তাকওয়া : পবিত্রতার মানদণ্ড

ইসলাম যে কোনো ধরনের ব্যবধান ও মেরুকরণকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এ বিষয়টি কোরআনে অতীব জোরের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, যে কারণে ‘তাকওয়া’ কথাটি আল কোরআনে নানাভাবে ১৫১ বার ব্যবহৃত। নির্দেশ দেয়া হচ্ছে—
‘হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করো; প্রত্যেকেরই উচিত ভালো করে লক্ষ্য করা আগামী দিনের জন্য (আখিরাত) সে কী প্রেরণ করছে’ (সূরা হাশর- আ.-১৮)।
অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী উপমা-সহকারে তাকওয়া ও তাকওয়াহীনতার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে আল কোরআন আমাদের এ কথাও বলছে—
‘যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহর ভয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর সে ব্যক্তি উত্তম, নাকি যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে পতনোন্মুখ ধ্বংসের কিনারায়, যা অচিরেই অগ্নিময় জাহান্নামের খাদে গিয়ে পড়বে’ (সূরা তাওবাহ-আ.-১০৯)।
আর আমাদের এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে, অনন্তকাল সুখ ও সাফল্য শুধু মুত্তাকিদের জন্যই :
‘তোমরা তোমাদের মালিকের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার কাজে এগিয়ে চলো; এবং সেই জান্নাতের জন্যও, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবী থেকেও বিশাল, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য’ (সূরা আলে ইমরান-আ.-১৩৩)।
অবশ্য প্রত্যেক সমাজে ও সম্প্রদায়ে কিছু মানুষ সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু অন্য অনেকে আবার পেছনে পড়ে থাকে। তাকওয়া ক্ষেত্রেও একই রকম। অতএব স্পষ্টতই কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় একটু বেশি তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। অবশ্য তাকওয়া যেহেতু অন্তরের ব্যাপার (সূরা আল হজ-আ.-৩২); সুতরাং আমাদের পক্ষে এটা বিচার করা সম্ভব নয় যে, কার তাকওয়া কতটা খাঁটি ও কতখানি গভীর। তবে এটা সত্য, নানা বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে তাকওয়া আমাদের কাজে ও ব্যবহারে প্রতিফলিত হয়। অতএব এক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে এটা নির্ণয় করা মোটামুটি স্বাভাবিক ও সাধারণ যে, তাকওয়ার প্রতিযোগিতায় কার অর্জন কতখানি। কিন্তু আমাদের যারা পিছিয়ে পড়েছে, তারা যেন এই সংশয়ে আক্রান্ত না হয় যে, তারা আর প্রতিযোগিতার মধ্যে নেই। কারণ তাকওয়া ছাড়া অন্য আর তো কোনো প্রতিযোগিতাই নেই।
বলা আবশ্যক, তাওহিদি-বিশ্বাস নিয়ে আমরা সব মুসলমানই একযোগে এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বর্তমান। ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নেতা এবং তার অনুসারী, লেখক ও পাঠক, প্রচারক এবং শ্রোতা, শাসক ও শাসিত, বৃদ্ধ-যুবক, পুরুষ ও নারী—সবার জন্যই তাকওয়া অপরিহার্য। কারণ আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে সে ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে মুমিন ব্যক্তির মধ্যে যত বেশি তাকওয়া বিদ্যমান (সূরা হুজুরাত-আ.-১৩)। ইসলামী সমাজ আসলে তাকওয়াসচেতন সমাজ; আর এ সমাজে তিনিই সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, যিনি সর্বোচ্চ তাকওয়ার অধিকারী বলে বিবেচিত। এই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ছাড়া জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম অর্জন একরকম প্রায় মূল্যহীন।
যা হোক, এসবই নীতি হিসেবে স্পষ্ট। কিন্তু কার্যত আমাদের অনেকেই এমন ধারণা পোষণ করে যে, মুত্তাকিরা আমাদের মতো সাধারণ মুসলমান থেকে আলাদা একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষ। এটা আসলে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের কাছ থেকে আমদানিকৃত একটা অতীব বিপর্যয়কর ধারণা। কারণ শরিয়াহ একটি অটুট ও অবিভাজ্য বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত; অথচ প্রাগুক্ত বক্র ও ভ্রান্ত ধারণার কারণে শরিয়াহ ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থাত্ অখণ্ড-অবিভাজ্য শরিয়াহ আজ এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা ও স্বাধীনতার বস্তু হয়ে দাঁড়াল, যার ফলে আমরা ভাবতে লাগলাম ‘সাধারণ মুসলমান’এর অবস্থান অনেকখানি আলাদা। এই বিবেচনা আমাদের অনেক পাপ ও অপরাধ, সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাকে পূর্বপ্রস্তুতকৃত মনগড়া ন্যায্যতা দ্বারা শুধু প্রশ্রয়ই দান করে না, এমনকি গ্রহণযোগ্যও করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত আমরা এ বিশ্বাসকে গ্রহণ করি, ‘যাই বলা হোক, আমি তো মুত্তাকি নই’।
তাকওয়ার বিপরীত পার্শ্ব হলো পাপ এবং যে ধারণা ও মনোভাব, তাকওয়া শুধু একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর অর্পিত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, সেটা আসলে সাম্প্রতিককালে আমদানিকৃত অন্য একটি বস্তু; আত্মসাধুতা (ঝবষভ জরমযঃড়ঁংঁবংং)। ইসলামী শরিয়াহর বিচ্যুতি ঘটানোর ক্ষেত্রে এই আত্মসাধুতা একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও কার্যকর অস্ত্র; যা রীতিমত চ্যালেঞ্জিংও বটে এবং ইসলামের দুশমনদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি ঘৃণ্য কৌশলও বটে।
আল কোরআন আমাদের কঠিনভাবে নিষেধ করছে, আমরা যেন নিজেদের পবিত্র বলে দাবি না করি। ‘কখনও নিজেকে পবিত্রতম দাবি করো না; আল্লাহপাকই ভালো জানেন, কোন ব্যক্তির মধ্যে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি বিদ্যমান’। (সূরা আন নজম-আ.-৩২)।
যেহেতু এটা একটা গুরুতর পাপ, কাউকে তার অপরাধকর্মের জন্য দোষারোপ করার আগে আমাদের অবশ্যই চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন; কারণ হতে পারে তারা হয়তো কোনো ‘মুনকার’ অর্থাত্ অসত্কর্মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করেই কাজটা করেছে। আল কোরআন এ ধরনের অভিযোগের কথা ইতিহাসকে সামনে রেখে সবিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখ করেছে। হজরত লুত (আ.) যখন তার জাতিকে সমকামিতার জঘন্যতা সম্পর্কে সতর্ক করছিলেন, তারা তখন উল্টো করে নবীকেই দোষারোপ করতে শুরু করল যে, তিনি একটু বেশি ভালো মানুষ (সূরা আন নমল-আ.-৫৬)।
একবার হাজী ইবনে আবি লাইলা একটি বিশেষ ঘটনার কারণে হজরত ইমাম আবু হানিফার (রহ.) সাক্ষ্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। ঘটনাটি এরকম : আগের দিন তাঁরা উভয়ে একসঙ্গে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে দেখা গেল কয়েকজন মহিলা গান করছে। তাদের দেখামাত্র মহিলারা গান বন্ধ করে দিল। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বললেন, ‘ভালো’, যার অর্থ ছিল এটা ভালো যে তারা গান বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু কাজী আবি লাইলা ভাবলেন, আবু হানিফা ‘ভালো’ কথাটি বলেছেন গানের প্রশংসার্থে, অতএব কাজী তাঁকে প্রকাশ্যে ফাসিক (পাপাচারী) ঘোষণা করলেন এবং জানিয়ে দিলেন, তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অথচ ব্যক্তিটি এমন যিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আইনবিদ, অত্যন্ত উঁচুমানের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত, অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ; আর এরকম একজন ব্যক্তিই জনসমক্ষে ‘ফাসিক’ বলে ঘোষিত হলেন। অনেকে ধারণা করতে পারে, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কাজীর ‘আত্মসাধুতার’ বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ আনা যায়। যায়, কিন্তু ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কী করলেন? তিনি সরলভাবে তাঁর মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন এবং তারপর তার সাক্ষাত্দানের অনুমতি লাভ করলেন। এটা অবশ্য একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। ইসলামের ইতিহাসে, তীব্র ও অবারিত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও এমন উদাহরণ খুবই বিরল, যেখানে কেউ তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আত্ম-পবিত্রতার অভিযোগ তুলে ধরেছেন। কিন্তু কেন বা কী কারণে? আসলে এ অভিযোগ তৈরি হয় সেখানে, যেখানে ধর্মনিষ্ঠতা ও সাধারণ জীবনের মধ্যে প্রবলভাবে মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ সেক্ষেত্রে এটা সম্ভব যে, কোনো উচ্চতর মান অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কপটভাবে তার ধর্মীয়-সংলগ্নতাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলার চেষ্টা করছে। আর এ কারণেই তার ওপর অর্পিত হচ্ছে আত্মপ্রচার-সদৃশ ‘আত্ম-পবিত্রতা’ প্রদর্শনের অভিযোগ বা অপরাধ। কিন্তু ইসলামে যেহেতু শুধু একটাই শরিয়াহ ও একটাই জীবন বিধান; অতএব সবার জন্য পবিত্রতার একই মানদণ্ড।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: