সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব আল্লাহর নেয়ামত

ঝগড়াঝাঁটি, কথা কাটাকাটি সমাজে হয়। কখনো এক পক্ষের বাড়াবাড়ি আবার কখনো উভয় পক্ষের বাড়াবাড়ির কারণে মাতামাতি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। আর একে প্রতিরোধ করার জন্য দুনিয়ার মধ্যে কত যে আইন তৈরি হয়েছে, কত সংস্থার যে সৃষ্টি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবুও এ দৃষ্টিকটু ব্যাপারটি সর্বত্র দেখা যায়। কোথাও কম, কোথাও বেশি। মানুষের মধ্যে সুপ্রবৃত্তির (ঝঁঢ়বৎ ঊমড়) তুলনায় কুপ্রবৃত্তির আধিক্য বৃদ্ধি পেলে হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা, ঝগড়াটে মনোভাব দেখা দেয় বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা অভিমত ব্যক্ত করেন। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও অভিমতটি জোরালোভাবে সমর্থন করে। সময়ের মূল্য, নিজের অধিকারের সীমাবদ্ধতা, অপরের অধিকারের পরিধি, নৈতিক জ্ঞান ও জবাবদিহিতার মনোভাবশূন্য মানুষ সমাজে অন্যায় ও অশান্তি সৃষ্টির কাজগুলো লালন করে থাকে। প্রায় সময় একটা তুচ্ছ ব্যাপার থেকে হয় অশান্তির সূত্রপাত। বহু তুচ্ছ ঘটনা ডেকে আনে ভয়াবহ যুদ্ধের ঘনঘটা। ইসলামপূর্ব যুগে এমনই কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত আমরা দেখি। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে একটি উটকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ চলে চল্লিশ বছর। এটি হরবুল বসুস বা বসুস যুদ্ধ নামে পরিচিত। ঘোড়দৌড়ের সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবস ও জুবাইন গোত্রদ্বয়ের মধ্যে সে যুগের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কয়েক শতাব্দী ধরে স্থায়ী ছিল। ( দ্রঃ ইঃ ইতিহাস- ড. মা হাসান ১/১২)

তবে সেকালের আর একালের সহিংস কর্মকাণ্ডে যে দিকটি লক্ষণীয় তা হলো, সে সময় প্রাণহানি, সম্পদহানি ঘটত ঠিকই। তবে তার ক্রমবৃদ্ধিটা ছিল অনেক মন্থরগতিতে। কারণ যোগাযোগ ও সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার দ্রুততম পদ্ধতি তখন ছিল না। অবশ্য এ জন্য কোনো সংঘটিত বিষয় নিরসন হওয়ার ক্ষেত্রেও চরম বিভ্রান্তি ও কালক্ষেপণ ঘটত। আজকাল সামান্য সময়ের মধ্যেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সব বন্দোবস্ত রয়েছে। বিজ্ঞানের এ যুগে সব সুবিধার মধ্যে এখানেই একটু ব্যত্যয়। তখন ভয়াবহ হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে শান্তিকামী মানুষ পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়ার সময়-সুযোগ পেত। কিন্তু সে ফুরসত আজ অনুপস্থিত। তখন ব্যক্তিগত কলহে লাঠিসোটা ব্যবহার হতো। এতে বিভিন্নভাবে অঙ্গহানি ঘটত। এখন নিমিষেই গুলি করে দেয়া হচ্ছে পাইপগান, এলএমজি, কাটারাইফেল দিয়ে, অনেক সময় আণবিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে নিমিষেই ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা ও জনপদ। এ হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে শুধু পক্ষ-বিপক্ষ ধ্বংস হয় তা নয়, মারা যায় নির্দোষ মানুষ, শান্তিকামী জনসাধারণ। এমনকি যারা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকেন তারাও এর শিকারে পরিণত হন। যেমন সংবাদকর্মী, জাতিসঙ্ঘ সদস্য। এ যেন এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি। প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার উপাদানগুলো নাগালের পাশে হওয়াতেই এ অবস্থার সৃষ্টি। দেশে দেশে এ ধরনের ঘটনা-মহাঘটনা এখন আর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দেখুন আফগানিস্তানের অবস্থা! এক মোল্লা ওমর, লাদেন ও তালেবান ঠেকাতে গিয়ে গোটা জাতিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ইরাকের অবস্থাও তাই। সাদ্দামকে ঘায়েল করার নামে গোটা দেশকে আজ পরাশক্তিগুলো তছনছ করে ছেড়েছে।

আমাদের সমাজেও সামান্য বাড়াবাড়ি ও আপত্তির শেষ পর্যায়ে দেখা যায় প্রতিশোধমূলক আচরণ। যেমন কোনো সন্ত্রাসী হাইজ্যাকার কর্তৃক কোনো মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে বেগ পেতে হলেই নৃশংসভাবে হামলা করা হয়। অনেক সময় অ্যাসিড মেরে প্রেমিক প্রেমিকার মুখ ঝলসে দিচ্ছে মুহূর্তেই। পরীক্ষায় খারাপ করেছে বলে কোনো ধরনের সুবিবেচনা মাথায় না এনে দেখা যায় কোনো কোনো ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যার মতো গর্হিত পথ বেছে নেয়। এ ধরনের খুন, জখম, আত্মহত্যা সমাজে কারো জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, নিজের খামখেয়ালি ও ধূর্তামি স্থায়ী করতে পারে না, পারে সমাজের শৃঙ্খলা ভাঙতে, গতি ও ধারাবাহিকতা স্তব্ধ করে দিতে, নিরুৎসাহিত করতে পারে সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নিল চিন্তা-চেতনা। সামাজিক অনিয়ম-অনাচারে আজ আর কোনো আগামাথা নেই। অভিনব পন্থায় ক্রমবর্ধমান হারের এসব অনাচার সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারলে, সভ্য সমাজের একজন সয়লাবে তা ভেসে যেতে বাধ্য। এ জন্য শাসক ও সমাজপতিদের দায়িত্ব ও ভূমিকা অগ্রগণ্য। পাশাপাাশি সমাজের নেতৃত্বের পরিবর্তন আনতে হবে। মসজিদ-মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রকৃত ধর্মের বাণী প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

সমাজ থেকে ঝগড়াঝাঁটি ও হিংসা, হানাহানি কমাতে হলে অনাচার উদ্দীপক সমুদয় উপাদানের সহজলভ্যতা আমাদের রোধ করতে হবে। সাধারণ মানুষের মাঝে হিংসা-দ্বেষ-ক্লেশ ইত্যাদির বদলায় ত্যাগ-প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, সামাজিক বন্ধন ও নিয়মকানুনের আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এমন আয়োজন উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে। ইসলাম ধর্মে এ ধরনের সামাজিক কর্তব্যকে ফরজ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছেঃ মানুষের মধ্য থেকে তোমরা নির্বাচিত। তোমাদের কাজ হলো সৎ কাজের আদেশ দান আর অসৎ কাজ থেকে বিরতকরণ। (আল কুরআন)

পবিত্র হাদিস শরিফে এসেছে ‘যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় কাজ দেখবে তা সে হাতে প্রতিরোধ করবে। যদি হাতে সম্ভব না হয় মুখে প্রতিবাদ করবে। যদি মুখে প্রতিবাদ করার সামর্থø না থাকে অন্তর দিয়ে হলেও তা ঘৃণা করবে এটা ঈমানের একটি ক্ষুদ্রতম দিক।’

মহানবী সাঃ-এর বাণীর মর্মানুসারে আমরা যে যেখানেই আছি সেখান থেকেই আপন সাধ্যমতো সমাজ সংশোধনের দায়িত্ব পালন করতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজে যদি সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত না হয় বা আমরা করতে না পারি, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে সমাজ সংশোধন করা দুরূহ ব্যাপার। একজন নেতা ঠিক হলে তার অধীনস্থ সব কর্মী ঠিক হতে বাধ্য। অপর দিকে একজন কর্মী ঠিক হলে বা সৎ হলে সে অন্য এক কর্মীকে সঠিক পথে আনা বা তার অসৎ নেতার ওপর প্রভাব বিস্তার করা তেমন সহজ নয়। এ জন্য বলা হয় মাছের পচন ধরে মাথা থেকে, আর সমাজের পতন শুরু হয় নেতৃত্ব থেকে। যে সমাজের নেতৃত্ব কলুষিত সে সমাজের মানুষদের দুর্ভাগাই বলতে হবে। কারণ তারা ভালো কিছুর ঘ্রাণ সহজেই গ্রহণ করতে পারবে না। আসুন আমরা সবাই একটি সুশীল সুন্দর বসুন্ধরা নির্মাণের কাজে ব্রত হই। কাজে লাগাই আমাদের মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মন্দির, প্যাগোডা ইত্যাদি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: