ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান আরবি শব্দ ও ইসলামী পরিভাষা। যার আরবি প্রতিশব্দ তাসদিক অর্থাত্ অকাট্য সত্যতা স্বীকার করা, দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন, অপরিবর্তনীয় ও শর্তহীন সত্যতার স্বীকৃতি। ইমাম মালিক, আহমেদ শাফেই প্রমুখ (রহ.) অধিকাংশ সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞের মতে, ঈমানের পরিপূর্ণ সংজ্ঞা হলো—আল্লাহ ও রাসুলের আদেশ ও আদর্শকে অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা, কর্মে বাস্তবায়ন করা।
ঈমানের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে প্রিয় নবী বলেন, ‘সেই ব্যক্তি ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ বা তৃপ্তি পেয়েছে যে আল্লাহকে প্রতিপালক, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদকে (সা.) রাসুল রূপে লাভ করে সন্তুষ্ট’ (মুসলিম শরীফ)।
একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমান হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে পুরোপুরি নিজের জীবনে প্রতিফলিত করা। একজন প্রকৃত পরহেজগার ঈমানদার ব্যক্তি হওয়ার সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এক কথায় ইবাদত-বন্দেগি ও নেক আমলের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমান দৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত কোনো সত্ কার্যই ফলপ্রসূ হতে পারে না। কোনো কোনো মুমিন মুসলমানের ঈমান এমন সবল ও দৃঢ় যে, যত বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টই আসুক না কেন তারা কখনোই আল্লাহ তায়ালার ওপর বিশ্বাস হারান না। সব অবস্থাতেই তারা বলেন, আলহামদুল্লািহ।
বস্তুত আত্মার সম্পদ ও অহঙ্কার ঈমান। ঈমান কোনো ঠুনকো বিষয় নয়। এজন্য ঈমানকে বলতে পারি আত্মার জাগ্রত উপস্থিতি, বাস্তব কর্মে পরিপূর্ণ আলোর দিশারী, আর শান্তি ও মুক্তির মাপকাঠি। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ, আত্মনিবেদন, আপস, বিরোধ পরিহার। অর্থাত্ ইসলাম হলো বাহ্যিক কর্ম, কিন্তু ঈমান হলো আন্তরিক বিশ্বাস। ইসলাম হলো ঈমানের বাস্তবসম্মত বা ব্যবহারিক রূপ, অন্যদিকে ঈমান হলো একটি সামষ্টিক ধারণা। সত্ কর্মের আদেশ হলো ইসলাম, আর ঈমান এরই প্রাণশক্তি। ঈমান হলো একটি সৌধের সুদৃঢ় ভিত্তি আর ইসলাম হলো সৌধের সুরম্য সৌন্দর্যমণ্ডিত অবয়ব। বস্তুত ঈমান ও ইসলাম মিলেই মুসলমান।
ঈমান হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেখানে ঈমানের ভিত্তির কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে সব আমল হচ্ছে নিষম্ফল ও অর্থহীন। সুতরাং ঈমান ছাড়া কোনো কাজই সত্ কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে না।
জ্ঞান বা ইলমই হচ্ছে আমলের বুনিয়াদ। নির্ভুল জ্ঞান ছাড়া কোনো আমলই অভ্রান্ত হওয়া সম্ভব নয়। জানার নামই ঈমান নয়। কেননা খোদ ইবলিশ এবং অনেক কাফেরও রাসুলের (সা.) নবুয়তের সত্যতা আন্তরিকভাবে জানত, কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঈমানের পথই সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথ’ (সুরা হুদ ২৪)।
ঈমানদার ব্যক্তিকে মুত্তাকি বলা হয়। মুত্তাকি বা খোদাভীরুদের পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা বাকারার প্রথমেই আল্লাহপাক বলেন, ‘মুত্তাকি ব্যক্তি তারাই যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, আমি তাদের যে রুজি দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ নবী করিম (সা.) ইসলামকে পাঁচটি খুঁটির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঈমান তাঁবুর মধ্যবর্তী খুঁটিস্বরূপ। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত চারকোণার চারটি খুঁটিস্বরূপ। ঈমান না থাকলে কোনো নেক আমলই উপকারে আসবে না। যাদের সহিহ ঈমান আছে কিন্তু আমল ঠিক নেই, তারাও বিভিন্ন পর্যায়ে কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করার পর একদিন বেহেশতে যাবে; কিন্তু যাদের ঈমান ঠিক নেই তারা কোনো দিন বেহেশতে যাবে না যদিও তাদের নেক আমল থাকে। কাজেই আমলের চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা ঈমান ছাড়া হাজারো আমল একেবারেই মূল্যহীন। ঈমান মজবুত রাখার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করা প্রয়োজন। ঈমানের ওপরই আমল গ্রহণযোগ্য হওয়া না হওয়া নির্ভরশীল। যার ঈমান নেই তার কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না। ঈমানের পরিপূর্ণতা অনেকাংশে নির্ভর করে আমলের ওপর। কোরআন মানি, হাদিস মানি না—এমন কথা যারা বলে তাদের ঈমানদার বলা যাবে না। ঈমান ছাড়া ইলম বা বিদ্যা অর্থহীন। শুধু ইলম ঈমান সৃষ্টি করে না। ঈমান শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন নেক আমল। অবশ্যই প্রয়োজনীয় দ্বীনি এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। আল্লাহ ও রাসুলের কথাকে সরল অন্তকরণে বিনা যুক্তিতর্কে মানার নামই ঈমান।
হাদিসে আছে তোমাদের মধ্যে কেউই পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সব মানুষের চেয়ে আমি অধিক প্রিয় না হব (মুসলিম-বুখারি)। হজরত আলী (রা.) বলেন, ঈমান যখন অন্তরে প্রবেশ করে একটি শ্বেতবিন্দুর মতো দেখায়, অতঃপর যতই ঈমানের উন্নতি হয় শ্বেতবিন্দু সম্প্রসারিত হয়ে ওঠে। এমনকি শেষ পর্যন্ত গোটা অন্তরে নূরে ভরপুর হয়ে উঠে যায় (মাযহারি ৪ : ৩২৬ পৃ.)।
সারা জীবনের মধ্যে মানুষ যখনই তওবা করুক বা ঈমান আনুক না কেন, আল্লাহ তা কবুল করবেন। কিন্তু মৃত্যুকালে যখন মানুষের প্রাণ বের হতে থাকে তখন তওবাও কবুল হয় না, ঈমানও কবুল হয় না। হাদিস শরীফে আছে, ঈমানের সত্তর শাখা আছে—তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ অর্থাত্ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা (মিশকাত শরীফ ১-১২)।
আসলে মুখে কালিমা পড়াই যথেষ্ট নয়। বরং সর্বান্তকরণে কালিমার হক আদায় করতে হবে। ঈমান একটি গাছের মূলের মতো। আর এর কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও শিকড় হলো ইসলাম। ঈমান হলো অবিভাজ্য অখণ্ড বিশ্বাস এবং ইসলাম খণ্ড খণ্ড আমলের সমষ্টি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: