বাংলা ভাষায় আল-কুরআনের বঙ্গানুবাদ

বাংলা ভাষায় আলকুরআনের বঙ্গানুবাদ

ভারতীয় উপমহাদেশে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (১৭০৩-১৭৬২) সর্বপ্রথম ফারসিতে কুরআনের অনুবাদ করেন। ১৭৭৬ সালে শাহ রফিউদ্দিন (১৭৪৯-১৮১৭) ও ১৭৮০ সালে শাহ আবদুল কাদির (১৭৫৩-১৮২৭) উর্দু ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করেন। শাহ রফিউদ্দিনের অনুবাদটি ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে এবং শাহ আবদুল কাদিরের অনুবাদটি ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশ পায়। এসব তাফসির কালক্রমে বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা লাভ করে। (পবিত্র কুরআন প্রচারের ইতিহাস, পৃ.-১৫) আধুনিক গবেষণায় দেখা যায় যে, বলা যায় যে, বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে খলিফা হারুনুর রশীদ (৭৮৬-৮০৯)-এর সময়ে এবং ক্রমান্বয়ে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে। এ সময় কুরআনে বাণী মৌখিকভাবে প্রচারিত হতো। মুসলিমগণ অচিরেই বাংলা ও সাহিত্যের উন্নতিতে মনোনিবেশ করেন। এ সময় শাহ মুহাম্মদ সগীর (১৩৮৯-১৪১০ খ্রি.) ইউসুফ জুলেখা কাব্যে সুরা ইউসুফের অর্থের অনুবাদ করেন। সৈয়দ সুলতানের ‘কোরানের কতা সব লিক্ষি লইলা সার’ এই বক্তব্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবুদল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) ‘নুরনামা’ কাব্য রচনা করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর মুসলমানদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সাথে সাথে ধর্মীয় বিপর্যয় দেখা দেয়। ফলে মুসলমানদের এহেন খ্রিষ্টান মিশনারীদের অপতত্পরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আলিম সমাজও সোচ্চার হয়ে সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। হাজী শরিয়াতুল্লাহ (১৭৬৪-১৮৪০); মাওলানা ইমামুদ্দীন (১৭৮৮-১৮৫৯); মাওলানা সুফি নূর মোহাম্মদ (১৭৯০-১৮৬১ আনু:) এবং মাওলানা কারামত আলী (১৮০০-১৮৭৩) প্রমুখ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আরবি ও ফারসি ভাষায় ব্যুত্পত্তি সম্পন্ন এসব আলিম বাংলা ভাষায় কোনো পুস্তক রচনায় অবদান রাখতে সক্ষম হননি। আর তখনও বাংলা মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন হয়নি। বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন হয়। তখন থেকে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ শুরু হয়। ১৮১৫ সালের পর বাঙালি মুসলমানগণ মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করেন। মুনশী হেদায়েতুল্লাহ ও মুনশী সৈয়দ আবদুল্লাহ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত এ সময়টি ছিল বাংলাভাষার ক্রান্তিকাল। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটান কলকাতার মির্জাপুরের পাটোয়ার বাগানের অধিবাসী আকবর আলি। দোভাষী পুঁথির ভাষায় রচিত পবিত্র কুরআনের আমপারা ও সুরা ফাতিহার বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেন। অবশ্য এটি ছিল শাহ আবদুল কাদিরের উর্দু তাফসিরের বঙ্গানুবাদ। (ঐ, পৃ:-১৭-১৮)

১৮০৮ অথবা ১৮০৯ সালে রংপুর নিবাসী আমিরুদ্দীন বসুনিয়া কুরআনের শেষ খণ্ড আমপারার অনুবাদ করেন।

এরপর ১৮৭৯ সালে কুরআনের প্রথম পারার বঙ্গানুবাদ করেন অমুসলিম রাজেন্দ্রনাথ মিত্র। গিরিশচন্দ্র সেনের তিন বছর আগে ১৬ পৃষ্ঠার এই অনুবাদ কর্মটি কলকাতার আয়ুর্বেদ প্রেস থেকে মুদ্রিত হয়। অনুবাদক নিজেই এ পুস্তকটির প্রকাশনার দায়িত্ব নেন। প্রথম মুদ্রণে ৫০০ কপি প্রকাশ করার পর এ কাজে বোধ হয় তিনি আর অগ্রসর হননি। ১৮৮৫ সালে ব্রাহ্মধর্মের নববিধান মণ্ডলীর ধর্মপ্রচারক গিরিশচন্দ্র সেন বাংলাভাষায় কুরআনের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সম্পূর্ণ অনুবাদ করেন। বঙ্গানুবাদটির রচনা, মুদ্রণ ও প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালের শেষাংশ থেকে ১৮৮৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পৌনে চার বছরের মধ্যে। (আহমাদ, বাংলা মুসলিম গ্রন্থপঞ্জী, পৃ. ৩৮৬) গিরিশচন্দ্রের অনুবাদটিতে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারনীতি, কুরআনি বিজ্ঞানের অপরিপক্কতা লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে তার অনুবাদটি মুসলমানদের মাঝে জনপ্রিয়তা তো অর্জন করতে পারেইনি তবে শতবর্ষ পরে একথা বলা যায় যে, তার অনুবাদ কর্মটি মুসলমান আলিমদের মাঝে একপ্রকার আত্মবিশ্বাসের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। গিরিশচন্দ্রের বঙ্গানুবাদের দুই বছরের মাথায় ১৮৮৭ সালে মুসলিম আলিম নইমূদ্দীনের অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: