ইসলামে পোশাকের বর্ণনা

ইসলামে পোশাকের বর্ণনা

 

পোশাক ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে নিচের কারণগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা:আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় প্রকৃতি বিশ্বব্যাপী এক নয়। গরম দেশের পোশাক আর শীতপ্রধান দেশের পোশাক যে এক হবে না তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। তাই প্রাথমিকভাবে মানুষ তার পরিবেশ অনুসারে পোশাক বেছে নেয়।

২. লজ্জাস্থানকে ঢাকা:লজ্জাস্থানের পরিমাণ বোধ ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু লজ্জাস্থানকে আবৃত করা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি।

৩. নিজেকে বা শ্রেণীকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা:সভ্যতার একটি অবদান হলো ইউনিফর্ম। ইউনিফর্ম হিসেবে পোশাক ব্যবহার করে বিভিন্ন শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং সমতা বিধান করাসহ উক্ত গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে অন্য গোষ্ঠী বা শ্রেণী থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়।

৪. সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা: বেশভূষা মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সমাজজীবনকে করে সুশৃঙ্খল।

পোশাক ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের বর্ণনা।

এবং তিনি তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের, যা তোমাদের তাপ থেকে রক্ষা করে। (নাহল:৮১) হে আদাম সন্তানগণ, আমি তোমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশভূষার জন্য। (আ’রাফ:২৬)

আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং আল-কোরআনে বর্ণিত উদ্দেশের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করার কথা বলে স্বয়ং আল্লাহপাক ভৌগোলিক কারণে বিশ্বব্যাপী পোশাকের বিভিন্নতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ভৌগোলিক কারণেই বিশ্বব্যাপী পোশাকের একই ডিজাইন নির্ধারণ করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। বিজ্ঞানের আধার মহান আল্লাহপাক কোরআনে তা নির্দেশও করেননি।

দীনের ক্ষেত্রে ইসলাম প্রতিটি বিন্দুতে অনঢ় হলেও শরিয়তি বিধানের ক্ষেত্রে ইসলাম সেভাবে অনঢ় না হয়ে সীমানা নির্ধারণ করেছে। তবে সীমানার ক্ষেত্রে অনঢ়। যেহেতু হজরত মুহাম্মদ (স.) শেষ নবী, তাই ইসলাম অনাগত ভবিষ্যতের সবদিক খোলা রেখে শুধু জীবনের বিভিন্ন ব্যবহারিক দিকের চুতসীমা নির্ধারণ করেছে। সীমার ভেতর মুমিনের আছে স্বাধীনতা। ইজতিহাদ করার অধিকারও এই সীমার মধ্যে।

পোশাকের কোরআনিক মৌলিক বিধান

১. লজ্জাস্থান তথা সতর আবৃতকারী পোশাক হতে হবে। (মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানসমূহ হেফাজত করে। -নূর :৩০)

২. পোশাক অপচয় ও অহমিকাপূর্ণ হবে না। (হে আদম সন্তান! প্রত্যেকটি ইবাদতের স্থানে তোমরা নিজেদের ভূষণে সজ্জিত হয়ে থাক। আর খাও, পান কর এবং অপচয় করো না।- আ’রাফ:৩১)

৩. মহিলাদের পোশাকে মাথা, বক্ষ এবং গ্রীবা আবৃতকারী কাপড় থাকতে হবে। (মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে, তারা যেন যা স্বভাবতই প্রকাশিত তা ব্যতীত সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন তারা মাথার কাপড় দিয়ে আবৃত করে।-নূর:৩১)

কোরআনিক বিধানের পর আমরা পাই রাসুল (স.) সুন্নাহ থেকে পোশাকের ব্যবহারিক সীমা। অনেকে মনে করেন রাসুলের (স.) পোশাক ছিল ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আরবের প্রচলিত পোশাক। প্রকৃত ঘটনা তা নয়। রাসুলের (স.) পোশাক এক ছিল না। রাসুলুল্লাহর (স.) পোশাক ছিল এক আল্লাহতে বিশ্বাসী তাকওয়ার পোশাক; কিন্তু একই আবহাওয়া ও দেশে বাস করার পরও কাফিরদের পোশাক ছিল মুশরিকি চিন্তায় সিক্ত।

রাসুলুল্লাহ (স.) এবং সাহাবিগণ যে একটিমাত্র ডিজাইনের পোশাক পরতেন এমন নয়। হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে আমরা অনেক ধরনের পোশাকের নাম দেখতে পাই। যেমন কামিস (জামা), কাবা বা কোর্তা (কোট জাতীয় জামা), ইজার (সেলাইবিহীন লুঙ্গি). রিদা (চাদর), তুব্বান (হাফ প্যান্ট বা হাফ পায়জামা, জাঙ্গিয়া), জুব্বা, সারাবিল (পায়জামা, ফুলপ্যান্ট, সালোয়ার), খিমার (ওড়না), জেলবাব ইত্যাদি। রাসুল (স.) নিজেও যুদ্ধে, সফরে, অনুষ্ঠানে, ঈদগাহ, মেহমানদের সাথে সাক্ষাতের সময় সুবিধাজনক পোশাক পরিধান করেছেন।

তবে দৈনন্দিন জীবনে রাসুল (স.) প্রায় সময় ইজার (সেলাইবিহীন লুঙ্গি) এবং রিদা (চাদর) পরিধান করতেন। আবু বুরদাহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, আয়েশা (রা.) একখানা চাদর ও মোটা কাপড়ের একটি ইজার নিয়ে আমাদের নিকট এলেন এবং বললেন, যখন নবী (স.) ওফাত যান, তখন এ দু’টি পোশাক তার পরিধানে ছিল। (সহি বুখারি)।

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে এটা খুবই স্পষ্ট যে, রাসুলল্লাহ (স.) তত্কালীন আরব দেশের পোশাককে বাতিল না করে প্রথমত ইসলামী আকিদার আলোকে সংশোধন বা সংস্কার করেছেন। দ্বিতীয়ত. বৈসাদৃশ্য সৃষ্টির মৌলিক নীতির ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী সব সম্প্রদায় থেকে মুসলমানদের পোশাককে পৃথক করেছেন।

যে ব্যক্তি রাসুলকে মেনে চলল, সে মূলত আল্লাহরই আনুগত্য করল -নিসা : ৮০। তাই রাসুলুল্লাহর (স.) নির্দেশ অবশ্য পালনীয়। পরিভাষায় ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা যাই বলা হোক না কেন, যে বিষয়ে রাসুলের (স.) সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে, সেটি অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই।

রাসুল (স.) কর্তৃক নির্দেশিত পোশাকের আবশ্যিক বিধান

১। কোনো মুসলিম পুরুষ রেশমী পোশাক পরিধান করতে পারবে না।

২। অন্য ধর্মীয় পোশাক পরিধান করা যাবে না।

৩। কাপড়ে কোনো প্রাণীর ছবি রাখা যাবে না।

৪। পোশাক টাইট, ফিট অথবা পাতলা হতে পারবে না।

৫। মহিলাদের পোশাক পা পর্যন্ত ঢাকা হবে।

৬। সর্বোপরি পুরুষ এবং মহিলার পোশাক পৃথক বৈশিষ্ট্যের হতে হবে।

৭। পোশাক এমন হবে না যে ইবাদতের সময় মনোযোগ আকর্ষণ করে।

৮। পুরুষের পোশাক পায়ের গিরার নিচে ঝুলানো যাবে না।

পুরুষদের পোশাক পায়ের গিরার নিচে ঝুলিয়ে পরার ক্ষেত্রে অহংকারকে অনেকে শর্ত হিসেবে মনে করেন। বলা হয়ে থাকে, অহংকার না থাকলে ঝুলিয়ে পরা যাবে। কিন্তু বহু হাদিস আছে, যেখানে অহংকারকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

তাই দেখা যাচ্ছে, একটিমাত্র ডিজাইনের পোশাক সবার জন্য হবে, এমনটি নয়। বরং বলা যায়, বিশ্বের সব প্রান্তের পোশাকই ইসলামী পোশাক, যদি তা ইসলামী আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক না হয় পোশাকটি যদি কোরআন এবং সুন্নাহ বর্ণিত সীমা অতিক্রম না করে এবং পোশাক পরিধান করলে অন্য কোনো সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে মনে না হয়। আমরা আমাদের পোশাক দিয়ে ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে না পারলে, আমাদের স্বকীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হতে বাধ্য। অতএব আমাদের পোশাক অন্তত এতটুকু অবশ্যই হতে হবে, যেন আপনাকে-আমাকে দেখে অন্য সম্প্রদায়ের লোক মনে না হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: