উন্নত ও মহৎ চরিত্রের গুরুত্ব

ইবাদত যেমন দ্বীনের একটা অংশ এবং শরিয়তের অন্যতম হুকুম, তেমনি মহৎ চরিত্রও দ্বীনের একটা অংশ এবং ইসলামে তার গুরুত্ব অপরিসীম। এক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের অন্য সব অংশের তুলনায় মহৎ চরিত্রের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সর্বাধিক। কারণ মহৎ চরিত্রের ক্ষেত্রে বান্দা আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী। মহৎ চরিত্র মূলত আল্লাহর সিফাত। আমাদের প্রতি নির্দেশ হলো, আমরাও যেন আল্লাহর বান্দা হিসেবে তার ওই সিফাতগুলো গ্রহণ করি। রাসূল সাঃ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান হও।’

রাসূল সাঃ-এর আগমনের আগেকার যুগ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন, পাপে নিমজ্জিত একটি যুগ। সত্যিই সে যুগে আঁধার নেমে এসেছিল। আরব, পারস্য, মিসর, রোম, ভারতবর্ষসহ সভ্য জগতের সর্বত্রই সত্যের আলো নিভে গিয়েছিল। যবুর, তাওরাত, বাইবেল, বেদ যাবতীয় ধর্মগ্রন্থই বিকৃত ও রূপান্তরিত হয়ে পড়েছিল। ফলে স্রষ্টাকে ভুলে মানুষ সৃষ্টির পায়েই বারবার মাথানত করছিল। তাওহিদ বা একত্ববাদ ভুলে প্রকৃতি পূজা, প্রতিমা পূজা, প্রতীক পূজা, পুরোহিত পূজা, ভূত-প্রেত ও জড় পূজাই ছিল তখনকার মানুষের প্রধান ধর্ম। সমাজ ও রাষ্ট্রের কোথাও নৈতিক শৃঙ্খলার লেশমাত্র ছিল না। অনাচার, অত্যাচার, ব্যভিচার ও পাপাচারে মানুষ এবং জগৎ রুগ্‌ণ হয়ে গিয়েছিল। এ অন্ধকার ও রুগ্‌ণ জগতে আল্লাহ রাসূল সাঃকে প্রেরণ করলেন। আর তিনি সাথে সাথে ঘোষণা দিলেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি মহৎ চরিত্রকে পূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য।’

শুধু মুখে নয়, তাঁর আচার ও কর্মেও ফুটে উঠেছিল মহৎ চরিত্রের গুণাবলি। গঠন করলেন সেবা সঙ্ঘ। কোথায় কোন এতিম ছেলে ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদে, কোথায় কোন দুস্থ-পীড়িত রুগ্‌ণ ব্যক্তি আর্তনাদ করে, নাকি কোনো বিধবা নারী নিরাশ্রয় হয়েছে, তাই তিনি সন্ধান করে ফিরতেন। কখনো এতিম শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, কখনো রোগীর বিছানার পাশে বসে তার সেবা করতেন। অথবা কোনো কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করে প্রতিবেশীকে সাহায্য করতেন। এভাবে লোকসেবায় তিনি ব্রতী হয়েছিলেন।

এই সেবা, ত্যাগ, মানবপ্রীতি কি কখনো বৃথা যেতে পারে? সত্যিকার কল্যাণচেষ্টা ও নিঃস্বার্থ সেবা মানুষ কত দিন ভুলে থাকবে? দিনে দিনে আরবরা নবী মুহাম্মদ সাঃ-এর প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগল। ভক্তি-শ্রদ্ধায় এক সময় সবাই তাঁকে আল আমিন বলে উপাধি দিলো। নীতি-ধর্মবিবর্জিত ঈর্ষা-বিদ্বেষকলুষিত পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরব চিত্তে এ স্থান লাভ করা তখনকার দিনে সহজসাধ্য ছিল না। অনুপম চরিত্র-মাধুর্য, সততা, আন্তরিকতা ও অকৃত্রিম মানবপ্রেম ছিল বলেই নবী মুহাম্মদের পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছিল। কাজেই একটা মানুষকে সমাজে আস্থা কুড়াতে হলে প্রয়োজন পড়ে চরিত্র-মাধুর্যের। সত্যবাদিতা সেই চরিত্র গঠনের প্রধান উপকরণ।

ইসলামে মহৎ চরিত্রের গুরুত্ব, তার মর্যাদা ও অবস্থা কী পরিমাণ তা রাসূল সাঃ-এর এ বাণীর দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায়। রাসূল সাঃ বলেন, ‘সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সে যে, সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী’ (আবু দাউদ) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘কেয়ামতের দিবসে মু’মিনের আখলাকের পাল্লায় সর্বাধিক ভারী বস্তু যা রাখা হবে, তা হলো তার উত্তম আখলাক’। (তিরমিজি, আবু দাউদ, মেশকাত)।

অথচ আজো বিশ্বের সভ্য জাতিগোষ্ঠীর মাঝে নীতি-নৈতিকতাহীন এমন আচরণ বিদ্যমান যা বিশ্বায়ন ও বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এ যুগে মেনে নেয়া দুষ্কর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ দেশে অশান্তি-অরাজকতা, ছিনতাই, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, লুট সব কিছুর মূলে উত্তম ও মহৎ চরিত্রের অভাব। ত্যাগ করা বা ছাড় দেয়ার স্বভাব আজ আমাদের নেই। অথচ কুরআন ও হাদিসে যেমন নামাজ-রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তেমনি আখলাকে হাসানা তথা মহৎ চরিত্রেরও গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপ ইবাদতের হুকুম অমান্যকারীদের প্রতি যেমন শাস্তির হুকুম প্রদর্শন করা হয়েছে, তেমনি অনেক মন্দ আখলাকের ব্যাপারেও জাহান্নামের কঠিন শাস্তির বাণী উচ্চারিত হয়েছে।

‘অহঙ্কার’ সম্পর্কে আল্লাহর কঠোর হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারিত হয়েছে, যার অন্তরে কিঞ্চিৎ পরিমাণ অহঙ্কার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। দোষ চর্চাকারীর ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘অপরের দোষ অন্বেষণকারী এবং তার গোপন কথা অবগত হয়ে তা প্রচারকারী জান্নাতে যেতে পারবে না।’ অন্য হাদিসে রাসূল সাঃ বলেন, ‘কেয়ামতের দিবসে সর্বনিকৃষ্ট মানুষ হবে ওই দ্বিমুখী চরিত্রের ব্যক্তি, যে এক পক্ষের কাছে এক চেহারা নিয়ে এবং অপর পক্ষের কাছে আরেক চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়।’ (বুখারি)।

অনুরূপ কিছু কিছু মন্দ আখলাক সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যার মধ্যে থাকবে, সে মু’মিন নয়।’ অন্য হাদিসে কিছু কিছু মন্দ আখলাক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তা জাহান্নাম অবধারিত করবে এবং জান্নাত থেকে বঞ্চিত করবে।’ ভেবে দেখা প্রয়োজন, উপরি উক্ত হাদিসগুলোয় যেসব মন্দ কাজের ব্যাপারে জাহান্নামের শাস্তির হুমকির কথা বলা হয়েছে এবং জান্নাত থেকে বা ঈমান থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা আখলাকসংক্রান্ত বিষয়। এ হাদিসগুলো থেকে অনুমান করা যায়, ইসলামে মহৎ চরিত্রের গুরুত্ব কত বেশি।

আখলাক সুন্দর করার বিষয়টি নিছক পূর্ণতা লাভ করার বিষয় নয় যে, বুজুর্গ ও কামেল হওয়ার জন্য তা প্রয়োজন। বরং মুসলমান হওয়ার জন্য, জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য, নামাজ-রোজার যেমন আবশ্যক তেমনি নিকৃষ্ট আখলাক পরিহার করা এবং উৎকৃষ্ট আখলাক গ্রহণ করাও অতি আবশ্যক। বিশেষত এমন আখলাক যার প্রতি কুরআন ও হাদিসে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যেমন­ ছবর, তাওয়াক্কুল, সততা, বিশ্বস্ততা, ইখলাস, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা, অপরের কল্যাণ কামনা, অপরের প্রতি সুধারণা, অপরের দোষ-ত্রুটি গোপন করা, ক্ষমা, উদারতা, ক্রোধ সংবরণ, বদান্যতা, দানশীলতা, ইনসাফ, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয়, নম্রতা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে শত্রুতা পোষণ করা ইত্যাকার। এই মহৎ আখলাকগুলো নিজের মধ্যে সৃষ্টি করা এবং তার পরিপন্থী মন্দা আখলাকগুলো নিজের থেকে দূর করার চেষ্টা করা খুব জরুরি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: