ইসলামে মানবাধিকার

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূলুল্লাহ সাঃ এরশাদ করেছেন­ ‘হে লোক সকল! নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক, অনারবির ওপর আরবির এবং আরবির ওপর অনারবির কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি হলো­ তাকওয়া বা খোদাভীতি (মুসনাদে আহমদ-ইবনে হাম্বল)।

মহানবী সাঃ-এর যুগান্তকারী সংবিধানের মাধ্যমে পৃথিবীর অধিকার হারা সব মানুষের সব রকমের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

মৌলিক অধিকারঃ দয়ার নবী সাঃ-এর মদিনাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্রের দ্বারা সব মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার তথা­ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা প্রভৃতি পূর্ণভাবে লাভ করেছে।

জীবনের নিরাপত্তাঃ পবিত্র কুরআনে অন্যায়ভাবে মানব হত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মজিদে এরশাদ করেছেন­ ‘তোমরা সে প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ্‌ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন।’ (সূরা বনী- ইসরাঈল, আয়াত-৩৩)।

পবিত্র কুরআন কোনো একজন মানুষ হত্যা করাকে সমগ্র মানবকে হত্যার শামিল বলে আখ্যায়িত করেছে। কারণ, মানুষের অন্তর থেকে যখন মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যায় তখন তার জন্য একজন মানুষ হত্যা করা যা একদল মানুষ হত্যা করাও তাই। পাপি-অত্যাচারীর জন্য সবই সমান। মহান রাব্বুল আলামীন এ মর্মে এরশাদ করেছেন­ ‘নরহত্যা অথবা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কার্য করা ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকেই হত্যা করল।’ (সূরা মায়িদা, আয়াত-৩২)।

মহান আল্লাহ্‌ পাক বলেন, ‘কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ীভাবে থাকবে। (সূরা নিসা, আয়াত-৯৪)।

‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না।’ (সূরা বনী-ইসরাঈল,আয়াত-৩১)।

অমুসলিমদের অধিকার সম্পর্কে সর্বশ্রেষ্ঠ হাদিস গ্রন্থ সহি বোখারি শরিফে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে­ ‘যদি কোনো মুসলমান চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করে, তাহলে ওই ব্যক্তি জান্নাতের খুশবু বা সুঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ ৪০ বছর সফরের দূরত্ব থেকেই পাওয়া যাবে।’

ধর্মীয় অধিকারঃ জাহেলি যুগে আরবদের ধর্মীয় অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। তাদের ধর্মীয় ধারণা কতগুলো অন্ধবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। সে সময় আল্লাহর একত্ববাদ বিলুপ্ত হয়ে ক্রমে ক্রমে সমগ্র মানবসমাজ পৌত্তলিকতায় ডুবে গিয়েছিল। তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য একটি করে মূর্তি ছিল। কাবাগৃহে মোট ৩৬০টি দেব-দেবীর মূর্তি সংরক্ষণ করেছিল তারা। তখনকার সময়ে ওকাজ মেলা নামে এক অশ্লীল মেলা বসত। তারা কোনো কাজ আরম্ভের আগে দেব-দেবীর সামনে আরজি পেশ করে নিত।

এ পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবের মাধ্যমে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধানরূপে পৃথিবীতে পাঠালেন। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কারের মূলে কুঠারাঘাত করে বিশ্বমানবতাকে এমন এক সুন্দর ধর্মীয় ব্যবস্থা উপহার দিলেন­ যার তুলনা ইতিহাসে নেই।

ইজ্জত-আবরুর নিরাপত্তাঃ মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় হলো­ ইজ্জত-আবরু। মানব জীবনের এই অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি প্রিয় নবী সাঃ-এর কাছেও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ প্রত্যেককে ১০০ করে বেত্রাঘাত করো।’ (সূরা নূর,আয়াত-২)।

আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে­ ‘কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয়, সে উপহাসকারীর চেয়েও উত্তম হতে পারে। এবং কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকেও উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণীর চেয়েও উত্তম হতে পারে।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১১)।

রাসূলুল্লাহ্‌ সাঃ আনীত শরিয়তে ব্যভিচারের কঠিনতম শাস্তি থেকেই অনুমান করা যায় পবিত্র ধর্ম ইসলামে মানুষের ইজ্জত-আবরু কতটা সম্মানিত ও মূল্যবান বিষয়।

সম্পদের নিরাপত্তাঃ রাসূলে আকরাম সাঃ মানুষের জানের নিরাপত্তা প্রদানের সাথে সাথে ধন-সম্পদের নিরাপত্তাও দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মজিদে ফরমান­ ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না।’ (সূরা বাকারা-আয়াত-১৮৮)।

প্রিয় নবীজী সাঃ ঘোষণা করেন­ ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।

বিশ্বনবী সাঃ বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের এক বিঘত পরিমাণও জমি জবরদখল করে, তাহলে কিয়ামতের দিন সাততবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’ (মুসলিম শরিফ)।

ন্যায়বিচারের অধিকারঃ জাতি, ধর্ম, বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের ন্যায়বিচার লাভের অধিকার রাসূলে করিম সাঃ প্রদান করেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা যখন বিচার করো, তখন ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করো।’ (সূরা নিসা-আয়াত-৫৮)।

অন্যত্র এরশাদ হয়েছে­ ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকো। কোনো জাতির বিদ্বেষ যেন তোমাদের কখনো সুবিচার থেকে বিচুøত করতে প্ররোচিত না করে।’ (সূরা মায়িদা, আয়াত-৮)।

ন্যায়বিচারের এক রায় উপস্থাপন করে­ বিশ্বনবী সাঃ ফরমান­ ‘সেই মহান আল্লাহর কসম! যাঁর কুদরতি হাতে আমার জীবন, যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা রাঃও চুরি করত, তবে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (মুসলিম শরিফ, দ্বিতীয় খণ্ড-পৃষ্ঠা-৬৪)

দাসদাসীর অধিকার সম্পর্কে প্রিয় নবী সাঃ-এর নির্দেশঃ মানব ইতিহাসে মানবদরদী দয়ার সাগর দরদী নবী সাঃ দাসদাসীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রদান করেন। তিনি দাসপ্রথাকে সমূলে উচ্ছেদ করেন। মহানবী সাঃ এরশাদ করেন­ ‘নিশ্চয় তোমাদের দাস তোমাদের ভাই, আল্লাহ্‌ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা যা খাবে তাদেরও সে খাবার দেবে, তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরও তা পরিধান করতে দেবে।’ (বোখারি শরিফ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৪৬)

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে­ ‘নিজের চাকর-নোকরকে সাথে বসিয়ে আহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

(মুসলিম শরিফ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠঃ-৫২)

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভের অধিকারঃ মানবতার মুক্তির দূত মহানবী সাঃ সমাজের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অর্থনৈতিক মৌলিক ছয়টি অধিকার বাস্তবায়ন করেছেন। যথা­ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিয়ে-শাদি।

ধনীদের সম্পদে অভাবগ্রস্তদের অধিকার রয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার তথা- জাকাত, ঊষর ও ফিতরা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে তিনি দেশের দরিদ্র শ্রেণীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দেবে আর বিরত রাখবে মন্দ কাজ থেকে।’ (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১১০)।

রাহমাতুল্লিল আলামিন সাঃ­ শোষণের মাধ্যম হিসেবে সুদের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। জুয়াখেলা, প্রতারণা, লটারি, মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছেন, যা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগণের জন্য খুবই ক্ষতিকর ছিল।

মজুদদারির নিষিদ্ধতা ঘোষণা করে মহানবী সাঃ বলেন­ যে ব্যক্তি মজুদ রাখে, সে গোনাহগার। অন্যত্র আল্লাহর রাসূল সাঃ এরশাদ করেন­ ‘যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করে রাখে না, সে আল্লাহর রহমত পাওয়ার যোগ্য। আর যে ওসব দ্রব্যাদি মজুদ রাখে, সে অভিশপ্ত।’ তিনি আরো বলেন, যারা দাম বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় জিনিস ৪০ দিনের বেশি মজুদ রাখে তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা অন্যকে ঠকায় ও অন্যের সাথে প্রতারণা করে তারা বিশ্বাসী নয়। প্রিয় নবী সাঃ সর্বপ্রথম শোষণমূলক ব্যবস্থা পরিহার করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। বিধবা, এতিম, অসহায়, দুস্থ প্রতিবেশী, যুদ্ধবন্দী প্রমুখ নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষিত করেন। এভাবে আল্লাহর হাবিব সাঃ অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।

দয়ার নবী সাঃ নারীদের তিনি সর্বাঙ্গীণ সম্মান ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের মোহরের অধিকার, ভরণ-পোষণের অধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করেন।

আল্লাহর প্রিয় হাবিব সাঃ ইহুদি-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকার রক্ষার্থে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন তা সব যুগের সব মানুষের জন্য অনুপম আদর্শ। একমাত্র তাঁর আদর্শই দিতে পারে বিশ্ব মানবতার মুক্তি, স্বস্তি ও শান্তির গ্যারান্টি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: