গণমাধ্যম এবং ইসলামের প্রেরণা

বর্তমানে মিডিয়া কীভাবে আমাদের জীবনে স্থান করে নিয়েছে তা আমরা সবাই জানি। সবার ঘরে ঘরে মিডিয়া ঢুকে পড়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই টিভি নামের আধুনিক আবিষ্কার জায়গা করে নিয়েছে। শুধু বাড়িতে কেন, প্রতিটি দোকানে শোভা পাচ্ছে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিসমৃদ্ধ টেলিভিশন। শহর কিংবা গ্রাম—সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে আধুনিক মিডিয়া। কম্পিউটার আর মোবাইল এসে যেন মিডিয়াকে পাগলা ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়েছে। সবার ঘরে ঘরে ঢোকার পর মিডিয়া ঢুকে পড়েছে এখন সবার পকেটে। পৌঁছে গেছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার হাতে। তাছাড়া খবরের কাগজ তো আমরা সবাই পড়ি।
কতই না ভালো হতো যদি মিডিয়াগুলো শুধু ন্যায় ও সুন্দরের পথ দেখাত। অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত। এটিই আসলে মিডিয়ার দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে আমরা দেখি, প্রভাবশালী মিডিয়া যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে না। মন্দ ও অসুন্দরের সঙ্গেই তাদের যত সখ্য। মিডিয়ার দায়িত্ব মানুষের কাছে সঠিক তথ্য ও প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা। নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে মানুষের ভালো-মন্দ এবং সুখ-দুঃখের কথা সবার সামনে উপস্থাপন করা। ক্ষমতাসীনদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া। মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যাবতীয় দুঃখ-বেদনা এবং প্রয়োজনের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা। পাশাপাশি সরকারের অন্যায় ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সাহসী করা। মানুষকে সরকারের অপকর্ম ও অনৈতিক কাজকর্ম সম্পর্কে সচেতন করাও মিডিয়ার অন্যতম দায়িত্ব।
আমাদের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেকে হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্যসন্ত্রাসের আশ্রয় নেন। মিডিয়ায় যারা কাজ করেন, যারা মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরেন মিডিয়ার মাধ্যমে এবং সুদূর পল্লীর খবর প্রচার করেন যারা জাতির সামনে তারা হলেন মিডিয়াকর্মী ও সাংবাদিক। সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। তাই মিডিয়াকর্মীদের হতে হবে আপন দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সজাগ।
মানব জীবনের আর সব বিষয়ের মতো ইসলামও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও প্রেরণা দিয়েছে। ইসলামের আদর্শের দাবি, মানুষের সামনে সংবাদ তুলে ধরতে হবে সঠিক সংখ্যা ও পরিসংখ্যান দিয়ে। রক্ষা করতে হবে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা। কারও ক্রীড়নক হয়ে বা ব্যক্তি স্বার্থচরিতার্থ করার জন্য কারও বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো যাবে না। সাংবাদিক ও মিডিয়াকর্মীদের সতর্ক করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ— এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে’ (বনি ইসরাঈল : ৩৬)।
সমাজের প্রতি আমাদের সবারই দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা শুনলাম তাই প্রচার করা যাবে না। মিডিয়া হয়তো অনেক ক্ষমতাধর। শক্তিমানরাও ভয় পায় সাংবাদিককে। তাই বলে মিডিয়ার শক্তির অপপ্রয়োগ করা যাবে না। আমরা হয়তো পাঠক ও জনসাধারণকে ফাঁকি দিতে পারি, আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসীমাত্রেই ভুলে গেলে চলবে না যে একদিন আমাকেও হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর তাদেরকে থামাও, অবশ্যই তারা জিজ্ঞাসিত হবে’ (সাফফাত : ২৪)।
কারও প্রশংসা করতে গিয়ে অতিরঞ্জন করা যাবে না। তেমনি কারও সমালোচনা করতে গিয়েও সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। কথা বলতে হবে সততা ও নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে। সাংবাদিক কারও পক্ষ নন। হ্যাঁ, পক্ষ কেবল সত্যের। সুতরাং পছন্দের দলমতের প্রশংসায় অতিরঞ্জন কিংবা বিপক্ষ দল-মতের বিরুদ্ধে অসত্য কথন—কোনোটাই কাম্য নয়। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে আমরা এমনটি করি বলেই সমাজে এত বিভেদ আর হানাহানি। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ কর’ (আন‘আম : ১৫২)।
যা বলা হবে, যা লিখা হবে বা যা-ই দেখানো হবে—সেখানে ইনসাফ ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকতে হবে। সত্য ও সততার প্রতি নিষ্ঠা দেখাতে হবে। আর অবশ্যই নেতিবাচকতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে। অগ্রাধিকার দিতে হবে ইতিবাচকতাকে। খারাপ শব্দ ও খারাপ দৃশ্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে যে কোনো মূল্যে। দূরে থাকতে হবে অশ্লীলতা ও বেলেল্লাপনা থেকে। সচেষ্ট থাকতে হবে মার্জিত শব্দ ও নির্দোষ চিত্র তুলে ধরতে। আল্লাহতায়ালা তাঁর নবীর মাধ্যমে আমাদের বলছেন, ‘আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে, যা অতি সুন্দর’ (নবী ইসরাঈল : ৫৩)।
আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন, ‘তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক কর’ (নাহল : ১২৫)।
অশ্লীল ও মন্দ কথা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা এবং কর্মের সমালোচনা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে’ (লুকমান : ৬)। এখানে বেহুদা কথা বলে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। নীতি-নৈতিকতাহীন যাবতীয় প্রচারণাও এর অন্তর্ভুক্ত। অতএব আমরা যে সমাজে বাস করি, যে সমাজটাকে আমরা শান্তির বাগান বানাতে চাই। তাকে ভালো করতে হলে নিরাপদ ও সুখময় হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অন্যদের মতো সাংবাদিক ভাইদেরও সত্, আদর্শবান ও আপসহীন হতে হবে। সমাজের সবাইকে হতে হবে সত্যনিষ্ঠ এবং অবশ্যই আল্লাহর অনুগত বান্দা। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আল্লাহর ভয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সমাজের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আল্লাহ আমাদের ওপর সহায় হোন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: