ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ

ইসলামের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ

পরিবেশ দূষণ নিয়ে গোটা বিশ্বে চলছে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা। বিশ্বের তাবত্ চিন্তাশীল মানুষ এখন পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার কৌশল নিয়ে অহর্নিশ তত্পর। নানাভাবে নষ্ট হচ্ছে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশ দূষণ বর্তমান সময়ে যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে আজকের বিশ্ব উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করার দাবি করলেও পরিবেশ রক্ষায় তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। আজকালকার বিজ্ঞান মনষ্ক মানুষ উন্নতির ব্যাপারে যতটা না যত্নবান, তার পরিবেশ রক্ষায় কিন্তু তেমন সচেতন নয়। ফলে আমাদের চারপাশ, আমাদের সমাজ, এমনকি জীবনও এক বীভত্স বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই পরিবেশ রক্ষায় গোটা দুনিয়ায় চলছে নানান গবেষণা, রচিত হচ্ছে অনেক ব্যয়বহুল পরিকল্পনা। প্রতিটি দেশের সমাজ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গলদঘর্ম প্রচেষ্টায় নিয়োজিত। তাদের লক্ষ্য একটাই, কিভাবে দুনিয়াকে বসবাস করার উপযোগী রাখা যায়, কিভাবে পরিবেশ দূষণের অনিবার্য বিপর্যয় থেকে মানবতাকে রক্ষা করা যায়।

পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের সমাজে চলছে ভাঙ্গন ও বিশৃঙ্খলা, নষ্ট হচ্ছে জীবন ও সম্পদ, বাড়ছে অশান্তি ও অস্থিরতা। দূষণের কারণে রোগ-শোক, জরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রতিনিয়ত কত মানুষ যে মৃত্যুর শীতল পরশ গ্রহণ করছে তার ইয়ত্তা নেই। তাই পরিবেশ  রক্ষায় আমাদের সচেতন হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। দুনিয়ার মানুষ এখন বাঁচার তাগিদে পরিবেশকে রক্ষা করতে সর্বত্রই সোচ্চার হচ্ছে আমরা বাংলাদেশেও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের জোর শ্লোগান তুলছি।

এখন আমরা দেখি এই প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ নিয়ে ইসলামের কি নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-ই বা কি বলে এই পরিবেশ নিয়ে। পরিবেশ আমাদের জন্য বড় এক নেয়ামত। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তা নিয়েই আমাদের পরিবেশ। চারপাশের অবস্থা, আকাশ-বাতাস, পানি-মাটি, গাছপালাসহ সম্প্রসারিত বিশাল দিগন্ত মিলে গড়ে উঠেছে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ভাষায়, পৃথিবী ভূ-পৃষ্ঠ হতে ওজোন স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত পরিমণ্ডলে বিদ্যমান আলো, বাতাস, পানি, মাটি, বন, পাহাড়, নদী, সাগর মোটকথা উদ্ভিদ ও জীবজগত্ সমন্বয়ে যা সৃষ্টি তাই পরিবেশ।

পরিবেশ মহান আল্লাহ তায়ালার মহান সৃষ্টি। মানুষের কল্যাণ ও স্বাভাবিক প্রয়োজনের তাগিদে পরিবেশের যাবতীয় জিনিস আল্লাহ তৈরি করেছেন। এর কোনটাই অপ্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়নি। আল্লাহপাক এ বিষয়ে কুরআনে পাকে সূরা লোকমানের ২০ নং আয়াতে ঘোষণা করেছেন এভাবে, ‘তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নিয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।’ সূরা আল-বাকারার ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ সূরা ইয়াসিনের ৩৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য একটি নিদর্শন মৃত ভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উত্পন্ন করি শস্য, তা তারা ভক্ষণ করে। আমি তাতে সৃষ্টি করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝর্ণা। যাতে তারা ফল পায়।’ একই বিষয়ে সূরা বাকারার ২২ নং আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, ‘যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা ও আকাশকে ছাদস্বরূপ করে দিয়েছেন আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল, ফসল উত্পন্ন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে।’ সূরা আল কামারে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি সকল জিনিস সৃষ্টি করেছি সুস্পষ্টভাবে ও সুনির্দিষ্ট পরিমাপ অনুযায়ী।’

ওপরে উল্লেখিত কুরআনের আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, দুনিয়ার সৃষ্টি, উপায়-উপকরণ আমাদের জন্য পরম নেয়ামত। এগুলোর সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবহার, যত্ন ও পরিচর্যা ঈমানী দায়িত্বের অংশ। আমরা যদি এই পরিবেশকে রক্ষা না করি তাহলে আমাদের জন্য বিপর্যয় অবধারিত। বলা আবশ্যক, আজ দুনিয়া জুড়ে যে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা আমাদের নিজেদেরই তৈরি। মহান আল্লাহপাক এ জন্য সূরা রুমের ৪১ নং আয়াতে বলেছেন, ‘জলে-স্থলে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে তা মানুষের অর্জনেরই ফল।’

এ জন্য মানবতার নবী, বিশ্ব সম্প্রদায়ের অন্যতম কল্যাণকামী আদর্শ মানুষ হযরত মুহাম্মদ (স.) মানুষের উত্তম জীবনধারণ ও কল্যাণ সাধনের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। উন্নত পরিবেশ তৈরিতে আমাদের প্রিয়নবী ছিলেন বিশেষ যত্নবান। পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম দিক-নির্দেশক ছিলেন তিনি। সামাজিক বিপর্যয় রোধে মহানবী (স.) : মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে মিলেমিশে বসবাস করা ছাড়া সামাজিক স্বস্তি ও শান্তি অসম্ভব। সমাজে শান্তি না আসলে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য। তাই সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমতা-সাম্য, দয়া-মায়া, ভালবাসার সুষ্ঠু পরিবেশ  অনিবার্য। একে অপরের প্রতি দায়িত্ব সচেতন হলে সামাজিক পরিবেশ সুন্দর হয়। অন্যায়, অবিচার, জুলুম, মিথ্যা ও হানাহানিমুক্ত পরিবেশই সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার জন্য সহায়ক। নবী করীম (স.) এ সামাজিক পরিবেশকে সুন্দর করার জন্য ঘোষণা করেছেন নানান কর্মসূচি। এ সম্পর্কে মহানবী (স.)-এর কতিপয় হাদীস আমরা উল্লেখ করতে পারি। রাসূল (স.) বলেন, ‘পরম দয়ালু আল্লাহ তায়ালা দয়াকারীকে দয়া করেন।’ ‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে মোমেন নয়।’ ‘ঐ ব্যক্তি মোমেন নয়, যে ব্যক্তি পেট পুরে খায় আর তার প্রতিবেশী পাশে ক্ষুধার্ত থাকে।’ ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তাকে জুলুম করবে না, অপমান করবে না এবং অসম্মান করবে না।’ একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।’ শুধু মুসলমানদের বিষয়ই নয়, সমাজের অমুসলিমদের প্রতিও যত্নশীল হয়ে দায়িত্ব পালন করে সামাজিক স্থিতি বা পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে হবে। তাই তিনি বলেছেন, ‘কোনো অমুসলিম নাগরিক যে অত্যাচার করলো বা অধিকার ক্ষুণ্ন করলো বা তাকে সাধ্যাতীত পরিশ্রম করালো বা তার অমতে তার কাছ থেকে কিছু নিয়ে নিল, কেয়ামতের দিন আমি হবো তার বিপক্ষে মামলা দায়েরকারী।’ তিনি সমাজের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে আরো বলেছেন, ‘যে কোনো সংখ্যালঘুকে হত্যা করলো সে বেহেশতের ঘ্রাণও উপভোগ করতে পারবে না। অথচ বেহেশতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব হতেও অনুভব করা যাবে।’ সামাজিক পরিবেশ রক্ষায় এমন সুন্দর নির্দেশনা ও সুবিচারপূর্ণ বিধান দুনিয়ার কোনো ধর্ম কিংবা মতবাদে বিধৃত হয়নি। সমাজের নানান অসঙ্গতি, জুলুম, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, সুদ, জুয়া, মিথ্যাচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধেও রাসূল (স.) কঠিন হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। এটা এ জন্য যে, এসব অনাচারের কারণে সামাজিক পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়। মহানবী (স.) বলেছেন, ‘মোমেনরা যখন দোযখের আগুন হতে নাজাত পাবে, তখন দুনিয়াতে একে অপরের প্রতি যে জুলুম করেছিলো তার প্রতিশোধ নেয়া হবে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘মজলুমের বদ দোয়াকে ভয় করো। কেননা, তার বদ দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।’

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে মহানবী (স.): প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার দাবিতে দুনিয়া জুড়ে আজ সম্মিলিত আওয়াজ উঠেছে। মানুষের অদূরদর্শিতা এবং অমানবিক আচরণের কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা তাবত্ বিশ্বের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক এবং প্রাকৃতিক নানান দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষ রোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ মহানবী (স.) বৃক্ষ বা বন রক্ষার তাগিদ দিয়ে গেছে সেই চৌদ্দশ’ বছর আগে। বৃক্ষ বা শস্য নষ্ট করাকে নিরুত্সাহিত করতে রাসূল (স.) মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। জনৈক ব্যক্তি একটি গাছের পাতা ছিড়লে রাসূল (স.) বললেন, ‘প্রত্যেকটি পাতা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে।’ বৃক্ষ রোপণকে উত্সাহিত করেছেন মহানবী (স.)। গাছ-পালা, লতা-পাতা মানুষ ও জীব-জন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। গাছপালা ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ করে এবং মাটির ক্ষয়রোধ করে। এ প্রসঙ্গে নবীজি এক হাদীসে বলেছেন, হযরত আনাস (রা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেতখামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।’ হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম (স.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে, কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি লাগাবে।’

পানি সংরক্ষণে মহানবী (স.)-এর নির্দেশনা : পানি মানুষ এবং জীব-জগতে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। পানি ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। পানি দূষিত হলে মাটি, বায়ু ও খাদ্যও দূষিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৃথিবীর ৬০ ভাগ পানিই দূষিত। ফলে রোগ-শোক, জরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ও পশু-পাখি। পানি দূষণের মূল কারণ হলো- নর্দমার ময়লা, কারখানার বর্জ্য পদার্থ, মানুষ ও পশু-পাখির মলমূত্র, কীটনাশকের মিশ্রণ প্রভৃতি। তাই আজ বিশ্বব্যাপী এ পানিকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য জোর তত্পরতা শুরু হয়েছে। সুপেয় পানির অভাব এখন মানুষকে রীতিমত উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা ধারণা করছে, চলমান শতাব্দীতে দুনিয়ায় যদি বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ হয় তাহলে তা হবে বিশুদ্ধ পানির জন্য লড়াই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: