বিশ্বশান্তি ও ইসলাম

বিশ্বশান্তি ও ইসলাম

ইসলাম শান্তির ধর্ম। শান্তিপূর্ণ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব প্রতিষ্ঠার একমাত্র সঠিক ও বাস্তবমুখী দিক-নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। ইসলামের এই কালজয়ী আদর্শের মহিমায় এক সময় অর্ধ পৃথিবীতে শান্তি স্থাপিত হয়েছিল। আমরা যদি সেই আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে পারি তাহলে এখনো সমগ্র বিশ্ব হতে যুদ্ধ বিগ্রহ, ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধতা বিদূরিত হয়ে এক সুখময় শান্তির নীড়ে পরিণত হবে আমাদের এই বসুন্ধরা। সুদৃঢ় ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় ইসলাম বিশ্ববাসীকে দিয়েছে শান্তি, শৃংখলা, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব এবং তার পরিণামবোধ ও কর্মের অধিকার।

মানুষের জীবনের সকল স্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যা যথার্থই প্রয়োজন, ইসলাম সে সকল বিষয় সুষ্ঠুভাবে বিন্যস্ত করছে এবং প্রত্যেকের সমষ্টিগত মর্যাদা নিরূপণে যা প্রয়োজন তা গ্রহণ করেছে। তাই আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেছেন,

“আজকের দিনে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ধর্ম)—পরিপূর্ণ করে দিলাম, সম্পূর্ণ ও সমাপ্ত করে দিলাম তোমাদের জন্য আমার নেয়ামত এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে জীবন বিধান হিসাবে পছন্দ করলাম”- (সুরা মায়িদা, আয়াত:৩)।একুশ শতকের চলমান পরিস্থিতিতে বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ আজ অরাজকতা, বিশ্বমন্দা, পারিবারিক বিশৃংখলা ও জঙ্গীবাদ নামক নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব যখন বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হচ্ছে, তেমনি মুহূর্তে বিশেষ কয়েকটি দেশের মোড়লগিরিতে বিশ্বশান্তি আজ তিরোহিত। অস্ত্র অনুসন্ধানের নামে শক্তি প্রদর্শন এবং জাতিসংঘের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশ্বব্যাপী নৈরাজ্য স্থাপন, তা কখনো শান্তি আনতে পারে না।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে গৃহযুদ্ধের দরুন ‘শান্তি’ নামক মোহময়ী বস্তু আজ দুর্লভ। অত্যাচারীর জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে এই দেশগুলোতে শান্তি পালিয়ে বেড়াচ্ছে। শিশুদের বুকফাটা আর্তনাদ আকাশে বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। এই করুণ অবস্থার একমাত্র সমাধান হল ইসলাম, ইসলামের শান্তিময় আলো প্রজ্বলন করে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে যেমন আরবসহ অর্ধ জাহানব্যাপী যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, ঠিক তেমনি তা আবার আনতে পারে একমাত্র ‘ইসলাম’। ইসলাম অর্থ শান্তি, আনুগত্য। একবাক্যে যার পরিচয় হল “মানবজীবনের সকল শাখা-প্রশাখার সমস্যার সমাধান একমাত্র ধর্ম ইসলাম”। ইসলাম তার আলোকবর্তিকার জ্বলন্ত উদাহরণস্বরূপ নিয়ে এসেছে মহা সংবিধান মহাগ্রন্থ ‘আল-কুরআন’। আধুনিক জ্ঞানপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে ব্যক্তি, পরিবার,  সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সমস্যার সমাধান দিচ্ছে আল-কুরআন। শান্তির এই মহাসনদ সম্পর্কে গুরু নানক বলেছেন, “বেদ ও পুরানের সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন কেবল মাত্র কুরআনই  পৃথিবীকে পরিচালিত করতে পারে। সাধু, ঋষি, সংস্কারক সাইয়েদ, পীর, সকলেই উপকৃত হবেন যদি তারা কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং দরুদ পড়েন”। বর্তমান বিশ্বে শান্তির জন্য যে হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে, অন্তরের পাপরাশি মানুষের সামগ্রিক জীবনকে যেভাবে দুর্বিষহ করে তুলছে, সেক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান হল ইসলাম এবং মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, কুরআন বর্ণনা করছে এভাবে, “এবং তোমার প্রতি ক্রমাগতভাবে কুরআন নাযিল করেছি সববিষয়ের বর্ণনাকারী, ব্যাখ্যাকারী হিসাবে, প্রদর্শনকারী জীবন বিধান, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ হিসাবে”-(সুরা নাহল, আয়াত:৮৯)। বিশ্বব্যাপী ইসলামের শান্তিময় বার্তাবাহক রূপে যে মহামানব ৫৭০ খৃষ্টাব্দে এ ধুলির ধরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন তাঁর অনুপম চরিত্র আজও সকলের নিকট অনুকরণীয়। এই মহামানব কুরআনকে সংবিধান করে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন তা আজও অতুলনীয়। নিজ ভূমি ছেড়ে পরভূমিতে গিয়ে আদর্শের এই মূর্ত প্রতীক সমগ্র বিশ্বের সকল রাষ্ট্রপতির নিকট হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বেদুঈন বর্বর, দুরন্ত আরবজাতিকে তিনি সুশৃংখল, দুর্বার, দিগ্বিজয়ী বাহিনীতে রূপান্তরিত করেছিলেন। মদীনা হিজরত থেকে শুরু করে ওফাতের পূর্ব সময় পর্যন্ত তার রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা  সমগ্র বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিলো।

মানবতার এই মহান নেতা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে এক আল্লাহর তাওহীদবাদে মানুষদের দীক্ষিত করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তার পুনরুত্থানের সময় আজ ঘনীভূত। দিকে দিকে জোর শোরগোল উঠছে শুধু একটি ধ্বনির। আর তা হলো শান্তি, এই শান্তি আনতে পারে একমাত্র ইসলাম।

ফরাসী সম্রাট “নেপোলিয়ন” তার জীবদ্দশায় রাসূল (স.) এবং তাঁর আনীত ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন এভাবে, মুহাম্মদ এর ধর্মই আমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়।  মহানবী (স.) শৈশবকাল থেকেই আরবদের মধ্যকার গোত্রযুদ্ধ দেখে ভেবেছিলেন, কিভাবে সমাজে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনা যায়? হারবুল ফুজ্জারের যুদ্ধের পর তার এই ভাবনা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছিলো, অতঃপর ৫৮৯/৯০ খৃঃ তিনি বেশ কিছু শান্তিপ্রিয় তরুণদের নিয়ে গঠন করেন “হিলফুল ফুযুল” বা শান্তি সংঘ। বিশ্ব ইতিহাসে এ ধরনের সংঘ এটাই প্রথম। তিনি বয়স্কদের পরামর্শক্রমে বেশকিছু প্রতিজ্ঞা সবার কাছ থেকে আদায় করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে বেশকিছু বছর আরবদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সংঘাত বন্ধ ছিলো।

এরপরও মানুষ ব্যক্তিগতভাবে অশান্তিতে অবগাহন করছিলো। প্রচলিত রীতি-নীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার জাহেলিয়াতের এই যুগকে ঘোর কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। আরবজাতির এহেন ন্যক্কারজনক অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে মহানবী (স.) দীর্ঘদিন হেরা গুহায় সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে মশগুল ছিলেন।

স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন এবং আরবীয় মরুময় সমাজে শান্তির বাতাস প্রবাহিত করার জন্য তার একমাত্র সহযোগী ছিলেন বিবি খাদিজা। বিশ্বব্যাপী “শান্তি” আনার জন্য এক মহান ব্রত নিয়ে ধ্যানমগ্ন মুহাম্মদ (স.) শুধু একটিই চিন্তা করতেন, শান্তি আনয়নের/ প্রতিষ্ঠার পন্থা কি? দীর্ঘ কয়েক বছর সাধনার পর অবশেষে স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ফেরেশতাগণ মহানবী (স.) এর জন্য খুলে দিলেন জ্ঞানের অবারিত দ্বার। আর পূর্ণ প্রকাশিত হলো ইসলাম, যা আজ থেকে বহু বছর আগে আদম (আ.) এর পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। মহানবী (স.) তাঁর আদর্শের বাণী সবার মাঝে ছড়িয়ে দিলেন, আরবের প্রতিটি প্রান্তরে ইসলামের সুমহান বাণী ছড়িয়ে পড়ল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: