গুনাহ থেকে পরিত্রাণের উপায়

গুনাহ থেকে পরিত্রাণের উপায়

বর্তমান যুগে নেককর্মের ব্যাপারে মানুষ খুবই অমনোযোগী এবং পাপের কাজের প্রতি খুবই অনুরাগী। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের দাবিতে মুসলমান। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা গুনাহের মধ্যে আপাদমস্তক হাবুডুবু খাচ্ছে। পাপাচারিতায় মানুষ এতটা অগ্রগামী যে, পাপকাজ বর্জন করার কথা এবং তা থেকে তাওবা-ইস্তেগফার করার কথা মনে উদয়ই হয় না। বরং অনেকে মনে করে যে, এত গুনাহ ও পাপাচারিতার পর কি আল্লাহ ক্ষমা করবেন? তাওবা করলে কি কবুল হবে? মহান রাব্বুল আলামিন অসীম দয়ালু, তিনি গুনাহ ক্ষমাকারী, তাওবা কবুলকারী ও কঠিন শাস্তিদাতা। গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, তাওবার দরজা সব সময় খোলা। আল্লাহ নিজেই বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ [সূরা জুমার-৫৩]।

গুনাহঃ আল্লাহর বাণী রাসূল সাঃ-এর হাদিস ও অন্যান্য পুণ্যবান জ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের বর্ণনা অনুযায়ী যেসব কাজ সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ তার উল্লেখযোগ্য কতগুলো গুনাহ সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো­

শিরক করাঃ আল্লাহর সাথে শিরক করা মহাপাপ কেননা আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন­ ‘নিশ্চয়ই শিরক হলো বড় জুলুম।’ [সূরা লোকমান-১৩]।

তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম।’ [সূরা আল মায়েদা-৭২]।

নিয়মিত নামাজ না পড়া ও ইচ্ছা করে নামাজ ত্যাগ করাঃ নামাজ বেহেশতের চাবি। নামাজ পরিত্যাগকারীর জন্য রয়েছে পরকালে কঠিন শাস্তি। আল্লাহপাক এরশাদ করেন­ ‘দুর্ভাগ্য সেই সব নামাজির, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন।’ [সূরা মাউন-৪, ৫]।

হাদিস শরিফে এসেছে­ হজরত আবু দারদাহ রাঃ বলেন, আমার বন্ধু আমাকে উপদেশ দিয়েছেন যে, তোমাকে যদি টুকরা টুকরাও করা হয় অথবা আগুনে জ্বালানো হয়, তবুও তুমি আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। আর ইচ্ছাপূর্বক ফরজ নামাজ পরিত্যাগ করবে না। যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে নামাজ পরিত্যাগ করে তার ওপর থেকে আল্লাহর দায়দায়িত্ব রহিত হয়। [ইবনে মাজাহ]।

? জাকাত না দেয়াঃ জাকাত মালকে পবিত্র ও বৃদ্ধি করে। জাকাত আদায় না করা জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর দেয়া সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করে, তাদের এ কাজকে তাদের জন্য কল্যাণকর মনে করো না। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যে সম্পদ নিয়ে তারা কার্পণ্য করত তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় ঝোলানো হবে।’ [আল-ইমরান-১৮০]।

জাকাত না দেয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেন, ‘যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে তার জাকাত দিলো না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদ একটি বিষধর সাপে পরিণত হয়ে গলা পেঁচিয়ে থাকবে এবং তার দুই চোয়ালে কামড়িয়ে ধরে বলবে আমি তোর সম্পদ। আমি তোর পুঁজি।’ [সহিহ আল বুখারি]।

? রমজানের রোজা পরিত্যাগ করাঃ রমজানের রোজা রাখা ফরজ। বিনা ওজরে রমজানের রোজা পরিত্যাগ করা কঠোর গুনাহ ও গুনাহে কবিরা। আল্লাহ পাকের ঘোষণা, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তêীদের দেয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পার। [বাকারাঃ ১৮৩]।

রাসূল সাঃ এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে দিনের বেলা শরিয়তের অনুমতি ব্যতিরেকে ও রোগব্যাধি ছাড়া পানাহার করে, তার পরিবর্তে সারা জীবন রোজা রাখলেও তার কাজা আদায় হয় না। যদিও সে রোজা রাখে।’ [তিরমিজি, আবু দাউদ]।

? সামর্থø থাকা সত্ত্বেও হজ না করাঃ আল্লাহর বাণী, ‘যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থø রাখে, তার ওপর হজ করা ফরজ।’ [সূরা আল ইমরান-৯৭]।

? মা-বাবার অবাধ্য হওয়া ও তাদের কষ্ট দেয়াঃ মা-বাবা হলো সন্তানের জন্য সবচেয়ে আপনজন। তাদের মনে কষ্ট দিয়ে বা তাদের সাথে বেয়াদবি করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব নয়। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না ও মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে উহ! বলো না এবং ধমক দিয়ো না। তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলবে। [সূরা বনি ইসরাইল-২৩]।

আল্লাহ পাক আরো বলেন, তুমি আমার কাছে কৃতজ্ঞ হও এবং তোমার মা-বাবার সাথেও কৃতজ্ঞ হও। [লুকমান-১৪]।

আত্মহত্যা করাঃ আত্মহত্যা একটি বড় গুনাহ। জীবন দান করেছেন আল্লাহ, জীবন নেবেনও তিনি। এতে কারো হাত নেই। আত্মহত্যাকারীর জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। এরশাদ হচ্ছে­ ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়ালু। আর যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি ও জুলুমের মাধ্যমে এ কাজ করবে, তাকে আমি আগুনে পোড়াব। এ কাজ আল্লাহর কাছে সহজ।’ [আন নিসা]।

মদ্যপান ও জুয়া খেলাঃ মদ্যপান ও জুয়া খেলা জঘন্য অপরাধ। এদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব। আল্লাহর ঘোষণা, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, দেবতার নামে বেদিতে বলি দেয়া ও লটারির মাধ্যমে ভাগ্য গণনা শয়তানের নোংরা কাজ। এসব থেকে দূরে থাকো। তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।

সুদের আদান-প্রদানঃ মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায়, তোমরা সাফল্য লাভ করবে।’ [আল ইমরান-১৩০]।

সুদের ভয়াবহতা হাদিস শরিফে এভাবে এসেছেঃ ‘রাসূল সাঃ বলেন, মিরাজের রাতে আমি আমার মাথার ওপরে সপ্তম আকাশে প্রচণ্ড তর্জন-গর্জনের শব্দ শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি, সেখানে কিছু লোক রয়েছে, যাদের ভুঁড়ি তাদের সামনে বেরিয়ে আছে। ভুঁড়িগুলো বড় বড় একটা ঘরের মতো। সেই সব ঘরে হাজার হাজার সাপ, বিচ্ছু্‌ এসব পেটের বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এরা কারা? জিব্রাইল বললেন, এরা সুদখোর।’ [আহমাদ]।

রাসুল সাঃ আরো বলেন, সুদের ৭০টি গুনাহ। এর মধ্যে সর্বনি্ন গুনাহ হলো আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করার সমান।’ [ইবনে মাজাহ]।

ধ্বংসকারী সাতটি গুনাহঃ রাসূল সাঃ বলেছেন­ ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহের কাজ পরিত্যাগ করো। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সেই ধ্বংসকারী গুণাহগুলো কী কী? নবী করিম সাঃ বললেন, তা হলো ১. আল্লাহ তায়ালার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করা ২. জাদু শিক্ষা করা ও আমল করা ৩. যে প্রাণীকে হত্যা করা আল্লাহ তায়ালা নিষিদ্ধ করেছেন, তাকে হত্যা করা, তবে ন্যায়ানুগ পন্থায় করা যায়; ৪. সুদ খাওয়া ৫. এতিমের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে আহার করা ৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা। ৭. কোনো মুমিনা সতিসাধ্বী মহিলার নামে (ব্যভিচারির) মিথ্যা অপবাদ দেয়া।’ [বুখারি, মুসলিম]।

এ ছাড়াও আরো উল্লেখযোগ্য কতগুলো কবিরা গুনাহ হলোঃ ব্যভিচার করা, এতিমের ওপর জুলুম করা, আল্লাহ ও রাসূলের ওপর মিথ্যা আরোপ করা, চুরি করা, ডাকাতি করা, জুলুম করা, মিথ্যা শপথ করা, হারাম খাওয়া ও হারাম উপার্জন করা, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনকে পরিত্যাগ করা, অহঙ্কার করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করা, প্রস্রাব থেকে যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জন না করা, অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ কাজ করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, মানুষের গোপনীয় দোষ জানার চেষ্টা করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া, ওজনে কম দেয়া, দুর্বল শ্রেণী­ দাসদাসী, চাকর-বাকর ও জীবজন্তুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করা। প্রাণীর প্রতিকৃতি বা ছবি আঁকা, ওয়াদা খেলাপ করা, বিনা ওজরে জামাত ত্যাগ করা ও একাকী নামাজ পড়া, পুরুষেরা স্বর্ণ ও রেশমি কাপড় পরা। ভবিষ্যদ্বক্তা ও জ্যোতিষীর কথা বিশ্বাস করা, সৎ ও খোদাভীরু বান্দাকে কষ্ট দেয়া, কোনো সাহাবিকে গালি দেয়া। আল্লাহ ছাড়া কারো নামে জন্তু জবাই করা­ এগুলো সবই কবিরা গুনাহ।

তাওবাঃ তাওবা আরবি শব্দ। এর অর্থ অনুশোচনা, অনুতাপ, প্রত্যাবর্তন, ক্ষমা, ফিরে আসা।

পরিভাষায় অতীতের কৃত গুনাহের কথা স্মরণ করে তার ওপর অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্পকে তাওবা বলে।

তাওবা করতে হবে খাঁটি মনে, দৃঢ়ভাবে, তাওবা করার পর ওই অন্যায় কাজে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাওবা কবুল করবেন। কারণ তিনি অতি দয়ালু, ক্ষমাশীল ও তাওবা কবুলকারী।

তাওবা কবুলের অঙ্গীকার ও তাওবা করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহপাক বলেন­ ‘আল্লাহ তায়ালা এমন দয়ালু যে, তিনি নিজ বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন। তোমরা যা কিছু করছ তাও তিনি জানেন। যারা ঈমান আনে ও সে অনুযায়ী আমল করে তাদের ইবাদতকে তিনি কবুল করেন। আর স্বীয় নেয়ামত ও অনুদান থেকে বিপুল পরিমাণে দান করেন। আর যারা কুফরি করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। [আশ-শুরা ২৫-২৬]। তিনি আরো বলেন, ‘তারা কি আল্লাহতায়ালার দরবারে তাওবা করবে না এবং তাঁর কাছে গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আল্লাহতায়ালা তো মহা ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ [মায়িদা-১০]

আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তার দরবারে খাঁটি মনে তাওবা করো।’ নিঃসন্দেহে আমার প্রতিপালক গুনাহ মার্জনাকারী ও প্রেমময়। [সূরা হুদ-৯০]।

তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা সম্পর্কে রাসূল সাঃ বলেন, ‘রাতের বেলায় আল্লাহ তাঁর রহমতের হাতকে বিগত দিনের গুনাহগারদের তাওবা কবুল করার জন্য সম্প্রসারিত করেন। এমনিভাবে দিনের বেলায়ও বিগত রাতের গুনাহগারদের তাওবা কবুল করার জন্য তাঁর ক্ষমা ও দয়ার হাতকে সম্প্রসারিত রাখেন। পশ্চিম প্রান্ত থেকে সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত এমনিভাবেই করা হবে।’ [মুসলিম, নাসায়ি]। নবী করিম সাঃ আরো বলেন, যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে খাঁটি মনে তাওবা করে সে ওই লোকের মতো হয়, যার কোনো গুনাহ নেই।’ [ইবনে মাজাহ]।

তাওবা করতে হবে সঠিক সময়ে। এখনো সময় আছে, আরো বয়স হলে তাওবা করব­ এমনটি ভাবা ঠিক নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাওবা কবুল করার দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার। যারা মূর্খতাবশত খারাপ কাজ করে, অতঃপর অতিসত্বর তারা তাওবা করে তাদের প্রতিই আল্লাহ তায়ালা করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: