রাসূল সাঃ-এর বিচারব্যবস্থা

রাসূল সাঃএর বিচারব্যবস্থা

রাসূল সাঃ-এর চরিত্র একটি সামগ্রিক বিষয়। মানব জীবনের প্রতিটি অংশে সমাজের প্রতিটি শাখায় সাম্য-শান্তি প্রতিষ্ঠা তথা শান্তির জন্য আমাদের ছুটে যেতে হবে প্রিয় রাসূল সাঃ-এর অনুপম জীবনাদর্শে। বিচারকার্যে নবীজী সাঃ-এর চরিত্র বা আখলাক তারই একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ সামাজিক জীব। সংসার সমাজ চালাতে গিয়ে তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ ও বিবাদ-বিসম্বাদ ঘটতে পারে। তবে এর জন্য যেন কোনো রকম সামাজিক ধ্বংস-বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয় সে জন্য নবী সাঃ রেখে গেছেন বিচারব্যবস্থার এক অনুপম আদর্শ।

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানব মহানবী সাঃ। তিনি দুনিয়ার চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা সমাজ দ্বারা নির্বাচিত বিচারক ছিলেন না। তাঁকে বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন স্বয়ং বিশ্ব নিয়ন্তা মহান আল্লাহ তায়ালা। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হচ্ছে , হে নবী! আমি সত্য সহকারে আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি। যাতে আপনি আল্লাহর দেখানো যুক্তির আলোকে বিচার-আচার করতে পারেন। (সূরা নিসাঃ ১০৫)। অপর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, হে নবীঃ বলুন, আমি আল্লাহ তায়ালার নাজিল করা কিতাবের ওপর ঈমান এনেছি এবং তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (সূরা শুরাঃ ১৫)।

ওপরের আয়াতে কারিমা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে রাসূল সাঃ ছিলেন মহান রব কর্তৃক বিশ্ব মানবের জন্য এক মহান আদর্শবান, অনুসরণীয়, অনুকরণীয় ন্যায়বিচারক। তিনি তাঁর জীবনে ন্যায়বিচারকার্যের যে উপমা উপস্থাপন করেছেন তা প্রশ্নাতীতভাবে বিশ্বসভ্যতার জন্য এক মহান আদর্শ ।

ছোট-বড়, ধনী-গরিব, মুসলিম-অমুসলিম সবার ক্ষেত্রে তিনি বিচার করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তার নাজিলকৃত আল কুরআনের আলোকে। যার মধ্যে নেই কোনো ভুল, সন্দেহ, সংশয়। বিশ্ববাসী তা অবলোকন করেছে সানন্দচিত্তে, মেনে নিয়েছে মাথা নত করে। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে­ অতএব হে নবী আপনার রবের কসম তারা কখনোই মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের ঝগড়া-বিবাদে আপনাকে বিচারক মানবে এবং আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি মনে দ্বিধা-সঙ্কোচ না রেখে সন্তুষ্টচিত্তে না মেনে নেবে। (সূরা নিসাঃ ৬৫)। এর দ্বারাই বুঝা যায় যে তিনি ছিলেন মহান আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক। আর বিচারক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব রিসালতের দায়িত্ব থেকে আলাদাও ছিল না। রাসূল সাঃ-কে বিচারক হিসেবে না মানা মুমিনের কাজ নয়, বরং তা মুনাফিকের কাজ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহর নাজিল করা কিতাব ও রাসূল সাঃ-এর দিকে এসো তখন দেখবে যে মুনাফিকরা তোমাদের থেকে কেটে পড়েছে। (সূরা নিসাঃ ৬১)। সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিচারককে অবশ্যই কতগুলো নীতি অনুসরণ করতে হবে।

১. বিচারককে অবশ্যই সৎ ন্যায়নিষ্ঠ ও মুমিন হতে হবে। কারণ যার অন্তরে আল্লাহভীতি নেই সে কখনোই ন্যায়বিচার করতে পারবে না। ২. বিচারককে বিচারকার্যে সর্বপ্রকার স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। ৩. সুস্থ মস্তিষ্কে বিচার করতে হবে। বিচারকার্য পরিচালনা করতে যেন কোনো পক্ষের প্রতি অবিচার না হয়ে যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু বকর রাঃ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলতেন, রাগান্বিত অবস্থায় যেন কোনো বিচারক দু’জন বিবদমানের মধ্যে বিচার ফয়সালা না করেন। (বুখারি-মুসলিম)।

হজরত বুরাইদা রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার জান্নাতি, আর দুই প্রকার জাহান্নামি। জান্নাতে তিনিই প্রবেশ করবেন, যিনি সত্য অবগত হয়ে সে মোতাবেক বিচারকার্য পরিচালনা করেন। আর যে ব্যক্তি জেনেশুনে অন্যায় ফয়সালা দান করে বা সত্য না জেনে আন্দাজের ওপর বিচারকার্য পরিচালনা করে, তারা উভয়েই জাহান্নামি। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)। বিচারকার্য পরিচালনার মূল ভিত্তি ও উপায় উপকরণ হচ্ছে­ প্রথমত আল কুরআন, এরপর সুন্নাতে নবী সাঃ এবং সর্বশেষ কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ ফয়সালা।

হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ যখন তাঁকে ইয়ামেনে পাঠালেন, তখন বললেন, কিভাবে তুমি বিচার-আচার করবে। মুয়াজ রাঃ বললেন, আল কুরআনের ফয়সালা অনুসারে। রাসূল সাঃ বললেন, যদি ওই বিষয়ে আল কুরআনে কোনো ফয়সালা খঁুজে না পাও। মুয়াজ রাঃ বললেন সুন্নাহ দ্বারা। হুজুর সাঃ বললেন, যদি তাতেও না পাও। তিনি বললেন, কুরআন সুন্নাহর নীতির অনুসরণে আমার ইজতিহাদ দ্বারা এবং এতে কোনো প্রকার সঙ্কীর্ণতা দেখাব না। এরপর নবী করিম সাঃ হজরত মুয়াজ রাঃ এর বুকে হাত রেখে বললেন, প্রশংসা সেই আল্লাহর তিনি তাঁর রাসূলের দূতকে এমন ক্ষমতা দান করলেন। যাতে আল্লাহর রাসূল সন্তুষ্ট। (তিরমিজি, আবু দাউদ)।

বিচার-আচার করার সময় বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষের কথাবার্তা যথাযথ শুনে এবং এরপক্ষে বিপক্ষে সাক্ষী-প্রমাণ গ্রহণ করে ফায়সালা প্রদান করা নবী করিম সাঃ-এর বিচারকার্যের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল।

ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে বিচারকার্য পরিচালনা না করা সম্পর্কে নবী করিম সাঃ কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু আউফা রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা একজন বিচারকের সাথে ততক্ষণ থাকেন যতক্ষণ তিনি বিচারকার্যে জুলুম-অত্যাচারের ঊর্ধ্বে থাকেন। যখন তিনি জুলুম ও বেইনসাফি করেন তখনই আল্লাহ তার থেকে পৃথক হয়ে যান। এবং অভিশপ্ত শয়তান তার সাথী হয়ে যায়। (তিরমিজি, ইবনে মাজা)। হজরত আয়েশা রাঃ রাসূল সাঃ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচারক কাজী কিয়ামতের দিন এই আকাঙ্ক্ষা করবেন যে, দু’ব্যক্তির মধ্যে সামান্য খেজুরের ফয়সালাও যদি তাকে পৃথিবীতে না করতে হতো তবে কতই না ভালো হতো। (মুসনাদে আহমদ)।

সুষ্ঠু, সুন্দর, ন্যায় ইনসাফের বিচারব্যবস্থা তখনই আশা করা যায় যখন বিচারকার্যে কুরআন, হাদিস তথা রাসূল সাঃ-এর অনুপম আদর্শকে সামনে রেখে বিচার করা হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: