদানগুলোকে বেশি মাত্রায় কর্মক্ষম করার জন্য মেথি অত্যন্ত উপকারী। বার্ধক্যকে দূরে ঠেলে তারুণ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে মেথি। নানাবিধ গুণসম্পন্ন এই মেথি আজ থেকেই হোক আমাদের সবার গুরুত্বপূর্ণ খাবার।

শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। অথচ বর্তমান বিশ্বের অসংখ্য শিশু মৌলিক অধিকারসহ বিভিন্ন প্রকার অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অপুষ্টি ও নানা প্রকার রোগ-শোকে ভুগছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার তথা অন্ন বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা ও শিক্ষার অধিকার অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অত্যাচার-নির্যাতন ও অমানুষিক শিশু শ্রমের কারণে সম্ভাব্য কুঁড়ি অকালেই ঝরে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও কোন কোন ক্ষেত্রে শিয়াল কুকুরের সাথে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া খাবারে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ অংশগ্রহণ করছে।  এ অধিকার বঞ্চিত মানুষ অন্যায়-অত্যাচার মাদকাশক্তি ও সন্ত্রাসের মত জঘন্যতম কাজে জড়িয়ে সমাজে সমস্যা সৃষ্টি করছে।  অথচ সামান্য সচেতন হলে সকল সম্ভাবনা আশ্রয় ও শিশুদের সম্পদে পরিণত করা যায়। নবজাতক শিশু ফলবান বৃক্ষের সাথে তুল্য। একটি চারাকে উত্তমরূপে পরিচর্যা করলে যেমন মজবুত কান্ড ও পত্র পল্লবে সুশোভিত পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হয়ে কাংঙ্ক্ষিতরূপে  ফলদান করতে সক্ষম হয়। তেমনি উত্তমরূপে পরিচর্যা করলে প্রতিটি শিশু সুস্থ্য সবল এবং সুঠাম দেহের অধিকারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যাদের দ্বারা আমরা আগামী দিনে সোনালী ভবিষ্যৎ গড়তে পারি। এ ক্ষেত্রে  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাতৃগর্ভ থেকে শিশু অধিকার নিশ্চিত করা। তাছাড়া শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যাপারে মাতৃদুগ্ধদানের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রয়েছে।  শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য শীর্ষক প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুসারে এ প্রবন্ধটি যথার্থ নির্বাচন। এ প্রবন্ধ শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাতৃদুগ্ধদানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও উৎসাহী করবে ইনশাল্লাহ।

মানব সভ্যতায় পিতা-মাতা ও সন্তানের পারস্পারিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, তাছাড়া পারস্পারিক গ্রহণযোগ্যতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য অধ্যাধিক। তাই শৈশব থেকে সন্তানকে প্রাপ্য অধিকার প্রদান ও উত্তর আচার-আচারণের দ্বারা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কেননা মানব সন্তানের শৈশব হল কাঁদা মাটির ন্যায়, শৈশবে তাকে যেমন ইচ্ছা তেমন গড়ে তোলা যায়। স্থায়ীত্ব ও প্রভাব বিস্তারের দিক থেকেও শৈশবকালীন শিক্ষা মানব জীবনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। শৈশবকালীন শিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে:

العلم في الصغر كالنقش على الحجر.

‘‘শৈশবে বিদ্যার্শন (স্থায়ীত্বের দিক থেকে) পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যের ন্যায়।’’[1] ইসলাম চৌদ্দশ বছরের অধিককাল যাবত শিশুদের বিষয় গুরুত্বারোপ করে আসছে এবং শিশু পরিচর্যার বিষয়টিকে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করত তাকে একটি সার্বক্ষণিক পালনীয় বিধানে পরিণত করেছে। ইসলাম যে শিশুর জন্ম মূর্হুত থেকেই তার অধিকারের কথা ঘোষণা করেছে তা নয়, বরং তার জন্মের পূর্ব থেকেই তার অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে।  ইসলামী দৃষ্টিতে শৈশব হচ্ছে সৌন্দর্য, আনন্দ, সৌভাগ্য ও ভালবাসার পরিপূর্ণ এক চমৎকার জগত। সন্তানকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যের ঘোষণা পবিত্র কুরআনে এসেছে,

‘‘ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি হচ্ছে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য বিশেষ।’’(সূরা কাহাফ:)[2] সুতরাং পার্থিব জীবনের সুখ শান্তি ও সৌন্দর্য এ শিশুকে ভবিষতে সম্পদ হিসেবে গড়ি তোলার জন্যে শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা করা একান্ত  প্রয়োজন। পিতা-মাতার উপর সন্তানের অনেকগুলো অধিকার রয়েছে।

বৈধভাবে জন্মগ্রহণ করার অধিকার

জন্মগত বৈধতা ইসলামের পরিবার গঠনের ভিত্তি এবং শিশুর ন্যায্য অধিকার। অবৈধ সন্তান না হবার জন্য নানারূপ সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে, এ ক্ষেত্রে  অবৈধ যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অবৈধ যৌনমিলনের ফলে মাবনদেহে নানারকম রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হয়। উপরন্ত এতে অবৈধ সন্তান জন্মের আশংকা  থাকে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, অবৈধ  সন্তান মানবিক অধিকার হতে অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয় এবং তার জীবন ধারণ ও লালন পালনের সুযোগ-সুবিধা সহজলভ্য হয় না। যদিও পিতা-মাতার অপরাধ সন্তানের উপর বর্তায় না তবুও সমাজ অবৈধ সন্তানকে পূর্ণ সামাজিক মর্যাদা দিতে সম্মত নয়।[3] এটা যথেষ্ট নয় যে কোন শিশু তার পিতার নামে পরিচিত। এটা সত্যা হলেও চলবে না, বরং সকল সত্যের উর্ধ্বে  এটা সত্য হতে হবে। শিশুকে যেন এ বিষয়ে লজ্জিত হতে না হয়। জাহেলিয়া বা অজ্ঞতার যুগে সন্দেহজনক পিতৃত্ব নিয়েও কোন কোন হতভাগ্য শিশুকে চলতে হতো। একাধিক ব্যক্তি একটি শিশুর পিতা ব‡ল দাবী করত এবং দাবীর সমর্থনে যুক্তিও পেশ করত।  বিষয়টি রাসুল (সা.) কে অত্যন্ত ব্যাথিত করে। তিনি ঘোষণা করেন ‘‘যে পিতার শয্যায় (বা সংসারে) সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, শিশু সেই শয্যারই।’’[4] ইসলামের বিধান হলো যে পরিবারে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, সন্তান সেই পরিবারের যদি না বিষয়টি চ্যালঞ্জ হয়।

এরূপ একটি সীদ্ধান্ত প্রচলিত আছে যে, বিয়ের ৬ মাসের মধ্যে যে শিশু জন্ম গ্রহণ করে তার জন্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করা বৈধ নয়। যদি কোন পিতা তার স্ত্রীর আনুগত্যহীনতার কারণে সন্তানকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিতে না চায়, তাহলে তাকে  অবশ্যই অবিশ্বাস করা যায় না,তাকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। যদি সে সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে লিয়ান[5] পদ্ধতি অবলম্বন করতে  হলেও শিশুর পিতার পরিচয় সন্দেহমুক্ত করতে হবে। লিয়ান এর পদ্ধতি সম্পর্কে  আল-কুরআনে এরশাদ হয়েছে:

﴿وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ ٱلۡمُحۡصَنَٰتِ ثُمَّ لَمۡ يَأۡتُواْ بِأَرۡبَعَةِ شُهَدَآءَ فَٱجۡلِدُوهُمۡ ثَمَٰنِينَ جَلۡدَةٗ وَلَا تَقۡبَلُواْ لَهُمۡ شَهَٰدَةً أَبَدٗاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤ إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ مِنۢ بَعۡدِ ذَٰلِكَ وَأَصۡلَحُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ ٥ وَٱلَّذِينَ يَرۡمُونَ أَزۡوَٰجَهُمۡ وَلَمۡ يَكُن لَّهُمۡ شُهَدَآءُ إِلَّآ أَنفُسُهُمۡ فَشَهَٰدَةُ أَحَدِهِمۡ أَرۡبَعُ شَهَٰدَٰتِۢ بِٱللَّهِ إِنَّهُۥ لَمِنَ ٱلصَّٰدِقِينَ﴾ [النور: 6- 9]

‘‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ উত্থাপন করে, অথচ নিজেরা ব্যতীত তাদের (প্রয়োজনীয় সংখ্যক) সাক্ষী নাই, তাদের  প্রত্যেকের সাক্ষ্য এই হবে যে, সে (স্বামী) আল্লাহর  নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী এবং পঞ্চম বারে বলবে, সে মিথ্যাবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়বে। তবে স্ত্রীর শাস্তি রহিত হবে যদি সে (স্ত্রী) আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামী মিথ্যাবাদী, এবং পঞ্চম বারে বলবে, তার স্বামী সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহর অভিশাপ পড়বে।’’[6]

সুন্দর নাম পাবার অধিকার

নাম একটি জাতির স্বকীয়তা ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হাজলিটের (William Hajlitt)  সাবলীল বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:

A mane fast anchored in the deep abyss of time is like a star twinkling in the firmament cold, distant, silent, but eternal and sublime.”[7]

নাম কালের অতল তলে আবদ্ধ নোঙর, যেন দূর নীলিমায় মিটিমিটি তারকা, শান্ত, সুদূর সমাহিত; কিন্তু শাশ্বত সুউন্নত। একটি সুন্দর বা উত্তম নাম পাওয়া প্রতিটি সন্তানের পিতা-মাতা তার হক বা অধিকার হিসেবে শরিয়ত স্বীকৃতি দেয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)এ প্রসঙ্গে এক হাদীস উল্লেখ করেন:

রাসূল (সা) বলেছেন, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হক হচ্ছে প্রথমত: তিনটি

  1. জন্মের পরে তার জন্য একটি উত্তম নাম রাখতে হবে।

  2. জ্ঞান বুদ্ধি হলে তাকে উত্তম শিক্ষা দিতে হবে।

  3. পূর্ণবয়স্ক হলে তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।[8]

ইবন আববাস (রা) থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে তিনি বলেন, তারা বললো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা অবগত হয়েছি যে, পিতার হক কি; কিন্তু সন্তানের হক কি? তিনি বললেন, পিতা (সন্তানকে) সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা প্রদান করবে।[9]

ইবন আববাস ও আবু সাঈদ (রা.) অন্যত্র বর্ণনা করেন-রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, যার সন্তান জন্মগ্রহণ করে সে যেন সুন্দর নাম ও সুশিক্ষা দেয় এবং সাবালক হলে তার বিয়ে দেয়।[10]

ইসলামে নামের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাওআলা প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম তাকে নামই শিক্ষা দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে:

﴿وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِ‍ُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣١﴾ [البقرة: 31]

‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তৎপর সে সমুদয় ফিরিশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, ‘এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও।’[11] পরবর্তী আয়াতে দেখা যায় এরপর ফেরেস্তাদের কাছে এ সকল জিনিসের নাম জানতে চাইলে তারা অজ্ঞতা প্রকাশ করে। তখন আদম (আ.)কে জিজ্ঞাস করলে তিনি তা বলে দেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাওআলা আদম (আ.) কে ফেরেস্তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।[12] নামের গুরুত্ব বুঝা যায়  যখন সকল কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম উচ্চারণের নির্দেশ আসে। এর মধ্যে কিছু কাজ আছে যা আল্লাহর নামে শুরু করা ফরজ। যেমন, সালাত, তায়াম্মুম ও পশু যবেহ ইত্যাদি। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ এসেছে এভাবে:

‘‘আপনি আপনার প্রতিপালকের নাম স্বরণ করুণ এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন থাকুন।[13] তাফসীরকারদের মতে এ আয়াতে তাকবীরে তাহরীমার কথা বলা হয়েছে, যার আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা ফরজ। শুধু কি কাজের আগেই বরং পবিত্র কুরআনে নাযিলকৃত প্রথম আয়াতের নির্দেশও ছিল মহান আল্লাহ্ তাআলার নামে পাঠ করার। যেমন এরশাদ হয়েছে:

﴿ ٱقۡرَأۡ بِٱسۡمِ رَبِّكَ ٱلَّذِي خَلَقَ﴾ [العلق:8]

‘‘পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে।[14] এতে বুঝা গেল যে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ ফরজ। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহর নাম উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হাদীস শরীফের সূত্রে আহকামুল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- খাবার সময় বান্দাহ যদি আল্লাহর  নাম উচ্চরণ করে, তাহলে শয়তান তার সাথে খেতে বসতে পারে না। আর নাম উচচারণ না করলে অবশ্যই তার খাবারে শয়তান শরীক হবে। মুশরিকরা তাদের কাজ-কর্ম শুরু করে তাদের দেব-দেবী মূর্তির নামে, যাদের তারা পূজা করে, ওদের বিরোধিতা করা হবে যদি আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কাজ শুরু করা হয়।[15]

সুতরাং নাম কোন ক্ষুদ্র বিষয় নয়, যে রাখতে হয় তাই রাখা। বরং এর মাধ্যমে পরিচয়ের এক শাশ্বত ধারার সূচনা ঘটে। ফলে বিশ্ব মণীষীরাও নামের গুরুত্ব না দিয়ে পারে নি। কিন্তু তা অর্থবোধক, শ্রুতিমধুর বা অন্য  কোন আঙ্গিকে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে মতান্তরের অবকাশ লক্ষ করা যায়। সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রে মুসলমানদের গাফলতির সুযোগ নেই। তাই শিশুকে সার্বিক দিক থেকে সুন্দর নাম দিতে হবে। যে ধরনের নাম নিয়ে অন্যরা হাসাহাসি করে, সে ধরনের নামে শিশুকে ডাকা যাবে না। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন: ‘‘তোমরা সুন্দর নাম রাখ।’’[16]

বেঁচে থাকার অধিকার

ইসলামে শিশু হত্যা নিষিদ্ধ। তা দরিদ্রতার ভয়, পারিবারিক সুনাম-সম্মান রক্ষা করা অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন। জাহেলিয়াত যুগে আরব দেশে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। এ ধরণের অমানবিক প্রথাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দা এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন:

﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ﴾ [الأنعام :151]

দারিদ্রতার কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমি তোমাদেরকে এবং তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি।’’[17] অন্যত্র বলা হয়েছে:

﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُمۡ خَشۡيَةَ إِمۡلَٰقٖۖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُهُمۡ وَإِيَّاكُمۡۚ إِنَّ قَتۡلَهُمۡ كَانَ خِطۡ‍ٔٗا كَبِيرٗا﴾ [الإسراء:31]]

দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি রিযিক দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।[18] যে সন্তান প্রসবিত হয়নি, দুনিয়ার আলো দেখেনি মাতৃগর্ভে থাকা কালেও তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে।  ভ্রুণে জীবন এসে গেলে তাকে হত্যা করা যাবে না। কারো কারো মতে ৪০ দিনে জীবন আসে  কারো কারো মতে ৪ মাসে। জীবন এসে গেলে গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম। কোন কোন ফকীহ বা আইনবিদের মতে যৌনমিলনের ফলে ভ্রুণ সৃষ্টি হলে গর্ভপাত হারাম।[19]

 

সুস্থতার অধিকার

প্রত্যেকটি মানব শিশুরই সুস্থ শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করার মানবিক অধিকার রয়েছে। কথা খুবই স্বাভাবিক যে, একজন পুষ্টিহীন মা কখনই সুস্থ শিশুর গর্বিত মা হতে পারে না। এ জন্যে মায়ের পুষ্টির ব্যাপারে অতিরিক্ত যত্ম নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া গর্ভস্থিত ভ্রুণের ঠিকমত গঠন ও বৃদ্ধির জন্য মাকে সুষম ও বাড়তি খাবার দিতে হবে। এ বাড়তি খাবার মায়ের স্বাভাবিক খাদ্য হতে ২০০ থেকে ৩০০ ক্যালোরী বেশী যোগাবার উপযোগী হবে। নিম্নে একজন সাধারণ কর্মক্ষম স্বাভাবিক মহিলা ও গর্ভবতি মায়ের কতখানি খাদ্য গ্রহণ করা উচিত তার একটি তালিকা দেয়া হল:

খাদ্য দ্রব্যের নাম

স্বাভাবিক মহিলা

গর্ভবতী মহিলা

চাল/ডাল

৩৫০ গ্রাম

৩৭৫ গ্রাম

ডাল

৪০   ’’

৬০’’

মাছ/গোশত/ডিম

৬০ ’’

৬০’’

আলু/মিষ্টিআলু

৬০ ’’

৬২’’

যেকোন শাক

১৫০ ’’

১৮০’’

যে কোন সব্জী

৯০ ’’

৯০’’

চিনি/গুড়

———

৩০’’

ফল

১টা ৫৫ ’’

১টা/ ৫৫’’

তৈল/ঘি

৪০  ’’

৫০’’

খাদ্য শক্তি

২১০০ কিঃ ক্যাঃ

২৩৬০ কিঃ ক্যাঃ প্রায়[20]

তাছাড়া রোগগ্রস্ত পিতা-মাতার সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে রোগাক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক অসুস্থ হওয়া পিতা-মাতার জন্য কোন অপরাধ নয়। কিন্তু অসুস্থতার সময়ে যৌনমিলনে অনেক সময় জটিলতার সৃষ্টি করে। তাছাড়া অবৈধ ও মাত্রাতিরিক্ত যৌনমিলনের ফলেও কতকগুলো রোগে শিশু জন্ম থেকে আক্রান্ত হয়। যৌন আক্রান্ত পিতা-মাতার সন্তান পঙ্গু এবং অন্ধ হলে জন্ম নিতে পারে। এ সম্পর্কে হাদীসের বাণী: কোথায় তোমার বীর্ষ স্থাপন করবে তা চিন্তা-ভাবনা করে স্থির করে নাও। বংশধারা যেন সঠিক হয়।[21] রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হলে জন্মগত অক্ষমতা সৃষ্টি হতে পারে। তাদের দেহ ক্ষীর্ণকায় ও মেধা নিম্নমানের হতে  পারে। এতদ্ব্যতীত যে সমস্ত রোগ  পিতা-মাতার থেকে সন্তানের মধ্যে সংক্রমিত হয় সে সম্পর্কে সতর্কতা অবল্বন করা খুবই জরুরী।[22]

মাতৃদুগ্ধ পান

একটি শিশু আত্মপ্রকাশ করার সাথে সাথেই শাখা যেরূপ তার মূলের প্রতি মুখাপেক্ষী থাকে, শিশুও তার মায়ের প্রতি সে রকম মুখাপেক্ষী থাকে। সে মায়ের গর্ভে থাকাকালীন রক্তরূপে যে আহার্য গ্রহণ করতো এখনও তাকে অনুরূপ আহার্য গ্রহণ করতে হয়।  তবে এ রক্ত আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তাঁর জ্ঞান ও ইচ্ছায় দুগ্ধে পরিণত হয় যা শিশুর শরীর গঠনে প্রয়োজনীয় সকল উপাদানে সমৃদ্ধ। আর এ দুগ্ধ প্রবাহিত  মায়ের স্তনে এসে উপনীত হয় এবং শিশু  আল্লাহর বিশেষ দিক নির্দেশ তার সন্ধান প্রাপ্ত হয়ে চুষতে থাকে। আল-কুরআনে এমন সব নীতিমালার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা মাতৃদগ্ধদানের বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করে  এবং মা ছাড়া অন্য মহিলার স্তন থেকে দুগ্ধপান করার ক্ষেত্রে তার দুগ্ধদান সম্পর্কিত নীতিমালা নিয়ন্ত্রণ করে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এরশাদ করেন:

﴿وَٱلۡوَٰلِدَٰتُ يُرۡضِعۡنَ أَوۡلَٰدَهُنَّ حَوۡلَيۡنِ كَامِلَيۡنِۖ لِمَنۡ أَرَادَ أَن يُتِمَّ ٱلرَّضَاعَةَۚ ﴾ [البقرة: 233]

‘‘যে জননী সন্তানদেরকে পুরো সময় পর্যন্ত দুগ্ধপান করতে ইচ্ছে রাখে, তাঁরা নিজেদের শিশুদের পুরো দু’বছর ধরে দুগ্ধ পান করাবে।’’[23] এ আয়াত দ্বারা স্তন্যদান সংক্রান্ত নিম্নোক্ত দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়:

এক. শিশুকে স্তন্যদান মাতার জন্য ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকলে মা  যেন তাঁর সন্তানকে  তার স্তন্যপান থেকে বঞ্চিত না করে, ক্রোধের বশর্বতী হয়ে বা অসন্তুষ্টির কারণে শিশুকে স্তন্যদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়।[24] বিবাহ বন্ধনে থাকাকালীন স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে স্তন্যদানের জন্য কোন প্রকার বেতন বা বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে না। তবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বা স্তন্যদানে নিয়োগকৃত ধাত্রী বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে।[25]

দুই. উক্ত আয়াতে স্তন্যদানের সময়সীমা দু’বছরের কথা বলা হয়েছে। ইমাম শাফয়ী, সাবেবাইন’ [26]স্তন্য দানের সময়সীমা দু’বছর বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম যুফারের একমত স্তন্যদানের সময়সীমা আড়াই বাছর বা ত্রিশ মাস বলা হয়েছে।[27]  তারা তাদের মতের পক্ষে আল্লাহ তা’আলার দলীল হিসেবে পেশ করেছেন:

﴿وَفِصَٰلُهُۥ ثَلَٰثُونَ شَهۡرًاۚ﴾ [الأحقاف:15]  

‘‘তার গর্ভ ও দুধপান করানোর সময়কাল ত্রিশ মাস।’’[28] অন্যত্র এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

﴿وَوَصَّيۡنَا ٱلۡإِنسَٰنَ بِوَٰلِدَيۡهِ حَمَلَتۡهُ أُمُّهُۥ وَهۡنًا عَلَىٰ وَهۡنٖ وَفِصَٰلُهُۥ فِي عَامَيۡنِ﴾ [لقمان: 14]

‘‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে নসিহত করছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে নিজের পেটে বহন করেছে। আর তাকে দুধ ছাড়াতে দুই বছর লেগেছে।’’[29]

তিন: কুরআনের নির্ধারিত সময়সীমা তথা দুবছর পূর্ণ হওয়ার আগেও কেউ চাইলে দুধ ছাড়িয়ে নিতে পারবে, তবে এ শর্ত থাকবে যে, এতে স্বামী-স্ত্রী পারস্পারিক আলোচনার পর, দুধ ছাড়িয়ে নিলে দুগ্ধপায়ী শিশুর কোন ক্ষতি হবে না এ ব্যাপারে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এ সম্পর্কে কুরআনের বিধান হচ্ছে:

﴿فَإِنۡ أَرَادَا فِصَالًا عَن تَرَاضٖ مِّنۡهُمَا وَتَشَاوُرٖ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِمَاۗ وَإِنۡ أَرَدتُّمۡ أَن تَسۡتَرۡضِعُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُمۡ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡكُمۡ﴾ [البقرة:233]

‘‘যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পারস্পারিক পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে দুধ ছাড়িয়ে নিতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাদের কারো কোন গুণাহ হবে না।’’[30] রাসূল (সা) শিশু অধিকারের কথা চিন্তা করে মাতৃদুগ্ধ পানকালে স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। যেমন- এরশাদ হয়েছে:

 «لقد هممت أن أنهى عن الغيلة حتى ذكرت ان الروم وفارس يصنعون ذلك فلايضر أولادهم.»

‘‘দুগ্ধপায়ী শিশুর মায়ের সাথে স্বামীর সহবাস আমি নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু পারস্য ও রোমকদের সম্পর্কে আমাকে জানানো হল যে, তারা এ কাজ করে, তবে তাদের সন্তানদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না।’’[31]

চার. পিতার কর্তব্য হচ্ছে শিশুকে দুধ খাওয়ানো সময়ে দুগ্ধধাত্রী মাকে তাঁর শিশুর দুগ্ধপান সম্পর্কিত সমস্ত প্রয়োজনীয় বস্ত্ত সরবরাহ করা। তবে তাতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে দেয় ‘‘ভরণপোষণ’’[32] এ কোন প্রকার প্রভাব পড়বে না। এতে করে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, শিশুকে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দুগ্ধদান ও এমন এক ব্যাপার, যার পাশাপাশি মায়ের জন্যে অতিরিক্ত কোন দায়িত্বভার নেয়া সম্ভব নয়। কেননা পিতার বর্তমানেও মাকে শিশুর সার্বিক দেখাশুনার সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে হয়। তাছাড়া পুত্র সন্তান বালেগ না হওয়া পর্যন্ত এবং কন্যা সন্তানের বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব পিতার উপর বর্তায়, তার সামর্থ্য অনুযায়ী।[33] পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

﴿وَعَلَى ٱلۡمَوۡلُودِ لَهُۥ رِزۡقُهُنَّ وَكِسۡوَتُهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ لَا تُكَلَّفُ نَفۡسٌ إِلَّا وُسۡعَهَاۚ﴾ [البقرة: 233]

‘‘জনকের কর্তব্য যথারীতি তাদের (মাতাগণের) ভরণপোষণ করা। কাউকেও তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেয়া হয় না।’’[34] ইসলামে পরিবার পরিজনের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করাকে সদকার সমতুল্য সাওয়াবের কাজ করা হয়েছে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে:

«اذا انفق المسلم نفقة على اهله وهو يحسبها كانة له صدقة.»

‘‘কোন মুসলিম ব্যক্তি সাওয়াবের আশায় তার পরিবার-পরিজনের জন্যে যা কিছু ব্যয় করে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’’[35]

পাঁচ: ইসলাম পিতার অনুপস্থিতে বা মারা গেলে তার কোন একজন আত্মীয়কে শিশুর লালন-পালন এবং দুগ্ধধাত্রীর প্রয়োজনসমূহ ও সার্বিক দেখাশুনার দায়িত্ব প্রদান শিশু সন্তানের উদ্দেশ্যেই করেছে। ইসলাম এর মজবুত সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ছয়: মায়ের দুগ্ধদানের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা অবস্থায় তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন ধাত্রীর সাহায্যে শিশুকে স্তন্যদানের ব্যবস্থাকরণ এমন একটি বিষয়, যা ইসলাম আদৌ উৎসাহিত করেনি। অনুরূপভাবে দুগ্ধদানের বিনিময়ে ইসলাম বৈষয়িক আকর্ষণও সৃষ্টি করেছে, যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটলে সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনে দুগ্ধধাত্রী মাকে স্তন্যদানের বিনিময় প্রদানের বিধান রেখেছে।[36] এ ব্যবস্থার পেছনে কারণ হচ্ছে এই যে, যাতে করে মহিলা শিশুর ব্যাপারকে তুচ্ছ বা হেয় করে না দেখে।

মাতুদুগ্ধ শিশুর প্রথম খাবার

নবজাতকের জন্মের পর তার উপযোগী প্রথম খাবার হল মায়ের বুকের শালদুধ। যা মায়ের গর্ভকালীন সময়ে ৬/৭ মাস থেকে আল্লাহ তা’আলা তার রহমত স্বরূপ শিশুর প্রয়েঅজন ও চাহিদা অনুযায়ী মায়ের স্তনে সৃষ্টি করে দেন। স্বল্প পরিমাণের হলুদান্ড এ তরল দুগ্ধটুকুই শিশুর প্রথম জীবনের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট।  শালদুধকে আল্লাহ তাআলা মায়ের স্বাভাবিক দুধের চেয়ে অধিক আমিষ এবং ভিটামিন ‘এ’ দিয়ে নবজাতকের প্রথম সঠিক ও সুষম খাদ্য হিসেবে সৃষ্টি করে থাকেন। জন্মের পর খাদ্য হিসেবে শিশুর যা যা দরকার তার সকল উপাদান শালদুধে বিদ্যমান। শালদুধের পর যে দুধ বুকে আসে তার তুলনায় শালদুধে অনেক রোগ প্রতিরোধক উপাদান ও শ্বেতকণিকা থাকে যা শিশুকে বিভিন্ন রোগজীবাণু হতে রক্ষা করে। সুতরাং শালদুধ হচ্ছে শিশুর প্রথম টিকা।[37] শালদুধে যে সব উপাদান থাকে তা শিশুর কচি ও অপরিণত পেট এবং অন্ত্রকে পরিপক্ক হতে সাহায্য করে। এ সব গ্রোথ ফ্যাক্টর শিশুর অন্ত্রণালীকে দুধ হজম করতে সাহায্য করে। এছাড়া  যে সব আমিষ জাতীয় বস্ত্ত শরীরে প্রবেশ করলে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে  পেট থেকে শরীরের ভেতর ঢুকতে এই ‘গ্রোথ ফ্যাক্টর’ বাধা প্রদান করে। সেহেতু শালদুধ দেয়ার আগে অন্য কোন খাবার যেমন মধু, পানি, মিছরীর শরবত, গরুর দুধ ইত্যাদি দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। উল্লেখিত খাবার দেয়া হলে শিশুর অন্ত্র ঠিকমতো পরিপক্ক হয় না, বরং ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশংকা থাকে এবং এর ফলে প্রায়ই তার এলার্জি হতে দেখা যায়। শালদুধ একটি রেচকের মত কাজ করে শিশুর পেটের প্রথম কালো পায়খানা বা মিকোনিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে। মিকোনিয়াম বেশিক্ষণ পেটে থাকলে শিশুর জন্ডিস হওয়ার আশংকা থাকে। শিশু জন্মের এক থেকে দু সপ্তাহ ধরে মায়ের বুকের দুধের পরিমাণ বাড়তে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে উপদানের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ শালদুধ কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত দুধ হয়ে যায়। দেখতে গরুর দুধের চেয়ে পাতলা বলে অনেক মা এ দুধের কার্যকারিতা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়।   অথচ শিশুর বেড়ে উঠার জন্যে এবং তার শারীরিক  ও মানসিক ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে যে সব উপাদান প্রয়োজন, তা  তার চাহিদা অনুযায়ী বুকের দুধে সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে। কেননা, শিশু জন্মের পর এক দিনেই বেড়ে ওঠে না, বরং ক্রমান্বয়ে সে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। যেমন আল-কুরআনে এসেছে:

‘‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অত:পর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন।[38] তার বেড়ে উঠার গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই আল্লাহ তা’আলা মায়ের দুধের উপাদান পরিবর্তন করে থাকেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে শিশু বেড়ে উঠার জন্য যে পরিমাণ পানি আছে বলে তাকে আলাদা করে পানি দেবার কোন প্রয়োজন নেই।’’[39]

শিশুর আদর্শ খাবার

‘মায়ের দুধের বিকল্প নেই’-এ কথাটি সর্বজনবিদিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু গবেষণার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, শিশুর জন্য মায়ের দুধই সর্বোত্তম ও নিরাপদ খাবার। মায়ের দুধে রয়েছে এমন সব উপাদান যা কোন ধরনের সংক্রমণ থেকে শিশুকে রক্ষা করতে পারে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টি ছাড়াও মায়ের দুধ শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। পাঁচ মাস বয়স পুরা হওয়া পর্যন্ত শিশুর জন্য যা প্রয়োজন তার সবই মায়ের দুধে আছে। শিশু খুব তাড়াতাড়ি ও সহজেই বুকের দুধ হজম করতে পারে। কেননা মায়ের দুধে আছে:

ক) শিশুর জন্য সঠিক পরিমাণে এবং সবচাইতে উপযোগী আমিষ ও চর্বি।

খ) অন্যান্য দুধের চাইতে বেশী পরিমাণ ল্যাকটোজ বা শর্করা যা শিশুর প্রয়োজন।

গ) যথেষ্ঠ পরিমাণে ভিটামিন বা খাদ্য প্রাণ। তাই মায়ের দুগ্ধ পান ক রা নো হলে শিশুকে আলাদাভাবে কোন ভিটামিন দিতে হয় না।

ঘ) শিশুর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ঠ লৌহ (আয়রন)। এর প্রায় সবটাই সহজে হজম হয় বলে বুকের দুধ পান করলে শিশু রক্ত শূন্যতায় ভোগে না।

ঙ) প্রচুর পরিমাণে পানি, যে কারণে গরম কালেও শিশুকে আলাদা পানি দিতে হয় না।

চ) যথেষ্ঠ পরিমাণে লবণ ও খনিজ পদার্থ।

ছ) এক ধরনের এনজাইম, যা চর্বি হজম করতে সাহায্য করে।

আল্লাহ তাআলা শিশুর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী মায়ের স্তনে সুপরিমিত উপাদান সহকারে দুধ সৃষ্টি করতে থাকেন। এমনকি শিশু যে বয়সে যে পরিমাণ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে, আল্লাহর ইচ্ছায় সেই পরিমাণ তাপ মাত্রায় দুধ তৈরী হয়ে থাকে।[40]

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধক

শুধুমাত্র মায়ের দুধেই রয়েছে শিশুর যাবতীয় রোগ প্রতিরোধ করার মত উপাদান। মায়ের দুধ পান করে বড় হলে বেশি বয়সেও সন্তান বহুবিধ রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।  মায়ের দুধ সকল সংক্রামক রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করে। বুকের দুধে কোন রোগ জীবাণু নেই বলে এ দুধ পান করে শিশু কোন সময় অসুস্থ হয় না। এতে আছে রোগ প্রতিরোধক বহু উপদান যা শিশুকে অসুখ-বিসুখ থেকে রক্ষা করে। এ উপাদানগুলোর মধ্যে আছে:

  1. জীবাণু ধ্বংসকারী জীবিত শ্বেতকণিকা (লিউকোসাইটিস)।

  2. রোগ প্রতিরোধক ইম্মিউনোগ্লোবিউলিন বা এন্ডিবডি। শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা গড়ে না উঠা পর্যন্ত এসব এন্টিবডি শিশুকে ননারকম রোগ থেকে রক্ষা করে।

  3. ‘বাইফিভাস ফ্যাক্টর’ নামে একটি পদার্থ যা শিশুর পেটে বিশেষ একটি জীবাণু যা ব্যাক্টরিয়াকে বাড়তে সাহায্য করে। এই জীবাণু হচ্ছে ‘ল্যাক্টোবেসিলস’ যা পেটে অন্যান্য ক্ষতি কারক জীবাণুকে ধ্বংস করে শিশুকে ডায়রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।[41] মোটকথা মায়ের দুধ সব সময় শিশুকে অসুস্থতার হাত থেকে রক্ষা করে। দু’তিন বছর বয়সেও অসুস্থ হলে বুকের দুধ থেকে পাওয় ক্ষমতা শিশুকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে মায়ের দুধ শিশু মৃত্যুার হার কমায়।[42] সম্প্রতি কালের বহু গবেষণায় দেখা গেছে শিশুকে মায়ের দুধ পান করালে শিশু মৃত্যুর হার শতকরা ৩ ভাগ কমে যায়।[43]

 

ক্যান্সার প্রতিরোধক

মাতৃদুগ্ধ পুষ্টিকরই শুধু নয়, এতে রয়েছে জীবাণু প্রতিরোধক উপাদান ( এন্টিবডি) সমূহ যা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। মায়ের দুধে আরো রয়েছে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া নির্মূলকারী প্রটোজোয়াণ এনজাইম ও ফপটি এডিস যা ফুসফুস ও পাকস্থলীর কোষে হামলা চালাতে জীবাণুকে বাধা দেয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ আবিস্কার করেছেন যে, মায়ের দুধ ক্যান্সারও প্রতিরোধ করে। সম্প্রতি সুইডিনের ‘লাভ’ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিদ্যা গবেষক আনডার্স হাকামসন মায়ের দুধে যে ক্যান্সার জীবাণুকে প্রতিরোধ করে তা সফলভাবে পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন।[44]

মানসিক বিকাশে সহায়তা

মায়ের দুধ শিশুর সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে যত প্রকার খাবার আছে তন্মধ্যে মায়ের দুধই শিশুর জন্য সর্বোত্তম খাবার,  আর এটিই শিশুর জন্য নিরাপ,দ ও সুষম খাবার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন এর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক মিডিয়া ওয়ার্কশপে বিভিন্ন গবেষণামুলক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, দু’বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খেলে শিশুর আইকিউ বা বুদ্ধিমত্তা শতকরা ১০ ভাগ বেশি হয়।[45]

তদুপরি দুগ্ধদানের কারণে মায়ের হজম শক্তি উন্নত হয়, তার মধ্যে সৃষ্টি করে সাধারণ স্বাস্থ্যেন্নতি এবং শিশুর প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রাণ আহরণের নিমিত্তে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা। তাছাড়া স্তন্যদান তাঁর গর্ভধারণ প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে এবং জন্মজনিত কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত শক্তিকে ফিরে পেতে সাহায্য করে। বতর্মানে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দুগ্ধদানে শৈথিল্য প্রদর্শনের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছে। রাসূল (সা.) আরবের রীতি অনুযায়ী ধাত্রী দ্বারা দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে দুশ্চরিত্রা মহিলাকে ধাত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা দুধের প্রভাব পরস্পরের মধ্যে সম্প্রসারণযোগ্য। তিনি বলেছেন: তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দুশ্চরিত্রা ও অপ্রকৃতস্থ রমণীর দুগ্ধপান করানো ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর।[46]

পারিবারিক আয়ের সহায়ক

শিশুকে গরুর দুধ অথবা টিনজাত দুধ না পান করিয়ে মায়ের দুধ পান করালে অর্থের অনেক সাশ্রয় হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে একটি শিশুর প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৫০ মিলি লিটার দুধ প্রয়োজন হয়।[47] সে হিসেবে ৭ কেজি ওজনের একটি শিশুর জন্য একদিনে প্রয়োজন হয় ১ লিটার (১০০০ মি.লি) দুধ। শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠার জন্য ৫ মাসে প্রয়োজন হবে (৩০দ্ধ৫দ্ধ১) ১৫০ লিটার দুধ। বর্তমান প্রতি লিটার গরুর দুধের দাম ৪০ টাকা হলে প্রয়োজন (১৫০দ্ধ৪০) = ৬০০০ টাকা। আবার যদি কৌটা বা টিনজাত দুধ পান করানো হয় তাহলে ৫ মাসে শিশুর জন্য বর্তমান বাজার দরে প্রয়োজন হয় প্রতি কেজি ৫২ টাকা হিসেবে (৫২দ্ধ১৫০) = ৭৮০০.০০ টাকা।

অথচ মা যদি শিশুকে বুকের দুধ পান করান, তাহলে তাকে প্রতিদিনের খাবারের সাথে সামান্য পরিমাণ বাড়তি খাবার খেলেই শিশুর জন্য পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হয়। একজন মা রোজ যা খান তার সাথে দুমুঠো বেশি ভাত ও দুচামচ ডাল (৫.০০) টাকা,  একটু তৈল ও এক মুঠো শাক-সবজি (৩.০০) টাকা খেলে সারাদিন হয়তো সাত থেকে আট টাকা বেশি লাগে। তাহলে ৫ মাসে খচর হবে ৭২০.০০ টাকা। তাছাড়া গরুর দুধ বা টিনজাত দুধ তৈরি করার পর নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু মায়ের দুধ কোন অবস্থাতেই নষ্ট হয় না। সুতরাং নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করালে পরিবারের আর্থিক ব্যয় কমে।

বিলম্বিত গর্ভধারণের সহায়ক

শিশু মাতৃস্তন্য পানকালে সাধারণত মায়ের পুনরায় গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা কম থাকে। শিশুকে স্তন্যদান  একটি প্রাকৃতিক গর্ভনিরোধ প্রক্রিয়া।[48] শিশু যদি ঘন ঘন এবং রাতেও দুধ পান করে তাহলে প্রল্যাকটিন ও অন্যান্য হরমোন যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি হয়ে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। ফলে বুকের দুধ পান করালে দুসন্তানের জন্মের মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি হয়।[49] মা যখন শিশুকে স্তনের দুধ পান করান তখন মাকে উপযুক্ত বাড়তি খাবার খেতে দিলে স্বাভাবিকভাবে মায়ের স্তনে দুধ বেড়ে যায়। এটা সন্তানের জন্য আল্লাহ তা’আলার নিয়ামত স্বরূপ। এ নিয়ামত যাতে সন্তান পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন সেজন্য আল।লাহই সন্তানের দুধপানকালে মায়ের গর্ভে দ্বিতীয় সন্তান দেন না।[50] বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এম.কিউ. কে তালুকদারের মতে, শিশুকে প্রথম পাঁচ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ পান করালে এবং সে সময় মায়ের মাসিক না হলে গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২ ভাগেরও কম থাকে। তার মতে, যে সমাজে কৃত্রিম জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রচলন কম, সেখানে শিশুকে মাতৃদুগ্ধ দান একটি স্বাভাবিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে বেশ কার্যকর।[51] বুকের দুধ পান করানোর মাধ্যমে সাময়িক জন্মবিরতি পদ্ধতিকে ইংরেজিতে ‘ল্যাম’ পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতিতে সুফল লাভের জন্য নিম্নের নিয়মগুলো মেনে চলা আবশ্যক।[52]

1)        পাঁচ মাস বয়স পুরো না হওয়া পর্যন্ত শিশুকে বুকে দুধ পান করাতে হবে।

2)        শিশুকে ঘনঘন দুধ পান করাতে হবে। দু’বার পান করার মাঝে দীর্ঘ বিরতী দেয়া যাবে না।

3)        দিনে বা রাতে শিশু যখনই দুধ চাইবে তখনই তাকে বুকের দুধ পান করাতে হবে।

4)        দু’বার দুধ পান করানোর মাঝে বিরতী যেন কোন অবস্থাতেই ছয় ঘন্টার বেশী না হয়।

সতন্ত্র শয্যায় নিদ্রা যাবার অধিকার

প্রত্যেক শিশুরই পৃথক এবং একক শয্যায় নিদ্রা যাবার অধিকার আছে। রাসূল (সা.) বলেন-

«مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِى الْمَضَاجِعِ»

সাত বছর বয়সে শিশুকে নামায পড়ার নির্দেশ দাও, দশ বছর হয়ে গেলে নামায না পড়লে তাদেরকে শাস্তি দাও এবং তাদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা কর।[53] পৃথক শয্যার ব্যবস্থা পৃথক পৃথক কক্ষে হতে পারে, একই কক্ষে বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে। তবে প্রত্যেকের জন্য শয্যা আলাদা হতে হবে।[54]

ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা

পিতা-মাতার অবর্তমানে সন্তান যাতে অর্থনৈতিক সমস্যার না পড়ে সে দিকে পিতা-মাতার সচেতন থাকতে হবে। পিতা-মাতা কিংবা শিশুর দায়িত্ব গ্রহণকারী অন্যান্যদের প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে, সামর্থ্য ও আর্থিক সংগতি অনুযায়ী  শিশুর উন্নয়নের জন্য উপযোগী জীবনমান নিশ্চিত করা।[55] যেমন রাসূল (সা) বলেছেন:

«لأن تذر ورثتك أغنياء خير من أن تذرهم عالة يتكففون الناس»

নিজের সন্তানকে অন্যের দায়-দাক্ষিণের উপর ফেলে যাবার চেয়ে অভাবমুক্ত রেখে যাওয়া উত্তম।[56]

আল্লাহ তা‘আলা এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেন:

﴿وَلۡيَخۡشَ ٱلَّذِينَ لَوۡ تَرَكُواْ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ ذُرِّيَّةٗ ضِعَٰفًا خَافُواْ عَلَيۡهِمۡ﴾ [النساء:9]

‘‘তাদের ভয় করা উচিত তারা যদি অসহায় সন্তান রেখে দুনিয়া থেকে চলে যায় তবে মৃত্যুর সময় সন্তানদের সম্পর্কে তাকে আশংকা ও উদ্বিগ্ন করবে।[57]

শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে উঠার অধিকার

সন্তানকে শিক্ষা প্রদানের দায়িত্ব পিতা-মাতার। তাদেরকে লিখতে এবং পড়তে শিক্ষা দেয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী করা যায় পিতা-মাতাকে। এক্ষেত্রে লিখা পড়া শিক্ষা দেবার সাথে সাথে পারিবারিক, বৈষয়িক এবং আদর্শিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। রাসূল (সা.) পিতা-মাতাকে নির্দেশ দিয়েছেন সন্তানকে লেখাপড়া, ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং খেলাধুলা বিষয়ে শিক্ষা দেবার জন্য। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে:

‘‘আবু রাফের মুনির আবু সালমান হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) এরশাদ করেন, পিতা-মাতার উপর সন্তানের যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি সন্তানের নিকটও পিতা-মাতার প্রাপ্য অধিকার রয়েছে। পিতা-মাতা হতে সন্তানের অধিকার হলো লিখতে শিক্ষা দেবে, সাঁতার শিক্ষা দেবে এবং তীবন্দাজী শিক্ষা দেবে। তাদের এমন কিছু শিক্ষা দেবে না, যা সন্তানকে ন্যায়নিষ্ঠা করে না।’’[58] রাসূল (সা.) আরো  এরশাদ করেন:

‘‘শিশুদের স্নেহ কর এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর। তোমরা তাদের সাথে কোন ওয়াদা করলে তা পূরণ কর। কেননা তাদের দৃষ্টিতে তোমরাই তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করছ।’’[59]

অন্যত্র হাদীস শরীফে এসেছে: الزموا أولآدكم ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখ।’’[60]

অন্যত্র হাদীস শরীফে এসেছে: ‘‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের স্নেহ কর এবং তাদের ভাল ব্যবহার শেখাও।’’[61]

«لأن يؤدب الر جل ولده خير من أن يتصدق بصاع»

‘‘ব্যক্তির সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেয়া এক সা দান খয়রাতের চেয়েও উত্তম।’’[62]

«علموا اولادكم فإنهم مخلوقون لزمان غير زمانكم»

‘‘তোমরা সন্তানদের জ্ঞান দান কর। কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের সৃষ্ট।’’[63]

সন্তানের প্রতি পিতার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে রাসূল (সা) আরো বলেন:

«من له ولد فليحسن اسمه وأدبه فإذا بلغ فليزوجه فإن بلغ ولم يز وجه فاصاب إثما فإنما إثمة على أبيه»

‘‘কারো সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে তার কর্তব্য সে যেন সুন্দর নাম রাখে এবং উত্তম আদব শিক্ষা দেয়। যখন সে বয়:প্রাপ্ত হবে তখন তার বিবাহ দিবে। যদি সে বয়:প্রাপ্ত হয়  আর পিতা যদি বিবাহ না দেয় তখন সন্তান কোন গুনাহের কাজ করলে সে গুনাহ তার পিতার হবে।’’[64]

মতামত প্রদানের অধিকার

শিশুর মতামত একেবারে নিম্নমানের সাদাবিধে বা মূল সমস্যা থেকে বহু দূরেই হোক না  কেন; বিভিন্ন সমস্যার সময় তাদের মতামত গ্রহণ করা। তার মতামতকে তুচ্ছ জ্ঞান করা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা উচিত নয়, বরং তাতে কোন ভুল ভ্রান্তি থাকলে তা দেখিয়ে দেয়া ও সঠিক মতকে তার সামনে প্রকাশ করা। পিতা-মাতার এভাবে শিশুকে মতামত প্রদানের সুযোগদান শিশুকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং তাকে যথাযথ দিক-নির্দেশনা দানে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত পন্থাসমূহ অবলম্বন করা যেতে পারে।

  1. বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে মতামত ব্যক্ত করতে তাকে অভ্যস্ত করানো এবং সমস্যা সম্পর্কে তার মধ্যে চেতনা সৃষ্টি করা।

  2. তার মতামতে কোন ভুল-ভ্রান্তি থাকলে তা দেখিয়ে দিয়ে সুন্দর মতামত দান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে সাহায্য করা।

  3. বড়দের মন্তব্য প্রকাশ ও তাদের মন্তব্য  এবং মতামতের ভাল দিকগুলো দেখিয়ে দেয়া, যাতে শিশুর অন্তরেও সঠিক মতামত পেশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি সৃষ্টিতে চিন্তা করার অবকাশ জন্মে।

  4. সমস্যাদি সম্পর্কে শান্ত পর্যালোচনায় অভ্যস্ত করানো। যাতে করে কোন সমস্যা দৃষ্টে সে অক্ষমের মত দাঁড়িয়ে না থাকে; বরং এর সমাধানে তার মধ্যে সৃষ্টি হয় একটি মনোবল।  বিভিন্ন মতামত ও সিদ্ধান্তের ভাল ও মন্দ উভয় দিক নিয়ে তার সাথে আলোচনা করা উচিত।

  5. এভাবে শিশুদেরকে ভবিষ্যতের জন্যে এবং আগামী দিনে যে সমস্ত সমস্যাদির সম্মুখীন হবে তার সুন্দর মুকাবিলার জন্য তাদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলা যেতে পারে।

  6. তাকে একজন মূল্যহীন মন্তব্যকারী হওয়ার মনোভাব পোষণ না করে বিভিন্ন সমস্যাদির মুকাবিলায় অভ্যস্ত করানো দরকার, যাতে কোন সমস্যাদৃষ্টে সে ভীত-সন্ত্রস্ত কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে না পড়ে। ইসলাম এ বিষয়টিকে উৎসাহিত করেছে। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা.) এর ঘটনা। একবার রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ মুমিনদেরকে একটি বৃক্ষের সাৃথে তুলনা করেছেন যার পাতা ঝরে না, তোমাদের জানা আছে কি, তা কোন বৃক্ষ? সাহাবীগণ সবাই চুপ থাকলেন। তখন রাসূল (সা) নিজেই উত্তর দিলেন; তা হচ্ছে খেজুর গাছ।’’ আব্দুল্লাহ ইবন উমার তার পিতার সাথে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পিতা- পুত্র উভয়ই যখন বাড়ীতে ফিরে গেলেন; তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমার তার পিতাকে বললেন, রাসূল (সা) যা বলেছিলেন তা আমার জানা ছিল কিন্তু সাহাবীদের সামনে উত্তর দিতে ভয় করেছিলেন। তখন তার পিতা তাকে বললেন, তুমি যদি উত্তর দিতে তাহলে আমার নিকট অধিকতর আনন্দের বিষয হতো।[65]

 

সমব্যবহারের অধিকার

সন্তান হিসেবে ছেলে মেয়ে উভয় সমব্যবহারের অধিকারী, এ ক্ষেত্রে কোন প্রকার ব্যবধান সৃষ্টি করা যাবে না। রাসূল (সা) এ ব্যাপারে এরশাদ করেছেন:

«اتقوا الله وإعدلوا فىأولادكم»

তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর এবং সন্তানদের ব্যাপারে ইনসাফ কায়েম কর।[66] মেয়েদের প্রতি অবহেলা করে ছেলেদেরকে অধিকতর গুরুত্বদান ইসলামে নিষিদ্ধ। সকল সন্তানের প্রতি সমব্যবহার করা পিতা-মাতার উপর অবশ্য কর্তব্য। হাদীসে বর্ণিত নিম্নোক্ত ঘটনা দ্বারা এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়।

«وعن أنس : كان رجل عند النيى (ص) فجاء إبن له فقبله وأجلسه على فخذه وجاءت بنت له فأ جلسه بين يديه فقال الرسول (ص) : ألا سويت بينهما؟»

‘আনাস ইবন মালেক (রা) বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। তার শিশু পুত্র তার নিকট এল। উক্ত সাহাবী তাকে চুম্বন করলেন এবং কোলে বসালেন। একটু পরে তার কন্যা এলো। তাকে তিনি  তার সামনে বসালেন। তখন রাসুল (সা.) সাহাবীকে বললেন তোমার কি উচিত ছিল না দুজনের প্রতি সমআচরণ করা?[67] জাগতিক স্বার্থের মোহে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে মানুষ সাধারণত: পুত্র সন্তান হলে আনন্দিত হয়, কন্যা সন্তান হলে অসুন্তুষ্ট হয়। ইসলাম এ হীন ও সংকীর্ণ মনোভাব দূর করতে উপদেশ দিয়েছে। বরং পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যা সন্তানকে পরকালের মুক্তির অন্যতম উপায় হিসেবে ঘোষনা করেছেন। কেননা কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করায়, তাকে সৎ ও সুশিক্ষা দেয়ায়, বয়:প্রাপ্ত হলে সৎ পাত্রে পাত্রস্থ করায় এবং পরবর্তীকালে তার খোঁজ খবর নেয়া ও দেখাশুনা করায় পিতার জাগতিক কোন স্বার্থ থাকে না। উপরন্তু অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এ ব্যাপারে উৎসাহিত করে রাসূল (সা) বলেছেন:

«من كانت له أنثى فلم يئدها ولم يهنها ولم يؤثر ولده عليها قال يعنى الذكور أدخله الله الجنة»

‘‘যাহার কন্যা সন্তান হয়েছে, অথচ উহাকে জীবন্ত কবর দেয় নাই, তাকে লাঞ্ছিত করে না কিংবা তার তুলনায় পুত্র সন্তানকে বেশী স্নেহ করে নাই, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতের প্রবেশ করাবেন।[68] এমনকি বিধবা কিংবা তালাকপ্রাপ্ত কন্যার যদি দেখা-শুনা বা নিরাপত্তা বিধান করার কেউ না থাকে এবং পিতার গৃহে অসহায় অবস্থায় ফিরে আসে, তা হলে পিতা অম্লানবদনে তাকে গ্রহণ করে তার সকল দায়িত্ব পালন করবে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে:

‘‘আমি কি তোমাকে সর্বোত্তম সদকার কথা বলন না? তোমার যে কন্যা তোমার কাছে ফিরে আসে অথচ তুমি ব্যতীত তার উপার্জনের কেউ নেই।’’[69] অর্থাৎ এ অবস্থায় তার ভরণপোষণসহ সকল দায়িত্ব গ্রহণ করা পিতার পক্ষে সর্বোত্তম সদকা।

বৈধ আয় থেকে প্রতিপালিত হবার অধিকার

নিজে যেমন হালাল উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা ওয়াজিব, তেমনি সন্তান প্রতিপালন বৈধ উপার্জন থেকে খরচ করা কর্তব্য। পুত্র সন্তান বলেগ না হওয়া পর্যন্ত এবং কন্যা বিবাহ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের পিতার উপর বর্তায়, তাঁর সামর্থ অনুযায়ী।[70] যেমন পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে:

﴿وَعَلَى ٱلۡمَوۡلُودِ لَهُۥ رِزۡقُهُنَّ وَكِسۡوَتُهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ لَا تُكَلَّفُ نَفۡسٌ إِلَّا وُسۡعَهَاۚ﴾

‘‘জনকের কর্তব্য যথারীতি তাদের (মাতাগণের) ভরণপোষণ করা। কাহাকেও তার সাধ্যাতীত কার্যভার দেয়া হয় না।’’[71] অবৈধ আয় যথা ঘুষ, চুরি, সুদ, প্রতারণা, অসৎকর্ম, নেছা, জুয়া ইত্যাদি উপায়ে অর্থ উপার্জন করে সন্তান প্রতিপালনের বিধান ইসলামে নেই। এ ধরনের অপকর্মের জন্যে সন্তানের কোন দায়িত্ব নেই। রাসূল (সা) বৈধ পন্থায় উপার্জনে উৎসাহিত করার নিমিত্তে এরশাদ করেন:

«طلب الرزق الحلال من أفضل الفرائض»

‘‘হালাল জীবিকা উপার্জন করা সর্বাপেক্ষা বড় ফরজ বা কর্তব্য।’’[72] অন্যত্র এরশাদ হয়েছে:

«سئل النبى (ص) عن افضل الكسب فقال بيع مبرور وعمل الرجل بيده.»

সাহাবীগণ একদা রাসূল (সা) কে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন প্রকারের উপার্জন উত্তম? রাসূল (সা) বললেন, ব্যক্তির নিজ হাতে কাজের বিনিময় বা সুষ্ঠু ব্যবসালব্ধ মুনাফা।’’[73] তাছাড়া নামাজ সমাপ্ত হলে আল্লাহর অনুগ্রহ বা জীবিকা অনুসন্ধানের জন্য জমিনে ছড়িয়ে পড়তে বলা হয়েছে। যেমন- এরশাদ হচ্ছে:

﴿فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرٗا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ﴾ [الجمعة:10]

‘‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’’[74] পিতা-মাতা, শিক্ষকসহ সকলেই সন্তান প্রতিপালনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা এ দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে:

«كلكم راع وكلكم مسئول عن رعيته.»

‘‘তোমরা প্রত্যেকেই (রাখালের মত) দেখাশুনাকারী, আর এ দেখাশুনার ব্যাপারে প্রত্যেকেই জবাবদিহি করতে হবে।’’[75]  আর আদর্শবান সন্তান দুনিয়াতে যেমন সুখ ও শান্তির কারণ তেমনি মৃত্যুর পরে ধন, বাহুবল ও প্রভাব প্রতিপত্তি যখন কোন কাজে লাগবে না তখন সৎ সন্তানই পরকালীন কল্যাণে আসবে। যেমন হাদীস শরীফে রাসূল (সা) এরশাদ করেছেন:

‘‘আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত নিশ্চয় রাসূল(সা) এরশাদ করেছেন, যখন মানুষ এন্তেকাল করে তখন তার সমস্ত আমল বন্দ হয়ে যায়, তবে তিনটি কাজ যার প্রতিদান (এন্তেকালের পরেও) পেতে থাক। ১. এমন সদকা যার কল্যাণকারীতা চলতে থাকে, ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হ, ৩. এমন সৎকর্মশীল সন্তান যে তার পিতা-মাতার জন্য দোয় করে।’’[76]

উপসংহারে বলা যায় শিশুকে সুস্থ্য, সবল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পিতা-মাতা এবং অভিভাবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটুকু আর তাদের নিকট শিশুদের অধিকার কতটুকু এ বিষয়ে অত্র প্রবন্ধে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে আধুনিকতার অনুসারী এক শ্রেণীর মায়েরা নিজেদের সৌন্দর্যহানীর ভয় ও আভিজাত্য রক্ষার্থে স্তন্যদানে অনীহা প্রকাশ করে থাকে। এ প্রবন্ধে আলোচিত স্তন্যদানের ইসলামী এবং বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য তাদেরকে দুগ্ধদানে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করবে। ফলে নতুন প্রজন্ম তাদের ন্যায্য অধিকার পেয়ে সু্স্থ্য সবল ও আদর্শ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার সুযোগ পাবে। আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সামান্যতম ভূমিকা রাখলে আমার শ্রম স্বার্থক হবে। আমিন।

ইসলাম হাউস

শিশুর যত্ন

শিশুর যত্ন

.


শিশুকে ডালের পানি খাওয়ান

ছোট বাচ্চাদের ডালের পানি খাওয়ান। এতে তাদের শরীর ভালো থাকবে।
গরম পানি খাওয়ান
বাচ্চাদের সব সময় পানি গরম করে সেই পানি ঠাণ্ডা করে খাওয়ান।
দুধের সর খাওয়াবেন না
শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় দুধের মধ্য থেকে সরটা সরিয়ে দিন। সর হজম হতে বেশি সময় নেয়।
কালো মেঘের বড়ি
বাচ্চাদের কৃমি দূর করার জন্য কালোমেঘ পাতার বড়ি করে খাওয়ান।
শিশুর হাড় মজবুত করুন
ছোট বাচ্চাদের প্রতিদিন এক চামচ পাকা বেল খাওয়ান, এতে তাদের হাড় মজবুত হবে।
খুসকি কমানোর ভেষজ প্রক্রিয়া
সরষের তেলের মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে তেলটা হালকা গরম করে বাচ্চার মাথায় ম্যাসাজ করুন। এতে খুসকি একেবারেই কমে যাবে।
সহজে দাঁত বের করুন
বাচ্চাদের দাঁত বেরোনোর সময় মধু খাওয়ান, এতে দাঁত খুব সহজেই বেরোবে।
বাচ্চার খুসকি কমান
দইয়ের সঙ্গে মধু মিশিয়ে শিশুর মাথায় লাগান, অল্প কিছুক্ষণ রাখার পর মাথা ধুয়ে দিন। এতে মাথার খুসকি কমে যাবে।

%d bloggers like this: