সমাজউন্নয়নে রসূল (স.)-এর অবদান

সমাজউন্নয়নে রসূল (স.)-এর অবদান

রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়বিচার ও নৈতিক বিধান নিশ্চিত করে জনসেবার মহান শিক্ষা ইসলামের। হযরত মুহাম্মদ (স.) যথার্থ উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানবতার বিকাশ ও মুক্তির জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সমাজ জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে অন্যায়-অবিচার সমূলে উত্পাটন এবং এরই ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রে জনগণের মহত্ কল্যাণ সাধিত হতে পারে। তিনি আরো উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘সমাজের সত্যিকার উন্নতি নিহিত রয়েছে বদান্যতা, ভালবাসা এবং পরস্পরকে বোঝার ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের তথা নিয়ত পরিবর্তনশীল ও সদাবিলীয়মান বস্তু-সামগ্রীর ওপর মানুষের চিত্তসত্বার স্বাক্ষর অংকনের যে ক্ষমতা, তার উন্নতির মাঝেই। তিনি প্রথমে তাই উদ্যোগ নিলেন সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার, অনৈক্য দূর করার। সমাজে বংশগত, গোত্রগত, সম্পদগত যে সব বৈষম্য যাবতীয় অনৈক্যের কারণ তার মূলে কুঠারাঘাত করলেন। কুরআনের বাণী উদ্বুদ্ধ করে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান।’ পরস্পরকে চিনতে পারার জন্যেই মানুষকে বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে।’ তিনি নিজেও একজন মানুষ। রাজা-প্রজা, পুরুষ-নারী, ক্রীতদাস-গোলাম কোন পার্থক্য নেই। …he (Prophet) ruled that social status of a person should not depend upon the economic position of that person but on how much he was devoted to god and his Prophet.। আর তাই তিনি ক্রীতদাস জায়েদকে অনেক সম্মানিত কোরেশ বংশের লোকের ওপর মর্যাদা দান করেন।

মানুষ যে সমাজের অভ্যন্তরে বাস করে এবং চলাফেরা করে আর যে সমাজের গর্ভে তার অস্তিত্ব, তার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিই যাবতীয় সমাজ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সমস্যা। অতীতের যাবতীয় বদঅভ্যাস যেমন জুয়া খেলা, স্ত্রীবিক্রয়, কন্যা হত্যা ইত্যাকার কলুষতা হতে আরববাসীদের চরিত্র সংশোধনের ওপর তিনি অধিক গুরুত্বারোপ করেন। এই সব নৈতিকতাবিহীন কার্যকলাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর শাস্তি বিধান করেন। তিনি উপলব্ধি করলেন অশিক্ষাই এ সকল সামাজিক দুষ্টব্যাধি বিস্তারের মূল কারণ। নিরক্ষর নবী (স.) শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, অল্প শিক্ষিত লোকের চাইতে সুশিক্ষিত ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করলেন। ঘোষণা করলেন বিদ্যাশিক্ষা অর্জন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। প্রয়োজনবোধে সুদূর চীন দেশে গিয়েও বিদ্যার্জন করার পরামর্শ দিলেন।

সমাজে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীজাতির সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার বিধান বিশ্বনবী (স.) এর এক অবিস্মরণীয় অবদান। যে আরব সমাজে প্রাক-ইসলামি যুগে নারী ছিল ঘৃণিত, লাঞ্ছিত সেই নারীর যথাযথ অংশীদারিত্ব স্বীকৃত হলো উত্তরাধিকার আইনে। নারীর অধিকার জন্মালো পছন্দমত স্বামী গ্রহণের এবং প্রয়োজনবোধে তালাক দেয়ার। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্যের সাথে সাথে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অধিকার ও কর্তব্য সুনির্ধারিত হলো। বহুস্ত্রীগমন তথা পতিতাবৃত্তির মতো সামাজিক সমস্যাকে চার স্ত্রী পর্যন্ত (সামর্থ্যানুযায়ী) বিবাহের বিধান জারির মাধ্যমে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হলো। ‘মুমিনরা একটি মানুষ সদৃশ, তার চোখ অসুস্থ হলে তার সমস্ত শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং যদি তার মস্তক পীড়িত হয় তা হলে তার সমস্ত দেহ পীড়িত হয়ে পড়ে। মানবতার এই সাম্যনীতি ঘোষণা করে ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ ঘোষণা করলেন নবী করীম (স.)।

নেতা, নেতৃত্ব এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য প্রসঙ্গে

রাসূলে করীম (স.) রাষ্ট্রযন্ত্রের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় প্রসঙ্গে যে সব বিধান ও মতামত রেখে গিয়েছেন তার মধ্যেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সুগভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন ‘খাদিমুল কওমী রঈসুহুম’ অর্থাত্ জাতির সেবকই হবেন জাতির নেতা। তিনি বলেছেন ‘প্রত্যেক দেশ-শাসক একজন মেষ-পালকের ন্যায়। প্রত্যেককেই যার যার অধীনস্থ মেষপালের মঙ্গলের জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আল্লাহ যে বান্দাকে কোন প্রজামণ্ডলের ভার অর্পণ করেছেন, সে যদি প্রজার সাথে প্রতারণা করে মারা যায় আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করেছেন। একজন মুসলমান রাষ্ট্রনায়ক আল্লাহর ছায়ামাত্র। আল্লাহ যেরূপ সূর্যরশ্মি, বৃষ্টিপাত বা বায়ুচালনা দ্বারা সকলকে সমানভাবে উপকার প্রদান করেন রাজা বা রাষ্ট্রপতিও তদ্রূপ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রজা পালন করবে। বিষয়টি গভীর সমাবেশ সহকারে অনুধাবন করলে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নেতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহান শিক্ষা ও নির্দেশিত পথে সকলে চললে রাষ্ট্রশাসন পরিচালনায় কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে না। জাতির সেবা করলে সকলের নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভের প্রসঙ্গটিও সহজ ও অনায়াসলব্ধ হয়ে যায়। God says to the Islamic state, Since you take obedience from the people in My name, you should give them what I have promised to give, that is, fulfil the responsibilites which I have assumed in respect of mankind. If you fail to fulfil the responsibilities to people you lose your right to their obedience. The two go together.

নাগরিকের অধিকার প্রসঙ্গে নবী করীম (স.) বলেছেন, তাঁর হাতে আমি নিজেকে সমর্পণ করেছি তাঁর শপথ, কোন ব্যক্তিই সত্যিকার ঈমানদার হতে পারবে না, যদি না সে তার ভ্রাতার জন্য তাই কামনা করে যা সে কামনা করে নিজের জন্য। এই নীতিরই আলোকে সমাজের অভ্যন্তরে সম্পদ বন্টনে যাতে ন্যায়নীতি বলবত্ থাকে এবং পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক যাতে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার ও  পরিধেয়  পায়, সে দিকে ইসলামী  রাষ্ট্রকে  অবশ্য  লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়  বলে তিনি মনে করতেন।এ লক্ষ্য অনুসারে  দেশের সংবিধানে এ ধারা অবশ্যই  থাকা চাই যে— প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার থাকবে: (ক) সুস্থ অবস্থায় এবং কাজ করবার বয়স থাকাকালে উত্পাদনমূলক ও শ্রমের মজুরি দেয়া হয় এমন কাজ পাবার, (খ) এই ধরনের উত্পাদনমূলক কাজের জন্য শিক্ষা লাভের প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্রের খরচে হওয়া, (গ) অসুস্থ হলে বিনা খরচে উপযুক্ত চিকিত্সা পাবার এবং (ঘ) অসুখ-বিমুখ, বৈষম্য, বার্ধক্য, অপ্রাপ্ত বয়স্কতা অথবা ব্যক্তির আয়ত্ত বহির্ভূত অবস্থায় কারণজাত বেকারত্বে রাষ্ট্রের নিকট থেকে উপযুক্ত খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় পাবার।৪৩

বিদায় হজ্বের অভিভাষণে রসূল (স.) উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনও কাফ্রী ক্রীতদাসকেও যদি তোমাদের প্রশাসক নিযুক্ত করা হয় এবং সে যদি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক তোমাদের পরিচালনা করে তা হলে অবশ্যই তোমরা তাকে মান্য করবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: