পরকাল সম্পর্কে ধারণা

ইসলামে পরকালের ওপর বিশ্বাস মুসলমানের জন্য ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পরকালকে কেন্দ্র করেই মানুষের সব ধর্মকর্ম পরিচালিত। তাহলে পরকাল কী? এ সম্বন্ধে কুরআনে দুই ধরনের আয়াত আছে। কিছু সংখ্যক আয়াতে বলা হয়েছে, মৃতুø পরবর্তী জীবনই পরজীবন বা পরকাল। যেমন­ কুরআনে কাফেরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তাদের সে সব গোনাহের ফলে তারা পানিতে নিমজ্জিত হলো, পরে দোজখে প্রবিষ্ট হলো’। কিন্তু বেশির ভাগ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, সৃষ্টিকে ধ্বংস করে নতুন ব্যবস্থাপনায় (নতুন নিয়মনীতির মাধ্যমে) যে জগৎ ও জীবনের সৃষ্টি হবে তা-ই পরকাল বা পরজীবন। আত্মার পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে এ জীবনের সূচনা হবে। সেখানকার স্থানকাল ও জীবনযাত্রা হবে পৃথিবীর সম্পূর্ণ বিপরীত। সুতরাং পৃথিবীর পরিবর্তন সাপেক্ষে যে নতুন জীবন সৃষ্টি হবে তা-ই পরজীবন বা পরকাল।

এ পরকাল কে সৃষ্টি করবেন? ‘তিনি আল্লাহ’ এক ও অদ্বিতীয় চিরন্তন সত্তা। তিনি তাঁর কর্তৃত্বে কাউকে অংশী করেন না। তিনি ইহজীবন ও পরজীবনের মালিক। কেউ তার সমকক্ষ নয়। তিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক।

কেন পরকাল বা মৃতুø পরবর্তী জীবন? আল্লাহ মানুষের সৃষ্টিকর্তা, তাঁর সৃষ্ট মানুষের কর্মফল প্রদানের জন্য পরকাল সৃষ্টি করবেন। পরকালে আল্লাহর বিচারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষের অনন্ত জীবনের সূচনা হবে। এ বিচারব্যবস্থায় আল্লাহ ব্যক্তি মানুষের পৃথিবীতে তাঁর কৃতকর্মের রিপোর্ট তৈরির জন্য মানুষের কর্ম লিপিকার দুই ফেরেশতা নিয়োগ করেছেন। ‘স্মরণ করো, দুই ফেরেশতা কর্ম লেখাকালীন তার ডান ও বাম দিকে এসে বসে। সে যে কথা উচ্চারণ করে বস্তুত তার নিকটবর্তী সতর্ক রক্ষক তা লিখতে প্রস্তুত রয়েছেন। সূরা ক্বাফঃ ১৭-১৮। সেদিন অভিযুক্ত মানুষের নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ভাষা পেয়ে রাজসাক্ষী হিসেবে তার কৃতকর্মের জন্য তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। ‘সেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে তাদের জিহ্বা, হাত ও পা, সূরা নূর-২৪। এ বিচারব্যবস্থায় আল্লাহর রায়ের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হবে শেরেকি গোনাহ বা অপরাধ। ‘… তাকে ছাড়া ওদের কোনো বন্ধু নেই এবং তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরিক করেন না।’ সূরা কাহাফ -২৬।

পরকাল সম্পর্কীয় আলোচনায় আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মানুষের সৃষ্টি। আল্লাহ বলেন, ‘আমার ইবাদত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করিনি।’ সূরা জারিয়া-৫৬। আর তার কর্ম পরীক্ষার জন্য জগৎ সৃষ্টি। ‘…আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন আকাশ, পৃথিবী ও তার মধ্যবর্তী সব কিছু ন্যায়ভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।’ সূরা রুম-৮। তারপর আসবে কেয়ামত। কেয়ামতের দিন সব কিছু ধ্বংস করে বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনা হবে ইস্রাফিলের সিঙ্গার প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনির মাধ্যমে। ‘ …সেদিন সিঙ্গা ধ্বনি বিশ্বকে প্রকম্পিত করবে, তার অনুগমন করবে দ্বিতীয় সিঙ্গা ধ্বনি… সূরা নাযিয়াত ৬-৭। তৃতীয় সিঙ্গা ধ্বনি হলে মানুষ আল্লাহর নির্দেশে জীবন্ত হয়ে সশরীরে কবর থেকে বের হয়ে স্রষ্টার সম্মুখে হাজির হবে, যাকে বলা হয় হাশর বা বিচার দিবস, এমন একদিন যা পৃথিবীর ৫০ হাজার বছরের সমান।’ ­সূরা মাআরিজ। সেদিন ফেরেশতাদের প্রদত্ত কর্ম তালিকা মানুষকে দেয়া হবে, তার ভিত্তিতে মানুষের বিচার হবে, প্রত্যেকের বিচার হবে আলাদা আলাদা এবং সে তা প্রত্যক্ষ করবে, এতে কারো প্রতি বিন্দু পরিমাণ জুলুম করা হবে না যে যা প্রাপ্য তা-ই দেয়া হবে। ‘… কেয়ামত দিবস তাদের জন্য বের করব এক কিতাব, সে তা খোলা পাবে। বলব পাঠ করো তোমার কিতাব, নিজের হিসাবের জন্য আজ তুমিই যথেষ্ট।’ সূরাঃ বনি ইস্রাইল ১৩-১৪। ‘স্মরণ করো, সেদিন আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি পেশ করে হাজির হবে, প্রত্যেককে সেদিন তাদের কর্মফল দেয়া হবে, অবিবেচিত হবে না তারা’। সূরা নাহলঃ ১১১।

সেদিন বিচার পদ্ধতিতে ন্যায়ের মানদণ্ড বা মিজান ব্যবহার করা হবে। ‘আমল একটি সরিষার দানা হলেও আমি হাজির করব এবং হিসাব গ্রহণে আমিই যথেষ্ট।’ সূরা আম্বিয়া-৪৭। যার পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে সে সানন্দে বেহেশতে প্রবেশ করবে, যার পাল্লা হালকা হবে সে হবে জাহান্নামের অধিবাসী। সেদিন পাপিরা সৎকর্ম করার জন্য পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইবে­ কিন্তু সেদিন কাফেরদের অনুমতি দেয়া হবে না। কৈফিয়তেরও ওজর শোনা হবে না’। সূরা নাহল-৮৪। ‘যেদিন আমি প্রত্যেক উম্মতের তাদের হতে তাদের বিষয়ে এক একজন সাক্ষী উঠাব’। সূরা নাহল-৮৪। সেদিন কোনো বিনিময় ও সুপারিশও কার্যকর হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতি প্রাপ্তরা আল্লাহর কাছে সুপারিশের সুযোগ পাবেন। সেদিন সব আধিপত্য আল্লাহরই থাকবে। ‘যেদিন কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে পাপিরা শপথ করে বলবে, তারা জগতে ক্ষণিককাল ব্যতীত অবস্থান করেনি; এভাবে তারা হয় সত্য বিমুখ। আর যাদেরকে প্রজ্ঞা ও ঈমান দেয়া হয়েছে? তারা বলবে তোমরা তো কেয়ামত দিবস পর্যন্ত আল্লাহর বিধানে অবস্থান করেছ, আর এটাই কেয়ামত দিবস; কিন্তু এর জ্ঞান রাখত না’। সূরা রুম ৫৫-৫৬। এভাবে জন্ম-মৃতুø ও পুনরুত্থান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের সবাইকে আখেরাতে আল্লাহর বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন­ এ বিচারের স্থান কোথায় হবে? তার উত্তরও আল্লাহ দিয়েছেন, ‘মাটি থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি, এতে ফিরিয়ে দেবো এবং আবার উহা থেকে পুনর্বার (তোমাদের) বের করব।’ সূরা ত্বহা ৫৫। ‘আল্লাহ তোমাদের মাটি থেকে উ?ভূত করেছেন পরে তাতে তোমাদের প্রত্যাবর্তন ও পুনরুত্থান করবেন’। সূরা-নূহ ১৭। মানুষ আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, ওই দিন আবার তাকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: