আমরা কি সুন্দরবন হারাতে যাচ্ছি?

আমরা কি সুন্দরবন হারাতে যাচ্ছি? 


বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ তথা কাদাপানির বন সুন্দরবন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে এক নম্বর স্থান পাওয়া উচিত এবং চলতি প্রতিযোগিতায় তা যোগ্যতম দাবিদার। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম জোয়ারবিধৌত গরান বনভূমি। এই বনের বর্তমান আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বিগত শতকেও এর আয়তন ছিল প্রায় ১৭ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। মানুষের আগ্রাসনে বর্তমানে সুন্দরবন সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। বনের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের, বাকিটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের। এখানে বিরল প্রজাতির প্রায় ৫০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ৩০ হাজার হরিণ রয়েছে। হাঙ্গর, কুমির, বানর, নানা প্রজাতির পাখি, পতঙ্গ, অজগর সাপসহ তিন হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ২১৭ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির জলজ প্রাণী, ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং দুই হাজার ১০ প্রজাতির মাছ রয়েছে। ১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালে সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বা বিশ্ব ঐতিহ্য উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। এই সুন্দরবন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ছয় লাখ লোকের জীবিকার উৎস। বিগত সিডর ও আইলায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সুন্দরবন দ্রুত প্রাকৃতিক শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে আমরা যখন ভোটযুদ্ধে প্রচার বিপ্লবে মুখরিত, আমাদের লক্ষ্য যেমন করেই হোক ছিনিয়ে আনতে হবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্যের রানীর মুকুট। যার ফলে বিকশিত গর্বে উদ্ভাসিত হবে প্রিয় সুন্দরবন। এমনই এক বিজয়মুখর ঝঙ্কারের মাঝে খবরের কাগজে বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে মাত্র ১০ কিলোমিটার অদূরে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার কৃষি ও মৎস্য চাষের স্বর্গ সাপমারী, কৈগরদাসকাটি, কাটাখালি মৌজায় সম্পূর্ণ কৃষিজমিতে প্রতিষ্ঠিত হতে চলছে ভারতীয় আর্থিক সহযোগিতায় ২৬৪০ মেগাওয়াট বিদুøৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদুøৎ প্রকল্প। আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই, আমরা উন্নয়ন চাই, দেশের বিদুøৎ সমস্যা সমাধান হোক আমরা তা কামনা করি। তবে নানা কারণে বিগত কয়েক দশক থেকে হয়তো বা বাধ্য হয়ে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ স্থানগুলোতে মানবীয় কার্যাবলি দানবীয় রূপ ধারণ করতে চলেছে।

ফলে পরিবেশ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আশা করা যায়, দেশের গণমুখী গণতান্ত্রিক সরকার এ ধরনের কাজ অবশ্যই নিরুৎসাহিত করে দেশীয় প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

একজন পরিবেশবাদী, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বলতে চাই, এ দুরভিসন্ধিমূলক প্রকল্প প্রিয় সুন্দরবনকে অদূরভবিষ্যতে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। হাজার হাজার কৃষক হবে গৃহহীন, কর্মহীন। স্বভাবত ‘সুন্দরবন বাঁচাও, সুন্দরবন সাজাও’ স্বার্থে কয়লাভিত্তিক বিদুøৎ প্রকল্প এই স্থানে প্রতিষ্ঠাকে কেউই ভালো চোখে দেখছে না। যদি প্রস্তাবিত তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আমরা কি অদূরভবিষ্যতে আমাদের প্রিয় সুন্দরবনকে হারাতে চাচ্ছি, নাকি দেশের অন্যত্র কোথাও এই প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎ প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠার মতো জায়গা নেই? দুর্ভাগ্য আমাদের বলতেই হবে, যে জায়গাটি সরকারের এবং সরকার নিয়োজিত দেশের বরেণ্য পরিবেশবিদ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা সংশ্লিষ্ট চিন্তাবিদরা স্থান নির্ধারণ করেছেন, তাদের কি একবারও চোখে পড়েনি, এমন অসংখ্য হাজার হাজার একর জায়গা পড়ে আছে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে। এ কারণে বাংলাদেশের হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক আদেশে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। আদেশে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সন্নিকটে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র কেন বাতিল করা হবে না। একই সাথে ওই প্রস্তাবিত বিদুøৎকেন্দ্রের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

আমাদের প্রস্তাব ‘সুন্দরবন বাঁচাও, সুন্দরবন সাজাও’-এর বাস্তবিকতায় দেশ জাতির কল্যাণে তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হোক জেগে ওঠা বিশাল চরাঞ্চল বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকায় মাদারীপুর জেলার আড়িয়াল খাঁ নদীর পাশে। মূলত কয়লা আমদানিনির্ভর এই প্রস্তাবিত প্রকল্প, এটা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য যে, বাংলাদেশের কয়লার খনি উত্তরবঙ্গে আর কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্রের প্রস্তাব করা হয়েছে দক্ষিণবঙ্গে। সুতরাং কয়লা আসবে ভারত থেকে আর শুধু খরচ বাঁচাতে সুন্দরবনের সর্বনাশ ডেকে আনা হচ্ছে­ এটাই কি সুন্দরবনের প্রতি আমাদের ভালোবাসা? সে যা-ই হোক, একজন দেশপ্রেমিকের চাওয়া পাওয়া হবে­ সুজলা বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎ প্রকল্প যদি করতে হয়, তা হলে ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা দিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হোক কয়লা ইয়ার্ড, প্রতিষ্ঠিত হোক এখানে তাপবিদুøৎ প্রকল্পের অবকাঠামো। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে করতে হবে নদী খনন। ফলে মরে যাওয়া নদী ফিরে পাবে নাব্যতা, বন্যার কবল থেকে মুক্তি পাবে বৃহত্তর ফরিদপুরবাসী আর সমাধান হবে সীমাহীন বিদুøৎ সমস্যা। সেই সাথে বেঁচে যাবে আমাদের প্রিয় সুন্দরবন।

সুন্দরবন বিশ্ববাসীর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, পৃথিবীর বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নান্দনিক পরিবেশের তুলনায় সুন্দরবনের তাপমাত্রা সুষম এবং বিভিন্ন দিক থেকে সমৃদ্ধ সুন্দরবন, সবুজে ঘেরা এ অপরূপ সুন্দরবনের গাছপালার বেশির ভাগই ম্যানগ্রোভ ধরনের সৌন্দর্য দেখতে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটছে এবং অদূরভবিষ্যতে ব্যাপক প্রসার ঘটবে নিঃসন্দেহে। যা বলার অপেক্ষা না।

আমরা বিশ্বাস করি বিদুøতের সীমাহীন চাহিদা রয়েছে, বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যার মধ্যে বিদুøৎ একটি। কিন্তু এ সমস্যার সমাধান দিতে গিয়ে সুন্দরবনের মতো একটি অমিত সম্ভাবনার প্রতীককে তো ধ্বংস করতে দিতে পারি না। এটা যেন মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার মতো। অতি সম্প্রতি সম্ভবত এ কারণে ‘সেভ দ্য সুন্দরবন’ নামে একটি সংগঠন সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। যেখানে বলা হয়েছে, সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রস্তাবিত তাপবিদুøৎ কেন্দ্রকে না বলুন। কারণ প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবন বিশ্বের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, এ সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে এবং বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের এ সুন্দরবনকে সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে নিয়ে যেতে জোর ভোটিং চলছে বিশ্বজুড়ে। সুন্দরবন বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব আধার। সুন্দরবন মূলত উদ্ভিদ সম্পদের সমাহার।

উদ্ভিদ বা গাছপালা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে রয়েছে, যারা বিশ্বাস করে তাদের জন্য গাছপালা ও ফলফলাদিতে আল্লাহ্‌র নিদর্শন রয়েছে। গাছ লাগানো এমন একটা সাদকা-ই-জারিয়া যার ফজিলত বৃক্ষরোপকের মৃতুøর পরও অক্ষুণ্ন থাকে। নিজের প্রয়োজনে গাছ লাগালে তা-ও সৎকর্ম। গাছ সম্পর্কে বিশ্বের গুণীজনও বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যেমন­ বুদ্ধ বলতেন, অরণ্য একটা অসামান্য জীব। অপরিসীম দয়া ও বদান্যতার আধার। প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই তার আনন্দ। নিজের জীবনধারণের জন্য সৃষ্ট উপাদানগুলোও সে বিলিয়ে দেয় অন্যের প্রয়োজনে। এমনকি যে কাঠুরে তাকে ধ্বংস করে, সেই কাঠুরেকেও ছায়া দিতে কার্পণ্য করে না। স্যার জগদীশ বসু-ই প্রথম মেটাল-ফ্যাটিগের ওপর গবেষণা করে লক্ষ করেন গাছেরও প্রাণ আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘সমস্ত জীবনের অগ্রগামী গাছ, সূর্যের দিকে জোড় হাত তুলে বলছে­ আমি থাকব, আমি বাঁচব, আমি চিরপথিক, মৃতুøর পর মৃতুøর মধ্যে দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশতীর্থে যাত্রা করব রৌদ্রে-বাদলে, দিনে-রাত্রে।’ বর্তমানে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, গাছেরা গান শুনতেও ভালোবাসে। আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে, যে দেশের রোগ সে দেশের গাছগাছড়ায় তার নিরাময়। যে উদ্ভিদকে নিয়ে এত কথা, সেই উদ্ভিদরাজির ভাণ্ডার সুন্দরবনকে যেকোনোভাবেই বাঁচাতে হবে।


সবশেষে বলব, হাজার হাজার বছরের পরিপূর্ণতায় যে অনন্য সুন্দরবন তৈরি হয়েছে তা পরিবেশ বিনষ্টকারী কোনো কর্মকাণ্ড দিয়ে বিনষ্টের উদ্যোগ নেয়া যাবে না। ম্যানগ্রোভ বন অন্যান্য দেশে আছে, কম-বেশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে (কলকাতায়) আছে। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ যেভাবে সুন্দরবনকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে আমাদেরও তাই করা অত্যাবশ্যক, বরং আরো বেশি যত্ন নিয়ে করা উচিত। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে যা করা হচ্ছে না, তা আমাদের সুন্দরবনেও করা সঠিক হবে না। বলতে হবে­ এক সুন্দরবন দুই রূপ নিতে পারে না। স্থানীয় জনসাধারণ তা চাইতে পারে না। মনে রাখতে হবে সুন্দরবন বাংলাদেশের নয়, এটা বিশ্ববাসীর। কোনো সুন্দরবনপ্রেমীরই এটা কোনো অবস্থায় ভালো লাগার কথা নয়। সুন্দরবনের এক অংশে হবে কয়লাভিক্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র আর অন্যত্র থাকবে নির্মল ঠাণ্ডা সমীরণ। সুতরাং ভোটের সাথে সাথে সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে।

তাই আমাদের স্পষ্ট বিশ্লেষণঃ ১. সুন্দরবনের সাথে সংলগ্ন করে তাপবিদুøৎ কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে কথাটি প্রচার হলে বা স্থাপনের কাজ শুরু হলে সুন্দরবনের পক্ষে ভোট দেয়ার হার কমে যাবে, এর ঐতিহ্যমূল্য কমে যাবে। ২. বর্তমানে স্যাটেলাইট ছবিতে স্পষ্টই দেখা যায় যে, ১০ বছর আগে ২০০০ সালে ভারতীয় সুন্দরবন ছিল ফাঁকা শূন্যস্থানে পূর্ণ, অথচ বর্তমানের ছবিতে দেখা যায় সেখানকার সুন্দরবন ঘন সবুজ অথচ বাংলাদেশ অংশে প্রচুর ফাঁকা স্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা আগে ঘন সবুজ বন ছিল। এটাই প্রমাণ করে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ কত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বনায়ন করা হয়েছে। অথচ আমরা এখন যৌথভাবে বাংলাদেশের সুন্দরবন ধ্বংসের খেলা শুরু করেছি। ৩. সুন্দরবনের পাশে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদুøৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে দেখা যাবে কয়েক বছর পর সেখানে শুধু কয়লার ডিপো স্থাপন করা হচ্ছে, বিদুøৎ উৎপাদনের নামে হবে দেদার গাছ কাটা, বনে আগুন লাগানো, বাঘ, হরিণ, কুমির প্রভৃতি ধরা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: