মানবকল্যাণে দয়া ও ভালোবাসা

দয়া ও ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। একটি মহৎ গুণ। দয়া ও ভালোবাসা ছাড়া কোনো মানুষ থাকতে পারে না। সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই রয়েছে এর আবেদন। রয়েছে সৃষ্টির সব প্রাণীর মধ্যেও। সৃষ্টির আদি থেকেই চলে আসছে এ ধারা। প্রথমে মানুষ হজরত আদম ও হাওয়া আঃ-এর মধ্যেও ছিল এর যতার্থ উপস্থিতি। মানুষ সৃষ্টি করেই আল্লাহতায়ালা তাকে দান করেছেন এই গুণ। যা মানুষের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে পরস্পরে দয়া ও ভালোবাসা।’ (সূরা, রুম-২১)

দয়া ও ভালোবাসার এই গুণটি মহৎ, যা মানুষকে উদার হতে শেখায়। কোমল করে তোলে। নম্র-বিনম্রতার ছবক দেয়। দয়া ও ভালোবাসার এই গুণের মানুষটি সবার প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রিয় হয়ে ওঠে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাঃ-এরও। তাঁর ওপরই বর্ষিত হয় আল্লাহর অবারিত দয়া রহমত। কারণ যে মানুষের সাথে দয়া ও ভালোবাসার আচরণ করে না, সেও লাভ করতে পারে না তার অপার দয়া ও রতমত। এক হাদিসে আছেঃ হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ রাঃ বর্ণনা করেন রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা তার উপর দয়া করে না, যে মানুষের উপর দয়া করে না।’ (বুখারি মুসলিম)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে আছে রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘দয়াশীল তারাই যাদের উপর আল্লাহতায়ালা দয়া করেন। তোমরা জমিনবাসীদের (মানুষের) উপর দয়া করো, আকাশের অধিবাসী (আল্লাহ) তোমাদের উপর দয়া করবেন।’

দয়া ও ভালোবাসার কল্যাণেই একজন মানুষ সাধন করতে পারে আত্মিক উন্নতি। হতে পারে পূত-পবিত্র ও কোলম চরিত্রাধিকারী। মুক্ত হতে পারে হিংসা বিদ্বেষ অহঙ্কার থেকেও। কারণ আল্লাহতায়ালার জন্য নিঃস্বার্থ এই ভালোবাসায় অন্তরে কোনো ক্লেদ ক্ষোভ থাকে না। থাকে না ঝঞ্ঝাট মনোমালিন্যতাও। সে হয়ে ওঠে স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন হৃদয়াধিকারী।

আর মানবকল্যাণে মানুষের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা ছাড়া কোনো মানুষ পূর্ণ মুমিন হতে পারে না। পারে না আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে। হাদিসে আছে হুজুর সাঃ বলেছেন, ‘সেই আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! কোনো মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই ভালোবাসবে, যা সে নিজের জন্য ভালোবাসে।’ (বুখারি, মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে আছে রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর পরস্পরকে ভালোবাসা না পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমারদের এমন একটি বিষয়ের খবর দেবো না, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে সক্ষম হবে? তাহলো তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করবে।’ (মুসলিম)। উল্লিখিত হাদিসে মানবকল্যাণে দয়া ও ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। আর এই গুণটিই হলো একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিনের আলামত।

দয়া ও ভালোবাসা শুধু মানুষের প্রতিই নয়। আল্লাহ সৃষ্ট প্রতিটি প্রাণীর ওপরও দয়া ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। আমাদের গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল, উট, মহিষ, ভেড়া ইত্যাদির প্রতিও দয়ার্দ্র হতে হবে। আমরা কোনো প্রাণীকে যেন অনাহারে না রাখি কিংবা সাধ্যের বাইরে কাজ আদায় না করি সে দিকেও বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। হুজুর সাঃ সব প্রাণীর প্রতি সদয়াচরণের কথা বলেছেন। সুহাইল ইবনে হানজালা রাঃ থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে­ তিনি বলেন, ‘হুজুর সাঃ একটি উটের পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন উটের পিঠ পেটের সাথে মিশে গেছে। তারপর বললেন, তোমরা এই নির্বাক প্রাণীকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। তোমরা তার উপর সুস্থ অবস্থায় আরোহণ করো, আর সুস্থ অবস্থায় তাকে ছেড়ে দাও।’

সাধারণ একটি প্রাণীর ওপর দয়া করে এক মহিলার ক্ষমা পাওয়ার ঘটনাও হাদিসে উল্লেখ আছে। হুজুর সাঃ বলেন, ‘এক মহিলাকে এ কারণে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে যে, একটি কুকুরকে পিপাসাকাতর দেখে তার অন্তর ব্যথিত হলো। অনেক কষ্ট স্বীকার করে কুয়া হতে পানি তুলে তাকে পান করালো এবং তার জীবন রক্ষা পেল।’ আরেক হাদিসে প্রাণীর প্রতি নির্দয়তার কারণে এক মহিলাকে শাস্তি দেয়ার ঘটনা উল্লেখ আছে। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণনা করেন রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘বিড়ালকে আটকে রাখায় এক মহিলাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। অবশেষে ক্ষুধায় বিড়ালটি মারা যায়। সে তাকে খাবার দেয়নি এবং ছেড়ে দেয়নি। বিড়ালটি খেতো জমিনের ঘাস।’ (বুখারি, মুসলিম)।

আমরা যদি দয়া-ভালোবাসায় এই মহৎগুণটি অর্জন করতে পারি। ছোট-বড় নেই, নেই ধনী-গরিব কিংবা আমির-ফকির। সবাই যদি সবার জন্য হতে পারি, অ্লানচিত্তে সবাইকে যদি ভালোবাসতে পারি, তাহলেই আমরা অনেক বিপদাপদ ঝগড়া সঙ্ঘাত থেকে বাঁচতে পারব। হিংসা-বিদ্বেষও আমাদের থেকে বিদায় নেবে। তখন আমরা পরস্পরে সদয় ব্যবহার ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে পারব অনায়াসেই। আমাদের চলনে-বলনে, কথায়-কাজে, আচরণে-উচ্চারণেও ভালোবাসার বহিপ্রকাশ ঘটাব। জীবনযাপনও করতে পারব অনাবিল শান্তি সুখের নীড়ে। পাশাপাশি আমাদের সমাজ-পরিবেশ বিধৌত হবে শান্তিসাম্যের আবহে। তাই মানবকল্যাণে দয়া ও ভালোবাসা হোক আমাদের পণ। আর তা হোক শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: