চোখ জুড়ানো হিরণ পয়েন্ট!

চোখ জুড়ানো হিরণ পয়েন্ট!


অনেক দিনের প্রতীক্ষার পর বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ সুন্দরবন দেখার সৌভাগ্য হলো। ভ্রমণের প্রধান স্থান নির্ধারণ করা হলো সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট, সেখানে পৌঁছা সময়সাপেক্ষ। আমরা ভ্রমণপিপাসু ৯ বন্ধু যথাক্রমে আমি জাভেদ হাকিম, জসিম, মোস্তাক, কামাল, কচি, মিলন, সাগর, লিটন ও আলাল। ভ্রমণে সার্বিক সহযোগিতা করলেন মংলা পৌরসভার কমিশনার আবদুল কাদের। রাতে গাড়িতে চড়ে খুব ভোরে মংলা ঘাটে পৌঁছে পূর্ব নির্ধারিত জালি বোটে উঠলাম। কমিশনারের মাধ্যমে জনসংখ্যা অনুযায়ী কাঁচাবাজার, ওষুধ, ফল ও মিনারেল পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা ছিল। কারণ আমাদের ভ্রমণের সময় জালি বোটে অবস্থান করতে হয়েছিল। জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে বোট হিরণ পয়েন্টের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে কী আনন্দ, বলে বোঝানো সম্ভব নয়। একটা সময় এলো সেলফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে চলে এলাম। পশুর নদীর ওপর দিয়ে চলছি, চারদিকে অথৈ পানি, দূর থেকে সুন্দরী গাছগুলো যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। পশুর, শিবসা ও হংসরাজ—এ তিনটি নদীর মোহনায় পৌঁছে এক অনন্য দৃশ্য অবলোকন করলাম আমরা। পশুর নদীর পানি থেকে হংসরাজের পানির উচ্চতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। পশুর নদীর পানি স্বচ্ছ এবং হংসরাজ নদীর পানি ঘোলা, সত্যিই সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। সকাল পেরিয়ে দুপুরের খাবারের পর্ব চলছে। কিন্তু এখনও বাঘ, হরিণ, কুমির তো দূরের কথা—একটি গাংচিলের দেখাও মিলল না। দূরবীন নিয়ে যারা ব্যস্ত, তারাও হতাশ। হঠাত্ মোস্তাক চিত্কার দিয়ে উঠল—দেখা পেয়েছি। হ্যাঁ, আমরা সবাই খালি চোখেই দেখতে পেলাম এক পাল হরিণ পড়ন্ত বিকালে ঘাস খাচ্ছে। আনন্দে সবাই আত্মহারা। ধীরে ধীরে আমাদের চোখে ধরা পড়তে লাগল গাংচিল, বক, অচেনা পাখিসহ মাছ ধরার দৃশ্য। বোট থেকেই দেখে নিলাম উলির চর। প্রায় সন্ধ্যার সময় নীল কমল নদীর তীরে স্বপ্নের সেই হিরণ পয়েন্টের জেটিতে এসে পৌঁছলাম। হিরণ পয়েন্টের রেস্ট হাউসে উঠে আমাদের মনে হলো আমরা যেন কিছু একটা জয় করে বীরের বেশে এখানে অবস্থান করছি। মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। আমরা ছাড়া আর কোনো ট্যুরিস্ট তিন তলার বিশাল রেস্ট হাউসে ছিল না এবং আশপাশে কোথাও না। সম্ভবত দুর্গম পথ ও বাঘের পদচারণ বেশি হওয়ায় এখানে পর্যটক আসার দুঃসাহস দেখায় না। সেদিক থেকে আমরা একটু ব্যতিক্রম। যেখানে ভয় সেখানেই আমাদের ভ্রমণের জয়। প্রকৃতি আমাদের সহায়, বিদ্যুিবহীন জোছনা রাত। পূর্ণিমার আলোতে মিঠা পানির পুকুরের পাশে বারবিকিউর আয়োজন হলো। সেদিন জোছনা রাত না হলে হয়তো রাতটা সাদামাটাই কেটে যেত। রেস্ট হাউসের কর্মকর্তাদের সতর্কবাণী বেশি রাত পর্যন্ত রুমের বাইরে থাকবেন না, যে কোনো সময় মামা চলে আসতে পারে। ওখানকার লোকেরা বাঘকে মামা বলে। অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে অবস্থান করলাম, মামাকে স্বাগত জানানোর জন্য। মামা (বাঘ) এলো না, সম্ভবত অভিমান করেছিল এতগুলো ভাগ্নে একত্রে থাকার জন্য। বাঘ দেখতে না পাওয়ার হতাশা আমাদের কাটিয়ে দিয়েছিল পূর্ণিমা রাতের আলো। সুন্দরবনের গভীরে মেঘ কিংবা কুয়াশাবিহীন পূর্ণিমা চাঁদ দীর্ঘদিন চোখের ফ্রেমে এঁটে থাকা এক অপরূপ ফটো। স্কুলের পাঠ্য বইয়ের সেই দুটি লাইন ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। পুরো সুন্দরবন ভ্রমণে আমরা এই লাইন দুটি মনে রেখেছিলাম।

হিরণ পয়েন্টের পাশেই কেওড়া সুতি। এখানে না গেলে যেন ভ্রমণের অপূর্ণতাই থেকে যেত। আমাদের সঙ্গে দুই ফরেস্ট অফিসার। বনের ভেতর কাঠের পাটাতনের ব্রিজ, এরপর অনেকদূর পর্যন্ত মাটির রাস্তা। দলে দলে হরিণের পাল ছোটাছুটি করছে। হঠাত্ উত্কট গন্ধ। বাঘের পায়ের চিহ্ন। কিঞ্চিত্ ভয়, কিন্তু বাঘ মামাকে দেখার বাসনাই বেশি। ফরেস্ট কর্মকর্তারা বললেন পায়ের চিহ্নে োঝা যায় মামা (বাঘ) সম্ভবত ২-৩ ঘণ্টা আগে এখানে এসেছিল। সুতরাং আপনারা আর বেশি দূর এগুবেন না এবং দল বেঁধে থাকবেন। কে শুনে কার বাণী যে যার মতো করে বাঘের সাক্ষাত্ পাওয়ায় ব্যস্ত। অবশেষে বাঘের পায়ের চিহ্নের স্মৃতি নিয়েই ফিরতে হলো সেখান থেকে। এবার যাচ্ছি দুবলার চরের আলোর কুল। বোট থেকেই দেখতে পেলাম সিডরের ভয়াবহতা। সুন্দরবনের দেহ থেকে এখনও সিডরের আঘাতের দাগ মোছেনি। আলোর কুল পৌঁছে দেখলাম বাহারি মাছের শুঁটকি। জেলেরা আমাদের টাটকা চিংড়ি উপহার দিল। ওদের নিঃস্বার্থ উপহার আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রইল। আলোর কুল ঘুরে এখন চলছি দুবলার চরের একাংশ মেহের আলি চরে। মেহের আলি চর পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। পর্যাপ্ত হরিণ দেখে মনে হয় যেন গৃহপালিত। সেই সঙ্গে প্রচুর বানরের কিচিরমিচির। চরের একপাশে বঙ্গোপসাগর আর অন্য পাশে নোনা জলের পশুর নদী। সুন্দরী গাছের চেয়ে গোলপাতা, ম্যানগ্রোভ আর কেওড়া গাছের আধিক্য বেশি। ইচ্ছে করলে জেলেদের কাছ থেকে বিনামূল্যে সাগরের মাছ নিয়ে খেতে পারেন। এই চরে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র আছে। দুর্ভাগ্য ঘটনাক্রমে আমাদের সেখানে রাতে আশ্রয় হলো না। অগত্যা পালাবদল করে জালি বোটেই ঘুমাতে হলো। শহরের ধনীর দুলালদের জালি বোটের পাটাতনে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা হলো। সেও বা কম কিসের, ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঝুলি একধাপ সমৃদ্ধ হলো। শেষ রাতে জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে জালি বোট স্টার্ট নিল। প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভাঙল সবার। আলো আঁধারের মাঝে উপভোগ করলাম এক অন্যরকম সকাল। কচির ধুন কথা, জসিমের বেঁচে থাকার বাসনা, মোস্তাক ও সাগরের অফুরন্ত চুটকি, আলালের কেনা শুঁটকির গন্ধতে তিন দিনের ভ্রমণ হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য। বোট চলছে মংলার উদ্দেশে মাঝে তিন জায়গায় বিরতি নিয়ে কিছুটা সময় ঘোরা হলো। প্রথমে হারবারীয়া ভেতরটা বন বিভাগ দ্বারা সাজানো গোছানো, দ্বিতীয় স্পট জয়মনি ঘোল গ্রাম, খুবই সুন্দর। মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো ছবি। বোট থেকেই দেখা হলো বদ্রা। সেখানে কুমিরের উপদ্রব রয়েছে। সময় নিয়ে অবস্থান করলে নোনাজলের কুমির দেখা যায়। তৃতীয় স্পট করম জল, সেখানে রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ওর থেকে সুন্দর বনের রূপ দেখা যায়। তৃতীয় স্পট করম জল, সেখানে রয়েছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ওপর থেকে সুন্দরবনের রূপ দেখা যায়। সত্যিই সুন্দরবন নামের পূর্ণ সার্থকতা রয়েছে। ম্যানগ্রোভ এই বনকে নিয়ে আমরা বিশ্বের ভ্রমণ পিয়াসীদের কাছে গর্ব করতে পারি নিঃসন্দেহে। ভ্রমণ সার্থক ও সুন্দরবন ভ্রমণে সহযোগিতা করেছেন সচিবালয়ের সরকারি কর্মকর্তা শরফুদ্দিন আহমেদ রাজু, ডাক্তার আতিয়া রহমান এবং পর্যটন করপোরেশনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
ভ্রমণের প্রয়োজনীয় কিছু টিপস:
১. প্রাণবন্ত উদার মানসকিতা
২. প্রয়োজনীয় অর্থ
৩. ভ্রমণের স্থান সম্পর্কে পূর্ব ধারণা
৪. প্রকৃতিকে উপভোগ করার দৃষ্টি
৫. নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলতা

মো. জাভেদ হাকিম
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: