নিয়ত ও আমলের সমন্বয় জরুরি

নিয়ত আমলের সমন্বয় জরুরি

নিয়ত সম্পর্কে হাদিসে এত বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে যে, অনেক পণ্ডিতজনের অভিমত হলো, নিয়ত ইসলামী শিক্ষার পুরোপুরি এক-তৃতীয়াংশ বেষ্টন করে আছে। নিয়ত সম্পর্কে যে হাদিস তা এতটাই স্মরণ রাখার মতো যে, সেটা প্রায়ই আরবিভাষী ও অনারব প্রায় সব মুসলমানই মূল আরবি-ভাষ্যে উদ্ধৃত করে থাকে। এমন মুসলমান কদাচিত্ দেখা যায়, যে এটা কখনও শোনেনি। বলাই বাহুল্য, এই হাদিসের শব্দ ও বাক্যের যে তাত্পর্য তা অত্যুত্কৃষ্ট। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আমাদের জীবনে এই হাদিসের প্রয়োগ সম্পর্কে এতটাই উদাসীন যে, আমাদের কর্মে তা খুব কমই প্রতিফলিত হয়। ইসলামের প্রেক্ষাপটে আমাদের কর্মগুলো মোটামুটি তিন শ্রেণীর যে কোনো একটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত এবং আমাদের নিয়তও যথারীতি কোনো না কোনোভাবে কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম শ্রেণীতে রয়েছে অবশ্যকরণীয় ধর্মীয় ইবাদত (ফরজ) ও তার সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থাত্ নফল-বন্দেগি (যেমন নফল নামাজ পাঠ)। দ্বিতীয় শ্রেণীতে রয়েছে অনুমোদিত কার্যগুলো, যা অধিকাংশই পার্থিব এই বাস্তব জীবনের জন্য অপরিহার্য, যেমন— আহার, তৃষ্ণা নিবারণ, নিদ্রা, জীবিকা উপার্জন, পরিবার প্রতিপালন ইত্যাদি। আর তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে এমন সব কাজ যা সম্পূর্ণরূপে হারাম অর্থাত্ নিষিদ্ধ। আমরা যে হাদিসের কথা বলছি, তার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ ক্ষেত্র হলো আমাদের প্রথম শ্রেণীভুক্ত কর্মগুলো। এই শ্রেণীভুক্ত কাজ এমনভাবে সম্পাদন করতে হবে, যার উদ্দেশ্য থাকবে একমাত্র আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি। কারণ এক্ষেত্রে আমাদের নিয়তের সামান্যতম বিকৃতি ঘটলে সম্পাদিত কর্মগুলো একেবারে পুরোপুরি বরবাদ হয়ে যাবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি এই নিয়তে সালাত (আনুষ্ঠানিক প্রার্থনা) আদায় করে যে, লোক তাকে ধার্মিক মনে করবে, তাহলে তার সালাতই শুধু বিনষ্ট হয়ে যাবে না, সেটা হবে তার জন্য একটা অমার্জনীয় অপরাধ; কারণ সে তার নামাজের মধ্যে আল্লাহর সঙ্গে অংশী স্থাপন করেছে। তার নামাজ আল্লাহর জন্য নয়, লোক দেখানোর জন্য! হজ, হিজরত, জিহাদ এবং দান-সদকা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম সত্য। আল কোরআনে অত্যন্ত সুন্দর একটি উপমার মধ্য দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে। দুই ব্যক্তির দান-খয়রাতকে সামনে রেখে আলোচ্য বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে। দুজনই অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করার জন্য অর্থব্যয় করে, কিন্তু একজন করে বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর জন্য, আর অপরজন লোকের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য। কোরআন বলছে :
‘হে ঈমানদাররা, তোমরা (উপকারের) প্রতিদান চেয়ে এবং (অনুগৃহীত ব্যক্তিকে) কষ্ট দিয়ে তোমাদের দান-সদকাকে বরবাদ করে দিও না; ঠিক সেই (হতভাগ্য) ব্যক্তির মতো, যে শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেই দান করে, সে আল্লাহপাক ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে না। তার (দানের) উদাহরণ হচ্ছে, যেন একটি মসৃণ শিলাখণ্ডের ওপর কিছু মাটির আস্তরণ পড়ল, (একদিন সেখানে) মুষলধারে বৃষ্টিপাত হলো, (বাইরের আবরণ সরে গিয়ে দেখা গেল, শক্ত) পাথর শক্ত হয়েই পড়ে আছে। (দান-খয়রাত করেও) তারা এর থেকে কিছুই অর্জন করতে পারল না। আর যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, আল্লাহপাক তাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।
অপরদিকে যারা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির জন্য এবং নিজেদের অন্তরকে (আল্লাহর পথে) অবিচল রাখার জন্য নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ হচ্ছে, একটি কোনো উঁচু পাহাড়ের উপত্যকায় একটি যেন (ফলের) বাগান, যদি সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, তাহলে ফসলের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়; আর প্রবল বৃষ্টি না হলেও বৃষ্টির ছোট-ছোট বিন্দুগুলোই হয়ে ওঠে (ফসলের জন্য) যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা ভালো করেই লক্ষ্য করেন, তোমরা কে কী কাজ করো’ (সূরা বাকারা-আঃ ২৬৪-২৬৫)।
দান-সদকা একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ; কারণ এখানে কাজের প্রকৃতি অনুযায়ীই মানসিক অশুদ্ধতা ও লক্ষ্যভ্রষ্টতার সম্ভাবনা একটু অধিক। আমরা এক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন তারা আমাদের প্রতি সকৃতজ্ঞ স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে; এবং আমরাও প্রশংসালাভের জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠি। আরও বড় কথা হলো, কোনোরূপ সংশয় ও বিবেকের দংশনকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা নিজেদের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ওঠি যে, প্রচারের অর্থ আসলে অন্যদের উত্সাহিত করা।
একজন মুসলমান যা করে তার মূলে থাকে আখেরাতের কথা; পারিপার্শ্বিকতার চাপে আত্মসান্ত্বনার জন্য সে কিছু করে না। একজন মুসলমান জানে যে, তার প্রদত্ত অর্থের (উড়হধঃরড়হ) প্রকৃত মূল্যমান আন্তরিকতার মানদণ্ডে বিচার্য, অর্থমূল্যে নয়। এবং সে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ যে, এই আন্তরিকতা ও ইচ্ছার পবিত্রতা তার জীবনের এমন অতীব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা না থাকলে বিশাল দানও ক্ষতি ও ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই বয়ে আনবে না। আর একজন ব্যক্তি যখন এভাবে চিন্তা করে, সে নিশ্চয়ই ‘অর্থ সংগ্রহের নৈশভোজ’-এর এই বর্তমান রূপটিকে বক্রদৃষ্টিতে ও ভ্রূকুটি নিয়েই অবলোকন করবে।
অনেক সময়ই এই হাদিসটিকে পূর্বোক্ত তৃতীয় শ্রেণীর নিষিদ্ধ অর্থাত্ হারাম কার্যগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যখন আমরা কোনো ভুল করি, তখন আমরা আমাদের অন্তরের অপরাধবোধকে এই বলে প্রশমিত করার চেষ্টা করি যে, আমাদের মনে ক্ষতিসাধনের কোনো চিন্তা ছিল না। আমাদের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা এই ভেবে আত্মতৃপ্তি অনুভব করি যে, আমাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ছিল ভালো। অতিশয় খারাপ কাজের পরিপ্রেক্ষিতেও আমরা আলোচ্য হাদিসটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি ‘ঊহফং লঁংঃরভু সবধহং’। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু সত্ অভিপ্রায় দ্বারা মন্দ কাজকে পরিশুদ্ধ করা যায় না। আমরা যদি সঠিকভাবে নামাজ, কোরবানি অথবা হজ পালন না করি, কেবল নিয়তের শুদ্ধতার ফলে কি তা সঠিক ও যথাযথ বলে গণ্য হতে পারে? চূড়ান্ত ভ্রান্তি হলো, পরিষ্কারভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়কে সত্ নিয়তের কথা বলে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। মাওলানা মানযূর নোমানী বলেন, ‘এটা হলো ধর্মকে নিয়ে একটা খেলা বা তামাশা’ এবং তিনি একথাও যুক্ত করেন যে, এতে বরং পাপের বোঝা আরও ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পায়।
যেসব কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত (বৈধ ও অনুমোদিত পার্থিব ক্রিয়াকর্ম) সে প্রসঙ্গে বলা যায়, আমাদের অন্তরের স্বাভাবিক প্রবণতা নিয়েও সেসব কাজ ইবাদত-বন্দেগিতে পরিণত হয়ে উঠতে পারে। এখানে আমরা সাধারণত আমাদের ক্ষতির দিকটির প্রতিই অধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। অথচ এখানেও মনোভাবের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে খুব সহজেই ইবাদতে পরিণত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, একজন ঈমানদার ব্যক্তি যখন এই নিয়তে তার কর্মস্থলে যায় যে, পরিবার প্রতিপালনের জন্য হালাল জীবিকা উপার্জন তার ওপর অর্পিত একটি ধর্মীয় দায়িত্ব, তাহলে শুধু এই মনোভাবের কারণেই তার পার্থিব ও সাংসারিক ক্রিয়াকর্ম হয়ে ওঠে ইবাদত। সে যদিও তার পার্শ্ববর্তী মানুষটির মতো একই কাজ করছে, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে আলাদা। নিঃসন্দেহে এটা তার জন্য পুরস্কার! আর এই সামান্য কাজের মধ্য দিয়েই আমরা একটি উচ্চতর লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে জীবনযাপন করতে সক্ষম হই এবং এটা আমাদের জীবনের একটা উচ্চতর অবস্থানও বটে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: