দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য ইসলামী দৃষ্টিকোণ

বিশ্বমানবের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ খোদায়ী পথপ্রদর্শক নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।’ অর্থাত্ দাতার হাত দান গ্রহীতার হাত থেকে উত্তম। আরও খুলে বললে অর্থ দাঁড়ায়, যে মানুষ অপর মানুষকে টাকাপয়সা, অর্থ-বিত্ত, সম্পদ, খাদ্য, বস্তু ইত্যাদি জীবনোপকরণ, জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রযুক্তি, সামরিক উপকরণ, চিকিত্সা উপকরণ, উন্নত চাষাবাদের উপকরণ যা কিছু প্রদান করবে, সেই ব্যক্তি-গোষ্ঠী এসব বস্তু গ্রহণকারীর তুলনায় উত্তম। অর্থাত্ এসব প্রয়োজনীয় বস্তুর দাতা-গ্রহীতা যেমন ব্যক্তি মানুষ হতে পারে, তেমনি জাতিগত, রাষ্ট্রগত পর্যায়েরও হতে পারে। দাতা রাষ্ট্র ও জাতিগত পর্যায়ের হলে তার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত হবে গ্রহীতা দেশটির ওপর। অতঃপর দাতা দেশটি নিষ্ঠাবান হলে তাতে সাহায্যপ্রাপ্ত দেশটি উপকৃত হয়। আর তার মধ্যে যদি আধিপত্যবাদের মনোভাব প্রবল থাকে, তাহলে সাহায্য গ্রহণকারী দেশটির জন্য তা অনেক ক্ষেত্রে অমঙ্গল ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো সময় নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত তাকে হারাতে হয়। এরূপ পরমুখাপেক্ষী অবস্থায় ভৌগোলিক স্বাধীনতার কথা যাই হোক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, মূল্যবোধ তাকে হারাতে হয়। নিজের অলক্ষ্যেই দাতা দেশের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সাহায্যপ্রাপ্ত দেশটির ঘাড়ে এসে সওয়ার হয়। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ওই দাতা দেশের ন্যায়-অন্যায়, রীতি-নিয়ম, যাবতীয় শর্ত ও দাবি গ্রহীতা দেশটিকে মেনে নিতে হয়। আর তা করতে গিয়েই গ্রহীতারা হয় ক্ষতিগ্রস্ত। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে আজকের উন্নয়নশীল, অনুন্নত দেশগুলো এ মানসিকতাজনিত সাহায্যের অভিশাপে অধিক জর্জরিত।  পরিতাপের বিষয়, সময়ের বিবর্তনে মুসলমানরা মহানবী (সা.) এর গুরুত্বপূর্ণ বাণীর তাত্পর্য যথাযথভাবে উপলব্ধিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই আজ তারা ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পৃথিবীর আধিপত্যবাদী দাতা শক্তিগুলোর মুখাপেক্ষী। এই মুখাপেক্ষিতার সুযোগ নিয়ে দাতারা নিজেদের ইসলাম বিদ্বেষ চরিতার্থ করছে। তারা মুসলমানদের ব্যক্তিগত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব ক্ষেত্রে অপমান ও জিল্লতির সম্মুখীন করে তুলেছে। মুসলমানরা দাতার হাতের অধিকারী হতে না পারায় আজ ব্যক্তিগত, জাতীয়, আন্তর্জাতিক সব পর্যায়ে পরমুখাপেক্ষী। হাদিসে উল্লিখিত ‘উপরের হাত’ তথা দাতা তার হাত বলতে যদি ফকির মিসকিনকে দু’চার পয়সা খয়রাত ও সাহায্যদানের অর্থ অন্তরে প্রবল না থেকে বিষয়টি উল্লিখিত ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হতো, তাহলে মুসলমানদের অবস্থা ভিন্নতর হতো।
মহানবী (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘অভাব-দারিদ্র্য মানুষকে কুফরের দিকে নিয়ে যায়।’ অর্থাত্ কোনো ব্যক্তি যত জ্ঞানী হোক না কেন, তার যদি প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ ও সম্পদ না থাকে, তখন সে দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিজের অলক্ষ্যেই নীতিভ্রষ্ট হয়ে ওঠে। তার প্রতিভা, সাহস, মনোবল হ্রাস পায়।
নৈতিক দৃঢ়তা খর্ব হয়। একজন জীবনের শুরু থেকে যেসব নীতিকথা বলে আসছে, অভাবজনিত পরিণতির শিকার হয়ে তখন সে ওইসব সুন্দর ও ন্যায্য নীতিমূলক কথার বিপরীত কাজই করতে শুরু করে। এ বাস্তব সমস্যার কশাঘাত থেকে রক্ষার স্থায়ী অনুভূতি অন্তরে পোষণ করে অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকার তাগিদ হিসেবেই মহানবীর অমর বাণীটি এসেছে যে, ‘দারিদ্র্য কুফরির কাছাকাছি নিয়ে যায়।’ এ কারণেই ইসলাম মানুষকে অভাব থেকে রক্ষা করতে চায়। দারিদ্র্যপীড়ায় জর্জরিত জীবন থেকে রক্ষাকল্পে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের নির্দেশ করেছেন, ‘তোমরা যখন নামাজ শেষ করবে, তখন আল্লাহর এই পৃথিবীতে তাঁর প্রদত্ত রিজিকের অন্বেষণে ছড়িয়ে পড়’ (ইয়া কুদিয়াতিস সালাতু, ফানতাশিরু ফিল আরদে, ওয়াবতাঘু মিন ফাদলিল্লাহ)।
মহানবী (সা.) ভিক্ষাবৃত্তি নিষেধ করেছেন। কোনো লোককে ভিক্ষা করতে দেখলে তিনি তাকে অপমানজনক কাজ থেকে ফেরার জন্য কাজের যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার খরিদ করে দিতেন।
হজরত মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিজের কষ্টার্জিত অর্থে জোগাড়কৃত খাদ্যই উত্তম খাদ্য।’
প্রয়োজনীয় সম্পদ ও জীবনোপকরণ না থাকলে দুস্থ, মানবতার সেবায় এগিয়ে আসা যায় না। সুরা মাউনে আল্লাহ সেসব ব্যক্তিকে দ্বীনের অস্বীকারকারী গণ্য করে তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তুমি কি দ্বীনের অস্বীকারকারী সেই ব্যক্তিকে দেখেছ, যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয় এরবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উত্সাহ দেয় না অর্থাত্ ব্যবস্থা করে না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই নামাজিদের যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে।’ মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে আহার করে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধায় কাতর থাকে।’ সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য দূর করার এর চেয়ে মহত্তম অনুপ্রেরক বাণী আর কী হতে পারে?
দারিদ্র্য দূর করার জন্য পবিত্র কোরআনে জাকাত ফরজ করা হয়েছে। এই নির্দেশের তাগিত হলো, সম্পদের অধিকারী হয়ে তুমি অহংকারী ও কৃপণ হয়েও না, বরং মানবতার সেবায় সে সম্পদ ব্যবহার করো। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে সম্ভাব্য সব কাজের উদ্যোগ নাও। এ জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা করো।
দুস্থ মানুষকে অর্থ, সম্পদ দ্বারা সাহায্য করা মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। আর তা করতে হলে তাকে হতে হবে সম্পদের অধিকারী। শুধু জাকাত নয়, দরিদ্রতা দূর করার জন্যই ফিতরা ও সাদাকার বিধান দেয়া হয়েছে। দান করার জন্য উত্সাহিত করা হয়েছে মুমিনদের।
মহানবী (সা.) তাঁর বংশের জন্য জাকাত, ফিতরা, সাদকা নিষিদ্ধ করে গেছেন। এর পরোক্ষ তাকিদ হলো—‘তোমরা কর্মের মধ্য দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সচেষ্ট থাকবে, যেন অপরের কাছে হাত পাততে না হয়।’ তাঁর উম্মতের জন্য এই বিধান বাধ্যতামূলক করা না হলেও এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্যই সবাইকে উত্সাহিত করা হয়েছে। যাতে সম্পদের অপচয়, অপব্যবহার বন্ধ হয় এবং সম্পদ কুক্ষিগতকারীদের হাত থেকে তা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
মুসলিম জাতি অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে মানুষের অধিকার হরণকারী, লোভী ও আধিপত্যবাদী শক্তির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে—এ জন্য ইসলামের বিরুদ্ধে সূচনাপর্ব থেকে সুকৌশলে এক শ্রেণীর লোক এর অগ্রগতি রোধে সচেষ্ট। তাদের সূক্ষ্ম প্ররোচনায় ও চাতুর্যে দুনিয়া ত্যাগ করে সংসার বিরাগী হওয়ার মতো ধারণাও কেউ কেউ প্রচার করেছে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এ মর্মে মুনাজাত করতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতে হাসনা।’ অর্থাত্ ‘হে আমাদের প্রভু। আপনি আমাদের এই বস্তুজগতেও হাসানা বা সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ দান করুন আর আখিরাতেও। আর আমাদের রক্ষা করুন দোজখের শাস্তি থেকে।’
ইসলাম-পূর্ব যুগে একদল খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা যখন আল্লাহর প্রতি ভক্তি আতিশয্যে ব্যবহারিক জীবনের কায়-কারবার পরিহার করে পাহাড় চূড়ায় গিয়ে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয় তখন পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা এ কার্যক্রমের নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, ‘তারা যে বৈরাগ্য গ্রহণ করেছিল, আমি তাদের এই দায়িত্ব দেইনি। এটা তাদেরই মনগড়া, নিজেদের উদ্ভাবিত।’ আল্লাহর এই বাণীতে দুনিয়াকে ত্যাগ করার কথা বলা হয়নি।
কিন্তু ভোগেরও শরীয়তসম্মত বিধান রয়েছে। স্মরণ রাখা দরকার যে প্রকৃতপক্ষে সেটিই হচ্ছে দুনিয়াদারি ও মানুষকে আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন করে রাখা। সম্পদ বা জনের প্রাচুর্যের নাম দুনিয়া নয়।
সম্পদের প্রাচুর্যের কমতির কারণে কাউকে দরিদ্র বলা যায় না। মহানবী (সা.)-কে এই বিশেষণে আখ্যায়িত করেন। উহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণস্তূপের প্রস্তাব যিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, তিনি দরিদ্র হতে পারেন না।
তিনি হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর মতো দেশ, জাতি ও মানবসভ্যতার সুখ-সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের জন্য দোয়া করেছেন। এই জাগতিক জীবনে জাতির যাবতীয় সম্পদ দুর্নীতিবাজ লম্পট; চরিত্রহীন নেতৃত্বের হাতে তুলে দিয়ে মহানবী (সা.) সে নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার নীতি গ্রহণ করেননি। দেশ রক্ষা, জাতিগঠন, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রচার মাধ্যম, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, অর্থনৈতিক চাবিকাঠি কোনোটাই আল্লাহর রাসুল (সা.) আবু লাহাব, আবু জাহেলি নেতৃত্বের হাতে ছেড়ে দিয়ে জাতিকে অর্থনৈতিক এতিম বানানোর নীতি গ্রহণ করেননি। উম্মতকেও এমন আহম্মকি করার তিনি অনুমতি দেননি। সম্পদ আল্লাহর, এ সম্পদ যেন মানবতার কল্যাণে ব্যয় হয়, এর জন্যই ছিল তাঁর অবিরাম সংগ্রাম ও সাধনা। তিনি পৃথিবী থেকে যেমন মনের দারিদ্র্য দূর করতে এসেছিলেন, তেমনি আল্লাহ প্রদত্ত অর্থ ব্যবস্থায় ধনের দারিদ্র্যও দূর করতে এসেছেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর মাত্র ১৩ বছরে তিনি তাঁর জাতিকে এতটা সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন যে আরবে জাকাত নেয়ার মতো কোনো লোক ছিল না। আজও তাঁর আদর্শ গ্রহণ করলে পৃথিবী এমনি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সুখী-সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। রাসুলের আদর্শ গ্রহণের মধ্যেই রয়েছে বিশ্ব থেকে অভাব, কষ্ট ও দারিদ্র্য দূর করার একমাত্র উপায়—এ কথা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারব, ততই আমাদের মঙ্গল।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: