কুরআনে নারীর ন্যায্য অধিকার

এ কথা অনস্বীকার্য যে, নারীর প্রতি সদয় অথবা নিষ্ঠুর আচরণে এক জাতির সাথে আরেক জাতির এবং এক আইনের সাথে আরেক আইনের যতই পার্থক্য ও বৈপরীত্য থাকুক না কেন, ইসলামের অভুøদয়ের আগে নারী কখনো কোনো সমাজে তার যথাযোগ্য সামাজিক ও আইনগত মর্যাদা লাভ করেনি। সভ্যতা সমৃদ্ধ প্রাচীন গ্রিক, রোমান, পারস্য, মিসরীয়, চৈনিক, হিন্দু, ইহুদি ও খ্রিষ্ট সমাজের চিত্র ছিল এ ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। গ্রিক সমাজে নারীরা এত ঘৃণিত ছিল যে, তাদের শয়তানের নোংরা চেলাচামুণ্ডা মনে করা হতো। রোমান সমাজে পরিবার প্রধান নিজের সন্তানদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা বিক্রি করে দিতে পারত দাসদাসীর মতো। কন্যাসন্তান হলে তো কোনো কথাই নেই। হিন্দু ধর্ম মতে পিতা, স্বামী অথবা নিজ পুত্রের কর্তৃত্ব থেকে নারীর স্বাধীন হওয়ার কোনো অধিকারই নেই। এমনকি এক সময় স্বামীর মৃতুøর পর স্ত্রীর বেঁচে থাকার অধিকারও ছিল না। তাকে স্বামীর সাথে একই চিতায় জীবন্ত পুড়ে মরতে হতো। ১৭০০ শতাব্দীতে আইন করে এই বর্বর প্রথাকে বিলুপ্ত করতে হয়। চীনাদের প্রবাদই ছিল ‘তোমরা স্ত্রীর কথা শোনো, তবে বিশ্বাস করো না’। ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা তো নারীকে রীতিমতো অভিশাপ মনে করে থাকে। কারণ নারীই না কি আদমকে বিপথগামী করেছিল। বোস্তাম নামক জনৈক খ্রিষ্টান যাজক বলেন, ‘নারী এক অনিবার্য আপদ, এক লোভনীয় আপদ, পরিবার ও সংসারের জন্য হুমকি, মোহনীয় মোড়কে আবৃত্ত বিভীষিকা।’ আরবদের অবস্থা তো ছিল আরো সঙ্গীন। কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়াকে তারা ভীষণ অশুভ ঘটনা বিবেচনা করত। কোনো কোনো গোত্র নবজাতক মেয়েকে আভিজাত্যের কলঙ্ক ভেবে এবং কেউবা খাদ্য জোগাতে পারবে না, এই আশঙ্কায় জ্যান্ত মাটিতে পঁুতে ফেলত।

এই যখন নারীর অবস্থা, তখন বিশ্ব মানবতার মুক্তির মহাপয়গাম কুরআনুল কারিম ঘোষণা দেয় ‘নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো’ (সূরা নিসাঃ ১৯)। রাসূলে আরবির কণ্ঠে ধ্বনিত হলোঃ ‘নারীগণ পুরুষদেরই সহোদরা’ (আহমদ, আবু দাউদ)। এভাবেই ইসলাম সর্বপ্রথম নারীদের সমাজে স্বাধীন, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করে, এমনকি সূরা নিসা নামে পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ সূরাই নাজিল হয় নারীর যাবতীয় অধিকারের বার্তা নিয়ে, ইসলামের নবীই নারীকে একজন মা হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীন করেন। তিনি ঘোষণা করেন। ‘মাতার পদতলে সন্তানের বেহেশত’ (মুসনাদে আহমদ)। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে ইসলাম নারীকে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তার আইনসম্মত অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করেছে, যাবতীয় নিপীড়ন ও নির্যাতন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে তাকে মুক্তির পয়গাম শুনিয়েছে সেই ইসলামকেই আজ নারী স্বাধীনতার অন্তরায়, নারী উন্নয়নের চরম প্রতিবন্ধক হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চলছে। ইসলামের নীতিকে ত্রুটিপূর্ণ ও অযৌক্তিক প্রমাণ করতে ইসলামের শত্রুরা আজ আদাজল খেয়ে নেমেছে। ইসলামী আইনকে অবিচার, অন্যায় ও বৈষম্যমূলক প্রমাণ করতে এদের নিরন্তর প্রচেষ্টা খুবই লক্ষণীয়। তবে এ কথা সত্য যে, প্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানব জাতির মধ্যে পুরুষকে মেধায়, মননে, যোগ্যতায়, প্রজ্ঞায় ও দৈহিক শক্তিতে নারীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই­ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয় সমানাধিকার ভোগ করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষ নারীর তুলনায় কিছু বেশি অধিকার ভোগ করে। পুরুষের এ শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নিতেই হবে, সম্মান করতে হবে। এই রূপ পার্থক্য করার মধ্যে নিহিত রয়েছে অপার জ্ঞান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা কৌশল।

কিন্তু আফসোসের বিষয়, এই চরম বাস্তবতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’ নামে ঘোষণা করেছে এক বিতর্কিত নীতিমালা, এতে নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও অধিকার সংরক্ষণের ধুয়া তুলে মানব জীবনের সব ক্ষেত্রে, এমনকি স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকারের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। জনসমক্ষে প্রকাশের আগে থেকেই তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। নীতির কপি জনগণের হস্তগত হওয়ার পর দেখা যায়, তাদের সন্দেহ ও আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এই নীতির প্রায় সব অনুচ্ছেদই সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। নারীর অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার কথা বলতে গিয়ে প্রায় ক্ষেত্রেই ইসলামী আইনকে পদদলিত করা হয়েছে। নারীর অধিকার নিশ্চিত করার নামে সরকার এ ঘৃণ্যপ্রস্তাব অনুমোদন করে কার্যত আল্লাহ ও তার রাসূলের ঐশী বিধান লঙ্ঘন করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালন করে আসা ইসলামী আইনের বিরুদ্ধাচরণ করে সরকার মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

নারী উন্নয়ন নীতিমালার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ নেই। যদি তার অর্থ নারীদের ন্যায্য অধিকার প্রদান করা হয়, তাহলে নারীর ন্যায্য অধিকার প্রদান করে গেছেন দেড় হাজার বছর আগে শান্তির দিশারী নবী মুহাম্মদ সাঃ। তাতে পরিবর্তন বা সংশোধনের অধিকার কারো নেই। আসলে নারী উন্নয়ন নীতিমালার অর্থ হলো ইহুদি সম্প্রদায় এবং জাতিসঙ্ঘের দালালি করতে গিয়ে সুকৌশলে দেশে কুরআনবিরোধী আইন পাস করা।

কিভাবে এই নীতিমালায় সুকৌশলে ভাষার চাতুর্যে প্রত্যক্ষ বক্তব্যের পরিবর্তে পরোক্ষ কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। কত সুকৌশলে এ নীতিমালার ছত্রে ছত্রে ইসলামী শরিয়াহর আইনকে পদদলিত করা হয়েছে তা এই নীতিমালায় বর্ণিত কিছু ধারার উল্লেখ করলেই সচেতন মহলের বুঝে নিতে কষ্ট হবে না। ২৩টি মূল ধারা এবং প্রায় এক শ’টি উপধারা সংবলিত এই নীতিমালার প্রথম ধারা বা ভূমিকাতেই বলা হয়েছে, ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার।’ ১.৩ ধারায় মানবাধিকার প্রশ্নে বলা হয়েছে ‘সুপরিকল্পিত নীতিমালার মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা সুস্থ সমাজ তথা উন্নত রাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি।’ এই নীতিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতেই এই নীতিমালার লক্ষ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘উন্নয়নের মূল স্রোতধারার সব স্তরের নারীকে সম্পৃক্ত করা ও তার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার মূল লক্ষ্য।’ এই অধ্যায়ের ১.১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা।’ একই অধ্যায়ের ১.১০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য কর্ম ক্ষেত্রে, আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।’

উল্লিখিত ধারাগুলোর ভাষার ভিন্নতা থাকলেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটি কথাই বলা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, নারীকে পুরুষের সমান ও সমকক্ষ প্রমাণ করা এবং তাদের যাবতীয় অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য না রাখা। এটি কোনোভাবেই কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কেননা আল্লাহপাক নারী ও পুরুষকে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নারী ও পুরুষ মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে সমান হলেও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অধিকার ও দায়িত্বে পার্থক্য ও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের প্রশ্নে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল। এ কারণে যে, আল্লাহ তায়ালা কতকের ওপর কতককে মর্যাদা দান করেছেন এবং এ কারণে যে, পুরুষ তার মাল ব্যয় করে।’ (সূরা নিসা, ৩৪)। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘নিজেদের শাসন ক্ষমতা কোনো স্ত্রীর হাতে অর্পণ করে এমন জাতির মঙ্গল আশা করা যায় না।’ অনুরূপভাবে সাক্ষ্য দান ও দিয়াতের ক্ষেত্রেও ইসলাম সঙ্গত কারণেই নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করেছে। অতএব যদি উল্লিখিত ধারাগুলো মেনে নেয়া হয় তাহলে ইসলামের এসব বিধান অনায়াসেই অকেজো হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১.৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নারী পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা।’ নীতিমালার তৃতীয় অধ্যায়ে নারীর মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে অনেক উপধারা সন্নিবেশিত হয়েছে। এর ৩.৩ ধারায় বলা হয়েছে ‘নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা।’ ৩.৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা এবং আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।’ ৩.৬-এ বলা হয়েছে, ‘বৈষম্যমূলক কোনো আইন প্রণয়ন না করা বা বৈষম্যমূলক কোনো সামাজিক প্রথার উন্মেষ ঘটতে না দেয়া।’ অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই ধারাগুলোর বাক্য ও শব্দগুলোর মাধ্যমে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে শরিয়া আইন, বিশেষ করে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ ইসলামের শত্রুরা চরম অজ্ঞতা কিংবা মারাত্মক বিদ্বেষের বশীভূত হয়ে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনকে বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করে থাকে। তাদের এই দুরভিসন্ধিটি আরো নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে নবম ধারার কতিপয় উপধারায়। এই অংশের মূল বক্তব্যটিই হলো ‘জাতীয় অর্থনীতির সকল কর্মকাণ্ড নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা।’ ৯.১৩ ধারায় অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দের মাধ্যমে আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরি বিষয়াদি যথা­ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য উপার্জনের সুযোগ, সম্পদ, ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজারব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা।’ এসব নীতিমালায় সরাসরি ইসলামের উত্তরাধিকার আইনের বিরোধিতা বা কুরআন ও সুন্নাহসংক্রান্ত কোনো শব্দ ব্যবহার না করে সুকৌশলে নতুন নতুন নীতির কথা বলে কুরআন ও সুন্নাহর আইনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া হয়েছে। কারণ নারীর উত্তরাধিকারের প্রশ্নে কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে­ এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু কেবল কন্যাসন্তান দুই এর অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। (সূরা নিসা, আয়াত-১১)।

উত্তরাধিকারসংক্রান্ত এরূপ অন্য আয়াতগুলোর দিকে লক্ষ করলে এ কথা প্রতিভাত হয় যে বোন, মা ও স্ত্রী পর্যায়ক্রমে ভাই, পিতা ও স্বামীর তুলনায় অর্ধেক পাচ্ছে। এখানে দৃশ্যত নারী পুরুষের মধ্যে ওয়ারিশি সম্পত্তির বণ্টনের ব্যাপারে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও উভয়ের ব্যয়খাতগুলো একটু খতিয়ে দেখলে ইসলামের উত্তরাধিকার আইনকে মোটেও বৈষম্যমূলক বলে মনে হবে না। ইসলাম মোটামুটিভাবে একজন পুরুষকে চার খাতে তার সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশ দেয়। পক্ষান্তরে একজন নারী এসব খাতের কোনো একটিতেও তার সম্পদ ব্যয় করতে বাধ্য নয়। এই অনস্বীকার্য বাস্তবতার দিকে লক্ষ করলে একজন নারীর অংশকে পুরুষের তুলনায় কোনোভাবেই কম বলার যুক্তি থাকে না।

অনুরূপভাবে তৃতীয় অধ্যায়ের ৩.৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন ধর্মের কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইনবিরোধী কোন বক্তব্য বা অনুরূপ কাজ করা বা কোন উদ্যোগ না নেয়া।’ এই ধারার মাধ্যমে আলেম বা মুফতিগণের ইসলামী আইনের ব্যাখ্যা বা ফতোয়া দেয়ার অধিকার খর্ব করারই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে পরোক্ষভাবে।

এভাবে ১.৩ ও ৩.২ ধারায় জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক প্রণীত CONVENTION ON THE ELIMINATION OF ALL FORMS OF DISCRIMINATION AGAINST WOMEN (CEDAW) তথা নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এই সনদের ধারা-২ হলো মূলনীতিবিষয়ক বিধান। যাতে নারী পুরুষের সব ক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই ধারা মেনে নিলে কুরআনে আল্লাহ প্রদত্ত মিরাস বা উত্তরাধিকার আইন বাতিল করতে হয়। তা ছাড়া এই সনদের ১৩ (এ) এবং ১৬-১(সি) ধারা দু’টি ইসলামী বিশ্বাসের পরিপন্থী হওয়ায় ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাতে স্বাক্ষর করেছিল আপত্তি ও লিখিত শর্ত দিয়ে। অথচ এই নীতিমালায় সে সব আপত্তি ও শর্তের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নিঃশর্তভাবে তা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ‘এটি একটি নীতিমালা, আইনের মতো এর কার্যকারিতা নেই।’ বলে বর্তমান সরকার আরেক তেলেসমাতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এর দ্বারা এখন না হলেও ভবিষ্যতে যে, কুরআনবিরোধী আইনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে তা খুবই স্পষ্ট।

অতএব দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সরকারকে অবশ্যই এ নীতিমালার কুরআনবিরোধী ধারাগুলো বাদ দিতে হবে। বিশেষ করে এর থেকে সমঅধিকার শব্দটি অবশ্যই বাদ দিতে হবে। কারণ এটিই সকল আপত্তির মূল। এর স্থলে ন্যায্য অধিকার শব্দটি প্রয়োগ করা হোক। কারণ ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই নারীর ন্যায্য অধিকারের কথা বলে। পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের জনগণ শত শত বছর ধরে নারী সমাজের প্রতি ইসলামের প্রদত্ত অধিকারগুলো নিশ্চিন্তে ও নিঃসঙ্কোচে গ্রহণ করে আসছে। এর দ্বারা তারা কখনোই অপরিতৃপ্তবোধ করেনি। সরকার জনগণের প্রয়োজন ও তাদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ নারী সমাজের প্রতি ইসলামের প্রদত্ত ন্যায্য অধিকারগুলোর পরিবর্তন নয়, বরং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন চায়। সমঅধিকারের নামে ভারসাম্যহীন, কুরুচিপূর্ণ ও পশ্চিমা ধাঁচের বল্গাহারা জীবন এ দেশের ধর্মপ্রাণ নারী সমাজের কখনোই কাম্য নয়। সরকার তা না করে এর সম্পূর্ণ উল্টোপথ অবলম্বন করে দেশবাসীর ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। যা সত্যিই খুব হতাশাব্যঞ্জক ও দুঃখজনক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: