ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার

 

বর্তমানে নারী উন্নয়ন নীতিমালা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশের একশ্রেণীর নারী নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে বিশেষভাবে উচ্চকিত। তাদের সাথে একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশাজীবী মানুষও নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নে বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করছেন। অন্য দিকে দেশের আলেম-মাশায়েখ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিপুলসংখ্যক ইসলামপ্রিয় জনগণ এর বিরোধিতা করছেন। বিষয়টি আল কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সংশ্লিষ্ট বলে মুসলমানদের কাছে তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এ বিষয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে সমাজের মানুষ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ায় জাতীয় ঐক্য ও সংহতির মূলে তা ক্ষতিকর বিবেচিত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে সুস্থ মনমানসিকতা ও যুক্তিপূর্ণ বুদ্ধি-বিবেচনার দ্বারা তার মীমাংসা হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয় পাশ্চাত্য সমাজে, যেখানে নারীকে এক সময় Original Sin বা ‘আদি পাপ’-এর উৎসরূপে গণ্য করা হতো। পাশ্চাত্য সমাজে নারীকে অশুভ শক্তির প্রতীক বা ডাইনি বলা হতো। নারীকে সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। নারীরা সেখানে শুধু পুরুষের ভোগের বস্তু হিসেবে গণ্য হতো। আধুনিক যুগে ইউরোপে গণতান্ত্রিক ধারা সূচিত হওয়ার পর সেখানে মানবাধিকারের প্রশ্নটি গুরুত্ব লাভ করেছে। তখন থেকেই নারী অধিকার ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য পাশ্চাত্যে বিভিন্ন ধরনের সভা-সমিতি-সংগঠন-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছে। অবশ্য নারী স্বাধীনতার নামে সেখানে নারীর প্রকৃত মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। নারী হয়েছে সেখানে এখন অশ্লীলতা ও বিকৃত রুচির প্রতীক। পণ্যের বিজ্ঞাপন ও পুরুষের কামনার বস্তু হিসেবে সেখানে নারীর ইজ্জত-আববু ও মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও প্রাচীনকাল থেকে নারীরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। প্রাচ্যের অনেক ধর্মে নারীকে ‘নরকের দ্বার’ হিসেবে গণ্য করা হতো। নারীকে মনে করা হতো অশুভ-অশুচি হিসেবে। স্বামীর মৃতুøর পর স্ত্রীকে তার সাথে সহমরণে বাধ্য করা হতো। ‘সতীদাহ প্রথা’ আইন করে বন্ধ করা হলেও এখনো তা কোনো কোনো সমাজে গোপনে সংঘটিত হয়। বিধবা নারীদের সাদা শাড়ি পরা, উপবাস করা ও নানা ধরনের আচার-আচরণে বাধ্য করা হতো। বিধবাদের বিয়ে-শাদি করা থেকে বিরত রাখা হতো। এমনকি, পূজা-উৎসব ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যোগদানেও তাদেরকে বিরত রাখা হতো। মোটকথা, নারীর কোনোরূপ মানবিক মর্যাদা দেয়া হয় না। পৈতৃক অথবা স্বামীর সম্পত্তিতেও নারীর কোনো অধিকার নেই। নারীকে দাসী মনে করা হতো। শিশুকালে তারা পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর ও বৃদ্ধকালে সন্তানের অধীন হিসেবে গণ্য হতো। তাদেরকে কখনো স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। প্রাচ্যের অনেক দেশে এরূপ অমানবিক বিধিবিধান ও নারীবিদ্বেষমূলক সামাজিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে প্রাচ্যদেশে হয়তো পাশ্চাত্যের নারী উন্নয়ন নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেটা বিশেষ বিশেষ জাতি-ধর্ম ও গোত্রের জন্য হতে পারে, মুসলিম সমাজের জন্য নয়।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলিম সমাজে নারীকে যথাযথ মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আল কুরআন ও সুন্নাহ নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দিয়েছে। মানবিক অধিকারের ক্ষেত্রেও উভয়ের ন্যায্য পাওনা সম্পর্কে ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। ইসলাম স্রষ্টা-প্রদত্ত জীবনবিধান হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ওঅধিকারকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাঃ তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের বাণীতেও নারী ও পুরুষের সমমর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এ মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করি।

নারী ও পুরুষের বিদ্যা শিক্ষা লাভের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যা অর্জনকে ইসলাম সবার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। পুত্র ও কন্যা উভয়ের ভরণ-পোষণ, উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান, যথাযথভাবে মানুষ হিসেবে উভয়কে গড়ে তোলা এবং উপযুক্ত বিয়ে-শাদি দেয়াকে পিতা-মাতার দায়িত্ব-কর্তব্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এমনকি, কন্যাসন্তানের ভরণ-পোষণ, উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষা ও সৎ পাত্রস্থ করলে পিতার জন্য জান্নাত অনিবার্য বলে রাসূলুল্লাহ সাঃ ঘোষণা করেছেন। পুত্রসন্তানের জন্য এসব দায়িত্ব পালন পিতামাতার জন্য বাধ্যতামূলক হলেও এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পুরস্কারের উল্লেখ ইসলামে নেই। অবশ্য উভয় ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে পিতামাতার জন্য মন্দ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। কিয়ামতের দিন আপন সন্তানরাই পিতা-মাতার দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়ে অভিযোগ আনবে। পিতা-মাতার সম্পত্তিতে পুত্রের যেমন অধিকার রয়েছে, কন্যারও অনুরূপ অধিকার ইসলামে স্বীকৃত। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কন্যাসন্তানের অধিকার সঙ্গতভাবেই পুত্রসন্তানের অর্ধেক করা হয়েছে। কারণ কন্যাসন্তান বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে মোহরানা পায়, উপরন্তু তার নিজের ও সংসারের খরচাদি নির্বাহের দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বামীর ওপর ন্যস্ত। সন্তান প্রতিপালন করাও পিতার দায়িত্ব। উপরন্তু নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতা-মাতা ও স্বামীর কাছ থেকে (মোহরানা, গয়না, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদিসহ) যা কিছু পায় তার ওপর সম্পূর্ণ অধিকার ও কর্তৃত্ব স্ত্রীর নিজের। উপরন্তু স্ত্রী যদি তার অর্থসম্পদ খাটিয়ে কোনো মুনাফা অর্জন করে অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরি ইত্যাদির মাধ্যমে কোনো অর্থসম্পদ উপার্জন করে তাহলে সেটাও সম্পূর্ণ তার নিজের। অবশ্য স্ত্রী যদি নিজের ইচ্ছায় তার অধিকারভুক্ত অর্থসম্পদ থেকে কোনো কিছু স্বামীকে প্রদান করে, সংসারে ব্যয় করে অথবা দান-খয়রাত করে, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

নারীদের জীবনে কন্যা, বধূ, মা­ এ তিনটি বিশেষ স্তর রয়েছে। ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশ্‌ত’ বলে রাসূলুল্লাহ সাঃ ঘোষণা দিয়েছেন। পিতার চেয়ে মায়ের মর্যাদাকে তিনগুণ বেশি বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। পিতা-মাতার খেদমত এবং তাদের সন্তুষ্টি বিধান করা ব্যতিরেকে কোনো সন্তানই বেহেশ্‌তে যেতে পারবে না। স্ত্রীর মোহরানা আদায় করা স্বামীর জন্য ফরজ। স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং তার সাথে সদাচার করা স্বামীর জন্য ইসলাম বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। কন্যাসন্তানের বিষয় আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত ইসলাম নারী জাতিকে যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। বলা যায়, ইসলাম নারীকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে অধিক মর্যাদা প্রদান করেছে। উপরন্তু নারীর জন্য পর্দাপ্রথার ব্যবস্থা করে, নারী-পুরুষের অবাধ অসঙ্গত মেলামেশাকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং নারী-পুরুষের স্বাভাবিক পবিত্র দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নারীর মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে, সামাজিক শালীনতা ও পারস্পরিক সম্ভ্রমপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে সুস্থ জীবন বিকাশের ওপর ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে।

তাই, ইসলাম নারীকে যথাযথ মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। এ কথা আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে, ইসলাম স্রষ্টা-প্রদত্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সুষম জীবনবিধান। এর মধ্যে যেমন কোনো অপূর্ণতা ও অসঙ্গতি নেই, তেমনি এতে কোনো ব্যক্তি-শ্রেণী-গোষ্ঠী-বর্ণ বা লিঙ্গের প্রতিও বৈষম্য করা হয়নি। সবাই আল্লাহর সৃষ্ট, কারো প্রতি স্রষ্টার কোনো বিশেষ পক্ষপাতিত্ব বা বিদ্বেষ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। পুরুষ যেমন আল্লাহর সৃষ্ট, নারীও তেমনি আল্লাহর সৃষ্ট। মানুষের ্বংশ-ধারা রক্ষার জন্য এবং নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনে শান্তি-স্বস্তি ও সৌহার্দøপূর্ণ আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই নারী ও পুরুষকে স্বতন্ত্র দৈহিক কাঠামো দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ স্বাতন্ত্র্য কোনো বৈষম্যের সৃষ্টি করে না, বরং উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ককে অধিকতর সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই নারী উন্নয়ন নীতিমালা অন্যদের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচিত হলেও মুসলিম সমাজ তথা মুসলিম বিশ্বের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। মহান স্রষ্টা নারীজাতির জন্য যে নীতিমালা প্রদান করেছেন, সেটা সব দিক দিয়ে সর্বোত্তম, সুসম্পূর্ণ ও ন্যায়ানুগ। ইসলামের নীতিমালা প্রকৃতপক্ষে সমগ্র মানব জাতির জন্যই প্রদত্ত। তাই এ নীতিমালা গ্রহণ করে শুধু মুসলিম নারীই নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-স্থান নির্বিশেষে বিশ্বের সব নারীই যথার্থ উপকৃত হতে পারেন।

দুর্ভাগ্যবশত আমরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞ। আমি মনে করি, ইসলামের বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক অবগত হলে আমরা পাশ্চাত্যের প্রণীত নীতিমালা নয়, ইসলামের নীতিমালাকেই সর্বোৎকৃষ্ট বিবেচনা করে তার বাস্তবায়ন ও অনুশীলনে তৎপর হবো। অধুনা প্রগতি, মানবাধিকার, নারীস্বাধীনতা ইত্যাদি বিশেষ কতগুলো মুখরোচক শব্দ সমাজে বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এর দ্বারা আমাদের বিশ্বাসে চিড় ধরানো এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে আমাদেরকে বিচুøত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। আমি দৃঢ় আস্থার সাথে বলতে পারি যে, নারীস্বাধীনতা ও প্রগতির নামে আমাদের দেশের যেসব আধুনিক শিক্ষিত নারী বিভিন্ন ধরনের দাবি উত্থাপন ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তারা কেউ ইসলামকে জানার চেষ্টা করেননি। যেসব রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও পেশাজীবী ব্যক্তি ও শ্রেণী পাশ্চাত্যের প্রণীত নারী উন্নয়ন নীতিমালা সমর্থন করছেন, তারাও ইসলাম সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়ার চেষ্টা করেননি। তাই যুক্তি ও তাদের বিবেকের প্রতি ঐকান্তিক আহ্বান জানাই এ বলে যে, আসুন আমরা সবাই ইসলামকে যথাযথরূপে জানার চেষ্টা করি। ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, এটা সমগ্র মানব জাতির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য ও কল্যাণকর। ইসলাম মুসলমানদের তৈরি করা কোনো বিধান নয়। মানব জাতির যিনি স্রষ্টা, তিনিই এ বিধান প্রণয়ন করেছেন। তাই, ইসলামকে সঙ্কীর্ণ অর্থে কোনো বিশেষ শ্রেণী বা মৌলবাদীদের বিষয় বলে আখ্যায়িত না করে, এটাকে স্রষ্টা-প্রদত্ত সম্পূর্ণাঙ্গ, কল্যাণকর ও সার্বজনীন বিধান হিসেবে গ্রহণ ও অনুসরণ করলে সবাই তা থেকে উপকৃত হবে। কোনোরূপ আবেগ, অন্ধতা, সঙ্কীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার মোহাচ্ছন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বচ্ছতা, যুক্তি ও উদারচিত্ততার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উপলব্ধির চেষ্টা করা প্রয়োজন। তাহলেই প্রকৃত মুক্তি ও কল্যাণ আসবে। অহেতুক বিভেদ-বিদ্বেষ ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ বর্জন করে শান্তি-সমৃদ্ধিপূর্ণ-কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে অগ্রসর হওয়া আজ সবার একান্ত কর্তব্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: