রোগের নাম বেলস্ পালসি

রোগের নাম বেলস্ পালসি


 

মানুষের মুখের মাংসপেশিগুলোর কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ু। ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুকে আবার সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভ বা স্নায়ু বলা হয়। মুখের প্যারালাইসিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো স্ট্রোক এবং সেরিব্রোভাসকুলার এক্সিডেন্ট, যা উপরের মটর স্নায়ু কোষের রোগ নামেও পরিচিত। যখন ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুর কার্যকারিতায় ব্যাঘাত ঘটে তখন সাধারণত মুখের এক পাশে প্যারালাইসিস ভাব হতে থাকে যা বেলস্ পালসি রোগ নামে পরিচিত। বেলস্ পালসিকে আবার মুখের নিচের মটর নিউরোন রোগও বলা হয়।

বেলস্ পালসি রোগে ফেসিয়াল নার্ভ বা স্নায়ুর প্রদাহ দেখা দেয়। মুখে ইডিমা বা ফোলা ভাব থাকে। মুখের স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়ে থাকে। বেলস্ পালসি রোগটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে আবার সংক্রমণের সঙ্গেও দেখা দিতে পারে। সাধারণত হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু অন্যান্য সংক্রমণ যেমন : এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণ, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, সাইটোমেগালি ভাইরাস, ভ্যারিসিলা জসটার ভাইরাস ইত্যাদি ভাইরাসের সংক্রমণের পর দেখা যেতে পারে। বেলস্ পালসি রোগে অবশ ভাব বা প্যারালাইসিস শুরু হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, যা সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। যদিও কানের পাশে এবং চোয়ালে ব্যথার সঙ্গে অনেক সময় প্যারালাইসিস হতে এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। এ রোগে সাধারণত মুখের এক পাশে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। রোগীর জিহ্বার স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। লালার প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে আসে। চোখের পানি আসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত এ অবস্থা ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগীদের মাঝে বেশি লক্ষ্য করা যায়। আবার বয়স বেশি হলেও একই সমস্যা দেখা যেতে পারে। রোগী মুখের অবশ ভাবের অভিযোগ করে থাকেন যদিও পরীক্ষা করলে দেখা যায় রোগীর অনুভূতি ঠিক আছে। প্রথম সপ্তাহে অসম্পূর্ণ মুখের প্যারালাইসিস হলে রোগটির চিকিত্সা সাধারণত সহজ হয়ে থাকে। শতকরা ৮৫ ভাগ রোগী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু কিছু রোগীর স্থায়ীভাবে কিছু প্যারালাইসিস বা অবশ ভাব থেকে যায়।

চিকিত্সা
সাধারণত কর্টিকোস্টেরয়েড বা প্রেডনিসোলন ট্যাবলেট দৈনিক ১ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি শরীরের ওজন হিসেবে ১০ দিন খেতে হবে। এর সঙ্গে এসাইক্লোভির গোত্রভুক্ত ট্যাবলেট ভাইরাক্স ৪০০ মিলিগ্রাম দৈনিক ৪টি করে ১০ দিন খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়। বেলস্ পালসি রোগটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কোনো উন্নতির লক্ষণ না দেখা যায় তাহলে ফেসিয়াল নার্ভে নির্দিষ্ট স্থানে অপারেশনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে এক্স-রে অথবা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে কোনো টিউমার আছে কি-না তা দেখে নিতে হবে। যদিও বেলস্ পালসি রোগ আপনার জীবনের বেল বা ঘণ্টা বাজাবে না, তবে জীবনের গতিপথ কিছুটা হলেও পরিবর্তন করবে। তাই এ ধরনের সমস্যায় কোনো অবহেলা না করে সঠিক এবং যথাযথ চিকিত্সা গ্রহণ করে স্বাভাবিক থাকুন।

Advertisements

উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন

উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন

ইসলাম ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান হচ্ছে মিরাছ বা উত্তরাধিকার সম্পদের সুষম বণ্টন। এই বিধানের গুরুত্ব ও তাত্পর্যের প্রধান দিক হচ্ছে এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেওয়া অকাট্য বিধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ ইনসাফপূর্ণ নীতিমালা, উত্তরাধিকার সম্পদে নারী-পুরুষ প্রত্যেকের ন্যায্য অধিকার লাভের একটি অলঙ্ঘনীয় প্রামাণ্য দলিল। তাই মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ তার জীবিত হকদার ওয়ারিশ বা আত্মীয়দের মাঝে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানমত সুষমরূপে বণ্টন করা ফরজ। যে কোনো ধরনের এই বিধানের সামান্যতম বিরোধিতা বা পরিবর্তন-পরিবর্ধন সরাসরি কোরআনি বিধানের লঙ্ঘন এবং খোদাদ্রোহিতার শামিল। আল্লাহতায়ালা নারী-পুরুষ উভয়ের স্রষ্টা। উভয়ের জন্য তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ইনসাফকারী, বিচারক এবং সবচেয়ে বেশি মেহেরবান-দয়ালু। সুতরাং উত্তরাধিকার সম্পদে কে কতটুকু হকদার, কে কার চেয়ে অধিকযোগ্য, কে কার চেয়ে অগ্রাধিকার লাভের অধিকারী—এ ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি অবগত। অতীত-ভবিষ্যত্, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। মিরাছের খোদায়ী বিধানেও কম-বেশি হিস্যা নির্ধারণ করার রহস্য ও অন্তর্নিহিত তাত্পর্য একমাত্র আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন। তাই প্রত্যেক নর-নারীর প্রধান কর্তব্য হলো বিনাবাক্যে, বিনয়চিত্তে আল্লাহর বিধানের প্রতি সমর্পিত হওয়া। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারিমে উত্তরাধিকার বিধান নাজিল করার পর আনুগত্যকারী ও অবাধ্যতাকারীদের পরিণাম সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটাই মহা সাফল্য। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। সুরা নিসা, আয়াত : ১৩-১৪
বর্তমান সময়ে ধর্মীয় বিবেচনায় আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা বা চরম অন্যায়মূলক বিষয় হলো মিরাছ বা উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টন না করা। মাশাআল্লাহ কিছু সচেতন দ্বীনদার লোক ছাড়া শিক্ষিত-অশিক্ষিত, দ্বীনদার-বেদ্বীনদার সর্বশ্রেণীর লোকই এই কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত। কেউ তো এই ফরজ কর্তব্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে আবার কেউ জেনে-বুঝে ধন-সম্পদের মোহে মোহগ্রস্ত হয়ে শরিয়তের বিধানরূপে উত্তরাধিকার সম্পদ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করে না। একদিকে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মিরাছ বণ্টন করা হয় না, উত্তরাধিকারীদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করা হয় না। বিশেষত নারী ওয়ারিশদের তাদের প্রাপ্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়। অন্যদিকে সরকার ‘উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমানাধিকার’ বা ‘সম্পদে নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারী দেয়া’র নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। মিরাছ বণ্টন না করা এবং কোরআনবিরোধী মিরাছি নীতিমালা প্রণয়ন করা উভয়টি কোরআনের বিধান তথা আল্লাহর হুকুমের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। যারা এসব করছে তারা যদি অন্যায় ও গুনাহের কাজ জানা-বুঝার পরও তা করে, তাহলে তারা ফাসেকি ও কবিরা গুনাহে লিপ্ত। তওবা ছাড়া যার ক্ষমা নেই। আর যদি কোরআনি বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা, বেপরোয়া মনোভাব ও অস্বীকারের কারণে হয় তাহলে তো তা সুষ্পষ্ট কুফরি। কারণ কোরআনের উত্তরাধিকার বিধানকে আল্লাহতায়ালা সরাসরি ফরজ কর্তব্য অর্থাত্ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হিস্যা ও অবধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজনের ওপর কোরআন-হাদিসের আলোকে চারটি হক শরিয়তের পক্ষ থেকে আরোপিত হয়। মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিকভাবে এ চারটি হক সম্পৃক্ত হবে এবং ক্রমানুসারে আদায় করা হবে। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে শরিয়তানুযায়ী তার কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহ করা হবে। এ ক্ষেত্রে অপব্যয় ও কৃপণতা উভয়টি নিষিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। যদি ঋণ সম্পত্তির সমপরিমাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি হয়, তবে কেউ ওয়ারিশি স্বত্ব পাবে না। তৃতীয়ত, ঋণ পরিশোধের পর এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে অছিয়ত কার্যকর করা হবে। বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করে বলছি। যদি ঋণ পরিশোধের পর সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকে কিংবা ঋণ একেবারেই না থাকে, তখন মৃত ব্যক্তি কোনো অছিয়ত করে থাকলে এবং তা গুনাহের অছিয়ত না হলে, তবে অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ থেকে তা কার্যকর করা হবে। যদি সে তার সব সম্পত্তি অছিয়ত করে যায়, তবুও এক-তৃতীয়াংশের অধিক অছিয়ত কার্যকর হবে না। চতুর্থত, ঋণ পরিশোধের পর অছিয়ত না থাকলে সব সম্পত্তি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। মিরাছি সম্পত্তি যেমন ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টন করা ফরজ তেমনি তা সহীহ শুদ্ধরূপে শরিয়তসম্মত নিয়মে বণ্টন করা ও বণ্টনের নিয়ম পদ্ধতি জানাও ফরজ। যদি কেউ বণ্টন পদ্ধতি না জানে, তবে ফারায়েজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেম বিশেষত অভিজ্ঞ মুফতিদের মাধ্যমে তা বণ্টন করে নিতে হবে। বর্তমান যুগে কোরআনের এই ফরজ বিধানের প্রতি ঘরে চরম অবহেলা ও উদাসীনতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি যার কব্জায় বা মালিকানায় থাকে, সে এককভাবে সেই সম্পত্তি ভোগ করে, নিজের আয়ত্তে জবরদখল করে রাখে এবং অন্যান্য হকদার ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে রাখে। সে মৃত ব্যক্তির বাবা হোক বা বড় ছেলে বা স্ত্রী কিংবা অন্য কেউ। তারা কেউ একটু ভেবেচিন্তেও দেখে না। সে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন করা ফরজ। ওয়ারিশদের তাদের প্রাপ্য হক না দেয়া বড় জুলুম ও কবিরা গুনাহ। মিরাছের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন করার একটি ঘৃণ্য দিক হচ্ছে নারীদের তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। অনেক জায়গায় অনেক ধরনের কু-প্রথা ও নানা অনৈসলামিক অজুহাতে তাদের প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত করা হয়। এই অপরাধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে মেয়েরা। মৃত ব্যক্তির মেয়ে বা বোনদের মাহরুম করা। অথচ আল্লাহ পাক কোরআনে কারিমে নারীদের মিরাছে তাদের ন্যায্য হিস্যা প্রদান করেছেন। বিশেষত মেয়েদের তাদের অংশ দেয়ার প্রতি এতটুকু গুরুত্ব আরোপ করেছেন, মেয়েদের অংশকে মিরাছের আসল সাব্যস্ত করেছেন। এর অনুপাতে ছেলেদের অংশ নির্ণয় করেছেন। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। এ কথা বলা হয়নি, দুই মেয়ের অংশ এক ছেলের অংশের সমপরিমাণ। এটা কত জঘন্য অপরাধ যে আল্লাহতায়ালা যাদের মিরাছের মৌলিক ভিত্তি বানিয়েছেন, তাদেরই মিরাছ থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমাদের সমাজে অনেকেই বোনদের অংশ দেয় না এবং তারা বোনদের কাছে ক্ষমা চেয়ে মিরাছের হিস্যা মাফ করিয়ে নেয়। আর বোনরাও একথা চিন্তা করে পাওয়া যখন যাবেই না, উপরন্তু ভাইয়েরা অসন্তুষ্ট হবে, তখন চাওয়ার দরকার কি! ফলে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে ক্ষমা করে দেয়। মনে রাখতে হবে, এরূপ ক্ষমা শরিয়তের আইনে ক্ষমাই নয়, বরং এটা জাহেলি কু-প্রথা। এ ক্ষেত্রে বোনদের কর্তব্য হলো—নিজেদের মিরাছি হক দাবি করা। তাদের প্রাপ্য অধিকার চেয়ে নেয়া। তারা কারও অসন্তুষ্টি ও নিন্দার পরোয়া করবে না। নিজেরা সচ্ছল বলে কোরআনি হিস্যা দাবি করা থেকে বিরত থাকবে না। বরং প্রয়োজন না থাকলেও নিজেদের হক আদায় করে নেবে। যাতে সমাজ থেকে এই ইসলামবিরোধী কু-প্রথা বিলুপ্ত হয় এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের সমাজে নারীদের মিরাছ থেকে বঞ্চিত করার জাহেলি নীতি নানা অজুহাত ও বিভিন্ন উপায়ে প্রয়োগ করা হয়। বিশেষত মেয়ের বিয়েতে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী যৌতুক হিসেবে প্রদানের কারণে কিংবা ভাইয়েরা বোনদের বিভিন্ন উপলক্ষে নানা উপহার সামগ্রী প্রদানের অজুহাতে মেয়েদের মিরাছি সম্পত্তি দেয়া হয় না। এরপর বোনরা মিরাছ দাবি করলে বা মিরাছের হিস্যা নিয়ে গেলে তাদের জন্য বাপের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয়। ভাইবোনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ চরম অন্যায়, অমানবিক ও কঠিন গুনাহের কাজ। মনে রাখতে হবে বিয়েতে বা বিয়ের পরে কন্যাকে যতভাবে যত অঢেল সম্পদই প্রদান করা হোক, তা উপহার বা হাদিয়া রূপে গণ্য। যাকে আত্মীয়তার হক বলা যেতে পারে। মিরাছের হিস্যার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণে কোনো ভাবেই মিরাছের হক থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তাদের মিরাছি হক আদায় না করা পর্যন্ত তাদের অধিকার কখনও শেষ হবে না। যৌতুক বা উপহার প্রদানের অজুহাতে মিরাছ না দেয়া বড় জুলুম এবং সম্পূর্ণ হারাম কাজ।

ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান শান্তি-সাফল্যের ভিত

ঈমান আরবি শব্দ ও ইসলামী পরিভাষা। যার আরবি প্রতিশব্দ তাসদিক অর্থাত্ অকাট্য সত্যতা স্বীকার করা, দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন, অপরিবর্তনীয় ও শর্তহীন সত্যতার স্বীকৃতি। ইমাম মালিক, আহমেদ শাফেই প্রমুখ (রহ.) অধিকাংশ সত্যপন্থী বিশেষজ্ঞের মতে, ঈমানের পরিপূর্ণ সংজ্ঞা হলো—আল্লাহ ও রাসুলের আদেশ ও আদর্শকে অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা, কর্মে বাস্তবায়ন করা।
ঈমানের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে প্রিয় নবী বলেন, ‘সেই ব্যক্তি ঈমানের পরিপূর্ণ স্বাদ বা তৃপ্তি পেয়েছে যে আল্লাহকে প্রতিপালক, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদকে (সা.) রাসুল রূপে লাভ করে সন্তুষ্ট’ (মুসলিম শরীফ)।
একজন খাঁটি ঈমানদার মুসলমান হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে পুরোপুরি নিজের জীবনে প্রতিফলিত করা। একজন প্রকৃত পরহেজগার ঈমানদার ব্যক্তি হওয়ার সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। এক কথায় ইবাদত-বন্দেগি ও নেক আমলের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। ঈমান দৃঢ় না হওয়া পর্যন্ত কোনো সত্ কার্যই ফলপ্রসূ হতে পারে না। কোনো কোনো মুমিন মুসলমানের ঈমান এমন সবল ও দৃঢ় যে, যত বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টই আসুক না কেন তারা কখনোই আল্লাহ তায়ালার ওপর বিশ্বাস হারান না। সব অবস্থাতেই তারা বলেন, আলহামদুল্লািহ।
বস্তুত আত্মার সম্পদ ও অহঙ্কার ঈমান। ঈমান কোনো ঠুনকো বিষয় নয়। এজন্য ঈমানকে বলতে পারি আত্মার জাগ্রত উপস্থিতি, বাস্তব কর্মে পরিপূর্ণ আলোর দিশারী, আর শান্তি ও মুক্তির মাপকাঠি। ইসলাম শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মসমর্পণ, আত্মনিবেদন, আপস, বিরোধ পরিহার। অর্থাত্ ইসলাম হলো বাহ্যিক কর্ম, কিন্তু ঈমান হলো আন্তরিক বিশ্বাস। ইসলাম হলো ঈমানের বাস্তবসম্মত বা ব্যবহারিক রূপ, অন্যদিকে ঈমান হলো একটি সামষ্টিক ধারণা। সত্ কর্মের আদেশ হলো ইসলাম, আর ঈমান এরই প্রাণশক্তি। ঈমান হলো একটি সৌধের সুদৃঢ় ভিত্তি আর ইসলাম হলো সৌধের সুরম্য সৌন্দর্যমণ্ডিত অবয়ব। বস্তুত ঈমান ও ইসলাম মিলেই মুসলমান।
ঈমান হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেখানে ঈমানের ভিত্তির কোনো অস্তিত্ব নেই, সেখানে সব আমল হচ্ছে নিষম্ফল ও অর্থহীন। সুতরাং ঈমান ছাড়া কোনো কাজই সত্ কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে না।
জ্ঞান বা ইলমই হচ্ছে আমলের বুনিয়াদ। নির্ভুল জ্ঞান ছাড়া কোনো আমলই অভ্রান্ত হওয়া সম্ভব নয়। জানার নামই ঈমান নয়। কেননা খোদ ইবলিশ এবং অনেক কাফেরও রাসুলের (সা.) নবুয়তের সত্যতা আন্তরিকভাবে জানত, কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঈমানের পথই সিরাতে মুস্তাকিম বা সরল পথ’ (সুরা হুদ ২৪)।
ঈমানদার ব্যক্তিকে মুত্তাকি বলা হয়। মুত্তাকি বা খোদাভীরুদের পরিচয় দিতে গিয়ে সূরা বাকারার প্রথমেই আল্লাহপাক বলেন, ‘মুত্তাকি ব্যক্তি তারাই যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, আমি তাদের যে রুজি দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ নবী করিম (সা.) ইসলামকে পাঁচটি খুঁটির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঈমান তাঁবুর মধ্যবর্তী খুঁটিস্বরূপ। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত চারকোণার চারটি খুঁটিস্বরূপ। ঈমান না থাকলে কোনো নেক আমলই উপকারে আসবে না। যাদের সহিহ ঈমান আছে কিন্তু আমল ঠিক নেই, তারাও বিভিন্ন পর্যায়ে কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করার পর একদিন বেহেশতে যাবে; কিন্তু যাদের ঈমান ঠিক নেই তারা কোনো দিন বেহেশতে যাবে না যদিও তাদের নেক আমল থাকে। কাজেই আমলের চেয়ে ঈমানের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা ঈমান ছাড়া হাজারো আমল একেবারেই মূল্যহীন। ঈমান মজবুত রাখার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করা প্রয়োজন। ঈমানের ওপরই আমল গ্রহণযোগ্য হওয়া না হওয়া নির্ভরশীল। যার ঈমান নেই তার কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য হয় না। ঈমানের পরিপূর্ণতা অনেকাংশে নির্ভর করে আমলের ওপর। কোরআন মানি, হাদিস মানি না—এমন কথা যারা বলে তাদের ঈমানদার বলা যাবে না। ঈমান ছাড়া ইলম বা বিদ্যা অর্থহীন। শুধু ইলম ঈমান সৃষ্টি করে না। ঈমান শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন নেক আমল। অবশ্যই প্রয়োজনীয় দ্বীনি এলেম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। আল্লাহ ও রাসুলের কথাকে সরল অন্তকরণে বিনা যুক্তিতর্কে মানার নামই ঈমান।
হাদিসে আছে তোমাদের মধ্যে কেউই পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যে পর্যন্ত তোমাদের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্তুতি এবং সব মানুষের চেয়ে আমি অধিক প্রিয় না হব (মুসলিম-বুখারি)। হজরত আলী (রা.) বলেন, ঈমান যখন অন্তরে প্রবেশ করে একটি শ্বেতবিন্দুর মতো দেখায়, অতঃপর যতই ঈমানের উন্নতি হয় শ্বেতবিন্দু সম্প্রসারিত হয়ে ওঠে। এমনকি শেষ পর্যন্ত গোটা অন্তরে নূরে ভরপুর হয়ে উঠে যায় (মাযহারি ৪ : ৩২৬ পৃ.)।
সারা জীবনের মধ্যে মানুষ যখনই তওবা করুক বা ঈমান আনুক না কেন, আল্লাহ তা কবুল করবেন। কিন্তু মৃত্যুকালে যখন মানুষের প্রাণ বের হতে থাকে তখন তওবাও কবুল হয় না, ঈমানও কবুল হয় না। হাদিস শরীফে আছে, ঈমানের সত্তর শাখা আছে—তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ অর্থাত্ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা (মিশকাত শরীফ ১-১২)।
আসলে মুখে কালিমা পড়াই যথেষ্ট নয়। বরং সর্বান্তকরণে কালিমার হক আদায় করতে হবে। ঈমান একটি গাছের মূলের মতো। আর এর কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ও শিকড় হলো ইসলাম। ঈমান হলো অবিভাজ্য অখণ্ড বিশ্বাস এবং ইসলাম খণ্ড খণ্ড আমলের সমষ্টি।

%d bloggers like this: