রোগ নিরাময়ে ঘরোয়া চিকিৎসা

ছোটখাটো অসুখে অস্বস্তিতে ওষুধ কেন? ঘরেই আছে নানা দ্রব্য হেঁশেলে, রেফ্রিজারেটরে। অস্বস্তি অনেকটাই উপশম হতে পারে। আমরা অনেকে একে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, কিন্তু সময়বিশেষে আরাম দিতে এদের জুড়ি নেই। উন্নত দেশের চিকিৎসকেরা বলছেন অ্যান্টিবায়োটিকের যে রকম অপব্যবহার হচ্ছে এবং ছোটখাটো অসুখে যেভাবে চিকিৎসার আতিশয্য ঘটছে, সে ক্ষেত্রে ঘরোয়া এসব চিকিৎসা আরাম দিতে পারে শরীরকে।

যেমন- আদা। পেটে অস্বস্তি, ঠাণ্ডা, সর্দিতে আদা বড় উপকারী।

বমিভাব, মোশন সিকনেসে আদা বেশ কার্যকর। একটি প্রিভেনটিভ মেডিসিন সেন্টারের পরিচালক ডা. এলসন হাস বলেন, আদার তিন-চার ফালি দুই কাপ পানিতে ১০ মিনিট জ্বাল দিয়ে এবং ১০-১৫ মিনিট রেখে আদা-চা বানিয়ে খেলে খুব উপকার দেয়। আর স্বাদু চা তৈরি করতে হলে এর সাথে যোগ করুন লেবুর রস ও মধু। হজম ভালো করতে হলে একটি টনিক আছে। কমলালেবুর শুকনো খোসা, লবঙ্গ ও রোজমেরি সমান সমান পরিমাণে মিশিয়ে, এককাপ আদা-চায়ে এই মিশ্রণ এক চামচ মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। এরপর পান করুন।

ঠাণ্ডা ও সর্দিতে আদা চা খুব ভালো। রক্ত চলাচল বাড়িয়ে ও ঘাম ঝরিয়ে ঠাণ্ডার কষ্ট কমায়। বুকে একটু গরম সেঁক। ছোটবেলা দিদারা বুকে রসুন ও গরম তেল মালিশ করতেন। বেশ আরাম হতো। মা ছোটবেলায় তুলসীপাতার রস গরম করে মধু মিশিয়ে চামচে করে মুখে তুলে দিতেন, মনে আছে। তবে শিশুদের ব্যাপারে একটি সতর্কবাণী আছে। শিশুদের ঠাণ্ডা লেগে হঠাৎ বুকে শ্বাসযন্ত্রে নেমে আসে। সেজন্য বেশি দেরি নয়। ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন। ঘরোয়া চিকিৎসা তাৎক্ষণিক আরামের জন্য। ডাক্তার অবশ্য দেখাতে হবে। শিশুদের ঠাণ্ডা সর্দি হয়ে হঠাৎ নিউমোনিয়া হয়ে যায়। টের পাওয়া যায় না।

হাস্‌ একটি টোটকা চিকিৎসার কথা বলেছেন। একটি কাপড়ের পট্টি ভিজিয়ে নিন গরম আদা-চায়ের মধ্যে, বুকে রাখুন এবং একটি টাওয়েল দিন এর ওপর। ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত এভাবে রাখুন।

বেকিং সোডা চুলকানিতে দেয় আরাম

একটি গামলায় প্রায় তিন পোয়া পানিতে দুই টেবিল চামচ বেকিং সোডা অথবা বাথটাবে আধকাপ বেকিং সোডা মিশিয়ে অবগাহন করলে চুলকানি কমে, জলবসন্ত বা বুনোগাছের বাকল লেগে চুলকানি এমনকি মলদ্বারের চুলকানিরও আরাম হয়। শিশুরোগের ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ডা. লোবেন স্টিন বলেন বেকিং সোডা মেশানো পানিতে গা ভিজিয়ে নিতে পারেন, পানির পট্টি ও কমপ্রেসও দিতে পারেন। তবে দেখবেন এটি লাগালে ত্বক শুষ্ক হয়। পতঙ্গ বা বোলতার হূল ও দংশনেও বেকিং সোডা ও পানির পেস্ট বেশ আরাম দেয়। ছোট শিশুদের শরীরে প্রয়োগ করতে সতর্কতা­ এদের ত্বক খুব নাজুক।

আঁচিল ঝরে যায় টেপের বাঁধনে

ত্বক বিজ্ঞানী ডা. জেরোম জেড লিট বলেন, আঁচিলের ওপর চার স্তর অ্যাডহেসিভ টেপ লাগান, ব্যান্ডেজটি যেন এয়ারটাইট হয়, তবে আঁচিলকে যেন বেশি চেপে না বসে। প্রথম টেপের পট্টি লাগানো হবে আঙুলের লম্বালম্বি, পরেরটি আঙুলকে পেঁচিয়ে বসান, এবার পুনরায় দুটো লাগান এভাবেই। ব্যান্ডেজকে রেখে দিন সাড়ে ছয় দিন, অর্ধেক দিন টেপ খুলে নিন। এরপর নতুন একটি লাগান। আঁচিল অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত টেপ লাগনো রাখুন। ডা. লিট বলেন, এতে সময় লাগে দুই থেকে ছয় সপ্তাহ।

কিভাবে এটি কাজ করে তা স্পষ্ট নয়। ডা. লিট বলেন, সম্ভবত আঁচিলের ভাইরাস টেপের বাঁধনে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।

টি ব্যাগ ঘর্মাক্ত পা ও ঘা শুকাতে পারে

চায়ের মধ্যে যে টনিক অ্যাসিড আছে এটি কাজ করে অ্যাসট্রিনজেন্ট হিসেবে, এতে পা থাকে শুকনো ও দুর্গন্ধমুক্ত। ডা. জেরোম জেড লিটের ভাষ্য­ কুড়ি আউন্স পানিতে দুটো চা-ব্যাগ দিয়ে জ্বাল দিন ১৫ মিনিট, এরপর এই মিশ্রণটি দেড় সের ঠাণ্ডা পানিতে মেশান একটি গামলায়। এক সপ্তা প্রতিদিন পা ২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। পায়ে আর দুর্গন্ধ থাকবে না।

দুষ্টুক্ষতের ব্যথা উপশমের জন্য একটি টি-ব্যাগ ঈষদুষ্ণ পানিতে ভিজিয়ে, ব্যাগটি মুচড়ে ক্ষতে ধরে রাখুন ৫-১০ মিনিট। তিন-চার ঘণ্টা পর পর দিতে পারেন।

রসুন উপকারী ঠাণ্ডা লাগা ও ফ্লুতে

গবেষণায় দেখা গেছে, রসুনের কোনো কোনো রাসায়নিক উপকরণ রোগজীবাণু ধ্বংস করতে পারে। ঠাণ্ডা লাগা, ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে রসুন খান। প্রতিবেলা খাবারে দুই-তিন কোয়া টাটকা রসুন খান। একটি রেসিপির কথা বলি।

বিশেষ সুপ। দু থেকে তিন কোয়া রসুনের টাটকা কোয়া এবং কিছু টাটকা আদা কুচি দিন এক পাত্র সবজির সুপে (সে সবজি হবে গাজর, ব্রকলি, পালংশাক, টমেটো, বাঁধাকপি, লাল ও সবুজ মরিচ)। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন এ ও সি। এটা রোগ প্রতিরোধক। সুপের ভাপ নাক দিয়ে শুঁকলেও নাক বন্ধ সেরে যাবে। এরপর সুপ খান।

একুপ্রেশার উপকারী বমি ও বেদনায়

নিউরোবায়োলজির অধ্যাপক ডা. ব্রুসপোমেরানজ বলেন, কব্জির ওপর আছে একটি বিন্দু, যা চাপলে বমিভাব উপশম হয়। তিনি ছয়টি গবেষণার কথা বলেছেন, অবশ্য কারণটি স্পষ্ট নয়। মনিবন্ধের ভেতর দিকে একটি খাঁজ আছে যার দুই পাশ দিয়ে দুটো শক্ত পেশিবন্ধনী চলে গেছে হাতের তালু থেকে কনুই পর্যন্ত। মনিবন্ধের দুই ইঞ্চি ওপরে বুড়ো আঙুল বা আঙুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরুন দুই মিনিট। ২০ মিনিট বারবার এরকম চাপ দিলে উগ্র বমিভাবও কমে যায়।

মাথার ত্বকে ইনফেকশন ও চুল পড়া

মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্প থেকে চুল ওঠে। অর্থাৎ চুলের ফলিকল থাকে স্ক্যাল্পে। সেখান থেকেই চুল গজায় ও সময়ে বাড়ে। মাথার ত্বকের সুস্থতার সাথে চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। মাথার ত্বকে ইনফেকশন থাকলে চুলের সমস্যা হয়। সবচেয়ে বড় কথা এতে চুল পড়ার হার অনেক বেড়ে যায়।

কী করে বুঝবেন মাথার ত্বকে ইনফেকশন বা সংক্রমণ হয়েছে?

­ চুলের গোড়ায় ব্যথা হওয়া বা ফুলে ওঠা। একে কেরিয়াল বলে।

­ চুলের গোড়া কালো হয়ে যাওয়া ও চুল পড়া।

­ চুলের গোড়ায় ছোট ছোট গোটার মতো হওয়া এবং অল্প ফুলে ওঠা। দানা বা গোটাগুলো পুঁজভর্তি হতে পারে।

­ মাথার ত্বক চুলকানো ও ময়লা ওঠা।

­ সাদা সাদা খোসার মতো ময়লা পড়া।

ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদির কারণে মাথায় সংক্রমণ হতে পারে। অনেক সময় মাথা চুলকাতে চুলকাতে ঘা কিংবা একজিমাও হতে পারে। অনেক সময় চুল পড়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় চুলের গোড়ায় ইনফেকশন রয়েছে। কোন ধরনের ইনফেকশন হয়েছে তা পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ, শ্যাম্পু ইত্যাদির সাহায্যে চিকিৎসা করলে ইনফেকশন রোধ করা সম্ভব। এছাড়া শহরের ধুলোবালু, ময়লা ও ধোঁয়ার কারণে সংক্রমণ হয় বলে এগুলো পরিহার করে চলাও প্রয়োজন। অনেক সময় চুল পড়ার কারণ খুঁজে পেতে দেরি হলে ও সঠিক চিকিৎসা না করালে মাথা খালি হয়ে যেতে পারে। তাই মাথায় ত্বকের সংক্রমণের সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে চুল পড়া রোধ করা প্রয়োজন। সংক্রমণের সঠিক চিকিৎসা হলে চুল পড়া থামবে ও চুল স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

হার্নিয়া রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

যদি আপনার কোনো কুঁচকিতে ব্যথা হয় কিংবা ফোলা দেখতে পান তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। এই ফোলা বেশি দেখা যাবে যখন আপনি দাঁড়াবেন। সাধারণত আক্রান্ত স্থানে হাত রাখলে আপনি এটা অনুভব করতে পারবেন।

আপনি শুয়ে পড়লে হার্নিয়া আপনা আপনি মিলিয়ে যাবে অথবা আপনি হাত দিয়ে হালকা চেপে পেটে ঢুকিয়ে দিতে পারবেন। যদি তা না হয় তাহলে জায়গাটিতে বরফের সেঁক দিলে ফোলা কমে গিয়ে হার্নিয়া চলে যায়। শোয়ার সময় মাথার তুলনায় কোমর উঁচু করে শুতে হবে।

যদি আপনি হার্নিয়া ঢোকাতে না পারেন তাহলে বুঝতে হবে অন্ত্রের অংশ পেটের দেয়ালে আটকে গেছে। এটি একটি মারাত্মক অবস্থা। এ ক্ষেত্রে জরুরিভাবে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। এ পর্যায়ে বমি বমি ভাব, বমি অথবা জ্বর হতে পারে এবং হার্নিয়া লাল, বেগুনি অথবা কালো হয়ে যেতে পারে। যদি এ ধরনের কোনো চিহ্ন বা উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

রোগ নির্ণয়

সাধারণ শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে ইনগুইনাল হার্নিয়া নির্ণয় করা হয়। আপনার চিকিৎসক আপনাকে আপনার উপসর্গগুলো জানতে চাইবেন, তারপর কুঁচকি এলাকার ফোলাটা পরীক্ষা করে দেখবেন।

যেহেতু কাশি দিলে হার্নিয়া অধিক স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়, তাই কাশি দেয়াটাও আপনার পরীক্ষার একটা অংশ হতে পারে।

জটিলতা

অপারেশনের মাধ্যমে হার্নিয়া ঠিক না করলে ক্রমে হার্নিয়া বড় হতে থাকে। বড় হার্নিয়া চার পাশের টিসুøর ওপর চাপ প্রয়োগ করে­ পুরুষের ক্ষেত্রে হার্নিয়া অণ্ডথলি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এবং ব্যথা ও ফোলা সৃষ্টি করে।

তবে ইনগুইনাল হার্নিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা হলো যখন অন্ত্রের অংশ পেটের দেয়ালের দুর্বল জায়গায় আটকে যায়। এ সময় প্রচণ্ড ব্যথা হয়, বমি বমি ভাব ও বমি হয় এবং পায়খানা বন্ধ হয়ে যায়, কিংবা বায়ু চলাচল করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে অন্ত্রের আটকে পড়া অংশে রক্ত চলাচল কমে যায়­ এ অবস্থাকে বলে স্ট্রাংগুলেশন­ যার কারণে আক্রান্ত অন্ত্রের টিসুøর মৃতুø ঘটতে পারে। স্ট্রাংগুলেটেড হার্নিয়া একটি জীবনমরণ সমস্যা, এ ক্ষেত্রে জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হয়।

চিকিৎসা

যদি আপনার হার্নিয়া ছোট থাকে এবং আপনার কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে তাহলে আপনার চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করার কথা ও অপেক্ষা কার কথা বলতে পারেন। কিন্তু হার্নিয়া যদি বড় হতে থাকে এবং ব্যথা হয় তাহলে অস্বস্তি দূর করতে ও মারাত্মক জটিলতা প্রতিরোধ করতে সাধারণত অপারেশনের প্রয়োজন হয়। হার্নিয়ার দু’ধরনের সাধারণ অপারেশন করা হয়ঃ

হার্নিয়োর্যাফি

এ পদ্ধতিতে আপনার সার্জন আপনার কুঁচকিতে একটা ইনসিশন দিয়ে বেরিয়ে আসা অন্ত্রকে ঠেলে পেটের মধ্যে ফেরত পাঠান। তারপর দুর্বল বা ছেঁড়া মাংসপেশি সেলাই করে ঠিক করে দেন। অপারেশনের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনি চলাফেরা করতে পারবেন, তবে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে যেতে আপনার চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

হার্নিয়োপ্লাস্টি

এ পদ্ধতিতে আপনার সার্জন কুঁচকি এলাকায় এক টুকরো সিনথেটিক মেশ লাগিয়ে দেন। সেলাই, ক্লিপ অথবা স্টাপল করে এটাকে সাধারণত দীর্ঘজীবী রাখা হয়। হার্নিয়ার ওপরে একটা একক লম্বা ইনসিশন দিয়েও হার্নিয়োপ্লাস্টি করা যেতে পারে। বর্তমানে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে, ছোট ছোট কয়েকটি ইনসিশন দিয়ে হার্নিয়োপ্লাস্টি করা হয়।

প্রতিরোধ

যদি আপনার জন্মগত ত্রুটি থাকে, যার কারণে ইনগুইনাল হার্নিয়া হতে পারে­ সেটা আপনি প্রতিরোধ করতে পারবেন না, তবে নিচের পরামর্শগুলো মেনে চললে আপনার পেটের মাংসপেশি ও কলার টান কমাতে পারবেনঃ

­ স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুনঃ যদি আপনার স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ব্যায়াম ও খাদ্যগ্রহণ করুন।

­ উচ্চ আঁশসমৃদ্ধ খাবার খানঃ টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি এবং সম্পূর্ণ খাদ্যশস্য আপনার সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

­ ভারী বস্তু উত্তোলনে সতর্ক হোনঃ পারতপক্ষে ভারী বস্তু উত্তোলন করবেন না। যদি একান্তই উত্তোলন করতে হয় তাহলে সর্বদা হাঁটু ভাঁজ করে শুরু করবেন, কখনো কোমর বাঁকাবেন না।

­ ধূমপান বন্ধ করুন।

Advertisements

সমাজউন্নয়নে রসূল (স.)-এর অবদান

সমাজউন্নয়নে রসূল (স.)-এর অবদান

রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়বিচার ও নৈতিক বিধান নিশ্চিত করে জনসেবার মহান শিক্ষা ইসলামের। হযরত মুহাম্মদ (স.) যথার্থ উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানবতার বিকাশ ও মুক্তির জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে সমাজ জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে অন্যায়-অবিচার সমূলে উত্পাটন এবং এরই ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রে জনগণের মহত্ কল্যাণ সাধিত হতে পারে। তিনি আরো উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘সমাজের সত্যিকার উন্নতি নিহিত রয়েছে বদান্যতা, ভালবাসা এবং পরস্পরকে বোঝার ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের তথা নিয়ত পরিবর্তনশীল ও সদাবিলীয়মান বস্তু-সামগ্রীর ওপর মানুষের চিত্তসত্বার স্বাক্ষর অংকনের যে ক্ষমতা, তার উন্নতির মাঝেই। তিনি প্রথমে তাই উদ্যোগ নিলেন সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার, অনৈক্য দূর করার। সমাজে বংশগত, গোত্রগত, সম্পদগত যে সব বৈষম্য যাবতীয় অনৈক্যের কারণ তার মূলে কুঠারাঘাত করলেন। কুরআনের বাণী উদ্বুদ্ধ করে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ সমান।’ পরস্পরকে চিনতে পারার জন্যেই মানুষকে বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে।’ তিনি নিজেও একজন মানুষ। রাজা-প্রজা, পুরুষ-নারী, ক্রীতদাস-গোলাম কোন পার্থক্য নেই। …he (Prophet) ruled that social status of a person should not depend upon the economic position of that person but on how much he was devoted to god and his Prophet.। আর তাই তিনি ক্রীতদাস জায়েদকে অনেক সম্মানিত কোরেশ বংশের লোকের ওপর মর্যাদা দান করেন।

মানুষ যে সমাজের অভ্যন্তরে বাস করে এবং চলাফেরা করে আর যে সমাজের গর্ভে তার অস্তিত্ব, তার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিই যাবতীয় সমাজ ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সমস্যা। অতীতের যাবতীয় বদঅভ্যাস যেমন জুয়া খেলা, স্ত্রীবিক্রয়, কন্যা হত্যা ইত্যাকার কলুষতা হতে আরববাসীদের চরিত্র সংশোধনের ওপর তিনি অধিক গুরুত্বারোপ করেন। এই সব নৈতিকতাবিহীন কার্যকলাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কঠোর শাস্তি বিধান করেন। তিনি উপলব্ধি করলেন অশিক্ষাই এ সকল সামাজিক দুষ্টব্যাধি বিস্তারের মূল কারণ। নিরক্ষর নবী (স.) শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, অল্প শিক্ষিত লোকের চাইতে সুশিক্ষিত ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করলেন। ঘোষণা করলেন বিদ্যাশিক্ষা অর্জন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। প্রয়োজনবোধে সুদূর চীন দেশে গিয়েও বিদ্যার্জন করার পরামর্শ দিলেন।

সমাজে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীজাতির সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার বিধান বিশ্বনবী (স.) এর এক অবিস্মরণীয় অবদান। যে আরব সমাজে প্রাক-ইসলামি যুগে নারী ছিল ঘৃণিত, লাঞ্ছিত সেই নারীর যথাযথ অংশীদারিত্ব স্বীকৃত হলো উত্তরাধিকার আইনে। নারীর অধিকার জন্মালো পছন্দমত স্বামী গ্রহণের এবং প্রয়োজনবোধে তালাক দেয়ার। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্যের সাথে সাথে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অধিকার ও কর্তব্য সুনির্ধারিত হলো। বহুস্ত্রীগমন তথা পতিতাবৃত্তির মতো সামাজিক সমস্যাকে চার স্ত্রী পর্যন্ত (সামর্থ্যানুযায়ী) বিবাহের বিধান জারির মাধ্যমে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হলো। ‘মুমিনরা একটি মানুষ সদৃশ, তার চোখ অসুস্থ হলে তার সমস্ত শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং যদি তার মস্তক পীড়িত হয় তা হলে তার সমস্ত দেহ পীড়িত হয়ে পড়ে। মানবতার এই সাম্যনীতি ঘোষণা করে ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ ঘোষণা করলেন নবী করীম (স.)।

নেতা, নেতৃত্ব এবং নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য প্রসঙ্গে

রাসূলে করীম (স.) রাষ্ট্রযন্ত্রের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় প্রসঙ্গে যে সব বিধান ও মতামত রেখে গিয়েছেন তার মধ্যেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর সুগভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন ‘খাদিমুল কওমী রঈসুহুম’ অর্থাত্ জাতির সেবকই হবেন জাতির নেতা। তিনি বলেছেন ‘প্রত্যেক দেশ-শাসক একজন মেষ-পালকের ন্যায়। প্রত্যেককেই যার যার অধীনস্থ মেষপালের মঙ্গলের জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আল্লাহ যে বান্দাকে কোন প্রজামণ্ডলের ভার অর্পণ করেছেন, সে যদি প্রজার সাথে প্রতারণা করে মারা যায় আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করেছেন। একজন মুসলমান রাষ্ট্রনায়ক আল্লাহর ছায়ামাত্র। আল্লাহ যেরূপ সূর্যরশ্মি, বৃষ্টিপাত বা বায়ুচালনা দ্বারা সকলকে সমানভাবে উপকার প্রদান করেন রাজা বা রাষ্ট্রপতিও তদ্রূপ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রজা পালন করবে। বিষয়টি গভীর সমাবেশ সহকারে অনুধাবন করলে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, নেতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহান শিক্ষা ও নির্দেশিত পথে সকলে চললে রাষ্ট্রশাসন পরিচালনায় কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে না। জাতির সেবা করলে সকলের নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভের প্রসঙ্গটিও সহজ ও অনায়াসলব্ধ হয়ে যায়। God says to the Islamic state, Since you take obedience from the people in My name, you should give them what I have promised to give, that is, fulfil the responsibilites which I have assumed in respect of mankind. If you fail to fulfil the responsibilities to people you lose your right to their obedience. The two go together.

নাগরিকের অধিকার প্রসঙ্গে নবী করীম (স.) বলেছেন, তাঁর হাতে আমি নিজেকে সমর্পণ করেছি তাঁর শপথ, কোন ব্যক্তিই সত্যিকার ঈমানদার হতে পারবে না, যদি না সে তার ভ্রাতার জন্য তাই কামনা করে যা সে কামনা করে নিজের জন্য। এই নীতিরই আলোকে সমাজের অভ্যন্তরে সম্পদ বন্টনে যাতে ন্যায়নীতি বলবত্ থাকে এবং পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক যাতে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার ও  পরিধেয়  পায়, সে দিকে ইসলামী  রাষ্ট্রকে  অবশ্য  লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়  বলে তিনি মনে করতেন।এ লক্ষ্য অনুসারে  দেশের সংবিধানে এ ধারা অবশ্যই  থাকা চাই যে— প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার থাকবে: (ক) সুস্থ অবস্থায় এবং কাজ করবার বয়স থাকাকালে উত্পাদনমূলক ও শ্রমের মজুরি দেয়া হয় এমন কাজ পাবার, (খ) এই ধরনের উত্পাদনমূলক কাজের জন্য শিক্ষা লাভের প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্রের খরচে হওয়া, (গ) অসুস্থ হলে বিনা খরচে উপযুক্ত চিকিত্সা পাবার এবং (ঘ) অসুখ-বিমুখ, বৈষম্য, বার্ধক্য, অপ্রাপ্ত বয়স্কতা অথবা ব্যক্তির আয়ত্ত বহির্ভূত অবস্থায় কারণজাত বেকারত্বে রাষ্ট্রের নিকট থেকে উপযুক্ত খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় পাবার।৪৩

বিদায় হজ্বের অভিভাষণে রসূল (স.) উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনও কাফ্রী ক্রীতদাসকেও যদি তোমাদের প্রশাসক নিযুক্ত করা হয় এবং সে যদি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক তোমাদের পরিচালনা করে তা হলে অবশ্যই তোমরা তাকে মান্য করবে।

%d bloggers like this: