রাসুলে আকরাম (সা.) এর কাব্যবোধ

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন নবী। তিনি কবি নন। নবী প্রত্যাদেশবাহক, জীবনব্যবস্থাপক ও মানবসমাজের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, ঔদার্য ও বিবেচনাবোধ সমকালীন সমাজে তাঁকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করে তুলেছিল। ভাষার বিশুদ্ধতা, সাংস্কৃতিক পরিচ্ছন্নতা ও মানবিক মূল্যবোধে তিনি ছিলেন মহিমান্বিত মহামানব। তিনি বলতেন, ‘আমি বিশুদ্ধভাষী আরব। কারণ, কোরাইশদের ভেতর আমার জন্ম। কিন্তু আমি আমার শৈশব যাপন করেছি সা’আদ বিন বকর গোত্রে।’ যে সমাজ-পরিবেশে তাঁর আবির্ভাব, সেটি ছিল কবিতার শব্দ-ছন্দ, উপমা-উেপ্রক্ষা, বাণী ও রূপকল্পে প্লাবিত। আরবদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্বপ্ন-বাস্তবতা ও দুঃখ-বেদনার বাহন ছিল কবিতা। নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহাবি-কবিদের কবিতার খোঁজ-খবর রাখতেন। ভালো ও সত্ কবিতা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল প্রসন্ন। প্রয়োজনে নিজে কবিতা আবৃত্তি করা, অন্যদের কবিতা শোনা, কবিতা আবৃত্তির নির্দেশ দেয়া, কবিদের প্রশংসা করা, তাদের জন্য দোয়া করা, পুরস্কৃত করা, কবিতার চরণ পাল্টে দেয়া, কবিতার প্রভাব ও আবেদনের স্বীকৃতি, সর্বোপরি কবিতার গঠনমূলক সমালোচনা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তত্পরতা। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন একটি যুগে, যখন সমালোচনা-সাহিত্যের শিল্পরূপ গড়ে ওঠেনি, সমালোচনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের রূপ-রীতি প্রণীত হয়নি, তখনই নবী সা. সমালোচনার কিছু নীতি-নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কুঁড়ি না-মেলা সমালোচনা-সাহিত্যকে এক অসাধারণ ফুটন্ত ফুলের রং-রূপ দান করছেন এবং রচনার উত্কৃষ্টতার মানদণ্ড নির্ধারণ করলেন শৈলীর জাদুময়তা ও চিন্তার ধর্মমুখিতা। রাসুলের বাণী, রচনা ও কবিতাকে নতুন করে যাচাই-পরখ করার সুযোগ করে দিলেন এবং নতুন আঙ্গিকে সমালোচনার পথ দেখালেন। সেই জাহেলি যুগেই তিনি সমালোচনা-সাহিত্যের পরিধি প্রশস্ত করলেন। কাব্য-সমালোচনায় যোগ করলেন আধুনিকতা ও নতুন মাত্রা। শুধু তাই নয়, আমরা তাঁর সমালোচনায় কিছু নতুন পরিভাষাও পাচ্ছি, যেগুলো তিনিই সর্বপ্রথম সাহিত্যের অঙ্গনে ব্যবহার করেছেন। যাতে সমালোচনা-সাহিত্য সঠিক পথে চলতে পারে। তিনিই সর্বপ্রথম প্রচলন করলেন, ‘আল-বয়ান’ শব্দটি, যা পরবর্তী যুগে আরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্রের নাম হয়ে গেছে। এছাড়াও তিনি সমালোচনার অঙ্গনে ব্যবহার করেছেন ‘বালিগ’-আলঙ্কারিক, ‘আল-উমূম, আল-ঈজাজ’—অর্থসংকোচন-অর্থসম্প্রসারণ, শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার নির্দেশকারী বিভিন্ন পরিভাষা।

রাসুল সা. কবিতার বিচার ও মূল্যায়ন করেছেন দুটি ভিত্তি ও মানদণ্ডের ওপর। এক. ধর্মীয় মানদণ্ড, দুই. ভাষাগত (বা অলঙ্কারশাস্ত্রিক) মানদণ্ড। রাসুলের সা. সমালোচনা নিয়ে, যা তিনি কবিতা ও কবিদের সম্পর্কে করেছিলেন, আলোচনা করতে গেলে সর্বপ্রথম যা আমাদের নজরে আসে, তা হলো, ধর্মীয় দিকটি তাঁর সমালোচনার অন্যতম মূলভিত্তি ছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর সমালোচনার কয়েকটি উদাহরণ হলো :
ইসলামের আবির্ভাবের আগে কবি লাবিদ বিন রবিয়ার (মৃ. ৬৬১ খ্রি.) কয়েকটি পঙিক্তর সমালোচনা করে রাসুল সা. বলেছেন, কবিরা যা বলেছেন, তার মধ্যে লাবিদের কথাটি সর্বাধিক সত্য। পঙিক্তগুলোর অর্থ এই, ধ্বংসশীল যা কিছু আছে পৃথিবীতে, আল্লাহ ছাড়া,/সুখ-ঐশ্বর্য-নেয়ামত ক্ষণস্থায়ী, সবকিছু হবে হাতছাড়া।
নাবিঘা জা’দির কিছু পঙিক্ত শুনে রাসুল সা. মুগ্ধ হলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ তোমার মুখ বিনষ্ট না করুন’। (এ দোয়ার বরকতে তিনি ১৩০ বছর জীবিত ছিলেন, অথচ তাঁর সম্মুখভাগের দাঁত মজবুত ছিল।) পঙিক্তগুলো ছিল এই : নেই কল্যাণ সে-সহনশীলতায়,/যা দমাতে পারে না প্রিয়তমের রাগ,/কল্যাণ নেই সে-মূর্খতায়,/যদি না থাকে কোনো সহনশীল ব্যক্তি/যে ছাড়ে না কোনো কাজ, যা শুরু করে একবার।
কা’আব বিন মালিক যখন রাসুলের সামনে এই পঙিক্তদ্বয় উচ্চারণ করলেন, প্রতিরোধ করে আমাদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে/এমনসব বীরপুরুষ,/যাদের চকচকে ধনুকগুলো নিক্ষেপ করে তীর/যেন প্রতিপক্ষ কাপুরুষ। চরণদ্বয় শুনে রাসুল বলে ওঠলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে’ না বলে ‘আমাদের ধর্মের পক্ষ থেকে’ কি বলা যায় না? কবি উত্তর দিলেন, অবশ্যই পড়া যায়। সেই থেকে তিনি এভাবেই পড়তেন এবং আমরা প্রাচীন উত্সগ্রন্থগুলোতে ওরকমই পাই।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও সাহিত্যিক ও কাব্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি কবিতার সমালোচনা করেছেন। ভাষাগত ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সমালোচনার উদাহরণও আছে কম-বেশি। সেগুলো খুব স্বল্প-সংক্ষিপ্ত হলেও, ‘বিন্দুতে সিন্ধু’র মতো সেগুলো খুবই ব্যাপক, মৌলিক ও নীতি-নির্ধারক।
যেসব গুণ থাকলে একটি কবিতা বা কথাকে যথেষ্ট সুন্দর ও উত্তীর্ণ বলা যায়, তার মধ্যে রয়েছে : বক্তব্য ও বর্ণনার বিশুদ্ধতা, সত্যের পক্ষসমর্থন, কৃত্রিম অলঙ্কার বর্জন, উপযুক্ত শব্দচয়ন ও সুঠাম বাক্যবুনন ইত্যাদি। আর এসব গুণের আলোকে রাসুল সময় সময় কিছু কথা ও কবিতার সমালোচনা করেছেন। তাই দেখা যাচ্ছে, এসব গুণসমৃদ্ধ কিছু কথা শুনেই তিনি উপর্যুক্ত দুই নীতি-নির্ধারক বক্তব্য পেশ করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞার আধার’ এবং ‘নিশ্চয় কিছু বর্ণনা জাদুময়’।
কবিতা সম্পর্কে রাসুলের সমালোচনা-পর্যালোচনা খুবই সংক্ষিপ্ত, তবে সন্তোষজনক ও সর্বদিকপ্লাবী। যেন ‘পেয়ালায় পৃথিবী’, ‘গোষ্পদে সাগর’ বা ‘বিন্দুতে সিন্ধু’। তাঁর সমূহ সমালোচনামূলক বক্তব্য, কবিতা সম্পর্কে তিনি তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্যের একটি হলো, ‘কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞার আধার’। এটি খুবই ছোট একটি বাক্য-সহজ, সরলও। কিন্তু এতে কবিতা-বিষয়ে, সমালোচনার সাগর-বিস্তৃতি রয়েছে। রয়েছে পাহাড়-প্রমাণ প্রত্যয়ী প্রজ্ঞা। শিল্পদৃষ্টিকোণ থেকে কবিতায় দুটি মৌলিক উপাদান থাকে : শব্দ ও অর্থ। কিংবা বলা যায়, অর্থ ও শৈলী। কবিতাকে শরীর ও আত্মা উভয় দিক থেকে, প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠতে হয়। রাসুলের উপরিউক্ত বাক্যে কবিতার আত্মিক নিদর্শন ও অন্তর্গুণের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: