ভাইয়ের ওপর বোনের অধিকার

একের চেয়ে দুই বড়, এক ভাগের চাইতে দুই ভাগ বেশি­ এটাই পাটিগণিতের সরল ও শুদ্ধতম হিসাব। কিন্তু মানুষের জীবন বড়ই অ?ভুত, বড়ই জটিল। এখানে অঙ্কের সরল হিসাবও আসলে সরল নয়। এখানকার দুই ভাগও আসলে এক ভাগের চেয়ে বেশি নয়। এক ভাগ আবার দুই ভাগের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ইসলামের অতি আলোচিত এই উত্তরাধিকার আইন সরাসরি জড়িত নারীর ওপর পুরুষের অধিকার ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে (সূরা ২ঃ আয়াত ২২৮; সূরা ৪ঃ আয়াত ৩৪)। এই অধিকার ও শ্রেষ্ঠত্ব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভাই-বোন অবধিও ব্যাপ্ত। ভাই-বোনের সম্পর্ক যেমন আজীবনের, তেমনি তাদের মাঝে একের ওপর অন্যের অধিকার ও দায়িত্বও আজীবনের। যে এই অধিকার ও দায়িত্ব এড়াতে চাইবে সে অতি আবশ্যিকভাবেই আত্মীয়তা ও রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করার দায়ে হবে দোষী এবং তার জন্য জান্নাত হবে অবশ্যই সুদূরপরাহত। ইসলামী বিধান মেনে দুই ভাগ সম্পদের মালিক হয়ে বোনকে ভুলে যাওয়া হবে আল্লাহকে অর্ধেক মেনে বাকি অর্ধেক না মানার শামিল। আর আল্লাহর আইনের এই খণ্ডিত বা সুবিধাবাদী ব্যবহার যে কি ভয়াবহ পাপ তা আল্লাহ পাক নিজের ভাষায় বর্ণনা করেছেন পবিত্র আল কুরআনে (২ঃ৮৫)।

আমাদের চর্মচোখের দৃষ্টিকে বাদ দিয়ে যদি অন্তরের দৃষ্টিকে একটু প্রসারিত করি তাহলে খুব স্পষ্ট দেখব যে, বাবা-মায়ের পরিত্যক্ত যে সম্পত্তি আজ আমরা ভাগাভাগি করছি, তা কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েরও ছিল না। তা ছিল তাদের বাবা-মায়ের। তারও আগে তা ছিল তাদের বাবা-মায়ের বাবা-মায়ের। অর্থাৎ যে সম্পদ আজ আমাদের সামনে তা সব সময়ই ছিল এই দুনিয়ার সম্পদ, মানুষের মাঝে শত শত বছর ধরে শুধুই হাতবদল হয়ে চলেছে মাত্র। আমাদের পরে তা আবারো দিয়ে যেতে হবে অন্য কাউকে। তাই যে কারো জীবনে যেকোনো সময়ের জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা সম্পদ নয়, তা হলো সম্পর্ক। সম্পর্কহীন মানুষের সহায়-সম্পদ অর্থহীন। কারণ সেসব কোথাও ব্যবহারের তো তার কোনো জায়গাই নেই, সেই সম্পদ দিয়ে করবেটা কী? অতএব সম্পদ হলো ব্যবহারের জন্য এবং আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলা যায় যে, ‘পুরনো সম্পর্ক রক্ষা ও নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি’ করাই হলো সহায়-সম্পদের সবচেয়ে যথার্থ কাজ। বস্তুত বিষয়টাই আল্লাহ পাক নিশ্চিত করেছেন তার প্রবর্তিত উত্তরাধিকার আইনে।

বিয়ে হলে বোনেরা চলে যায় পরের বাড়ি। ভাইদেরকেও একসময় আলাদা হতে হয় নিজ নিজ সংসার নিয়ে। এই পর্যায়ে তাদের রক্তের সম্পর্ক রক্ষিত হতে পারে প্রথমত আত্মিকভাবে; দ্বিতীয়ত, বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদের মাধ্যমে। সম্পদভিত্তিক যোগাযোগটা না থাকলে আত্মীয়তার সম্পর্কও ফিকে হয়ে যায় সময়ের ব্যবধানে। সে জন্যই আমরা আজকের শহরবাসী চিনি না আমাদের গ্রাম আর গ্রামের আত্মীয়দের। যদিও আমাদের মা-বাবারা উঠে এসেছেন ওই গ্রাম থেকেই। পরম করুণাময় আল্লাহ পাক চান না যে তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষ নিজের সমস্ত নাড়ির বন্ধন খুইয়ে একসময় খড়কুটোর মতো ভাসমান কোনো একাকী বস্তু হয়ে যাক বিশাল এই বিশ্বের বুকে। তাই তিনি প্রতিটি ভাইবোনকে অধিকার দিয়েছেন তাদের পৈতৃক সম্পত্তিতে (৪ঃ৭, ১১-১২, ১৭৬)। এ ক্ষেত্রে ভাইকে দুই ভাগ দিয়ে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তার বোনের দায়িত্ব, তা চাই তার ভালো লাগুক বা না লাগুক। বোনের বিয়ে হয়ে পরের ঘরে যাওয়া মানেই পর হয়ে যাওয়া নয়। নিজের শিশুকাল আর শৈশব কেটেছে যেখানে, যাদের কাছে সেখানে তার অধিকার আছে। মন চাইলেই নাড়ির টানে ছুটে আসতে চাইতে পারে বাবা-মার স্মৃতিময় ভিটায়। তা ছাড়াও যেকোনো সময় বোন হতে পারে স্বামীহীন। হতে পারে তালাকপ্রাপ্ত। তার পুনর্বিয়ের প্রয়োজন হতে পারে। অথবা পুরোজীবনটাই তাকে থাকতে হতে পারে অবিবাহিত। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে বোনের দেখভালের দায়িত্ব পুরোপুরি ভাইয়ের। এটা যাতে বোনের প্রতি ভাইয়ের দয়ার দান মনে করার কোনো সুযোগ না থাকে, সে জন্যই ভাইকে আগাম দিয়ে রাখা হয়েছে দুই ভাগ সম্পদ। এমনকি যেসব বোন নিজের সংসারে অভাবগ্রস্ত তারা ভাইয়ের কাছে দাবি করতে পারে সহায়তা। এটা কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটা তাদের অধিকার। এর দ্বারা এক দিকে বোনের সম্মান যেমন সুউচ্চ ও সমুন্নত রাখা হয়েছে, অন্য দিকে ভাইদেরকে তথা ছেলেদেরকে বাধ্য করা হয়েছে রক্তের সম্পর্ক রক্ষায় সদাসচেষ্ট, সচেতন ও তৎপর থাকতে। মহান আল্লাহ পাক এভাবে একের ওপর অপরকে নির্ভরশীল করে রেখেছেন বলেই বিশ্বজগতে আজো মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক টিকে আছে এবং চলমান আছে পার্থিব জীবনের এই ধারা (৪৩ঃ৩২)। আল কুরআনের এই অমোঘ উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তনের সাধ্য যেহেতু কোনো মানুষের নেই, তাই এ নিয়ে দ্বন্দ্ব বা বিতর্ক একেবারেই যুক্তিহীন, সময় নষ্ট মাত্র। এ বিষয়ে তর্কবিতর্ক না করে বরং এমন একটা বিশেষায়িত আদালতের কথা চিন্তা করা যেতে পারে, যেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হবে আল্লাহর এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। বিশেষ করে ভাই যাতে কোনোভাবেই কোনো বোনের দায়িত্ব এড়াতে না পারে সেটা নিশ্চিত করবে এই আদালত এবং আইনানুগ দেখভালের প্রয়োজনে কোনো বোন যাতে তার ভাই দ্বারা কখনোই প্রত্যাখ্যাত বা প্রতারিত না হতে পারে তারও ব্যবস্থা করবে এই আদালত।

অঙ্কের হিসাবে যারা ভাইয়ের দুই অংশকে বোনের এক অংশের চেয়ে বেশি বলে থাকেন, তারা আল্লাহর আইনের অন্য দিকটা যে কেন দেখেন না বা বলেন না, তা একেবারেই বোধগম্য নয়। আল্লাহর আইনের সেই অনুপম দিকটা হলো নারীর ওপর কোনো খরচের দায়ভার না চাপানো। আল কুরআনের বিখ্যাত আয়াত যেখানে অমিতব্যয়ীদেরকে শয়তানের ‘ভাই’ বলা হয়েছে (১৭ঃ২৬-২৭) সেখানেও কিন্তু ‘বোন বা নারী’র কোনো উল্লেখ নেই, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, শুদ্ধ ইসলামিক বিধানে সংসারের কোনো প্রয়োজনে খরচ করার কোনো দায়দায়িত্ব নারীর ওপর বর্তায় না। একটা পরিবারে খরচ করাটা শুধু উপার্জনক্ষম পুরুষের দায়িত্ব আর সে কারণেই নারীর ওপর পুরুষ শ্রেষ্ঠ (৪ঃ৩৪)। এই সুযোগে অবশ্য নারীদের খরচ না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। নারীদেরকে মনে রাখতে হবে যে, শারীরিক অপবিত্র সময়ের কারণে তাদেরকে অনেক মূল্যবান ফরজ ইবাদত ছেড়ে দিতে হয়। যদিও সুস্থতা লাভের পর সেসবের কাজা আদায় করা যায়; কিন্তু কাজার সওয়াব তো আর ফরজতুল্য হয় না, তাই নারীদের ইবাদতে ঘাটতি থাকার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এ ঘাটতি পূরণে তার অংশের সম্পদ থেকে ব্যয় করাটা হলো সবচেয়ে সহজ উপায়। বস্তুতপক্ষে নারী তার প্রাপ্ত সম্পদ থেকে নিজ সংসারের জন্য যা-ই ব্যয় করুক না কেন, তা-ই গণ্য হবে ছাদাকাহ হিসেবে। যেহেতু ছাদাকাহর মতো ইবাদত একান্তই মনের ব্যাপার এবং এতে শক্তি প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। তাই নারীর সম্পদ খরচেও তার ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। মেয়েদের জন্য এটা একটা কঠিন পরীক্ষা বটে এবং এটাই সম্ভবত এক ভাগ সম্পদ দিয়েও নারীকে খরচের কোনো ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে না দেয়ার মূল কারণ। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাকের প্রতিটি আইন-কানুনের মতো এখানেও তিনি তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে মূলত রক্ষা করতে চেয়েছেন ইহ ও পারলৌকক চতুর্মুখী দৃশ্য ও অদৃশ্য সব সমস্যা, ধ্বংস, আপদ ও বিপদ থেকে। সীমিত জ্ঞান এবং স্বল্প আয়ুর মানুষের পক্ষে এমন সুদূরপ্রসারী ও সুসমন্বিত বিধানের কথা কল্পনা করাটাও দুরূহ। এই বিষয়গুলো পুরোপুরি অনুধাবনের কোনো চেষ্টা না করে আল্লাহর আইনগুলোকে অযথা ঘাঁটাঘাঁটি করার যেকোনো অপপ্রয়াস মানুষের জন্য যে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি করবে তা বলাই বাহুল্য। চরম এই সত্যটা অন্তত মুসলিম দেশের শাসকরা বুঝবেন এটাই একমাত্র আশা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: