জনপ্রতিনিধিদের কুরআনিক দায়িত্ব

নির্বাচন হয়েছে দেশে। নির্বাচিত হয়েছেন সিটি মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, কাউন্সিলর ও কমিশনাররা; যাদের প্রায় ৯৮ শতাংশই মুসলমান। মুসলমানদের ঈমান হলো, ক্ষমতা দেয়ার মালিক আল্লাহ। ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার মালিকও আল্লাহ। বাস্তবেও তাই। আল্লাহ বলেন, ‘ বলুন, হে আল্লাহ তুমিই রাজ্য ও রাজত্বের মালিক, যাকে চাও তাকে রাজত্ব দান করো, যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নাও।’ আল কুরআন। দুনিয়ায় শান্তিময় পরিবেশ বজায় রাখার এবং মানুষ যাতে সুখ-শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন পরিপূর্ণ ইসলামী জীবনাদর্শ। মানে শান্তিপূর্ণ জীবনবিধান। ইসলাম শব্দের অর্থও শান্তি। মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার জন্য মানুষের মধ্য থেকে কিছু উপযুক্ত লোক বাছাই করে তাদেরকে সমাজের নেতা নির্বাচিত করার দায়িত্বও ইসলাম মানুষকে দিয়েছে। এ কারণেই আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো তোমাদের দায়িত্বশীলদের।’ আল কুরআন। রাসূল সাঃ বলেন, ‘যে আমির অর্থাৎ দায়িত্বশীলের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল, যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল।’ আল হাদিস। তবে সে আনুগত্যের সীমা কী হবে তাও আল্লাহর রাসূল সাঃ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর নাফরমানি করে কোনো মানুষের আনুগত্য করা যাবে না।’ সে যেই হোক­ আল হাদিস। সামাজিক শান্তি, নিরাপত্তা, সঠিক দায়িত্ব পালন এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ ছুবহানাহুতায়ালা সমাজের কিছু মানুষকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেন। তাদের দায়িত্ব কী হবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমানদের যদি কোনো এলাকার দায়িত্বশীল করি­ তাদের চারটি প্রধান কাজঃ (১) সে এলাকায় নামাজ কায়েম করা, (২) জাকাত আদায় করা, (৩) সৎ ও কল্যাণময় কাজের আদেশ জারি করা এবং (৪) অসৎ ও অন্যায় কাজ নিষিদ্ধ করা। আল-কুরআন।

নামাজ বা সালাতঃ রাষ্ট্রীয় সামাজিক, প্রশাসনিক ও মানবিক অন্যায় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে উপরিউক্ত চারটি কাজও মুসলমান নেতাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। সালাত শব্দের অর্থ ক্ষমা ও রহমত। সালাতের মাধ্যমে নিজের জন্য ক্ষমা এবং সমাজের জন্য আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়। তাই এর নাম সালাত।

আল্লাহর নবী সাঃ বলেন, ‘যে নামাজ বর্জন করল সে দ্বীন বরবাদ করে দিলো।’ নাউজুবিল্লাহ। আল্লাহর নবী আরো বলেন, ‘যে ইচ্ছা করে নামাজ পরিহার করল সে কুফরি করল।’ হজরত উমর রঃ তার শাসনামলে আঞ্চলিক গভর্নরদের চিঠি লিখে নামাজের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে নামাজের ব্যাপারে সাবধান করছি, এটা তোমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।

জাকাতঃ জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্র করা। জাকাতের মাধ্যমে নিজের সম্পদ ও আত্মাকে এবং সমাজকে দারিদ্র্য থেকে পবিত্র করা হয়; তাই এর নাম জাকাত। জাকাত দেয়া সম্পদশালী মুসলমানদের জন্য ফরজ। জাকাত যারা দেবে না, তারা শুধু দুনিয়ায় জানমালের ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা নয়, আখেরাতেও জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। যারা জাকাত দেবে, আল্লাহর রাস্তায় দান করবে, গরিব অসহায় মানুষকে সাহায্য করবে, তারা দুনিয়ায় সুখ পাবে, শান্তি পাবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে এবং জান্নাতি হওয়ায় সৌভাগ্য লাভ করবে। আলহামদুলিল্লাহ। জাকাত দেয়া মুসলমানদের জন্য ফরজ। জাকাত আদায় করে গরিবদের মাঝে বিলি-বণ্টন করা ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম নেতা ও সরকারের দায়িত্ব। তাই আল্লাহ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধারকে জাকাত সংগ্রহ করে স্থানীয় গরিবদের মাঝে বণ্টন করার এবং তাদের পুনর্বাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো ওই সব কর্ণধারের মধ্যে ইসলামী গুণ ও জ্ঞান থাকতে হবে।

সৎ কাজের আদেশঃ সৎ কাজের আদেশ দেয়ার ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ বারবার হুকুম দিয়ে আয়াত নাজিল করেছেন। ইসলামী শরিয়তে ফরজ কাজগুলোর পর এটিকেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আলী রাঃ বলেন, উত্তম আমল হলো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাদান। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা দেবে।’ আল কুরআন। আল্লাহ বলেন, যুগের কসম, সব মানুষই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ছাড়া­ যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করে সত্য এবং ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয় তারা ব্যতীত। আল কুরআন। সৎ কাজে আদেশ দেয়ার এ দায়িত্ব পালনে মুসলমান সমাজ গাফিল হওয়ার কারণেই দেশ ও সমাজে এত অরাজকতা জন্ম নিচ্ছে। প্রত্যেক মুসলমান স্ব স্ব স্থানে নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী সৎ কাজের আদেশ দেয়ার ইসলামী দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে দেশ ও রাষ্ট্রে এত অনাচার জন্ম নেয়া এবং বৃদ্ধি পাওয়া কোনো দিনই সম্ভব হতো না; বরং দেশ ও সমাজ সুখ-শান্তির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতো। আল্লাহ বলেন, ‘এলাকার লোকেরা যদি ঈমান আনে এবং আল্লাহকে ভয় করে চলে আমি আসমান জমিনের বরকতের সব দরজা তাদের জন্য খুলে দিতাম।’ আল-কুরআন।

অসৎ কাজে বাধাঃ ইসলামী বিধান অনুযায়ী অসৎ কাজে বাধা দান মুসলমানদের একটি মৌলিক দায়িত্ব। মুসলমানরা এ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে কোনো ধরনের পাপই সমাজে জন্ম নিত না। কারো পক্ষেই ইসলাম, মানবতা, দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করা সম্ভব হতো না। আল্লাহ ও রাসূলবিরোধী কাজে বাধা দেয়ার দায়িত্ব পালন না করায় আজ দেশ ও সমাজে হাজারো অন্যায় ও পাপের জন্ম দিচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে আল্লাহর গজব ও অনাচার। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন, গুপ্তহত্যা, নারী নির্যাতন ও জঙ্গিবাদ। আল্লাহর নবী সাঃ বলেন, ‘কোনো জনপদে যদি কেউ পাপের কাজ করে, অন্যরা ক্ষমতা ও সুযোগ থাকার পরও তাকে পাপকাজ থেকে বিরত না রাখে, তাহলে মৃতুøর আগেই আল্লাহ তাদের সবার ওপর আজাব নাজিল করবেন। হজরত আবু দারদা রাঃ অপর এক হাদিসে বর্ণনা করে বলেন, আল্লাহর নবী সাঃ বলেছেন, ‘তোমরা যদি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা না দাও, আল্লাহ তোমাদের ওপর জালিম বাদশা বসিয়ে দেবে, সে তোমাদের বড়জনদের সম্মান দেবেন না এবং ছোটদেরকে দয়া করবে না। এমনকি সে সময়ে ভালো মানুষও দোয়া করলে সে দোয়া কবুলও হবে না।’ আল-হাদিস।

নামাজ কায়েম করা ধনীদের থেকে জাকাত আদায় করে গরিবদের মাঝে ঠিকভাবে বণ্টন করা, সৎ কাজের আদেশ কার্যকর এবং অসৎ কাজ বন্ধ করা যেহেতু কঠিন কাজ, সেহেতু যারা ক্ষমতার অধিকারী হয় তাদেরকেই এই চারটি দায়িত্ব বিশেষভাবে পালন করার জন্য আল্লাহ আদেশ নাজিল করেছেন। যারাই সমাজ ও জনগণকে সুখ-শান্তি দিতে চায় এবং আল্লাহর গজব ও আজাব থেকে বাঁচাতে চায় তাদের উচিত আল্লাহ প্রদত্ত কুরআনিক এই চারটি দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা। আল্লাহর আদেশ হিসেবে এ দায়িত্ব পালন তাদের জন্য ফরজ। এ জন্যই আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল। তোমাদের প্রত্যেককেই তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।’ আল-হাদিস।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: