হালাল ও হারামের বিধান

হালাল হারামের বিধান

ইসলামী আইন-কানুন ও আচার-আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো হালাল ও হারামের বিধিবিধান। কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা এসেছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে যেসব কাজের অনুমতি রয়েছে এবং সে সম্বন্ধে কোনো নিষেধবাণী নেই, তাকে হালাল বা বৈধ বলে। এটি হারামের বিপরীত। হালাল দ্রব্যাদি দুনিয়ায় অফুরন্ত যা গণনা করে শেষ করা যাবে না। পক্ষান্তরে, হারাম দ্রব্য সীমিত। এরপরও বহু মানুষকে দেখা যায় হালাল বাদ দিয়ে হারাম দ্রব্যাদির দিকে নাক গলাতে। বস্তুত হারাম তো তা-ই, যা ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামের নিষিদ্ধ বস্তু বা কাজ তিন পর্যায়ে বিভক্তঃ (ক) হারাম (খ) মাকরুহ তাহরিমি ও (গ) মাকরুহ তানজিহি।

হালাল কাজ যেমন­ আল্লাহ ও রাসূলের সাঃ নির্দেশিত পন্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য করা, লেনদেন করা, বিবাহ-শাদি করা ইত্যাদি। হালাল বস্তু যেমন­ কোনো হালাল প্রাণীর গোশত, হালাল খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। গৃহপালিত পশুপাখি যেমন­ গরু, ছাগল, মেষ, দুম্বা, উট, হাঁস-মুরগি, কবুতর ইত্যাদি আল্লাহর নামে জবেহ করে এর গোশত খাওয়া হালাল। উল্লেখ্য, এ পর্যায়ে মোবাহ নামের একটি পরিভাষা আছে। যে কাজ করলে কোনো গুনাহ হয় না এবং না করলে কোনো অন্যায় হয় না, তাকে মুবাহ বলে। ইসলামী আইনে মুবাহকে জায়েজ বা সিদ্ধ কাজ বলে।

হারাম শব্দটি যেমন হালালের বিপরীত তেমনি ফরজেরও বিপরীত। হারাম কাজ জেনেশুনে করলে কঠোর গুনাহ হবে। আর হারামকে হালাল মনে করে সম্পাদন করলে অথবা কোনো হারাম বস্তু বা কাজকে হারাম হওয়া অস্বীকার করলে কুফর বা চরম আইন অমান্যকারী ইসলামদ্রোহী বলে গণ্য হতে হয়। নি্নে কতগুলো হারাম বস্তু ও কাজ উপস্থাপন করা হলোঃ (১) মরা জীবজন্তু খাওয়া হারাম, কিন্তু মরা মাছ খাওয়া হালাল (২) রক্ত হারাম (৩) শূকরের গোশত খাওয়া হারাম (৪) মানুষের গোশত খাওয়া হারাম (৫) যেসব প্রাণীকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়েছে তার গোশত হারাম (৬) যেসব হালাল জীবজন্তুকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে অথবা পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে কিংবা কোনো হালাল প্রাণী ওপর থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে অথবা ভোঁতা অস্ত্র দ্বারা হত্যা করা হয়েছে কিংবা কোনো হালাল প্রাণীকে হিংস্র প্রাণী মেরে ফেলেছে এরূপ প্রাণীর গোশত হারাম (৭) হিংস্র প্রাণী, যেমন­ সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক, শিয়াল, কুকুর ইত্যাদি এবং হিংস্র পাখির গোশতও হারাম, যেমন­ বাজ, চিল ইত্যাদি (৮) যেসব প্রাণী সাধারণত নাপাক ও মরা জীবজন্তু খেয়ে বাঁচে তাও হারাম যেমন- কাক, চিল ও শকুন ইত্যাদি। যেসব প্রাণী গর্তে বাস করে তাও হারাম, যেমন- শজারু, গুইসাপ ইত্যাদি (১০) যেসব প্রাণী কষ্টদায়ক, বিষাক্ত ও ক্ষতিকর তাও হারাম যেমন­ সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি (১১) গাধা, খচ্চর এবং হাতির গোশত হারাম (১২) মাছ ব্যতীত সব জলজপ্রাণী খাওয়া হারাম (১৩) যেসব পানীয় দ্রব্য মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটায় ও উন্মাদনা সৃষ্টি করে তাও হারাম যেমন­ মদ, আফিম, গাঁজা। একইভাবে অবৈধ কারো অধিকার হরণ করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, সুদ ও ঘুষ খাওয়া হারাম। মানব জীবনে হালাল বস্তু গ্রহণের ফায়দা ও উপকারিতা অপরিসীম। শরিয়ত মানুষের কল্যাণই চায়। আমরা যেসব বস্তু খেয়ে থাকি তার সার পদার্থ আমাদের দেহের শিরা-উপশিরায় পৌঁছে দেহকে সবল ও সতেজ করে। খাদ্য ও পানীয় বস্তুতে এমন কিছু উপাদান আছে, যা মানুষের সুস্থ মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটায় এবং উন্মাদনা সৃষ্টি করে, স্মৃতিশক্তি লোপ করে দেয়। কাজেই ওসব আহার্য আমাদের জন্য সম্পূর্ণ অবৈধ। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণার দ্বারা হিংস্র প্রাণীর দেহে এমন সব জীবাণু আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলো মানবদেহের পক্ষে ক্ষতিকর। কাজেই এসব প্রাণীও আমাদের জন্য হালাল হতে পারে না। আগেই বলেছি, ইসলামের নিষিদ্ধ ব্যাপারগুলো তিন পর্যায়ের হারাম, মাকরুহ তাহরিমি ও মাকরুহ তানজিহি। মাকরুহ অর্থ খারাপ বা নিন্দনীয়। তাহরিমি অর্থ হারামকারী অর্থাৎ যে মাকরুহ হারামের কাছাকাছি। যেসব কাজ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই, তবে কোনো কোনো হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাকে মাকরুহ তাহরিমি বলে। এটি হারামের কাছাকাছি বলে বর্জনীয়। একে হালাল জ্ঞান করা ভীষণ অপরাধ তবে কাফির হবে না। এটি ওয়াজিবের বিপরীত, যেমন­ কিবলার দিকে মুখ করে প্রস্রাব, পায়খানা করা ইত্যাদি। যেসব কাজ শরিয়তের দৃষ্টিতে ঘৃণাজনক কিন্তু এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, বরং পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাকে মাকরুহ তানজিহি বলে। আদর্শ মুসলমানেরা মাকরুহ তানজিহিও পরিত্যাগ করেন।

হালাল-হারামের বিধান দিতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, হে মানবমণ্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু সামগ্রী ভক্ষণ করো আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো এ নির্দেশই তোমাদের দেবে যে, তোমরা অন্যায় ও অশ্লীল কাজ করতে থাকো এবং আল্লাহর প্রতি এমন সব বিষয়ে মিথ্যারোপ করা, যা তোমরা জান না। আর যখন তাদের কেউ বলে যে, সেই হুকুমেরই আনুগত্য করো, যা আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেছেন। তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সেই বিষয়েরই অনুসরণ করব যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের দেখেছি। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছুই জানত না, জানত না সরল পথও। বস্তুত এহেন কাফেরদের উদাহরণ­ এমন যেন কেউ এমন জীবকে আহ্বান করছে­ যা কোনো কিছুই শোনে না, হাঁক-ডাক আর চিৎকার ছাড়া বধির মূক ও অন্ধ। সুতরাং তারা কিছুই বুঝে না। হে ঈমানদার, তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুজি হিসেবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা তাঁরই বন্দেগি করো। (সূরা বাকারা)।

‘হাল’ বা হালাল শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো গিঁট খোলা। যেসব বস্তুসামগ্রীকে মানুষের জন্য হালাল বা বৈধ করে দেয়া হয়েছে, তাতে যেন একটা গিঁট খুলে দেয়া হয়েছে এবং সেগুলোর ওপর থেকে বাধ্যবাধকতা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হজরত সাহল ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, মুক্তি বা পরিত্রাণ লাভ তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীলঃ ১. হালাল খাওয়া, ২. ফরজ আদায় করা ও ৩. রাসূলে করিম সাঃ­ এর সুন্নাতগুলোর আনুগত্য ও অনুসরণ করা (মা’আরিফ-অখণ্ড-৮৪)।

সূরা বাকারার উদ্ধৃত আয়াতে যেমন হারাম খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে হালাল ও পবিত্র বস্তু খেতে এবং তা খেয়ে শুকরিয়া আদায় করতে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। কেন না, হারামে মন্দ অভ্যাস সৃষ্টি হয়, ইবাদতে আগ্রহ স্তিমিত হয়ে যায় এবং দোয়া কবুল হয় না। হালাল খানায় অন্তরে এক প্রকার নূর সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে অন্যায়-অসচ্চরিত্রতার প্রতি ঘৃণাবোধ এবং সততার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়; ইবাদত-বন্দেগির প্রতি অধিকতর মনোযোগ আসে, পাপের কাজে মনে ভয় আসে এবং দোয়া কবুল হয়। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর সমস্ত নবী-রাসূলগণের প্রতি হেদায়েত করেছেন যে, ইয়া আয়ুøহাল রুসুলু কুলু মিনাত তোয়াইয়্যিবাতি ওয়ামিল সোয়ালিহা­ আমার রাসূলগণ। তোমরা পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করো এবং নেক আমল করো। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, নেক আমলের ব্যাপারে হালাল খাদ্যের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনুরূপ হালাল খাদ্য গ্রহণে দোয়া কবুল হওয়ার আশা এবং হারাম খাদ্যের প্রতিক্রিয়ায় তা কবুল না হওয়ার আশঙ্কাই থাকে বেশি। হজরত সাঃ ইরশাদ করেছেন, বহু লোক দীর্ঘ সফর করে আসে এবং অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে বলতে থাকেঃ ইয়া পরওয়ারদিগার, ইয়া রব…, কিন্তু যেহেতু সে ব্যক্তির পানহারসামগ্রী হারাম উপার্জনের, পরিধেয় পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত-এমতাবস্থায়, তার দোয়া কী করে কবুল হতে পারে? (মুসলিম, তিরমিজি- ইবনে কাসিরের বরাতে)।

Advertisements

One Response to “হালাল ও হারামের বিধান”


মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: