ফুসফুসের সুস্থতায় করণীয়

ফুসফুসের সুস্থতায় করণীয়


ফুসফুসের সুস্থতার জন্য সব সময়ই ওষুধের প্রয়োজন পড়ে। ফুসফুসের রোগ দেখা গেলেই চিকিৎসক ওষুধ প্রয়োগ করেন। অথচ কিছু কিছু ওষুধ আছে যেগুলো ফুসফুসের ওপর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সাধারণ মাত্রায় সেবন করলেও কিছু কিছু ওষুধ শ্বাসনালী, এলভিওলি এবং ফুসফুসের আবরণীর প্রতি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নিদ্রাবর্ধক ওষুধ শ্বাসতন্ত্রের ফেইলিউর বা ব্যর্থতা ঘটাতে পারে। অ্যান্টি-কোয়াগুলেন্ট জাতীয় ওষুধ খেলে কফের সাথে রক্ত যেতে পারে এবং মাংসপেশি শিথিলকারী ওষুধ খেলে শ্বাসতন্ত্রের মাংসকে অবশ করে দিতে পারে। এগুলো হলো সবই ওষুধের পরোক্ষ প্রভাব। যে সমস্যাটি বেশি দেখতে পাওয়া যায় সেটা হলো প্রদাহনাশক ওষুধ কিংবা বিট ব্লকার খেলে হাঁপানি রোগ বেড়ে যেতে পারে।

ওষুধসংক্রান্ত হাঁপানিঃ বিটা ব্লকার

হাঁপানি কিছু ওষুধের প্রভাবে হতে পারে অথবা বেড়ে যেতে পারে। যারা ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোতে নিয়োজিত আছেন তারা কিছু ওষুধের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়তে পারেন। কারণ ওষুধগুলো তাদের শ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকতে থাকে। বিশেষ কিছু ধরনের ওষুধের মধ্যে পেনিসিলিন, সিমিটিডিন, পাইপেরাজিন, সেফালোস্পোরিন এবং মিথাইলডোপা। হাঁপানি রোগীকে যে ওষুধটি সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলে সেটা হলো বিটা ব্লকার। এটা এখন অনেকেরই জানা হয়ে গেছে যে, বিটা ব্লকার হাঁপানি রোগীদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু গোলযোগ তখনই দেখা দেয় যখন চিকিৎসকরা বিটা ব্লকার বুক ধড়ফড় এবং উচ্চ রক্তচাপের জন্য লিখে থাকেন এবং উচ্চ রক্তচাপের জন্য বিটা ব্লকার একটি প্রকৃত কার্যকর ওষুধ বটে। অথচ বিটা ব্লকার ব্যবহার হাঁপানি রোগীদের জন্য নিষিদ্ধ। এমনকি চোখের ড্রপে বিটা ব্লকার থাকলেও হাঁপানির আক্রমণ হতে দেখা গেছে। তবে প্রোপ্রানোলল খেলে যতটা বিপদের আশঙ্কা থাকে এটিনোলল বা মেটোপ্রোলল খেলে ততটা বিপদ নাও ঘটতে পারে। যদিও হাঁপানিতে এগুলো ব্যবহার না করাই ভালো। এ ধরনের হাঁপানি আক্রমণে সালবুটামল, টারবুটালিন, ইনহেলারের সাহায্যে ব্যবহার করলে রোগীর শ্বাসকষ্ট কমে যায়। তাই উচ্চ রক্তচাপে আক্রমণ রোগীদের বিটা ব্লকার না দিয়ে ক্যালসিয়াম এন্টাগোনিস্ট দিয়ে চিকিৎসা করাই ভালো।

বেদনানাশক এবং প্রদাহনাশক ওষুধ

এসপিরিনজনিত হাঁপানি অনেক বছর ধরেই পরিচিতি লাভ করেছে। তবে সম্ভবত প্রায় সব প্রদাহনাশক বেদনা নিরোধ ওষুধই হাঁপানি আক্রমণ বাড়াতে পারে। তাই হাঁপানি রোগীকে যদি এই জাতীয় ওষুধ সেবন করাতেই হয় তাহলে প্রথম ডোজটি চিকিৎসকের পূর্ণ আওতাধীন রেখে খাওয়ানোই ভালো। এসপিরিন অ্যান্ড ইন্ডোমেথাসিন বেশি ভয়ঙ্কর, হাঁপানি আক্রমণের জন্য দায়ী। প্যারাসিটামল এ ব্যাপারে যথেষ্ট নিরাপদ বলে আমি মনে করি। তবুও যারা ওষুধের প্রতি অতি মাত্রায় সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামলের ব্যবহারও সতর্কভাবে করতে হবে। বেদনানাশক ওষুধের প্রতি সংবেদনশীল রোগীদের খুব অল্প মাত্রায় তা প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়িয়ে সংবেদনশীলতা কমানোর চেষ্টা করতে হবে। হঠাৎ করে এমাইনোফাইলিন প্রতিক্রিয়ার জন্য শ্বাসনালীর সঙ্কোচন হতে পারে। যদি আন্তঃশিরাপথে পেনিসিলিন অথবা আয়রন ডেক্সট্রন কমপ্লেক্স দেয়া হয় তখনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যে ওষুধ প্রয়োগ করে হাঁপানির আক্রমণ দূর করা হয়, কিছু অতি সংবেদনশীল হাঁপানি রোগী রয়েছে তাদের বেলায় সেই ওষুধগুলো আরো বেশি অঘটন ঘটাতে পারে। ওষুধগুলো হাঁপানি চিকিৎসায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন এমাইনোফাইলিন অথবা আন্তঃশিরা পথের হাইড্রোকোর্টিসন সল্ট।

ওষুধজনিত কাশি

আজকাল উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ওষুধ যেমন ক্যাপটোপ্রিল, এনাপ্রিল যাকে এনজিওটেনসিন কনভার্টিং এনজাইম ইনহিবিটর বলে, সেগুলো ভয়ঙ্কর ধরনের কাশির জন্ম দেয় যেখানে খুব একটা কফ থাকে না। তবে ওই ওষুধগুলোতে হাঁপানি হয় না। তাই একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগী যদি খুব কাশিতে ভুগে চিকিৎসকের কাছে আসে তখন প্রথমেই খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে রোগী কোন ওষুধ তার উচ্চ রক্তচাপের জন্য সেবন করছেন। যদি এমন ধরনের ওষুধ খান তাহলে অবিলম্বে তা পরিবর্তন করতে হবে। আন্তর্জাতিক হিসাব মতে, এ ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার ৭ শতাংশ। যদিও আমি যে ট্রায়ালটি সম্পন্ন করেছি তাতে ১১ শতাংশ পাওয়া গেছে।

এডাল্ট রেসপিরেটর ডিসট্রেস সিনড্রোম বা এআরডিএল বলে একটা সমস্যা রয়েছে যাতে রোগী প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভোগে। এই এআরডিএস কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাইড্রোক্লোরখায়াজাইড অথবা বিটাসিমপেথোমাইমেটিক জাতীয় ওষুধের প্রতিক্রিয়ার ফলে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়া সালফোনেমাইড, কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, মেত্থোট্রেক্সেট এবং প্রোকারবাজিন জাতীয় ওষুধ ইয়োসিনোফিলিয়া ঘটাতে পারে। এর ফলে ফুসফুসের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অসুবিধা দেখা দেয়, যা এক্স-রেতে ধরা পড়ে। তবে ভালো দিক হলো এ ওষুধগুলো সেবন বন্ধ করে দিলে সমস্যাগুলো নিজে নিজেই দূর হয়ে যায়। অনেক সময় স্টেরয়েড ব্যবহার করে রোগীকে তাৎক্ষণিক সুস্থতা দেয়া সম্ভব। ইয়োসিনোফিলিয়া ছাড়াও ফুসফুসে এলভিওলাইটিস ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইট্রোফুরানটয়েন, ব্লিওমাইসিন প্রভৃতি ওষুধ।

তা হলে দেখা যাচ্ছে এমনিতেই ধূমপান পরিবেশ দূষণের জন্য বক্ষ্যব্যাধি হয়। আবার অনেক রোগীর নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত ওষুধও ফুসফুসের অনেক সমস্যার জন্মদাতা। তাই ফুসফুস এবং ওষুধ এ দু’টির ব্যাপারে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েরই সচেতন থাকতে হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: