জানাযার কিছু বিধান

জানাযার কিছু বিধান

তালকিন ও তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা

প্রশ্ন-১. তালকিন কি ও তার নিয়ম কি?

উত্তর: মুমূর্ষূ ব্যক্তিকে কালিমা স্মরণ করিয়ে দেয়া এবং তাকে কালিমা পাঠ করার দীক্ষা দানকে আরবিতে ‘তালকিন’ বলা হয়। যখন কারো উপর মৃত্যুর আলামত জাহির হয়, তখন উপস্থিত ব্যক্তিদের উচিত তাকে لا إله إلا الله বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহকে স্মরণ করতে বলা। উপস্থিত লোকদের সাথে এ কালিমা একবার পাঠ করাই তার জন্য যথেষ্ট, তবে পীড়াপীড়ি করে তাকে বিরক্ত করা নিষেধ।

প্রশ্ন-২. মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কিবলামুখী করার বিধান কি?

উত্তর: আলেমগণ মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করা মুস্তাহাব বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

 «الكعبة قبلتكم أحياء وأمواتا» (رواه أبوداود فى الوصايا بلفظ «البيت الحرام قبلتكم أحياء وأمواتا»(

“বায়তুল্লাহু তোমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবলা”। ইমাম আবু দাউদ ওসিয়ত অধ্যায়ে বর্ণনা করেন, “বায়তুল হারাম তোমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবলা”।   

প্রশ্ন-৩. দাফনের পর তালকিন করার বিধান কি ?

উত্তর: দাফনের পর তালকিন প্রসঙ্গে শরি‘আতে কোন প্রমাণ নেই, তাই এটা বিদাত। দাফনের পর তালকিন প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসগুলো জাল ও আমলের অযোগ্য, তাই তালকিন শুধু মুমূর্ষাবস্থায় করা, মৃত্যুর পর নয়।

প্রশ্ন-৪. অমুসলিম মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালিমার তালকিন করা বৈধ?

উত্তর: হ্যাঁ, সম্ভব হলে অমুসলিম ব্যক্তিকেও কালিমার তালকিন করা বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক ইয়াহূদী খাদেম মমূর্ষাবস্থায় পতিত হলে, তিনি তাকে দেখতে যান ও তাকে কালিমার তালকিন করে বললেন, বলঃ

 « أشْهَدُ أَنْ لاَإِلَه إلاّ اللهَ وأَنَّ مُحَمّدَ رَسُوْلُ اللهِ »

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল”। এ কথা শোনে বালকটি তার পিতা-মাতার দিকে তাকাল, তারা তাকে বললঃ “তুমি আবুল কাসেমের আনুগত্য কর”। এভাবে ইয়াহূদী বালকটি কালিমা পড়ে ইন্তেকাল করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “সমস্ত প্রসংশা মহান আল্লাহ তালার জন্যে যিনি আমার মাধ্যমে এ বালকটিকে জাহান্নামের অগুন থেকে মুক্ত করলেন।

প্রশ্ন-৫. উল্লেখিত হাদিস কি অমুসলিম খাদেম গ্রহণের বৈধতা প্রমাণ করে?

উত্তর: না, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ জীবনে ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে আরব উপদ্বীপ হতে বের করে দিতে বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদেরকে বের করে দিতে বলেছেন, খাদেম হিসাবে তাদেরকে ডেকে আনার কোন অর্থ নেই।

মৃতের গোসল ও কাফন

প্রশ্ন-১. সাহাবি ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস দ্বারা মৃত ব্যক্তির গোসলের পানিতে বড়ই পাতা দেয়া ওয়াজিব প্রমাণিত হয়?

উত্তর- মৃতের গোসলের পানিতে বড়ই বা কুলপাতা দেয়া শরীয়ত সম্মত, তবে ওয়াজিব নয়। আলেমগণ হাদিসের নির্দেশকে মুস্তাহাব বলেছেন। কারণ কুলপাতা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য খুব কার্যকরী। কুলপাতা না পাওয়া গেলে সাবান বা এ জাতীয় কিছু ব্যবহার করাই যথেষ্ট।

প্রশ্ন ২- এহরাম আবস্থায় মৃত ব্যক্তির গোসলের হুকুম কি?

উত্তর: এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তিকেও অন্যান্যদের ন্যায় গোসল দিতে হবে, তবে তার গাঁয়ে সুগন্ধি মাখবে না এবং তার মুখ ও মাথা ঢাকবে না। তার কাফন পাগড়ি ও জামা ব্যতীত শুধু এহরামের কাপড়ে সীমাবদ্ধ থাকবে। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে। এহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির হজের অবশিষ্ট কাজ অন্য কাউকে সম্পূর্ণ করতে হবে না, তার মৃত্যু আরাফাতে অবস্থানের পর বা আগে যখনই হোক। কারণ এ ব্যাপারে রাসূলের কোন নির্দেশ নেই।

প্রশ্ন ৩- নারী ও পুরুষকে কাফন কাপড় পরানোর নিয়ম কি?

উত্তর- জামা ও পাগড়ী ব্যতীত পুরুষকে সাদা তিন কাপড়ে এবং নারীকে ইযার, কামিস, উড়না ও বড় দু’চাদরসহ মোট পাঁচ কাপড়ে কাফন দেয়া উত্তম। এ ছাড়া সতর ঢেকে যায় এমন এক কাপড়ে নারী কিংবা পুরুষকে কাফন দেয়াও বৈধ।

প্রশ্ন ৪- মৃত ব্যক্তির গোঁফ, নখ ইত্যাদি কাটার বিধান কি?

উত্তর- এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট কোন দলিল নেই, তাই কাটা না-কাটা উভয় সমান। কতক আলেম নখ ও গোঁফ কাটার স্বপক্ষ্যে প্রমাণ পেশ করেছেন, কিন্তু গোপন অঙ্গের পশম পরিষ্কার করা ও খতনা করার কোন দলিল নেই, তাই এ দু’কাজ কোন অবস্থাতেই করা যাবে না।

প্রশ্ন ৫- মৃত ব্যক্তির গোসলে কুলপাতা মিশ্রিত পানি ব্যবহার করা কি সুন্নত?

উত্তর- যেহেতু কুলপাতা মিশ্রিত পানি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় খুব কার্যকরী, তাই অনেক ফেকাহবিদ এটাকে উত্তম বলেছেন, তবে বাধ্যতামূলক নয়।

প্রশ্ন ৬- দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়ার সময় রক্তের প্রবাহ বন্ধ করার জন্য অনেকে প্লাষ্টিক ইত্যাদির কাবার ব্যবহার করে, শরি‘আতের দৃষ্টিতে এর হুকুম কি?

উত্তর- রক্তের প্রবাহ বন্ধ করার জন্যে এ ধরণের কাবার ব্যবহারে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ৭- হাদিসঃ

« من غسل ميتا فستر عليه ستر الله عليه يوم القيامة »

“যে ব্যক্তি কোন মৃতকে গোসল দেয়, অতঃপর সে তার দোষত্রুটি ঢেকে রাখে, আল্লাহ তালা কিয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি ঢেকে রাখবেন”। হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর ৭- এ হাদিস সম্পর্কে আমাদের জানা নেই, তবে এ সম্পর্কে আমাদের নিকট বিশুদ্ধ হাদিস হচ্ছেঃ

«من ستر مسلما ستره الله في الدنيا والأخرة»

“যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ তার দোষ ঢেকে রাখবেন”। (বুখারি ও মুসলিম) জীবিত ও মৃত সকল মুসলিম এ হুকুমের অন্তর্ভূক্ত।

প্রশ্ন ৮- সাতবার ধৌত করার পরও যদি মৃত ব্যক্তি পরিষ্কার না হয়, তাহলে এর অধিক ধৌত করার অনুমতি আছে?

উত্তর – প্রয়োজনে অধিকবার ধৌত করা বৈধ।

প্রশ্ন ৯- মৃতদের গোসল দানের পদ্ধতি শিখানোর জন্য প্রশিক্ষণ কোর্স খোলার বিধান কি?

উত্তর – মৃতদের গোসল দানের পদ্ধতি শিখানোর জন্য কোর্স খোলা শরীয়ত সম্মত ও একটি ভাল কাজ। অনেকে তা ভালভাবে করতে পারে না, তাই এর জন্য প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা খুব ভাল উদ্যোগ।

প্রশ্ন ১০- মৃতব্যক্তির গোসল তার পরিবারের লোকদের দেয়া কি উত্তম?

উত্তর – না, এটা জরুরী নয়, বরং বিশ্বস্ত এবং এ বিষয়ে ভাল জ্ঞান রাখে এ রকম লোকই উত্তম।

প্রশ্ন ১১- স্বামীর গোসল তার স্ত্রীর দেয়া উত্তম না অন্য কেউ দেবে?

উত্তর – স্ত্রী যদি অভিজ্ঞ হয় তাহলে তার স্বামীকে গোসল দিতে আপত্তি নেই, যেমন খলিফা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তার স্ত্রী ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা গোসল দিয়েছেন এবং আসমা বিনতে উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহা তার স্বামী আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গোসল দিয়েছেন।

প্রশ্ন ১২- মৃত ব্যক্তি যদি তার গোসলের জন্য কাউকে অসিয়ত করে যায়, তার অসিয়ত পুরো করা কি জরুরি?

উত্তর – হ্যাঁ, তার অসিয়ত পুরো করা জরুরি।

প্রশ্ন ১৩- মৃতের কাফনের নির্দিষ্ট বাঁধন কয়টি?

উত্তর – কাফনের বাঁধনে নির্দিষ্ট কোন পরিমাণ নেই, উপরে নিচে ও মাঝে মোট তিনটিই যথেষ্ট। দু’টো হলেও আপত্তি নেই। মূল বিষয় হল কাফন যেন খুলে না যায় বরং আটকে থাকে, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া।

প্রশ্ন ১৪- মৃতের গোসলে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত কোন সংখ্যা আছে কি?

উত্তর – গোসলদাতা ও তার একজন সহায়ক, মোট দু’জনেই যথেষ্ট।

প্রশ্ন ১৫- গোসলদাতা কি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে যে, সে সালাত আদায় করত কি-না?

উত্তর – যদি বাহ্যিকভাবে মুসলিম বুঝা যায় বা মৃতকে উপস্থিতকারীগণ মুসলিম হয়, তাহলে জিজ্ঞাসার প্রয়োজন নেই। অনরূপ জানাযার সালাতের ক্ষেত্রে। অনেকে এ বিষয়টি সাধারণভেবে জিজ্ঞাসা করে, যার কারণে মৃতের ওয়রিসগণ বিব্রত ও লজ্জাবোধ করেন।

প্রশ্ন ১৬- তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার স্বামী গোসল দিতে পারবে?

উত্তর – তালাক যদি প্রত্যাহারযোগ্য হয় (দু’তালাক বা তিন তালাক) তাহলে মৃত স্ত্রীকে তার স্বামী গোসল দিতে পারবে অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ১৭- অনেক ফেকাহবিদ মন্তব্য করেছেন যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু নশ্বর এই জীবনেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে আপনাদের অভিমত কি?

উত্তর – উল্লিখিত মন্তব্য হাদিসের পরিপন্থী, বিদায় তার দিকে কর্ণপাত না করাই ভাল।

প্রশ্ন ১৮- গুপ্ত আঘাত ও নির্মমভাবে নিহত ব্যক্তিদের কি গোসল দেয়া হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, তাদেরকে গোসল দেয়া হবে এবং তাদের উপর সালাত পড়া হবে। যেমন খলীফা ওমর ইব্‌ন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু ও খলীফা ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন, অতঃপর তাদেরকে গোসল দেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর জানাযা পড়া হয়েছে। অনরূপ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু নির্মমভাবে শহীদ হয়ে ছিলেন, তাকেও গোসল দেয়া হয়েছে এবং তার উপর জানাযা পড়া হয়েছে।

প্রশ্ন ১৯- যুদ্ধের ময়দানে মৃত যদি নানা আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, তাকেও কি গোসল, জানাযা ও কাফন দেয়া হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, তাকেও গোসল ও কাফনসহ সব কিছু করা হবে, তার উপর জানাযা পড়া হবে। তার নিয়ত বিশুদ্ধ হলে ইনশাআল্লাহ সে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে।

প্রশ্ন ২০- কাফন পরানের পর যদি রক্ত নির্গত হয় তাহলে কি কাফন পরিবর্তন করতে হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, কাফন পরিবর্তন করবে বা ধোয়ে নিবে এবং রক্ত যেন বাহির না হয় সে ব্যবস্থা করবে।

প্রশ্ন ২১- মৃত এবং মৃতের কাফনে সুগন্ধি দেয়ার হুকুম কি?

উত্তর – মৃত যদি এহরাম অবস্থায় না হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তির গাঁয়ে ও তার কাফনে সুগন্ধি দেয়া সুন্নত।

প্রশ্ন ২২- গোসলদাতা মৃতের দোষ-ত্রুটি বা গুণাগুণ বর্ণনা করতে পারবে?

উত্তর – ভাল কিছু প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মন্দ কিছু প্রকাশ করবে না। কারণ এটা পরনিন্দা ও গীবতের অন্তর্ভূক্ত। নাম প্রকাশ না করে যদি বলে অনেক মৃতলোক খুব কালো ও কুৎসিত হয়ে যায় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে বলা যে, উমুককে গোসল দিয়েছিলাম তার মাঝে এ ধরণের দোষ দেখতে পেয়েছি, এভাবে বলা নিষেধ। কারণ এর ফলে মৃতের ওয়ারিসরা দুঃখ পায়, তাই এগুলো গিবতের অন্তর্ভুক্ত।

সালাতুল জানাযা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন -১ দাফনের পর সালাতে জানাযার হুকুম কি? তা কি একমাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ?

উত্তর – দাফনের পর জানাযা পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাফনের পর জানাযার সালাত পড়েছেন। যে ব্যক্তি জামাতের সহিত সালাত পাড়েনি সে দাফনের পর পড়বে। যে একবার পড়েছে সে ইচ্ছা করলে অন্যান্য মুসল্লিদের সাথে একাধিকবার পড়তে পারবে, এতে কোন সমস্যা নেই। আলেমদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে দাফনের একমাস পর পর্যন্ত জানাযার সালাত পড়া যায়।

প্রশ্ন ২- জানাযায় অংশগ্রহণকারীর যদি আংশিক সালাত ছুটে যায় তাহলে তা আদায় করতে হবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, ছুটে যাওয়া অংশ সাথে সাথে আদায় করে নিবে। যদি ইমামকে তৃতীয় তাকবীরে পায় তাহলে সে তাকবির বলে সূরা ফাতিহা পড়বে, ইমাম যখন চতুর্থ তাকবীর বলবে তখন সে দ্বিতীয় তাকবীর বলে রাসূলের উপর দরুদ পড়বে, ইমাম যখন সালাম ফিরাবে তখন সে তৃতীয় তাকবীর বলে দু’আ পড়বে অতঃপর চতুর্থ তাকবির দিয়ে সালাম ফিরাবে।

প্রশ্ন ৩- ছুটে যাওয়া আংশিক সালাত আদায়ের আগেই যদি লাশ তুলে নেয়া হয় তাহলে অবশিষ্ট সালাত কিভাবে আদায় করবে?

উত্তর – সাথে সাথে তাকবিরে তাহরিমা বলে সূরা ফাতিহা পড়বে, অতঃপর ইমামের সাথে তাকবির বলবে ও রাসূলের উপর দরুদ পড়বে। অতঃপর ইমাম সালাম ফিরালে সে তাকবির দিয়ে দো‘আ করবে, যার অর্থ: “হে আল্লাহ, তুমি এ মৃতকে ক্ষমা কর, অতঃপর তাকবির বলে সালাম ফিরাবে”। ইমামের সাথে দু’তাকবির পেলে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করবে।

প্রশ্ন ৪- জানাযার সালাতে ইমামের ডানপাশে কাতার বন্ধি জায়েয কি না?

উত্তর – প্রয়োজনে ইমামের ডান ও বাম দিকে কাতার বন্ধি করা যেতে পারে, তবে ইমামের পিছনে কাতার বন্ধি করাই সুন্নত, কিন্তু জায়গার সঙ্কীর্ণতার কারণে ইমামের ডান ও বামে কাতার হতে পারবে।

প্রশ্ন ৫- মুনাফেকের উপর জানাযার নামাজ পড়া যাবে কি?

উত্তর – যার নেফাক সুস্পষ্ট, তার উপর জানাযার সালাত পড়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا ٨٤﴾ [التوبة: 84]

“আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না”। সূরা আত-তাওবাহ: (৮৪) আর যদি নেফাকির বিষয়টি অস্পষ্ট বা অপবাদমুলক হয়, তাহলে তার উপর জানাযা পড়া যাবে, কারণ মৃতের উপর জানাযা পড়া অকাট্য দলীলের কারণে ওয়াজিব, যা কোন সন্দেহের দ্বারা রহিত হবে না।

প্রশ্ন ৬- লাশ দাফনের একমাস পর কবরের উপর জানাযা পড়া যাবে?

উত্তর – এ প্রসঙ্গে আলেমদের মতানৈক্য রয়েছে, তাই উত্তম হল একমাসের পর না পড়া। অধিকাংশ বর্ণনা মতে দেখা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস পর্যন্ত কবরের উপর জানাযা পড়েছেন, একমাসের বেশী সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নামাজ পড়ছেন বলে কোন প্রমাণ নেই। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে জনাযা তো দাফনের পূর্বে পরে নয়।

প্রশ্ন ৭- জানাযার স্থানে পৌঁছতে অক্ষম ব্যক্তি গোসল খানায় জানাযা পড়তে পারবে?

উত্তর – হ্যাঁ, পড়তে পারবে যদি গোসলখানা পাক হয়।

প্রশ্ন ৮- মৃতব্যক্তিকে সালাত পর্যন্ত কোন কক্ষে রাখতে কোন অসুবিধা আছে কি?

উত্তর – না, তাতে কোন অসুবিধা নেই।

প্রশ্ন ৯- একটি হাদিস বলা হয় যে,

«إنَّ الشَّيَاطِيْنَ تَلْعَبُ بِالْمَيِّتِ»

“শয়তান মৃতব্যক্তিকে নিয়ে খেলা করে”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর – এটি একটি বিভ্রান্তিকর কাথা, আমাদের জানামতে ইসলামি শরি‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই।

প্রশ্ন ১০- যারা কবরের উপর নির্মিত মসজিদে নামায পড়া বৈধ মনে করে, তারা তাদের সপক্ষে দলিল পেশ করে যে, মসজিদে নববিও তো কবরের উপর, সেখানে কিভাবে সালাত শুদ্ধ হচ্ছে?

উত্তর – রাসূলের কবর মসজিদে নয় বরং রাসূলের কবর তাঁর ঘরের ভিতর। যারা ধারণা করে যে মসজিদে নববি রাসূলের কবরের উপর তাদের ধারণা ভুল।

প্রশ্ন ১১- জানাযার নামাজে ইমামতির জন্য মসজিদের স্থায়ী ইমাম অধিক হকদার, না মৃতের ওয়ারিসগণ?

উত্তর – জানাযা যদি মসজিদে হয়, তাহলে মসজিদের ইমামই জানাযা পড়াবে।

প্রশ্ন ১২- আমরা জানি যে দাফনের পর প্রায় একমাস পর্যন্ত মৃতের উপর নামাজ পড়া যায়। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে তাঁর শেষ জীবনে “জান্নাতুল বাকি”তে (মসজিদের নববির আশে অবস্থিত গোরস্তান) দাফন কৃত সাহাবাদের উপর জানাযা পড়েছেন এবং তাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন?

উত্তর – তাদের উপর জানাযা পড়েছেন, এর অর্থ হচ্ছে তাদের জন্যে দু’আ করেছেন, আর মৃতদের জন্যে দো‘আ যে কোন সময় হতে পারে।

প্রশ্ন ১৩- যে মসজিদে কবর বিদ্যমান, সেখানে কি সালাত পড়া যাবে?

উত্তর – না, যে মসজিদে কবর রয়েছে সেখানে সালাত পড়া যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে এ জন্যে অভিশাপ করেছেন যে, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছিল।

প্রশ্ন ১৪- যদি অবস্থা এমন হয় যে পুরা শহরে একটি মাত্র মসজিদ, আর তাতে রয়েছে কবর এমতাবস্থায় মুসলিমগণ কি ঐ মসজিদে নামায পড়বে?

উত্তর – মুসলিম কখনো সে মসজিদে সালাত পড়বে না। যদি কবরহীন অন্য কোন মসজিদ পাওয়া যায় তা হলে ঐ মসজিদে পড়বে অন্যথায ঘরেই সালাত পড়বে। কোন মসজিদে কবর থাকলে দেখতে হবে যে, মসজিদ আগে নির্মাণ হয়েছে না কবর আগে তৈরি হয়েছে, যদি মসজিদ আগে হয়ে থাকে তাহলে কর্তৃপক্ষের উপর ওয়াজিব হচ্ছে কবর খনন করে সেখান হতে অবশিষ্ট হাড্ডি মাংশ উত্তলন করে সাধারণ জনগনের জন্যে ব্যাবহারিত কবরস্থানে স্থানান্তর করা। আর যদি কবর পূর্ব হতে থাকে আর মসজিদ পরে নির্মাণ হয়। তাহলে সেখান থেকে মসজিদ ভেঙ্গে অন্য জায়গায় নির্মাণ করবে, যেখানে কোন কবর নেই।

কারণ আম্বিয়ায়ে কেরামের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াহূদী ও খৃস্টানদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। মুমিন জননী উম্মে সালমা ও উম্মে হাবীবাহ যখন সংবাদ দিলেন যে, হাবশায় তাঁরা এমন একটি গির্জা দেখেছেন যেখানে প্রতিমার ছবি নির্মিত। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তাদের মাঝে কোন সৎকর্মশীল লোক মারা গেলে তারা তাদের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করত এবং সেখানে তাদের প্রতিমা স্থাপন করত। তারা আল্লাহর নিকট এ ভূ-পৃষ্ঠের মধ্যে নিকৃষ্টতম প্রাণী”। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোন ব্যক্তি কবরের উপর নির্মিত মসজিদে সালাত পড়লে তা বাতিল বলে গণ্য, এ সালাত পুনরায় পড়তে হবে।

প্রশ্ন ১৫- স্বেচ্ছাসেবামূলক রক্তদান জায়েয আছে কি না?

উত্তর – প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, তবে লক্ষ্য রাখাতে হবে যে দানকারীর যেন কোন কষ্ট না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ

﴿وَقَدۡ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيۡكُمۡ إِلَّا مَا ٱضۡطُرِرۡتُمۡ إِلَيۡهِۗ١١٩﴾ [الأنعام:119]

“অথচ তিনি তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন, যা তোমাদের উপর হারাম করেছেন। তবে যার প্রতি তোমরা বাধ্য হয়েছ”। সূরা আল-আনআম: (১১৯)

প্রশ্ন ১৬- জানাযার নিয়ম কি ?

উত্তর – জানাযার নিয়ম এই যে, প্রথমে তাকবির বলে ইমাম সাহেব আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা-ফাতিহা পড়বে। সূরা ফাতিহার সাথে সূরায়ে ইখলাস বা সূরায়ে ‘আসরের ন্যায় কোরআনের কোন ছোট সূরা বা কিছু আয়াত মিলিয়ে নেয়া মুস্তাহাব। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সূরা মিলিয়ে জানাযা পড়তেন। অতঃপর দ্বিতীয় তাকবির দিয়ে রাসূলের উপর দরুদ পড়বে, যেমন অন্যান্য নামাযের শেষ বৈঠকে পড়া হয়। অতঃপর তৃতীয় তাকবির দিয়ে মৃতের জন্যে দু’আ করবে, দু’আর সময় নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে শব্দের আভিধানিক পরিবর্তন প্রয়োগ করবে, একাধিক জানাযা হলে বহুবচনের সর্বনাম ব্যবহার করবে। অতঃপর চতুর্থ তাকবির বলবে এবং ক্ষণকাল চুপ থেকে ডান দিকে এক সালাম ফিরিয়ে জানাযা শেষ করবে।

আর ছানা ইচ্ছা করলে পড়তেও পারে, আবার ইচ্ছা করলে ছেড়েও দিতে পারে। তবে তা পরিত্যাগ করাই উত্তম হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা জানাযা নিয়ে তাড়াতাড়ি করবে।” (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৭- যে ব্যক্তি জানাযা ও দাফনে অংশগ্রহণ করবে সে কি দু’কিরাত নেকি পাবে?

উত্তর – হ্যাঁ, সে দু’কিরাত নেকি পাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«من تبع الجنازة حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل أحد»

“যে ব্যক্তি জানাযায় অংশগ্রহণ করবে এবং লাশ দাফন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে দু’কিরাত নেকী নিয়ে বাড়ি ফিরবে, প্রতিটি কিরাত ওহুদ পাহাড় সমান”। (বুখারি)

ولقوله صلى الله عليه وسلم «من شهد الجنازة حتى يصلى عليها فله قيراط ومن شهدها حتى تدفن فله قيراطان» قيل يارسول الله: وما القيراطان ؟ قال: «مثل الجبلين العظيمين»

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাযায় অংশগ্রণ করত নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে এক কিরাত নেকি পাবে, আর যে জানাযায় অংশগ্রহণ করে দাফন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে দু’কিরাত নেকি পাবে”। জিজ্ঞসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! দু’কিরাত বলতে কি বুঝায়? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “দুইটি বড় পাহাড় সমপরিমাণ”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৮- ইসলামে বিশেষ অবদান রেখেছেন এমন ব্যক্তির জানাযা একদিন বা ততোধিক বিলম্ব করা যাবে?

উত্তর – বিলম্ব করাতে যদি কল্যাণ থাকে তাহলে করা যাবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়েছে সোমবার অথচ তাঁর দাফন হয়েছে বুধবার রাতে। তাই ইসলামের সেবায় নিবেদিত এমন ব্যক্তির দাফন বিলম্বে যদি কোন কল্যাণ থাকে, যেমন তার আত্মীয় স্বজনের আগমন ইত্যাদি, তাহলে বিলম্ব করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ১৯- কোন মৃতের উপর একাধিক বার জানাযা পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – বিশেষ কারণে একাধিক বার জানাযা পড়া যেতে পারে, যেমন জানাযা শেষে কিছু লোক উপস্থিত হলো, তাহলে এরা মৃতের উপর দাফনের পূর্বে বা পরে জানাযা পড়তে পারবে। এমনিভাবে যে একবার সবার সাথে জানাযা পড়েছে সে আগত লোকদের সাথে লাশ দাফনের পরে ও পুনরায় জানাযা পড়তে পারবে। কারণ এতে সালাত আদায়কারী ও মৃত ব্যক্তি উভয়ের জন্য কল্যাণ রয়েছে।

প্রশ্ন ২০- মায়ের গর্ভে মৃত সন্তানের জানাযা পড়া যাবে কি?

উত্তর – পাঁচ মাস বা ততোধিক সময় গর্ভে অবস্থান করে যদি কোন শন্তান মৃত ভূমিষ্ঠ হয়, তাহলে তাকে গোসল দেবে, তার জানাযা পড়বে ও তাকে মুসলিমদের গোরস্থানে দাফন করবে।

প্রশ্ন ২১- আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়া যাবে কি?

উত্তর – যেহেতু আহলে সূন্নত ওয়াল জামায়াতের মতানুসারে আত্মহত্যার কারণে কেউ মুসলিমদের গন্ডি হতে বেরিয়ে যায় না, তাই অন্যান্য অপরাধীদের ন্যায় তার উপরও কিছু সংখ্যক লোক জানাযা পড়ে নিবে।

প্রশ্ন ২২- নিষিদ্ধ সময়ে জানাযার নামাজা পড়ার বিধান কি?

উত্তর – নিষিদ্ধ সময়ে জানাযা পড়া যাবে না, তবে নিষিদ্ধ সময়টি যদি লম্বা হয়, যেমন ফজরের সালাতের পর হতে সূর্য উঠা পর্যন্ত এবং আসরের সালাতের পর হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত, বিশেষ প্রয়োজনে এ দু’সময়ে জানাযা পড়া ও লাশ দাফন করা যাবে। আর যদি নিষিদ্ধ সময়টি স্বল্প হয় তাহলে জানাযা ও দাফন কিছুই করা যাবে না। আর সল্প সময় বলতে বুঝায় ঠিক বেলা উঠার পূর্ব মুহূর্ত এবং ঠিক দ্বিপ্রহর ও সুর্যাস্তের সময়। সাহাবি উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«ثلاث ساعات كان رسول الله صلى الله عليه وسلم ينهانا أن نصلي فيهن و أن نقبر فيهن موتانا: حين تطلع الشمس بازغة حتى ترفع وحين يقوم قائم الظهيرة حتى تزول وحين تضيّف الشمس للغروب».

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন সময়ে আমাদেরকে জানাযা পড়তে ও তাতে আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন, সুর্যোদয়ের সময় যতক্ষণ না তা পরিপূর্ণরূপে উদয় হয়, ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যায়  এবং ঠিক সূর্যাস্তের সময়। [মুসলিম]

প্রশ্ন ২৩- বিদ’আতির জানাযায় অংশ গ্রহণ না করার বিধান কি?

উত্তর – বিদ’আতির বিদ‘আত যদি বিত’আতিকে কুফর পর্যন্ত নিয়ে যায়, যেমন খারেযি, মুতাযিলা ও জাহমিয়া প্রমূখ পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের বিদ‘আত। তাহলে এরূপ বিদ’আতির জানাযায় অংশ গ্রহণ করা কারো পক্ষেই জায়েয নয়।

আর যদি তার বিদ‘আত এ পর্যায়ের না হয়, তবুও আলেমদের উচিত বিত’আতের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে তার জানাযা পরিত্যাগ করা।

প্রশ্ন ২৪- আলেমদের ন্যায় জনসাধারণ কি বিদ’আতির জানাযা পরিত্যাগ করবে না ?

উত্তর – প্রতিটি মুসলিমের জানাযা পড়া ওয়াজিব, যদিও সে বিদ’আতি হয়। সুতরাং বিদ‘আত যদি কুফরের পর্যায়ের না হয়, তাহলে এরূপ বিদ’আতির জানাযা মুষ্টিমেয় কিছু লোক পড়ে নেবে। আর যদি বিদ‘আত কুফরের পর্যায়ের হয়, যেমন খারেযি, রাফেযি, মুতাযিলা ও জাহমিয়া প্রমূখদের বিদ‘আত, যারা বিপদে-আপদে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও রাসূলের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের শরণাপন্ন হয়, তাদেরকে আহ্বান করে, তাহলে এরূপ বিদ‘আতিদের জানাযায় অংশগ্রহণ করা কাহারো জন্যই জায়েয নেয়। আল্লাহ তাআলা মুনাফেক ও তাদের ন্যায় অন্যান্য কাফেরদের প্রসঙ্গে বলেছেনঃ

﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٖ مِّنۡهُم مَّاتَ أَبَدٗا وَلَا تَقُمۡ عَلَىٰ قَبۡرِهِۦٓۖ إِنَّهُمۡ كَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَمَاتُواْ وَهُمۡ فَٰسِقُونَ ٨٤﴾ [التوبة: 84]

“আর তাদের মধ্যে যে মারা গিয়েছে, তার উপর তুমি জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের উপর দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে”। সূরা আত-তাওবাহ: (৮৪)

প্রশ্ন ২৫- জানাযায় অধিক সংখ্যক লোকের অংশ গ্রহণে কি বিশেষ কোন ফজিলত আছে?

উত্তর – সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«ما من رجل مسلم يموت فيقوم على جنازته أربعون رجلا لايشركون بالله شيئاً إلا شفعهم الله فيه»

“যদি কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করে, আর তার জানাযায় চল্লিশ জন লোক এমন উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে না, আল্লাহ মৃত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করবেন”। (মুসলিম)

তাই আলেমগণ বলেছেন, যে মসজিদে মুসল্লি বেশী হয়, জানাযার জন্য ঐ মসজিদ অন্বেষণ করা মুস্তাহাব, মুসল্লি যত বেশী হবে ততই মৃতের জন্যে কল্যাণ হবে, কারণ এতে সে অধিক মানুষের দু’আ পাবে।

প্রশ্ন ২৬- জানাযার সালাতে ইমামের দাঁড়ানোর নিয়ম কি?

উত্তর – সুন্নত হচ্ছে ইমাম পুরুষদের মাথা বরাবর আর মহিলাদের মাঝা বরাবর দাঁড়াবে। জানাযা একাধিক লোকের হলে প্রথমে সালাবক পুরুষদের লাশ, অতঃপর নাবালেক ছেলেদের লাশ, অতঃপর সাবালক নারীদের লাশ, অতঃপর নাবালেক মেয়েদের লাশ রাখবে। একই সাথে সবার উপর নামাজ পড়ার জন্য প্রথমে পুরুষদের লাশ লাখবে, অতঃপর তাদের মাথা বরাবর বাচ্ছাদের মাথা রাখাবে, অতঃপর তাদের মাথা বরাবর নারী ও মেয়েদের কোমর রাখবে।

প্রশ্ন ২৭- জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

« صلوا كما رأيتموني أصلي »

“তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ, সেভাবেই সালাত আদায় কর”। (বুখারি)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

« لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب »

“ঐ ব্যক্তির কোন সালাত হয়নি, যে সূরা ফাতিহা পাঠ করে নি”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ২৮- চতুর্থ তাকবির শেষে কিছু পড়ার বিধান আছে কি?

উত্তর – চতুর্থ তাকবির শেষে কিছু পড়ার প্রমাণ নেই, তবে চতুর্থ তাকবির শেষে একটু চুপ থেকে অতঃপর সালাম ফিরাবে।

প্রশ্ন ২৯- ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ মৃতলোকের জানাযায় অতিরিক্ত তাকবির বলা যাবে কি?

উত্তর – প্রচলিত নিয়ম তথা চার তাকবিরের উপর সীমাবদ্ধ থাকাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ জীবনে জানাযার পদ্ধতি এরূপই ছিল। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী অত্যন্ত সম্মানী মানুষ হওয়া সত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযায় চারের অধিক তাকবির বলেননি।

প্রশ্ন ৩০- জানাযার নামাজে রাসূলের উপর দরূদ পড়ার হুকুম কি?

উত্তর – ওলামায়ে কেরামের প্রশিদ্ধ উক্তি অনুযায়ী জানাযার সালাতে রাসূলের উপর দরূদ পড়া ওয়াজিব। মুসল্লিরা জানাযায় কখনো রাসূলের উপর দরূদ পরিত্যাগ করবে না।

প্রশ্ন ৩১- জানাযায় সূরা-ফাতিহা পড়ার বিধান কি?

উত্তর – সূরা ফাতিহা পড়া উত্তম, সাহাবি ইব্‌ন ইব্বাস রাদিআল্লাহ আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়তেন।

প্রশ্ন ৩২- জানাযার প্রতি তাকবিরে হাত উঠানো কি সুন্নত ?

উত্তর – জানাযার প্রতি তাকবিরে হাত উঠানো সুন্নত। বর্ণিত আছে যে, সাহাবি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর ও আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস প্রতি তাকবিরে হাত উঠাতেন। (দারা কুতনি)

প্রশ্ন ৩৩- জনৈক ব্যক্তি জানাযা পড়তে মসজিদে প্রবেশ করল, কিন্তু তখনো সে ফরজ সালাত পড়েনি, এমতাবস্থায় সে কি প্রথমে ফরজ নামাজ পড়বে, না অন্যান্য লোকদের সাথে জানাযায় অংশগ্রহণ করবে। যদি ইতিমধ্যে লাশ তুলে নেয়া হয় তাহলে সে জানাযার নামাজ পড়বে কি না?

উত্তর -এমতাবস্থায় সে প্রথমে জানাযার নামাজ আদায় করবে অতঃপর ফরজ নামাজ পড়বে, কারণ তখন যদি সে জানাযা না পড়ে পরবর্তীতে পড়তে পারবে না, পক্ষান্তরে ফরজ নামাজ তো পরেও পড়া যাচ্ছে। লাশ তুলে নেয়ার হলে দাফনের পর জানাযা পড়বে।

প্রশ্ন ৩৪- আমাদেরে কর্মক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোন সহকর্মী মারা গেলে বিজ্ঞাপন বিতরণ করা হয়, যাতে জানাযার সময় ও দাফনের স্থানের উল্লেখ থাকে, এ ব্যাপারে শরি‘আতের হুকুম কি?

উত্তর – যদি এরূপ বলা হয় যে অমুক মসজিদে অমুকের জানাযা হবে ইত্যাদি, তাহলে আমার জানা মতে দোষের কিছু নেই, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাশির ব্যাপারে বলেছিলেন।

প্রশ্ন ৩৫- গায়েবানা জানাযার বিধান কি?

উত্তর – প্রসিদ্ধ মতানুসারে এটা নাজ্জাশীর জন্যে নির্দিষ্ট ছিল। তবে কতিপয় আলেম বলেছেন যে, মৃত ব্যক্তি যদি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়, যেমন বড় আলেম, বড় দায়ি, ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যার বিশেষ অবদান রয়েছে, এরূপ ব্যক্তির ক্ষেত্রে গায়েবানা জানাযা পড়া যেতে পারে। কিন্তু আমাদের জানা মতে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক নাজ্জাশি ছাড়া অন্য কারো উপর গায়েবানা জানাযা পড়েননি, অথচ তাঁর নিকট মক্কাতুল মুক্কারামাহসহ বিভিন্ন স্থান হতে অনেক সাহাবিদের মৃত্যুর সংবাদ এসে ছিল। বাস্তবতার নিরিখে এটাই সত্য মনে হচ্ছে যে, গায়েবানা জানাযা নাজ্জাশির জন্যেই নির্দিষ্ট ছিল, তথাপিও যদি কেউ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী যেমন আলেম ও সরকারী কর্মকর্তা প্রমূখদের উপর পড়তে চায়, তাহলে পড়ার অবকাশ রয়েছে।

প্রশ্ন ৩৬- জানাযায় অধিক কাতার মুস্তাহাব, তাই প্রথম কাতারে জায়গা রেখে দ্বিতীয় কাতার করা যাবে কি?

উত্তর – ফরজ নামাজের কাতারের ন্যায় জানাযার নামাজের কাতার হবে। তাই আগে প্রথম কাতার পূর্ণ করবে অতঃপর দ্বিতীয় কাতার। এক্ষেত্রে সাহাবি মালেক ইব্‌ন হুবাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে না, কারণ তার বর্ণিত হাদিসটি বিশুদ্ধ হাদিসের বিপরীত, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রথম কাতার পূরণ করা ওয়াজীব।

প্রশ্ন ৩৭- জানাযার নামাজ কি মাঠে পড়া উত্তম না মসজিদে?

উত্তর – সম্ভব হলে মাঠে পড়াই উত্তম। তবে মসজিদে পড়াও জায়েয আছে, যেমন মুমিন জননী আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়জা নামীয় ব্যক্তির দু’পুত্রের জানাযা মসজিদেই পড়েছেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন ৩৮- জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়া সুন্নত, এ ব্যাপারে লোকজনকে অবগত করার জন্যে মাঝে মধ্যে তা স্বশব্দে পড়া কেমন?

উত্তর – কখনো কখনো সূরা ফাতিহা স্বশব্দে পড়তে সমস্যা নেই, যদি সূরা ফাতিহার সাথে অন্য কোন ছোট একটি সূরা বা কিছু আয়াত মিলিয়ে নেয়া হয় তাহলে আরও ভাল। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলিয়ে নিতেন। তবে যদি শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে তাও যথেষ্ট।

প্রশ্ন ৩৯- গায়েবানা জানাযার পদ্ধতি কি?

উত্তর – লাশ উপস্থিত থাক আর না থাক জানাযার পদ্ধতি একই।

দাফন ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন ১- কবরের উপর পাথরকুচি রাখা ও পানি দেয়ার বিধান কি?

উত্তর – যদি সম্ভব হয় কবরের উপর পাথরকুচি রাখা মুস্তাহাব, কেননা এর ফলে কবরের মাটি জমে থাকে। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের উপর কাঁচ ভাঙ্গা রাখা হয়েছিল। কবরের উপর পানি ঢালা মুস্তাহাব, যেন মাটিগুলো জমে যায় ও সহজে মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, ফলে মানুষ তার অবমাননা থেকে মুক্ত থাকবে।

প্রশ্ন ২- লাশ কবরে রেখে মুখ খুলে দেবে কি?

উত্তর – মুখ খুলবে না বরং ঢেকে রাখবে। হ্যাঁ, এহরামাস্থায় যার মৃত্যু হয় তার মুখ খুলে দেবে। আরাফাতের ময়দানে এহরাম অবস্থায় জনৈক ব্যক্তির মূত্য হলে লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার দাফন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

«إغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تخمروا رأسه ولا وجهه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا»

“তাকে কুলপাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা গোসল দাও এবং এহরামের দু’কাপড়ে কাফন দাও, তার মাথা ও মুখ ঢেকো না, কারণ কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ৩- অনেকেই মুখ খোলা রাখা ও পাথর রাখার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দেয়, মূলত এর কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – এ ধরণের কথার কোন ভিত্তি নেই, এটা মুর্খতা ও অজ্ঞতার আলামত।

প্রশ্ন ৪- মৃত ব্যক্তি যদি তার লাশ অন্য কোন শহরে দাফন করার জন্য অসিয়ত করে, তাহলে তার এ অসিয়ত পুরো করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – না, তার এ অসিয়ত পুরো করা ওয়াজিব নয়, সে যদি কোন মুসলিম শহরে মারা যায়, তাহলে তাকে ঐ শহরেই দাফন করা বাঞ্চনীয়।

প্রশ্ন ৫- দাফন করার সময় মহিলাদের কবর ঢেকে রাখার বিধান কি?

উত্তর – এটা উত্তম।

প্রশ্ন ৬- মৃত ব্যক্তি যদি জীবিতদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়, তাহলে সে তালকিন অবশ্যই শুনতে পাবে, এ ধরণের মন্তব্য কতটুকু সঠিক?

উত্তর – শরিয়ত অনুমোদিত সকল ইবাদত নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ, এতে অনুমান বা ধারণার কোন অবকাশ নেই। মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পায়ের ধ্বনি শোনে ঠিক, কিন্তু এর ফলে তার কোন ফায়দা হয় না।

মৃত্যুর ফলে মানুষ দুনিয়া হতে আখেরাতে ফিরে যায়, কর্মস্থল ত্যাগ করে ভোগের জায়গায় প্রত্যাবর্তন করে।

প্রশ্ন ৭- কবর খননের লাহাদ ও শেক তথা সিন্দুক ও বগলি এ দু’প্রকারের মধ্যে কোনটি উত্তম এবং দাফন শেষে কবর কতটুকু উঁচু করবে?

উত্তর – মদীনাবাসী লাহাদ খননেই অভ্যস্ত ছিল, তবে কখনো কখনো শেকও খনন করত, যেহেতু আল্লাহ তাআলা তার হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে লাহাদ পছন্দ করেছেন, তাই লাহাদই উত্তম, তবে শেকও জায়েয, বিশেষ করে যখন কোন প্রয়োজন দেখা দেয়। সাহাবি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

اللحد لنا والشق لغيرنا

“লাহাদ আমাদের জন্যে আর শেক অন্যদের জন্যে”। এ হাদিসটি খুবই দুর্বল। কারণ এ হাদিসের সনদে বিদ্যমান আব্দুল-আ’লা আছ্ছালাবী নামক জনৈক বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। আর কবর উঁচু করা হবে এক বিঘত বা তার কাছাকাছি পরিমাণ।

প্রশ্ন ৮- অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মৃতের ওলী ওয়ারিসগণ উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সম্মানিত উপস্থিতি আপনারা আপনাদের দাবি-দাবা মাফ করেদিন, তাকে ক্ষমা করে দিন, তার জন্যে সবাই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এ জাতীয় প্রথা কি শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এ জাতীয় প্রথার কোন ভিত্তি আছে আমার জানা নেই। হ্যাঁ, যদি জানা থাকে যে, মৃত্যুবরণকারী লোকটি মানুষের উপর জুলুম করেছে তাহলে বলা যেতে পারে যে, আপনারা আপনাদের দাবী মাফ করেদিন। অন্যথায় শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, আপনারা তার জন্যে আল্লাহর নিকট দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

প্রশ্ন ৯- কবর বা কবরস্থানের রাস্তা আলোকৃত করার বিধান কি?

উত্তর – যদি তা মানুষের উপকার্থে বা লাশ দাফনের সুবিদার্থে করা হয় তাহলে জায়েয, যেমন প্রাচীর ঘেরা গোরস্থান যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো নেই, লাশ দাফনের সুবিধার্থে সেখানে আলোর ব্যবস্থা করা বৈধ। অন্যথায় কবরের উপর বাতি জালানো বা কবরকে আলোকসজ্জা করা নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم زائرات القبور والمتخذين عليها المساجد والسرج» (رواه الترمذي)

“কবর যিয়ারতকারী নারী, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ও তাতে আলোকসজ্জাকারীদের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন”। (তিরমিজি)

অনুরূপ যদি মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তায় বাতি দেয়া হয় আর তাতে কবর কিছুটা আলোকৃত হয় তবুও দোষের কিছু নেই। অনুরূপ লাশ দাফনের জন্যে বাতি জালানোতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ১০- মাইয়্যেতের সাথে চলার সুন্নত তরিকা কি?

উত্তর – মাইয়্যেতের সাথে জানাযার স্থানে যাবে, অতঃপর গোরস্থানে দাফন শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من تبع جنازة مسلم إيمانا واحتسابا وكان معها حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل جبل أحد» (رواه البخاري)

“যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত ও সাওয়াবের আশায় কোন মুসলিমের জানাযায় অংশ গ্রহন করল এবং দাফন পর্যন্ত তার সাথে থাকল ও তার দাফন কর্ম শেষ করল, সে দু’কিরাত নেকি নিয়ে ফিরবে, প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পাহাড় পরিমাণ”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১১- মৃত ব্যক্তির জন্য ইস্তেকামাতের দু’আ কখন করবে, দাফনের পর না দাফনের মাঝে?

উত্তর – দাফন শেষ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম দাফনের কাজ শেষ করে কবরের পাশে দাড়িয়ে বলেছিলেন,

 «استغفروا لأخيكم ، واسألوا الله له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা পার্থনা কর এবং আল্লাহর নিকট তার জন্য ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হবে। [আবু দাউদ]

«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ» (رواه ابوداود)

“আল্লাহর নামে ও তার রাসূলের তরিকা অনুযায়ী এ লাশ দাফন করছি”। (আবু দাউদ)

প্রশ্ন ১২- কবর আযাব প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যেমন জনৈক ব্যক্তিকে দাফন করার উদ্দেশ্যে কবরে রাখা হলে সাপ বেরিয়ে আসে, যখন অন্য কবরে রাখা হয় সেখানেও সাপ বেরিয়ে আসে ইত্যাদি, এ সবরে ভিত্তি কতটুকু?

উত্তর – ঘটনার সত্যতা সমন্ধে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, তবে এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আল্লামা ইবনে রজন রাহিমাহুল্লাহ নিজ গ্রন্থ “আহওয়ালুল কবর” এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রশ্ন ১৩- ওয়াজ ও নসিহতের সময় এসব ঘটনা উপাস্থাপন বলা কি ঠিক?

উত্তর – এসব ঘটনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যেহেতু জানা যায়নি, তাই এগুলো না বলা উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা যা প্রমাণিত তাই যথেষ্ট। মূল বিষয় হচ্ছে মানুষদেরকে ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দান করা ও গুনাহের প্রতি নিরুৎসাহিত করা। যেমনটি করেছিলেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কিরাম। এ ছাড়া বাস্তব-অবাস্তব কিচ্ছা-কাহিনী না বলাই ভাল।

প্রশ্ন ১৪- এক কবরে নারী-পুরুষ উভয়কে দাফন করা কি জায়েয?

উত্তর – এতে কোন সমস্যা নেই, প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, যখন যুদ্ধ বা মহামারি ইত্যাদি কারণে অনেক লাশ একত্র জমা হয়।

প্রশ্ন ১৫- লাশ কবরে রেখে বাঁধন খুলে দেবে কি?

উত্তর – বাঁধন খুলে দেয়া উত্তম, সাহাবিগণ এরূপ করতেন।

প্রশ্ন ১৬- কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করা জায়েয আছে কি?

উত্তর – কবরের উপর পাথর, হাড্ডি বা লোহা ইত্যাদি দ্বারা চিহ্ন স্থাপন করার দোষণীয় নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি ওসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

প্রশ্ন ১৭- মৃতকে কেবলামুখি করে রাখা সুন্নত না মুস্তাহাব?

উত্তর – মৃতকে কেবলামুখী করে রাখা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الكعبة قبلتكم أحياء و أمواتا» (رواه أبو داود)

“জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায়ই বাইতুল্লাহ তোমাদের কিবলা”। (আবুদাউদ)

তাই মৃতকে ডান পাঁজরে শুইয়ে কেবলামুখী করে রাখবে।

প্রশ্ন ১৮- কবর সংস্কার করা কি জায়েয?

উত্তর – প্রয়োজন হলে কবর সংস্কার করা যায়, যেমন কবরের নির্দিষ্ট জায়গা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা অন্য কোন প্রয়োজনে।

প্রশ্ন ১৯- মৃতুদের হাড্ডি জীর্ণ হয়ে গেলে সেগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা কি জায়েয?

উত্তর –  প্রয়োজন হলে স্থানান্তর করা যাবে, অন্যথায় নিজ স্থানে কবর বহাল থাকবে।

প্রশ্ন ২০- দিনে লাশ দাফন করা উত্তম, এ কথার ভিত্তি কি?

উত্তর – নিষিদ্ধ তিন সময় ব্যতীত যে কোন সময় লাশ দাফন করা বৈধ, সাহাবি উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন সময় নামাজ পড়তে ও আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় ও ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়, যতক্ষণ না তা হেলে যায়।

প্রশ্ন ২১- মৃত ব্যক্তি যদি মহিলা হয়, আর তার কোন অভিভাবক যদি উপস্থিত না থাকে, তাহলে পুরুষগণ স্বেচ্ছায় তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে কি সহযোগিতা করতে পারবে?

উত্তর – মৃত মহিলার অভিভাবক উপস্থিত থাকা সত্বেও তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে স্বেচ্ছায় পুরুষরা সহযোগিতা করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত থাকা সত্বেও তাঁর এক মেয়ের লাশ অন্য পুরুষরা কবরে নামিয়ে ছিল।

প্রশ্ন ২২- কোন মসজিদে যদি কবর থাকে, যা স্থানান্তরে ফিতনার আশঙ্কা হয়, তাহলে সে কবরটি স্থানান্তর করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – এমতাবস্থায় দেখতে হবে যে কোনটি আগে, কবর না মসজিদ, যদি মসজিদ আগে নির্মাণ হয়, তাহলে মসজিদ ঠিক রেখে কবর নিঃশেষ করতে হবে, তবে এ কাজটি আদালত বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা যেন কোন ধরণের ফিতনা সৃষ্টি না হয়। আর যদি কবর আগে স্থাপিত হয়, তাহলে কবর ঠিক রেখে মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (متفق على صحته)

“ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (বুখারি ও মুসলিম)

এমনিভাবে মুমিন জননী উম্মে-সালমা ও উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাবশায় অবস্থিত গীর্জা ও তাতে নির্মিত মূর্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ দিলে, তিনি বলেনঃ

«أولئك إذا مات فيهم الرجل الصالح بنوا على قبره مسجدا وصوروا فيه تلك الصور أولئك شرار الخلق عند الله» (رواه البخاري ومسلم)

“তারা এমন যে, যখন তাদের কোন নেককার লোক মারা যায়, তারা তার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করে ও তাতে তার ছবি অঙ্কন করে, এরাই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম মাখলুক”। (বুখারি ও মুসলিম)

হাদিস দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কবরের উপর নির্মিত মসজিদে নামাজ পড়লে তার নামাজ শুদ্ধ হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরণের মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন, কারণ এটা শিরকে আকরের মাধ্যে গণ্য।

প্রশ্ন ২৩- এক কবরে দু’লাশ রাখার পদ্ধতি কি?

উত্তর – দু’জনের মধ্যে যে অধিক সম্মানী তাকে প্রথমে কিবলা মুখী করে রাখবে, অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে রাখবে। উভয়কে ডান পাজরের উপর কিবলামুখী করে শোয়াবে। যদি তিন ব্যক্তিকে একই কবরে দাফন করতে হয়, তাহলে তৃতীয় ব্যক্তিকে পূর্বের দু’জনের পাশে শোয়াবে। বর্ণিত আছে যে, ওহুদ যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী সাহাবাদের লাশের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দু’জন, দু’জন ও তিনজন তিনজন করে এক-এক কবরে দাফন কর। যে কোরআনে অধিক পারদর্শী তাকে আগে রাখ।

প্রশ্ন ২৪- দাফন করার সময় নিম্নে বর্ণিত আয়াত পাঠ করার বিধান কি?

﴿مِنۡهَا خَلَقۡنَٰكُمۡ وَفِيهَا نُعِيدُكُمۡ وَمِنۡهَا نُخۡرِجُكُمۡ تَارَةً أُخۡرَىٰ ٥٥﴾ [طه:55]

 “মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব এবং এ মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব”। সূরা তা-হা: (৫৫)

উত্তর – দাফনের সময় এ আয়াত বলা সুন্নত তবে এর সাথে আরো যুক্ত করবে—

بسم الله والله اكبر

প্রশ্ন ২৫- কাফনের কাপড়ে কালিমায়ে তাইয়্যিবা লিখা, অথবা কাগজে লিখে তা কাফনে রেখে দেয়া কেমন?

উত্তর – এ ধরণের কাজের কোন ভিত্তি নেই। শরিয়ত স্বীকৃত কাজ হচ্ছে উপস্থিত লোকজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালিমায়ে তাইয়্যিবা তালকিন করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لقنوا موتاكم لا إله إلا الله» (رواه مسلم)

“তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর তালকিন কর”। (মুসলিম) যেন মৃতের সর্বশেষ কথা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হয়। এ ছাড়া কাফনের উপর বা কবরের দেয়ালে কালিমা লেখার কোন বিধান নেই।

প্রশ্ন ২৬- কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করা কেমন?

উত্তর – কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করতে নিষেধ নেই, এটা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়, সাহাবি বারা ইব্‌ন  আজেব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করেছেন।

সান্ত্বনা দান ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন ১- শোকবার্তা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ও তাদের সাথে বৈঠক করা কি বৈধ?

উত্তর – শোকাহত মুসলিম পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়া মুস্তাহাব, এর মাধ্যমে তাদেরকে সুহৃদয়তা দেখানো হয়। এ সময় যদি তাদের নিকট চা, কফি ইত্যাদি পান করে বা আতর ইত্যাদি গ্রহণ করে, যা সাধারণত অন্যান্য সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে করা হয়, এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ২- শোক প্রকাশের সময় এ কথা বলা কেমন যে, সে তার শেষ ঠিকানায় চলে গেছে?

উত্তর – আমার জানামতে তাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ দুনিয়ার তুলনায় পরকাল নিশ্চয় তার শেষ ঠিকানা। তবে মুমিনদের সত্যিকারের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত আর কাফেরদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।

প্রশ্ন ৩- সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্যেঃ

﴿يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧﴾ [الفجر:27]

“হে প্রশান্ত আত্মা” [ফজর: ২৭] বলে মৃতকে সম্বোধন করা কেমন?

উত্তর – এ ধরণের বাক্য পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ তাদের জানা নেই যে মৃতের আত্মা বাস্তবিকেই কেমন। শরিয়ত অনুমোদিত আমল হচ্ছে মৃতের জন্যে প্রার্থনা করা, তার জন্যে ক্ষমা ও রহমতের দো‘আ করা।

প্রশ্ন ৪- পেপার পত্রিকায় শোকপ্রকাশ করা কেমন, এটাকি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর – এটা নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত না হলেও বর্জন করা উচিত, কারণ এতে নিষ্প্রয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়।

প্রশ্ন ৫- মৃতের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তিন দিন পর্যন্ত মৃতের বাড়িতে অবস্থান করে, এটা কেমন?

উত্তর – মৃতের পরিবারের সাথে হৃদ্যতা প্রকাশের জন্য সেখানে তিন অবস্থান করা বৈধ, তবে এ ক্ষেত্রে ওলিমার ন্যায় লোকদের জন্য খাওয়ার অনুষ্ঠান করবে না।

প্রশ্ন ৬ – সান্ত্বনা দেয়ার জন্য কি কোন নির্ধারিত সময় আছে?

উত্তর – আমার জানামতে এর জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই।

প্রশ্ন ৭- শোকাহত পরিবারকে খানা পৌঁছানো বাবদ জবেহকৃত প্রাণী পাঠিয়ে দেয়া কেমন?

উত্তর – দেয়া যেতে পারে, নিকটতম আত্মীয়দের দ্বারা তা রান্না করে নেবে। মুতার যুদ্ধে সাহাবি জাফর ইবন আবু তালিব শাহাদত বরণ করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা তৈরি করে পাঠিয়ে দাও, কারণ তারা কঠিন বিপদগ্রস্ত খানা তৈরির মানষিকতা তাদের নেই।

প্রশ্ন ৮- মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করেছে যে, তার ইন্তেকালের পর যেন বিলাপ করা না হয়, তবও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে, তাহলে কি মৃতকে আযাব দেয়া হবে?

উত্তর – তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, প্রত্যেকের উচিত তার আপনজনদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা। ওয়ারিসদের সতর্ক করার পরও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে তাহলে ইনশাল্লাহ সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ١٨﴾ [فاطر:18]

“আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”। সূরা ফাতিরঃ (১৮)

প্রশ্ন ৯- শোকাহত পরিবারের জন্য প্রেরিত দুপর বা রাতের খাবারে অন্য কেউ অংশগ্রণ করলে তা কি মাতম বা বিলাপে পরিণত হবে?

উত্তর – না, তা মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কারণ আগত লোকদের জন্য শোকাহত পরিবার খানার ব্যাবস্থা করেনি, বরং অন্যরা তাদের জন্য ব্যাবস্থা করেছে, আর তা অতিরিক্ত হওয়ায় অন্যরা তাতে অংশগ্রহণ করেছে, তাই এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ১০ – অনিচ্ছায় যদি ক্রন্দনের মধ্যে বিলাপ এসে যায় তাহলে তার হুকুম কি?

উত্তর – বিলাপ সর্বাস্থায় না জায়েয, তবে চক্ষু অশ্রুশিক্ত ও অন্তর বিষণ্ন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহিমের ইন্তেকালের পর তিনি বলেছেন,

«العين تدمع و القلب يحزن ولا نقول إلا ما يرضى الرب و إنا لفراقك يا إبراهيم لمحزونون» رواه البخاري)

“চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করছে, অন্তর ব্যথিত হচ্ছে, তবুও প্রভূর অসন্তুষ্টির কারণ হয় এমন কথা বলব না, হে ইব্রাহীম, তোমার বিরহে আমরা ব্যথিত”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১১ – শোকপ্রকাশের জন্য সফর করা ও শোকাহত লোকদের নিকট অবস্থান করা কেমন?

উত্তর – এ বিষয়টি শোকাহত লোকদের অবস্থার উপর নির্ভর করবে, তারা যদি এতে আন্দবোধ করে তাহলে তাদের নিকট অবস্থান করতে কোন সমস্যা নেই, অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ১২ – ফকিহগণ বলেছেন, স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য সর্বোচ্চ তিন দিন শোক প্রকাশ করা বৈধ, অর্থাৎ সাজসজ্জ্বা ত্যাগ করা, কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর – কথাটি সম্পূর্ণ সঠিক, বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «لا تحد امرأة على ميت فوق ثلاث إلا على زوج أربعة أشهر وعشرا» (متفق عليه)

“কোন নারী মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ করেব না, তবে তার স্বামীর জন্য চারমাস দশদিন শোক প্রকাশ করবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৩ – শোকাহত পরিবার নিজেদের খানা নিজেরা পাক করতে পারবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, তারা নিজেদের খানা নিজেরা রান্না করবে, এতে কোন সমস্যা নেই, তবে কারো জন্য পাকাবে না।

প্রশ্ন ১৪ – মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা কি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর – মৃতকে উদ্দেশ্যে করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা হারাম ও নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে কারো প্রশংসায় সীমাতিরিক্ত করা কোন অবস্থাতে জায়েয হবে না। যেমন করে থাকে কবি ও গায়কগণ।

প্রশ্ন ১৫ – পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শোকবার্তা পাঠনো কেমন?

উত্তর – বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষ, কারণ এটা একটি ব্যয়বহুল কাজ, তবুও যদি সত্যবাণী দ্বারা শোকপ্রকাশ করা হয় তবে জায়েয, তবে এভাবে না করাই উত্তম। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তাদের নিকট পত্র পাঠাবে বা মোবাইল করবে, বা সাক্ষাত করবে।

কবর যিয়ারত

প্রশ্ন ১ – কবর দৃষ্টিগোচর হলে বা কবরের দেয়াল অতিক্রম করলে কবরবাসীদেরকে সালাম করতে হবে কি?

উত্তর – পথিক হলেও সালাম দেয়া উত্তম, এরূপ ব্যক্তির যিয়ারতের নিয়ত করে নেয়া উত্তম।

প্রশ্ন ২ – যিয়ারতকারীর নির্দিষ্ট কবরের পাশে গিয়ে যিয়ারত করার হুকুম কি?

উত্তর – গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ করাই যথেষ্ট, তবুও যদি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ ও সালাম করতে চায় করতে পারবে।

প্রশ্ন ৩ – মৃত ব্যক্তি যিয়ারতকারীকে চিনতে পারে?

উত্তর – কতিপয় হাদিসে এসেছে যে, যিয়ারতকারী যদি এমন হয় যে দুনিয়াতে তার সাথে পরিচয় ছিল তাহলে আল্লাহ যিয়ারতকারীর সালামের উত্তর দেয়ার জন্য তার রুহ ফিরিয়ে দেন । কিন্তু এ হাদিসের সনদে কিছু ত্রুটি রয়েছে। অবশ্য আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

প্রশ্ন ৪ – উম্মে আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত,

«نهينا عن اتباع الجنائز ولم يعزم علينا»

“আমাদেরকে জানাযার সাথে চলতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি”। হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – আবস্থা দৃষ্টে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, বর্ণনাকারীর  মতে নিষেধটি কঠোর নয়, তবে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে প্রত্যেক নিষেধ হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।

«ما نهيتكم عنه فاجتنبوه وما أمرتكم به فأتوا منه ما استطعتم» (متفق عليه)

“আমি যার থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তোমরা তা পরিত্যাগ কর, আর আমি তোমাদেরকে যার আদেশ দেই, তোমরা তা সাধ্যানুসারে পালন কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, মহিলাদের জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত যাওয়া হারাম, তবে পুরুষদের ন্যায় তারা জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে।

প্রশ্ন ৫ – একটি হাদিসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটতে দেখে বললেন, হে জুতা ওয়ালা! তোমার জুতাদ্বয় খুলে নাও। এ হাদিসের উপর কি আমল করা যাবে? জুতা নিয়ে কেউ কবরের উপর হাটা-চলা করতে চাইলে তাকে কি নিষেধ করা হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে, সুতরাং কোন অবস্থাতেই কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটা-চলা করা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, বিশেষ প্রয়োজনে যেমন কবরের উপর যদি কাঁটাদার গাছ থাকে বা মাটি অত্যন্ত গরম হয়, যে কারণে খালিপায়ে চলা অসম্ভব হয়, এমতাবস্থায় জুতা নিয়ে কবরের উপর হাঁটা যেতে পারে, এরূপ কোন বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাকে অবশ্যই নিষেধ করা হবে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। তাকে শরি‘আতের হুকুম জানিয়ে দেবে।

প্রশ্ন ৬ – গোরস্থানে প্রবেশকালে জুতা খুলার বিধান কি?

উত্তর – কবরের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে জুতা অবশ্যই খুলতে হবে, আর যদি কবরের উপর দিয়ে না হেটে গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়, তা হলে জুতা খুলতে হবে না।

প্রশ্ন ৭ – জনৈক মহিলাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দরত আবস্থায় দেখে বলেছিলেন,

«اتقي الله واصبري»

“আল্লাহকে ভয়কর ও ধৈর্যধারণ কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস কি মহিলাদের কবর যিয়ারত বৈধ প্রমাণ করে না?

উত্তর – সম্ভবত উল্লিখিত ঘটনাটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য কবর যিয়ারত বৈধ থাকাকালিন সময়ের ঘটনা। আর মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষিদ্ধকারী হাদিস এ হাদিসের জন্যে নাসেখ বা এ হাদিসকে রহিতকারী।

প্রশ্ন ৮ – কিছু কিছু শহরে অনেক মানুষ কববের উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এটা নেহায়েত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ, এ কাজের দ্বারা কবরবাসীদের অপমান করা হয়, তাই তাদেরকে এ কাজ হতে বারণ করা এবং শরি‘আতের বিধান সম্পর্কে অবহিত করা জরুরী। তারা এসব কবরের উপর যেসব সালাত আদায় করেছে, তা সব বাতিল ও বৃথা। এ অবস্থায় কবরের উপর বসাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বলেছেন,

« لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها » (رواه مسلم)

“কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না”। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লম আরো বলেছেন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (رواه البخاري)

“আল্লাহ ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর লানত করেছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (বুখারি ও মুসলিম)

এ হাদিস সম্পর্কে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা তাদেরকে তাদের গর্হিত কাজের জন্য সতর্ক করেছেন।

প্রশ্ন ৯ – জনৈক ব্যক্তির কবরের উপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হল, আর ঐ ব্রিজের উপর দিয়ে একটি যাত্রিবাহী গাড়ি যাওয়ার সময় বিরত দিল, যাত্রীদের মাঝে একজন মহিলাও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গাড়িটির যাত্রা বিরতির কারণে সে মহিলা কি কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে, সে মহিলা কি কবরবাসীদের সালাম করবে?

উত্তর – না, মহিলা কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না, ব্রিজ কেন কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কবর যিয়ারতকারী বলে গণ্য হবে না। মহিলা যদি পথচারী হয়, তবুও তার পক্ষে কবরবাসীদের সালাম না করা উত্তম।

প্রশ্ন ১০ – একটি হাদিস প্রচলিত আছে,

« اذا مررتم بقبر كافر فبشروه بالنار »

“যখন তোমরা কোন কাফেরের কবরের পাশ দিয়ে যাও, তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?

উত্তর – আমার জানা মতে এ হাদিসের বিশুদ্ধ কোন সনদ নেই।

প্রশ্ন ১১- মহিলারা কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম দেবে কি?

উত্তর – আমার জানা মতে কবরবাসীদেরকে মহিলাদের সালাম না-করা উচিৎ। কারণ সালাম বিনিময় কবর যিয়ারতের রাস্তা উম্মুক্ত করবে, দ্বিতীয়ত সালাম দেয়া কবর জিয়ারতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মহিলাদের উপর ওয়াজি হচ্ছে সালাম বর্জন করা, তারা যিয়ারত ব্যতীত মৃতদের জন্য শুধু দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের নিয়ম কি?

উত্তর – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের সুন্নত তরিকা এই যে, কবরের দিকে মুখ করে সালাম দেবে, অতঃপর তাঁর দু’সাথী আবু-বকর ও ওমরকে সালাম দেবে, অতঃপর ইচ্ছা করলে অন্য জায়গায় গিয়ে কিবলামুখী হয়ে নিজের জন্য দো‘আ করবে।

প্রশ্ন ১৩ – মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করা নিষেধ, যেসব হাদিসে মহিলাদের কবর যিয়ারত থেকে বারণ করা হয়েছে, সেখানে রাসূলের কবরও অন্তর্ভুক্ত, তাই তাদের জন্য জরুরী হচ্ছে রাসূলের কবর যিয়ারত না-করা। মহিলাদের জন্য রাসূলের কবর যিয়ারত বৈধ না অবৈধ এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম দু’ভাগে বিভক্ত, তাই সুন্নতের অনুসরণ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য মহিলাদের জন্য যে কোন কবর যিয়ারত ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। তা ছাড়া মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ সংক্রান্ত হাদিসে রাসূলের কবরকে বাদ দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় হাদিসের ব্যাপকতার উপর আমল করাই ওয়াজিব, যতক্ষণ না এর বিপরীত কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ১৪ – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?

উত্তর – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলকে শুধু সালাম করবে, শুধু কবর জিয়াতর উদ্দেশ্যে যাবে না, তবে মাঝে-সাজে যেতে পারে।

প্রশ্ন ১৫ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা কি জায়েয?

উত্তর – মসজিদে নববি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। তাই মসজিদে নববির যিয়ারত মূল উদ্দেশ্য করে সফর করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে নবীর কবর যিয়ারত করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لاتشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد: المسجد الحرام ومسجدي هذا والمسجد الاقصى» (رواه البخاري)

“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা যাবে নাঃ মাসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদে আকসা”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১৬ – কবর জিয়ারতের জন্য জুমার দিনকে নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – এর কোন ভিত্তি নেই। যিয়ারতকারী সুযোগ বুঝে যখন ইচ্ছা যিয়ারত করবে। জিয়ারতের জন্য কোন দিন বা রাতকে নির্ধারিত করা বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«من احدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের এ দ্বীনে যে কেউ নতুন কিছু আবিষ্কার করল, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

«من عمل عملا ليس عيه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ নয়, তা পরিত্যক্ত”। হাদিসটি ইমাম মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

প্রশ্ন ১৭ – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিভাবে কবর জিয়ারতের দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন?

উত্তর – কবর যিয়ারত প্রথমে সবার জন্য নিষেধ ছিল, অতঃপর সবার জন্য জায়েয হয়, অতঃপর শুধু মহিলাদের জন্য নিষেধ হয়। এ ব্যাখ্যার পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আহাকে কবর জিয়ারতের আদব তখন শিক্ষা দিয়েছিলেন যখন তা সবার জন্য জায়েয ছিল।

প্রশ্ন ১৮ – কবরের পাশে দো‘আ কি দু’হাত তুলে করতে হবে?

উত্তর – কবরের পাশে দু’হাত তুলে দো‘আ করা জায়েয আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে কবরবাসীদের জন্য দু’হাত তুলে দো‘আ করেছেন। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৯ – কবরের পাশে সম্মিলিত দোয়ার কি হুকুম?

উত্তর – কাউকে দো‘আ করতে দেখে শ্রোতাদের আমিন আমিন বলায় কোন বাঁধা নেই। তবে পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত দো‘আ করা যাবে না। অকস্মাৎ কাউকে দো‘আ করতে দেখে তার সাথে সাথে আমিন আমিন বলা যাবে, কারণ এটাকে সম্মিলিত দো‘আ বলা হয় না।

প্রশ্ন ২০ – গোরস্থানের প্রথমাংশে সালাম দিলে সমস্ত কবরবাসীর জন্য সালাম বিবেচ্য হবে?

উত্তর – এ সালামই যথেষ্ট, সে ইনশাল্লাহ জিয়ারতের সাওয়াব পেয়ে যাবে। যদি গোরস্থান অনেক বড় হয় আর সে ঘুরে ঘুরে সব দিক দিয়ে সালাম বিনিময় করতে চায় তাও করতে পারবে।

প্রশ্ন ২১ – অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা কি জায়েয?

উত্তর – শিক্ষা গ্রহণের জন্য হলে অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে তাঁর জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে এ বিষয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি। শুধু জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ২২ – দু’ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করার কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, যিয়ারতকারীর যখন সুযোগ হবে তখন সে যিয়ারত করবে, এটাই সুন্নত।

প্রশ্ন ২৩ – মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কবর মুখী হয়ে দো‘আ করা কি নিষেধ?

উত্তর – না, নিষেধ নয়, মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কেবলামুখী ও কবরমুখী উভয় বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির দাফন শেষে বললেন,

 «استغفروا لأخيكم واسألوا له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা কর এবং তার ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কেননা তাকে এখন প্রশ্ন করা হবে”। এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেননি যে, কিবলামুখী হয়ে দো‘আ কর।

সুতরাং কিবলামুখী হয়ে দো‘আ করুক আর কবরমুখী হয়ে দো‘আ করুক উভয়ই জায়েয। রাসূলের সাহাবিগণ কবরের চতুর্পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করতেন।

প্রশ্ন ২৪- দু’হাত তুলে মৃতের জন্য দো‘আ করা কি জায়েয?

উত্তর – কিছু কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কবর যিয়ারত করে দো‘আ করতেন তখন দু’হাত তুলেই দো‘আ করতেন। যেমন ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে তাদের জন্য দো‘আ করার সময় দু’হাত তুলেছেন।

প্রশ্ন ২৫ – আমাদের এখানে কিছু সৎকর্মী যুবক বাস করে, তারা নিজেদের সাথে কতক গাফেল লোকদেরকে কবর জিয়ারতের জন্য নিয়ে যেতে চায়, হয়ত তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সঞ্চার হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের মত কি?

উত্তর – এটা একটি মহৎ কাজ, এতে কোন বাঁধা নেই। এটা ভাল কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

প্রশ্ন ২৬ – কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করার হুকুম কি?

উত্তর – লিখা বা নাম্বারিং করা ব্যতীত শুধু পরিচয়ের জন্য কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করা যেতে পারে। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন, আর নাম্বারিং করাও লিখার অন্তর্ভূক্ত। তবে কবরস্থ লোকের পরিচয়ের জন্য শুধু পাথর ইত্যাদি রাখা যাবে, কালো বা হলুদ রঙের পাথরও রাখা যাবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি উসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

জানাযা বিষয়ে বিভিন্ন ফতোয়া

প্রশ্ন ১ – ব্রেইন স্ট্রোকে মৃত্যুবরণকারীর অঙ্গদানের বিধান কি?

উত্তর – জীবিত হোক আর মৃত হোক প্রতিটি মুসলিম অত্যন্ত সম্মানের অধিকারী, সুতরাং তার সাথে এমন কোন আচরণ করা উচিৎ হবে না, যা তার জন্য কষ্টকর বা তার আকৃতি বিকৃতির শামিল, যেমন হাড় বাঙ্গা বা টুকরো টুকরো করা ইত্যাদি। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كسر عظم الميت ككسره حيا »( رواه أبوداود)

“মৃতের হাড় ভাঙ্গা তার জীবিত অবস্থায় হাড় ভাঙ্গার ন্যায়”। (আবুদাউদ) উল্লেখিত হাদিস এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কোন জীবিত ব্যক্তির উপকারার্থে মৃত  ব্যক্তির অঙ্গহানি করা, যেমন রিদপিন্ড বা কলিজা ইত্যাদি কর্তন করা জায়েয নয়, কারণ এটা হাড় ভাঙ্গা হতেও জঘন্য। মানবাঙ্গ দান করা জায়েয কি না এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। কতিপয় আলেম বলেছেন বর্তমান সময়ে অঙ্গদানের অধিক প্রয়োজন দেখা দেয়ার কারণে তা বৈধ। কিন্তু তাদের এ উক্তি সঠিক নয়। পূর্বোল্লিখিত হাদিস দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, অঙ্গদান জায়েয নেই। এবং এতে যেমন মৃত ব্যক্তির অঙ্গের সাথে খেল-তামাশা করা হয়, অনুরূপ তাকে অপমানও করা হয়।

বাস্তব সত্য হল এই যে, মৃতের ওয়ারিসগণ সম্পদের লোভে মৃতের মানহানীর বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করে না, তা ছাড়া ওয়ারিসগণ তো শুধু মৃতের মালের ওয়ারিস হয় তার দেহের ওয়ারিস তো কেউ হয় না।

প্রশ্ন ২ – মৃত কাফেরের হাড় বিচ্ছিন্ন করার হুকুম কি?

 উত্তর – এ বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ, যদি মৃত কাফের জিম্মি অথবা চুক্তিভুক্ত বা নিরাপত্তা কামী হয়, তাহলে তার হাড় বিচ্ছিন্ন করা জায়েয হবে না, কারণ সে মুসলিমদের ন্যায় সম্মানী, আর যদি সে যুদ্ধরত দেশের হয় তাহলে জায়েয হবে।

প্রশ্ন ৩ – প্রতিশোধ বা কিসাস হিসাবে মৃতব্যক্তির হাড্ডি বিচ্ছিন্ন করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – ওয়াজিব নয়, কারণ কিসাস তো চলে শর্তসাপক্ষে শুধু জীবিতদের মাঝে।

প্রশ্ন ৪ – মৃতব্যক্তি অঙ্গদানের অসিয়ত করলে তা কি বাস্তবায়ন করা হবে?

উত্তর – পূর্বের ফতোয়ার কারণে তার অসিয়ত বাস্তবায়ন করা হবে না। যদিও সে অসিয়ত করে যায়, কারণ তার দেহের মালিক সে নিজে নয়।

প্রশ্ন ৫ – মৃতের সম্পদ থেকে প্রথমে কাফন ও সংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন সুগন্ধি ইত্যাদির খরচ কি আলাদা করা হবে?

উত্তর – মৃতের ত্যাজ্য সম্পদ হতে সর্বপ্রথম কাফন দাফন যেমন লাশের গোসল দেয়া, কবর খনন করা ইত্যাদির খরচ বের করা হবে, অতপর বন্ধকের বিনিময়ে গৃহিত ঋণ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সাধারণ করজ পরিশোধ করা হবে, অতঃপর সম্পদের এক তৃতীয়াংশ হতে ওয়ারিস ব্যতীত অন্যদের জন্য কৃত অসিয়ত পূরণ করা হবে।

প্রশ্ন ৬ – কোন ব্যক্তির যদি ব্রেইন স্ট্রোক হয়, তাহলে তাকে তৎক্ষণাৎ মৃত বলা যাবে?

উত্তর – না, তাকে মৃত বলা যাবে না, তাকে মৃত ঘোষণা করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবে না, বরং মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অনেক সময় ডাক্তারগণ রুগির কলিজা ইত্যাদি কেটে নেয়ার জন্য এ বিষয়ে হাড়াহুড়ো করে, এবং মৃতকে নিয়ে যাই ইচ্ছা তাই করতে থাকে এগুলো সম্পুর্ণ না জায়েয।

প্রশ্ন ৭ – ডাক্তারগণ দাবি করেন যে, ব্রেইন স্ট্রোকের মানুষ কখনো জীবন ফিরে পায় না, কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর – তাদের এ দাবি নির্ভরযোগ্য নয়। আমাদের নিকট এমন অনেক তথ্য আছে যে, ব্রেইন স্ট্রোককৃত মানুষ জীবন ফিরে পেয়েছে এবং দীর্ঘদিন জীবিত ছিল। মূল কথা হচ্ছে ব্রেইন স্ট্রোককৃত ব্যক্তিকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রশ্ন ৮ – মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসিন ব্যতীত অন্য কোন সূরা পড়া জায়েয আছে কি?

উত্তর – যেহেতু হাদিস শরিফে সূরা ইয়াসিন পড়ার কথা এসেছে তাই ঐ সূরা পড়াই উত্তম, কিন্তু তার সাথে অন্য সূরা পড়লেও কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ৯ – মৃত ব্যক্তিকে চুম্বন করা জায়েয আছে কি?

উত্তর – মৃত ব্যক্তিকে পুরুষ বা এমন মহিলা চুম্বন করতে পারবে যার সাথে বিয়ে বন্ধন চিরতরের জন্য হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এন্তেকাল হলে সাহাবি আবুবকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কপালে চুমু দিয়ে ছিলেন।

প্রশ্ন ১০ -মৃতকে রিফ্রিজারেটরে রেখে মৃত্যুর ছয়মাস পর জানাযা পড়া কেমন?

উত্তর – প্রয়োজনে ছয়মাস বা ততোধিক সময় দেরি করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ১১ – হজে গমনকরী যে ব্যক্তির হজ নষ্ট হয়ে গেছে, তার মৃত্যু হলে বিধান কি?

উত্তর – তার সাথেও শুদ্ধ হজে গমনকারী ব্যক্তির ন্যায় আচরণ করা হবে। তাকে তার কাপড়েই সুগন্ধি ছাড়া মাথা ও মুখ খোলা রেখে কাফন দয়া হবে। সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত আছে যে, জনৈক হাজি বাহন হতে পড়ে মৃত্যুবরণ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে বললেন,

«اغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تحنطوه ولا تخمروا وجهه ولا رأسه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا» (متفق عليه)

“তাকে কুলপাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা গোসল দাও, এহরামের দু’কাপড়ে কাফন দাও এবং তার মাথা ও মুখ খোলা রাখ, কেননা সে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণী ব্যক্তির উপর জানাযার নামাজ কেন পড়তেন না?

উত্তর – ইসলামের শুরুতে ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহী করা ও গৃহিত ঋণ দ্রুত পরিশোধের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে যায়, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণমুক্ত, ঋণগ্রস্ত সকলের উপর জানাযা পড়তেন।

প্রশ্ন ১৩ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «وأنتم شهداء الله في أرضه»

“তোমরা আল্লাহর জমিনে তার সাক্ষী”। উল্লেখিত হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – এ হাদিসটি সে ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে তার ভাল-মন্দ সব কিছু মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেয়, কাজেই মানুষ তার কর্মের উপর সাক্ষী হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা নিজ উম্মতদিগকে মন্দকাজ করা ও তা প্রকাশে বারণ করেছেন এবং ভাল কাজ করা ও তা প্রকাশের প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

প্রশ্ন ১৪- জীবিতদের কোন আমল মৃতদের নিকট পৌঁছে কি?

উত্তর – যেসব আমল মৃতদের নিকট পৌঁছার কথা হাদিসে এসেছে সে সব আমল পৌঁছে যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

«إذا مات ابن آدم انقطع عمله إلا من ثلاث : صدقة جارية أو علم ينتفع به أو ولد صالح يدعوله» (رواه مسلم)

“যখন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, শুধু তিনটি ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়াহ অথবা মানুষের উপকার হয় এমন এলেম অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দো‘আ করে”। (মুসলিম) এ ছাড়া সাদকাহ, দোয়া, হজ, ওমরাহ ইত্যাদি মৃতের নিকট পৌঁছার কথা হাদিসে এসেছে। কিন্তু সালাত সিয়াম কোরআন তিলাওয়াতে তওয়াফ ইত্যাদি মৃতদের নিকট পৌঁছার কোন প্রমাণ নেই, তাই এগুলো পরিহার করা উচিৎ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

 «من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد» ( رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ মোতাবেক নয়, তা পরিত্যক্ত”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৫ – মৃতরা জীবিতদের কতক আমল দ্বারা উপকৃত হবে আর কতক আমল দ্বারা হবে না, এর প্রমাণ কি?

উত্তর – এসব বিষয় ওহী নির্ভর, এখানে মানুষের ধারণা বা অনুমানের কোন অবকাশ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের দ্বীনে যে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৬ – মৃত ব্যক্তিরা জীবিত নিকট আত্মীয়দের আমল সম্পর্কে অবগত হন কি?

উত্তর – আমার জানামতে শরি‘আতে এর কোন প্রমাণ নেই।

প্রশ্ন ১৭ – ধর্মযুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন কাফেরকে গালি দেয়া যাবে কি?

উত্তর – যদি কোন কাফের ইসলামের বিরোধীতা বা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে, তাহলে তাকে গালি দেয়া শরিয়ত সম্মত। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের একজামা’ত যেমন আবুজাহেল, ওতবা ইবন রাবিয়া, শায়বা ইবন রবিয়ার উপর অভিশাপ করেছেন।

প্রশ্ন ১৮ – বিপদের সময় শোকর করা কি ওয়াজিব?

উত্তর – বিপদের সময় সবর করা ওয়াজিব, কিন্তু তার উপর সন্তুষ্ট থাকা ও শোকর করা মুস্তাহাব। এখানে তিনটি স্তর রয়েছে, (ক) ধৈর্যধরণ, এটা ওয়াজিব। (খ) বিপদের উপর সন্তুষ্ট থাকা, এটা সুন্নত। (ঘ) বিপদের উপর শুকরিয়া আদায় করা, এটাই সর্বোত্তম।

প্রশ্ন ১৯ – অনেক মেডিকেল কলেজগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া হতে গবেষণার জন্য লাশ আনা হয় এবং পরীক্ষা করার জন্য লাশ কাটা-ছেড়া করা হয়, শরিয়ত দৃষ্টে এ কাজ কেমন?

উত্তর – লাশটি যদি এরূপ কাফের সম্প্রদায়ের হয় যাদের সাথে নিরাপত্তার কোন চুক্তি নেই তাহলে বৈধ, অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ২০ – সন্ধেহভাজন মৃত ব্যক্তির অঙ্গ বিচ্ছেদ করা কেমন?

উত্তর – শরিয়ত সম্মত কারণে করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ২১ – জানাযা নিয়ে দ্রুতচলা কি সুন্নত?

উত্তর – জানাযা নিয়ে সাধ্যানুযায়ী দ্রুতচলা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «أسرعوا بالجنازة فإن تك صالحة فخير تقدمونها إليه وإن كان سوى ذلك فشر تضعونه عن رقابكم» (رواه البخاري)

“তোমরা জানাযা নিয়ে দ্রুতচল, যদি পূণ্যবান হয় তাহলে তোমরা তাকে ভাল পরিণতির দিকে দ্রুত পৌঁছে দিলে, আর যদি পাপী হয়, তাহলে একটি মন্দবস্তুকে তোমাদের কাঁধ থেকে দ্রুত সরালে। (বুখারি)

প্রশ্ন ২২ – জানাযায় দ্রুত করার অর্থ কি গোসল ও নামাজে দ্রুত করা?

উত্তর – এর অর্থ হচ্ছে চলার পথে দ্রুত চলা, কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে গোসল, কাফন, দাফন ও নামাজ সব এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্ন ২৩ – উম্মে আতিয়া সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রয়েছেঃ

 «نهينا عن اتباع الجنائز»

“আমাদেরকে জানাযার সাথে যেতে নিষেধ করা হয়েছে”। এ হাদিসের ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – নিষেধের উদ্দেশ্য হচ্ছে গোরস্থানে যাওয়া। জানাযা পড়তে নিষেধ করা হয়নি, জানাযা পুরুষদের জন্য যেমন বৈধ মহিলাদের জন্যও বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মহিলারাও রাসূলের সাথে জানাযায় অংশ গ্রহণ করতেন।

প্রশ্ন ২৪ – জানাযার সাথে গমনকারীদের জন্য সুন্নত তরিকা কি?

উত্তর – জানাযার সাথে গমনকারীদের জন্য সুন্নত হচ্ছে পুরুষরা যতক্ষণ না কাঁধ থেকে লাশ জমিনে না রাখবে, কেউ বসবে না। আর প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সুন্নত হচ্ছে যতক্ষণ না লাশ দাফন শেষ হয় অপেক্ষা করবে, যাতে সালাত ও দাফন উভয় আমলের পরিপূর্ণ নেকি লাভ করা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 «من تبع جنازة مسلم فكان معها حتى يصلى عليها و يفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل جبل أحد» (رواه البخاري)

“যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের জানাযায় অংশ গ্রহণ করে, অতঃপর তার সাথেই থাকে যতক্ষণ না তার উপর সালাত আদায় করা হয় ও তার দাফন শেষ হয়, সে সে দু’কিরাত পূণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরবে, প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পাহাড়ের সমান”। (বুখারি)

প্রশ্ন ২৫ – মৃত ব্যক্তিকে কিভাবে কবরে রাখবে?

উত্তর – আব্দুল্লাহ ইবন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিস প্রমাণ করে যে, মৃত ব্যক্তিকে পায়ের দিক হতে প্রবেশ করিয়ে মাথার দিকে টেনে আনবে এবং কেবলামুখী করে ডান পাঁজরে শোয়াবে এবং নিম্নের দো‘আ পড়বেঃ

 «بسم الله وعلى ملة رسولِ لله»

“আল্লাহর নামে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ মোতাবেক রাখছি”। (আবুদাউদ)

প্রশ্ন ২৬ – কাফেরের জানাযা দেখে দাঁড়ানো যাবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, কাফেরের জানাযা দেখেও দাঁড়ানো যাবে, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « إذا رأيتم الجنازة فقوموا » وجاء في بعض الروايات: قالوا : يارسول الله إنها جنازة يهودي فقال : « أليست نفسا» وفي لفظ « إنما قمنا للملائكة » وفي لفظ « إن للموت لفزعا» (رواه أحمد)

“যখন তোমরা জানাযা দেখ, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে যাও। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সাহাবগণ বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! এটাতো এক ইয়াহূদীর জানাযা”। তিনি বললেনঃ “এটা কি প্রাণী নয়?” অন্য বর্ণনায় আছে যে, “আমরা তো ফেরেশতাদের সম্মানার্থে দাঁড়িয়েছি”। অন্য আরেকটি বর্ণনায় আছে যে, “মৃত্যুর রয়েছে বিভীষিকা রয়েছে”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৭ – কোন মুসলিম মসজিদে অবস্থান করছেন, এমতাবস্থায় কোন জানাযা যাইতে দেখলে দাঁড়াতে হবে কি?

উত্তর – হাদিসের বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে এমতাবস্থায়ও দাঁড়ানো মুস্তাহাব। না দাঁড়ালেও সমস্যা নেই কারণ এটা সুন্নত বা ওয়াজিব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একসময় জানাযা দেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবার অন্য সময় দাঁড়াননি।

জানাযা বিষয়ে প্রশ্নাবলি

প্রশ্ন ১ – পুরুষদের কবর কতটুকু গভীর হবে আর নারীদের কবর কতটুকু গভীর হবে?

উত্তর – উত্তম হচ্ছে উভয়ের কবর মানবাকৃতির অর্ধেক পরিমাণ গভীর করা, যেন হিংস্রপ্রাণীর আক্রমণ হতে নিরাপদ থাকে।

প্রশ্ন ২ – পাহাড়ি এলাকায় মৃতব্যক্তিকে পাহাড়ের গর্তে বা গুহায় দাফন করা হয় এটা কেমন?

উত্তর – সম্ভব হলে কবর খনন করা এবং কাচা ইটের দেয়াল তৈরি করে দেয়া উত্তম। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে পাহাড়ের গুহায় মাটি দেবে এবং হিংস্রজন্তু হতে নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা করবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ ١٦﴾ [التغابن:16]

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর”। সূরা আত্তাগাবুনঃ (১৬)

প্রশ্ন ৩ – কাচা ইট পাওয়া না গেলে পাথর ব্যাবহার করা যাবে কি?

উত্তর – বর্ণিত আয়াতের দ্বারা বুঝা যায় যে কাচা ইট পাওয়া না গেলে কাঠ, পাথর, পাত ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে, যার দ্বারা মৃতের সুরক্ষা হয়, অতঃপর মাটি দেবে। আল্লাহ তালা বলেছেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ ١٦﴾ [التغابن:16]

“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর”। সূরা আত্তাগাবুনঃ (১৬)

অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 «إذا أمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم» (رواه البخاري)

“আমি যখন তোমাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ করি, তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী তা বাস্তবায়ন কর”। (বুখারি)

প্রশ্ন ৪ – অনেক জায়গায় দেখা যায় যে, নারী-পুরুষের কবর সহজে পার্থক্য করার জন্য, নারীদের জন্য একধরনের চিহ্ন আর পুরুষদের জন্য অন্য ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের কাজের কোন ভিত্তি আছে কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, সুন্নত হচ্ছে দাফন, উচ্চতা ও গভীরতা নারী-পুরুষ সকলের জন্য সমান হবে।

প্রশ্ন ৫ – সহজে পার্থক্য করার সুবিধার্থে গোরস্থানের কিছু অংশ পুরুষদের জন্য আর কিছু অংশ মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – আমার জানা মতে এর কোন ভিত্তি নেই। শরিয়ত সম্মত নিয়ম হল সমগ্র গোরস্থান সকলের জন্য সমপর্যায়ের থাকবে, এটাই সকলের জন্য সহজতর উপায়। ইসলামের ঊষালগ্ন হতে অধ্যাবদি এ পদ্ধতিই চলে আসছে। মদিনার ‘জান্নাতুল বাকি’ নামক গোরস্থান নারী-পুরুষের জন্য সমান ছিল, আর সমস্ত কল্যাণ ও মঙ্গল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাগণের অনুসরণের মধ্যেই বিদ্যমান।

প্রশ্ন ৬ – সহজে পরিচিতির জন্য অনেক গোরস্থানের প্রতিরক্ষা দেয়ালে নম্বর লাগানো হয় এটা কেমন?

উত্তর – অনেক ক্ষেত্রে কবরের উপর লিখার কারণে কবর কেন্দ্রিক ফেতনা সৃষ্টি হয়, তাই কবরের উপর লিখা সম্পুর্ণ নিষেধ ও না-জায়েয। আর প্রতিরক্ষা দেয়ালে নম্বর লাগানো নিষেধ হওয়া সম্পর্কে আমার নিকট যদিও কোন প্রমাণ নেই, তবুও বলব যেহেতু এটাও কবরের উপর লিখার সাদৃশ্য তাই এটা বর্জন করা উচিৎ।

প্রশ্ন ৭ – অনেক সান্ত্বনা প্রদানকারীকে দেখা যায় যে, সহজে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে তারা শোকাহত লোকদেরকে কবর হতে দূরে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে তাদের সাথে কথা-বার্তা বলে, এরূপ করা কেমন?

উত্তর – আমার জানামতে এরূপকরাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ এতে সান্ত্বনা জ্ঞাপন সহজ হয়।

প্রশ্ন ৮ – মুমূর্ষু বা মৃত মহিলাদেরকে মেহেদী দেয়া কেমন?

উত্তর – আমার জানা মতে এর কোন ভত্তি নেই।

প্রশ্ন ৯ – মৃত ব্যক্তিকে মিসওয়াক করানো কেমন?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, শরি‘আতের বিধান হচ্ছে মৃতকে অযু করানো, অযু করানোর সময় যখন কুলি করানো হয় তখন যদি জীবিতদের ন্যায় তাকেও মিসওয়াক করিয়ে দেয়া হয়, তাহলে করানো যেতে পারে।

প্রশ্ন ১০ – উপস্থিত লোকজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কিভাবে কিবলামুখী করবে?

উত্তর – ডানপাশে শোয়াবে এবং মুখমন্ডল কিবলামুখী করে দেবে, যেমনটি করা হয় কবরে শোয়াবার সময়।

প্রশ্ন ১১ – মৃতের উপর কোরআন মজিদ রেখে দেয়া কেমন?

উত্তর – এ ধরণের কাজ শরিয়ত সম্মত নয়, শরি‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই, বরং এগুলো বিদ‘আত।

প্রশ্ন ১২ – জানাযার নামাজ মাঠে পড়াই উত্তম বলে সুবিদিত, তাই গোরস্থানের একাংশ জানাযার জন্য নির্দিষ্ট করব না ঈদের মাঠেই জানাযা পড়ব?

উত্তর – জানাযার জন্য যদি নির্ধারিত কোন স্থান থাকে তাহলে সেখানেই পড়বে অন্যথায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জানাযা মসজিদেই পড়বে। জানাযার নামাজ মসজিদে পড়তে কোন সমস্যা নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়জা নামী ব্যক্তির দু’পুত্রের জানাযা মসজিদেই পড়েছেন।

প্রশ্ন ১৩ – কোন মুসল্লি নিজ মহল্লায় ফরজ নামাজ পড়লেন অতঃপর জানাযার জন্য গিয়ে দেখলেন যে, ঐ মসজিদে এখনও ফরজ নামাজের জামাত হয়নি। এমতাবস্থায় সে জানাযার জন্য অপেক্ষা করবে না অন্যদের সাথে নামাজে শরিক হবে? এমনিভাবে যে ব্যক্তি এত বিলম্বে আসল যে, নামাজ তিন রাকাত হয়ে গেছে, যদি সে জামাতে শরিক হয় তাহলে তার জানাযাও ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমতাবস্থায় সে কি করবে?

উত্তর – কোন মুসলিম যদি মসজিদে এসে দেখতে পায় যে, মুসল্লিগণ জামাতের সহিত নামাজ পড়ছে তখন সেও জামাতে শরিক হয়ে যাবে, এ নামাজ তার জন্য নফল হবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুজর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন,

«صل الصلاة لوقتها فإن أقيمت وأنت في المسجد فصل معهم فإنها لك نافلة» ( رواه مسلم)

“হে আবুজর, সময়মত নামাজ পড়, যদি নামাজের ইকামত হয় আর তুমি তখন মসজিদে থাক, তখন তাদের সাথেও নামাজ পড়, এটা তোমার জন্য নফল হবে”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিদায় হজে মিনায় অবস্থান করছিলেন, দু’ব্যক্তিকে রাসূলের নিকট আনা হল যারা জামাতে অংশগ্রহণ করে নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,

«ما منعكما أن تصليا معنا ؟» فقالا : يا رسول الله قد صلينا في رحالنا . قال : «لا تفعلا إذا صليتما في رحالكما ثم أتيتما مسجد جماعة فصليا معهم فإنها لكم نافلة»

“আমাদের সাথে তোমরা কেন নামাজ পড়নি” তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আমাদের দলের সাথে নামাজ পড়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: “এরূপ কর না, যখন তোমরা তোমাদের তাবুতে নামাজ পড়ে নাও, অতঃপর কোন মসজিদের জামাতে এসে উপস্থিত হও, তখন তাদের সাথেও নামাজ পড়, এটা তোমাদের জন্য নফল হবে”।

প্রশ্ন ১৪ – মৃত ব্যক্তি যদি এই মর্মে অসিয়ত করে যে, তার জানাযার নামাজ অমুক ব্যক্তি পড়াবে, তাহলে ইমামতির জন্য অসিয়তকৃত ব্যক্তি উত্তম হবে না নির্ধারিত ইমাম?

উত্তর – অসিয়তকৃত ব্যক্তির তুলনায় মসজিদের নির্ধারিত ইমামই উত্তম, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « لا يؤمن الرجل الرجل في سلطانه» (رواه مسلم)

“কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কর্তৃত্বের জায়গায় ইমামতি করবে না”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৫ – ইমামের সামনে জানাযার জন্য লাশ রাখার নিয়ম কি?

উত্তর – মৃত পুরুষের লাশ এভাবে রাখবে যে, লাশের মাথা যেন ইমাম বরাবর হয়, আর মৃত মহিলার লাশ এভাবে রাখবে যে, লাশের কোমর যেন ইমাম বরাবর হয়। এপদ্ধতিই সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর যদি লাশ নারী-পুরুষ উভয়ের হয়, যেমন নারী, পুরুষ ও বাচ্ছা, তাহলে ইমামের সামনে প্রথমে পুরুষের লাশ, অতঃপর বালকের লাশ, অতঃপর মহিলার লাশ, অতঃপর বালিকার লাশ রাখবে। লাশ রাখার ক্ষেত্রে পুরুষের মাথা বরাবর মহিলাদের কোমর হবে, যেন সকল লাশের অবস্থান ইমামের সামনে শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে হয়।

প্রশ্ন ১৬ – এহরামরত মহিলার লাশকে কিভাবে কাফন পড়াবে?

উত্তর – অন্যান্য মহিলাদের ন্যায় তাকেও ইযার (দেহের নিম্নাংশের পরিধেয় বস্ত্র), উড়না, জামা ও দু’চাদর দ্বারা কাফন পড়াবে। মাথা ঢেকে দেবে তবে নেকাব ব্যতীত। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহরামত মৃত মহিলাকে নেকাব পড়াতে নিষেধ করেছেন, যেহেতু সে এহরামরত তাই সুগন্ধিও লাগাবে না।

প্রশ্ন ১৭ – ভিডিওর মাধ্যমে মৃতের গোসল ও কাফন দাফন শিখানো কেমন?

উত্তর – বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, ছবি অঙ্কন করা নিষেধ, ছবি অঙ্কনকারীগণ অভিশপ্ত, তাই ভিডিও ছাড়া অন্য উপায়ে মৃতের গোসল ও কাফন-দাফন শিখাবে।

প্রশ্ন ১৮ – শহরের ভেতর অবস্থিত গোরস্থান ঈদগাহের একেবারে নিকটে এমতাবস্থায় ঈদগাহ পরিবর্তন করার হুকুম কি?

উত্তর – এটা আদালতের কাজ, আদালত বিবেচনা করবে এ অবস্থায় শরি‘আতের দৃষ্টিতে কি করা উচিৎ।

প্রশ্ন ১৯ – গোরস্থানের গেটে গোরস্থানে প্রবেশের দো‘আ লেখার হুকুম কি?

উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই। এর বিপরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন বলে প্রমাণিত, তা ছাড়া কবরের গেটের উপর লেখার অনুমোদন, কবরের উপর লেখার প্রচলনকে প্রসারিত করবে, তাই কবরের গেটের উপর দো‘আ ইত্যাদি লেখা ঠিক হবে না।

প্রশ্ন ২০ – কবরের উপর কাচা খেজুর গাছের ডালা স্থাপন করার হুকুম কি?

উত্তর – এটা শরিয়ত সম্মত নয় বরং বিদআত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, অমুক দু’কবরে আযাব হচ্ছে, তাই তিনি ঐ দু’কবরের উপর খেজুরের ডালা স্থাপন করেছেন, যাতে কবর আযাব বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া অন্য কোন কবরের উপর তিনি তা স্থাপন করেননি। এতে বুঝাগেল যে এ কাজটি ঐ দু’কবরের সাথে সীমাবদ্ধ ছিল, তাই অন্য কোথায় এ কাজ করা বৈধ হবে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যে বিষয়ে আমাদের আদর্শ নেই, তা পরিত্যক্ত”। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

« من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)

“আমাদের এ দ্বীনে যে নতুন কিছুর উদ্ভাবন করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ও মুসলিম)

বর্ণিত হাদিসদ্বয় একথার প্রমাণ যে, কবরের উপর লিখা, ফুল দেয়া ইত্যাদি সম্পূর্ণ না-জায়েয। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে চুনা করতে, কবরের উপর ঘর বানাতে, বসতে ও লিখতে নিষেধ করেছেন।

প্রশ্ন ২১ – মুক্তাদির যদি জানা না থাকে যে, মৃত ব্যক্তি নারী কি পুরুষ, এমতাবস্থায় সে কিভাবে দো‘আ পড়বে?

উত্তর – দোয়ার বিষয়টি ব্যাপক, তাই এখানে যদি পুংলিঙ্গের স্থলে স্ত্রীলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গের স্থলে পুংলিঙ্গের সর্বনাম ব্যবহার করা হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ২২ – বালকদের জানাযায় কোন দো‘আ পড়বে?

উত্তর – বড়দের জন্য যে দো‘আ পড়া হয় বালকদের জন্য অনুরূপ দোয়াই পড়বে। হ্যাঁ, তাদের জন্য সহিহ হাদিস দ্বারা যে অতিরিক্ত দো‘আ প্রমাণিত, তা হচ্ছেঃ

« اللهم اجعله ذخرا لوالديه وفرطا وشفيعا مجابا اللهم أعظم به أجورهما وثقل به موازينهما وألحقه بصالح سلف المؤمنين واجعله في كفالة إبراهيم عليه الصلاة والسلام و قه برحمتك عذاب الجحيم »

“হে আল্লাহ, এই বাচ্চাকে তার পিতা-মাতার জন্য অগ্রবর্তী নেকী ও সযত্নে রক্ষিত সম্পদ হিসাবে কবুল কর এবং তাকে এমন সুপারিশকারী বানাও যার সুপারিশ কবুল করা হয়। হে আল্লাহ, এই বাচ্চার দ্বারা তার পিতা-মাতার সওয়াব আরো বৃদ্ধি কর। এর দ্বারা তাদের নেকীর পাল্লা আরো ভারী করে দাও। আর একে নেককার মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত কর এবং তাকে ইবরাহীম  আলাইহিস সালামের যিম্মায় রাখ। তাকে তোমার রহমতের দ্বারা দোযখের আযাব হতে বাঁচিয়ে দাও”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

 «الطفل يصلى عليه ويدعى لوالديه» (رواه أحمد)

“বাচ্চার উপর নামাজ পড়া হবে, কিন্তু দো‘আ তার পিতা-মাতার জন্য করা হবে”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৩ – মৃত যদি কোন ভিন্ন দেশের শ্রমিক হয় এবং তার অভিভাকগণ লাশের দাবি করে, কিন্তু লাশ পৌঁছানোর প্রচুর খরচের সাথে সাথে তাকে দীর্ঘদিন বক্সে রাখতে হয়, যার কারণে তার নাড়িভুড়ি পর্যন্ত গলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এমতাবস্থায় কফিল কি তাকে মৃত্যুর স্থানেই দাফন করবে, না অভিভাকদের দাবি অনুযায়ী তার দেশে পাঠিয়ে দেবে?

উত্তর – জীবিত-মৃত সর্বাবস্থায় প্রতিটি মুসলিম মর্যাদার অধিকারী, তাই কোন মুসলমানের লাশ স্থান্তরের মধ্যে যদি প্রশ্নে বর্ণিত সমস্যার সম্ভাবনা থাকে তাহলে কোন অবস্থাতেই একজন মুসলমানের লাশ স্থান্তর করা জায়েয হবে না। যেখানে তার মৃত্যু হয়েছে সেখানেই তার দাফন হবে, এটাই শরিয়ত স্বীকৃত নিয়ম। হ্যাঁ, যদি তার লাশ স্থানন্তরের উপর ধর্মীয় কোন কল্যাণ নির্ভরশীল হয়, এবং স্থানন্তর না করলে মুসলিমগণ তা হতে বঞ্চিত হবে, আর স্থানন্তর দ্বারা প্রশ্নে বর্ণিত লাশ বিকৃতির সমস্যাও না-থাকে তাহলে স্থানন্তর করা যেতে পারে।

হ্যাঁ, যদি আরব উপদ্বীপে কোন কাফেরের মৃত্যু হয় তাহলে অবশ্যই তার লাশ স্থানান্তর করতে হবে। কোন অবস্থাতেই তাকে আরব উপদ্বীপে দাফন করা জায়েয হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমুসলিদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়ার জন্য অসিয়ত করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

«لايجتمع فيها دينان» (رواه أحمد)

“আরব উপদ্বীপে কখনো দু’টি ধর্ম একত্র হতে পারে না”। (আহমদ)

প্রশ্ন ২৪ – জনৈক মহিলা কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই মৃতদের গোসল দিতেন, যা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ, তবুও তিনি কাজটি এ জন্য ছেড়ে দিয়েছেন যে, এ কাজের দ্বারা মানুষ নির্বোধ ও নির্দয় হয়ে যায়। তার এ মন্তব্যের উপর আমরা একমত পোষণ করব কি না?

উত্তর – মুসলিমদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে এ মহিলার জন্য উচিৎ যে, তিনি নিয়মিতভাবে মৃতদের গোসল দিয়ে যাবেন এবং আল্লাহর নিকট হতে পুরুস্কারের দৃঢ় আশা রাখবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

 « من كان في حاجة أخيه كان الله في حاجته» (متفق عليه)

“যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পুরো করে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পুরো করবেন”। (বুখারি ও মুসলিম)

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

« والله في عون العبد ما كان العبد في عون أخيه» (رواه مسلم)

“আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে লেগে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহয্যে লেগে থাকে”। (মুসলিম)

প্রশ্ন ২৫ – মৃতের জানাযার নামাজ পড়ার জন্য সফর করার হুকুম কি?

উত্তর– জানাযার জন্য সফর করা যেতে পারে, কোন সমস্যা নেই।

দরুদ ও সালাম নাযিল হোক মুহাম্মদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পরিবার এবং সমস্ত সাহাবি ও মুমিনদের উপর।

সূত্র: ইসলাম হাউস

Advertisements

রোগের নাম বেলস্ পালসি

রোগের নাম বেলস্ পালসি


 

মানুষের মুখের মাংসপেশিগুলোর কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ু। ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুকে আবার সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভ বা স্নায়ু বলা হয়। মুখের প্যারালাইসিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো স্ট্রোক এবং সেরিব্রোভাসকুলার এক্সিডেন্ট, যা উপরের মটর স্নায়ু কোষের রোগ নামেও পরিচিত। যখন ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুর কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটে তখন সাধারণত মুখের এক পাশে প্যারালাইসিস ভাব হতে থাকে যা বেলস্ পালসি রোগ নামে পরিচিত। বেলস্ পালসিকে আবার মুখের নিচের মটর নিউরোন রোগও বলা হয়।

বেলস্ পালসি রোগে ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুর প্রদাহ দেখা দেয়। মুখে ইডিমা বা ফোলা ভাব থাকে। মুখের স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়ে থাকে। বেলস্ পালসি রোগটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে আবার সংক্রমণের সঙ্গেও দেখা দিতে পারে। সাধারণত হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু অন্যান্য সংক্রমণ যেমন : এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণ, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, সাইটোমেগালি ভাইরাস, ভ্যারিসিলা জসটার ভাইরাস ইত্যাদি ভাইরাসের সংক্রমণের পর দেখা যেতে পারে। বেলস্ পালসি রোগে অবশ ভাব বা প্যারালাইসিস শুরু হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, যা সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। যদিও কানের পাশে এবং চোয়ালে ব্যথার সঙ্গে অনেক সময় প্যারালাইসিস হতে এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। এ রোগে সাধারণত মুখের এক পাশে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। রোগীর জিহ্বার স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। লালার প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে আসে। চোখের পানি আসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত এ অবস্থা ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগীদের মাঝে বেশি লক্ষ্য করা যায়। আবার বয়স বেশি হলেও একই সমস্যা দেখা যেতে পারে। রোগী মুখের অবশ ভাবের অভিযোগ করে থাকেন যদিও পরীক্ষা করলে দেখা যায় রোগীর অনুভূতি ঠিক আছে। প্রথম সপ্তাহে অসম্পূর্ণ মুখের প্যারালাইসিস হলে রোগটির চিকিত্সা সাধারণত সহজ হয়ে থাকে। শতকরা ৮৫ ভাগ রোগী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছু রোগীর স্থায়ীভাবে কিছু প্যারালাইসিস বা অবশ ভাব থেকে যায়।

চিকিত্সা
সাধারণত কর্টিকোস্টেরয়েড বা প্রেডনিসোলন ট্যাবলেট দৈনিক ১ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি শরীরের ওজন হিসেবে ১০ দিন খেতে হবে। এর সঙ্গে এসাইক্লোভির গোত্রভুক্ত ট্যাবলেট ভাইরাক্স ৪০০ মিলিগ্রাম দৈনিক ৪টি করে ১০ দিন খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়। বেলস্ পালসি রোগটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কোনো উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় তাহলে ফেসিয়াল নার্ভে নির্দিষ্ট স্থানে অপারেশনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে এক্স-রে অথবা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে কোনো টিউমার আছে কি-না তা দেখে নিতে হবে। যদিও বেলস্ পালসি রোগ আপনার জীবনের বেল বা ঘণ্টা বাজাবে না, তবে জীবনের গতিপথ কিছুটা হলেও পরিবর্তন করবে। তাই এ ধরনের সমস্যায় কোনো অবহেলা না করে সঠিক এবং যথাযথ চিকিত্সা গ্রহণ করে স্বাভাবিক থাকুন।

উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন

উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন

ইসলাম ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হচ্ছে মিরাছ বা উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন। এই বিধানের গুরুত্ব ও তাত্পর্যের প্রধান দিক হচ্ছে এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেওয়া অকাট্য বিধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ ইনসাফপূর্ণ নীতিমালা, উত্তরাধিকার সম্পদে নারী-পুরুষ প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার লাভের একটি অলঙ্ঘনীয় প্রামাণ্য দলিল। তাই মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ তার জীবিত হকদার ওয়ারিশ বা আত্মীয়দের মাঝে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানমত সুষমরূপে বণ্টন করা ফরজ। যে কোনো ধরনের এই বিধানের সামান্যতম বিরোধিতা বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন সরাসরি কোরআনি বিধানের লঙ্ঘন এবং খোদাদ্রোহিতার শামিল। আল্লাহতায়ালা নারী-পুরুষ উভয়ের স্রষ্টা। উভয়ের জন্য তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ইনসাফকারী, বিচারক এবং সবচেয়ে বেশি মেহেরবান-দয়ালু। সুতরাং উত্তরাধিকার সম্পদে কে কতটুকু হকদার, কে কার চেয়ে অধিকযোগ্য, কে কার চেয়ে অগ্রাধিকার লাভের অধিকারী—এ ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি অবগত। অতীত-ভবিষ্যত্, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। মিরাছের খোদায়ী বিধানেও কম-বেশি হিস্যা নির্ধারণ করার রহস্য ও অন্তর্নিহিত তাত্পর্য একমাত্র আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন। তাই প্রত্যেক নর-নারীর প্রধান কর্তব্য হলো বিনাবাক্যে, বিনয়চিত্তে আল্লাহর বিধানের প্রতি সমর্পিত হওয়া। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারিমে উত্তরাধিকার বিধান নাজিল করার পর আনুগত্যকারী ও অবাধ্যতাকারীদের পরিণাম সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটাই মহা সাফল্য। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। সুরা নিসা, আয়াত : ১৩-১৪
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় বিবেচনায় আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা বা চরম অন্যায়মূলক বিষয় হলো মিরাছ বা উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন না করা। মাশাআল্লাহ কিছু সচেতন দ্বীনদার লোক ছাড়া শিক্ষিত-অশিক্ষিত, দ্বীনদার-বেদ্বীনদার সর্বশ্রেণীর লোকই এই কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত। কেউ তো এই ফরজ কর্তব্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে আবার কেউ জেনে-বুঝে ধন-সম্পদের মোহে মোহগ্রস্ত হয়ে শরিয়তের বিধানরূপে উত্তরাধিকার সম্পদ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করে না। একদিকে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মিরাছ বণ্টন করা হয় না, উত্তরাধিকারীদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করা হয় না। বিশেষত নারী ওয়ারিশদের তাদের প্রাপ্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়। অন্যদিকে সরকার ‘উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকার’ বা ‘সম্পদে নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারী দেয়া’র নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। মিরাছ বণ্টন না করা এবং কোরআনবিরোধী মিরাছি নীতিমালা প্রণয়ন করা উভয়টি কোরআনের বিধান তথা আল্লাহর হুকুমের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। যারা এসব করছে তারা যদি অন্যায় ও গুনাহের কাজ জানা-বুঝার পরও তা করে, তাহলে তারা ফাসেকি ও কবিরা গুনাহে লিপ্ত। তওবা ছাড়া যার ক্ষমা নেই। আর যদি কোরআনি বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা, বেপরোয়া মনোভাব ও অস্বীকারের কারণে হয় তাহলে তো তা সুষ্পষ্ট কুফরি। কারণ কোরআনের উত্তরাধিকার বিধানকে আল্লাহতায়ালা সরাসরি ফরজ কর্তব্য অর্থাত্ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হিস্যা ও অবধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজনের ওপর কোরআন-হাদিসের আলোকে চারটি হক শরিয়তের পক্ষ থেকে আরোপিত হয়। মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিকভাবে এ চারটি হক সম্পৃক্ত হবে এবং ক্রমানুসারে আদায় করা হবে। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে শরিয়তানুযায়ী তার কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে অপব্যয় ও কৃপণতা উভয়টি নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। যদি ঋণ সম্পত্তির সমপরিমাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি হয়, তবে কেউ ওয়ারিশি স্বত্ব পাবে না। তৃতীয়ত, ঋণ পরিশোধের পর এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে অছিয়ত কার্যকর করা হবে। বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করে বলছি। যদি ঋণ পরিশোধের পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে কিংবা ঋণ একেবারেই না থাকে, তখন মৃত ব্যক্তি কোনো অছিয়ত করে থাকলে এবং তা গুনাহের অছিয়ত না হলে, তবে অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ থেকে তা কার্যকর করা হবে। যদি সে তার সব সম্পত্তি অছিয়ত করে যায়, তবুও এক-তৃতীয়াংশের অধিক অছিয়ত কার্যকর হবে না। চতুর্থত, ঋণ পরিশোধের পর অছিয়ত না থাকলে সব সম্পত্তি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। মিরাছি সম্পত্তি যেমন ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করা ফরজ তেমনি তা সহীহ শুদ্ধরূপে শরিয়তসম্মত নিয়মে বণ্টন করা ও বণ্টনের নিয়ম পদ্ধতি জানাও ফরজ। যদি কেউ বণ্টন পদ্ধতি না জানে, তবে ফারায়েজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেম বিশেষত অভিজ্ঞ মুফতিদের মাধ্যমে তা বণ্টন করে নিতে হবে। বর্তমান যুগে কোরআনের এই ফরজ বিধানের প্রতি ঘরে চরম অবহেলা ও উদাসীনতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি যার কব্জায় বা মালিকানায় থাকে, সে এককভাবে সেই সম্পত্তি ভোগ করে, নিজের আয়ত্তে জবরদখল করে রাখে এবং অন্যান্য হকদার ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে রাখে। সে মৃত ব্যক্তির বাবা হোক বা বড় ছেলে বা স্ত্রী কিংবা অন্য কেউ। তারা কেউ একটু ভেবেচিন্তেও দেখে না। সে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন করা ফরজ। ওয়ারিশদের তাদের প্রাপ্য হক না দেয়া বড় জুলুম ও কবিরা গুনাহ। মিরাছের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করার একটি ঘৃণ্য দিক হচ্ছে নারীদের তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। অনেক জায়গায় অনেক ধরনের কু-প্রথা ও নানা অনৈসলামিক অজুহাতে তাদের প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই অপরাধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে মেয়েরা। মৃত ব্যক্তির মেয়ে বা বোনদের মাহরুম করা। অথচ আল্লাহ পাক কোরআনে কারিমে নারীদের মিরাছে তাদের ন্যায্য হিস্যা প্রদান করেছেন। বিশেষত মেয়েদের তাদের অংশ দেয়ার প্রতি এতটুকু গুরুত্ব আরোপ করেছেন, মেয়েদের অংশকে মিরাছের আসল সাব্যস্ত করেছেন। এর অনুপাতে ছেলেদের অংশ নির্ণয় করেছেন। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। এ কথা বলা হয়নি, দুই মেয়ের অংশ এক ছেলের অংশের সমপরিমাণ। এটা কত জঘন্য অপরাধ যে আল্লাহতায়ালা যাদের মিরাছের মৌলিক ভিত্তি বানিয়েছেন, তাদেরই মিরাছ থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমাদের সমাজে অনেকেই বোনদের অংশ দেয় না এবং তারা বোনদের কাছে ক্ষমা চেয়ে মিরাছের হিস্যা মাফ করিয়ে নেয়। আর বোনরাও একথা চিন্তা করে পাওয়া যখন যাবেই না, উপরন্তু ভাইয়েরা অসন্তুষ্ট হবে, তখন চাওয়ার দরকার কি! ফলে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে ক্ষমা করে দেয়। মনে রাখতে হবে, এরূপ ক্ষমা শরিয়তের আইনে ক্ষমাই নয়, বরং এটা জাহেলি কু-প্রথা। এ ক্ষেত্রে বোনদের কর্তব্য হলো—নিজেদের মিরাছি হক দাবি করা। তাদের প্রাপ্য অধিকার চেয়ে নেয়া। তারা কারও অসন্তুষ্টি ও নিন্দার পরোয়া করবে না। নিজেরা সচ্ছল বলে কোরআনি হিস্যা দাবি করা থেকে বিরত থাকবে না। বরং প্রয়োজন না থাকলেও নিজেদের হক আদায় করে নেবে। যাতে সমাজ থেকে এই ইসলামবিরোধী কু-প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের সমাজে নারীদের মিরাছ থেকে বঞ্চিত করার জাহেলি নীতি নানা অজুহাত ও বিভিন্ন উপায়ে প্রয়োগ করা হয়। বিশেষত মেয়ের বিয়েতে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী যৌতুক হিসেবে প্রদানের কারণে কিংবা ভাইয়েরা বোনদের বিভিন্ন উপলক্ষে নানা উপহার সামগ্রী প্রদানের অজুহাতে মেয়েদের মিরাছি সম্পত্তি দেয়া হয় না। এরপর বোনরা মিরাছ দাবি করলে বা মিরাছের হিস্যা নিয়ে গেলে তাদের জন্য বাপের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয়। ভাইবোনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ চরম অন্যায়, অমানবিক ও কঠিন গুনাহের কাজ। মনে রাখতে হবে বিয়েতে বা বিয়ের পরে কন্যাকে যতভাবে যত অঢেল সম্পদই প্রদান করা হোক, তা উপহার বা হাদিয়া রূপে গণ্য। যাকে আত্মীয়তার হক বলা যেতে পারে। মিরাছের হিস্যার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণে কোনো ভাবেই মিরাছের হক থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তাদের মিরাছি হক আদায় না করা পর্যন্ত তাদের অধিকার কখনও শেষ হবে না। যৌতুক বা উপহার প্রদানের অজুহাতে মিরাছ না দেয়া বড় জুলুম এবং সম্পূর্ণ হারাম কাজ।

ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান আরবি শব্দ ও ইসলামী পরিভাষা। যার আরবি প্রতিশব্দ তাসদিক অর্থাত্ অকাট্য সত্যতা স্বীকার করা, দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন, অপরিবর্তনীয় ও শর্তহীন সত্যতার স্বীকৃতি। ইমাম মালিক, আহমেদ শাফেই প্রমুখ (রহ.) অধিকাংশ সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞের মতে, ঈমানের পরিপূর্ণ সংজ্ঞা হলো—আল্লাহ ও রাসুলের আদেশ ও আদর্শকে অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা, কর্মে বাস্তবায়ন করা।
ঈমানের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে প্রিয় নবী বলেন, ‘সেই ব্যক্তি ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ বা তৃপ্তি পেয়েছে যে আল্লাহকে প্রতিপালক, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদকে (সা.) রাসুল রূপে লাভ করে সন্তুষ্ট’ (মুসলিম শরীফ)।
একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমান হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে পুরোপুরি নিজের জীবনে প্রতিফলিত করা। একজন প্রকৃত পরহেজগার ঈমানদার ব্যক্তি হওয়ার সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এক কথায় ইবাদত-বন্দেগি ও নেক আমলের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমান দৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত কোনো সত্ কার্যই ফলপ্রসূ হতে পারে না। কোনো কোনো মুমিন মুসলমানের ঈমান এমন সবল ও দৃঢ় যে, যত বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টই আসুক না কেন তারা কখনোই আল্লাহ তায়ালার ওপর বিশ্বাস হারান না। সব অবস্থাতেই তারা বলেন, আলহামদুল্লািহ।
বস্তুত আত্মার সম্পদ ও অহঙ্কার ঈমান। ঈমান কোনো ঠুনকো বিষয় নয়। এজন্য ঈমানকে বলতে পারি আত্মার জাগ্রত উপস্থিতি, বাস্তব কর্মে পরিপূর্ণ আলোর দিশারী, আর শান্তি ও মুক্তির মাপকাঠি। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ, আত্মনিবেদন, আপস, বিরোধ পরিহার। অর্থাত্ ইসলাম হলো বাহ্যিক কর্ম, কিন্তু ঈমান হলো আন্তরিক বিশ্বাস। ইসলাম হলো ঈমানের বাস্তবসম্মত বা ব্যবহারিক রূপ, অন্যদিকে ঈমান হলো একটি সামষ্টিক ধারণা। সত্ কর্মের আদেশ হলো ইসলাম, আর ঈমান এরই প্রাণশক্তি। ঈমান হলো একটি সৌধের সুদৃঢ় ভিত্তি আর ইসলাম হলো সৌধের সুরম্য সৌন্দর্যমণ্ডিত অবয়ব। বস্তুত ঈমান ও ইসলাম মিলেই মুসলমান।
ঈমান হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেখানে ঈমানের ভিত্তির কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে সব আমল হচ্ছে নিষম্ফল ও অর্থহীন। সুতরাং ঈমান ছাড়া কোনো কাজই সত্ কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে না।
জ্ঞান বা ইলমই হচ্ছে আমলের বুনিয়াদ। নির্ভুল জ্ঞান ছাড়া কোনো আমলই অভ্রান্ত হওয়া সম্ভব নয়। জানার নামই ঈমান নয়। কেননা খোদ ইবলিশ এবং অনেক কাফেরও রাসুলের (সা.) নবুয়তের সত্যতা আন্তরিকভাবে জানত, কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঈমানের পথই সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথ’ (সুরা হুদ ২৪)।
ঈমানদার ব্যক্তিকে মুত্তাকি বলা হয়। মুত্তাকি বা খোদাভীরুদের পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা বাকারার প্রথমেই আল্লাহপাক বলেন, ‘মুত্তাকি ব্যক্তি তারাই যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, আমি তাদের যে রুজি দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ নবী করিম (সা.) ইসলামকে পাঁচটি খুঁটির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঈমান তাঁবুর মধ্যবর্তী খুঁটিস্বরূপ। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত চারকোণার চারটি খুঁটিস্বরূপ। ঈমান না থাকলে কোনো নেক আমলই উপকারে আসবে না। যাদের সহিহ ঈমান আছে কিন্তু আমল ঠিক নেই, তারাও বিভিন্ন পর্যায়ে কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করার পর একদিন বেহেশতে যাবে; কিন্তু যাদের ঈমান ঠিক নেই তারা কোনো দিন বেহেশতে যাবে না যদিও তাদের নেক আমল থাকে। কাজেই আমলের চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা ঈমান ছাড়া হাজারো আমল একেবারেই মূল্যহীন। ঈমান মজবুত রাখার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করা প্রয়োজন। ঈমানের ওপরই আমল গ্রহণযোগ্য হওয়া না হওয়া নির্ভরশীল। যার ঈমান নেই তার কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না। ঈমানের পরিপূর্ণতা অনেকাংশে নির্ভর করে আমলের ওপর। কোরআন মানি, হাদিস মানি না—এমন কথা যারা বলে তাদের ঈমানদার বলা যাবে না। ঈমান ছাড়া ইলম বা বিদ্যা অর্থহীন। শুধু ইলম ঈমান সৃষ্টি করে না। ঈমান শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন নেক আমল। অবশ্যই প্রয়োজনীয় দ্বীনি এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। আল্লাহ ও রাসুলের কথাকে সরল অন্তকরণে বিনা যুক্তিতর্কে মানার নামই ঈমান।
হাদিসে আছে তোমাদের মধ্যে কেউই পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সব মানুষের চেয়ে আমি অধিক প্রিয় না হব (মুসলিম-বুখারি)। হজরত আলী (রা.) বলেন, ঈমান যখন অন্তরে প্রবেশ করে একটি শ্বেতবিন্দুর মতো দেখায়, অতঃপর যতই ঈমানের উন্নতি হয় শ্বেতবিন্দু সম্প্রসারিত হয়ে ওঠে। এমনকি শেষ পর্যন্ত গোটা অন্তরে নূরে ভরপুর হয়ে উঠে যায় (মাযহারি ৪ : ৩২৬ পৃ.)।
সারা জীবনের মধ্যে মানুষ যখনই তওবা করুক বা ঈমান আনুক না কেন, আল্লাহ তা কবুল করবেন। কিন্তু মৃত্যুকালে যখন মানুষের প্রাণ বের হতে থাকে তখন তওবাও কবুল হয় না, ঈমানও কবুল হয় না। হাদিস শরীফে আছে, ঈমানের সত্তর শাখা আছে—তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ অর্থাত্ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা (মিশকাত শরীফ ১-১২)।
আসলে মুখে কালিমা পড়াই যথেষ্ট নয়। বরং সর্বান্তকরণে কালিমার হক আদায় করতে হবে। ঈমান একটি গাছের মূলের মতো। আর এর কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও শিকড় হলো ইসলাম। ঈমান হলো অবিভাজ্য অখণ্ড বিশ্বাস এবং ইসলাম খণ্ড খণ্ড আমলের সমষ্টি।

গরমে দই খেয়ে সুস্থ থাকুন

গরমে দই খেয়ে সুস্থ থাকুন


দই দুধ থেকে তৈরি এই খাদ্যদ্রব্যটা আমাদের শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। অত্যধিক গরমে ঠাণ্ডা দই যেমন তৃষ্ণা মেটায়। এর সঙ্গে গরমের তীব্র দহন থেকে শরীরকে মুক্ত রাখে। শুধু তাই নয়, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতেও সাহায্য করে দই। দই খেলে আর কী সুফল পাওয়া যায় তা জেনে নিই।
— প্রতিদিন দই খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
— দইয়ের সঙ্গে জোয়ান মিশিয়ে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
— তীব্র গরমে দইয়ের ঘোল খেলে শরীরের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। গরমও কম অনুভূত হয়।
— দই হজম ক্ষমতা বাড়ায়।
— দইয়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে। তাই প্রতিদিন দই খেলে পেটের নানা রোগ খুব সহজেই দূর হয়ে যায়।
— প্রতিদিন দই খেলে সর্দি-কাশি কমে। তাছাড়া শ্বাসনালীতে কোনো রকম সংক্রমণ হয় না।
— আলসার কমাতে হলে প্রতিদিন দই খান। এতে বিশেষ ফল পাবেন।
— যদি কখনও মুখের ভেতর ছুলে যায় অর্থাত্ ছালা পড়ে তাহলে পানির মধ্যে দই মিশিয়ে কুলকুচি করুন। এতে খুব তাড়াতাড়ি ছালা কমে যাবে।

সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের প্রেরণা

সন্তান প্রতিপালনে ইসলামের প্রেরণা

ইসলাম যেসব দিক বিবেচনায় নিয়ে মানুষকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করে সন্তান জন্ম দেয়া তার অন্যতম প্রধান কারণ। সন্তানের মাধ্যমে বিবাহিত জীবনের স্বার্থকতা ফুটে ওঠে। বিবাহিত মানুষ মাত্রই সন্তান কামনা করেন। বিশেষত নারীদের দৃষ্টিতে। আপন জন্মের স্বার্থকতাই সন্তান জন্ম দেবার মধ্যে বলে মনে করেন নারীরা। নিঃসন্তান দম্পতিরাই জানেন সন্তান কতটা আরাধ্য। মানুষের স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা তার স্বভাব সম্পর্কে সবচে ভালো জানেন। তাই তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, 

﴿ٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ ﴾  [البقرة:187]

‘অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর।’ {সূরা আল-বাকারা : ১৮৭}

ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, ইকরামা, হাসান বসরী, সাদ্দী ও যাহহাক বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য সন্তান।

আজ পশ্চিমা প্রচারণার যুগে অধিক সন্তান নেয়াকে শুধু নিরুৎসাহিতই করা হচ্ছে না। বেশি সন্তান জন্মদানকারী দম্পতিকে অপরাধীর দৃষ্টিতেও দেখা হচ্ছে কোথাও কোথাও। অথচ মানবতার কল্যাণের বার্তাবাহী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অধিক সন্তান নিতে সুস্পষ্টভাবে অনুপ্রাণিত করছেন।

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُ بِالْبَاءَةِ ، وَيَنْهَى عَنِ التَّبَتُّلِ نَهْيًا شَدِيدًا ، وَيَقُولُ : تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ ، إِنِّي مُكَاثِرٌ الأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ».

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং বৈরাগ্য থেকে তীব্রভাবে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, ‘তোমরা অধিক সন্তানদানকারী স্বামীভক্ত নারীদের বিয়ে করো। কেননা কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের (সংখ্যা) নিয়ে নবীদের সামনে গর্ব করবো।’ [মুসনাদ আহমাদ : ১২৬৩৪।]

মা‘কাল বিন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ إِنِّى أَصَبْتُ امْرَأَةً ذَاتَ حَسَبٍ وَجَمَالٍ وَإِنَّهَا لاَ تَلِدُ أَفَأَتَزَوَّجُهَا قَالَ : لاَ. ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَنَهَاهُ ثُمَّ أَتَاهُ الثَّالِثَةَ فَقَالَ : «تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّى مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ».

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক ব্যক্তি এলো। সে বলল, একজন কুলীনা ও সুন্দরী মহিলা পেয়েছি, তবে সে সন্তান জন্ম দিতে পারে না। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, ‘না’। অতপর তাঁর কাছে দ্বিতীয়বার এসে পরামর্শ চাইলেন। আবার তিনি বারণ করলেন। সে তৃতীয়বার তাঁর কাছে এলে সেবারও তিনি তাকে নিষেধ করলেন। অতপর তিনি বললেন, ‘তোমরা অধিক সন্তানদানকারী স্বামীভক্ত নারীদের বিয়ে করো। কেননা কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের (সংখ্যা) নিয়ে গর্ব করবো।’ [আবূ দাউদ : ২০৫২; নাসায়ী : ৩২২৭]  

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي ، فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي , فَلَيْسَ مِنِّي، وَتَزَوَّجُوا ، فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ ، وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحْ ، وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ ، فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءٌ».

‘বিবাহ আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত মোতাবেক কাজ করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা বিবাহ করো। কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের সামনে গর্ব করব। অতএব যার যোগ্যতা আছে সে যেন বিয়ে করে। আর যার নাই সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা, সাওম একে প্রশমিত করে।’ [ইবন মাজা : ১৮৪৬]  

ইদানীং তথাকথিত অনেক আধুনিক ব্যক্তিকে দেখা যায় বিয়ের প্রতি তারা উন্নাসীক। এমনকি অনেক ধার্মিক ব্যক্তিকেও দেখা যায় বিবাহিত জীবনকে কেবল ‘ঝামেলা’ (?) হিসেবে দেখেন। তাদের বিয়েতে উদ্বুদ্ধ হবার জন্য সন্তান গ্রহণের ফযীলতসম্বলিত হাদীসগুলো হতে পারে দারুণ প্রেরণা। কেননা বিয়ে না করলে এসব ফযীলত তারা কখনো অর্জন করতে পারবেন না। যেমন :

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَيَرْفَعُ الدَّرَجَةَ لِلْعَبْدِ الصَّالِحِ فِي الْجَنَّةِ ، فَيَقُولُ : يَا رَبِّ ، أَنَّى لِي هَذِهِ ؟ فَيَقُولُ : بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ».

‘জান্নাতে নেক ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। সে বলবে, হে রব, কিসের সৌজন্যে আমার এ মর্যাদা? আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ইস্তেগফারের বদৌলতে।’ [ইবন মাজা : ১০৬১৮]

আবূ হাসসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قُلْتُ لِأَبِي هُرَيْرَةَ إِنَّهُ قَدْ مَاتَ لِيَ ابْنَانِ فَمَا أَنْتَ مُحَدِّثِي عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَدِيثٍ تُطَيِّبُ بِهِ أَنْفُسَنَا عَنْ مَوْتَانَا قَالَ قَالَ نَعَمْ «صِغَارُهُمْ دَعَامِيصُ الْجَنَّةِ يَتَلَقَّى أَحَدُهُمْ أَبَاهُ أَوْ قَالَ أَبَوَيْهِ فَيَأْخُذُ بِثَوْبِهِ أَوْ قَالَ بِيَدِهِ كَمَا آخُذُ أَنَا بِصَنِفَةِ ثَوْبِكَ هَذَا فَلَا يَتَنَاهَى أَوْ قَالَ فَلَا يَنْتَهِي حَتَّى يُدْخِلَهُ اللَّهُ وَأَبَاهُ الْجَنَّةَ».

‘আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু -এর উদ্দেশে আমি বললাম আমার দু’টি সন্তান মারা গেছে। আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমাদের কোনো হাদীস শোনাতে পারেন যা মৃতদের ব্যাপারে আমাদের মনটাকে খুশি করে দেবে? হাসসান বলেন, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হ্যা। ‘তাদের ছোটরা জান্নাতে মুক্তবিচরণশীল। এদের কেউ তার পিতা অথবা (তিনি বলেছেন) পিতামাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। অতপর তার কাপড় অথবা (বলেছেন) হাত ধরবে যেমন আমি তোমার এ কাপড়ের প্রান্ত ধরেছি। অতপর সে ছাড়বে না অথবা ক্ষান্ত হবে না যাবৎ না আল্লাহ তার বাবাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।’ [মুসলিম : ৪৭৬৯; মুসনাদ আহমদ : ১০৩৩১]  

মুয়াবিয়া বিন কুররা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন,

أَنَّ رَجُلاً كَانَ يَأْتِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ ابْنٌ لَهُ ، فَقَالَ لَهُ النَّبِيّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : «أَتُحِبُّهُ ؟» فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، أَحَبَّكَ اللَّهُ كَمَا أُحِبُّهُ ، فَفَقَدَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ «مَا فَعَلَ ابْنُ فُلاَنٍ ؟» قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ ، مَاتَ ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لأَبِيهِ : «أَمَا تُحِبُّ أَنْ لاَ تَأْتِيَ بَابًا مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ ، إِلاَّ وَجَدْتَهُ يَنْتَظِرُكَ ؟ فَقَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ ، أَلَهُ خَاصَّةً أَمْ لِكُلِّنَا ؟ قَالَ : بَلْ لِكُلِّكُمْ».

‘এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসতো। তার সঙ্গে থাকতো তার একটি ছেলে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘তুমি কি তাকে ভালোবাসো?’ সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনাকেও তেমন ভালোবাসুন যেমন আমি তাকে ভালোবাসি। পরবর্তীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (কয়েকদিন) দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, অমুকের সন্তানের খবর কী? সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, সে মারা গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তার পিতার উদ্দেশে বললেন, তুমি কি এমনটি পছন্দ করো না যে জান্নাতের যে দরজাতেই তুমি যাবে সেখানে তাকে তোমার জন্য অপেক্ষমান পাবে?’ এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল, এটা কি শুধু ওই ব্যক্তির জন্য নাকি আমাদের সবার জন্য? তিনি বললেন, ‘বরং তোমাদের সবার জন্য’।’ [মুসনাদ আহমদ : ১৫৫৯৫]

سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَقُولُ : «مَنْ كَانَ لَهُ فَرَطَانِ مِنْ أُمَّتِي ، دَخَلَ الْجَنَّةَ فَقَالَتْ عَائِشَةُ : بِأَبِي ، فَمَنْ كَانَ لَهُ فَرَطٌ ؟ فَقَالَ : وَمَنْ كَانَ لَهُ فَرَطٌ يَا مُوَفَّقَةُ قَالَتْ : فَمَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ فَرَطٌ مِنْ أُمَّتِكَ ؟ قَالَ : فَأَنَا فَرَطُ أُمَّتِي ، لَمْ يُصَابُوا بِمِثْلِي».

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যার দু’দুটি সন্তান বিয়োগ ঘটবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন, যার একটি সন্তান বিয়োগ ঘটবে (সেও কি এমন বিনিময় পাবে)? তিনি বললেন, ‘হে সুন্দরপ্রশ্নের তাওফীক প্রাপ্তা, যার একটি সন্তান বিয়োগ ঘটবে তার জন্যও একই (বিনিময়) রয়েছে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনার উম্মতের মধ্যে যার কোনো সন্তানই বিয়োগ ঘটবে না? তিনি বললেন, আমিই আমার উম্মতের মৃত সন্তান, তারা আমার মতো আর কাউকে পাবে না।’ [মুসনাদ আহমদ : ৩০৯৮; শুয়াবুল ঈমান : ৯২৯৫]

আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

جَاءَتْ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ ذَهَبَ الرِّجَالُ بِحَدِيثِكَ فَاجْعَلْ لَنَا مِنْ نَفْسِكَ يَوْمًا نَأْتِيكَ فِيهِ تُعَلِّمُنَا مِمَّا عَلَّمَكَ اللَّهُ قَالَ «اجْتَمِعْنَ يَوْمَ كَذَا وَكَذَا» فَاجْتَمَعْنَ فَأَتَاهُنَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَّمَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَهُ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ «مَا مِنْكُنَّ مِنْ امْرَأَةٍ تُقَدِّمُ بَيْنَ يَدَيْهَا مِنْ وَلَدِهَا ثَلَاثَةً إِلَّا كَانُوا لَهَا حِجَابًا مِنْ النَّارِ فَقَالَتْ امْرَأَةٌ وَاثْنَيْنِ وَاثْنَيْنِ وَاثْنَيْنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَاثْنَيْنِ وَاثْنَيْنِ وَاثْنَيْنِ»

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের উদ্দেশে বলেন, একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, পুরুষরা তো আপনার হাদীস শুনে যায়। অতএব আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্যও একটি দিন নির্ধারণ করুন। আমরা সেদিন আপনার কাছে আসবো, যাতে আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন আমাদেরকেও তার কিছু শিখিয়ে দেন। তিনি বললেন, ‘তোমরা অমুক অমুক দিনে সমবেত হবে। অতপর তারা জমায়েত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে তাশরীফ রাখলেন। আল্লাহ তাঁকে যা শিখিয়েছেন তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাদের বললেন, ‘তোমাদের যে কারও তিনটি সন্তান মারা গিয়ে থাকে তার জীবদ্দশায়, তবে তারা তার জন্য (জান্নামের) আগুন আড়ালকারী হবে। এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, যদি দু’টি দু’টি দু’টি করে সন্তান মরে গিয়ে থাকে তবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, দু’টি সন্তানও (অগ্নি থেকে আড়ালকারী হবে।) [মুসলিম : ৪৭৬৮; বুখারী : ১১৯২]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ لَهُ ثَلاَثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ ، فَتَمَسُّهُ النَّارُ ، إِلاَّ تَحِلَّةَ الْقَسَمِ».

‘এমন কোনো মুসলিম নেই তিনটি সন্তান মারা যাবে অপ্রাপ্ত বয়সে আর তাকে আগুন স্পর্শ করবে। হ্যা, সামান্য পরিমাণ হতে পারে[1]।’ [মুসনাদ আহমদ : ১০১২০]

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنَ النَّاسِ مُسْلِمٌ يَمُوتُ لَهُ ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِ رَحْمَتِهِ إِيَّاهُمْ»

‘মুসলিমদের মধ্যে যে কোনো ব্যক্তির যদি তিনটি সন্তান মারা যায় নাবালক অবস্থায়, আল্লাহ অবশ্যই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এটি করবেন তিনি তাদের প্রতি ওই ব্যক্তির মমতার কারণে।’ [বুখারী : ১৩৮১]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَتَتِ امْرَأَةٌ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- بِصَبِىٍّ لَهَا فَقَالَتْ يَا نَبِىَّ اللَّهِ ادْعُ اللَّهَ لَهُ فَلَقَدْ دَفَنْتُ ثَلاَثَةً قَالَ «دَفَنْتِ ثَلاَثَةً» قَالَتْ نَعَمْ. قَالَ « لَقَدِ احْتَظَرْتِ بِحِظَارٍ شَدِيدٍ مِنَ النَّارِ»

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একজন মহিলা তার বাচ্চাকে নিয়ে এসে বলল, হে আল্লাহর নবী, আপনি এর জন্য দু‘আ করুন (যাতে এ জীবিত থাকে)। কেননা, আমি (এর আগে) তিনজনকে দাফন করেছি। তিনি বললেন, তুমি কি তিনজনকে দাফন করেছ? মহিলা বলল, জী। তিনি বললেন, তুমি তো কঠিন বন্ধনী দিয়ে নিজেকে আগুন থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছো।’ [মুসলিম : ৬৮৭১; নাসায়ী : ৮৮৭৭; মুসনাদ আহমদ : ৯৪২৭]

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

«إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثٍ : صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ ، وَعِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ ، وَوَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ.»

‘মানুষ যখন মরে যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায় তবে সে তিনটি (উৎস থেকে নেকী প্রাপ্তি বন্ধ হয় না) : সাদাকায়ে জারিয়া, এমন কোনো ইলম যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং সুসন্তান যে তার জন্য দু‘আ করে।’ [তিরমিযী : ১৩৭৬; মুসলিম : ১৬৩১; ইবন খুযাইমা : ২৪৯৪]

কন্যা জন্মে নাখোশ হওয়ার নিন্দা

অনেক ভাইকে দেখা যায়, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তারা বেজায় নাখোশ হন। তারা কি ভেবে দেখেছেন তাদের এ মনোভাব কাদের সঙ্গে মিলে যায়? কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাতে রুষ্ট হওয়া মূলত জাহেলী চরিত্রের প্রকাশ, আল্লাহ তা‘আলা যার সমালোচনা করেছেন পবিত্র কুরআনে। ইরশাদ হয়েছে :

﴿وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلۡأُنثَىٰ ظَلَّ وَجۡهُهُۥ مُسۡوَدّٗا وَهُوَ كَظِيمٞ ٥٨ يَتَوَٰرَىٰ مِنَ ٱلۡقَوۡمِ مِن سُوٓءِ مَا بُشِّرَ بِهِۦٓۚ أَيُمۡسِكُهُۥ عَلَىٰ هُونٍ أَمۡ يَدُسُّهُۥ فِي ٱلتُّرَابِۗ أَلَا سَآءَ مَا يَحۡكُمُونَ ٥٩﴾ [النحل:58-59]

‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। আপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!’ {সূরা আন-নাহল : ৫৮-৫৯}

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যাদের বড় ভালোবাসতেন। মেয়েরা ছিল তাঁর আদরের দুলালী। আজীবন তিনি কন্যাদের ভালো বেসেছেন এবং কন্যা সন্তান প্রতিপালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ . وَضَمَّ أَصَابِعَهُ».

‘যে ব্যক্তি সাবালক হওয়া পর্যন্ত দু’টি কন্যার ভার বহন করবে কিয়ামতের দিন আমি আর সে আবির্ভূত হব। একথা বলে তিনি তার হাতের দুই আঙ্গুল একসঙ্গে করে দেখান।’ [মুসলিম : ৬৪৬৮; তিরমিযী : ১৯১৪; ইবন আবী শাইবা : ২৫৯৪৮]

আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

جَاءَتْنِى امْرَأَةٌ وَمَعَهَا ابْنَتَانِ لَهَا فَسَأَلَتْنِى فَلَمْ تَجِدْ عِنْدِى شَيْئًا غَيْرَ تَمْرَةٍ وَاحِدَةٍ فَأَعْطَيْتُهَا إِيَّاهَا فَأَخَذَتْهَا فَقَسَمَتْهَا بَيْنَ ابْنَتَيْهَا وَلَمْ تَأْكُلْ مِنْهَا شَيْئًا ثُمَّ قَامَتْ فَخَرَجَتْ وَابْنَتَاهَا فَدَخَلَ عَلَىَّ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَحَدَّثْتُهُ حَدِيثَهَا فَقَالَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم: «مَنِ ابْتُلِىَ مِنَ الْبَنَاتِ بِشَىْءٍ فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ سِتْرًا مِنَ النَّارِ»

‘আমার কাছে এক মহিলা এলো। তার সঙ্গে তার দুই মেয়ে। আমার কাছে সে কিছু প্রার্থনা করল। সে আমার কাছে একটি খেজুর ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করল এবং তা দুই টুকরো করে তার দুই মেয়ের মাঝে বণ্টন করে দিল। তা থেকে সে কিছুই খেল না। তারপর সে ও তার মেয়ে দু’টি উঠে পড়ল এবং চলে গেল। ইত্যবসরে আমার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন। আমি তাঁর কাছে ওই মহিলার কথা বললাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যাকে কন্যা দিয়ে কোনো কিছুর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় আর সে তাদের প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তবে তা তার জন্য আগুন থেকে রক্ষাকারী হবে।’ [মুসলিম : ৬৮৬২; মুসনাদ আহমদ : ২৪৬১৬]

কন্যা সন্তান প্রতিপালনে শুধু পিতাকেই নয়; ভাইকেও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বোনের কথাও বলা হয়েছে হাদীসে। যেসব ভাই মনে করেন মেয়ে বা বোনের পেছনে টাকা খরচ করলে ভবিষ্যতের তার কোনো প্রাপ্তি নেই তারা আসলে ভুলের মধ্যে আছেন। আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«لَا يَكُونُ لِأَحَدٍ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، أَوْ ثَلَاثُ أَخَوَاتٍ، أَوْ ابْنَتَانِ، أَوْ أُخْتَانِ، فَيَتَّقِي اللهَ فِيهِنَّ وَيُحْسِنُ إِلَيْهِنَّ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ»

‘কারও যদি তিনটি মেয়ে কিংবা বোন থাকে অথবা দুটি মেয়ে বা বোন থাকে আর সে তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের সঙ্গে সদাচার করে, তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ [মুসনাদ আহমদ : ১১৪০৪; বুখারী, আদাবুল মুফরাদ : ৭৯]  

আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ أَوِ ابْنَتَانِ أَوْ أُخْتَانِ فَأَحْسَنَ صُحْبَتَهُمْ ، وَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ وَاتَّقَى اللَّهَ فِيهِنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ.»

‘যার তিন মেয়ে অথবা তিনটি বোন কিংবা দুটি মেয়ে বা দুটি বোন রয়েছে, সে তাদের সঙ্গে সদাচার করে এবং তাদের (বিবিধ সমস্যায়) ধৈর্য ধারণ করে আর তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সে জান্নাতে যাবে।’ [মুসনাদ হুমাইদী : ৭৭২]

কন্যা সন্তান প্রতিপালনে যাতে বৈষম্য না করা হয়, বস্তুবাদী ব্যক্তিরা যাতে হীনমন্যতায় না ভোগেন, তাই তাদের কন্যা প্রতিপালনে ধৈর্য ধরার উপদেশ দেয়া হয়েছে। শোনানো হয়েছে পরকালে বিশাল প্রাপ্তির সংবাদ। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

«مَنْ كَانَتْ لَهُ ثَلاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَى لأْوَائِهِنَّ، وَعَلَى ضَرَّائِهِنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ، زَادَ فِي رِوَايَةِ مُحَمَّدِ بْنِ يُونُسَ: فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَاثْنَتَيْنِ ؟ قَالَ: وَاثْنَتَيْنِ، قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَوَاحِدَةً؟ قَالَ: وَوَاحِدَةً»

‘যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের কষ্ট-যাতনায় ধৈর্য ধরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুহাম্মদ ইবন ইউনূসের বর্ণনায় এ হাদীসে অতিরিক্ত অংশ হিসেবে এসেছে) একব্যক্তি প্রশ্ন করলো, হে আল্লাহর রাসূল, যদি দু’জন হয়? উত্তরে তিনি বললেন, দু’জন হলেও। লোকটি আবার প্রশ্ন করলো, যদি একজন হয় হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, একজন হলেও।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১১]

আউফ বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ يُنْفِقُ عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَبِنَّ أَوْ يَمُتْنَ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ»

‘যার তিনটি মেয়ে রয়েছে, যাদের ওপর সে অর্থ খরচ করে বিয়ে দেয়া বা মৃত্যু পর্যন্ত, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১২]

আউফ বিন মালেক আশজায়ী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَا مِنْ عَبْدٍ يَكُونُ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَيُنْفِقُ عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَبِنَّ أَوْ يَمُتْنَ إِلَّا كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ» فَقَالَتِ امْرَأَةٌ: يَا رَسُولَ اللهِ، وَاثْنَتَانِ ؟ قَالَ: «وَاثْنَتَانِ»

‘যে বান্দার তিনটি মেয়ে রয়েছে, যাদের ওপর সে অর্থ খরচ করে বিয়ে দেওয়া অথবা মৃত্যু পর্যন্ত, তবে তারা তার জন্য আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে। তখন এক মহিলা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আর দুই মেয়ে? তিনি বললেন, ‘দুই মেয়েও’।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১৩]

আবূ আম্মার আউফ বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«أَنَا وَامْرَأَةٌ سَفْعَاءُ الْخَدَّيْنِ كَهَاتَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” وَجَمَعَ بَيْنَ أُصْبُعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى ” امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ آمَتْ مِنْ زَوْجِهَا، حَبَسَتْ نَفْسَهَا عَلَى أَيْتَامِهَا حَتَّى بَانُوا أَوْ مَاتُوا »

‘আমি এবং গাল মলিনকারী[2]  মহিলা কিয়ামতের দিন এভাবে উঠব।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্রিত করে দেখান। (আর গাল মলিনকারী হলেন) ‘ওই মহিলা যিনি সুন্দরী ও সুবংশীয়া। তার স্বামী মারা গিয়েছেন। তথাপি তিনি তার এতিম সন্তানদের জন্য তাদের বিয়ে বা মরণ পর্যন্ত নিজেকে (কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে) বিরত রেখেছেন’। [মুসনাদ আহমদ : ২৪০৫২; আবূ দাউদ : ৫১৫১; বুখারী, আদাবুল মুফরাদ : ৫১৪৯]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَكُونُ لَهُ ابْنَتَانِ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِمَا مَا صَحِبَهُمَا وَصَحِبَتَاهُ إِلَّا أَدْخَلَتَاهُ الْجَنَّةَ»

‘যে কোনো মুসলিমের দুটি মেয়ে থাকবে আর সে তাদের সঙ্গে সদাচার করতে যতদিন সে তাদের সঙ্গে থাকবে এবং তারা যতদিন তার সঙ্গে থাকবে, তবে তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১৪; আবী ইয়া‘লা, মুসনাদ : ২৫৭১]

মুহাম্মদ ইবন মুনকাদির থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“«مَنْ كَانَتْ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ أَوْ أَخَوَاتٍ فَكَفَّهُنَّ وَأَوَاهُنَّ وَرَحِمَهُنَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ “، قَالُوا: أَوِ اثْنَتَانِ ؟ قَالَ: ” أَوِ اثْنَتَانِ “، قَالَ: حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُمْ لَوْ قَالُوا: أَوْ وَاحِدَةً قَالَ: أَوْ وَاحِدَةً »

‘যার তিন তিনটি কন্যা অথবা বোন আছে আর সে তাদের থেকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে, তাদের আশ্রয় দেয় এবং তাদের ওপর দয়া করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’। সাহাবীরা বললেন, আর দু’জন? তিনি বললেন, দু’জনও। বর্ণনাকারী বলেন, এমনকি আমরা মনে করলাম যদি তারা বলতেন, আর একজন? তবে তিনি বলতেন, আর একজনও। [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১৫]

উকবা বিন আমর জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

“«مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، فَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّار»

‘যার তিনটি কন্যা সন্তান থাকে আর সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরে, তাদেরকে খাওয়ায়, পান করায় এবং তাদের পোশাকের ব্যবস্থা করে, তবে সে কন্যারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে।’ [বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১৭; মুসনাদ আহমদ : ১৭৪০৩; আবী ইয়া‘লা, মুসনাদ : ১৭৬৪]

মনে রাখতে হবে, আজ যে অবিবেচক পিতা কন্যা সন্তান দেখে রাগান্বিত হচ্ছেন, কন্যার মাকে যাচ্ছে তাই গালমন্দ করছেন, কাল তিনি এর জন্য আফসোস করতে পারেন। ছেলেদের অবাধ্যতায় অতিষ্ঠ এ পিতাকে এ মেয়েই একদিন আমোদিত ও স্বার্থক পিতা বানাতে পারে। আমরা ভুলে যাই স্থুল দৃষ্টিতে অনেক কিছু মন্দ মনে হলেও অনেক সময় তা মঙ্গল বয়ে আনে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَإِن كَرِهۡتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡ‍ٔٗا وَيَجۡعَلَ ٱللَّهُ فِيهِ خَيۡرٗا كَثِيرٗا ١٩ ﴾ [النساء:19]

‘আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১৯}

উল্লেখিত হাদীসগুলোর আলোকে আমরা জানলাম যে, কন্যাসন্তানও অনেক সময় দুনিয়া ও আখিরাতে বরকতের বার্তাবাহী হয়। অতএব মেয়ে হলে তাকে অশুভ মনে করা, কন্যা সন্তান দেখে অসন্তুষ্ট হওয়া কেবল মূর্খতা ও মূঢ়তার পরিচায়ক। প্রসঙ্গত ইসলাম শুধু সন্তান জন্ম দেয়ার কথাই বলেনি, সাথে সাথে সন্তানের প্রতি কর্তব্যের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দ্ব্যর্থহীনভাবে। একটি সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর পিতা ও তার পরিবার-প্রতিবেশেরও কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন :

নব জাতকের পিতাকে সুসংবাদ দেয়া বা অভিবাদন জানানো

মানুষকে সন্তান প্রতিপালনে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে ইসলাম নানাবিধ তাৎপর্যপূর্ণ বিধান প্রবর্তন করেছে। সন্তান জন্মকে ইসলাম আনন্দের উপলক্ষ্য আখ্যা দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَقَدۡ جَآءَتۡ رُسُلُنَآ إِبۡرَٰهِيمَ بِٱلۡبُشۡرَىٰ قَالُواْ سَلَٰمٗاۖ قَالَ سَلَٰمٞۖ فَمَا لَبِثَ أَن جَآءَ بِعِجۡلٍ حَنِيذٖ ٦٩ فَلَمَّا رَءَآ أَيۡدِيَهُمۡ لَا تَصِلُ إِلَيۡهِ نَكِرَهُمۡ وَأَوۡجَسَ مِنۡهُمۡ خِيفَةٗۚ قَالُواْ لَا تَخَفۡ إِنَّآ أُرۡسِلۡنَآ إِلَىٰ قَوۡمِ لُوطٖ ٧٠ وَٱمۡرَأَتُهُۥ قَآئِمَةٞ فَضَحِكَتۡ فَبَشَّرۡنَٰهَا بِإِسۡحَٰقَ وَمِن وَرَآءِ إِسۡحَٰقَ يَعۡقُوبَ ٧١ قَالَتۡ يَٰوَيۡلَتَىٰٓ ءَأَلِدُ وَأَنَا۠ عَجُوزٞ وَهَٰذَا بَعۡلِي شَيۡخًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عَجِيبٞ ٧٢ قَالُوٓاْ أَتَعۡجَبِينَ مِنۡ أَمۡرِ ٱللَّهِۖ رَحۡمَتُ ٱللَّهِ وَبَرَكَٰتُهُۥ عَلَيۡكُمۡ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِۚ إِنَّهُۥ حَمِيدٞ مَّجِيدٞ ٧٣ فَلَمَّا ذَهَبَ عَنۡ إِبۡرَٰهِيمَ ٱلرَّوۡعُ وَجَآءَتۡهُ ٱلۡبُشۡرَىٰ يُجَٰدِلُنَا فِي قَوۡمِ لُوطٍ ٧٤ ﴾ [هود: 69-74]

‘আর অবশ্যই আমার ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে ইবরাহীমের কাছে আসল, তারা বলল, ‘সালাম’। সেও বলল, ‘সালাম’। বিলম্ব না করে সে একটি ভুনা গো বাছুর নিয়ে আসল। অতঃপর যখন সে দেখতে পেল, তাদের হাত এর প্রতি পৌঁছছে না, তখন তাদেরকে অস্বাভাবিক মনে করল এবং সে তাদের থেকে ভীতি অনুভব করল। তারা বলল, ‘ভয় করো না, নিশ্চয় আমরা লূতের কওমের কাছে প্রেরিত হয়েছি’। আর তার স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়া‘কূবের। সে বলল, ‘হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামী, বৃদ্ধ? এটা তো অবশ্যই এক আশ্চর্যজনক ব্যাপার’! তারা বলল, ‘আল্লাহর সিদ্ধান্তে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? হে নবী পরিবার, তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত’। অতঃপর যখন ইবরাহীম থেকে ভয় দূর হল এবং তার কাছে সুসংবাদ এল, তখন সে লূতের কওম সম্পর্কে আমার সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল।’ {সূরা হুদ : ৬৯-৭৪}

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

﴿فَبَشَّرۡنَٰهُ بِغُلَٰمٍ حَلِيمٖ ١٠١﴾ [الصافات: 101]

‘অতঃপর তাকে আমি পরম ধৈর্যশীল একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম।’ {সূরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০১}

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

﴿وَبَشَّرُوهُ بِغُلَٰمٍ عَلِيمٖ ٢٨﴾ [الذاريات: 28]

‘তারা তাকে এক বিদ্বান পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।’ {সূরা যারিয়াত, আয়াত : ২৮}

﴿وَنَبِّئۡهُمۡ عَن ضَيۡفِ إِبۡرَٰهِيمَ ٥١ إِذۡ دَخَلُواْ عَلَيۡهِ فَقَالُواْ سَلَٰمٗا قَالَ إِنَّا مِنكُمۡ وَجِلُونَ ٥٢ قَالُواْ لَا تَوۡجَلۡ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَٰمٍ عَلِيمٖ ٥٣ قَالَ أَبَشَّرۡتُمُونِي عَلَىٰٓ أَن مَّسَّنِيَ ٱلۡكِبَرُ فَبِمَ تُبَشِّرُونَ ٥٤ قَالُواْ بَشَّرۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ فَلَا تَكُن مِّنَ ٱلۡقَٰنِطِينَ ٥٥ قَالَ وَمَن يَقۡنَطُ مِن رَّحۡمَةِ رَبِّهِۦٓ إِلَّا ٱلضَّآلُّونَ ٥٦﴾ [الحجر: 51-56]

‘আর তুমি তাদেরকে ইবরাহীমের মেহমানদের সংবাদ দাও। যখন তারা তার নিকট প্রবেশ করল, অতঃপর বলল, ‘সালাম’। সে বলল, ‘আমরা নিশ্চয় তোমাদের ব্যাপারে শঙ্কিত’। তারা বলল, ‘তুমি ভীত হয়ো না, নিশ্চয় আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী শিশুর সুসংবাদ দিচ্ছি’। সে বলল, ‘তোমরা কি আমাকে সুসংবাদ দিচ্ছ, যখন বার্ধক্য আমাকে স্পর্শ করেছে ? সুতরাং তোমরা কিসের সুসংবাদ দিচ্ছ’ ? তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে যথার্থ সুসংবাদ দিচ্ছি। সুতরাং তুমি নিরাশদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’। সে বলল, ‘পথভ্রষ্টরা ছাড়া, কে তার রবের রহমত থেকে নিরাশ হয়’ ? {সূরা আল-হিজর, আয়াত : ৫১-৫৬}

﴿يَٰزَكَرِيَّآ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَٰمٍ ٱسۡمُهُۥ يَحۡيَىٰ لَمۡ نَجۡعَل لَّهُۥ مِن قَبۡلُ سَمِيّٗا ٧ ﴾ [مريم:7]

‘(আল্লাহ বললেন) ‘হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম  দেইনি।’ {সূরা মারইয়াম, আয়াত : ০৭}

﴿فَنَادَتۡهُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَهُوَ قَآئِمٞ يُصَلِّي فِي ٱلۡمِحۡرَابِ أَنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحۡيَىٰ مُصَدِّقَۢا بِكَلِمَةٖ مِّنَ ٱللَّهِ وَسَيِّدٗا وَحَصُورٗا وَنَبِيّٗا مِّنَ ٱلصَّٰلِحِينَ ٣٩﴾ [آل عمران: 39]

‘অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বলল, সে যখন কক্ষে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা ও নারী সম্ভোগমুক্ত এবং নেককারদের মধ্য থেকে একজন নবী।’ {সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩৯}  

আর সুসংবাদ যেহেতু মানুষকে আনন্দিত করে, তার ভেতরে পুলক সঞ্চার করে তাই মুসলিমের উচিত তার ভাইকে আনন্দে আহ্লাদিত হবার মতো সংবাদ আগেভাগে পৌঁছে দেয়া। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন, আবূ লাহাবকে তার দাসী সুয়াইবা এ খুশির সংবাদ দেন। আবূ লাহাবের কাছে গিয়ে সুয়াইবা বলেন, রাতে আব্দুল্লাহর একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছে। এ সংবাদে খুশি সে সুয়াইবাকে আজাদ করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা তার এ ভালো কাজকে বৃথা বানাননি। মৃত্যুর সময় তার কণিষ্ঠা আঙ্গুলের গর্ত থেকে তাকে পানি পান করান। অতএব সন্তানের সুসংবাদ দেয়া মুস্তাহাব। যদি তা না পারা যায় তবে তাকে অন্তত শুভেচ্ছা জানানো মুস্তাহাব। সুসংবাদ ও শুভেচ্ছার মধ্যে পার্থক্য হলো, সুসংবাদ বলে এমন কিছু জানানো যা তাকে খুশি করবে আর খুশির খবর পাওয়ার পর তাতে বরকত বৃদ্ধির দু’‌আ করাকে বলা হয় শুভেচ্ছা জ্ঞাপন।   

নবজাতকের কানে আযান দেয়া

সন্তান জন্ম নেয়ার খুশিকে সার্বজনীতা দিতে আরেকটি বিধান দেয়া হয়েছে। আর তা হলো, নবজাতকের কানে আযান দেয়া। এর মধ্যে যেমন পারলৌকিক কল্যাণ নিহিত, তেমনি এতে আছে সামাজিক কিছু ইতিবাচক দিক। আবূ রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«أَذَّنَ فِى أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِىٍّ – حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ – بِالصَّلاَةِ».

‘ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহু হাসান বিন আলীকে প্রসব করার পর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি দেখেছি তার কানে আযান দিলেন।’ [তিরমিযী : ১৫১৪; আবূ দাউদ : ৫১০৭। {ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ ও শায়খ আলবানী এটিকে হাসান বলেছেন}]   

আর সদ্যভূমিষ্ট শিশুর কানে আযান দিতে বলা হয়েছে যাতে পৃথিবীতে আগমনের পর মানুষের কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর বড়ত্ব-মাহাত্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং যে শাহাদাতের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করে সে বক্তব্য সম্বলিত বাক্যই প্রবেশ করে। এতে করে ধরাধামে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার ইসলামের নিদর্শন শেখার সুযোগ তৈরি হয়, যেমন তাকে দুনিয়া ত্যাগের প্রাক্কালে তাওহীদের বাক্য শিখিয়ে দেয়া হয়। শিশুটি অস্বীকার করা যাবে না যে, এ বাক্য অনুধাবন করতে যদিও শিশু সক্ষম নয়, তথাপি তার অন্তরে এ আজানের কিছুটা প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। এ ছাড়া আরও উপকার রয়েছে। যেমন, আজানের বাক্যগুলো শুনে শয়তানের পলায়ন করে। একটি শিশু ভূমিষ্ট হবার পূর্ব মুহূর্তে শয়তান অপেক্ষায় থাকে, দুনিয়াতে আসামাত্রই সে চায় বাচ্চাটির ওপর তার অশুভ প্রভাব বিস্তার করতে। কিন্তু আযান দেয়া মাত্র সে সেখান থেকে পলায়ন করে।

এ আজানের আরেকটি তাৎপর্য এই যে, এর মাধ্যমে শিশুটিকে শয়তানের মন্দ আহ্বানের আগেই আল্লাহ ও দীনে ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো সম্পন্ন করা হয়। যেমন, মানব প্রকৃতি হলো, সে যাবতীয় শুভ ও শুভ্রতা নিয়ে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান নিয়েই পৃথিবীতে আসে। অতপর শয়তান তাকে এ সুপথ থেকে বিচ্যুত করে এবং দীনে ইসলাম থেকে দূরে নিয়ে যায়।

সন্তানকে তাহনীক করানো

নব জাতকের কানে আযান দেবার পর এবার দায়িত্ব তাকে তাহনীক করানো। অর্থাৎ সামান্য খেজুর চিবিয়ে নব জাতকের মুখে খানিকটা ঘষে দেয়া। আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«وُلِدَ لِي غُلاَمٌ فَأَتَيْتُ بِهِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَسَمَّاهُ إِبْرَاهِيمَ فَحَنَّكَهُ بِتَمْرَةٍ وَدَعَا لَهُ بِالْبَرَكَةِ وَدَفَعَهُ إِلَيَّ ، وَكَانَ أَكْبَرَ وَلَدِ أَبِي مُوسَى».

‘আমার একটি সন্তান জন্ম নিল। তাকে নিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন মূসা। তারপর খেজুর দিয়ে তাকে তাহনীক করেন। তিনি তার জন্য বরকতের দু‘আ করেন এবং আমার কাছে তাকে ফিরিয়ে দেন। এটি ছিল আবূ মূসার বড় সন্তানের ঘটনা।’ [বুখারী : ৫৪৬৭; মুসলিম : ৫৭৩৯]

আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ ابْنٌ لأَبِى طَلْحَةَ يَشْتَكِى فَخَرَجَ أَبُو طَلْحَةَ فَقُبِضَ الصَّبِىُّ فَلَمَّا رَجَعَ أَبُو طَلْحَةَ قَالَ مَا فَعَلَ ابْنِى قَالَتْ أُمُّ سُلَيْمٍ هُوَ أَسْكَنُ مِمَّا كَانَ. فَقَرَّبَتْ إِلَيْهِ الْعَشَاءَ فَتَعَشَّى ثُمَّ أَصَابَ مِنْهَا فَلَمَّا فَرَغَ قَالَتْ وَارُوا الصَّبِىَّ. فَلَمَّا أَصْبَحَ أَبُو طَلْحَةَ أَتَى رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَأَخْبَرَهُ فَقَالَ : أَعْرَسْتُمُ اللَّيْلَةَ. قَالَ نَعَمْ قَالَ : اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمَا. فَوَلَدَتْ غُلاَمًا فَقَالَ لِى أَبُو طَلْحَةَ احْمِلْهُ حَتَّى تَأْتِىَ بِهِ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم-. فَأَتَى بِهِ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- وَبَعَثَتْ مَعَهُ بِتَمَرَاتٍ فَأَخَذَهُ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ : أَمَعَهُ شَىْءٌ. قَالُوا نَعَمْ تَمَرَاتٌ. فَأَخَذَهَا النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَمَضَغَهَا ثُمَّ أَخَذَهَا مِنْ فِيهِ فَجَعَلَهَا فِى فِى الصَّبِىِّ ثُمَّ حَنَّكَهُ وَسَمَّاهُ عَبْدَ اللَّهِ».

‘আবূ তালহার একটি ছেলে ছিল অসুস্থ। এমতাবস্থায় আবূ তালহা সফরে গেলেন। সফর থেকে যখন ফিরলেন, জিজ্ঞেস করলেন আমার ছেলের কী অবস্থা? উম্মু সুলাইম বললেন, সে আগের চেয়ে বেশি প্রশান্তিতে আছে। উম্মু সুলাইম তারপর তার সামনে রাতের খাবার পরিবেশন করলেন। আবূ তালহা রাতের খাবার গ্রহণ করলেন। অতপর তার সঙ্গে সহবাস করলেন। এ কাজ সমাপ্ত হলে উম্মে সুলাইম বললেন, (আমাদের সন্তান মৃত্যু বরণ করেছে তাই) লোকেরা তাকে দাফন করেছে। সকাল হলে আবূ তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন। তাঁকে এ ঘটনা জানালেন। অতপর (তার স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্যের পারাকাষ্ঠায় মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে) তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ কি তোমরা সহবাস করেছো?’ বললেন, জী। তিনি দু‘আ করলেন, ‘হে আল্লাহ, এদের মধ্যে বরকত দিন’। (রাসূলুল্লাহর দু‘আর বরকতে সে রাতের মিলনে গর্ভ ধারণ হয়।) অতপর উম্মে সুলাইম একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। তখন আবূ তালহা আমাকে বলেন, একে নিয়ে তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও। শিশুটিকে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এলেন। আর উম্মে সুলাইম তার সঙ্গে কিছু খেজুরও পাঠান। (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে) তিনি তাকে গ্রহণ করেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তার সঙ্গে কি কিছু আছে?’ সাহাবীরা বললেন, হ্যা, তার সঙ্গে খেজুর আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর গ্রহণ করলেন এবং তা চিবুলেন। তারপর নিজের মুখ থেকে নিয়ে তা শিশুর মুখে দেন এবং তাহনীক করেন। আর তার নাম রাখেন আব্দুল্লাহ।’ [বুখারী : ৫০৪৮; মুসলিম : ৫৭৩৭]

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّهَا حَمَلَتْ بِعَبْدِ اللهِ بْنِ الزُّبَيْرِ بِمَكَّةَ قَالَتْ فَخَرَجْتُ وَأَنَا مُتِمٌّ فَأَتَيْتُ الْمَدِينَةَ فَنَزَلْتُ قُبَاءً فَوَلَدْتُ بِقُبَاءٍ ثُمَّ أَتَيْتُ بِهِ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَوَضَعْتُهُ فِي حَجْرِهِ ثُمَّ دَعَا بِتَمْرَةٍ فَمَضَغَهَا ثُمَّ تَفَلَ فِي فِيهِ فَكَانَ أَوَّلَ شَيْءٍ دَخَلَ جَوْفَهُ رِيقُ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ حَنَّكَهُ بِالتَّمْرَةِ ثُمَّ دَعَا لَهُ فَبَرَّكَ عَلَيْهِ ، وَكَانَ أَوَّلَ مَوْلُودٍ وُلِدَ فِي الإِسْلاَمِ فَفَرِحُوا بِهِ فَرَحًا شَدِيدًا لأَنَّهُمْ قِيلَ لَهُمْ إِنَّ الْيَهُودَ قَدْ سَحَرَتْكُمْ فَلاَ يُولَدُ لَكُمْ

‘আসমা বিনতে আবী বকর রাদিয়াআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়েরকে গর্ভে ধারণ করেন। তিনি বলেন, আমি মক্কা থেকে বের হলাম আমি প্রায় বাচ্চা প্রসবের মেয়াদ পুরো করে ফেলেছি। তারপর আমি মদীনায় পৌঁছলাম। সেখানে কুবা পল্লীতে আমি সন্তান জন্ম দিলাম। অতপর বাচ্চাটিকে নিয়ে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলাম এবং তাকে তাঁর কোলে দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর চাইলেন। খেজুর চিবুলেন এবং বাচ্চাটির মুখে একটু থুথু দিয়ে দিলেন। ফলে তার পেটে প্রথম যা পড়ে তা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থুথু। অতপর তিনি খেজুর দিয়ে তার তাহনীক করেন। অতপর তার জন্য দু‘আ করেন। বরকত কামনা করেন। আর এ-ই ছিল ইসলামে জন্মগ্রহণকারী প্রথম শিশু। এতে সবাই যার পর নাই খুশি হন। কারণ, তাদের বলা হয়েছিল ইহুদীরা তাদের যাদু করেছে। তাই তাদের কোনো সন্তান হবে না।’ [বুখারী : ৫৪৬৯; মুসলিম : ৫৭৪১]

সন্তানের তাহনীক করানো পর আসে তার আকীকার কথা। ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধই লিখিত হয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তিগণ সেখান থেকে বিস্তারিত জেনে নিতে পারবেন।

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যারা দীনের ওপর চলতে চাই, নিজের জীবনটাকে নববী আদর্শে সুসজ্জিত করতে চাই, তারাও কিন্তু সন্তান জন্ম ও তৎপরবর্তী করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে না জানার কারণে যা করার তা করতে পারি না। উল্টো যা না করা উচিত, যা পিতার ও সন্তানের জন্য কল্যাণকর নয়, তাই করা করে থাকি। আশা করি আমাদের কুরআন-হাদীস রোমন্থিত এ নিবন্ধ আমাদের চলার পথে অমূল্য পাথেয় যোগাবে। আল্লাহ তা‌’আলা আমাদের সবাইকে তাঁর নির্বাচিত এবং তাঁর রাসূলের প্রদর্শিত পথে চলবার তাওফীক দিন। আমীন।

ইসলাম হাউস

মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে

 মোবাইল মেসেজে সুন্দরবনকে ভোটিং করা যাবে


অবশেষে সুন্দরবনপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ হলো। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতায় সুন্দরবনকে বিজয়ী করতে সাশ্রয়ীমূল্যে মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোট দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স অব নেচার ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তির প্রেক্ষিতে গতরাত ১২-০১ মিনিট থেকেই মেসেজের মাধ্যমে ভোট প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে ভোটিং করে সুন্দরবনকে বিজয়ী করার একটি সহজ ক্ষেত্র তৈরী হলো।  এক্ষেত্রে ‘টেলিটক’ বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশের  অন্যান্য মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে গেটওয়ে সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবহৃত সকল অপারেটরের প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকগণই এসএমএস-এ সুন্দরবনকে ভোট প্রদান করতে পারবেন। 
জানা গেছে, এসএমএস-এর মাধ্যমে ভোটদানের ক্ষেত্রে যে কোন মোবাইল ফোন থেকে  মেসেজ অপশনে গিয়ে ঝই লিখে পাঠিয়ে দিতে হবে ‘১৬৩৩৩’ নম্বরে। এসএমএসটি গৃহীত হলে ভোটদানকারী একটি ‘কনফার্মেশন’ ফিরতি এসএমএস পাবেন। ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে  সুন্দরবনের জন্য ‘কী-ওয়ার্ড’ ঝই । অন্য স্থানগুলোর কী-ওয়ার্ডসহ বিস্তারিত তথ্য টেলিটকের ওয়েবসাইটে http://www.teletalk.com.bd/ পাওয়া যাচ্ছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী গতরাত ১২টা-১ মিনিট হতেই যে কেউ মোবাইলের মাধ্যমে সুন্দরবনকে ভোট দিতে পারছেন। সুন্দরবন বাদেও যে কোন ব্যক্তি যে কোন মোবাইল থেকেই তার পছন্দের প্রাকৃতিক স্থানকে যতবার খুশি ততবার ভোট দিতে পারবেন। ভোটগ্রহণ চলবে চলতি বছরের ১০ই নভেম্বর পর্যন্ত। এসএমএস-এ ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে ২ টাকা এবং ভ্যাট হিসেবে আরও ৩০ পয়সাসহ মোট ২ টাকা ৩০ পয়সা  কাটা হবে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সুন্দরবন সমর্থন কমিটি-বাংলাদেশসহ সুন্দরবনপ্রেমীরা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনের ভোট প্রদানের নাম্বারটি ‘টোল ফ্রি’ করার আবেদন করে আসছিল। এ ক্ষেত্রে সরকারও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ টেকনিক্যাল কারণে বিষয়টিতে অনুমোদন দেয়নি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আপামর মানুষের প্রকৃতির প্রতি ভালবাসার অন্যন্যসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি  এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা এবং সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় এনে নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ  বিকল্প হিসেবে এসএমএস-এর মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে ভোট প্রদানের দাবিটিতে অনুমোদন দিয়েছে। এসএমএস-এর মাধ্যমে এই ভোট প্রদানের বিষয়টিতে নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুন্দরবন সমর্থক কমিটি-বাংলাদেশের আহবায়ক পূর্বাঞ্চল সম্পাদক আলহাজ্ব লিয়াকত আলী, সদস্য সচিব উন্নয়ন সংগঠন রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন এবং সমন্বয়কারী একে হিরু সেভেন ওয়ান্ডারার্স কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সুন্দরবনপ্রেমীদের পক্ষে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।  ল্যান্ডফোন, মোবাইল ফোন এবং এসএমএসসহ ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রাপ্ত  ভোটের ভিত্তিতে ১১ নভেম্বর জগতের ৭টি নতুন সপ্তাশ্চর্যের নাম ঘোষণা করা হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সুন্দরবনসহ ২৮টি প্রাকৃতিক সম্পদ ফাইনাল রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।  বিটিআরসি কার্যালয়ে গতকাল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু এবং পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী হাসান মাহমুদসহ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, চেয়ারম্যান বিটিআরসি এবং মোবাইল ফোন অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত  থেকে মেসেজের ভোটিং করার সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। 

সূত্র: নেট

%d bloggers like this: